সীমান্তরেখা
লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক
পর্ব_২৮
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]
আকসা দ্বিধান্বিত। বুঝতে পারছে না, আসলে কি হচ্ছে ওর সাথে। মেজবাহ ওকে চুমু খেলো। তারপর আবার ‘জান’ও সম্বোধন করলো! আসলে কি সত্যি? নাকি সবটাই ওর ভ্রম! আকসা নিজ হাতে জোরে একটা চিমটি কাটে। ব্যাথায় কুকিয়ে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে। তারমানে স্বপ্ন নয়, এটা সত্যি। কিন্তু কীভাবে সম্ভব? মেজবাহ এমন কথা বলছে! আকসা মনের দ্বিধা তখনো কাটাতে না পেরে হঠাৎ কিছু না বলেকয়ে মেজবাহ’র কপালে হাত রাখলো। মেজবাহ হতচকিত হলো। ওর হাত সরিয়ে দিয়ে বিরক্তি স্বরে বললো, “কী করছো!”
“চেক করছি, আপনার আবার আমার মতো জ্বর হলো কিনা৷ আসলে জ্বরজারি হলেই তো মানুষ আবোলতাবোল বকে। তাই ভাবলাম..”
“চুপ! একদম চুপ! সারাক্ষণ যতসব উল্টাপাল্টা কথাবার্তা। এসব আমার সাথে করবে না৷ এগুলোকে ব্যাড ম্যানারস বলে। ওকে?”
“স্বামীর কপালে হাত রাখাও আজকাল ব্যাড ম্যানারস হয়ে গেছে বাবাহ! জানতামই না!”
আকসা বিরবির করতেই মেজবাহ ভ্রু কুঁচকে ফেললো। আদেশের সুরে বললো, “এখন বিরবির করে টাইম ওয়েস্ট না করে গিয়ে জলদি তৈরি হও। সাড়ে সাতটার অ্যাপয়েন্টমেন্ট। ডাক্তার জাহাঙ্গীর এমনিতেও সাতটার পরে চেম্বারে থাকেন না। তোমার জন্য তাকে রিকোয়েস্ট অবধি করতে হয়েছে আমার।”
“বউয়ের জন্য এটুকু করে অহংকার করার কিছু নেই। অবশ্য আপনার মতো অহংকারী লোকের কাছ থেকে আর কি আশা করা যায়!”
মেজবাহকে হালকা ধাক্কা দিয়ে ওয়ারড্রব থেকে পোশাক নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল আকসা৷ মেজবাহ অবশ্য ওর কথার তোয়াক্কা করলো না৷ এই মেয়ে হরহামেশা-ই এমন আবোলতাবোল বকে৷ এর কথাকে এতো গুরুত্ব সহকারে নেওয়া মানেই সময় নষ্ট৷ আর মেজবাহ’র কাছে সময়ের গুরুত্ব অনেক৷ আপাতত ও ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল সেট করতে ব্যস্ত হলো। এরমধ্যে একবার ওয়াশরুমের দরজার দিকে ফিরে জোরে চেঁচিয়ে ভেতরে আকসাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলো, “আমি আসবো?”
“না! আপনি কেন আসবেন?”
“তুমি অসুস্থ তাই।”
“আমার নিজের কাজ নিজে করে নিতে পারি।”
“ওকেহ। কোনো হেল্প লাগলে বোলো। আ’ম হেয়ার।”
“লাগবো না৷”
তীক্ষ্ণ কথাটা শোনা গেল ভেতর থেকে। মেজবাহ’র হাত মুঠো হয়ে এলো। তবে কিছু বললো না আর। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো। শার্টের বোতাম আটকাদে ব্যস্ত হতেই হঠাৎ ওয়াশরুমের ভেতর থেকে কোঁকানোর আওয়াজ শুনে হাত থমকে গেল ওর। দ্রুত পা চালিয়ে বদ্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “কী হয়েছে? আকসা? এই মেয়ে!”
মেজবাহ বারবার ডাকলো ওকে। ভেতর থেকে কোনো সাড়া পেল না৷ প্রথমবার বুক কেঁপে উঠলো মেজবাহ’র। ও সমানে দরজা ধাক্কা দিতে লাগলো৷ কিছু সময় পরে ভেতর থেকে দরজা খুলে গেল। আকসা দাঁড়িয়ে আছে দরজার কোণে। চোখ ছলছল করছে ওর। একে তো জ্বর, তারওপর আবার হুকে হাত কেটে ফেলেছে মেয়েটা। মেজবাহ’র মেজাজ চরম খারাপ হলো। একটা ধমক দিতে যেয়েও দিলো না। আকসা দরজার কোণে শরীর আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে— ব্যাপারটা মাত্রই খেয়াল হলো মেজবাহ’র। চোখে-মুখে ভীষণ অসহায়ত্ব৷ মেজবাহ কিছুটা আন্দাজ করতে পেরে বললো, “সাইডে সরো। ভেতরে আসতে দাও।”
“না প্লিজ।”
আকসার আকুতি মেজবাহ শুনলো না৷ একহাতে ওকে টেনে সরিয়ে ওয়াশরুমের ভেতরে প্রবেশ করলো। ওয়াশরুমের লাইট বন্ধ বলে হাঁপ ছাড়লো আকসা৷ যাক অন্তত এদিক থেকে তো বেঁচে গেছে। মেজবাহ আবছা আলোতেই আকসার কাঁধ আড়াল করে ঢেকে রাখা ওড়নাটা ধীরে ধীরে সরিয়ে দিলো। তৎক্ষনাৎ কাঁধ উন্মুক্ত হলো। আকসা শিউরে উঠলো না। তবে ঠোঁট চেপে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। মেজবাহ ওর অস্বস্তি বুঝতে পেরে বললো, “অন্ধকারে কি আর দেখবো ভাই! এমন হেজিটেট করার কী হয়েছে? নরমাল হও।”
তবে আকসা স্বাভাবিক হতে পারলো না। শত হোক, এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক হওয়া যায় না। এই লোকটা এক অদ্ভুত সম্মোহন, অদ্ভুত কেমন যেন! আকসা এই সম্মোহনে কখনোই পরতে চায় না৷ লোকটা ফল্গুর বালির ন্যায়। এমন লোকদের সম্মোহনে পরা অন্যায়। জীবন ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। মেজবাহ’র হাত ওর কামিজের চেইনের অংশে। চেইনের ওপরে আবার হুক। পিঠ পুরোপুরি নগ্ন৷ আকসার মনে হচ্ছে, মেজবাহ বুঝি ওর পিঠের দিকেই একধ্যানে তাকিয়ে আছে। সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও এমন একটা ধারণা মস্তিষ্কে আসতেই আকসা চট করে পিছু ফিরে তাকালো৷ রুক্ষ দৃষ্টি ওর। মেজবাহ ওর নড়াচড়ায় ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রূঢ় স্বরে বললো, “কী হলো? নড়াচড়া করছো কেন? একটা কাজও ঠিকমতো করতে দেবে না? বাঁধা দিতেই হবে তোমার!”
“আপনি করছেন না ঠিকমতো কাজ।”
“ঠিকমতো করছি না মানে? আমার সাথে কথাবার্তা ক্লিয়ারলি বলবে। এমন ম্যানতা টাইপ কথা পছন্দ নয়।”
মেজবাহ’র এতোক্ষণের ভেতরে জড়ো হওয়া মেজাজ এবার কিঞ্চিৎ উপচে পরলো। আকসা তবু গায়ে মাখলো না। আপাতত ওর নিজেরও মেজাজ খারাপ। ও তীক্ষ্ণ কন্ঠে সরাসরি প্রশ্ন করে বসলো— “আপনি আমার পিঠ দেখছেন কেন?”
“মানে?”
মেজবাহ যেন বুঝতে পারেনি— এমনভাবে ভ্রু কুঁচকে পাল্টা প্রশ্ন করলো।
“সোজা কথা বোঝেন না? আমার পিঠের দিকে তাকিয়ে আছেন কেন?”
“আশ্চর্য মেয়েমানুষ তো! আমি তোমার পিঠ দেখতে যাবো কেন?”
“হ্যাঁ দেখছেন। শতভাগ নিশ্চিত আমি।”
মেজবাহ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, “তোমার পিঠে দেখার মতো কী আছে ভাই? যে আমি তোমার পিঠ দেখতে যাবো!”
