প্রেমবসন্ত_২
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
১৪.
জয়া ড্যাবড্যাব করে কিছুক্ষণ নাজনীনের সিরিয়াস মুখ খানা দেখে কম্বলটা শক্ত করে জড়িয়ে নিল।নাজনীন ঠোঁট চেপে মেয়েটার কাণ্ড দেখছিল।জয়াকে বিছানা থেকে নামতে না দেখে সে হাত বাড়িয়ে জয়ার হাত ধরার আগেই জয়া বলল,
“আপনি অনেক খারাপ।এখন যদি বাড়ির সবাইকে গিয়ে এই কথা বলে দেই তাহলে কেমন হবে?”
নাজনীন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী বলবি?”
“বলব নাজনীন ভাই আমায় ৭বার ফরজ গোসল করাবে বলেছে।তখন আপনার ইজ্জত থাকবে?”
“ফরজ গোসলের অর্থ বুঝিস?”
“অবশ্যই বুঝি।”
“বল তো কী?”
জয়া নাক টেনে বলল,
“স্বামী-স্ত্রী এক…”
হঠাৎ মেয়েটার চোখ বড় বড় হয়ে এলো।নাজনীন দাঁত চেপে বসে তখন।বেচারি কথায় কথায় অনেক নষ্ট কথা বলে ফেলেছে।নাজনীন বিরক্ত হয়ে বলল,
“যা,গিয়ে সবাইকে বল তুই জামাইয়ের সাথে ফরজ গোসল দিয়েছিস।”
জয়া পারলে কম্বলের ভেতর ঢুকে অদৃশ্য হয়ে যায়।মেয়েটা কথায় কথায় কিসব বলে ফেলেছে।নাজনীন হঠাৎ বিছানা থেকে নেমে বারান্দায় গেল।খানিকক্ষণ পর হাতে একটা বড় লাঠি নিয়ে এগিয়ে আসতেই জয়া চিৎকার করে বলল,
“লাঠি নিয়ে এলেন কেন?”
“তোকে আদর করতে।”
“লাঠি দিয়ে কে আদর করে?”
“তোর জামাই।”
জয়া তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে জামা-কাপড় না নিয়েই ওয়াশরুমে ছুটল।ওয়াশরুমের দরজা আঁটকে দেয়ার আগে চোখ পাকিয়ে বলল,
“তুমি আমার বালের জামাই।”
নাজনীন লাঠিটা ছুড়ে মারার আগেই জয়া দরজা বন্ধ করে দিল।দিন দিন মেয়েটা লিমিট ক্রস করে যাচ্ছে।জয়া ওয়াশরুমে ঢোকার পর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নাজনীন দাঁত চেপে লাঠিটা মাটিতে ঠুকল।এই মেয়েকে আজ জব্দ না করে ছাড়বে না সে।কত বড় সাহস ভাবা যায়?
ওদিকে জয়া ভেতরে গিয়ে দাঁত কাঁপিয়ে পানি ছুড়ছে শরীরে।মেয়েটার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা,
এখন বের হলে শেষ!গোসল শেষ করে চুল ভেজা ভেজা অবস্থায় যখন বুঝল সে কাপড় আনতেই ভুলে গেছে, তখন তার মুখ শুকিয়ে গেল।একটু ইতস্তত করল।তারপর কাঁপা গলায় দরজা অল্প ফাঁক করে বলল,
“নাজনীন ভাই,শুনুন না?”
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নাজনীন হুঁশিয়ারি গলায় বলল,
“থাপ্পড় খাবি? কোন আক্কেলে ‘ভাই’ ডাকিস আমাকে?”
“আচ্ছা ঠিক আছে।নাজনীন জামাই শুনুন…”
“চুপ।”
নাজনীন এত জোরে বলল যে জয়ার মনে হল দরজা ভেঙেই ঢুকবে।নাজনীন রেগে বলল,
“আর একবার ‘ভাই’ বলবি তো দরজাসহ তুলে নিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলব!”
জয়া ঠোঁট ফোলাল।বলল,
“ঠিক আছে,ঠিক আছে।তবে একটু শুনুন তো!”
নাজনীন লাঠি কাঁধে তুলে বলল,
“কী?”
“আমি ওই…আসলে আমি জামা কাপড় আনতে ভুলে গেছি।”
জয়ার গলা এতটাই ছোট যে মনে হচ্ছে পিঁপড়াও শুনতে পাবে না।নাজনীন মুচকি হাসল।এই হাসি জয়ার মুখ দেখে মনে হলো।
“বিপদ।তোর জামা কাপড় আনতে ভুলে গেছিস?”
“হু!”
“এখন কী করবি?”
“আপনি এনে দিন।”
“তুই আমাকে দিয়ে দাসীর কাজ করাবি?”
জয়া ঠোঁট কামড়ে ধরল হঠাৎ।
“দুঃখিত,কিন্তু আমারে তো আর উল’ঙ্গ হয়ে বের হতে পারব না।”
“কেন পারবি না?তোর জামাই লাগি আমি।এখন অব্দি তোকে দেখতে পাইনি।সামনে আয় তো!”
জয়ার বুকের ভেতর ধকধক করে কাঁপতে লাগল।মেয়েটা দরজার ফাঁকটা আরও ছোট করে দিল,যেন নাজনীনের চোখ না পড়ে।পানি পড়া চুল গলা বেয়ে নামছে।সে ঠোঁট কুঁচকে ভেতর থেকে চ্যাঁচিয়ে বলল,
“না! আপনি পাগল নাকি? আমি উল’ঙ্গ হয়ে বের হব কেন?”
“তোর জামাই আমি।স্বামী-স্ত্রী মধ্যে আবার লজ্জা কীসের? এখনই বের হ।”
জয়া প্রায় চ্যাঁচিয়ে উঠল,
“আপনি কেন এমন অশ্লীল কথা বলছেন?”
নাজনীন লাঠিটা দু’বার মাটিতে ঠুকল।বলল,
“তুই’ই তো শিখিয়েছিস আমাকে অশ্লীলতা।এখন বের হ,নইলে দরজা ভেঙে ঢুকব।”
“দরজা ভাঙলেই কিন্তু আমি আ’ত্মহ’ত্যা করব!”
জয়ার গলা কাঁপছে।
নাজনীন ঠাট্টার স্বরে বলল,
“ওটা করিস না।তুই মরলে আমাকে আবার নতুন বউ ধরতে হবে।অনেক ঝামেলা।”
“আপনি খুব বাজে! শালা পাগল একটা!”
“চালিয়ে যা।যত বলবি ততই দরজা ভাঙতে ইচ্ছে করবে।”
জয়া হাত কাঁপিয়ে বলল,
“দেখেন,আমি কাপড় আনতে ভুলে গেছি। একটু কাপড়টা এনে দিলেই তো হয়!”
“তা তো হবেই। কিন্তু কাপড় আনব কেন? দরজা খুলে দে,তোকে একটু দেখি।”
“অসভ্য লোক।আপনার মুখে ঠাডা পরুক।”
নাজনীন এবার সিরিয়াস হলো।গম্ভীর গলায় বলল,
“ক্ষমা চা,নাহলে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাক।”
“কোন দুঃখে?”
“বালের জামাই বললি কেন?”
“ওটা তো এমনি এমনি বলেছিলাম।”
“ক্ষমা চেয়ে ভালো মতো বল।”
জয়া পড়েছে মহা বিপদে।নাজনীন তো তার পিছুই ছাড়ছে না।সে বিরক্ত হয়ে বলল,
“আল্লাহর দোহায় লাগে।আপনি অন্তত বাইরে যান,আমি এই শীতে ভেজা গায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।”
“ক্ষমা চা বেয়াদব।”
“আচ্ছা আচ্ছা,আমাকে দয়া করে মাফ করে দিন।”
“ভালো মতো বল।”
“আমার ভালো জামাই,আমাকে মাফ করে দাও।কষ্ট করে আমার জামা-কাপড় গুলো এনে দিলে তোমায় ১০১টা চুমু খাব।এবার এনে দাও।”
জয়া ওয়াশরুমের ভেতর দাঁড়িয়ে কাঁপছে।ঠাণ্ডায় নয়,লজ্জায় আর রাগে।ওদিকে নাজনীন ঠিক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে লাঠিটা কাঁধে তুলে বেশ আরামে শিস দিচ্ছে।মনে হচ্ছে এ জীবন তার বেশ জমে গেছে।নাজনীন ঠোঁট চেপে বিনাবাক্যে জয়ার জামা-কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমের সামনে এলো।খুব সাধাসিধে ভঙ্গিতে বলল,
“নে,তোর জামা-কাপড় রেখে গেলাম দরজার সামনে।যেভাবে কেঁদে কেঁদে বললি,তাতে আমার দয়া হলো খুব।”
জয়া অবাক!
“সত্যি??”
“হু।বের হয়ে নে।আমি একদমই দেখব না।চোখ বন্ধ করে আছি।”
নাজনীন এতটাই ভদ্র গলায় বলল যে জয়ার সন্দেহ হলো।তবুও দরজা একটু খুলে তাকিয়ে দেখল—মাটিতে সুন্দর করে ভাঁজ করা জামা-কাপড়। নাজনীন মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।জয়ার বুকের উপর থেকে বিশাল একটা চাপ কমে গেল।সে তাড়াতাড়ি জামা-কাপড় তুলে নিল,দরজা বন্ধ করে পরে নিল।সব ঠিকঠাক করে যখন ভেজা চুল নিয়ে দরজা খুলে বের হলো,তখনই বিপদ।
নাজনীন একদম তার সামনে দাঁড়িয়ে।
নাজনীন ঠোঁট টিপে হাসল।
“এবার নে,১০১টা চুমু দে।”
জয়া হকচকিয়ে বলল,
“কী..কী??”
“কথাটা তো তুই-ই বললি।আমি জামা-কাপড় এনে দিলে ১০১টা চুমু দিবি।কথা দিলে কথা রাখতে হয়।তাই না?”
জয়া পিছিয়ে গেল দুই পা।বলল,
“আমি তো মজা করে বলেছি!”
“আমি কিন্তু সিরিয়াস ভাবেই নিয়েছি।”
তারপর একটু ঝুঁকে নরম গলায় বলল,
“নে,এবার ৫০টা দিবি ঠোঁটে,আর বাকি ৫১টা তোর ইচ্ছা।”
জয়া চোখ বড় বড় করে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।নাজনীনকে সে এতদিন ভদ্র-নম্র মনে করত।কিন্তু এই লোকের মধ্যে যে এত কিছু সেটা সে জানত না।মেয়েটা ছুটে চলে যেতে চাইছে ঘর থেকে।কিন্তু ততক্ষণে নাজনীন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
হঠাৎ তার মুখের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“তাড়াতাড়ি চুমু দে।”
জয়া হকচকিয়ে নাজনীনের বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল,
“পাগল লোক,আপনার কী মাথা নষ্ট হয়েছে?বললাম না মজা করেছি আমি?”
“বাহানা না দিয়ে দিবি নাকি আমি অন্য ব্যবস্থা করব?”
জয়া শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে পায়ের আঙুল কুঁচকে ফেলল।নাজনীন একপা সরবে না এখান থেকে সেটা ভালো করেই বুঝে গেছে বেচারি।
জয়াকে এমন চুপ করে থাকতে দেখে হঠাৎ করে শক্ত হাত জোড়া দিয়ে কোলে তুলে নিল নাজনীন।মেয়েটা ভয়ে নাজনীনের গলা জড়িয়ে ধরল।
“আপনি কী মানুষ?কী শুরু করেছেন এসব?নামান নাহলে সত্যি সত্যি চিৎকার করব।”
আজ বোধহয় নাজনীন শপথ করেছে সে লিমিট ক্রস করবে।মুখ যেন থামার নাম নেই তার।সে জয়াকে নিয়ে বারান্দায় যেতে যেতে বলল,
“চিৎকার করবি?কর!বাড়ির মানুষ জানে আমরা হাসব্যান্ড-ওয়াইফ।”
মেয়েটা বাকরুদ্ধ নাজনীনের লাগামছাড়া কথায়।নাজনীন ওকে নিয়ে হালকা তাপ মিশ্রিত রোদে গিয়ে বারান্দার চেয়ারে বসিয়ে দিল।জয়ার চিবুক চেপে ধরে একটুখানি ঝুঁকে নিচু গলায় বলল,
“যেদিন ধরব সেইদিন বুঝবি আমি কী।এত লাফাস না,ডানা কাটতে আমার বেশি সময় লাগবে না।আর হ্যা,১০১টা ভিটামিন আমি নিয়েই ছাড়ব।আজ ছাড় দিয়েছি তার মানে এই নয় প্রত্যেকদিন ছেড়ে দিব।”
•
বিকেল বেলা কায়নাত শাশুড়ির পিছু পিছু ঘুরছে।ড্রয়িংরুমে আদাল আর আয়মান চেয়ে চেয়ে দেখছে ভাবির কাণ্ড।দুষ্টু আদি তখন মামুদের অন্যপাশের সোফায় পা গুটিয়ে বসে বসে কার্টুন দেখছে।সাঈমা রান্না ঘরে রাতের খাবার তৈরি করতে ব্যস্ত।বেহরুজ বেগম কায়নাতকে পিছু পিছু ঘুরতে দেখে কপাল কুঁচকে রান্না ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ালেন।বললেন,
“কিছু বলবে?”
কায়নাত কাঁশলো একটু।বলল,
“একটু কথা ছিল আম্মু।”
“জি, বলো?”
“বলছিলাম যে রাতে কী রান্না হবে?”
“চিংড়ি ভুনা আর সবজি হবে আজ।”
আয়মান নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল কায়নাতের কথা শুনে।মায়ের সাথে তো সে কথাই বলতে পারছে না।কনসার্টের কথা কী করে বলবে?আদাল সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আদির কাছে গিয়ে বসল।উদ্দেশ্য আদির থেকে কিছু মিছু খাবার চুরি করে খাওয়া।
অন্যদিকে কায়নাত আড়চোখে আয়মানের চিন্তিত বদন দেখে আমতা আমতা করে বলল,
“আসলে আম্মু আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।দয়া করে বারণ করবেন না।”
বেহরুজ বেগম শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“বলো?”
“আয়মান ভাইয়ার আজ একটা কনসার্ট আছে বলেছেন।উনি সেখানে যেতে চাচ্ছেন,তবে আপনার অনুমতি নিয়ে।তিনি চাইলেই মিথ্যে বলে যেতে পারতেন কিন্তু উনি সেটা করেননি।আপনি প্লিজ বারণ করবেন না আম্মু।”
বেহরুজ বেগম কায়নাতের পেছনে ড্রয়িংরুমে আইমানের দিকে তাকালেন।আয়মান আতঙ্কে শুকনো ঢোক গিলল।হঠাৎ করেই বেহরুজ বেগম বললেন,
“ভাবির পিছু লেগেছ আবার?তাকে পটিয়ে আমাকে রাজী করাতে চেয়েছিলে?”
আয়মান মিনমিন করে বলল,
“প্লিজ মা!”
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।রান্না-ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন,
“যেতে চাইছো যাও।নেক্সট টাইম এসব আমি শুনব না।”
আয়মান খুশিতে সিঁড়ির দিকে দৌঁড়ে যেতে যেতে চিৎকার করে কায়নাতকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ধন্যবাদ ভাবি।কালকে আপনাকে পুরো শহর ঘুরিয়ে দেখাব আমি।”
ছেলেটা দৌঁড়ে তিনতলায় চলে গেল।কায়নাত তার খুশি দেখে হেসে ফেলল।বেহরুজ বেগম কায়নাতের হাতে ছোট ট্রে’তে গরম গরম নুডলস আর একগ্লাস কুসুম গরম পানি দিয়ে বললেন,
“অর্ণর ঘরে এটা দিয়ে আসো।”
কায়নাত শুকনো ঢোক গিলে মাথা নাড়িয়ে গুটি গুটি পায়ে তিন’তলায় উঠে আসে।হাতে ট্রে থাকার কারণে দরজায় নক করতে না পেরে কিছুটা উচ্চস্বরে বলল,
“এইযে শুনছেন?দরজাটা একটু খুলুন তো?”
অর্ণ খানিকক্ষণ পর এসে দরজা খুলে দিলে কায়নাত ট্রে এগিয়ে দিলে অর্ণ গম্ভীর গলায় বলে,
“ভেতরে রেখে যান।”
কায়নাত ট্রে ঘরে এসে সোফার পাশে টি-টেবিলের উপরে রাখল।হঠাৎ বারান্দা থেকে স্বার্থ বেরিয়ে এসে দাঁত কেলিয়ে বলল,
“আমার জন্য কিছু আনেননি ভাবি?”
কায়নাত অবাক হয়ে বলল,
“আপনি কখন এসেছেন?”
“একটু আগেই তো এসেছি।”
“ওহ,আমি তো জানতাম না ভাইয়া।আপনি বলুন কী খাবেন?আমি এখনই নিয়ে আসছি।”
স্বার্থ মুখ খোলার আগে অর্ণ ধমক দিয়ে বলল,
“ঘর থেকে যাও।”
কায়নাত চমকে পাশে তাকায়।হঠাৎ করে লোকটা রেগে গেল কেন?ভারী আশ্চর্য ব্যাপার!সে ঘর থেকে বের হলে স্বার্থ সোফায় বসে নুডলস এর বাটি হাতে নিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“বউ পর-পুরুষের সাথে কথা বলেছে বলে তোর এত জ্বলে সোনা?কোথায় জ্বলে?জায়গাটা একটু দেখা মলম লাগিয়ে দেই।”
স্বার্থর কথা শেষ হতেই অর্ণ ধীরে ধীরে মুখটা তার দিকে ফেরাল।চোখ দুটো কামানের গোলার মত শক্ত,ঠাণ্ডা।মুখের একপাশ টাইট হয়ে উঠে গেছে বিরক্তিতে।অর্ণ গম্ভীর গলায় বলল,
“মুখটা বন্ধ রাখ,স্বার্থ।”
স্বার্থ চোখ টিপে আরও উসকে দিতে চাইল,
“কেন? কথাটা সত্যি বলেছি তো! বউ কার সাথে কথা বলবে,কার দিকে…”
স্বার্থর কথা শেষ হওয়ার আগেই অর্ণ নুডলসের গরম বাটিটা স্বার্থের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে টেবিলে এত জোরে রাখল যে শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল।
গলা নামিয়ে খুব ধীরে,কিন্তু এমন ঠাণ্ডা স্বরে বলল যে স্বার্থর হাসি গলা পর্যন্ত আঁটকে গেল,
“আমার স্ত্রী কার সাথে কথা বলবে,সেটা নিয়ে মন্তব্য করার মতো জায়গায় নেই তুই।”
স্বার্থ কাপড় ছাড়াই ভেজা মুখ মুছল,মুচকি হেসে বলল,
“এই পোড়া কন্ঠস্বর,বউয়ের ব্যাপারে এমন মাটি কামড়ে অধিকার? বাহ রে!তুই না বললি কায়নাত তোর হাঁটু সমান?”
অর্ণ আর দাঁড়ালই না।ঘুরে বারান্দার দিকে যেতে যেতে ঠাণ্ডা রাগে বলল,
“অপ্রয়োজনীয় কথা বেশি বলিস না,স্বার্থ।”
স্বার্থ আবার হাসল,
“সিরিয়াস হলে তোকে দেখতে কত কিউট লাগে জানিস?”
“আর একটা কথা বললে মার একটাও মাটিতে পড়বে না।”
স্বার্থ এবার চুপ।
কারণ অর্ণের কণ্ঠে এমন একস্বরের রাগ, যেটা সাধারণত সে প্রকাশই করে না।
এই রাগ মানে—ভূমিকম্প শুরু হওয়ার আগের নিস্তব্ধতা।স্বার্থ ধীরে সোফায় হ্যালান দিল,মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করল,
“বউয়ের বিষয়ে এত আগ্রাসী!হুম,কায়নাত ভাবির কেস তো বড্ড সিরিয়াস।”
রাতে অর্ণ ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বের হলো।স্বার্থ এখনো বাড়িতেই আছে অর্ণর সাথে বের হবে বলে।এদিকে কায়নাত তৈরি হয়েছে নিশা আর নিধির সাথে বাইরে যাবে বলে।কায়নাত কালো বোরকা,হিজাব পরে নিচ’তলায় সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ঘাড় উঁচু করে উপরের দিকে তাকিয়ে ছিল।নিধি আর নিশা বোধহয় এখনই নামবে এই আশায়।হঠাৎ করে চোখ বড় হয়ে এলো অর্ণকে দেখে।কালো রঙের প্যান্ট,কালো শার্ট আর সেই শার্টের উপরের তিনটা বোতাম খোলা।এই শীতের মধ্যে লোকটা এত পাতলা কাপড়ের শার্ট পরেছে?তার চেয়ে বড় কথা অর্ণ এই রাত করে সেজে-গুড়ে যাচ্ছে কোথায়?শার্টের বোতামও খোলা।মেয়েটার কেন যেন রাগে শরীর গরম হয়ে এলো।নিশ্চিত লোকটার কোনো মেয়ে বান্ধুবীর সাথে দেখা করতে যাচ্ছে?হতেই পারে।অর্ণ নিচে নামতে নামতে কায়নাতের নিকাবের আড়ালে থাকা রাগান্বিত আঁখি জোড়া দেখে কপাল কুঁচকে ফেলল।একদম নিচে এসে ওর পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় কায়নাত বলল,
“এইযে সাধু পুরুষ।কথা শুনে যান।”
অর্ণ পিছু ঘুরে দাঁড়ায়।কায়নাত তাকে পুরো পর্যবেক্ষণ করে বলে,
“আপনাকে একটা কথা বলি?”
অর্ণ বিরক্ত হয়ে বলল,
“মুখ তো কখনো থামে না ম্যাডাম।এখন প্রশ্ন করার জন্য আমার অনুমতি নিচ্ছেন?”
“অপমান করবেন না।যেটা বলেছি সেটার উত্তর দিন।”
“প্রশ্নই যখন করেননি তাহলে উত্তর দিব কিভাবে?”
কায়নাত থমথমে খেয়ে গেল।হালকা গলা কেঁশে আশেপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“আপনার বুঝি অনেক মেয়ে বান্ধুবী আছে?”
“আছে।”
কায়নাত রাগে কিছুটা শক্ত হয়ে বলল,
“কত গুলো?”
“অনেক গুলো।”
“কেমন বন্ধু?”
“ভালো।”
“আশ্চর্য!আপনার না বাড়িতে বউ আছে?”
“তো?”
“তো আবার কী?বউ রেখে আবার মেয়ে বান্ধুবীদের সাথে দেখা করতে যাওয়া হচ্ছে?আপনার নামে আমি মানলা করব বলে দিলাম।”
অর্ণ আশ্চর্য হলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লিলিপুট মহিলার কথা শুনে।ভাবছে কী এই মেয়ে?অর্ণ নিজের ঘাড় চুলকে ঠোঁট কামড়ে ধরল।কায়নাত অর্ণর থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে বলল,
“অসভ্য পুরুষ মানুষ।আপনার লাজ-লজ্জা বলতে কিছু নেই নাকি?একটু তো শরম করুন?আজ বাদে কাল দশ বাচ্চার বাপ হবেন।এখন এসব করলে মানায়?ভালো হয়ে যান,ভালো হতে টাকা লাগে না।”
অর্ণ একটু ঝুঁকে এসে বলল,
“কদিন পর দশ বাচ্চার বাপ হব?”
কায়নাত রেগে বলল,
“হ্যা।”
“মা কে হবে?”
“আশ্চর্য তো!আপনার বউ যেহেতু আমি তাহলে আপনার বাচ্চার মা তো আমিই হব নাকি?”
অর্ণ একটু থমকে দাঁড়িয়ে রইল কায়নাতের কথায়।চোখ দু’টো হালকা সরু হয়ে এলো।
“আপনি আমার দশটা বাচ্চার মা হবেন?”
কায়নাত গর্বিত ভঙ্গিতে বোরকার আড়াল থেকেও মাথা উঁচু করে বলল,
“হ্যা,তাহলে কী!আপনার মত মানুষকে সামলাতে হলে এক-দুইটা বাচ্চা দিয়ে হবে?দশটা না হলে সংসার হবে কিভাবে?”
অর্ণ ঠোঁট টিপল,
“আপনি পারবেন সামলাতে?”
“আমি? আমাকে নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না।আমি একা একাই সামলাবো।আপনি শুধু বাচ্চা তৈরি করবেন।”
অর্ণ কপাল কুঁচকে বলল,
“কী করব??”
“বাচ্চা তৈরি করবেন।আমি পালব।”
“আপনি কী মাথায় আঘাত পেয়েছেন,ম্যাডাম?”
কায়নাত রেগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“এই যে এত রাতে সাজুগুজু করে কোথায় যাচ্ছেন তা এখনো বলেননি।নিশ্চয়ই কোনো মেয়ে বান্ধুবীর কাছে যাচ্ছেন।তাই না?”
অর্ণ ঠান্ডা গলায়,
“হ্যা।যাচ্ছি।”
কায়নাত চোখ বড় বড় করে বলল,
“আমি বলেছিলাম! আমার কথা সব সত্যি হয়।আপনার ভেতরে লুকানো শয়তানের থাবা আমার চোখে ধরা পড়ে গেছে।আপনি এত অশ্লীল!বউ রেখে মেয়েদের কাছে যাওয়া আপনার জন্য খুব গর্বের?”
অর্ণ বিরক্ত হয়ে বলল,
“আমি স্বার্থর সাথে যাচ্ছি।”
“কেন যাচ্ছেন?তার ওপর আপনার ওই শার্টের খোলা বোতাম!কি দরকার ছিল তিনটা বোতাম খোলা?এটা কি কোনো ‘সাধু পুরুষের পোশাক?আপনি কি জানেন বোতাম খুলে বের হলে বাইরের মেয়েরা দুই কালো টিপের দিকে নজর দেয়?”
অর্ণ নিচু গলায় বলল,
“তিনটা না,দু’টো খোলা।”
“মিথ্যে বলেন?এই শীতের রাতে দুটো বোতাম খোলা মানে আপনার কিছু কিছু হয়।কী সমস্যা আপনার?”
অর্ণ মাথা নাড়ল,
“তুমি অনেক কথা বলো।”
“তাতে কী হয়েছে?আজ রাতে ওই বোতাম খোলা শার্ট পরে বাইরে যাওয়া লাগবে না।আমি এখানেই আপনাকে আঁটকে রাখব।”
“কেন?”
“কারণ মেয়েরা সুন্দর পুরুষ দেখলে সমস্যা করে।আর আপনাকে এমনিতেই… মানে… একটু… উহু… ভালোই দেখাচ্ছে।”
অর্ণ ধীরে বলল,
“মানে আপনি চাইছেন আমি না যাই?”
মাথা মাথা নাড়ল।বলল,
“একদমই না!আপনি কোথাও যাবেন না।এখনই উপরের ঘরে ফিরে যান।ঘরে গিয়ে বোতাম লাগান,কম্বল গায়ে দিন আর ঘুমান।স্বার্থ-টার্থ কিছুই হবে না আজ।”
অর্ণ দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে ঝুঁকে কায়নাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আর যদি যাই?”
কায়নাত নিঃশ্বাস চেপে হুমকি দিল,
“তাহলে কাল থেকে আপনার সাথে সব কথা বন্ধ।আর আপনার দশটা বাচ্চা বাতিল।”
অর্ণ কথা বন্ধ করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ওর চোখ দুটো এমনভাবে কায়নাতের দিকে স্থির হলো,যেন এই প্রথম ও বুঝতে পারছে এই মেয়েটা পুরো অন্য লেভেলের জীব।কায়নাত বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,বোরকার আড়ালেও বোঝা যাচ্ছে কতটা রাগ আর কতটা মালিকানা নিয়ে কথা বলেছে সে।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অর্ণ বলল,
“এত কথা কিভাবে বলো?”
“কেন? কোনো সমস্যা?”
অর্ণ গম্ভীর মুখে,একটু বিস্ময় আর একটু বিরক্তির মিশিয়ে বলল,
“একটা মেয়ে এত কথা বলে,এত পাগলের মতো কথা বলে এটা আমার জানা ছিল না।”
“আশ্চর্য! আমি পাগল?”
“কোনো সন্দেহ নেই।”
(এই দুই বোনের কাণ্ড-কীর্তি দেখে আমি হতবাক।একজন জাউরামির পিএইচডি করেছে আরেকজন পাবনার পাগল।আশ্চর্য,আশ্চর্য,আশ্চর্য!সর্বশেষে মানতেই হচ্ছে,আসলেই হায়াত একটা পাগল।)
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ গল্পের লিংক
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.২