মেঘের ওপারে আলো
পর্ব_৭
Tahmina_Akhter
[🚫 আমার অনুমতি ছাড়া কপি এবং কার্টেসি ছাড়া পোস্ট নিষিদ্ধ ]
— আলো আমার অর্ধাঙ্গিনী হাতে যাবে কেন?
মেঘালয় বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। তানিয়া আর মাশফি আপাতত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। মাহরীন ধীরপায়ে হেঁটে এসে সোফায় বসল৷ তারপর, মেঘালয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— কারণ,আমি চাইছি।
— তোমার চাওয়া আর না চাওয়ায় তো বিয়ের মত একটা ব্যাপারকে আমি ছেলেখেলা হিসেবে ভাবতে পারি না, মা?
— ছেলেখেলা ভাববে কেন? আলো ইজ কারেক্ট গার্ল ফর ইউ।
— আম্মু, আপনি অনুমতি দিলে একটা কথা বলি?
তানিয়ার কথা শুনে মাহরীন তানিয়ার দিকে ফিরল। মাশফি চোখের ইশারায় বারবার তানিয়াকে চুপ থাকতে বলল, কিন্তু তানিয়া মানলে তো?
— মেঘালয়, আপনার ছেলে। আপনার চেয়ে মেঘালয়ের ভালো কে বুঝবে? কিন্তু, মেঘালয়ের সঙ্গে আলোকে? আমি মানতে পারলাম না বিষয়টা।
— সবকিছু মেনে নেয়ার মত ধারণ ক্ষমতা তোমার নিজের মধ্যে তৈরি করা উচিত, তানিয়া। মেঘালয়ের সঙ্গে আলোকে মানাবে না,এটাই তো বলতে চাইছো তুমি? জীবন সঙ্গীর গায়ের রঙ কালো ফর্সা এটা ম্যাটার না। ম্যাটার হচ্ছে জীবনসঙ্গী কেমন? সে কতটা আপন হতে পেরেছে? সে কতটা লয়াল? সে কতটা এফোর্ট দিচ্ছে?
মাহরীনের কথা শুনে তানিয়া মেকি হাসি দিয়ে বলল,
— কিন্তু, একটা লো ক্লাস ফ্যামিলির মেয়ে আর যাই হোক হাই ক্লাস ফ্যামিলির বউ হতে পারে না। কোথায় সে? আর কোথায় আমরা? আপনি কিভাবে ভাবলেন, আমরা আপনার সব ব্যাপারে সহমত প্রকাশ করব?
— ব্যাপারটা যদি মেঘালয় আর আমার মাঝে থাকতে দাও তাহলে বেটার হত তানিয়া। তোমাকে আমি কিছু বলতে চাই না। কারণ, তুমি এখন আমার ছেলে বউ। তবুও, আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি। তুমি আমার ছেলের বউ হয়ে ক’দিন এই বাড়িতে ছিলে? কতদিন তুমি ছেলের বউ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছো? তুমি এত বড়লোক বাড়ির মেয়ে। তবুও কেন আমি তোমার কাছে সংসারের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে শেষ বয়সে একটু শান্তি, একটু অব্যাহতি নিতে পারছি না।
মাহরীনের কথা শুনে আপাতত সবাই স্তব্ধ। মেঘালয় দুই হাত দিয়ে তারমকপালের চুল গুলো পেছনের দিকে সরিয়ে দিলো। তারপর, দুই হাতের ওপর থুতনির ভর রেখে উদাস হয়ে কিছু একটা ভাবতে লাগল।
এদিকে তানিয়া বিস্মিত হয়ে গেল। মাশফি বুঝতে পারল পরিস্থিতি অন্যদিকে গড়াতে পারে। তাই তানিয়ার হাত ধরে সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য তানিয়াকে বারবার অনুরোধ করে। কিন্তু, তানিয়া নাছোড়বান্দা।
—তো আপনি এখন কি চাইছেন? আমার ক্যারিয়ার ছেড়ে এসে আপনার সেবা করি ? আপনার সংসার সামালই?
— আমি তো একবারও বলিনি, তুমি তোমার ক্যারিয়ার ছেড়ে এসো। তুমি আমার সেবা করবে না। ইট’স ওকে। আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন আমি আমার সংসার দেখে রাখতে পারব। কিন্তু, আমারও তো শখ আছে।তিন তিনটা ছেলে আমার। বড় ছেলেকে বিয়ে করিয়ে ভালো করে একমাসও ছেলের বউয়ের সঙ্গে থাকতে পারলাম না। কাব্যকে বিয়ে করালাম। কাব্য আর ইতি দুজনেই স্কলারশিপ পেয়েছে। চল যাবে পোল্যান্ডে। মেঘালয় সারাদিন মেডিক্যালে পড়ে থাকে। আমার একা বাড়িতে দম বন্ধ হয়ে আসে।
— একাকী সময় না কাটলে কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যান। আর যদি ভেবেই থাকেন মেঘালয়কে বিয়ে করাতেই হবে, তাহলে আলোকে নয় অন্য কাউকে দেখুন মেঘালয়ের জন্য।
— তানিয়া? ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট। আমি এখনও বেঁচে আছি। আমার ছেলের ভালো মন্দ আমাকে বুঝতে দাও।
মাহরীনের কথা শুনে মাশফি এবং তানিয়া দু’জনেই উঠে চলে গেল। মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর মাহরীনের পায়ের কাছে বসল। মাহরীনের হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে বলল,
— মা, তুমি কি চাও?
— আলোকে তোর বউ হিসেবে দেখতে চাই। আমার ঘরে আলোর পদচারণ দেখতে চাই। খুব কি বেশী কিছু চেয়ে ফেলেছি আমি তোর কাছে, মেঘালয়?
মেঘালয় মাহরীনের হাঁটুতে মাথা রাখা অবস্থায় হুট করে চোখের পানি ছেড়ে দিলো। মাহরীন হাঁটুতে ভেজা অবস্থা টের পেয়ে মেঘালয়ের মাথা হাত রেখে ব্যতিব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কাঁদছিস কেন, পাগল ছেলে?
— তুমি কি ভাবছো, মা? তুমি কি ভাবছো, তুমি চলে গেলে আমি নিঃসঙ্গ হয়ে পরব?
— আমার অবর্তমানে কে আছে তোকে দেখে রাখার? মাশফি তার পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। কাব্য থাকবে না দেশে। আর তুই একা কি করবি? তোকে বিয়ে করিয়ে মরতে পারলেই আমার শান্তি রে, মেঘালয়। ইদানিং তোর বাবা আমাকে রোজ রাতে এসে স্বপ্নে দেখা দেয়। আমাকে তার সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়। আমি নিষ্ঠুরের মত তোর বাবাকে বারবার ফিরিয়ে দেই। তাকে মিষ্টি সুরে বকা দেই। বারবার বলি, মেঘালয়ের আমি ছাড়া আর কে আছে? ওর একটা ব্যবস্থা করি তারপর তোমার হাত ধরে চলে যাব। তুমি যেদিকে যেতে বলবে সেদিকে যাব।
মেঘালয় মাহরীনের হাত শক্ত করে চেপে ধরে তারপর কান্না ধরা গলায় বলে,
— তুমিও পাষাণ। বাবা তো চলে গেল। এখন তুমিও পালিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা করছো। কেন করছো, এমন? আমি তোমাকে ছাড়া কিভাবে থাকব, মা? তোমার মেঘালয়ের তুমি ছাড়া আর কে আছে ?
মাহরীন নিজেকে শক্ত রাখল। কিন্তু, ভেতরটা যে কেমন দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে! মৃত্যু হুট করে এসে যদি তাকে গ্রাস করত? কিন্তু, সেই সৌভাগ্য কি আর তার আছে? রোজ রোজ একটু একটু করে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করছে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে।
মেঘালয় এবার মাহরীনের হাত ধরে মাহরীনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুমি শুধু শুধু দুশ্চিন্তা করছো। তোমার লিউকোমিয়া মাত্র স্টেইজ টুতে আছে। চিকিৎসা করলে তুমি সুস্থ হয়ে যাবে,মা। শরীরে রোগ মানুষকে যতটা কাবু করে তারচেয়েও বেশী কাবু করে মনের রোগ। তুমি তোমার মনকে বোঝাও, তুমি পারবে রোগকে জয় করতে। তোমার কিছুই হয়নি। চিকিৎসা বিজ্ঞান এখন কতটা এগিয়ে গেছে! ইউ উইল বি ফাইন? ডোন্ট ওয়ারি।
মাহরীন মনে মনে হাসে মেঘালয়ের কথা শুনে। মাহরীন জানে তিনি আর কখনোই সুস্থ হতে পারবেন না। তবুও যেন মেঘালয়কে খুশী করার জন্য বলল,
— এই জন্যই তো বলছি। আলোকে এনে দে। ওকে দেখলে আমি সুস্থ হয়ে যাব।
— মা আলো কোনো খেলনা নয় যে, ওকে চাইলেই কিনে নিয়ে আসব। সে একজন মানুষ। তার চাওয়া পাওয়া আছে নিশ্চয়ই?
— আলোর চাওয়া-পাওয়া আছে কি নেই আমি বুঝব। আগে তুই বল। তুই আগে বল তুই আলোকে পছন্দ করিস?
— দুবার দেখা হলো মাত্র। তখন কি আর ওকে স্ত্রী বানানোর চোখে দেখেছি নাকি?
মেঘালয়ের দুষ্টুমি সুরে বলা কথাগুলো শুনে মাহরীন হাসতে হাসতে বলল,
— পাজি ছেলে!
মেঘালয় মুগ্ধ হয়ে তার মায়ের হাসি দেখল। কতদিন পর তার মাকে এভাবে হাসতে দেখেছে! এমন সময় মেঘালয়ের মোবাইল ফোনে কল আসে। মেঘালয় কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কেউ কিছু একটা বলতেই মেঘালয় সিরিয়াস ভঙ্গিতে জবাব দিলো “আমি আসছি”। মেঘালয় উঠে দাঁড়ালো তারপর মাহরীনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— হসপিটালে যেতে হবে, মা। ছুটি আর কাটানো যাচ্ছে না।
মেঘালয় ছুটে গেল তার ঘরে তারপর পরনের ড্রেস চেঞ্জ করল। মানিব্যাগ এবং মোবাইল হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাবার সময় মাহরীন পেছন থেকে ডাক দিলো মেঘালয়কে। মেঘালয় পেছনে ফিরে তাকাতেই বলল,
— তাহলে আগামীকাল সকালে আলোদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাই?
— তোমার যা করতে ইচ্ছে করে করো। তোমার কোনো কিছুতেই নিষেধাজ্ঞা নেই। কারণ, আজ পর্যন্ত আমি
মাহরীন আহমেদের সকল পছন্দ-অপছন্দকে নিজের পছন্দ অপছন্দ ভেবে বড় হয়েছি।
মেঘালয় চলে গেল। আর মাহরীন বসে রইল ড্রইংরুমে। মাথায় একশ রকমের দুশ্চিন্তা ভর করছে। মেঘালয়ের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তিনি আগে থেকেই জানতেন। কারণ, মেঘালয় তার মায়ের নেওটা। মা যা বলে তাই করে। কিন্তু, আলো? আলো কি রাজি হবে? যদি আলো রাজি না হয়?
পরদিন দুপুরে মেঘালয় বাড়িরে ফিরে আসে। হসপিটালের ডিউটি শেষ করার পর একরাশ ক্লান্তিতে তার দেহ নড়বড়ে অবস্থা। কোনোমতে গোসল শেষ করে দুপুরের খাবার জন্য ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে যেতেই দেখতে পেলো মাশফি, তানিয়া এবং মাহরীনকে। তারা কি নিয়ে যেন আলাপ করছে? মেঘালয়কে দেখে মাহরীন চুপ হয়ে যায়। মেঘালয় তার জন্য বরাদ্দকৃত চেয়ারে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল,
— কাব্য ভাই আর ইতি ভাবিকে কবে আনবে?
— আগামীকাল সকালে।
তানিয়া জবাব দিলো। মেঘালয় প্লেটে ভাত নিয়ে একটা মাছের টুকরো নিয়ে খেতে শুরু করল। তানিয়া এবার মাশফিকে চোখের ইশারায় কি যেন বলতে বলল মেঘালয়কে। কিন্তু মাশফি ইশারায় বোঝাল, পারবে না সে। এদিকে মাহরীন ওদের দুজনের কান্ড দেখে বিরক্ত হয়ে গেল।
এদিকে মেঘালয়ের মনে কুটকুট করছে আলোর ব্যাপারে জানতে। আলোদের বাড়িতে গিয়েছিল কিনা?যদি গিয়েও থাকে তাহলে আলোর সিদ্ধান্ত কি ছিল? পরক্ষনেই নিজের ভাবনাকে ধিক্কার জানালো। যেই মেয়ে তাকে দেখলে বিরক্ত চোখে তাকায়। সেই মেয়ে আর যাই হোক মেঘালয়ের জন্য তার বিয়ের প্রস্তাব শুনে ধেঁইধেঁই করে রাজি হয়ে যাবে না।
চলবে…।
(সন্ধ্যায় আরেকটা পর্ব আসবে। কেমন লাগল পাঠ অনুভূতি জানাবেন। এবং অবশ্যই বড় বড় মন্তব্য চাই।গল্পঘর গ্রুপে আমি গল্পটা পোস্ট করব। অতএব, কোনো কাঁদা ছোড়াছুড়ি যাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন পাঠক )
গল্পটা যাদের ভালো লেগেছে তারা অবশ্যই পেইজে ফলো দিয়ে রাখবেন।
Share On:
TAGS: তাহমিনা আক্তার, মেঘের ওপারে আলো
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৯
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৯
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৩
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৫
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৩০
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৩
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৪
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৬
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৮
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৫