দিশেহারা (১৯)
সানা_শেখ
“আমি এই রুমে থাকি?”
“এই কিরে তুই দেখছি তোর মা-খালার মতো হয়ে গেছিস, পুরুষ মানুষ ছাড়া থাকতেই পারিস না।”
সোহার কান ঝাঝা করে ওঠে শ্রবণের কথা শুনে। এই ছেলে নিজেকে ভাবেটা কী? নেহাতই ভয় পাচ্ছে বলে এই রুমে এসেছে নয়তো জীবনেও আসতো না। ওর মতো বদ লোকের কাছে কে আসতে চায়? অন্তত সোহা চায় না। নিজেকে সামলে দ্রুত দু’দিকে মাথা নেড়ে বলে,
“না, এমন কিছু না। ওই রুমে একা একা ভয় লাগছে, তুমি বিছানায় থাকো আমি নিচে বিছানা করে থাকি।”
“না, বের হ আমার রুম থেকে। দ্বিতীয়বার যেন তোকে এই রুমে না দেখি।”
শ্রবণের রাগী স্বর শুনে চুপসে যায় সোহা। আর কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না, ওই রুমে ফিরে যাওয়ারও সাহস হচ্ছে না। পাশাপাশি রুম হলেও একটা কথা ছিল। এই রুমের চেয়ে বেশ কিছুটা দূরত্ব ওই রুমের। পাশের রুমটা শ্রবণের স্টাডি রুম।
“যাচ্ছিস না কেন?”
“আমাকে বাড়িতে যেতে দাও।”
শ্রবণ বিছানা থেকে নেমে তেড়ে আসে সোহার দিকে। সোহা ভয়ে পেছাতে পেছাতে দেওয়ালের সঙ্গে ঠেকে যায়। শ্রবণ সোহার সামনে দাঁড়ায়, একদম কাছাকাছি। সোহা ভয়ে মুখ তুলে তাকাচ্ছে না। শ্রবণ সোহার চোয়াল চেপে ধরে মুখ উচুঁ করে চোখে চোখ রেখে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“ওই বাড়িতে তো দূর তুই এই ফ্ল্যাটের বাইরেও যেতে পারবি না। আরেকবার ওই বাড়িতে যাওয়ার কথা মুখ দিয়ে বের করলে তোর জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।”
সোহা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, চোখ দুটো পানিতে টুইটুম্বর।
শ্রবণ আগের মতো একই সুরে বলে,
“যা গিয়ে ঘুমা, রাতে আমার গায়ে ছোঁয়া দিলে পাছায় লাথি দিয়ে রুম থেকে বের করে দেব।”
সোহাকে ছেড়ে পুনরায় বিছানায় বসে হেডবোর্ডের সঙ্গে হেলান দিয়ে।
সোহা কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে ধীর পায়ে হেঁটে এসে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে কিনার ঘেঁষে। ভয়ে ওর আত্মা সহ শরীর এখনও কাঁপছে। শ’য়’তা’নটা কথায় কথায় তেড়ে এসে গলা আর চোয়াল চেপে ধরে।
গত রাতে নিজেই জাপটে ধরে ঘুমিয়ে এখন এসেছে ছোঁয়া নিয়ে কথা বলতে!
ওকে ছোঁয়া তো দূরে থাক ওর চেহারাও দেখতে চায় না সোহা। নিজেই তো জোর করে নিয়ে এসে আটকে রেখেছে, এখন আলাদা রুমে রেখে ভূতের ভয় দেখিয়ে মা’র’তেও চায়।
সকালে সোহার ঘুম ভাঙার পর চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে শ্রবণ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছে।
এই ছেলে প্রত্যেকদিন এত সকাল সকাল কীভাবে ঘুম থেকে উঠে যায় সোহা বুঝতে পারে না। রাতে ঘুমায়ও দেরি করে আবার সকালে দ্রুত উঠে যায়। শুধু গতকাল বেলা করে ঘুম থেকে উঠেছিল।
সোহা শোয়া থেকে উঠে বিছানা গুছিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। মাথা ভার ভার হয়ে আছে আজ। রাতে টেনশনে ঘুমই হয়নি ভালোভাবে।
শ্রবণ শোয়ার পর মাঝখান থেকে কোলবালিশ সরিয়ে দিয়েছিল। সোহাকে মা’রা’র মতো কোনো কারণ পাচ্ছিল না তাই শ’য়’তা’নি করে বালিশ সরিয়ে দিয়েছিল যেন সোহা ঘুমের ঘোরে ওর কাছে চলে আসে আর ও সোহাকে উত্তম মাধ্যম দিতে পারে।
বেচারি সোহা শ্রবণের মতলব বুঝতে পেরে ঘুমোতেই পারেনি ভালোভাবে। ওর ঘুমের ঘোরে গড়াগড়ি করার অভ্যাস, ঘুমের ঘোরে কখন জানি শ্রবণের গায়ে ছোঁয়া দিয়ে ফেলে আর শ্রবণ ওকে উধম ক্যালানি দেয়।
শ্রবণ ফরমাল সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরেছে। শার্ট ইন করা, হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। চুল গুলো হেয়ার জেল দিয়ে সেট করেছে। হাতে ঘড়ি পরে সানগ্লাস শার্টের সামনে ঝুলিয়ে নেয়। ফোন, ওয়ালেট আর গাড়ির চাবি পকেটে ভরে নেয়। প্রায় নয়টা বাজতে চলল। নাস্তা করে যাবে অফিসে। আজ দুই ভাইয়ের হাগা টাইট করে দিয়ে আসবে। শাহীন রেজা চৌধুরীও কম দোষী নয়, উনি চাইলেই শ্রবণের সঙ্গ দিতে পারতেন তখন কিন্তু দেননি। দেখেছেন শুধু নিজের স্বার্থ, নিজেদের নিয়ে ভেবেছেন সবসময়, ভাতিজার দিকে ফিরেও তাকাননি।
শ্রবণ ডাইনিং টেবিলে বসে চেয়ার টেনে। জিম থেকে ফেরার সময় নাস্তা কিনে নিয়ে এসেছে দু’জনের জন্য।
শ্রবণের খাওয়ার মাঝেই সোহা আসে ডাইনিং টেবিলের কাছে।
“চোখ দিয়ে গিলে খাবি নাকী?”
শ্রবণের কর্কশ স্বর শুনে মাথা নিচু করে নেয় সোহা। শ্রবণ আগের মতোই কর্কশ স্বরে বলে,
“এগুলো গিলে দুপুরের রান্না করবি।”
সোহা তড়িৎ গতিতে মুখ তুলে তাকায়। ও রান্না করবে? শ্রবণ পুনরায় বলে,
“বুঝতে পেরেছিস আমার কথা?”
“আ আমি তো রান্না করতে পারি না।”
“পারিস না শিখে নিবি। আমি দুপুরে ফিরে এসে খাব, খাবার যেন রেডি থাকে। খাবার ভালো না হলে তোর কপালে শনি আছে।”
সোহা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
“একবেলার মধ্যে কীভাবে রান্না শিখব?”
“সেটাতো আমি জানি না, তুই রান্না করবি; আমি খাব।”
“আমি সত্যি সত্যিই রান্না করতে পারি না।”
“এক কথা বার বার বলবি তো কানশা বরাবর দেবো একটা।”
সোহা চোখের পানি মুছতে মুছতে শ্রবণের দিকে তাকিয়ে থাকে। এ কেমন জালিম? রান্না করতে বলছে আবার খাবার ভালো না হলেও খবর আছে বলছে।
জীবনে একটা ডিম সিদ্ধ করেনি, আজকে রান্না কীভাবে করবে?
শ্রবণ নিজের খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ায়। টিস্যু পেপার দিয়ে হাত মুছতে মুছতে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। সোহা পেছন থেকে জড়ানো গলায় বলে,
“কী রান্না করব?”
শ্রবণ পেছন না ফিরেই বলে,
“গরুর মাংস, মুসুর ডাল, করলা ভাজি, মাছ ভাজি, ডিম ভুনা আর ভাত।”
এতকিছু? সোহার ওষ্ঠ জোড়া ফাঁকা হয়ে গেছে। এতকিছু ও একা একা কীভাবে করবে? রান্নাই করতে পারে না সেখানে এতকিছু করা ওর পক্ষে অসম্ভব।
শ্রবণ বেরিয়ে গেছে ফ্ল্যাট থেকে। সোহা তখনও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। ওর মাথা কাজ করছে না, হাত পা ছড়িয়ে গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।
কোন পাপের কারণে এই শ্রবণ নামক ঝড় ওর জীবনে আসলো? ভালোই তো ছিল, শান্তিতে ছিল। ভালো থাকা আর শান্তি কেড়ে নেওয়ার জন্যই এই শ্রবণ ওর জীবনে এসেছে।
খিদে পেয়েছে, চেয়ার টেনে বসে খাওয়ার জন্য। আগে খেয়ে পেট ঠান্ডা করে নিক তারপর ভাববে কীভাবে কি করবে।
খেতে খেতে আশেপাশে নজর বুলায়। এত বড়ো ফ্ল্যাটে ও একা রয়েছে, কেমন গা ছমছম করছে।
খাওয়া শেষ হতেই টেবিল গুছিয়ে রেখে রান্নাঘরে আসে। রান্না করতে তো বলে গেলো, রান্নার জিনিস আছে কী?
ফ্রিজ খুলে নরমালে ডিম পেয়ে যায় তবে করলা নেই। ডিপ খুলে মাংস বের করে, মাছ বের করে পানিতে ভিজিয়ে রাখে।
পুরো রান্নাঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ডাল পায় না, হয়তো নেই।
রুমে গিয়ে ফোন নিয়ে আসে। শ্রবণ গতকালই ওয়াই ফাই কানেক্ট করে দিয়েছিল।
ইউটিউবে ঢুকে রান্নার ভিডিও দেখতে শুরু করে।
ভিডিও দেখে দেখে সব মসলা বের করে। কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ কুচি কুচি করে কে টে নেয়।
রসুন আর আদা ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নেয়।
রান্নার সবকিছু প্রস্তুত করে ডিম সিদ্ধ হওয়ার জন্য চুলায় বসায়।
কফি কীভাবে বানাতে হয় সেই ভিডিও দেখে নিজের জন্য এক মগ কফি বানায়।
কফি খেতে খেতে মাংস রান্নার ভিডিও আবার দেখতে শুরু করে। রান্না ভালো না হলে শ্রবণ খাবার না খেয়ে ওকেই চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে।
মাংস, ডিম ভুনা আর মাছ ভাজি করতে করতেই দুপুর হয়ে গেছে সোহার। আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে ভয়ে ভয়ে অনেক যত্ন নিয়ে রান্না করেছে যেন ভালো হয় রান্না। জীবনের প্রথম আজ রান্না করলো।
শ্রবণের কাছে কেমন লাগবে কে জানে। যদি ভালো না লাগে? ওকে কী মা’র’বে? সোহার দুই হাত জ্বলছে কাঁচা মরিচ কা’টা’র জন্য আর মাছ ম্যারিনেট করার জন্য।
হাত দুটো লাল টকটকে হয়ে গেছে, আগুনের তাপ লাগলে আরও বেশি জ্বলে। হাত জ্বলার কারণে বেচারীর দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। একটু পর পর হাতে ফু দেয় আবার পানিতে ভিজিয়ে রাখে।
ভাত রান্না করার জন্য চাল ধুয়ে চুলায় বসিয়ে দেয়। বড়ো একটা বাটিতে পানি নিয়ে আইস কিউব দিয়ে সেটাতে দুই হাত ভিজিয়ে রাখে আবার। এখন একটু আরাম লাগছে।
দুপুর তো হয়েই এলো, ভাত হওয়ার আগেই যদি শ্রবণ ফিরে আসে?
ভাতের মাড় গালিয়ে চুলার উপর রাখে আবার। হাত দুটো এখন এত বেশি জ্বলছে যে সোহার গড়াগড়ি করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না হাতের এই জ্বালা। বাবার বাড়িতে ছিল ননির পুতুলের মতো।
পাতিলের ঢাকনা তুলে ভাতের দিকে তাকিয়ে সোহার গলা শুকিয়ে আসে। খুন্তি দিয়ে ভাত নেড়ে মেয়েটা শব্দ করে কেঁদে ওঠে। হাত জ্বালা নিয়ে এত কষ্ট করে ভাতের মাড় গালিয়ে লাভ হলো কী? এই ভাত শ্রবণ খাবে তো দূর দেখলেও ওকেই ভাজা ভাজা করে খেয়ে ফেলবে। ভাতের মাড় গালতে দেরি হওয়ায় জাউ ভাত হয়ে গেছে। আবার ভাত রান্না করতে হবে। কাঁদতে কাঁদতে চাল ধুয়ে আবার ভাত বসায়। এই পাতিলের ভাত এখন কী করবে? এতগুলো ভাত ফেলে দেবে? এই ভাত ও নিজেও খেতে পারবে না।
হাতের অবস্থা এমন হয়েছে যে মনে হচ্ছে হাত দুটো গরম তেলের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছিল। পুনরায় পানির মধ্যে হাত ডুবিয়ে দেয়।
জীবনের প্রথম রান্না করতেও ওর এত কষ্ট হয়নি যতটা হাত জ্বলার কারণে হচ্ছে।
সারাদিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে কিন্তু শ্রবণ এখনও ফ্ল্যাটে ফেরেনি। সোহার এখন আরও বেশি ভয় করছে একা ফ্ল্যাটে থাকতে। হাতের জ্বালা ঠিক হয়ে গেছে এখন। শ্রবণের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ওর নিজেরও খাওয়া হয়নি দুপুরে। খিদেও পেয়েছে, ভয়ও করছে আবার শ্রবণের জন্য টেনশন হচ্ছে। দুপুরে এসে খাবে বলল অথচ এখনও আসছে না কেন? কোনো বিপদ হলো কী?
ফোন হাতে তুলে নেয়, শ্রবণের নাম্বার তো ওর কাছে নেই। দাদার কাছে কল করে ওনার কাছ থেকে শ্রবণের নাম্বার নেয়।
কল করতেই রিং হতে শুরু করে। সোহার হার্টবিট বেড়ে গেছে, বুকের ভেতর জোরে জোরে শব্দ হচ্ছে।
রিং হতে হতে কল কেটে যায় রিসিভ হয় না। পর পর আরও পাঁচ-ছয়বার কল করে কিন্তু রিসিভ হয় না।
পুনরায় কল করতেই রিসিভ হয়। ওপাশ থেকে ভেসে আসে শ্রবণের কর্কশ গলার স্বর।
“কে? রিসিভ হচ্ছে না চোখে দেখেন না? তবুও বার বার কল করছেন কেন?”
“ভা ভাইয়া, আমি।”
গলার স্বর শুনেই বুঝতে পেরেছে ফোনের অপর পাশে সোহা রয়েছে। বাজখাঁই গলায় বলে,
“এতবার কল করছিস কেন?”
“কো কোথায় তুমি?”
“মেয়ে নিয়ে হোটেলে শুয়ে আছি।”
সোহা শুকনো ঢোঁক গিলে বলে,
“দ্রুত ফিরে আসো, ভয় করছে আমার।”
“ফোন রাখ, আরেকবার কল করে ডিস্টার্ব করবি তো ফিরে এসে—”
বাকী কথা শেষ না করেই কল কে’টে দেয় শ্রবণ।
সোহা ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকে পলকহীন।
চলবে………..
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ৫
-
দিশেহারা পর্ব ১৫
-
দিশেহারা পর্ব ৪১
-
দিশেহারা গল্পের লিংক
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ৩৪
-
দিশেহারা পর্ব ৩৬
-
দিশেহারা পর্ব ৩৭