সীমান্তরেখা পর্ব ২১
লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক
পর্ব_২১
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]
মেজবাহকে আটকাতে পারলো না আকসা। অনেক চেষ্টা করেও আটকানো গেল না। বোধহয় নিতান্তই ভদ্রতার খাতিরে লোকটা আকসার মায়ের তাড়াহুড়োয় বানানো পায়েস খেয়ে দেরি হওয়ার অজুহাত দিয়ে বেরিয়ে গেল। আকসা দরজার কাছে অসহায় মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল পুরোটা সময়। কিন্তু মেজবাহ ওর দিকে একবারের জন্য ঘুরেও তাকালো না।
মেজবাহ বেরিয়ে যেতেই আয়েশা বেগম পায়েসের বোলটা টেবিলের ওপরে রেখে দরজার পাশে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা আকসার কাছে এগিয়ে এসে চিন্তিতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, “মেজবাহ’র সাথে কি তোমার কিছু হয়েছে?”
“না তো আম্মু!”
আকসা একেবারে নিরীহ মুখ করে জবাবটা দিলো। আয়েশা বেগম রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়ে বিরবির করলেন, “হঠাৎ এভাবে চলে গেল কেন! আমাদের কোনো কাজে অসন্তুষ্ট হলো নাকি!”
আকসা মায়ের কথা শুনেও কিছু বললো না৷ ওর আম্মু প্রস্থান করতেই ও ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে দরজা আঁটকে দিলো। দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। আকসা এবার এগিয়ে গিয়ে ফোনটা তুলে এনে সরাসরি সাইফুল ভাইয়াকে কল দিলো। সাইফুল কল রিসিভ করতেই ও ফোনের এপাশ থেকে তেঁতে উঠে বললো, “আপনাদের দু’জনকে মিলিয়ে দেওয়ার চক্করে আমার সংসার ভাঙতে চললো ভাইয়া। আমি আপনার সাথে কথা বলেছি— এটা আমার হাসবেন্ড শুনে ফেলেছে। আর উনি আমাকে ভুল বুঝেছেন। এখন আমি কি করবো বলুন!”
সাইফুল ছেলেটা একটু পাগলাটে স্বভাবের। তবে মনের দিক থেকে খুব ভালো। আকসার কথা শোনামাত্র-ই ও ফোনের এপাশ থেকে হাহাকার করে বলে উঠলো, “বলো কি ছোট আপু! এজন্যই আমি চাইনি, আমার সাথে তোমার যোগাযোগ আছে— একথা কেউ জানুক। আগে জানালেও তোমাকে ভুল বুঝতো। কেউই বাইরের ছেলের সাথে তার বউয়ের কথা বলা মেনে নেবে না। সে যেকোনো পরিস্থিতিতে হোক। কলির সাথে যোগাযোগ করা হয়ে গেলে আমি এমনিতেই তোমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিতাম। কারণ আমি চাইনি, আমার জন্য কারো জীবনে সমস্যা হোক। এমনিতেই তোমাকে কত জ্বালাই আপু। কিন্তু যা চাইনি সেটাই হলো! তুমি এক কাজ করো। ভাইয়ার নাম্বার আমাকে দাও। আমি উনাকে বুঝিয়ে বলবো। আমার জন্য তোমাদের সংসার ভাঙবে না। তাহলে আমি কোনোদিনও নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না।”
“থাক ভাইয়া। আমার ব্যাপারটা আমি দেখবো। আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। কলির সাথে আপনার দেখা করার ব্যবস্থা তো করেই দিয়েছি। আগামীকাল অথবা পরশু বি-ক্যাফেতে যাবে ও। আপনি ওর সাথে দেখা করতে যাবেন, কনভিন্স করবেন। সেদিকে ফোকাস করুন।”
“কিন্তু ছোট আপু তোমার ঝামেলাটা…”
“আমি মিটিয়ে নিবো ভাইয়া। রাখছি এখন। আল্লাহ হাফেজ।”
