Golpo romantic golpo সুতোয় বাঁধা জীবন

সুতোয় বাঁধা জীবন পর্ব ১


রাতে একপ্রকার আবেগের বশবর্তী হয়েই তাসরিফের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলো মায়া। গা পোড়ানো জ্বরে তখন অর্ধ জ্ঞানে ছিলো তাসরিফ। বাইরে বইছিলাম উথাল-পাতাল কালবৈশাখী ঝড়। গভীর রাতে সেই ঝড়বৃষ্টির মাঝেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত মিলন সুরে হারিয়ে গেছিলো দুটি স্বত্বা। আবেগঘন সেই চূড়ান্ত সুখের মুহুর্ত পরক্ষণেই চুরমার হয়ে গেছিলো তাসরিফের আধো জ্ঞানে আওড়ানো ভাঙা ভাঙা বুলিতে। “আমি… এই সম্পর্ক… থেকে… মুক্তি চাই” ব্যাস একটা বাক্য। আধো স্বরে উচ্চারিত হওয়া এই একটা বাক্য ভেঙে চুরমার করে দিলো মায়ার কোমল হৃদয়। কিন্তু ততক্ষণে সবকিছু হাতের বাইরে চলে গেছে। অত্যাধিক আবেগের বশে মায়া নিজের সর্বস্ব হারিয়ে বসেছে স্বামী নামক মানুষটার কাছে। নিজেকে সম্পুর্ন রুপে সপে দিয়ে আজ নিঃস্ব সে। এখন বুক জুড়ে বইছে কেবল হাহাকার, আর চোখের কোণে অবাধ বর্ষন।

মেজর তাসরিফ আহমেদ। শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়িক তামিম আহমেদের একমাত্র ছেলে। ভালোবেসে ধোঁকা পেয়ে নারী জাতির প্রতি চরম বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছে তার মনে। বাকি জীবন সম্পুর্ন একা কাটানোর সিদ্ধান্তে অনড় ছিলো তাসরিফ। অথচ তার সিদ্ধান্তকে এক চুটকিতে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল তার মা। সদ্য মন ভাঙা ছেলেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে জোর পূর্বক মায়ার সাথে জুড়ে দিয়েছিল তার জীবন। যদিও বিয়েটা তাসরিফ মেনে নেয়নি। শহরের আধুনিক রীতি নীতিতে বেড়ে ওঠা ছেলে সে। তার ওপর সেনাবাহিনীর একজন হাই র‍্যাঙ্কের অফিসার। সেখানে মায়া নিতান্তই গ্রামের একটা এতিম মেয়ে। এমন একটা মেয়েকে কি নিজের পাশে কল্পনা করা যায়?

তাই বিয়ের আসরেই তাসরিফ কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলো, এই মেয়েকে সে কোনোদিন নিজের স্ত্রী রুপে স্বীকার করবে না। এর পরপরই সে চলে গেছিলো বাড়ি ছেড়ে নিজ গন্তব্যে। নিজের সদ্য বিয়ে করা বউয়ের মুখটা পর্যন্ত দেখেনি সেদিন। এরপর গুনে গুনে কেটে গেছে ছয়টা মাস। স্বামীর স্বীকৃতি বিহীন আগাছার মতো শ্বশুর বাড়িতে পড়ে আছে মায়া। যদিও শ্বশুর বাড়ির সকলেই তাকে পরিবারের সদস্যের জায়গায় বসিয়ে দিয়েছে। শুধু ঠাঁই মেলেনি নিজের স্বামীর জীবনে।

সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের ছয় মাস কেটে যাওয়ার পরেও যখন তাসরিফ বাড়ি ফিরছিলো না, তখন মিথ্যে অসুস্থতার বাহানা দিয়ে ছেলেকে টেনে এনেছেন সালেহা বেগম। এতে অন্তত কিছুটা সময় তো মায়ার সাথে কাটাক। হতে পারে, এই অল্প সময়েই ছেলের মন বদলে গেলো। তবে লাভের লাভ কিছুই হলো না। বরং মায়ের মিথ্যে ধরা পরায় রেগে আবারও ক্যান্টনমেন্টে ফিরতে চেয়েছিলাম তাসরিফ। তবে সেই মুহুর্তে বাঁধিয়ে বসলো গা কাঁপিয়ে জ্বর। এই জ্বরটাই যেনো তার জীবনে আকস্মিক পরিবর্তন নিয়ে এলো।