“সে আপনি জানেন।”
কথাটা বলতেই হঠাৎ পেছন থেকে ওর কোমর টেনে পিঠ বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বললো, “হ্যাঁ আমার তো জানা উচিত। তোমার কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছে, তুমি চাচ্ছো, আমি যেন তোমার পিঠ নিয়ে কমপ্লিমেন্ট দিই, রাইট?”
আকসা চমকে উঠলো। আতঙ্কিত কন্ঠে বললো, “না! আমি চাইছি না৷ আমি শুধু বললাম..”
“কী বললে? তোমার পিঠ কেমন, সেটা আমি জানি কিনা তাই?”
“না। আমি আসলে..”
আচমকা একটা কান্ড ঘটলো। পিঠে শীতল অধর-স্পর্শ পেতেই কেঁপে উঠলো আকসা। অস্বস্তিতে কাদা হলো। জড়ো গলায় বললো, “ছাড়ুন মেজবাহ! কী করছেন! ওয়াশরুমের ভেতরে কেউ এসব করে?”
“পারফেক্ট প্লেস.. তোমার পিঠের কমপ্লিমেন্ট দেওয়ার জন্য।”
আকসা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাখে। মেজবাহ এবার রসিকতার স্বরে বলতে থাকে, “পিঠের কমপ্লিমেন্ট চাইছিলে তাই না? ওকে, দিচ্ছি। তোমার পিঠে হাড়গোড় ছাড়া আর কিছু নেই। খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো কোরো। নাহলে সারাজীবন আনফরচুনেটলি এই হাড়ে-ই কিস করে যেতে হবে। ব্লাডি সিভিলিয়ান!”
মেজবাহ ওকে ছেড়ে দিলো৷ কামিজের চেইন আর হুক লাগিয়ে দিয়ে বের হয়ে আসলো ওয়াশরুম থেকে। আকসা এখনো থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ এই লোক এমনভাবে মানুষকে কটাক্ষ করতে পারে! প্রতিবার বোবা বনে যায় আকসা।
.
.
ডাক্তার কিছু টেস্ট দিয়েছেন৷ আগামীকাল এসে আবার টেস্টগুলো করাতে হবে। চেম্বার থেকে বের হয়ে রোডের পাশে পার্ক করে রাখা গাড়ির নিকটে এসে দাঁড়িয়েছে মেজবাহ। আকসা ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। শরীর এখন মোটামুটি সুস্থ ওর। ক্লান্তিবোধটা হালকা রয়েছে। মেজবাহ গাড়ির চাবিটা বের করেছে সবে, ঠিক তখক পাশ থেকে একটা মোটরসাইকেল দ্রুতগতিতে ভো করে চলে গেল। আকসাকে পাশ কাটিয়েই গেল। এমন ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না ও। ধাক্কা খেল মোটরসাইকেলের সাথে। মেজবাহ সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলো, “এই হারামির বাচ্চা! চোখে দেখিস না? বাইক থামা তুই। মাটির সাথে গেড়ে রেখো দেবো।”
“মেজবাহ! প্লিজ থামুন!”
“থামবো মানে? দেখলে না কী করলো?”
“করেছে তো কী হয়েছে? মানুষ ভুল করতেই পারে। তাই বলে আপনি এতো রুড হচ্ছেন কেন? সবসময় কেন আপনি এতো রুড হন?”
মেজবাহ আকসার হাতের বাহু দুই হাতে চেপে ধরে রেখে দাঁতে দাঁত পিষে বললো, “যার জন্য করি চুরি সে-ই বলে চোর! রুড হই কার জন্য? তোমার জন্য। আর তুমি! এজন্যই বলি, তুমি আমার কোনোকিছুই ডিজার্ভ করো না৷ নাথিং! ইউ গার্ল হ্যাভ মেড মি কমপ্লিটলি হোপলেস ফর ইউ। আই হেইট ইউ!”
চলবে
Share On:
TAGS: ঝিলিক মল্লিক, সীমান্তরেখা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৮
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৮
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১০
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৪
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৬
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৩
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৪
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৩
-
সীমান্তরেখা পর্ব ২৩
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৯