#অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
#নুসাইবা_ইভানা
#পর্ব -১৬
“ছাড়ুন আমাকে। আমাকে স্পর্শ করবেন না। আমার হাত ছাড়ুন, নয়তো চিৎকার করব।”
“করো চিৎকার দেখি, তোমার গলায় কত জোর।”
নীলাঞ্জনা লাবিবের গালে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিয়ে বলে, “আমার গলার চেয়ে হাতের জোর বেশি। আপনার মতো মানুষের জন্য হাতের জোর প্রয়োজন, গলার জোর না।”
রাতুল তেড়ে এসে বলে, “এত বাড় বেড়েছে তোর! আমার সন্তান আমাকে ফিরিয়ে দিতে হবে।”
“আজ আপনার মনে পড়ল এটা আপনার সন্তান? যখন সন্তান গর্ভে ছিল, তখন কোথায় ছিলেন?”
“দেখো নীলাঞ্জনা, আগে যা হয়েছে, সেসব ভুলে যাও। মানুষের জীবনে কত ভুলত্রুটি হয়, ওসব ধরে রেখে জীবন চলে না। তুমি আমার কাছে ফিরে এসো।”
“আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন, আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা না যে আপনার সাথে ব্রেকআপ হয়েছিল, আবার প্যাচআপ করে নেব। আপনি আমার প্রাক্তন হ্যাসবেন্ড, যার সাথে আমার লিগ্যালি ডিভোর্স হয়েছে। আপনার কাছে ফিরে যাওয়ার কোনো অপশন আমাদের ধর্মে নেই।”
লাবিব এবার তেড়ে আসল নীলাঞ্জনার দিকে। মাতুয়াইল শিশু ও মাতৃ ইনস্টিটিউটের ইমার্জেন্সি বিভাগের বাইরে বকুলতলায় দাঁড়িয়ে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত দুজনে।
আশেপাশে অনেকেই ভিড় জমিয়েছে।
একজন ডাক্তার এসে বলে, “এখানে কী হচ্ছে? হাসপাতালের মধ্যে দাঁড়িয়ে এসব করা অপরাধ, আপনারা জানেন না?”
নীলাঞ্জনা বলল, “সরি স্যার।”
নীলাঞ্জনা তার ছেলেকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছিল। সেখানেই লাবিবের সাথে দেখা।
নীলাঞ্জনা লাবিবের দিকে তাকিয়ে বলে…

নয়না রুমে এসে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। আলমারি খুলতেই অবাক হলো! যে জিনিস যেভাবে ছিল, ঠিক সেভাবেই রাখা। হাত বাড়িয়ে একটা কটনের থ্রিপিস বের করে নিল।
জিয়ান নয়নাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে, “এই মুহূর্তগুলো আমার কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে, বাটার মাশরুম। মনে হচ্ছে চোখ খুললেই স্বপ্ন ভেঙে যাবে।”
নয়না সামনের দিকে ঘুরে, জিয়ানের কথা উপেক্ষা করে বলে, “আচ্ছা, আমার ফোনটা তো এ বাসায় থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমার বাসায় কী করে গেল?”
“তোমার ফোন তো ড্রয়ারে ছিল। তোমাকে খুঁজে না পেয়ে আমি কল করেছিলাম, তখন খেয়াল করলাম রুমেই বাজছে।”
“তাহলে ফোন আমার বাসায় কীভাবে গেল?”
“তোমার বাবা হয়তো নিয়েছে। আচ্ছা, আমাকে একটা কথা বলো তো, সেদিন তুমি মায়ের কাছে মিথ্যে কেন বলেছিলে? বের হওয়ার সময় কেন বলেছিলে তুমি তোমার ফ্রেন্ডের বার্থডে পার্টিতে যাচ্ছ?”
“সেদিন আমার কাছে একটা পার্সেল আসে, সেখানে একটা নীল শাড়ি, সাথে কিছু অর্নামেন্টস আর একটা চিরকুট থাকে। যাতে লেখা ছিল, তুমি চাও না কেউ জানুক আমরা সাজেক যাচ্ছি। তাই উপস্থিত মিথ্যে বলেছিলাম।”
জিয়ান নয়নাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “একটা ভুল ধারণায় কী থেকে কী হয়ে গেল?”