স্বামীর শত অবহেলার পরেও নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেনি মায়া। অসুস্থ স্বামীকে সেবা করার দরুন আজ রাতটা থেকে গেছে তাসরিফের ঘরেই। অত্যাধিক জ্বরে কাতর স্বামীর সেবা যত্নে কাটিয়ে দিয়েছে রাতের অর্ধ প্রহর। জ্বর তখন তাসরিফের মাথায় চড়ে গেছে। সেই জ্বরের রেশ ধরেই ঘোরের বশবর্তী হয়ে মায়াকে কাছে টেনে নিলো সে। শুরুতে মায়া সম্মতি না দিলেও তাসরিফের ব্যাকুলতা থমকে দিয়েছিল মায়ার শরীর। স্বামীর আহ্বান কোনোভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল তার নারী স্বত্বা। সম্পর্কটা তাসরিফ মৌখিক ভাবে না মানলেও, স্বামী স্ত্রী নামক অদৃশ্য এক সুতোর বন্ধনে বাঁধা পড়েছে দুজন। চাইলেই কি আর সেই সুতোর বন্ধন ছিঁড়ে ফেলা যায়? সেই সম্পর্কের টানেই মায়া সাড়া দিয়েছিলো তাসরিফের ডাকে। সপে দিয়েছিল নিজেকে স্বামী নামক মানুষটার কাছে। নিজের সর্বস্ব খুইয়ে শেষ পর্যায়ে হুঁশ ফিরলো মায়ার। তাসরিফ তাকে পছন্দ করে না। স্ত্রী হিসেবে কখনোই মেনে নেয়নি। এমনকি, আজ পর্যন্ত মায়ার মুখের দিকে তাকিয়েও দেখেনি তাসরিফ। অজ্ঞানে কাছে টানলেও, স্বজ্ঞানে তার চাওয়া এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি। এমন একটা ঠুনকো সম্পর্কের জেরে নিজের সর্বস্ব কিভাবে সপে দিলো মায়া?

ভাবনাটা মাথায় আসতেই দুচোখ বেয়ে গলগলিয়ে অশ্রু ঝড়ে পড়লো মায়ার। স্বামীর মন জয়ে অপারগতা সাপের মতো দংশন করছে তার শরীর জুড়ে। মনটা চুরচুর করে ভেঙে যাচ্ছে একাধারে। মন ভাঙার সেই ব্যথা, দেহের ব্যথার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি কষ্টদায়ক। যে মানুষটা তাকে স্ত্রী হিসেবে মানে না। যার মুখ দেখতেও ঘৃণাবোধ করে। তারই সাথে জ্বরের ঘোরে মিলিত হয়েছে জানতে পারলে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে সে? যদি মায়াকে লোভী ভাবে? সুযোগ সন্ধানী বলে বসে? তখন মায়া কি করবে? কোন মুখে দাঁড়াবে এই মানুষটার সামনে?

এক বুক শঙ্কা নিয়ে বিছানা ছাড়তে গিয়েও তাসরিফের বাহু বন্ধনে আটকা পড়লো মায়া। ঘাড় ঘুরিয়ে চাইলো একবার মানুষটার দিকে। আধো আধো চোখে তাকিয়ে আছে তাসরিফ। ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু একটা বিড়বিড় করছে সে। মনের কৌতুহল মেটাতে খানিকটা এগিয়ে গেলো মায়া। তৎক্ষনাৎ কর্ণকুহরে আঘাত করলো তাসরিফের অনুচ্চস্বরে আওড়ানো কিছু বাক্য,

