সুতোয়বাঁধাজীবন
পর্বঃ০৫
কলমেসোনালিকাআইজা
⚠️ কপি করা সম্পুর্ন নিষিদ্ধ। চাইলে শেয়ার দিয়ে পাশে থাকতে পারেন।⚠️
সেদিনের বিচ্ছেদ, বেশ জোরালো ভাবে দাগ কাটলো তাসরিফের বুকে। সবসময় অবহেলা করে আসা মেয়েটার শূন্যতা আজ বড়ই পীড়া দিচ্ছে মেজরকে। এই যেমন, সেই ঘটনার প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেছে। এই দুটো মাসে মায়াকে কতই না খুঁজেছে তাসরিফ। নিজের ক্ষমতার জোর খাটিয়েও মায়াকে ফিরে পেতে চেয়েছে। তবে নিয়তির চেয়ে বেশি নিষ্ঠুরতা করলো তার নিজের পরিবার। মায়া বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে নিজের পরিবারের সাথে সম্পর্কে অবনতি হয়েছে তাসরিফের।
অবজ্ঞা করে মেয়েটার দিকে কখনো না তাকানোর দরুন, মায়ার চেহারা সম্পর্কে অবগত নয় সে। যার মুখের দিকে তাসরিফ কোনোদিন তাকিয়েও দেখেনি, তাকে খুঁজে বের করবে কিভাবে? চোখের সামনে আসলেও তো চিনতে পারবে না। তাই খোঁজার সুবিধার্থে সে মায়ার একটা ছবি চেয়েছিল নিজের পরিবারের কাছে। কিন্তু তারা ছবি দেয়া তো দূর, উল্টো দু চারটে মন্দ কথা শুনিয়ে দিলো ছেলেটাকে। অপরাধ নিজের থাকায় কোনো জবাব দিতে পারেনি তাসরিফ। জবাব দেবেই বা কিভাবে? একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ হওয়ার সত্বেও নিজের দায়িত্ব নিয়ে হেলাফেলা করেছে সে। মেয়েটা তো ছোটো। রোহানের সমবয়সী হলে মায়ার বয়স হয় আঠারো বছর। সেখানে তাসরিফের বয়স ত্রিশ বছর। হিসাব করলে দেখা যায়, দুজনার মধ্যেকার বয়সের ব্যবধান বারো বছর।
মায়া নাহয় ছোটো। কিন্তু তাসরিফ? সে তো বড়। ওর কি উচিত ছিলো না বাচ্চা মেয়েটার প্রতি একটু মানবিক হওয়ার? যেখানে বড় হিসেবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করায় সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব ছিলো তাসরিফের। সেখানে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছে মায়া। তবুও তো হেরে গেলো মেয়েটা। তাসরিফের অবহেলা মেয়েটার বাচ্চা মনটা ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে। সাধে তো আর ঘর ছাড়েনি। একবুক কষ্ট নিয়ে তবেই বাড়ি ছেড়েছে। এতটুকু বয়সে নিজেই নিজের দায়িত্ব নিয়েছে। কে জানে, এই নিষ্ঠুর শহরে একা মেয়েটা নিজেকে নিরাপত্তা দিতে পারছে কি না?
তিক্ত ভাবনাগুলো স্মৃতিপটে নাড়াচাড়া করতে করতে তপ্ত শ্বাস ছাড়লো তাসরিফ। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে জীবনের করা ভুলগুলো আরও একবার স্বরণ করছিল সে। আজকাল প্রায়সই সে এমন আকাশ কুসুম ভাবনা নিয়ে কল্পনায় হারিয়ে যায়। এক কালে যার প্রতি তাসরিফের বিন্দু মাত্র ফিলিংস ছিলো না। আজ সেই মেয়েটাই তার ডিউটি থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়ার কারণ। স্বামী স্ত্রী নামক সম্পর্কের এতো জোর? একবার সুতোয় জড়ানো একটা বন্ধন জুড়ে গেছে বলে, সেটা ছিন্ন করার পরেও রেশ রয়ে গেছে?
—“মেজর! আপনার ফোন বাজছে।”
আচমকা ডাকে ভাবনায় ছেদ ঘটলো তাসরিফের। অন্য মনস্ক থাকার দরুন সে খেয়ালই করেনি, দীর্ঘক্ষন ধরে তার ফোনটা বেজে যাচ্ছে। একটা ছোট্ট করে দম নিয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করলো তাসরিফ। ফোনের স্ক্রিনে “মা” নামটা দেখে সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে শোনা গেলো সালেহা বেগমের গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
—“বাড়ি কবে ফিরবি?”
—“দেরি হবে ফিরতে।”
—“কত দেরি?”
—“অনেকটা।”
—“আগামীকাল বাড়ি ফিরবি। কোনো বাহানা শুনবো না।”
—“বদলি হওয়ার এক সপ্তাহও হয়নি মা। এতো তাড়াতাড়ি ছুটি পাবো না।”
সালেহা বেগম থামলেন একটু। কিছুটা সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে বললেন,
—“তোর বাড়ি আসাটা খুব জরুরি। চেষ্টা করে দেখ তো, দুই দিনের জন্য ছুটি ম্যানেজ করা যায় কি না?”
—“এতো জরুরি তলব কেনো?”
বলতে বলতে থেমে গেলো তাসরিফ। কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে ঝটপট করে বলল,
—“মায়া ফিরে এসেছে?”
সালেহা বেগম হতাশ হলেন ভিষণ। ফোঁস করে একবুক তপ্ত শ্বাস ছাড়লেন। নিঃশ্বাসের সাথে খানিকটা দুঃখও বেরিয়ে গেলো যেনো। নমনীয় কন্ঠে বললেন,
—“ফিরে আসার জন্য মেয়েটা চলে যায়নি তাসরিফ। আত্মসম্মানের সহিত মাথা উঁচু করে বাঁচতে চলে গেছে। ও কোনো লোভী মেয়ে নয় যে চলে গিয়ে আবার ফিরে আসবে। আর ফিরবেই বা কার টানে? ফেরার মতো সম্পর্ক তৈরি করেছিলি ওর সাথে?”
তাসরিফ চুপ হয়ে গেলো। আপনাআপানি মাথাটা নিচু করে নিলো। এই ব্যর্থতা ছেলেটা প্রতিনিয়ত পোড়ায়। কেনো মেয়েটাকে অবহেলা করলো সে? আজ সেই অবহেলা করা মেয়েটাই দিন রাত বিরহ দহনে পোড়াচ্ছে ওকে। খানিক্ষন চুপ থেকে তাসরিফ বলে উঠলো,
—“কেমন আছো মা?”
দু’ফোটা চোখের জল ছাড়লেন বোধহয় সালেহা বেগম। নাক টেনে জবাব দিলেন,
—“এই তো, ভালোই আছি।”
—“জিজ্ঞেস করবে না আমি কেমন আছি?”
—“না করবো না। কেনো করবো? তোর খারাপ থাকার কারণ তুই নিজের হাতে তৈরি করে নিয়েছিস। এখন আমাকে বলে কি ফায়দা?”
তাচ্ছিল্য হাসলো তাসরিফ। লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
—“তাই তো। আচ্ছাহ্, তোমরা ভালো থেকো। তাতেই হবে। আমি দেখছি ছুটি ম্যানেজ করতে পারি কি না। তবুও, সপ্তাহ খানেক সময় লাগবে হয়তো।”
কথা বলার ঠিক এই পর্যায়ে আর্মি পোশাক পরিহিত একজন সৈনিক দৌড়ে এলো তাসরিফের কাছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
—“মেজর! গন্ডগোল হয়ে গেছে। সাইনবোর্ড টানানো নিষিদ্ধ এরিয়াতে একটা মেয়ে ঢুকে পড়েছে।”
কথাটা যেনো চম্বুকের মতো মনোযোগ টেনে নিলো তাসরিফের। খট করে ফোনটা কেটে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
—“হোয়াট? মেয়েটা জানে না এই এরিয়া কতটা ডেঞ্জারাস? একটু পা স্লিপ করলেই সোজা খাদে পড়ে মা*রা যাবে।”
—“সাইনবোর্ডে তো সতর্ক বার্তা দেওয়াই আছে। পড়তে পারে কি না কে জানে?”
রাগে চোয়াল জোড়া শক্ত হয়ে গেলো তাসরিফের। আর এক সেকেন্ডও সময় ব্যায় না করে সঙ্গে সঙ্গে ছুটলো ক্যান্টনমেন্টের বাইরে।
–
পাহাড়ের খাদের ঠিক শেষ প্রান্তে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। মেয়েটাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে সবুজ পোশাকধারী সেনা সদস্যরা। এতগুলো সেনাবাহিনীর মাঝে একা পড়ে ভয়ে তটস্থ হয়ে আছে মেয়েটা। যার দরুন, ভয় থেকে বাঁচতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছে সবার প্রথম মেয়েটার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষন করে নিলো তাসরিফ। ভয়ে কেমন যেনো জমে গেছে মেয়েটা। ওড়নার কোণা ধরে মোচড়ামুচড়ি করে নিজের ভয়ের জানান দিচ্ছে। তবে তাতে বিন্দু মাত্র মন গললো না তাসরিফের। বরং হৃদয়হীন পাষাণ মানবের মতো বাজখাঁই গলায় ধমকে উঠলো,
—“এ্যাই মেয়ে এ্যাই! তোমার সাহস হলো কি করে এখানে আসার? সাইনবোর্ডে যে বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে এটা ডেঞ্জারাস এরিয়া। সেটা চোখে দেখোনি?”
আচমকা ধমকে চমকে উঠলো মেয়েটা। তবে মাথা তুলে তাকানোর সাহস আর পেলো না। কোনো কারণে মেয়েটা থরথরিয়ে কাঁপছে। সেটা কি পাহাড়ের খাদ দেখে নাকি তাসরিফের ধমক শুনে, কেউ বুঝতে পারলো না। এদিকে মেয়েটাকে জবাব দিতে না দেখে রাগের পারদ তরতর করে বেড়ে গেলো তাসরিফের। দুকদম সামনে এগিয়ে এসে ফের ধমকে উঠলো,
—“কি হলো? কথা বলছো না কেনো? কানে শোনো না?”
তাসরিফ কথা শেষ করেছে কি করেনি, আচমকাই মেয়েটা শক্তিহীনের মতো দেহটা ছেড়ে দিলো। লতার ন্যায়ে দেহটা খাদের শেষ প্রান্তে পড়েই যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহুর্তে খপ করে হাতটা ধরে টেনে নিজের দিকে নিয়ে আসলো তাসরিফ। টান খেয়ে ছোটোখাটো শরীরটা আছড়ে পড়লো তাসরিফের বুকে। মাথাটা বুকের সাথে ঠেকতেই আচমকা ভেতরটা মুচড়ে উঠলো তাসরিফের। দম বন্ধ করা অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। জ্ঞানহীন মেয়েটার চুলের গন্ধ তাসরিফের মস্তিষ্কে গিয়ে সজোরে আঘাত করলো। বুকের ভেতর রেড সিগন্যাল বেজে উঠলো, “মেয়েটা কি ওর পরিচিত? কোথায় দেখেছে?” জানার তাগিদে মেয়েটার মুখের দিকে তাকালো তাসরিফ। মুখটা কেমন জানি চেনা। তবুও বড্ড অচেনা। এর আগে কোথায় দেখেছে মেয়েটাকে?
উত্তর খুঁজে বের করার সময় টুকুও পেলো না তাসরিফ। তার আগেই কোথা থেকে যেনো ছুটতে ছুটতে হাজির হলো দিহান। দূর থেকেই চিৎকার করে বলে উঠলো,
—“তাসরিফ। ওকে বকিস না ভাই। ও আমার পরিচিত।”
গলা ছেড়ে কথাগুলো বলতে বলতে কাছাকাছি চলে এলো দিহান। এসেই কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তিকে তাসরিফের বুকে দেখে ভড়কে গেলো কিছুটা। চোখে মুখে বিরক্তি নিয়ে বলল,
—“ধমকেছিস? নিশ্চিত ধমকে ধমকে মেয়েটার পিলে চমকে দিয়েছিস?”
—“তুই চিনিস মেয়েটাকে?”
উত্তরের পরিবর্তে তাসরিফের পাল্টা প্রশ্ন শুনে বেশ বিরক্ত হলো দিহান। কন্ঠে একরাশ বিরক্তি ঢেলে বলল,
—“না চিনলে তো আর এমনি এমনি ছুটে আসিনি। আমার কলেজের স্টুডেন্ট ও। ফাস্ট ইয়ার। আর….”
—“আর?”
দিহান একটু থামলো। এক পলক জ্ঞানহীন মুখটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আর স্টুডেন্ট ছাড়াও ও আমার বিশেষ কেউ।”
বলতে বলতে জ্ঞানহীন দেহটা নিজের বাহুডোরে সামলে নিলো দিহান। হঠাৎ নিজের বুক থেকে মেয়েটা সরতেই কেমন যেনো অস্বস্তি অনুভব করলো তাসরিফ। হাসফাস করে উঠলো বুকের ভেতর। সেই অস্বস্তি আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেলো দিহানের কথা শুনে।
—“মায়াবিনী। চোখ খোলো। ভয় নেই। তোমার দিহান স্যার সাথে আছে তো।”
তবে বিপরীত দিক থেকে কোনো জবাব এলো না। উপায়ন্তর না পেয়ে জ্ঞানহীন দেহটা কোলে তুলে নিলো দিহান। এরপর তাসরিফের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“বন্ধু হিসেবে এটুকু ফিবার কর। বিষয়টা আর বেশিদূর এগোতে দিস না। মেয়েটা না বুঝে চলে এসেছে এখানে। জ্ঞান ফিরলে আমি নিজ দায়িত্বে ওকে বারন করে দেবো।”
তাসরিফ কোনো জবাব দিলো না। বরং অদ্ভুত চোখ ঠায় চেয়ে রইলো মেয়েটার জ্ঞানহীন মুখের দিকে। তাসরিফের দিক থেকে কোনো জবাব না পেয়ে দিহান আবারও বলল,
—“সন্ধ্যায় আসছিস তো আমার বাসায়? জমিয়ে আড্ডা দেবো কিন্তু। সেই সাথে মায়াবিনীর বিষয়েও কিছু একটা বলবো। তুই তো আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। সময় মতো চলে আসিস, কেমন?”
এটুকু বলেই পাহাড়ের রাস্তা ধরে হাঁটা দিলো দিহান। বেশ সাবধানে ধীরে ধীরে পা ফেলে এগোচ্ছে। যেনো কোলের জ্ঞানহীন মেয়েটা ওর কাছে কতই না মূল্যবান। অসাবধানতা বসতও মেয়েটার কোনো রুপ ক্ষতি হতে দেবে না সে। সেদিকে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তাসরিফ। দিহান যতই দুরত্ব অতিক্রম করে যাচ্ছে, তাসরিফের বুকের ছটফটানি ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শেষে মনের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে তাসরিফ পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলো,
—“মেয়েটার নাম কি দিহান?”
ডাকটা দিহানের কান পর্যন্ত পৌঁছালো না বোধহয়। ততক্ষণে সে বেশ অনেকটা দুরত্ব অতিক্রম করে চলে গেছে।
চলবে?
(পড়া শেষে সবাই লাইক কমেন্ট করবেন। যারা আমার নাম ছাড়া গল্প কপি করবে বা চ্যাটজিপিটি দিয়ে পরের পর্ব লিখবে তারা সবাই হাউন আঙ্কেল। বদ দোয়া দিলাম, তোদের সবার চুল পড়ে যাবে। অকালে টাক হয়ে যাবি খবিশ গুলো। 😑😑😑)
Share On:
TAGS: সুতোয় বাঁধা জীবন, সোনালিকা আইজা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
এক টুকরো মেঘ গল্পের লিংক
-
সুতোয় বাঁধা জীবন গল্পের লিংক
-
সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ৩
-
সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ১
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ২
-
সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ৪
-
সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ২
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ৫
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ১
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ৪