আকসা আর কথা বাড়ালো না। কল কেটে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। হঠাৎ আকসার কিছু একটা মনে পরতেই ফাইল ম্যানেজারে প্রবেশ করলো দ্রুত। একটু ঘাটতেই কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা পেয়ে গেল আকসা। ওর ফোনের রেকর্ডারে সকল ফোনকল রেকর্ড হয়ে থাকে। জীবনে এই একটা অন্যতম চমৎকার কাজ করেছে বলে নিজেকে নিজে বাহবা দিলো আকসা।
মেজবাহ ওর কথাগুলো বোধহয় পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি। অথবা এমনও হতে পারে, আকসার কথাগুলো বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। অবশ্য না হওয়ার-ই কথা। কেউই বিশ্বাস করবে না। তবে মেজবাহ’র মুখ দিকে কিছু বোঝা যায়নি। চোখে-মুখে বরাবরের মতোই সেই ভদ্রতাসূচক দাম্ভিকতা। আকসার চোখ এড়ায়নি সেটা।
আকসা সাইফুল ভাইয়ার সাথে বলা ফোনকলের সব রেকর্ডগুলো খুঁজে খুঁজে একত্রিত করে আলাদা একটা ফাইলে সেভ করে রাখলো। এরপর হোয়াটসঅ্যাপে প্রবেশ করে মেজবাহ’র ইনবক্সে প্রবেশ করলো। ‘মেজবাহ ইফতেখার’ নামক আইডির প্রোফাইল ফটো এখনো দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ সাত মিনিট আগে অ্যাক্টিভ ছিল হোয়াটসঅ্যাপে। তারমানে আকসাকে এখনো অবধি ব্লক করা হয়নি। আকসা দ্রুত হাতে টাইপিং করে মেজবাহকে টেক্সট করলো— “আছেন?”
.
.
আফসান শিকদার চেয়ারে বসে আছে মুখে আঙুল ঠেকিয়ে। মুখটা বেশ গম্ভীর হয়ে আছে। জেমি বিছানার ওপরে বসা। ওড়না কাঁধের ওপর থেকে সরে একপাশে ঝুলছে। অর্ধেকাংশ ফ্লোরের ওপরে পড়ে রয়েছে। জেমি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে আফসানের দিকে। আয়ান ফ্লোরের ওপর ওর বাবার আজ ওর জন্য নিয়ে আসা নতুন খেলনা নিয়ে খেলছে। ওর মনোযোগ সেদিকেই। বাবা-মা’র মধ্যকার মনোমালিন্য বুঝতে পারছে না বাচ্চাটা। জেমি হঠাৎ রা স্বরে বলে উঠলো, “আপনার সমস্যা কী আফসান? সব দায়িত্ব আমার একার? আপনার কোনো দায়িত্ব নেই?”
“হোয়াট ডু ইউ মিন?”
আফসান গম্ভীর মুখের ওপর থেকে হাতটা সরিয়ে শান্ত স্বরে পাল্টা প্রশ্ন করতেই জেমি এবার উঠে আসলো বিছানার ওপর থেকে। সোজা এসে আফসানের সামনে দাঁড়িয়ে চড়া গলায় বললো, “বাবুকে দেখাশোনা করার দায়িত্ব কি শুধু আমার? আপনার কোনো দায়িত্ব নেই তাইনা? সব আমি একা হাতে করবো?”
“আমাকে বাহিরে বিজনেস সামলাতে হয় জেমি। আর তুমি ঘরে সামলাও। এটাই তো নিয়ম তাইনা? তবুও এতো ব্যস্ততার মাঝেও আমার বাচ্চার জন্য সময় বের করি, ওর সব প্রয়োজন মিটাই। তারপরও তুমি আঙুল তোলার সাহস পাও কীভাবে?”
এতো কথা-কাটাকাটির পরেও আফসানকে এমন শান্তভাবে কথা বলতে দেখে জেমির ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল। ও আচনক আফসানের শার্টের কলার চেপে ধরে জোরগলায় বললো, “আপনি আমাকে কি পেয়েছেন আফসান! আমার কোনো কথা-ই আপনি গুরুত্বপূর্ণ সহকারে নেন না! কেন? কী কারণে? বলুন!”
আফসান চেয়ারের হাতল শক্ত করে চেপে ধরে মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে শান্ত গলায় বললো, “ঠান্ডা হও জেমি। তোমার আম্মু, খালামণিরা আছেন ড্রয়িংরুমে। অশান্তি কোরো না। তারা জানলে কষ্ট পাবেন।”
জেমি এবার আগের তুলনায় কিছুটা শান্ত হলেও ঠোঁট চেপে বললো, “বাবুর খেয়াল-ই রাখতে পারবেন না যখন, তাহলে হইয়েছেন কেন?”
“আমি হওয়ায়নি। আল্লাহ দিয়েছেন।”
“জি জানি। কিন্তু আপনি কিছু না করলে তো আর হতো না তাইনা? আপনি আমার সাথে ওসব করেছেন বলেই হয়েছে।”
“ওহ কাম অন! আমি একা কিছু করিনি ওকে? তুমিও করেছো। দু’জনে মিলে করেছি বলেই বেবি হয়েছে। শুধু একা আমার দোষ দিও না! সরো। আমার শার্টের আয়রন খারাপ হচ্ছে।”
.
.
মেসেজ ডেলিভারড হওয়ার প্রায় পয়ত্রিশ মিনিট বাদে মেজবাহ মেসেজ সিন করলো৷ আকসা এতোক্ষণ বারবার হোয়াটসঅ্যাপে প্রবেশ করছিল-বের হচ্ছিল। অপেক্ষায় ছিল, কখন মেজবাহ মেসেজ সিন করে। আকসা যখন কনভারসেশনে প্রবেশ করেছে, তখনই মেজবাহ মেসেজ সিন করেছে। তা দেখে আকসা ভাবলো, এই বুঝি মেজবাহ মেসেজের রিপ্লাই দেবে। কিন্তু আচনক মিনিট খানেকের ব্যবধানে মেজবাহ’র প্রোফাইল ফটো গায়েব হয়ে গেল। অ্যাক্টিভ স্ট্যাটাসও দেখা গেল না আর। আকসা হতভম্ব হলো। আচমকা ঘটনায় প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরমুহূর্তে উপলব্ধি করলো, মেজবাহ ওকে ব্লক করে দিয়েছে। আকসা তবু নিশ্চিত হতে মেজবাহকে একটা হার্ট ইমোজি সেন্ট করলো।
মেসেজটা ডেলিভারড হলো না। আকসা এবার পুরোপুরি নিশ্চিত, মেজবাহ ওকে সত্যিই ব্লক দিয়েছে। তবু ওর বুক ভার হলো না এবার। ও ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিজেকে সামলে নিলো। এবার কল লিস্টে প্রবেশ করে মেজবাহ’র ফোন নাম্বার সার্চ করলো। এরপর ওর নাম্বারে সরাসরি কল দিলো। সম্ভবত সিম থেকেও ব্লক করে দিয়েছে বলে ধারণা হলো আকসার। কিন্তু রিং বাজতেই অবাক হলো ও। এখনো এখান থেকে ব্লক করেনি। আকসা মনে মনে খুব করে চাইতে লাগলো, যেন মেজবাহ ব্লক না করে ওর কল রিসিভ করে।
শেষমেশ আকসার চাওয়া পূরণ হলো। মেজবাহ কল রিসিভ করলো। আকসা ফোন কানে নিতেই ওপাশ থেকে কর্কশ কন্ঠস্বর শোনা গেল। মেজবাহ চড়া গলায় বলছে, “প্রবলেম কী তোমার? এভাবে বারবার কল-টেক্সট দিয়ে ডিস্টার্ব করছো কেন?”
“আমার ছোট্ট একটা প্রবলেম আছে। আপনি আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে ব্লক করেছেন। সে আপনি করতেই পারেন। আপনার ব্যক্তিস্বাধীনতা। কিন্তু এভাবে হঠাৎ কিছু না বলেকয়ে ব্লক করা কি ঠিক বলুন? মানুষের তো কথা থাকতে পারে। প্রতিটা মানুষের-ই নিজস্ব পয়েন্ট আছে। আপনার যেমন আছে, তেমন আমারও আছে। আপনার অন্তত আমার কথাগুলো শোনা উচিত মেজবাহ। হতে পারে, আমার কথাগুলো শোনার পর আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হলো।”
“তোমার আর কী কথা শুনবো? আর কী বলতে বাকি রেখেছো তুমি? আর একটা কথা শুনে রাখো, এমনিতেও তোমার প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট নেই আমার। সো, ডিভোর্সটা হওয়ার-ই ছিল।”
এমন রূঢ়, যন্ত্রণাদায়ক কথা শোনার পরেও আকসার কোনো যন্ত্রণা বা হেলাফেলা হলো না। ও স্বাভাবিকভাবেই বললো, “তারপরও। ফাঁসির আসামির ক্ষেত্রেও শেষবার তার ইচ্ছাপূরণ করা হয়। আপনি নাহয় শেষবার আমার কথা শুনলেন। তারপর যা খুশি সিদ্ধান্ত নেবেন। ব্লকটা খুলুন প্লিজ।”
“ওকে।”
আকসা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। হোয়াটসঅ্যাপে প্রবেশ করতেই দেখলো, মেজবাহ মিনিট কয়েক পরে ব্লক খুলে দিয়েছে। কিন্তু কোনো মেসেজ দেয়নি। আকসা-ই লিখলো, “আসলে আপনাকে আমার কথার সত্যতার কয়েকটা প্রমাণ দিতে চাইছিলাম। সাইফুল ভাইয়ার সাথে কথা বলার সকল কল রেকর্ড আছে আমার কাছে। তারিখসহ সব প্রমাণ আছে। আপনাকে দিচ্ছি, শুনে নিবেন। তারপর আপনি বিচার করবেন, আমি সঠিক কিনা।”
মেসেজটা দেওয়ার মিনিট দুয়েক পরে সিন হলো৷ অপর পাশ থেকে শুধুমাত্র জবাব এলো— “ওকে।”
আকসা এবার সেই কল রেকর্ডগুলো একে একে মেজবাহ’র ইনবক্সে দিয়ে পাঠালো। বেশ কয়েকটা কল রেকর্ড। শুনতে একটু সময় লাগবে। মেজবাহ মেসেজ সিন করে বোধহয় কল রেকর্ডগুলো শুনতে ব্যস্ত হলো। এই ফাঁকে আকসা ওর ফোনের নোটবুকে গেল দ্রুত একটা কাজ করার জন্য।
.
.
আকসা প্রায় আট মিনিট পরে নোটবুক থেকে বের হয়ে পুনরায় মেজবাহ’র ইনবক্সে প্রবেশ করলো। সেখান থেকে বের হলো না আর। আকসার আন্দাজ মোতাবেক এগারো মিনিট বাদে মেজবাহ রেকর্ডিংগুলো পড়া শেষ করে মেসেজ লিখলো, “শুনলাম।”
তার পরবর্তী মেসেজ, “স্যরি।”
এরপর মেজবাহ বোধহয় আরো কিছু লিখছিল। তারমধ্যেই আকসা কপি-পেস্ট করে রাখা মেসেজটা দ্রুত ওর ইনবক্সে পাঠিয়ে দিলো। বিশাল বড় একটা মেসেজ। সেখানে লেখা— “এইযে ভদ্র-অহংকারী, দাম্ভিক জনাব মেজবাহ ইফতেখার! আপনার মতো লোকের সাথে আমি এমনিতেও থাকবো না। যে নিজের বিয়ে করা বউয়ের ওপর সামান্য বিশ্বাসটুকুও রাখতে পারে না, ইন্টারেস্ট দেখাতে পারে না, ভালোবাসতে পারে না; তার সাথে থাকার প্রশ্ন-ই আসে না। দুনিয়ায় বহুত ভালো ছেলে আছে। দরকার হয় গ্যাংস্টার বিয়ে করবো। তারা অন্তত বউকে ভালোবাসে। কিন্তু আপনাদের মতো ভদ্রলোকেরা বউ বাদে পৃথিবীর বাদবাকি সবকিছু ভালোবাসেন! আমার শুধুমাত্র নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা জরুরি ছিল নিজের আত্মসম্মানের খাতিরে, সেটা আমি করে ফেলেছি। আপনার সাথে সংসার? আর নয়! অসম্ভব ব্যাপার! আপনি কী আমাকে ডিভোর্স দেবেন? আমি আপনাকে ডিভোর্স দিচ্ছি। জাস্ট ওয়েট! আপনার চাইতে শতগুণ ভালো একটা ছেলেকে বিয়ে করে হ্যাপি থাকবো দেখে নিয়েন। গুডবাই মেজর সাহেব।”
চলবে
Share On:
TAGS: ঝিলিক মল্লিক, সীমান্তরেখা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৫
-
সীমান্তরেখা পর্ব ১৬
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৭
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৩
-
সীমান্তরেখা পর্ব ১৪
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৪
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১
-
সীমান্তরেখা পর্ব ১০
-
সীমান্তরেখা পর্ব ১৮
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৬