—“আই হেইট ইউ মায়া। চিট করা হয়েছে আমার সাথে। গোল্ড ডিগ্গার তুমি। সম্পদের লোভে বিয়ে করেছো আমাকে তাই না? এই জোর জবরদস্তি সম্পর্ক আমি মানি না।”

এরপর আরও কিছু বললো হয়তো। তবে পরের অংশটুকু আর কান পর্যন্ত পৌঁছালো না মায়ার। ভাঙাচোরা মনের শেষ অংশটুকু নিয়ে বিছানা ছাড়লো সে। ফ্লোরে পড়ে থাকা নিজের জামা কাপড় গুলো কুড়িয়ে নিলো হাতে। কোনোমতে সেগুলো গায়ে জড়িয়ে চলে গেলো টেবিলের কাছে। কলমের আঁচড়ে কিছু একটা লিখে কাগজটা চারটে ভাঁজে ভাঁজ করে তাসরিফের বালিশের পাশে রাখলো। ঘোলাটে চোখে একবার ঘুমন্ত মানুষটার দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। এলোমেলো কদম জোড়া থামলো খোলা আকাশের নিচে।

বাইরে তখনও ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির তীব্রতায় দশ হাত দূরের কিছু দেখাও দুষ্কর। সেই তুমুল বর্ষনের বুক চিরে রাস্তার মাঝে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো মায়া। চোখ ফেটে কান্না বের হচ্ছে। তবে সেটা চোখের কোটর অতিক্রম করতেই বৃষ্টির সাথে মিশে অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে আচমকাই গলা ছেড়ে চিৎকার করে উঠলো মেয়েটা। চিৎকারের সেই সুরের সঙ্গে বেরিয়ে এলো এক অসহায় স্ত্রীর বুক ফাটা হাহাকার। জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার গল্প। নিজের সর্বস্ব খুইয়ে নিঃস্ব হওয়ার আর্তনাদ।

তাসরিফের ঘুম ভাঙলো একটু বেলা করেই। ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে আটের ঘরে পৌঁছেছে সবে। বাইরে তখন ঝলমলে রোদ। রাতে বৃষ্টির পর সকাল থেকেই ঝলমলে রোদ দেখা দিয়েছে। আড়মোড়া ভেঙে পিটপিট করে চাইলো তাসরিফ। জ্বর নেমে গেলেও মাথাটা ভিষণ ভারি হয়ে আছে। ভারি মাথাটা এক প্রকার টেনেই উঠে বসলো সে। মুহুর্তেই নিজেকে অর্ধনগ্ন অবস্থায় পেয়ে হকচকিয়ে গেলো। মস্তিষ্কে জোর দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো ঘটনা কি? তৎক্ষনাৎ, নজর জোড়া আটকে গেলো বিছানার চাদরে। পুরো চাদর জুড়ে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। এখানে আসলে কি ঘটেছে বুঝতে পেরে নিজের মাথাটা দুই হাতে চেপে ধরলো তাসরিফ। দৃষ্টিপটে ভেসে উঠলো গতরাতের কিছু আবছা স্মৃতি। তবে বহু চেষ্টা করেও মেয়েটার মুখটা সে স্বরন করতে পারলো না। পারবে কিভাবে? যে মেয়ের চেহারার দিকে কখনো চেয়েও দেখেনি, তার মুখ মনে রাখা কি সম্ভব? তবে চেহারা স্বরন না হলেও মেয়েটা কে, সেটা বুঝতে বিন্দু মাত্র বেগ পেতে হলো না তাসরিফের। ডান হাতের তর্জনী এবং বৃদ্ধাঙ্গুলের সাহায্যে চোখ দুটো চেপে ধরে বলে উঠলো,

—“মায়া! শিট! শিট! শিট!”

এক বুক অস্বস্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ালো তাসরিফ। রাগে পুরো শরীর রিরি করছে। তাসরিফ নিশ্চিত, ওর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে ইচ্ছে করে মেয়েটা ঘনিষ্ট হয়েছে। পুরোটাই ওকে ফাঁসানোর ধান্দা। এই ধৃষ্টতার জন্য মায়াকে সে কোনোদিন ক্ষমা করবে না। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মায়ার তালাশে ঘরের চারিদিকে নজর বুলালো। তবে ঘরের কোনো কোণে মায়ার অস্তিত্বের সন্ধান না পেলেও নজর আটকালো বালিশের কাছে রাখা একটা চিরকুটে। কৌতুহল বসত চিরকুটটা তুলে মেলে ধরলো তাসরিফ। এরপর নিঃশব্দে পড়তে শুরু করলো,

“মেজর সাহেব! প্রচন্ড ঘৃণা করেন আমাকে তাই না? আমার চেহারাও আপনার দেখতে ইচ্ছে করে না। এতো ঘৃণার মাঝেও ইচ্ছাকৃত ভাবে একটা ভুল কাজ করে ফেললাম যে। আপনি জ্ঞানে না থাকলেও, আমি তো জ্ঞানে ছিলাম। সজ্ঞানে থেকেও আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। নিজেকে সপে দিলাম আপনার কাছে। অপরাধ না করেও অপরাধী হয়ে গেলাম। পাপ না করেও পাপী আমি। এখন নিশ্চয়ই আপনি আমাকে আরও বেশি ঘৃণা করবেন। মাত্রাতিরিক্ত ঘৃণা। আপনার এতো ঘৃণা নিয়ে আমি থাকবো কিভাবে? সম্ভব নয় তো থাকা। তাই, নিজের না করা পাপের প্রাশ্চিত্ব স্বরুপ আপনাকে মুক্ত করে দিলাম। এই সুতোয় বাঁধা জীবন এবং জোরপূর্বক সম্পর্ক থেকে মুক্তি দিলাম। আজ থেকে আপনি মুক্ত। নিজের পছন্দ মতো একটা মেয়েকে বিয়ে করে জীবন সাজিয়ে নেবেন। আমার মুখ আর কোনোদিন দেখতে হবে না। ভালো থাকবেন। সুখে থাকবেন। নিজের খেয়াল রাখবেন।”

চিঠিটা পড়ে পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেলো তাসরিফ। ব্যর্থ ভঙ্গিতে ধপ করে বসে পড়লো খাটের ওপর। এতোদিন সে মেয়েটার প্রতি একটা ভুল ধারণা মনে পুষে রেখেছিল। মেয়েটাকে সে লোভী ভেবে সবসময় অবহেলা করে এসেছে। অথচ আজ, তাসরিফ বুঝতে পারছে তার ধারণা পুরোটাই ভুল। মেয়েটা আর যাই হোক কিন্তু লোভী নয়। নিজের ভুল বুঝতে পেরে নজর ঝুঁকে গেলো তাসরিফের। তৎক্ষনাৎ টুংটাং শব্দে তার ফোনে একটা ম্যসেজ আসলো,

“মেজর! আপনার জন্য কি গাড়ি পাঠাবো?”

গতকাল ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যাওয়ার জন্য নিজের টিমের কাছে বার্তা পাঠিয়েছিল তাসরিফ। সেই সুত্র ধরেই তারা নিশ্চিত হতে চাইছে তাদের মেজর দুই দিনের মাথায় আদৌ ফিরবে কি না। ম্যাসেজটা দেখেও তৎক্ষনাৎ কোনো জবাব দিতে পারলো না তাসরিফ। তার আঠাশ বছরের জীবনে এই প্রথম নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। অজ্ঞানে করে ফেলা এই মারাত্মক ভুলটা এবার কিভাবে সংশোধন করবে সে……?

চলবে?

সুতোয়বাঁধাজীবন

সূচনা_পর্ব

কলমেসোনালিকাআইজা

[ গল্পটার বেশ কিছু পর্ব বহুদিন ধরে নোটপ্যাডের এক কোণে পড়ে ছিলো। তাই ভাবলাম শেয়ার করি সবার মাঝে। ভালো রেসপন্স দেখলে কন্টিনিউ করবো। আপনাদের আগ্রহ কম থাকলে থামিয়ে দেবো।]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply