Golpo romantic golpo সীমান্তরেখা

সীমান্তরেখা পর্ব ২৫


সীমান্তরেখা পর্ব ২৫

লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক

পর্ব_২৫

[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]

মেজবাহ’র বাইকের ওপরে গুটিসুটি মেরে বসে আছে আকসা। মেজবাহ ওর সামনে দাঁড়ানো। প্যান্টের পকেটে একহাত, অপর হাতে ফোন কানে। কারো সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। মুখের হাবভাব ভালো নয়। কপালের শিরা-উপশিরা ফুলে আছে। যেমনটা হয়ে থাকে সাধারণত খুব বেশি মাত্রায় রেগে থাকলে।

আকসা কিছু বলছে না। কাতর চাহনিতে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। শুনছে ওর ফোনের ওপাশের ব্যক্তিকে বলা কথাগুলো। মেজবাহ বলছে, “হ্যাঁ, আমি নিয়াজ আংকেলের কথা-ই বলছিলাম। ওসি নিয়াজ মোর্শেদ। তার নাম্বারটা আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে দিয়ে রাখিস দোস্ত। ওকে থ্যাংকস। এখন রাখছি। পরে এই বিষয় নিয়ে কথা বলবো।”

কথা শেষ করে ফোনটা পকেটে রেখে এবার আকসার ভীত-সন্ত্রস্ত মুখটার দিকে তাকালো মেজবাহ। আকসা এতোক্ষণ চাতক পাখির ন্যায় ওর দিকে তাকিয়ে ছিল৷ এবার ও তাকাতেই শুকনো গলায় ঢোক গিলে বললো, “মেজবাহ আমি আস…”

“চুপ।”

“মেজবাহ..”

“চুপ। একদম চুপ।”

“বলছিলাম যে…”

“বললাম না চুপ করতে! বাংলা ভাষা বুঝো না? ইংরেজিতে বলবো? নাকি উর্দুতে?”

আকসা ঠোঁট চেপে চুপ হয়ে কাতর চোখদু’টো মেজবাহ’র মুখের ওপরে বিচরণ করতে লাগলো। মুখ একদম শুকিয়ে গেছে ওর। ভেতরকার ভয় চোখে-মুখে স্পষ্ট প্রতিফলিত। বিষাদ ছেয়ে গেছে মুখে। মেজবাহ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে এবার চোয়াল শক্ত রেখেই বললো, “তুমি যে জেদ দেখিয়ে আজ এভাবে নিজের একটা ক্ষতি করে বসছিলে, এর ফলাফল কী হতে পারতো ধারণা আছে কোনো? ডু ইউ হ্যাভ এ্যনি সেন্স? আন্সার মি ইডিয়ট!”

আকসার চোখ কেঁপে ওঠে। সাথে সাথে মুখ নুইয়ে ফেলে ও। মেজবাহ এবার কিছুটা নরম সুরে বলে, “অতিরিক্ত জেদ কখনোই ভালো না। ইট উইল ডেসট্রয় ইউ ইন সাচ আ ওয়্যে দ্যাট ইউ ওয়োন্ট ইভেন বি এবল টু স্ট্যান্ড আপ এগেইন। তুমি জেদ বাসার মধ্যে দেখাতে পারো, জেদ ধরে যা খুশি করতে পারো; আই ওন্ট স্যে অ্যা ওয়ার্ড। বাট, ফারদার রাস্তাঘাটে, এমন নির্জন এরিয়ায় আমার সাথে জেদ দেখাতে আসবে না। এবার নাহয় ফরচুনেটলি আমি চলে না গিয়ে ফিরে এসেছি। কিন্তু পরেরবার? তারপর? প্রতিবার কে এভাবে ওই হারামির বাচ্চাদের হাত থেকে বাঁচাবে তোমাকে? প্রতিবার বাঁচানোর জন্য আমি থাকবো? হু? আজ যদি আমি না থাকতাম, তাহলে তোমার সাথে কী হতো ভেবে দেখেছো? ডু ইউ হ্যাভ এ্যনি আইডিয়া? ওই জানোয়ারগুলো তোমাকে ছিঁড়ে খেতো! ওরা কি ভালো ফ্যামিলির ছেলেপেলে? অমানুষের বাচ্চা ওরা। নর্দমার কীট! তোমাকে মেরে ফেলতেও হেজিটেট ফিল করতো না ওরা!”

