হিপনোটাইজ
তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:08
⭕পূনর্জন্ম বা টাইম ট্রাবল কোন ধর্মে গ্রহনযোগ্য
_______________________________ নয়,এটি কেবল রুপকথার উপমা।
___________________⭕
বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা বকুল গাছটা এখন আর দাঁড়িয়ে নেই।আইরিশ কেঁটে ফেলেছে সেটা।সে চায় না ফ্লোরেন্সা অন্য কাউকে তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিক।আর এই গাছটার প্রতি ফ্লোরেন্সার টান সহ্য করতে পারে না আইরিশ, ফলস্বরূপ গাছটা কেঁটেই ফেলেছে সে।
দুই দিন ধরে নাওয়া খাওয়া বন্ধ করেছে ফ্লোরেন্সা।বকুল গাছটির কথা ভাবলেই হৃদয় নিংরে আসে তার।আইরিশ ভাই এমন কিছু করবে ভাবতেই পারে নি সে।রাগে দুঃখে ঘর থেকেই বের হয়নি মেয়েটা।
সুফি এসেছে কিছুক্ষণ হলো,ফ্লোরেন্সার আম্মাই ডেকে এনেছে তাকে।একমাত্র সুফিই পারবে ফ্লোরেন্সার মান অভিমান ভাঙাতে।
“কিরে?আর কয়দিন এভাবে শোক পালন করবি,যা হবার তা তো হয়েই গিয়েছে।”
সুফির কথা শুনে ফুফিয়ে কেঁদে উঠলো ফ্লোরেন্সা,ভেজা কন্ঠে বললো,
“আইরিশ ভাই আমার বকুল গাছটা কেঁটে ফেললো রে সুফি।”
সুফি দু হাতে জড়িয়ে ধরলো ফ্লোরেন্সাকে, বললো,
“থাক মন খারাপ করিস না,আমরা আরেকটা বকুল গাছের চাড়া এনে লাগাবো ওই জায়গাটায়।”
“সে তো অনেক দিনের ব্যাপার, আব্বা গঞ্জে যেতে যেতে তো মেলা দেরি।হাট বসবে সেই রবিবারের দিকে।”
সুফি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো, তারপর তাড়াহুড়ো কন্ঠে বললো,
“বড় দীঘির পাড় বটতলায় একটা বকুল গাছের চাড়া দেখেছিলাম।ওইখান থেকেই আনবো,চল আমার সাথে।”
ফ্লোরা নাক টেনে বললো,
“সেকি!বটতলা তো নিষিদ্ধ জায়গা,ওইখানে গেলে আইরিশ ভাই মেরেই ফেলবে।”
“আইরিশ ভাই দেখলে তো?আমরা লুকিয়ে যাবো, আবার চাড়া নিয়ে চলে আসবো।”
“কিন্তু লোকে যে বলে ওইখানে ভুত প্রেত থাকে।”
“আরে বাদ দে তো, এসব ভুয়ো কথা,আমি বিশ্বাস করি না, যেতে হয় চল, নয়তো এখানে বসে বসে শোক পালন কর।”
ফ্লোরেন্সা ঠোঁট টিপে ভাবলো, তাড়াহুড়োয় উঠিয়ে নিলো ওড়না টা, মাথায় ঘোমটা দিতে দিতে বললো,
“চল,আইরিশ ভাই আসার আগেই ফিরতে হবে কিন্তু।”
এক সময় বাকেরগঞ্জের প্রাণকেন্দ্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিলো শ্যাওলাধরা এই প্রাচীন বটগাছটি।সেই গাছের ছায়াতেই শুয়ে ছিলেন এক পীর সাহেব, যার পবিত্র কবর ঘিরেই গড়ে উঠেছিলো একটি মাজার।
গঞ্জের মানুষদের জন্য মাজারটি ছিলো শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের প্রতীক। প্রতিদিনই সেখানে কেউ না কেউ প্রার্থনার আশায় যেতো। এই পবিত্র স্থানের দেখভালের গুরুদায়িত্ব পালন করতেন হুজুর আব্দুল খালেক। নিঃশব্দে, নিবেদিত প্রাণে তিনি ছিলেন মাজারের আত্মা আলোকিত এক প্রহরী।
গঞ্জের সকলেই নিজেদের সমস্যা সমাধানের উৎস হিসেবে খুব ভক্তি করতেন হুজুর আব্দুল খালেক কে।তার তাবিজ-তুমার, পড়া পানি, ঝাড়পুক ছিলো সমস্যা সমাধানের অখণ্ড অলৌকিক আলোকবর্তিকা।
গঞ্জের সকলের বিপদে আপদে হুজুর আব্দুল খালেক যেমন নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, ঠিক তেমনি তার একমাত্র মেয়ে সাংবাদিক ফাতেমাও ছিলো ভিষণ মানব দরদি।
ব্রিটিশ শাসকদের বর্বরতা যখন প্রতিদিন নতুন রূপে ভয়ংকর হয়ে উঠছিল, ঠিক সেই অন্ধকার সময়ে জেগে উঠেছিল এক প্রতিবাদী নারী কণ্ঠ।হুজুর আব্দুল খালেকের মেয়ে ফাতেমা বাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের দাবিতে কলম ধরেছিলেন। তাঁর লেখা একটি আর্টিকেল ঝাঁকুনি দিয়েছিল নিঃশব্দ বাংলাকে।
তার লেখার আগুনে স্বৈরাচারী ব্রিটিশদের চোখে চোখ রেখে রুখে দাঁড়ানোর সাহস সঞ্চয় করেছিল সাধারণ বাঙালি।যার ফলস্বরূপ তীব্র ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী। প্রতিশোধের ভয়াবহতা তখন চেপে বসে ইতিহাসের পাতায়।
এক রাতে সেই শ্যাওলাধরা পবিত্র বটগাছের ভূমিতেই, নির্মমভাবে ফাতেমা ও তাঁর বাবা হুজুর আব্দুল খালেককে গলা কেটে হত্যা করা হয়।
তারা সাহায্য চেয়েছিলো, বাকের গঞ্জের প্রতিটি মানুষের কাছে সাহায্য চেয়েছিলো, মরনের আগ পর্যন্ত তারা রুখে দাড়ানোর কথা বলেছিলো প্রত্যেককে।অথচ সবাই নিরুদ্বেগ, নিশ্চুপ।ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গলা তোলার সাহস দেখায় নি কেউ, নাতো এগিয়ে গিয়েছিল তাদের বাচাতে।
পবিত্র মাজার তাদের বাপ মেয়ের রক্তে রঞ্জিত হওয়ার পরপরই পরিত্যক্ত ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিলো, বলা হয়েছিলো এ বটগাছ এবং মাজারটি অভিশপ্ত।আর তার পর থেকেই সবার যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। বটগাছটি পরিনত হয় দৈব দানবের রুপে।
ফ্লোরেন্সা আর সুফি বটতলায় এসে দাড়ালো মাত্র।তাদের চোখে মুখে অদ্ভুত কৌতুহল।বটতলার ঘটনা অজানা নয় তাদের,অথচ তারা যায়গাটাকে ছুয়ে দেখার কৌতুহলে চলে এসেছে,ভয় ডর ভুলেছে অচিরে।
বিশ বিশটি বছর শুষে নেওয়া বটগাছটি মোটা, আঁকাবাঁকা শেকড়গুলো মৃত মানুষের হাড়ের মতো সাদা হয়ে উঠেছে।বিস্তৃত শেকড় উঠে এসেছে মাটির উপরে।শেকড় গুলো দেখে মনে হচ্ছে গা-ছমছমে জীবন্ত সাপের মতো ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
সুফি চুপি চুপি পা ফেলে এগিয়ে গিয়ে বসলো বটগাছের একটা মোটা শেকড়ের উপর।চোখ বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস টেনে তাকালো ফ্লোরেন্সার ভীত চোখের দিকে, চঞ্চল কন্ঠে বললো,
“কি শান্তি লাগছে তাই নারে ফ্লোরেন্সা?মানুষ শুধু শুধুই এত সুন্দর যায়গাটাকে পরিত্যক্ত করে রেখেছে।”
ফ্লোরেন্সা সুফির কথা শুনতে শুনতে আনমনে এগিয়ে গেলো বটগাছটার আরেকটু কাছে,তারপর মোটা গাছটা ছুয়ে দিয়ে বললো,
“বকুল গাছ কোথায় সুফি, ওটা নিয়ে তাড়াতাড়ি চল।গাছটা কেমন ভয়ংকর লাগছে।”
কথাটা বলতেই কপাল কুঁচকে এলো ফ্লোরেন্সার,নাকে ভেসে এলো তীব্র পচা রক্তের গন্ধ। গা শিউরে উঠল তার। ঠিক তখনই ঝুপঝুপ শব্দে কিছু একটা তরল জিনিস পড়তে শুরু করলো তার মাথার উপর।
ফ্লোরেন্সা চমকে উঠলো। ভয় আর বিভ্রান্তিতে দ্রুত হাত ছোঁয়ালো চুলে, তীব্র ঘিনঘিনে স্যাঁতসেঁতে এক স্পর্শ। আঙুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়লো লালচে, ঘন তরল।
তার চোখ বিস্ফারিত, শ্বাস আটকে আসছে। বুকের ভেতর অস্বাভাবিক দৌড় শুরু করলো হৃদপিণ্ড।
ফ্লোরেন্সার অদ্ভুত আচরণে থমকে গেলো সুফি। ভ্রু কুঁচকে, চোখ ছোট ছোট করে তাকালো তার মুখের দিকে। ঠিক তখনই চোখে পড়লো সেই ভয়াবহ দৃশ্য,ফ্লোরেন্সার মাথা থেকে গড়িয়ে পড়ছে ঘন লাল রক্ত। ফর্সা ত্বক রক্তে ভিজে লালচে হয়ে উঠেছে ফ্লোরেন্সার।
সুফির কাঁপা হাত এগিয়ে এলো বিস্ময়ে। আঙুল ছুঁইয়ে দিল লাল তরলে, অবিশ্বাস্য আতংকিত কন্ঠে বললো,
“রক্ত,ফ্লোরেন্সা এগুলো রক্ত।”
নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে কেবল,চারপাশের বাতাসে কেমন রক্তের উটকো গন্ধ ভেসে আসছে, সেই বটবৃক্ষ আর ঝুলন্ত শরীর গুলো চোখের পাতায় স্পষ্ট।গলা শুখিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে, খড়খড়ে লাগছে কণ্ঠনালী।
চোখ টিপটিপ করে দু পাশে মাথা নাড়াচ্ছে ফ্লোরেন্সা,ফট করেই চোখ খুলে নিলো,আতংকিত চক্ষু জোড়া শান্ত হলো আইরিশের, ভূমিকম্পের বেগে কম্পন তোলা শরীরটাও শান্ত হয়েছে নিমিষে। উন্মাদের মতো তড়িৎ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো ফ্লোরেন্সা কে,ফ্লোরেন্সা স্পষ্ট টের পেলো আইরিশের হৃৎপিন্ডের দাপাদাপি।উপলব্দি করলো আইরিশের প্রগাঢ় ভালোবাসার গভীরতা।
আইরিশের অস্থিরতা কমে নি, রিক্ত শুন্য মরুভূমিময় বক্ষপটে স্থিরতা আসে নি এক দন্ড।হৃদয়খানা মুমূর্ষু যন্ত্রণায় তোলপাড়,অথচ কন্ঠখানি আগের মতোই কঠিন,
“কেনো গিয়েছিস ওই জায়গাটায়, জায়গাটা শুধু তোর জন্য নয় বরং সবার জন্য নিষিদ্ধ ছিলো। “
ফ্লোরেন্সা মাথা নত করলো,মিনমিনিয়ে বললো,
“ভুল হয়ে গিয়েছে ভাইয়া আর কখনো যাবো না।”
“আজ বড় কোন অঘটন ঘটে গেলে এই ভুলের মাশুল আমাকে দিতে হতো।”
ফ্লোরেন্সা ছলছলে চোখে চাইলো আইরিশের দিকে, কি বলবে ভাষা খুজে পেলো না, তবে সে বুঝতে পেরেছে আইরিশের জটিল কথার অর্থ। আইরিশ আলতো হাত রাখলো ফ্লোরেন্সার গালে, প্রগাঢ় অনুভূতি মিশেয়ে উচ্চারণ করলো কঠিন কিছু শব্দ,
“তুই এমন এক স্বর্গ যার জন্য আমাকে প্রতিদিন নড়কে যেতে হয়।”
কবে বুঝবি ফ্লোরেন্সা?তোর সরলতা যে আমাকে বড্ড পোড়ায়।”
“ভালোবাসি কিনা যানি না তবে আপনাকে খুব ভালোবাসার মতো একজন আছে আইরিশ ভাইয়া, আমি যে তাকে খুব ভালোবাসি তাকে কষ্ট পেতে দিবো না কিছুতেই দিবো না।”
মনে মনে কথাগুলো আওড়ালো ঠিক তবে আইরিশকে বলা হলো না কিছুতেই, আইরিশকে আঘাত করতে চায় না ফ্লোরেন্সা। আইরিশের ভালোবাসা এইভাবে নষ্ট করে দিতেও যে মন সাই দেয় না। কি করবে সে?কোন গতিই তো দেখছে না।
“আমাকে একটু একা থাকতে দিন ভাইয়া,শরীর টা ভালো লাগছে না।”
খুব কৌশলে আইরিশের তোলা প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলো ফ্লোরেন্সা। আইরিশ বুঝলো ফ্লোরেন্সার মনোভাব, তবে আর কিছু বললো না, কারন ফ্লোরেন্সা যতই এড়িয়ে যাক ফ্লোরেন্সা শুধু মাত্র তার, আর এই সত্যটা কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারবে না ফ্লোরেন্সা। ফোস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো আইরিশ,
“বেশ বিস্রাম নে তাহলে।”
আইরিশ উঠে দরজা অব্দি হেটে যেতেই ডেকে বসলো ফ্লোরেন্সা,
“ভাইয়া?”
আইরিশ থামলো পেছন ফিরে তাকালো জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে।ফ্লোরেন্সা ঢোক গিললো, শুখনো খরখরে জ্বিভের আগা ভিজিয়ে নিয়ে বললো,
“ওই লাশ গুলো।”
আইরিশের ললাট শক্ত হয়ে এলো, মুখে বিরাজ করলো কাঠিন্যতা,
“আজকে বলেছিস এইটাই প্রথম এবং এইটাই শেষ বার হওয়া চাই, এই বিষয় টা নিয়ে কোন রকম কৌতুহল দেখাবি না, কথাটা মনে থাকে যেনো।”
আর একটি বাক্য ব্যয় না করেই গটগট পায়ে বেড়িয়ে গেলো আইরিশ।
আইরিশ যাওয়া মাত্রই ফ্লোরেন্সার ঘরে হুমরি খেয়ে এসে পড়লো সুফি,কন্ঠে তার আকুলতা,
“ঠিক আছিস তুই?”
“হ্যাঁ এখন ঠিক আছি।”
“ওই লাশগুলোর চেয়ে তো তোকে নিয়েই আমার বেশি ভয় হচ্ছিলো।”
“লাশ!” অস্ফুটে উচ্চারণ করলো ফ্লোরেন্সা।
সুফির কন্ঠ নরম হলো, মলিন মুখটা জুড়ে অন্ধকার ঘনিয়ে এলো,
“আমাদের গঞ্জের পাঁচ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে বটতলা থেকে।”
ফ্লোরেন্সা আঁতকে উঠল,
“কিহ!”
“হ্যাঁ রে ফ্লোরেন্সা, পাঁচ জনের কারোই মাথা পাওয়া যায় নি।”
ভয় খামচে ধরলো ফ্লোরেন্সার কলিজা খানি। ধরপড়িয়ে উঠলো হৃৎপিন্ড, জানার কৌতুহল আরেকটু বাড়লো,
“কারা ছিলো ওরা?তাদের পরিচয় কি জানা গেছে?”
“সবাই মেয়ে, আমাদের মতোই বয়স হবে। আচ্ছা তোর রেহানার কথা মনে আছে?”
“হ্যাঁ মনে থাকবে না কেনো আমরা একসাথেই তো মোক্তবে পড়তাম। মেয়েটা ভিষণ সুন্দরী ছিলো।”
“পাঁচ জনের মধ্যে রেহানাও একজন ছিলো ফ্লোরেন্সা।”
ফ্লোরেন্সা আরেকটু অবাক হলো,কান্না পেলো খুব,
“কি বলছিস তুই? কে করলো এসব?”
“সবাই ধারনা করছে প্রিন্স জোসেফ এমন কিছু করেছে যাকে তুই সোজা বাড়িতে এনে আশ্রয় দিয়েছিস।”
ফ্লোরেন্সার মুখটা চুপসে গেলো, অবিশ্বাসের গাঢ় আভা হৃদয় জুড়ে, কোথাও একটু সন্দেহের সাক্ষাৎ পর্যন্ত পাওয়া গেলো না।কি করেই বা সন্দেহ করবে?মানস্পটে ভেসে উঠে সেই অজ্ঞাত সুপুরুষের সরলতায় মোড়ানো মুখ,মনটা আন্দোলন বিক্ষোভ জানায় প্রতিটি নিঃশ্বাসে, ওমন অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারি পুরুষ আর যাই করুন এমন জঘন্য কাজ করতে পারে না।
ফ্লোরেন্সা নিজের আঙুল চেপে ধরলো সুফির ঠোঁটের উপর,
“হুশশ,এই নামটা আর ভুলেও উচ্চারণ করিস না সুফি। আমার মনে হচ্ছে মানুষ টা এমন জঘন্য কাজ করতে পারে না, কেনো যানি বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না মন সাই দিচ্ছে না।”
সুফি চোখ উল্টোলো, ভ্রু নাচিয়ে বললো,
“বাব্বাহ! দুদিন না যেতেই এতো বিশ্বাস?”
সুফির কথায় না চাইতেও হৃদয়ে কুন্ঠা ভর করলো ফ্লোরেন্সার, আইঢাই করে বললো,
“তেমন কিছু নয় সুফি, তুই অযথাই বেশি বেশি ভাবছিস।এসব না ভেবে তুই বরং আইরিশ ভাইয়াকে নিয়ে ভাব,সারাজীবন কি এক তড়ফাই ভালোবেসে যাবি?মনের কথা কি জানাবি না?”
সুফি হতাশার নিশ্বাস ফেললো,আইরিশের নামটা শুনলেই কেমন বিষাধময় যন্ত্রণায় ছেয়ে যায় হৃদয়।সেই ছোট্ট থেকে মানুষটাকে ভালোবাসে সে, মানুষটার নাক, চোখ, ঠোঁট এমনকি গায়ের গন্ধটাও মুখস্ত তার। অথচ আজ পর্যন্ত বলে উঠতে পারলো না নিজের মনের কথা, হৃদয়ে জন্ম নেওয়া যুগ যুগান্তরের অনুভুতির কথা।
কিভাবে বলবে সে?সামান্য কর্মী হয়ে কি মনিবকে প্রেম নিবেদন করা মানায়? এ তো বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানোর মতো দুঃস্বপ্ন। কেনো বেছে বেছে এই মানুষটাকেই ভালোবাসতে হলো তার।ওই গম্ভীর পুরুষটা কি কখনো বুঝবে তাকে?মূল্য দিবে তার ভালোবাসার?
ফ্লোরেন্সা মৃদু ধাক্কা দিলো তাকে,
“কিরে ভাইয়াকে নিয়ে কোন রাজ্যে চলে গেলি?”
“আমি নিতে চাইলেই কি তোর ভাই যাবে?কখনো তো ফিরেও তাকায় না।উনি হয়তো আমাকে কেমন দেখতে সেটাও যানে না।”
ফ্লোরেন্সা ব্যাথিত হলো, হবেই বা না কেনো তার জন্যই তো আইরিশ ভাইয়া সুফিকে এড়িয়ে চলে। যেদিন সুফি এই কথাটা জানতে পারবে খুব কষ্ট পাবে হয়তো।ফ্লোরেন্সা সান্ত্বনা দিতে বললো,
“মন খারাপ করিস না সুফি,তোর ভালোবাসা যদি খাটি হয়ে থাকে তবে ভাইয়া মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারবে না, দেখিস তোর ভালোবাসার জয় হবেই।”
সুফি জড়িয়ে ধরলো ফ্লোরেন্সাকে, আদুরে কন্ঠে বললো,
“তোর কথাই যেনো সত্যি হয় ফ্লোরেন্সা, নয়তো আমি মরে যাবো, এই পৃথিবী থেকে হয়তো আমার ভালোবাসার সাথে সাথে এই আমিটাও বিলিন হয়ে যাবে।”
ফ্লোরেন্সার বুকের ভেতরটা অজানা কারনেই ধরপরিয়ে উঠে, শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সুফিকে, কোমল কন্ঠে প্রকাশ করে সুফির প্রতি জমানো অনুভুতি,
“এমন কথা বলিস না সুফি, তুই আমার বন্ধু কম বোন বেশি, আমি তোকে নিজের বোনের মতো ভালোবাসি, তোর প্রতি নিজের ভালোবাসা টা যদি প্রকাশ করতে পারতাম তবে স্বার্থক হতো জীবন। হয়তো তুইও আমাকে ছেড়ে যাবার মতো এমন কঠিন কথা গুলো কখনোই বলতে পারতিস না,তোকে আমি কষ্ট পেতে দিবো সুফি, আইরিশ ভাই তোরই হবে,আর তার জন্য আমার যা করতে হয় করবো, তুই দয়া করে আর কখনো নিজেকে হারিয়ে ফেলার কথা বলিস না।”
🔸🔸🔸🔸🔸🔸🔸_
আজও সেই একই রকম রাত, হুতুম পেচার ডাকের সাথে আজও ভেসে আসছে সেই অদ্ভুত সম্মোহনী সুর।যেই সুর শুনে স্থির থাকা যায় না, যেই সুরের ডাকে সারা দিতেই হয়, না চাইতেও বেড়োতে হয় দোর খুলে।
মাথায় ঘোমটা পেচিয়ে ফ্লোরেন্সা ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো নিঃশ্বব্দে,ফ্লোরেন্সার কেনো যানি মনে হয় এই সুরের উদ্দেশ্যই তাকে ডেকে আনা, এই সুর মনে প্রানে চায় ফ্লোরেন্সা ঘর থেকে বেড়িয়ে আসুক, ধরিয়ে দিক তার দূর্বলতা।