“তোমার ভাই একটা সাইকো। সত্যি সত্যি যদি প্রেম থাকতোও, তার জন্য এমন করতে হবে! একদম পাগল তোমার ভাই। আমি কতবার বলেছি, আমার কথা শুনোনি।”
“আমার তো এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। আমাদের জাহিন এমন কিছু করতে পারে।”
“এবার তো জানোই সে কী কী করতে পারে? এবার তাকে আটকাতে না পারলে আরো বড় কিছু করবে।”
জিয়ান নয়নার কপালে চুমু দিয়ে বলে, “সে সুযোগ আর দেব না।”
জিয়ান নয়নাকে কোলে বসিয়ে নয়নার চুল নিয়ে খেলা করছে। নয়না যতই স্বাভাবিক হতে চাচ্ছে, কিন্তু পারছে না। তার হৃদযন্ত্র কেমন দ্রুত উঠানামা করছে। শরীরের তাপমাত্রাও মনে হচ্ছে বেড়ে যাচ্ছে।
জিয়ান নয়নার কাঁধের চুল সরিয়ে নয়নার কাঁধে আলতো করে চুমু দিতে লাগল।
নয়না ইষৎ কেঁপে উঠল। সরে যেতে চাইল জিয়ানের কাছ থেকে।
জিয়ান নয়নাকে আরো শক্ত করে নিজের সাথে আঁকলে নিয়ে বলে, “আজ আর পালানোর পথ নেই, বাটার মাশরুম।”
নয়না জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে বলল, “আজ হবে না, মিস্টার প্লেন ড্রাইভার।”
“হবে না কেন! আমার আজই চাই, এক্ষুনি চাই। প্লিজ জান, না করো না। আমাকে একটু তোমার মাঝে হারিয়ে যেতে দাও।”
নয়না জিয়ানের কানে মুখে কিছু বলল।
জিয়ান মুখ গোমড়া করে বলে, “তাহলে আমাকে জেল থেকে আজ ছাড়িয়ে আনলে কেন! আর চারদিন পরেই আনতে।”
নয়না উঠে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে হাসতে লাগল। কতদিন পর মনখুলে হাসছে নয়না।
জিয়ান নয়নার দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে এই চেহারা, এই হাসি ছাড়া বড্ড অপূর্ণ।
নয়না হাসতে হাসতে বলে, “আমি ভুল করে ফেললাম। ধুর! আপনি আর চারদিন শ্বশুরবাড়ির আপ্যায়ন নিয়েই আসতে পারতেন। আহা, কী যে করলাম আমি।”
“হু, এভাবে তোমাকে কাছে পেয়েও দূরে থাকার চেয়ে ওই শ্বশুরবাড়িও ভালো।”
“আহাগো আমার স্বামী। আপনার মতো মাথায় তো ওসব চলে না যে এত হিসেব কষব।”
“চলে না কেন, হু? এত হ্যান্ডসাম বর চোখের সামনে দেখলেই তো ঝাঁপিয়ে পড়ে চুমু-টুমু খাওয়া শুরু করার কথা। রসকষহীন বউ জুটেছে কপালে।”
নয়না জিয়ানের সামনে এসে জিয়ানের ঠোঁটে টুপ করে চুমু খেয়ে সরে গেল।
জিয়ান চোখ ছোট করে নয়নার দিকে তাকিয়ে বলে, “এটা কী হলো!”
“হ্যান্ডসাম বরকে চুমু খাওয়া হলো।”
“এটাকে চুমু বলে না। এটাকে বলে টোপ। এখন আমার চুমু খাওয়ার ক্রেভিং আরো হাজার কোটি গুণ বেড়ে গেছে।”
“চুমু খেতে দিতে পারি। তবে শুধু চুমু পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে, মিস্টার প্লেন ড্রাইভার।”
জিয়ান নয়নাকে টেনে নিজের কাছে এনেই ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।

আমি ছোটবেলা থেকে মরিয়া হয়ে নিজের বাবা-মায়ের পরিচয় খুঁজে গেছি। শুধুমাত্র একটা প্রশ্ন করার জন্য। কেন আমাকে জন্ম দিল? কেন জন্ম দিয়ে একা ছেড়ে দিল এই পৃথিবীতে? এই সব প্রশ্নের ভার আমাকে রাতের পর রাত জাগিয়ে রাখত। কত কেঁদেছি। জানো, যখন মেডিক্যালে ভর্তি হলাম, সবার বাবা-মা আসত। কত আদর-স্নেহ করত তাদের। আমি নিজেকে আড়াল করে রাখতাম। কারো সাথে মিশতাম না। কারণ এতিম শব্দের সাথেই জুড়ে আছে অবহেলা। এতিম শুনলেই সবাই কেমন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত। ছোটবেলা থেকে এসব সহ্য করে বড় হয়েছি। এই পৃথিবীতে চারজন মানুষ আমাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেনি। রেজা, নাহিদ, লাবিব আর নাজিম আঙ্কেল। কলেজ লাইফটা আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় কেটেছে। আমি আজ ডাক্তার, তাতেও সবচেয়ে বড় অবদান জিয়ানের। আমার মেধা ছিল, কিন্তু টাকা ছিল না। মেডিক্যালে যাদের সাথে পড়াশোনা করেছি, সবাই ভাবত আমি ইগোইস্টিক, অহংকারী। অথচ ওসব ছিল নিজেকে আড়াল করার জন্য। কারো সাথে মিশতাম না। একা থাকতাম। কথা কম বলতাম। মনের মধ্যে ভয় থাকত, কেউ যদি জেনে ফেলে আমার কোনো পিতৃ-পরিচয় নেই। তাহলে কেউ আমাকে মূল্য দেবে না। সারা জীবন এই ভয় আমার মনের মধ্যে জেঁকে থাকত। তোমাকে বিয়ে করতে চাইনি। কারণ জানতাম, তারাও আমাকে অপমান করবে, ছোট করবে। এই শহরের মানুষ খুব দয়াশীল, তবে সেটা শুধু মৌখিক। বাস্তবতা ভিন্ন। জানো, কতদিন রাতে না খেয়ে থেকেছি। কতদিন এক জুতো পরে কাটিয়েছি। খালি পায়ে হাঁটতাম সারাক্ষণ, শুধু ক্লাসে যাওয়ার সময় পরে যেতাম। ক্লাস শেষে আবার খুলে রেখে দিতাম। একটা শার্ট, একটা প্যান্টে কেটে যেত বছর। কখনো আমি হাত পেতে কারো কাছে কিছু চাইনি।
জানো, সেদিন যখন জানতে পারলাম আমার পিতা এই শহরের সনামধন্য একজন ব্যক্তি। যার টাকা-পয়সা, নাম-খ্যাতির কোনো অভাব নেই। সেই পরিবারের অবৈধ সন্তান আমি। তুমি বলো, আমি কী বলেছি আমাকে জন্ম দিতে? আমি কী বলেছি আমাকে পৃথিবীতে আনতে? তাহলে কেন আনল, বলো! পরিচয় দিতে পারবে না, নাম দিতে পারবে না। তাহলে জন্ম দিল কেন?
সায়না কান্না করছে। একটা মানুষের হাসিখুশি মুখের আড়ালে কতটা গভীর ক্ষত লুকিয়ে রেখেছিল। সায়না অনিকেতের হাত ধরে বলে, “সুনয়নার বাবা তোমারও বাবা?”
অনিকেত মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
“জানো, ওই মানুষটা সেদিন এতিমখানার পুরোনো কর্মচারী দুজনকে টাকা দিয়ে গেছে যাতে সত্যিটা আমি জানতে না পারি। তার মানে সে জানে আমি তার সন্তান। আচ্ছা, মানুষ কী করে এত নিষ্ঠুর হতে পারে!”
“তাহলে তোমার মা কে?”
“ওই মহিলা।”
“সুনয়নার মা?”
“হুম। কেয়ারটেকার আমাকে সব সত্যিটা বলেছে। উনি ছয় মাস পর্যন্ত আমাকে ফিডিং করাতে আসতেন।”
“তাহলে তোমাকে কে পরিচয় দিতে কী সমস্যা? ওনারা তো হ্যাসবেন্ড-ওয়াইফ। তোমার উচিত ওনার মুখোমুখি হওয়া।”
“কিছু সত্য না জানাও ভালো। কিছু সত্যি জানার পর সব সত্য মিথ্যে হয়ে যায়। কিছু সত্যে মুখোমুখি হওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে লজ্জাজনক অধ্যায়।”
#চলবে
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১০
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ২