সুতোয়বাঁধাজীবন
পর্বঃ০৩
কলমেসোনালিকাআইজা
প্রচন্ড ঝড়ের পর আশপাশটা যেমন এলোমেলো অগোছালো হয়ে পড়ে। বর্তমানে মায়াও ঠিক তেমনই বিধ্বস্ত অবস্থায় আছে। পড়নের ভেজা জামাটা গায়েই শুকিয়ে গেছে। দীর্ঘক্ষন কান্নার ফলে চোখ দুটো ফুলে কলাগাছ। রাতভর বৃষ্টিতে ভেজার দরুন উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে রং ধারণ করেছে। ঠোঁটের এক কোণে সামান্য কালচে দাগ। এই মুহুর্তে মেয়েটাকে মানসিক ভারসাম্যহীন পাগল ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না। বান্ধবীর এমন করুণ হাল দেখে চোখ দুটো ভরে উঠলো নিকিতার। পরিস্থিতি কিছুটা আন্দাজ করতে পেরে দৌড়ে এসে আগলে নিলো মায়াকে। এই মুহুর্তে কোনো আলোচনায় না গিয়ে নিজের সাথে হোস্টেলের ভেতরে নিয়ে গেলো।
ভেজা জামাটা বদলে নিকিতারই একটা শুকনো জামা পড়ে নিলো মায়া। পরিস্থিতি কিছুটা আয়ত্তে আসতেই এই পর্যায়ে মায়াকে চেপে ধরলো নিকাতা। মুখোমুখি হয়ে বসে মায়ার হাত দুটো চেপে ধরে বলল,
—“এবার বল কি হয়েছে? তুই হঠাৎ এখানে কেনো?”
—“আমার থাকার জন্য একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবি নিকিতা?”
মাথা নিচু রেখেই মিনমিন করে আবদার খানা করলো মায়া। হঠাৎ মায়ার এমন অদ্ভুত আবদারে আশ্চর্য হয়ে গেলো দুই বান্ধবী। নিকিতার পরিবর্তে রুমি প্রশ্ন করে উঠলো,
—“কেনো? থাকার জায়গার কি প্রয়োজন? দুলাভাই কি তোকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে?”
—“না। আমি নিজেই বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি।”
কথাটা বজ্রপাতের মতো চমকে দিলো নিকিতা আর রুমিকে। হুট করে একটা মানুষের বাড়ি ছেড়ে চলে আসা তো সহজ কথা নয়। নিশ্চয়ই খারাপ কিছু হয়েছে। তাছাড়া, মায়ার অনাকাঙ্ক্ষিত সেই বিয়ের বিষয়ে দুই বান্ধবী খুব ভালো করেই জানে। মায়ার স্বামী যে ওকে শুরু থেকেই মেনে নেয়নি সেই বিষয়েও ওরা অবগত। তবে কি লোকটা মায়ার ওপর কোনো রুপ শারিরীক বা মানসিক নির্যাতন করেছে। সেই কষ্ট সইতে না পেরে বাড়ি ছেড়েছে মেয়েটা? চিন্তিত নিকিতার নজর পড়লো মায়ার ঘাড়ে। ফর্সা চামড়ায় লম্বাটে কালচে দাগটা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। মাথার ভেতর একগুচ্ছ চিন্তা নিয়ে নিকিতা প্রশ্ন করলো,
—“দুলাভাই কি তোকে মারধর করেছে মায়া?”
আচমকা এহেন প্রশ্নে চমকে উঠলো মায়া। চকিতে মাথা তুলে তাকালো নিজের বান্ধবীর দিকে। মাথা ক্রমাগত ডানে বামে নেড়ে বলল,
—“না না। উনি আমাকে মারধর করবেন কেনো? উনি কখনো আমার গায়ে হাত তোলেননি।”
—“তাহলে এগুলো কি? তোর ঘাড়ে এই দাগ কিসের? ঠোঁটের কোণেও রক্ত। এসবের কারণ কি মায়া?”
নিকিতার প্রশ্নগুলো এবার বেকায়দায় ফেলে দিলো মায়াকে। অস্বস্তিতে হাসফাস করে উঠলো ভেতরটা। রাতের সেই আবেগঘন মুহুর্ত স্মৃতির দুয়ারে আবারও কড়া নাড়লো। লজ্জায় নজর লুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো মায়া। আমতা আমতা করে জবাব দিলো,
—“ওই, আসলে, কাল……….”
বাক্যগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে। কিভাবে উত্তর দেবে ভেবে পাচ্ছে না। ব্যক্তিগত মুহুর্তের কথা এভাবে কি সবার সামনে বলা যায়? মায়াকে হাসফাস করতে দেখে ঘটনা কিছুটা আন্দাজ করে নেয় নিকিতা। দুই নয়নে বিস্ফোরণ ঘটলো নিকিতার। অবাকের চূড়ান্তে পৌঁছে গিয়ে বলল,
—“দুলাভাই তোকে মেনে নিয়েছে মায়া? নিজে থেকে কাছে টেনে নিয়েছে? তাহলে তুই বাড়ি ছাড়লি কেনো?”
ছলছলে চোখে একবার বান্ধবীর দিকে তাকালো মায়া। গলাটা বুজে আসছে অজানা ব্যথায়। ধরা গলায় বলল,
—“ভুলবশত কাছে টেনে নিয়েছিল কাল। কিন্তু পরক্ষণেই আবার আমার জায়গা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। উনি আমাকে ঘৃণা করেন নিকি। এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি চান উনি।”
—“মানেটা কি? ইচ্ছা হলো বিয়ে করে নিলো। ইচ্ছা হলো বিয়ে মানবো না বলে বিয়ের দিন বউকে রেখে চলে গেলো। এখন ভোগ করে ছুড়ে ফেলে দিলো? উনি কি মানুষ?”
—“ওনার কোনো দোষ নেই নিকি।”
—“আচ্ছাহ্? দোষ নেই? তাহলে বাড়ি ছেড়েছিস কেনো? চল, তোকে সেই ভালো মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসি।”
বলতে বলতে মায়ার হাত টেনে ধরে উঠে দাঁড়ালো নিকিতা। যেনো এই মুহুর্তে মায়াকে তার শ্বশুর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে। তবে মায়া যেনো জমে বরফ হয়ে আছে। যা কিছুই হয়ে যাক, সে তাসরিফের কাছে কোনোমতেই ফিরবে না। হাতে টান পড়ায় থেমে গেলো নিকিতা। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার চাইলো মায়ার মুখের দিকে। নামের মতোই মেয়েটার মুখে এক আকাশ সমান মায়া জড়ানো। একবার কেউ মেয়েটার মুখের দিকে চাইলে নিশ্চিত পাথরের মনও গলে যাবে। সেখানে ওই মেজরটাই শুধু ব্যতিক্রম আচরণ করছে। নিকিতা ভেবে পায় না, এতো লক্ষী একটা মেয়েকে কেউ কিভাবে অপছন্দ করতে পারে? ভাবতে ভাবতে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো নিকিতা। রাগ জেদ একপাশে ফেলে আবারও মায়ার মুখোমুখি হয়ে বসলো। ক্রন্দনরত মায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে নিচু কন্ঠে বললো,
—“বাড়ি যে ছাড়লি। কিছু ভেবে ছেড়েছিস?”
—“না। কিচ্ছু ভাবিনি। শুধু এটুকু ভেবেছি, এই জোরপূর্বক সম্পর্কে ওনাকে আর বেঁধে রাখবো না। কারো ঘৃণা নিয়ে আগাছার মতো ওই বাড়িতেও পড়ে থাকবো না। ওনাকে আজীবনের জন্য মুক্ত করে দিয়ে চলে এসেছি।”
—“তাহলে এখন কি করবি?”
—“আপাতত থাকার জন্য একটা জায়গা ঠিক করবো। তোর কাছে কিছুদিন থাকতে দিবি নিকি?”
নিকিতা হতাশ হলো এবার। মুহুর্তেই মায়াকে দেয়ার মতো কোনো জবাব খুঁজে পেলো না। পাশ থেকে রুমি হঠাৎ বলে উঠলো,
—“কিন্তু আমরা তো এখান থেকে চলে যাবো মায়া। পরিক্ষা তো শেষ। হাতে লম্বা ছুটি আছে। রেজাল্ট আউট হওয়ার পর ভার্সিটিতে ভর্তি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি। এতোদিন তো আর হোস্টেলে থাকা সম্ভব নয়। তাছাড়া, আমরা আজই সন্ধ্যায় রওনা হবো। টিকিট কাটাও হয়ে গেছে।”
মায়ার চেহারায় এবার আমাবস্যার কালো আধার নামলো যেনো। মেয়েটার এখানে পরিচিত বলতে এই দুই বান্ধবী ছাড়া আর কেউ নেই। ওরাও দিনশেষে মায়াকে একা করে দিয়ে চলে যাচ্ছে। এজন্যই হয়তো বলে, অভাগী যেদিকে যায়, নদীও শুকিয়ে যায়। এবার মায়ার ঠাঁই হবে কোথায়? চিন্তিত মায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে নিকিতা বলল,
—“কি কি নিয়ে বের হয়েছিস বাড়ি থেকে? মানে, টাকা পয়সা কিছু এনেছিস?”
মায়া ডানে বামে মাথা নাড়লো। নিকিতার হতাশা এবার চূড়ান্ত সীমা ছুঁয়ে নিলো। হতাশ সুরে বললো,
—“কোনো কাজ করেছিস এটা? টাকা পয়সা হাতে নেই তোর। পড়নের একসেট জামাও সঙ্গে করে আনিসনি। সাবলেট ভাড়া করে থাকতে গেলেও দুই মাসের ভাড়া হাতে নিয়ে উঠতে হবে সেখানে। তার ওপর তোর খাওয়া, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। মাত্র উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিলাম আমরা তিনজন। রেজাল্টও বের হয়নি। এই মুহুর্তে তুই কোনো চাকরিও পাবি না। তাহলে চলবি কিভাবে? এই ঢাকার বুকে বাঁচতে হলে টাকা চাই মায়া। সিকিউরিটির কথা নাহয় বাদই দিলাম।”
একদমে কথাগুলো বলে থামলো নিকিতা। ওর কথাগুলো মায়ার দুশ্চিন্তা হাজার গুণ বাড়িয়ে দিলো। সত্যিই তো। আবেগের বশে মায়া বাড়ি তো ছাড়লো। অভিমান থেকে তাসরিফকে মুক্তিও দিয়ে দিলো। বিয়ে নাম সম্পর্কের অদৃশ্য বন্ধন ছিন্ন করে একলা চলার পথ বেছে নিলো। কিন্তু এই লম্বা পথ একা পাড়ি দেবে কিভাবে সেটা তো ভাবলো না। এই দুনিয়াতে ওর বাবা মা নেই। আত্মীয় স্বজন থেকেও নেই। এখন স্বামী নামক ছায়াটাও মাথার ওপর থেকে সরে গেলো। এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় মেয়েটা একা একা বাঁচবে কিভাবে? আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা কালো হাতগুলো থেকে নিজেকে রক্ষা করবে কিভাবে? কারো সাহায্য ছাড়া নতুন করে জীবন শুরুই বা করবে কিভাবে? ভাবতে ভাবতে চোখ ভরে এলো মায়ার। নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধা দন্দ মস্তিষ্ক শূন্য করে দিলো। মায়ার চিন্তার মাঝেই নিকিতা আবারও বলে উঠলো,
—“এখন ভেবে চিন্তে বল কি করবি? ফিরে যাবি শ্বশুর বাড়ি?”
—“কক্ষনো না। ওই বাড়িতে আর কোনোদিন ফিরবো না আমি। আর না মেজর সাহেবের জীবনে দ্বিতীয়বার অধিকার ফলাতে যাবো। ওই মানুষটা ঘৃণা করে আমাকে। এই জোরপূর্বক সম্পর্কটা গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওনার। ঘৃণা নিয়ে আর যাই হোক, সংসার করা যায় না নিকি। আজ আমার বাবা বেঁচে থাকলে কি আমাকে এতো অবহেলা সহ্য করে থাকতে দিতো ওখানে? কখনোই দিতো না। আমি আর ওনার কাছে ফিরতে চাই না। আমি নতুন করে জীবন সাজাতে চাই। নিজের মতো মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে বাঁচতে চাই। ওনার জীবনে একটা অযাচিত পরগাছা হয়ে থাকতে চাই না।”
একদমে কথাগুলো বলে থামলো মায়া। মেয়েটা অত্যন্ত শান্ত শিষ্ট হলেও আজ কথায় কেমন যেনো তলোয়ারের মতো ধার ছিলো। কথার ভাঁজে ছিলো আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচার একবুক ইচ্ছা। নিকিতা চুপচাপ কিছুক্ষণ ভাবলো। এরপর হুট করেই বলে উঠলো,
—“আমার সাথে যাবি মায়া?”
—“কোথায়?”
—“আমার বাড়ি?”
—“মানে, চট্টগ্রাম?”
—“হ্যা। তোর একটা ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তুই আমার কাছেই থাকবি। আমি বাড়িতে সবাইকে ম্যানেজ করে নেবো। যাবি আমার সাথে?”
এই পর্যায়ে কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেলো মায়া। ছোটো থেকে বড় হয়েছে গ্রামে নিজের বাড়িতে। যেটা মায়ার জন্য সবচেয়ে শান্তির জায়গা ছিলো। এরপর কপাল দোষে বাবা মা দুজন একসাথে মারা গেলো। চাচাদের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পড়ে মেয়েটাকে আপন বাড়ি ছাড়তে হলো। তামিম আহমেদের বদৌলতে ঠাই মিললো ঢাকা শহরে। এখন এই শহর ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে হবে? নিজেকে কেমন যেনো পরগাছা মনে হলো মায়ার। মেয়েটার হয়তো জন্মই হয়েছে অন্যের কাঁধে ভর করে বাঁচর জন্য। নাহলে এতো এতো প্রতিকূলতা তার জীবনে কেনো?
এদিকে মায়াকে চুপ থাকতে দেখে অধৈর্য্যে হয়ে গেলো নিকিতা। মায়ার বাহুতে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল,
—“কিছু বলছিস না যে? জলদি জলদি জবাব দে। হাতে সময় কম।”
বিপরীতে মায়া তৎক্ষনাৎ কোনো জবাব দিলো না। তবে, কিছু একটা বলার জন্য কেমন যেনো হাসফাস করছে মেয়েটা। বার কয়েক বলতে গিয়েও ঠোঁট চেপে ধরছে। বেশ খানিক্ষন চুপ থেকে ইতস্তত কন্ঠে মায়া বললো,
—“কিছু খেতে দিবি নিকিতা? খুব খুধা লেগেছে।”
কথাটা বলেই লজ্জায় মাথা নিচু করে নিলো মায়া। দুই হাতের তালু ডলতে ডলতে নিজের অস্বস্তির জানান দিলো।
এদিকে মায়ার কথাটা যেনো তীরের মতো বিঁধলো নিকিতার বুকে। মেয়েটার এমন দ্বিধাগ্রস্ত আবদার বড়ই লজ্জায় ফেললো নিকিতাকে। কথার তালে পড়ে মেয়েটার শুকনো মুখের দিকে খেয়ালই করেনি সে। মানুষ ঠিক কোন পর্যায়ে গেলে কারোর কাছে খাবার চেয়ে আবদার করে সেটা কি আর মুখে বলে বোঝাতে হবে? নিকিতা তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়ালো। দ্রুত কদম চালালো কিছু খাবার আনতে। কয়েক কদম গিয়েও থেমে গেলো। পেছন ফিরে আঙ্গুল তুলে বলল,
—“নির্যাতন, অত্যাচারের বাইরেও লোকটা খেতে পর্যন্ত দেয়নি তোকে। মানে, শারিরীক, মানসিক কোনো অত্যাচারই বাদ রাখেনি নির্দয় বিবেকহীন লোকটা। আই স্যোয়ার মায়া, সুযোগ পেলে এই লোকের চাকরি খেয়ে দেবো আমি।”
চলবে?
(পড়া শেষে সবাই লাইক কমেন্ট করবেন প্লিজ। গল্পের মূল কাহিনি আর কয়েক পর্ব থেকে শুরু হবে।)
Share On:
TAGS: সুতোয় বাঁধা জীবন, সোনালিকা আইজা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ১
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ২
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ৩
-
সুতোয় বাঁধা জীবন গল্পের লিংক
-
সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ২
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ৫
-
এক টুকরো মেঘ গল্পের লিংক
-
এক টুকরো মেঘ পর্ব ৪
-
সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ১