হেইসুইটহার্ট___(০৯)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
ক্যাফেটা এখন নিস্তব্ধ বলা যায়। কোনো কোলাহল নেই,ক্রেতাদের ভিড় নেই। শুধু আছে সম্রাট আর সম্রাটের সবুজ চোখের তীক্ষ্ণ চাউনি দুটো। যা দেখে ভেতর ভেতর শঙ্কায়-চিন্তায় কুকড়ে গেল কুহু। ও এখন পুরোপুরি নিশ্চিত স্যাম সেদিনের প্রতিশোধ নিতেই এসেছে। নাহলে এরকম শহরের কোণে একটা ছোট্ট ক্যাফেতে কেন আসবে, কেন বুক করবে, কেনই বা ওকে বাদে সবাইকে ছুটি দিয়ে দেবে?
মেয়েটা জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে সাহস টানল বুকে। বিরোধাভাস করে বলল
“ ন-না। আমি একা থেকে কী করব? কেন থাকব আমি?”
সম্রাট সাথে সাথেই বলল,
“ আজকে রাতে তুমি আমাকে সার্ভিস দেবে।”
“ কীইইইই?”
আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দেয়া চিৎকারে সবার কানে তালা ঝুলে গেল। তুরন্ত নিজের দুই কান দুহাত দিয়ে চেপে ধরল তুহিন। সম্রাট নিজেও চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলে। উফ,এত চ্যাঁচায় মেয়েটা!
নাক কুঁচকে বলে,
“ টিপিক্যাল এনোয়িং লেডি। আমি ফুড সার্ভিস বুঝিয়েছি।”
লুকাস বললেন,
“ নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। মিস্টার স্যাম আপনি ভাববেন না। আমরা সচেষ্ট থাকব। জাফরিন নিশ্চয়ই আপনাকে সার্ভ করবে।”
তারপর বাকিদের দিকে চেয়ে বললেন,
“ তোমরা তাহলে চলে যাও। আমি আর কিয়ু সামলে নিচ্ছি। শেফ তো আছেন।”
সবাই মাথা নাড়ে। ব্যস্ত হয় নিজের মতো।
সম্রাট পা নাড়তে নাড়তে ঠোঁট কামড়ে হাসল।
কুহুর মেজাজ চটে গেল আরো। এত বিশ্রী করে একটা মানুষ কীভাবে হাসতে পারে!
অতীষ্ঠ চিত্তে সেও হনহন করে চলল ওদের কমন রুমের পথে,যেখানে জামাকাপড় আর ব্যাগ রাখা হয়। কাঁধব্যাগটা নিয়ে বের হতেই লুকাস সামনে পড়লেন। অবাক হয়ে বললেন,
“ জাফরিন,তুমি কোথায় যাচ্ছ?”
“ মিস্টার লুকাস,আম সরি! আমি আপনার এই কাস্টমারকে সার্ভিস দিতে পারব না। আমি এক্ষুনি সবার সাথে বেরিয়ে যাব।”
“ আর ইউ ইনসেইন জাফরিন! কী বলছো? স্যাম নিজে তোমাকে চ্যুজ করেছে যেখানে, সেখানে তুমি থাকবে না?”
“ না।”
হনহন করে হাঁটা ধরল কুহু। লুকাস বললেন,
“ জাফরিন, এটা কিন্তু ভুল করছো। ওনার জানলে তোমার ওপর ভীষণ রেগে যাবেন। তাতে তোমার স্যালারি কাটা যেতে পারে, এমনকি চাকরি অবধি খোয়াতে পারো।”
কুহু থামল অমনি। দোনামনায় ভুগে চাইল ফিরে। ভদ্রলোক ফের বললেন,
“ দেখো জাফরিন, এমনিই ওনার তোমাকে কাজে নিতে চাননি। শুধুমাত্র মেহেকের রেফারেন্সেই আমি তোমাকে রেখেছিলাম। এখন তোমার বেস্ট সার্ভিস না পেলে সবার আগে আমার মুখটা ছোটো হবে। তার চেয়েও বড়ো কথা ক্যাফেটা ছোটো,সেখানে স্যাম আসা মানে ইটস আ বিগ অপারচুনিটি
ফর আস। ও যদি আজ গিয়ে একটা ভালো রিভিউ করে,আমাদের সুনাম হবে। কাস্টমার বাড়বে। ক্যাফে বড়ো হবে,স্যালারিও বাড়বে- তোমার আমার, আমাদের সবার।
কেন বোকামো করছো? প্লিজ জাফরিন,আমি তোমার বিপদে তোমাকে কাজ দিয়েছি না? এবার তোমার উচিত আমাকে ফেবর করা। এই ক্যাফেকে ফেবর করা।”
কুহু দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ল। সেই সাথে ভীষণ বিপাকে। এই ক্যাফে থেকে ও চলে,ওর খরচা চলে। কাজ চলে যাওয়া মানে বাবার কাছে হাত পাতা,সাহায্য নেয়া। যা ও চায় না। সব ক্ষোভ পাশে সরিয়ে
মাথা নেড়ে বলল,
“ ওখেই।”
প্রসন্ন হলেন লুকাস,
“ গুড গার্ল। যাও, ব্যাগ রেখে এসো। আর স্যামকে মেন্যু সার্ভ করো। দেখো কী পছন্দ করে। আর হ্যাঁ, বি পলাইট। ওর সাথে খারাপ বিহেব করো না,ও বদনাম করলে আমরা কিন্তু পুরোপুরি ডিসট্রয় জাফরিন,মনে রেখো!”
কুহু হার মানল। উপকারের কাছে,মানবতার কাছে,নিজের প্রয়োজনের কাছে। হাত উলটে ঘড়ি দেখল একবার। আর তো এক ঘন্টা মতো আছে। এটুকু সময় একটু কষ্ট করে নাহয় এই ক্রিঞ্জস্টারকে সহ্য করেই নেবে।
ও বুক ফুলিয়ে দম নিলো। সব ক্রেতাদের সাথে বিনিময় করা সেই মেকি হাসিটা ঠোঁটে ঝুলাল পরপর।
তুহিন ফিসফিস করে বলল,
“ আসছে বস আসছে।”
“ তো? কোলে বসিয়ে আদর দেবো?”
ছেলেটা মিইয়ে গেল। মিনমিন করে বলল,
“ ইয়ে,না। আচ্ছা আমি চুপ করে থাকি।”
দুটো হাত পেটের ওপর বেঁধে তুহিন মাথা নুইয়ে রইল। থমাস মনোযোগ দিয়ে বিস্কিট খাচ্ছে তখন।
কুহু এসে দাঁড়াল সেসময়। খুব চমৎকার করে বলল,
“ হ্যালো স্যার।”
ঘাড়টা ঘুরিয়ে চাইল সম্রাট।
“ হেই সুইটহার্ট!’’
কুহু দাঁত পিষে চোখ বুজল। ঢোক গিলতে গিলতে কমাল রাগটা।
হেসে বলল,
“ আমার নাম প্রিয়তমা জাফরিন কুহু।”
“ তো? আমি কখন বললাম তোমার নাম থমাস!’’
তুহিন ফিক করে হেসে ফেলল অমনি।
রাগে মেজাজ প্রচণ্ড খারাপ হলো কুহুর। কটমটিয়ে চাইতেই তুহিন আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়। চশমাটা ঠেলে ঠোঁট টিপে রাখে।
কুহু বলল,
“ আপনার কিছু প্রয়োজন? কী অর্ডার করবেন যদি বলতেন?”
সম্রাট বলল,
“ কী কী আছে এখানে?”
কুহু মেন্যু কার্ড টেবিলে রাখল। সম্রাট হাতে নেয়,তারপর ওকে চমকে দিয়ে ছুড়ে মাটিতে ফেলে দেয় সেটা। চেয়ারের হাতলে বাহু ছড়িয়ে বলে,
“ আমার মুড নেই। তুমি নিশ্চয়ই জানবে এতে কী লেখা?
উম এক কাজ করো,পুরো মেন্যু কার্ডটা বলো। প্রত্যেকটা আইটেমের নাম,দাম আর অবশ্যই প্রোটিন ক্যালরিটা মাস্ট বলবে।”
কুহু আশ্চর্য হয়ে চেয়ে থাকে। সম্রাট আনন্দ পায় তাতে। বিদ্রুপ করে বলে,
“ একটা ক্যাফের ডিউটি করছো,আর মেন্যু কার্ডের আইটেম সম্পর্কে জানো না?”
“ জানি কিনা সেই প্রশ্ন পরে। যদি বলতে পারি তাহলে কী করবেন? উত্তর নিয়ে ক্যাফে ছেড়ে সাথে সাথে বেরিয়ে যাবেন নিশ্চয়ই?”
“ কথায় দেখছি ভীষণ তেজ!”
“ তা একটু আছে।
আফটার অল বাংলাদেশ থেকে এসে আপনাদের দেশে আছি। এটুকু তেজ না থাকলে তুষারপাতে তলিয়ে যেতাম না?”
সম্রাট চেয়ে দেখল কথা বলার সময় কুহুর চোখা নাকটা ফুঁসছে। রাগে কটমট করছে যেন। এই একটা মেয়ে দেখল সে,যে ওকে দেখে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ার বদলে চিড়বিড় করে উঠছে। আর এখানেই সম্রাটের মূল আকর্ষণ!
থুতনি চুলকে হাসল ও।
কুহু নিজেই বলল,
“ মিস্টার স্যাম,আপনি চাইলে আমাদের ক্যাফের প্রথম ইউনিক আইটেমটা ট্রাই করতে পারেন। আপনার জন্য স্পেইশাল করে বানিয়ে দিতে বলব। ‘সাইলেন্স উইথ কফি’,অর্থাৎ চুপচাপ কফি খেয়ে কেটে পড়া। দাম একটু বেশি, কারণ আপনার মতো মানুষের জন্য তো চুপ থাকাটা অসম্ভব!”
সম্রাট ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ আচ্ছা? কিন্তু একটা ইঁদুর সাইজের মেয়ের পরামর্শ আমি নেবো না। তুমি বরং এক কাজ করো, একটা ক্যাপুচিনো কন শিউমা নিয়ে এসো। তুহিন,তুমি কিছু খাবে?”
উত্তরে দুপাশে মাথা নাড়ল তুহিন।
কুহু একটু অবাক হলো বটে। সম্রাট এত সহজে ছেড়ে দিলো যে!
ঘাড় নেড়ে চলল তাও। কফি বানাতে মিনিট সাতেক লাগল। এনে টেবিলে রাখতেই ভ্রু কুঁচকে ফেলল সম্রাট। হাতের আঙুল দিয়ে মাপল কাপের বাইরেটা। তুরন্ত ঠেলে দিয়ে বলল,
“ আমি এটা খাব না।”
কুহু ভ্রু বাঁকায়,
“ কেন?”
“ এটার ফোমটা এক সেন্টিমিটার হয়নি। ওপরে বাবলস দেখা যাচ্ছে। সফট ফোম ছাড়া আমি খাই না। আবার করে আনো।”
কুহু আশ্চর্য হয়ে বলল,
“ এটা কেমন কথা? এখন কি কফি বানাতে স্কেল নিয়ে বসতে হবে?”
সম্রাট মেজাজ নিয়ে বলল,
“ এটা কীরকম ক্যাফে তুহিন! এরা গেস্টদের সাথে এত রুড! ওনারকে ফোন করো তো।”
তুহিন উদ্যোগ নেয়ার আগেই কাপটা হাতে তুলে গজগজিয়ে চলে গেল কুহু। ফিরতে সময় লাগল এবার। একদম বাবলস ছাড়া তুলতুলে হয়েছে ফোমটা। টেবিলে রেখে বলল,
“ নিন, মেপে দেখুন। কাটা-কম্পাস দেবো?”
সম্রাট মাপল না।
বলল,
“কাপের হাতলটা আমার বাম হাত বরাবর রাখা হয়নি কেন?”
“ আপনি রাখতে বলেননি।”
“ বলেছি।
তুহিন,আমি বলিনি?”
“ জি বস।”
“ এই মেয়েটা রুডই নয়,সাথে ভীষণ অমনোযোগী!”
কুহু ক্লান্ত শ্বাস ফেলে কাপটা সরিয়ে সম্রাটের বাম হাতের কাছে রাখল। থমাস মাথাটা ওর বাহুতে ঘষছিল তখন। সম্রাট বলল,
“ আই থিংক থমাসের জল তেষ্টা পেয়েছে। ওর জন্যে পানি নিয়ে এসো।”
“ একটা কুত্তাকেও এখন সার্ভিস দিতে হবে? হায় আল্লাহ!”
কুহু বিড়বিড় করতে করতে পানির বোতল আনতে যায়। সম্রাট জিজ্ঞেস করল,
“ কী বলেছে? গালি দেয়নি তো!”
তুহিন খুব কষ্টে হাসি চেপে বলল,
“ না বস। বলেছে থমাস খুব কিউট!”
“ হ্যাঁ তোমার মতো।”
তুহিনের মুখটা দপ করে অন্ধকার হয়ে গেল। ওর এই জাত শত্রু থমাসকে নাকি ওর মতো কিউট দেখতে! এ কেমন সর্বনাশা কথা?
কুহু একটা বোলে পানি নিয়ে এলো। থমাস তো আর বোতলে খেতে পারবে না।
কুকুর দেখলে ওর গা ঘিনঘিন করে। কিন্তু অবলা পশুই তো! সামনে পানি রাখতেই থমাস জিভ দিয়ে চেটেপুটে খায়। কিছু ছিটকে পড়ে চারদিকে। কুহু যেতে নিলেই সম্রাট পিছু ডাকে
“ যাচ্ছো কোথায়? ক্লিন দ্য টেবিল প্রিটি।”
লুকাস ক্যাশ কাউন্টারে বসেছিলেন। কুহু ক্ষুব্ধ চোখে তাকালেন ওনার দিকে। ভদ্রলোক মাথা নেড়ে বোঝালেন, করতে ওসব।
মেয়েটা আর কথা বাড়াল না। চুপচাপ ন্যাপকিন দিয়ে গোটা টেবিল মুছল।
শ্বাস নিতেও পারল না,
সম্রাট বলল,
“ থমাসের জন্যে একটা বিন স্যান্ডউইচ নিয়ে এসো। থার্টি ফাইভ পার্সেন্ট বিন’’স থাকবে। কম বেশি যেন না হয়।”
কুহুর রাগে মাথা জ্বলছে। এলেন ব্রিটিশের নাতি! কফির ফোম এক সে.মি,স্যান্ডউইচে বিন ৩৫% আহা,যেন অংক করতে বসেছে।
কপাল কুঁচকে ফের কিচেনে গেল সে। গোটা দিনের ডিউটিতে ও এত হাঁটে না,যা আজ এই লোকটা ওকে হাঁটাচ্ছে। রকস্টার? মনস্টার একটা। সবুজ চোখের দৈত্য!
কুহু স্যান্ডউইচের কথা বলে এসেছে। দুজন শেফ,সময় লাগবে কিছু। ও লুকাসের কাছে গিয়ে বলল,
“ উনি বেশি বেশি করছেন লুকাস। এভাবে কেউ ওয়েটারদের সাথে বিহেব করে?”
লুকাস চাপা কণ্ঠে বললেন,
“ স্টার জাফরিন, বাকিদের মতো তো হবে না। এক ঘন্টার জন্য উনি যা ক্রোনা দিয়েছেন,তা আমাদের এক দিনের ইনকামের দ্বিগুণ। প্লিজ,ওনাকে রাগিও না। আরেকটু সময়ই তো!”
কুহু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তক্ষুনি হাঁক ছুড়ল সম্রাট।
“ হেই সুইটহার্ট, এদিকে এসো।”
কুহু বিব্রত চোখে লুকাসের দিকে চাইল। লুকাস অবাক হয়েছেন।
ও খিটমিট করে এগিয়ে এসে বলল,
“ ডোন্ট কল মি সুইটহার্ট।”
কাঁধ উঁচাল সম্রাট,
“ ইটস মাই লাইফ,মাই চয়েস। আমি তো কারো হুকুম শুনি না।”
“ কী দরকার?”
সম্রাট ওভার কোর্টটা দেখাল। কালো কোর্টের বুকের অংশে কফি পড়েছে।
বলল,
“ ক্লিন দিস।”
কুহু হেসে বলল,
“ সরি মিস্টার স্যাম,আপনি ক্যাফে বুক করেছেন, আমাকে বুক করেননি। ইটস নট মাই ডিউটি।”
“ তোমাকে বুক করতে কত লাগবে?”
“ বেশি বেশি করবেন না।”
“ তুহিন, এই ব্যাংলাডেশি ভ্যাম্পায়ারটার একটা ভিডিও নাও। এর রুক্ষ আচরণ নিয়ে আমি আজকেই আমার ভ্যারিফাইড একাউন্টে একটা রিভিউ করে দেবো।”
তুহিন ফের ঘাড় নাড়ল। হাতে নিলো ফোন। কুহু বলল,
“ আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”
“ প্রুফ চাও?”
কুহু হাত তুলে কড়া গলায় বলল,
“ ক্যামেরা নামান। নামান!”
ধমকে ধড়ফড় করে ফোন নামিয়ে আনল তুহিন।
ও ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ আপনি কি আর কিছু অর্ডার করবেন মিস্টার স্যাম?”
“ করব, এই কফির টেস্ট ভালো হয়নি। মুখ তেতো হয়ে গেছে। একটা পাইন-এপল জুস নিয়ে এসো।”
“ কী কী লাগবে একবারে বলুন।”
“ আমার ইচ্ছে,আমি কখন বলব! মিস্টার লুকাস,শী ইজ সো আনপ্রফেশনাল।”
লুকাস বললেন,
“ জাফরিন? কী করেছ তুমি!”
কুহু চোখমুখ খিচে জুস আনতে ছুটল।
সম্রাট এক চুমুক দিয়ে বলল,
“ এত ঠান্ডা কেন? আই ওয়ান্ট রুম টেম্পরেচার।”
গ্লাসটা আবার নিয়ে গেল ও।
ফিরে এলো দু মিনিট বাদে। সম্রাট এবার খেয়ে বলল,
“ আই ওয়ান্ট কোল্ড। এটা তো বেশি গরম হয়ে গেছে।”
তুহিন ঠোঁট চেপে হাসল। বস তো এ মেয়েকে আচ্ছা জব্দ করছে।
কুহু এবার আর গ্লাস নিলো না। গেল,ফিরল একটা আস্ত আইসবার হাতে নিয়ে। সামনে রেখে বলল,
“ রুম টেম্পরেচার দিয়েছি। এর বেশি কোল্ড লাগলে আইস দিয়ে খান। যতটা লাগবে ততটা নিন। সেল্ফ সার্ভিস ইজ দ্য বেস্ট সার্ভিস ইউ নো?”
সম্রাট চেয়ার থেকে পা দুটো নামাল। জুতোর বালু পড়েছে তাতে। বলল,
“ তাহলে এটা পরিষ্কার করো।”
কুহুর মন চাইল চেয়ারটা তুলে ওর মাথায় ভাঙতে। কিন্তু কিছু বলল না। চুপচাপ চেয়ারটা নিয়ে বালু ঝেড়ে আনল। পাশে রাখতেই ও বলল,
“ বোসো।”
“ আমি কেন বসব?”
“ উম,তর্ক করো না। আগামী এক ঘন্টা তোমাকে আমার সার্ভিসে রাখা হয়েছে। সীট ডাউন!’’
বিরক্তি গিলে বসল কুহু। টেবিলে মোট তিনটা চেয়ার ছিল। তুহিন দাঁড়িয়ে আছে এখনো। সম্রাট ওকে বসতেও বলছে না। আর এই ভোটকা কুকুরটাও নামছে না। ধুর!
কুহু বসতেই ঝড়ের বেগে শরীরের নিকটে এগিয়ে এলো সম্রাট। দুটো বাহুর ধাক্কায় মেয়েটার বুক ছ্যাৎ করে উঠল। হকচকিয়ে চাইল সে।
সম্রাট হাস্কি স্বরে বলল,
“ প্রিটি লিটল বেইবি, তোমার জন্যে আমার টিডি বুস্টার নিতে হয়েছে। এখন কামড়টা ফেরত দিই? তুমি হাতে কামড়েছ,আমি কোথায় কামড়াব বলো!”
কুহু ঢোক গিলে বলল,
“ আমি তো যেচেপড়ে আপনাকে কামড় দিতে যাইনি। আপনি আমার সাথে ওরকম একটা বাজে ইয়ার্কি করেছিলেন কেন?”
সম্রাট নাক কুঁচকে বলল,
“ তোমাদের দেশে কি বিনয় শেখায় না? একে তো কামড়েছ,আবার ক্ষমাও চাইছো না। সে সরি টু মি। আমি যতক্ষণ এখানে আছি, তুমি প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর আমাকে বলবে, ‘আই অ্যাম সরি মিস্টার স্যাম, থ্যাংক ইউ ফর ইউর কাইন্ডনেস।”
কুহু চড়া স্বরে বলল,
“ আপনার কি মনে হচ্ছে মিস্টার স্যাম,ক্যাফে বুক করে মাথা কিনে নিয়েছেন?”
সম্রাট ফিসফিস করে বলল,
“ আমি চাইলে গোটা ক্যাফে কিনতে পারি সুইটহার্ট। তুমি সরি বলবে কিনা!”
“ বলতাম, যদি হুকুম না করতেন। এখন মোটেও বলব না।”
“ আচ্ছা?
থমাস…”
ডাক শুনে মাথা তুলল থমাস।
সম্রাট গায়ে হাত বুলিয়ে বলল,
“ যাও তো,ওকে ম্যানার্স শেখাও।”
থমাস চেয়ার থেকে এক লাফে নামতেই,দু লাফ দিয়ে ছিটকে সরে গেল কুহু। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বলল,
“ ক-কী করবে এটা? এই কুকুরটা কী করবে?”
সম্রাট হুকুম দেয়,
“ থমাস রান…”
থমাস তেড়ে আসতেই কুহু ছুটল,তুরন্ত ছুটল সেও। ঘেউঘেউ করতে করতে গোটা ক্যাফে কুহুকে চক্কর কাটালো একবার। মেয়েটা দরজা থেকে বের হতে গেলেই সম্রাটের একজন দেহরক্ষি বাইরে থেকে হূক টেনে দিলেন। অসহায় মেয়েটা থমাসের থেকে বাঁচতে এ টেবিল ও টেবিল ঘুরল। বাঁচাও বাঁচাও বলে চ্যাঁচাল, মাঝেমধ্যে ওকে তাড়াতে এটা সেটা ছুড়ে ছুটে মারল গায়ে। থমাস পালানোর বদলে ক্ষেপলো আরো। এমন ভাবে ঘেউঘেউ করল,যেন এক্ষুনি কুহুকে কামড়ে থেতলে দেবে। লুকাস ভড়কে চেয়ে রইলেন। থমাসের ওই বিশাল কালো শরীরটার সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস হচ্ছে না। কামড়ে দেয় যদি! কী ভয়ানক দাঁত।
সম্রাট ক্রুর হেসে কফিতে চুমুক দিলো।
কুহু হাঁপিয়ে গেছে। ছোটার শক্তি নেই। অনুনয় করল চ্যাঁচিয়ে,
“ মিস্টার স্যাম ওকে থামান। প্লিজ! ও আমাকে কামড় দেবে, প্লিজ।”
“ দেন সে সরি সুইটহার্ট।”
“ সরি সরি… প্লিজ এবার থামান এটাকে।”
সম্রাট পুরু স্বরে ডাকল,
“ থমাস স্টপ।”
মূহুর্তে থেমে গেল সে। লেজ নাড়তে নাড়তে এসে ভিড়ল ফের মালিকের কাছে। কুহুর শ্বাস ফুরিয়ে এসেছে। ক্লান্তের ন্যায় ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ল সে। থমাস নিজেও লাফ দিয়ে মনিবের পাশে উঠে বসল।
সম্রাট বলল,
“ উহুম,বসে থাকলে হবে না। সার্ভ মাই ফুড। হারি আপ।”
মেয়েটা নিঃসহায় চিত্তে উঠে এলো ফের। মন চাইছে এই চাকরি ছেড়ে এক্ষুনি ভেগে যেতে। নেহাৎ কাদায় পড়েছে বলে! টেবিলের কাছাকাছি আসতেই,হাতটা টান মেরে ফের ওই চেয়ারে বসিয়ে দিলো সম্রাট। একটু ভড়কে গেল মেয়েটা।
রাগ হলেও স্বর নুইয়ে বলল,
“ দেখুন, সেদিনের জন্যে আমি দুঃখিত! আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
“ এখন পাচ্ছো না?”
“ না।”
সম্রাট ফের কাছে এগিয়ে এলো। নিঃশ্বাসের
তপ্ত হাওয়ার ঝটকায় কুহু মাথাটা সরিয়ে নেয় দ্রুত। অস্বস্তিতে চুর হয়ে তাকায়। সম্রাট মজা পায়। ও তো চায়ই-ই এটা।
বলল,
“ তুমি সেদিন আমাকে ক্রিঞ্জ স্টার বলেছ। মানে হলো, আমি আর আমার গান সব ক্রিঞ্জ তাইত!”
কুহু বিস্মিত হলো! সেদিন অত চ্যাঁচামেচির মাঝে কী বলেছিল না বলেছিল, এই লোক মনে রেখে দিয়েছে?
সম্রাট মাথা নেড়ে বলল,
“ ওখেই, আমার গান যখন ক্রিঞ্জ তাহলে এখন তুমি গেয়ে শোনাও।”
কুহু বিহ্বল চোখে বলল,
“ আমি কেন গাইব?”
“ কথা অল্প,কাজ বেশি। গান গাও।”
“ গাইব না।”
“ তুহিন!”
“ ইয়েস বস?”
“ ম্যানেজার কে বলো এর স্যালারি হাফ কেটে রাখতে।”
“ মামার বাড়ি?
আপনি বললেই ওনারা কাটবে?”
“ দেখাই?”
কুহু মিইয়ে গেল। কোনো বিশ্বাস নেই, কাটতেও পারে। এরকম রক সুপারস্টারের কাছে ওর মতো মানুষ তো চুঁনোপুটি…
তুহিন বিনয় সমেত তাগিদ দিল,
“ ম্যাম, আপনি কি গাইবেন? নাকি আমি যাব?”
কুহু দাঁত খিচে শ্বাস নেয়। বিষ গিলে গুণগুণ করে ওঠে,
“ এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে,
এসো না গল্প করি!
দেখো ঐ ঝিলিমিলি চাঁদ,
সারারাত আকাশে শলমা জরি!
এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়েএএ এসো না গল্প করি!”
সম্রাট গানের আগামাথা বুঝল না। ভাষাটাও না। তবে কুহুর কণ্ঠ এত মিষ্টি,এত সুর তাতে! এক চোট মুগ্ধতায় বুক ভিজে গেল তার। মেয়েটা এমনিই আদুরে ভাবে কথা বলে। রেগে রেগে বললেও বাচ্চাদের মতো শোনায়! সেই আদুরে কণ্ঠে গানের সুর সম্রাটের চোখমুখ আটকে রাখল কিছু পল। লিটল বেবি ভালো গান গায়,অথচ ও শুধু লেগপুল করতে গাইতে বলেছিল! গানের একটা তাল, একটা ছন্দও কাটেনি। আড়চোখটা তুলে তুহিনের দিকে চাইল সম্রাট। সে ছেলে অভিভূত হয়ে চোখ বুজে মাথা দোলাচ্ছে। সম্রাট ভ্রু কুঁচকে ফেলল। একেই বলে মাটির টান! নেপোটিজম? কই ওর গানে তো এভাবে মাথা দোলাতে দেখল না। কুহু গান শেষ করে থামতেই ছেলেটা হাত তালি দিলো। লম্বা লম্বা গাছের মতো নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের দিক ফিরে বলল,
“ এই,তোমরা হাত তালি দিচ্ছো না কেন?”
সবাই তালি বাজায় সহসা। সম্রাট দেখল তুহিনের গদগদ ভাব বেশি। এটা আবার সুইটহার্ট এর প্রেমে পড়েছে কিনা!
তুহিন প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বলল,
“ খুহ সুন্দর গেয়েছেন ম্যাম, কী দারুণ গলা আপনার!”
সম্রাট বলল,
“ কীসের দারুণ!
পুরোটা সময় মনে হলো একটা মিকি মাউস চিঁচিঁ করে ডাকছে।”
কুহু নাক ফুলিয়ে রইল। তুহিন বিড়বিড় করে বলল,
“ আমার তো ভালোই লাগল। আচ্ছা ম্যাম আপনি… “
কুহু মাঝপথেই কথা কেড়ে নেয়,
“ আপনি আমাকে ম্যাম ডাকছেন কেন?
আমার আন্ডারে চাকরি করেন আপনি?”
“ নো ম্যাম।”
“ ম্যাম ডাকবেন না।”
“ ওকে ম্যাম।”
“ আবার?”
“ সো সরি, আপনি কি কিছু খাবেন ম্যাম? একটা কোল্ড ড্রিংক্স? কতদিন পর নিজেদের গান শুনলাম। এর জন্যে একটা চমৎকার ট্রীট বরাদ্দ আপনার। বলুন ম্যাম,কী খাবেন?”
কুহু গমগম করে বলল,
“ আপনার মাথা খাব।”
“ সরি ম্যাম, আমার মাথা দেয়া যাবে না। তাহলে বসের স্কেজিয়ুল মনে রাখবে কে!”
সম্রাট বসেছিল মাঝে। ওর এক পাশে কুহু বসা,আরেক পাশে তুহিন দাঁড়ানো। দুজনকেই ও নাক কুঁচকে দেখল একেক বার। জিজ্ঞেস করল,
“ কী বলছো তোমরা? ইংরেজিতে বলো।”
“ বস,ম্যাম আপনার প্রশংসা করছেন।”
সম্রাট জানে এটা মিথ্যে। হাসল তাই।
কুহু বলল,
“ আমি কি এখন যেতে পারি?”
“ না। আমার জন্যে ফ্রুট স্যালাদ নিয়ে এসো।
স্যালাদে ফোর্টি ফাইভ পার্সেন্ট অ্যাপল, টেন পার্সেন্ট বেরিস এন্ড থার্টি ফোর পার্সেন্ট নাটস থাকবে।”
“ এরকম কীভাবে হবে? আমি কি ক্যালকুলেটর নিয়ে বসেছি?”
“ আমি কী জানি! অর্ডার ঠিক নাহলে আমি কিন্তু ক্যাফে নিয়ে নেগেটিভ রিভিউ দিয়ে দেবো।”
কুহুর আর সহ্য হচ্ছে না। তাও চলল ধুপধাপ পায়ে। ও তুহিনকে বলল,
“ কী এমন গাইছিল এটা? এত লাফাচ্ছিলে কেন?”
“ ইয়ে বস, আপনার ভালো লাগেনি?”
“ এত বাজে গান আমি কোনোদিন শুনিনি।”
কুহু গিয়ে কিচেনে অর্ডার দিয়ে এসেছে। স্যাম তার ব্রাউন চুলগুলো এক হাত দিয়ে পেছনে সরিয়ে তীক্ষ্ণ সবুজ চোখে ফিরল। তুরন্ত,
মুখ বাঁকাল মেয়েটা। রাগ কটমটিয়ে ভাবল,
“ হুহ, চুল উল্টে ভাব দেখাচ্ছে যেন মহাবিশ্ব জয় করে ফেলল। শয়তানটার থোবড়াটা যদি একবার ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে কেচে দিতে পারতাম!”
মুখে বলল,
“ স্যালাদ হতে একটু সময় লাগবে।”
“ সময় কেন লাগবে? ঘাস খাচ্ছে শেফ?”
কুহু মনে মনে বলল,
“ ঘাস তো তোর খাওয়ার কথা। চেহারাটা একদম ঐ বিলেতি গোরুদের মতো ধবধবে সাদা করে বসে আছে! মাথার ওপর দুটো শিং গজালেই একদম ষোলো কলা পূর্ণ।”
খাবার তৈরি হলো একটু সময় নিয়ে। কুহু ট্রে এনে জোরসে রাখল টেবিলে।
আওয়াজটা সম্রাটের কানে লাগল। বিরক্ত হয়ে বলল,
” একটু বেশি আওয়াজ হলো না,সুইটহার্ট?”
কুহুর মেজাজ এমনিই চড়ে আছে। সুইটহার্ট শুনলে গা-পিত্তি জ্বলে যায় তার। সম্রাট বিদ্রুপ করে বলল,“ রাগ হচ্ছে? মিকি মাউসদের রাগও হয়!”
অমনি ফুঁসে উঠল মেয়েটা,
“ দেখুন,অনেক সহ্য করছি কিন্তু। আপনি আমার নাম ধরে ডাকতে পারলে ডাকবেন, কিন্তু এরকম উদ্ভট আজেবাজে নাম বলবেন না। মিকি মাউস কী হ্যাঁ? আমি ইঁদুর,আমি ইঁদুর হলে আপনি কী? নিজের চেহারা আয়নায় দেখেছেন? মুখটা সাদা,চুল বাদামি,চোখ সবুজ,গায়ে পরেছে কালো! সব মিলিয়ে একটা বিদেশী গোরু লাগছে আপনাকে। আ সুইডিশ কাউ….”
তুহিন বিষম খেল। খুকখুক করে কেশে উঠল অমনি। সম্রাট এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল, “কী,আমি কী?”
কুহু মুখের ওপর বলল,
“ শুনতে পাননি,ভেঙে বলব? আপনি একদম সুইডেনের ফার্মের সেই বিশেষ জাতের বিলেতি গোরদের মতো ইউনিক! ওপ্স এটা তো প্রশংসা, আপনি আবার রাগ করছেন না তো?”
তুহিনের জিভটা বেরিয়ে এলো। থমাসের চেয়েও বিশাল সাইজের করে জিভ কাটল সে। এই রে! এ মেয়ে নির্ঘাত পাগল হয়ে গেছে। বস তো ক্ষ্যাপবে এবার। অথচ কুটিল চোখে হাসল সম্রাট। জিজ্ঞেস করল ওকেই,
“ তুহিন,বিলেতি গোরু কী খায়?”
ছেলেটা থতমত খেলো প্রশ্ন শুনে। বলল,
“ ঘা-ঘাস খায় বস।”
সম্রাট বরফ-শীতল চোখ ঘুরিয়ে চাইল ফের। কুহু ঘাবড়ে গেল। টিশার্টের ওপরে পরা সার্ভিস এপ্রোনটা শক্ত করে ধরে রাখল মুঠোয়। ভেতরে বুক ঢিপঢিপ করলেও, তেজ নেভানো যাবে না।
সম্রাট বলল,
“ যেহেতু আমি তোমার কাছে বিলেতি গোরু, তাই আমার ডিনারটাও আজ গোরুর মতোই হওয়া উচিত। যাও, ক্যাফের পেছনের গার্ডেন থেকে আমার জন্যে ঘাস তুলে নিয়ে এসো।”
কুহু চোখ বড় বড় করে বলল,
“আপনি কি পাগল! আমি কেন আপনার জন্য ঘাস-পাতা তুলতে যাব? এ-এটা কি আ-আমার ডিউটির মাঝে পড়ে?”
“ কেন পড়বে না? তোমার ডিউটি তো নটায় শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন বাজে আটটা চল্লিশ। এখনো বিশ মিনিট,তুমি আমার সার্ভিস দেবে। এইটুকু সময় ক্যাফের সাথে আমি তোমাকেও কিনে নিয়েছি। তাই আমি যা বলব, সেটাই তোমার সার্ভিস রুল। যাও, আমার ডিনার নিয়ে এসো।”
কুহু হনহন করে লুকাসের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মনিটরে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। ও বলল,
“ মিস্টার লুকাস,উনি তো আমাকে এখন ওনার জন্যে ঘাস তুলে আনতে বলছেন।”
“ আমি শুনেছি, জাফরিন। তুমি ওনাকে কাউ বলতে গেলে কেন? এরকম একজন স্টারকে পশুর সাথে তুলনা করেছ, কিছু যে বলছে না সেই কপাল! এদের সাথে লাগতে নেই। ”
কুহু বুঝল এখানে কথা বাড়িয়ে লাভ হবে না। পৃথিবীর সর্বত্র জোর যায় মুল্লুক তার। লুকাস ফের বললেন,
“ আবার সত্যিই ঘাস এনো না। ওনার সম্মানে লাগতে পারে। বোঝোই তো,হাই প্রফাইল কাস্টমার।”
কুহু ফোসফোস করতে করতে কিচেনের পেছনের স্টোরে গেল। পথে ফোনটা বাজল ওর। মেহেক কল করেছে। মুখ কালো করে ধরল মেয়েটা। “ হ্যাঁ কিয়ু…আমি বেরিয়ে পড়েছি। তোমার কতদূর?”
“ আমার বোধ হয় আজ আর ফিল্ম দেখা হবে না, মেহেক।”
“ সে কী, কেন?”
“ আমি খুব ঝামেলায় পড়েছি। মন মেজাজ ভালো নেই। একটা অসভ্য কাস্টমার আমাকে খুব জ্বালাচ্ছে।”
“ কী? আর লুকাস কী করছে?”
“ কিছু না।”
“ আমি এক্ষুনি আসছি কিয়ু, দাঁড়াও তুমি। কে তোমাকে জ্বালাচ্ছে, আজ ঘুষি মেরে সেটার নাকের ঘি বের করে ছাড়ব।”
কুহু প্রথমে ভেবেছিল মানা করবে। পরপর মনে হলো,আসুক মেহেক। এসে দেখুক ওর স্যামের আসল রূপ। কীভাবে একটা মেয়েকে সে উত্যক্ত করছে দেখুক এসে। তাই বলল,
“ আচ্ছা এসো।”
কুহু একটা বোলে লেটুস পাতা ভরে নিয়ে এলো। রাখল ওর সামনে। থমথমে গলায় বলল,“এই নিন আপনার ঘাস!”
সম্রাট বাটির দিকে এক বার তাকাল, পরপর দেখল কুহুর লালচে মুখ। বলল,
“ গোরু তো নিজের হাতে খায় না, মিকি মাউস। তাদের খাইয়ে দিতে হয়। তাদের তো হাত নেই। খাইয়ে দাও।”
কুহু গর্জে বলল –
“ কীইইইইইইই? আপনার সাহস কী করে হলো আমাকে এসব বলার? আমি আমি…”
মাঝপথেই ঘেউঘেউ করে উঠল থমাস। মাথা নাড়াতে নাড়াতে কৈফিয়ত চাইল,কেন তার মনিবের সাথে এমন চোটপাট করা হচ্ছে। কুহু ভয়ে মিইয়ে গেল। কিন্তু হেসে থমাসের গায়ে হাত রাখল সম্রাট।
“ কাল্ম ডাউন মাই বয়। কাল্ম ডাউন। ”
তুহিন মৃদূ স্বরে বলল – ম্যাম, থমাস চ্যাঁচামেচি পছন্দ করে না। বসের ওপর তো একদম নয়।”
সম্রাট বলল,
“ খাইয়ে দেবে সুইটহার্ট? নাকি… কাল সকালে তোমার এই ক্যাফের লাইসেন্স আর তোমার কাজের পারমিট দুটোই বাতিলের তালিকায় ফেলে দেবো? না,থমাসকে দিয়ে আরেকবার ক্যাফেটা ঘুরিয়ে দেখাব তোমায়? আমি কিন্তু একদম মজা করছি না।”
কুহুর চিড়বিড় করে চেয়ে থাকে। অপমানে শরীর কাঁপছে ওর। উপায়হীনতায় চোখ ছলছল করছে। জেনেশুনে বিষ গেলার মতো ভাব করে একটা লেটুস পাতা হাতে তুলল সে। সম্রাটের সেই সুন্দর, ধবধবে ফরসা চেহারা এখন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত কিছু। কাঁপা হাতে পাতাটা ওর মুখের সামনে ধরল কুহু। সম্রাট বিজয়ী হেসে মুখে নেয় সেটা। ঠোঁটদুটো ইচ্ছে করে ছোঁয়ায় মেয়েটার পেলব আঙুলে। শিউরে তাকাল কুহু। ভীষণ ক্ষোভের আগুনে জ্বলে উঠল মাথার কোষ। সম্রাট পাতা চিবোতে চিবোতে হাসে তাও।
কুহু খিটমিট করে বলে,“ আপনার ওপর গজব পড়ুক।”
সম্রাটের গায়ে লাগল বোধ হয়। আচমকা দুম করে উঠে দাঁড়াল সে। বসে থাকা ছোট্ট কুহু ঢেকে গেল ওর লম্বা-চওড়া শরীরী ছায়ায়। ভয় পেলো মেয়েটা। ধড়ফড়িয়ে উঠল,সম্রাট এক পা এগোতেই আরো দু পা ছিটকে পিছু হটলো সে। তুহিন নিজেও ভ্যাবাচেকা খেয়েছে। বসের আবার কী হলো?
সম্রাট চুপ করে এগিয়ে যায়। গাঢ় আশঙ্কায় নেতিয়ে পড়ে কুহু। ফ্যাকাশে মুখে তাকায় এদিক-সেদিক। লুকাস ক্যাশ কাউন্টারে নেই। এর মধ্যে গেলেন কোথায়?
কুহু পিছিয়ে যেতে যেতে একটা চারকোণা টেবিলের সাথে কোমরটা লাগল ধড়াম করে। বিদ্যুতের গতিতে সম্রাট কাছে এসে থামল। কুহু পিঠ নিয়ে হেলে যায়,সরতে চায়,বাড়াতে চায় দুরুত্ব। নিজের বলিষ্ঠ দুটো হাত মেয়েলি দেহের দুইপাশে রেখে ঠিক ততটাই ওর ওপর ঝুঁকে গেল সম্রাট। কুহু ফ্যাসফ্যাসে দম নিয়ে বলল,
“ স-সরে দাঁড়ান। অসভ্যতা করছেন কেন?” সম্রাট সরল না,উলটে আরো ঝুঁকে ওর কানের কাছে স্বীয় ঠোঁট জোড়া থামাল। এক ঝটকা তপ্ত শ্বাস কুহুর ঘাড়ে লুটিয়ে পড়ল সহসা। চোখমুখ খিচে নিলো মেয়েটা। সম্রাট ফিসফিস করে বলল,
“ শুধু সামনে এসে দাঁড়াতেই নিঃশ্বাস গলায় আটকে গেল, সুইটহার্ট! এরপর আরেকটু গভীরে যদি যাই, তাহলে! যাব?”
কুহুর ওষ্ঠাগতপ্রাণ। ভয়ে কাঁপছে মেয়েটা। “কী করবেন?”
সম্রাট ঠোঁট কামড়ে হাসল। গাঢ় স্বরে বলল,“ ইউ বাইট মাই হ্যান্ড সুইটহার্ট… নাও আ’ম গোয়িং টু বাইট ইয়র লিপ’স। তুমি আমার রক্ত বের করেছ,এবার তো আমার পালা। তাহলে আমিও আজ ততক্ষণ থামব না, যতক্ষণ না তোমার ঠোঁটে রক্তের স্বাদ পাই।”
চলবে…
Share On:
TAGS: নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি, হেই সুইটহার্ট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৩(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৫
-
সমুদ্রকথন গল্পের লিংক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৯