আজও সেই একই জায়গায়, কেটে ফেলা বকুল গাছটার শেকড়ের পাশে দাঁড়িয়ে ঠোঁট গোল করে সুর তৈরি করছে জোসেফ। তবে আজ আর ফ্লোরেন্সা নিঃশ্বব্দে দাড়ালো না, আসা মাত্রই চটপট ছুড়লো ধারালো কথার বান,
“আমি যদি খুব ভুল না হই তবে আপনি এই সুর আমার জন্যই বাজান তাইতো? “
জোসেফ প্রতিক্রিয়া বিহীন পেছনে ঘুরলো, সরাসরি চোখ রাখলো ফ্লোরেন্সার চোখে,
“আজ তোমাকে স্বরন করেই বাজিয়েছি।”
ফ্লোরেন্সা কপাল কুচকালো, বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“আমার জন্য? “
“হ্যাঁ তোমার জন্য” তড়িঘড়ি করে শার্টের পকেট থেকে একটি কালো চকচকে পাথরের অলংকার বের করে ফ্লোরেন্সার দিকে এগিয়ে দিলো,
“আমাকে সাহায্য করার জন্য সামান্য উপহার।”
ফ্লোরেন্সা হাত গোটাল,
“ক্ষমা করবেন, আমি এই উপহার নিতে পারবো না, বিনিময়ের উদ্দেশ্যে আমি উপকার করিনি।”
জোসেফ ফ্লোরেন্সার বারনের ধার ধারলো না বরং অধিকারবোধ দেখালো, ব্যাস্ত হাতেই অলংকার টা পড়িয়ে দিলো ফ্লোরেন্সার গলায়। ফ্লোরেন্সা হকচকালো, অপ্রস্তুত ভঙিতে চাইলো জোসেফের দিকে,
“এটা কি করলেন আপনি? “
“যদি বলি অধিকার খাটালাম, নিজের ভালোবাসার ব্লু ব্লাড গার্লের উপর।”
ফ্লোরেন্সা অবাকের চরম শীর্ষে,কি বলছে উনি? মাথা ঠিক আছে?একজন ব্রিটিশ প্রিন্স কিনা একটা বাঙালি মেয়েকে ভালোবাসবে এটা যে অসম্ভব ব্যাপার। অথচ মনটা কেমন অন্য গান গাইলো, কেমন যেনো ফিসফিসিয়ে বললো,
“সম্ভব হলে ক্ষতি কি?ভালোবাসায় সব জায়েজ।”
ফ্লোরেন্সা দ্বিধাদন্দে ভুগলো, লোপ পেলো চিন্তাশক্তি, মস্তিষ্কে গেথে গেলো শুধু মাত্র জোসেফের বলা কথা গুলো।কুন্ঠার বেড়াজালে চিবুক নামিয়ে পালানোর পয়তাড়া চালালো, দ্রুত প্রস্থানের জন্য দৌড়ে যেতে শুরু করলো, হাওয়ার দাপটে ঘোমটা দিয়ে রাখা মাথার ওড়না সরে গিয়ে উড়তে শুরু করলো তার, এমন সুন্দরতম দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রইলো একজোড়া নীল চোখ, বিরবির করে বললো,
“কাল এক অন্যরকম ভোর হবে ব্লু ব্লাড গার্ল। খুব শীঘ্রই তোমার প্রতিটি দিবা শুধু আমিময় হতে যাচ্ছে। “
চলবে,,,,,,,,,,
Share On:
TAGS: তাজনিন তায়্যিবা, হিপনোটাইজ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
হিপনোটাইজ পর্ব ১
-
হিপনোটাইজ পর্ব ৬
-
হিপনোটাইজ পর্ব ৭
-
হিপনোটাইজ পর্ব ৪
-
হিপনোটাইজ পর্ব ৫
-
হিপনোটাইজ পর্ব ১০
-
হিপনোটাইজ পর্ব ৯
-
হিপনোটাইজ পর্ব ৩
-
হিপনোটাইজ পর্ব ২