আকসা মেজবাহ’র বলা কথাগুলো কল্পনা করেই কেঁপে উঠলো। সত্যিই তো! আজ যদি মেজবাহ ফিরে না আসতো, তাহলে ওর কী হতো? আজ তো ওর সম্ভ্রম চলে যেতে পারতো! এরপর..এরপর কী হতো? আকসা তো বেঁচে থেকেও মরে যেত! বোধহয় ওকে শেষ পর্যন্ত আত্মহ..নাহ! আর ভাবতে পারে না আকসা। মাথা চক্কর দেয় ওর৷ বাইক থেকে পরে যাওয়ার মতো অবস্থা হতেই সামনে দাঁড়ানো মেজবাহ’র হাতের বাহু চেপে ধরে নিজেকে সামলে নেয়৷ মেজবাহ ওর পিঠে একহাত রেখে শক্তভাবে ধরে রাখলো ওকে।

ওরা তখন সেই নির্জন রাস্তা থেকে কিছুটা সামনে একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। এদিকে জনমানব নেই বললেই চলে। দু’জন এখানে রয়েছে মিনিট দশেক হবে। আকসার শাড়ির আঁচলটা কোনোরকমে বুকে জড়ানো ছিল। মেজবাহ সেটাপেছন থেকে টেনে নিয়ে ভালোভাবে ওর গায়ে জড়িয়ে দিলো৷ এরপর বাইকে উঠে ওর হাত টেনে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ধরে বাইক স্টার্ট দিলো। পেছনে আকসার উদ্দেশ্যে বললো, “বাসায় পৌঁছানোর আগে চোখের পানি মুছে নাও। এই চোখে যেন আর পানি না দেখি আমি।”

শেষোক্ত কথাটায় ঠান্ডা মাথায় দেওয়া হুমকি। আকসা স্পষ্ট টের পেল। দ্রুত চোখের জল মুছে নিয়ে সামনে মেজবাহ’র বুকে হাত জড়িয়ে ধরে রাখলো।
.
.

“আমি আপনাকে কখন ট্যুরে যাওয়ার কথা বললাম আফসান?”

আফসান বিছানার ওপরে বসে ল্যাপটপে অফিসের পেন্ডিং কাজগুলো সারছিল। তখন জেমি ঘরে এসে সরাসরি প্রশ্নটা করতেই ও ল্যাপটপ থেকে একপল মুখ তুলে পুনরায় কাজে মনোনিবেশ করলো। আফসানের তরফ হতে কোনো জবাব না পেয়ে জেমির মেজাজটা তরতরিয়ে আরো বাড়লো বৈ কমলো না৷ ও এবার দূরত্ব মিটিয়ে কয়েক কদম এগিয়ে আফসানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পুনরায় বললো, “কী হলো? জবাব দিচ্ছেন না কেন? আমি কখন বলেছি ট্যুরের কথা?”

আফসান তবুও যেন শুনতে পায়নি ওর কথা। একেবারেই প্রতিক্রিয়াহীনভাবে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙুল চালিয়ে যাচ্ছে। জেমি স্বভাবগত সাধারণভাবে বড়ই অধৈর্য। তারওপর আফসানের সাথে ক’দিন যাবত একটা রেষারেষি চলছে। এবেলায় আবারও জবাব না পেয়ে ও এবার একটা ভয়ঙ্কর কাজ করে বসলো। নত হয়ে টেনে ধরলো আফসানের শার্টের কলার। এতক্ষণ প্রতিক্রিয়াহীন কাজে মনোযোগী আফসান এবার চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো জেমির দিকে। সেই রক্তিম ভয়ঙ্কর চাহনি দেখে জেমির ভয় পাওয়ার কথা। তবে আফসোসের বিষয় হলো, ও মোটেই ভয় পেল না আফসানকে। এতোবছরের সংসার জীবনে ভয় জিনিসটা কয়েক শতাংশ উবে গেছে ওর মধ্য থেকে। ও একইরকম জোরের সাথে শার্টের কলার চেপে ধরে রেখেছে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে আফসানের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। আফসান শান্তস্বরে গম্ভীর গলায় বললো, “কলার থেকে হাত সরাও।”

“সরাবো না। আগে আমার প্রশ্নের জবাব দিবেন।”

“এখন আমার এতো ইউজলেস টাইম হয়ে যায়নি যে, তোমার এসব আজেবাজে প্রশ্নের জবাব দেবো।”

“আজেবাজে প্রশ্ন? আপনি যখন আমার নাম নিয়ে এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন মনে ছিল না আপনার ভাষ্যমতে এই আজেবাজে প্রশ্ন আসতে পারে?”

“ট্যুরের ডিসিশন নিয়ে তোমার কীসের এতো প্রবলেম? এখন আমার মাথা খারাপ কোরো না৷ চুপচাপ যেয়ে ঘুমাও।”

“মাথা খারাপ তো আপনি করে ছেড়েছেন আমার৷ প্রথমে ভালোবাসা দিয়ে মাথায় তুলে এরপর পায়ে ঠেলতেও দ্বিধা করেন না। আপনাদের মতো লোকেরা বউ-ই ডিজার্ভ করে না। যাবো না আমি আপনার সাথে ট্যুরে!”

জেমির মুখ বন্ধ হওয়া মাত্র আফসান ওকে একটানে বিছানার ওপরে ফেলে ওকে চেপে ধরে বললো, “ট্যুরে তোমাকে আমার সাথেই যেতে হবে, আমার সাথেই থাকতে হবে। কথাটা মেনে নিলেই তোমার জন্য ভালো।”

“আপনার সাথে থাকবো না আমি। আপনাদের মতো লোকেরা বউ বলতে শুধু তার শরীর চেনেন। যখন শরীরের চাহিদা মিটে যায়, তখন বউয়ের গুরুত্বও শেষ আপনাদের কাছে। সব শরীর-লোভী!”

কথাটা বলামাত্র জেমিকে শক্ত করে বিছানার সাথে চেপে ধরলো আফসান। চোয়াল শক্ত করে বললো, “কী চিনি? সাহস থাকলে আরেকবার বলো!”

“শরীর চেনেন, শরীর চেনেন, শরীর চেনেন! তিনবার বললাম। এনার্জি থাকলে আরো সাতানব্বই বার বলতাম। আপনি কী মনে করেন? আপনাকে ভয় পাই আমি?”

“শরীর চিনি তাই না? শরীরের প্রয়োজন হলে বাইরে যেতাম, যেখানে কাপুরুষেরা যায়। আমি অমন পুরুষ নই যে, শরীরের জন্য এখানে-ওখানে যাওয়া লাগবে। আরো যদি শরীরের দরকার হতো, তাহলে আরো কয়েকটা বিয়ে করতাম। করেছি? করিনি। শরীর-লোভী আমি তাই-না? আজকের পর থেকে তোমাকে ছোঁয়া তো দূর, তোমার ছায়াও মাড়াবো না৷ তারপর বলতে এসো, শরীরের চাহিদার জন্য আসি। তখন ছাড় দেবো না!”

জেমির চেপে ধরে রাখা বাহু ছেড়ে উঠে আসলো আফসান। তখন ঘরের বাইরে থেকে আয়ান খেলনা গাড়ি হাতে নিয়ে খেলতে খেলতে ছুটে এসেছে ভেতরে। ছেলেকে দেখে আফসানের রাগান্বিত চেহারা স্বাভাবিক-শান্ত হলো। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। আয়ান মায়ের চাইতে বাপ-ভক্ত বেশি। ছুটে আসতেই ওর পাপা ওকে কোলে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে রেখে বিছানার অপর পাশে এসে বসলো। জেমি বিপরীত পাশে পা ঝুলিয়ে অসহায় মুখ করে বসে ছিল। আয়ানকে নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই আফসান ওর হাত টেনে সরিয়ে দিয়ে বললো, “আমার ছেলেকে আমার কাছে থাকতে দাও একটু। সারাক্ষণ তোমার সাথে রেখে নিজের মতো ম্যানারলেস বানিয়ে ফেলো না। তোমাকে তো ম্যানারস শেখাতে পারিনি, অন্তত ওকে শেখাই। বাচ্চাদের ছোট থেকে সঙ্গ ভালো হওয়াটা জরুরি।”

কড়া জবাবটা পেয়ে জেমি এবার আর তর্ক না করে নিজের বালিশে মাথা রেখে উল্টোদিকে শুয়ে গজগজ করতে লাগলো।
.
.
আকসার আজ রাতে ধুমিয়ে জ্বর এলো। এই অসময়ে জ্বর আসার কারণ বোধহয় সন্ধ্যার সেই ভয়াবহ ঘটনাটাই। বাপের বাড়ি আর যাওয়া হয়নি ওর। মেজবাহ ওকে নিয়ে সোজা নিজেদের বাসায় চলে এসেছে। রাতে ওর পরিবারের সকলে ফিরে এসে আকসাকে দেখে জিজ্ঞাসা করেছিল, ও বাপেরবাড়ি যায়নি কেন?
মেজবাহ স্বাভাবিকভাবে কথা ঘুরিয়ে নিয়েছে একটা অজুহাত দিয়ে।

আকসা কম্বল মুড়ি দিয়ে শীতে কাঁপছে। ফ্যান চলছে লো ভলিউমে। একবার ফ্যান বন্ধ করেছিল ও। তবে বন্ধ করলে আবার অসহ্য গরমে শরীরে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। একটা ঠান্ডা-গরম আবহ দেয়। জ্বরের ঘোরে সবকিছু তিক্ত-বিষাক্ত ঠেকছে ওর। সন্ধ্যার সেই কুৎসিত ঘটনা মানসপটে বারবার ভেসে উঠতেই দ্বিগুণ কেঁপে ওঠে শরীর।
মেজবাহ সবে একটা লম্বা শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে। মাথা মুছতে মুছতে প্রথমেই ওর চোখ গেল বিছানার দিকে। শীত প্রায় শেষ। এসময়ে কেউ কম্বল ব্যবহার করে না৷ আকসাকেও কম্বল নিতে দেখেনি ক’দিন। হঠাৎ এভাবে কম্বল মুড়ি দিয়ে কিম্ভূতকিমাকার হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে একটু অবাকই হলো। তোয়ালেটা রেখে ধীর পায়ে হেঁটে বিছানার কাছে এগিয়ে যেতেই আকসার বিরবির করে কথা বলার শব্দ কানে আসলো ওর। ভ্রু দ্বিগুণ কুঁচকে গেল। এগিয়ে ওর পাশে বসতেই শুনতে পেল, আকসা জড়ানো গলায় বললো, “প্লিজ, ছাড়ুন আমাকে। আমার মানসম্মান.. ”

মেজবাহ’র হৃদয়ে এই প্রথমবার বোধ করি কিছু দ্বারা আঘাত করা হলো যেন। ও কম্বল সরিয়ে আকসার খোলা বাহুতে হাত রাখতেই চমকে উঠলো। ওর শরীর অতিরিক্ত গরম! চোখ শক্ত করে বুঁজে রেখে নানার আবোলতাবোল বকছে। ঠোঁট নড়ছে ধীরে। মেজবাহ মেডিসিন বক্স আনার জন্য উঠতে যাবে, তখনই আকসা ওর হাতের বাহু টেনে ধরলো ঘোরের মাঝে। মেজবাহ ঘাড় ঘুরিয়ে ওর মুখটা দেখে দাঁড়িয়ে গেল। কিছুটা ঝুঁকে ওর কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো, “হাতটা ছাড়ো। জ্বর এসেছে তোমার। মেডিসিন খাওয়াতে হবে এখন। তাহলে রাতের মধ্যেই জ্বর নেমে যাবে।”

আকসা হাত ছাড়লো না। মেজবাহ জোরপূর্বক সরার চেষ্টা করতেই ও এবার জ্বরের ঘোরে উঠে বসে মেজবাহকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। ডুকরে কেঁদে উঠে কান্নারত স্বরে বললো, “আমাকে ছেড়ে যাবেন না প্লিজ ওরা আমাকে..টেনে নিয়ে…”

আকসার কথা জড়িয়ে গেল। মেজবাহ কয়েক মুহূর্ত পাথরের মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো৷ এরপর আকসার মাথা নিজের পেটানো পেটের সাথে আলতোভাবে চেপে ধরে রেখে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, “কিছু হয়নি আকসা। তোমার হাসবেন্ড এখনো বেঁচে আছে৷ সে থাকতে তোমার কিছু হতে দেবে না।”

চলবে


পরব রিচেক করে দিচ্ছি। এই পর্বে ৭k রিয়্যাক্ট হলে আগামীকালও একটা পর্ব দিবো ইন শা আল্লাহ।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply