হেই সুইটহার্ট (০৭)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
“ তারপর; তারপর আমাকে বলল, আমি যদি একটা সেলফির ব্যবস্থা করে দিই,আমাকে আবার জড়িয়ে ধরবেন?”
কিন্তু হাসির তোড়ে মেহেকের অর্ধেক কথাই রয়ে গেল মুখে। কমন লাউঞ্জে তখন ওরা চারজন গল্পে বসেছে। এলিন,ফিওনা মেহেক আর কুহু। বাকিরা হেসে গড়িয়ে গেলেও, সতর্ক চোখে চাইল কুহু। উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ তুমি কী করলে? জড়িয়ে ধরলে ওনাকে?”
মেহেক মন খারাপ করে বলল,
“ নাহ,এর আগেই তো স্যাম লোক পাঠিয়ে ওকে ডেকে নিয়ে গেল।”
এলিন হতাশ হয়ে বলল,
“ যাহ! একটুর জন্যে হলো না তাহলে।
কুহু চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো অমনি। ভীষণ তাজ্জব হয়ে বলল,
“ মানে কী মেহেক,ডেকে না নিয়ে গেলে ধরতে?”
মাথা নাড়ল মেয়েটা,
“ হ্যাঁ । স্যামের সাথে সেলফি তুলতে দিলে একটা চুমুও খেতাম।”
কুহুর মুখ ফাঁকা হয়ে গেল। আকাশ ভেঙে পড়ল বেচারি,
“ কী বলছো,চুমুও খেতে?”
ফিওনা বলল,
“ প্রফিট ছিল তো। স্যামকে একটু ছুঁতে পারতো,হাগ করতে পারতো, ওর ওই ব্লিউ শ্যানেলের গন্ধ… ভাবা যায়?”
এলিন গদগদ হয়ে বলল,
“ সেদিন যখন ও স্টেজে ঝুঁকে এলো, আমার হাত ধরল, আমার তো ওর শরীরের গন্ধে মাথা জমে গিয়েছিল! হি ইজ সামথিং এলস। আর কিয়ু কী করলে,ও নিজে তোমাকে ডান্স অফার করল তুমি নিলে না?”
কুহুর এসব কথায় মনোযোগ নেই। ও মেহেককেই বলল,
“ তুমি একটা অচেনা ছেলেকে এক দেখাতেই জড়িয়ে ধরবে মেহেক? চুমুও খাবে? তোমার খারাপ লাগবে না?”
এলিন,ফিওনা হুহা করে হেসে ফেলল অমনি। ফিওনা বলল,
“ ভাই এ কে রে? ও ভুলে যাচ্ছে এটা সুইডেন। এখানে সবাই কি ওর মতো কনজার্ভেটিভ নাকি!”
এলিন স্বায় মেলায়,বলে
“ কিয়ু, এখানে এসব নরমাল। তুমি যে কেন এখনো খাপ খাওয়াতে পারছো না! তোমার এই মাইন্ড সেট আপ নিয়ে বিদেশে আসাই উচিত হয়নি।”
কুহুর মন খারাপ হয়ে গেল। চিবুক নুইয়ে ওখান থেকে চুপচাপ বেরিয়ে গেল মেয়েটা।
মেহেক কপাল কুঁচকে বলল,
“ তোমরা ওকে ওভাবে বললে কেন? ও ছোটো মানুষ! আর ব্যাপারটা তো আমার। আমি নিজে কিছু বলেছি ওকে?”
মেয়েটাও আর আড্ডায় বসল না। বেরিয়ে এলো পিছু ধরে। কুহু টেরেসে এসে দাঁড়িয়েছে। এখানে অনেক গুলো ছোটো ছোটো ফুলের গাছ লাগানো। এর মধ্যে শুধু দুটো টিউলিপের চারা ওর,তবে এখনো ফুল ফোটেনি। চারপাশে রক্ত শুষে নেয়া ঠান্ডা।
মেহেক পেছনে এসে দাঁড়াল তখনই। দুহাতের তালু ঘষতে ঘষতে বলল,
“ ওয়াও স্নো ফল হচ্ছে কিয়ু! বাইরে যাবে?”
ও ছোট করে বলে,
“ উহু।”
মেহেক মুচকি হেসে বলল,
“ ওদের কথায় মন খারাপ করলে? আরে, ওরা তো এরকমই। আচ্ছা বাবা ওকে, আমি আর অচেনা লোকজনকে জড়িয়ে ধরব না। হ্যাপি?”
কুহু হেসে ফেলল৷
“ আমার জন্যে তুমি নিজেকে কেন বদলাবে? তোমাদের যা কালচার তুমি তাই করো। আমিই একটু ওভার রিয়্যাক্ট করে ফেলেছিলাম।”
“ থাক কিয়ু, মিস্টার টাওহিনের সাথে দেখা হলে আমি নাহয় এক কাপ কফিই খাইয়ে দেবো।”
কুহু চুপ করে রইল। মোমের মতো মুখখানা চিন্তায় কাঠ। টেরেসের শক্ত পাঁচিলে নখ ঘষতে ঘষতে রয়সয়ে বলল,
“ একটা কথা বলি,মেহেক?”
“ হু,আবার জিজ্ঞেস করতে হয়?”
কুহু দু মিনিট সময় নেয়। পরপর চোখ খিচে একদমে বলে,
“ আমি আজ স্যামকে কামড় দিয়েছি।”
মেহেকের মাথায় বোম পড়ল।
আর্তনাদ করে বলল,
“ কীইইই!”
শুকনো মুখে মাথা ঝাঁকায় মেয়েটা।
“ সে কী,কেন? কীভাবে? ওকে কোথায় পেলে তুমি?”
কুহু কটমট করে বলল,
“ লোকটা খুব খারাপ মেহেক! খুব খারাপ! জানো কী হয়েছে?”
আজকের ঘটনার পুরোটা হূলস্থুল করে শেষ করল ও। মেহেক সব শুনে থমকে রয়,চোখ ঝাপটায়, পরপর শব্দ করে হেসে ওঠে মেয়েটা। কুহু হতবাক হয়ে বলল,
“ হাসছো?”
মেহেক ওর গাল টেনে বলল,
“ এত বোকা কেন তুমি? স্যাম তোমাকে খোলা রাস্তায় কিডন্যাপ করতে আসবে? পাগল!”
“ হ্যাঁ, সত্যি বলছি। ওর চশমা পরা চামচিকাকে বলছিল আমাকে গাড়িতে তুলতে।”
মেহেকের হাসি আরো বেড়ে গেল।
“ ও গড! কিয়ু, আম শিয়র ও মজা করেছে। আরে বাবা ও একজন রক-সুপারস্টার। ওর যদি কাউকে কিডন্যাপ করার হয় ও কি নিজের গাড়ি নিয়ে আসবে? তাও অমন মুখ খুলে! সুইডেনের রাস্তার মোড়ে মোড়ে সিসিক্যামেরা আছে।”
কুহু মাথা নেড়ে বলল,
- তাইত! তাহলে সত্যিই আমাকে বোকা বানিয়েছে?”
“ অভিয়েস্লি। আর তুমিও বোকা হয়েছ।”
কুহুর এবার মায়া হলো। ইস,কামড় তো একটা দিয়েছে জম্পেশ শক্তি খাটিয়ে। নিশ্চয়ই ব্যথাও পেয়েছে অনেক! এত গাধা কেন ও? লোকটা মজা করল আর ও বুঝলোই না?
এলিন চ্যাঁচিয়ে বলল,
“ মেহেক এসো, স্যামের শো-টা শুরু হয়েছে।”
“ চলো কিয়ু, আহা চলো না…”
কুহুর হাতটা টেনেটুনে ফের কমন লাউঞ্জে এনে বসাল মেহেক। অনিচ্ছায় বসল সে। তেমন নিগ্রহ নিয়েই চোখটা টেলিভিশনে রাখল। সম্রাটের নতুন প্রজেক্ট নিয়ে একটা ছোট্ট পডকাস্ট। তাও ওর অফিসেই ক্যামেরা নিয়ে হানা দিয়েছেন জার্নালিস্ট! কুহু দেখল সম্রাটের কব্জিতে একটা স্টেরাইল গজ প্যাঁচানো। কামড় খেয়ে তাকে একটা টিডি বুস্টারও নিতে হয়েছে। কুহুর খারাপ লাগল। ওখানেই তো ও কামড় দিয়েছিল। ব্যান্ডেজও করিয়েছে? ভীষণ লেগেছে বুঝি! এক কথায় দু কথায় শোয়ের সময় কাটছিল। প্রথমবার বলিউডে কাজ করবে সম্রাট,সে নিয়েই কথাবার্তা।
হোস্ট থাকা ভদ্রলোক তক্ষুনি বললেন,
“ হাতে ব্যান্ডেজ দেখতে পাচ্ছি স্যাম! কোনো সমস্যা?”
কুহুর মুখটা চুপসে গেল। ঠোঁট উলটে আড়চোখে তাকাল মেহেকের দিকে। মেহেকের অবশ্য ধ্যান-জ্ঞান টিভিতেই আটকে।
সম্রাট বলল,
“ আ স্মল ক্যাট বাইট।”
কুহু তব্দা খায়। চোখটা ফুড়ে আসে বাইরে। লোকটি বললেন,
“ আচ্ছা, আপনার পেট?”
“ এখনো পোষ মানেনি। নতুন,তবে শীঘ্রই মানবে।”
ওর কথা থামল তুরন্ত ,হুহা করে হেসে উঠল মেহেক। হাসতে হাসতে লাউঞ্জের হাতলে শরীর ছেড়ে দিলো মেয়েটা। এলিন,ফিওনা কিছুই বোঝেনি। কয়েকবার জিজ্ঞেস করল – হাসছো কেন? কিন্তু মেহেক হাসি থামিয়ে কথাই বলতে পারল না। হাসতে হাসতে কুহুর গায়ে দুটো চড়-থাপ্পড়ও পড়ল তার।
কুহু ঠোঁট গোজ করে বসে রইল শুধু। নাকটা ফুলল ভীষণ রাগে। ও বিড়াল? ওটা ক্যাট বাইট ছিল? কত্ত বড়ো সাহস। আজ তো হাতে কামড়েছে,এরপর সামনে পেলে এমন জায়গায় কামড়াবে… মিডিয়াকেও বলতে পারবে না।
আফনানের বয়স ষোলোর কোঠায়। স্টকহোমের খুব নামি স্কুলে পড়ে সে। ভালো স্টুডেন্ট। কিন্তু স্বভাবে একটু বোকা বোকা ও। এখনো স্পষ্ট ভাবে সব কথা বলতে পারে না। প্রায়শই জিভে জড়িয়ে যায়। আফনান যখন মন দিয়ে অংক কষছিল,ঘাড়ের ওপর একটা হাত পড়ল তখনই। এক চোট চমকে ফিরে চাইল সে। তুরন্ত, ঠোঁট ছড়িয়ে কেমন ঠান্ডা চোখে হাসল সম্রাট। খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠে দাঁড়াল ছেলেটা। দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ ব্রো… ফাইনালি তুমি আমার কাছে এলে। পরশু রাতে এসেছ,আর আমাদের দেখা হলো আজ?”
“ তারপর, কী খবর তোমার?”
বলতে বলতে ওর চুলটা এক পাশে গুছিয়ে দিলো সম্রাট।
“ আমি খুব ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?”
সম্রাট তীক্ষ্ণ চোখে আফনানের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা দেখল। খুব ছোট্ট শ্বাস ফেলল নিঃশব্দে। পরপর জ্যাকেটের পকেট থেকে ছোট্ট চারকোণা প্যাকেট বের করে বলল,
“ এটা তোমার।”
আফনান উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“ ও মাই-গড। ব্লিউ শ্যানেল? তুমি কীভাবে বুঝলে তোমার পারফিউমটা আমার ভালো লাগে?”
সম্রাটের নির্লিপ্ত জবাব,
“ আমি সব বুঝি।” তারপর টেবিলের বুক থেকে চেয়ারটা সরিয়ে নিয়ে বসল সে। বলল,
“ দেখো, স্মেল কেমন!”
“ তুমি ইউজ করো, ব-বেস্ট তো হবেই।”
“ তাও একবার দেখে নাও।”
প্রফুল্ল চিত্তে পারফিউমের প্যাকেট খুলল আফনান। ঢাকনা সরিয়ে এক হাতের কব্জি উলটে স্প্রে করল সেখানে। সেকেন্ড দুয়েকে গোটা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল উৎক,ঝাঁঝালো এক গন্ধ। এটা তো ব্লিউ শ্যানেলের গন্ধ নয়! নাকটা কুঁচকে ফেলল আফনান। বিভ্রান্ত হয়ে এক পল তাকাল ভাইয়ের দিকে। সম্রাটের ঠোঁটে তীর্যক শব্দহীন হাসি। চোখ দুটো অন্ধকার ঝোঁপে শিকারের দিকে চেয়ে থাকা বাঘের মতো জ্বলছে- নিশ্চল,নিশ্চিত। আফনানের সরল মুখটা থমকে গেল তখনই। টের পেলো হাতের আঙুল থেকে শিরা বেয়ে কিছু একটা উঠে আসছে ওপরে। বরফ আর আগুনের মিশেলে তৈরি বোধ হয়। অমন অদ্ভুতুরে ব্যথায় ছেলেটার গা হিম হয়ে গেল। ধড়ফড় করে হাতটা নাড়াতে চাইল,পারল না। গোটা হাত আস্তে আস্তে অবশ হয়ে যাচ্ছে। আঁতকে উঠল সে।
আর্তনাদ করে বলল,
“ ব্রো আমার হাত, আমার হাত নাড়াতে পারছি না।”
সম্রাট চুপ,নিষ্পৃহ। শান্ত ভঙ্গিতে এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলল। এয়ারপডসের দুটো মাথা বের করে গুজে রাখল কানে। চেহারায় উদ্বেগ নেই,তাড়াহুড়ো নেই।
আফনান হতভম্ব হয় ওর আচরণ দেখে। কিন্তু বিস্ময় চাপা পড়ল ব্যথার তীব্রতায়। এরকম যন্ত্রণা ওর আগে কিছুতে হয়নি। যেন
হাড় ফেটে যাচ্ছে, হাতটা খসে পড়ছে কাঁধ থেকে। যেন নিষ্ঠুর ভাবে রগে রগে বিষ ঢেলে দিচ্ছে কেউ একজন। এই অসহনীয় পীড়ায় কেঁদে ফেলল ছেলেটা। চিৎকার করে বলল,
“ ব্রো ডু সামথিং। আমি মরে যাচ্ছি,ব্যথা ও গড। খুব ব্যথা করছে ব্রো। কিছু করো প্লিজ!”
সম্রাট গান শুনতে শুনতে গুনগুন করছে। চোখ বুজে আঙুল বোলাচ্ছে কপালে। মাঝেমধ্যে ওপরের পাটা নড়ছে তার। আফনান ব্যথায় ছটফট করতে করতে,রুমের এ মাথা থেকে ও মাথা ছুটল। পাগল হয়ে চ্যাঁচাল,গোঙালো,কাঁদল। শেষে শক্তি ফুরিয়ে দূর্বলের ন্যায় ধপ করে বসে পড়ল ফ্লোরে।
হাত উলটে ঘড়ি দেখল সম্রাট। একটা নির্দিষ্ট সময় পার হয়েছে, উঠে দাঁড়াল এইবার।
হেডফোন কান থেকে নামিয়ে এনে ফের এয়ারপডসে ভরল। খুব আস্তে হেঁটে এসে এক হাঁটু মুড়ে বসল ওর সামনে। আফনান হেচকি তুলে কাঁদছে। হাতের পাঁচ আঙুল ফুলে গেছে তার। র্যাশ উঠেছে জায়গায় জায়গায়। অস্বাভাবিক লালচে গোটা হাত। ভেজা,আতঙ্কে জমে যাওয়া চোখে ভাইয়ের দিকে চাইল সে।
সম্রাট ভীষণ বরফ গলায় বলল,
“ দরজার পিন কোড কী করে জেনেছ?”
আফনানের মুখের রক্ত সরে গেল সহসা। হতবাক চোখ থমকে রইল দুপল।
সম্রাট ভ্রু নাঁচায়,
“ সত্যিটা বললে ব্যাপারটা শুধু হাতের ওপর দিয়ে যাবে,আই প্রমিস ইউ।”
আফনান ভয়ে ভয়ে বলল,
“ ব্রো, আমি-আমি তোমার ঘরে ঢুকিনি।”
সম্রাটের সহজ চিবুক পাথর হলো। হুঙ্কার ছুড়ল স্থূল স্বরে,
“ আফনায়ায়ান! পিন কোড জানলে কী করে?”
ও ঢোক গিলে বলল,
“ ফরেইন্সিক ক্লাসে শিখিয়েছিল। আমি শুধু এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়েছিলাম ব্রো। কিন্তু তোমার রুমের কিছু ধরিনি।”
“ তোমার যাওয়া উচিত হয়নি। আমি মানা করেছিলাম তো!”
আফনান যন্ত্রনায় কুকড়ে যাচ্ছে। শরীর কাঁপছে। চোখের পানি গলিয়ে বলল,
“ ব্রো, আমি ব্যথায় মরে যাচ্ছি। কিছু করো না প্লিজ! এরপর আমি আর কখনো তোমার ঘরে ঢুকব না।”
ভয়ানক এক দানবের মতো হাসল সম্রাট। খুব সাবলীল হাসি,অথচ চোখদুটোর আগুন দেখে আফনানের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। সম্রাট
উঠে দাঁড়াল। বলল,
“ এরপর? আগে এই অপরাধের শাস্তিটা নাও। কেমন লাগছে, পলাইট?
নাকি তোমার এক্সপেরিমেন্টের জন্যে ব্যথাটা আরেকটু বাড়াব?”
“ ফর গড শেইক, আমি তোমার পায়ে পড়ি ব্রো। আমি আর সহ্য করতে পারছি না, আমার হাত ছিঁড়ে যাচ্ছে, মাম্মাম ম্মাম্মাম।”
আফনান কাঁদতে কাঁদতে গলা ফাটিয়ে চ্যাঁচাল। রোজি ঘুমোচ্ছিলেন।
ধড়ফড় করে উঠে,ছুটে এলেন এইবার। ঘরে ঢুকতেই মাথায় বাজ পড়ল। হুড়মুড় করে এসে ছেলেকে আগলে ধরলেন দুহাতে। ব্যস্ত হয়ে বললেন,
“ বেটা কী হয়েছে তোমার? কাঁদছো কেন?”
পরপর চোখ পড়ল ওর হাতের দিকে।
“ ও মাই গড, এ কী! হাতে কী হয়েছে?”
আফনান কথা বলতে পারল না। অসহ্য ব্যথায় মায়ের বুকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল । রোজি দুশ্চিন্তায় ছটফট করে উঠলেন। চিৎকার করে বললেন,
“ হানি,হানি কল টু দ্য হসপিটাল! হানি!”
সম্রাট হাতঘড়িটা দেখল ফের। ভীষণ ধীরস্থির বলল,
“ দরকার নেই। ৩ মিনিটের মধ্যে ব্যথা কমে যাবে।”
রোজি এতক্ষণে খেয়াল করলেন ওকে। হতবিহ্বল হয়ে বললেন,
“ তুমি,তুমি ওর সাথে কিছু করেছ স্যাম? ওর হাতের এই অবস্থা কি তোমার জন্যে?”
সম্রাটের ঠোঁটে ফিচেল হাসি। অথচ সবুজ চোখে আমাবস্যার মতো অন্ধকার নিয়ে বলল,
“ ও এই হাত দিয়ে আমার দরজার পিন কোড টাইপ করে আমার রুমে ঢুকেছিল, রোজি। আমি ওর এই চমৎকার সাহসের জন্যে ওকে একটা ছোট্ট গিফট-স দিয়েছি। কিন্তু ও নিতে পারল না। দেখো কেমন সেন্স হারিয়ে ফেলেছে!”
রোজির মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
পরপর গর্জে বললেন,
“ আর ইউ ইনসেইন স্যাম?
ও একটা বাচ্চা ছেলে। তুমি ওর সাথে…”
“ বাচ্চাকে বাচ্চার মতো থাকতে হয় রোজি। ও যতদিন বাচ্চামো করেছে,আমিও ওকে বাচ্চাদের মতো ট্রীট করেছি। এবার ও একটা বড়োদের মতো কাজ করেছে,আমি ওকে বড়োদের মতো ট্রীট করলাম। আমি তার সাথে তেমন,যে আমার সাথে যেমন!”
রোজি চিৎকার করে বললেন,
“ স্যাম, তুমি ওকে কী করেছ? কী হয়েছে আমার ছেলের? ওর কিছু হলে আমি তোমার নামে পুলিশ কেস করব।”
সম্রাট নাক কুঁচকে বলল,
“ টিপিক্যাল এনোয়িং!
আমি কী করলাম? টাচ পর্যন্ত করিনি।”
রোজির চোখ পড়ল মেঝেতে পড়ে থাকা কাচের বোতলে। ধরতে গেলেই সম্রাট ছিনিয়ে নিলো।
হকচকালেন তিনি। মুখ তুলতেই বোতলটাকে শূন্যে ছুড়ে আবার ধরে ফেলল সম্রাট। ভীষণ চমৎকার করে বলল,
“ আ,আ…নট এ্যাট অল রোজি। এতে Nerivex Bloom ( ছদ্মনাম) আছে। শরীরের যেখানে লাগে সেই অংশ অবশ হয়ে যায়। আমি চাই না তুমিও তোমার সুন্দর হাতে এই হাড় পোড়ানো ব্যথা পাও।”
রোজি বিস্ময়াহত হয়ে বললেন,
“ তুমি, তুমি এটা আফনানকে দিয়েছ?”
সম্রাটের বাঁকা হাসিতেই,
কেঁপে উঠলেন রমণী,
“ এখন এখন কী হবে? ওর হাত হাত তো…..”
“ বলেছি না তিন মিনিট পর সাড়বে? ব্যথা আর নেই। বরফ লাগাও, র্যাশ চলে যাবে। টেইক ইট ইজি।”
সম্রাট ঘর ছেড়ে বের হতে গেল,
রোজি আর্তচিৎকার ছুড়লেন,
“ তুমি এটা কী করে করতে পারলে, স্যাম। ও তোমাকে অনেক ভালোবাসতো।”
হাঁটা থেকে থেমে, ফিরল সম্রাট। এতক্ষণের শান্তমূর্তি বদলে গেল তার।
পৈশাচিকতায় চিবুক ফুটিয়ে বলল,
“ কিন্তু স্যাম বিশ্বাসঘাতক,প্রতারক,আর মিথ্যেবাদিদের ভালোবাসে না রোজি। আমার অর্ডারের বাইরে যাওয়া একটা মিথ্যে। আমাকে না জানিয়ে পিনকোড হ্যাক করা একটা প্রতারণা! ও আজ ছোটো বলে শুধু হাত দিয়ে মেটালাম। আদারওয়াইস ইউ নো, হাউ অ্যামেইজিং আই এ্যাম!”
হঠাৎ কিছু মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল ও। দ্বিতীয় পকেট থেকে একইরকম ব্লিউ শ্যানেলের একটা আসল প্যাকেট বের করে এসে রাখল আফনানের টেবিলে। ওর অচেতন মুখটায় ফিরে চাইল একবার। কণ্ঠ চেপে ফিসফিস করল,
“এঞ্জয় দ্য স্মেল বাড্ডি…”
তারপর সদর্পে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ছেলেটা। কোথাও কোনো অনুশোচনা, খারাপ লাগা কিচ্ছু নেই। রোজি চিড়বিড় করে বললেন,
“ ব্লাডি সাইকো!”
সম্রাটের কোলে গুটিশুটি মেরে বসে আছে থমাস। খুব আদুরে ভঙ্গিতে মাথাটা ওর বুকে দিয়ে রাখা। থমাসের কুচকুচে কালো পশম ভরতি শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সম্রাট। নাভেদ শেখ ছেলেকে চুপ করে দেখলেন দু পল। আফনানের হাতের কথাটা শুনেছেন তিনি। অথচ এ নিয়ে একটা প্রশ্নও করলেন না। সোজাসুজি নিজের কথা ধরলেন,
“ তুহিন বলল তুমি বলিউডে প্রজেক্ট নিয়েছ।”
“ হ্যা!”
“ কবে যাবে?”
“ জানুয়ারির শেষে।”
“ এখানে আর শো আছে?”
“ নেই।”
নাভেদ জিভে ঠোঁট চুবিয়ে বললেন,
“ আফনানকে একটু বেশিই শাস্তি দিলে না বেটা?”
“ আমার তুলনায় কম হয়েছে।”
“ ও বুঝতে পারেনি। তুমি ওকে মাফ করে দাও।”
“ দিয়েছি। ওর জন্যে আমি নিউ বাইসাইকেল অর্ডার করেছি।”
মুচকি হাসলেন নাভেদ। বললেন,
“ আফনানকে তুমি ভালোবাসো আমি জানি।”
সম্রাট থমাসের দিকে চেয়ে, ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। নাভেদ নিজেই বললেন,
“ তোমাকে একটা জিনিস দেখাই।”
তারপর ছোট ক্যানভাসটা এগিয়ে দিলেন তিনি। ছোপ ছোপ রং ঢালা পৃষ্ঠায় দুটো মেয়েলি সবুজ চোখ দেখেই সম্রাটের চেহারা পাংশুটে হয়ে গেল। নিষ্পলক চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। পরপর চট করে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“ আবার কেন এঁকেছ?”
নাভেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ জানি না। চোখ বুজলেই দেখতে পাই,তাই হাতে উগলে আসে। তোমার মায়ের এই চোখ দেখেই তো একদিন ভালোবেসেছিলাম। সে আমার সাথে যাই করুক,আমি তো তাকে ভালোবাসি।” সম্রাট আবার নিঃশব্দে ওই রকইরকম হাসল। এক ছটা শ্বাস ফেলল সেই নীরব হাসির মাঝে। পরপর ফট করে ক্যানভাস এক টানে ছিঁড়ে দুভাগ করে ফেলল সে।
নাভেদ চমকে বললেন,
“ কী করলে,স্যাম?”
“ আর কখনো ওনাকে আঁকবে না। আঁকলেও আমাকে দেখাবে না।”
“ এতদিনে মরে বাতাসে মিশে গেছে। আর রাগ রেখো না।”
“ আমার কোনো রাগ নেই।”
ওপর থেকে রোজি ডাকলেন সেসময়। আফনানের জ্বর এসেছে । বাবা-ছেলের কথাবার্তা এখানেই থামল। নাভেদ হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে রওনা করলেন ঘরে। যেতে যেতে বললেন,
“ ওহ,আমার কাল পেইন্টিং নিয়ে একজন ক্লায়েন্ট আসার কথা। ভাবলাম বাড়িতেই ডাকি।”
“ ডেকে কী লাভ? সেই তো অফার পছন্দ না হলে রিজেক্ট করে দেবে।”
নাভেদের মুখ কালো হয়ে গেল। এ সমাজ তার শিল্পের যথাযথ মূল্যায়ন দেয় না। তার পেইন্টিং যা টাকার যোগ্য তা বলা হয় না কখনো। এত পেইন্টিং দিয়ে ঘর ভরানো,অথচ ক্লাইন্টের মনে ধরে হাতে গোনা কয়েকটা। অথচ সবগুলো বিক্রি হলে আজ কোথায় থাকতেন তিনি!
নাভেদ মন খারাপ করেই চলে গেলেন। সম্রাট থমাসের থেকে চোখ সরিয়ে আড়চোখে দেখল সেদিকে। বাবার ছায়া উধাও হতেই ধড়ফড় করে মায়ের চোখ আঁকা ছিঁড়ে ফেলা কাগজদুটো ফোল্ড করে ট্রাউজারের পকেটে ভরে ফেলল সে।
চলবে…
Share On:
TAGS: নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি, হেই সুইটহার্ট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