সীমান্তরেখা
লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক
পর্ব_১৬
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]
আকসা বিমূর্ত হয়ে তাকিয়ে আছে মেজবাহ’র দিকে। চোখের পলক পরছেই না ওর। মেজবাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। যেন কিছুই হয়নি মাত্র। ওর নির্বিকারত্ব দেখে তেমনই বোধ হলো। মেজবাহ বিরক্তিস্বরে বললো, “হাটে যেতে হবে। লেইট হয়ে যাচ্ছে অনেক।”
মেজবাহ দ্রুত পা চালালো। সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে আফিফকে ডাক দিয়ে বললো, “এখান থেকেই ব্যাক কর। ওদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমরা হাটে যাবো।”
বড়ভাইয়ের কথা শুনে ওরা আর সামনে এগোলো না৷ যথেষ্ট ঘোরাফেরা হয়েছে। এবার সবাইকে নিয়ে উল্টোপথে ফিরলো ওরা। বাকি পথটুকু আকসার নিরবতায় কেটে গেল। এরইমধ্যে মেজবাহ’র দিকে অগোচরে দু-একবার তাকালেও মেজবাহ ওর দিকে একবারের জন্যও তাকালো না। আফিফদের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথাবার্তা এবং আলোচনায় ব্যস্ততা দেখালো।
.
.
“বাচ্চা নিচ্ছো কবে?”
রাতের বেলা সবার মাঝে বড়ঘরে একসাথে খেতে বসে খালামণির শাশুড়ির প্রশ্নটা শোনামাত্র বিষম খেল আকসা। খাবার গলায় আঁটকে বিশ্রীভাবে কাঁশি উঠলো ওর। পাশ থেকে তাহসিন পানিভর্তি গ্লাসটা বড়ভাবীর দিকে এগিয়ে দিলো। রিমু ওর পিঠ হাতের তালু দিয়ে আলতোভাবে টেনে দিলো। আকসা পানি খেয়ে নিজেকে শান্ত করে সামনের সারিতে বসে একমনে খেতে ব্যস্ত লোকটাকে দেখলো। মেজবাহ দিব্যি খেয়েই চলেছে। ভরা আসরের মাঝে কথাটা বলা হয়েছে। এমন নয় যে, মেজবাহ’র কান অবধি কথাটা পৌঁছায়নি। বরং, উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ খুব স্পষ্টভাবেই কথাটা শুনেছে।
আকসা বিব্রতবোধ করলো। এই আধুনিক যুগে এসেও মানুষ কলিযুগের মতো এহেন প্রশ্ন করতে পারে? ওর ধারণাতেই ছিল না। ইশা বেগম পাশে বসে খাচ্ছিলেন। আকসাকে অপ্রস্তুত হতে দেখে তিনি পরিস্থিতি শান্ত করতে মৃদু হেঁসে বললেন, “বিয়ে তো ওদের সবে হলো মাওই। আর ক’টা দিন যাক৷ ওরা একটু ঘোরাফেরা করুক। তারপর না-হয় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বাচ্চাকাচ্চার ব্যাপারে ভাববে।”
আকসা খেয়াল করলো, ওর শাশুড়ি কথাটা বলামাত্র-ই মেজবাহ খাওয়া ছেড়ে হাত ধুয়ে উঠে গেল শতরঞ্জি থেকে। মেজবাহ’র মা-খালারা অনেক ডাকলেন। তবু মেজবাহ ফিরে তাকালো না৷ ইশা বেগম বোনের সাথে আরে চিন্তিত হয়ে আলোচনা করতে লাগলেন, তার ছেলের হঠাৎ হলোটা কি!
.
.
আকসারা সবাই খালামণিদের ছাঁদে মাদুর বিছিয়ে বসেছিল রাতের খাবার খাওয়ার পরে। ওরা আগামীকাল ভোরে খেজুরের রস তোলা দেখতে যাবে। সেটা নিয়েই কথাবার্তা হচ্ছিল। আকসা টুকটাক সায় দিচ্ছিল ওদের সাথে। তবে মাঝেমধ্যে বেশ অন্যমনষ্ক হয়ে পরছিল। তাহসিন নিচে গিয়েছে পিঠা আনতে। এখানে আপাতত আকসা, রিমু, মিহি আর ছোট খালামণির মেয়ে মারিয়া উপস্থিত।
“তুমি-ই আকসা?”
আকসা মিহিকে কিছু একটা বলছিল, তখনই হঠাৎ পেছন থেকে মেয়েলি কন্ঠস্বরটা শোনা গেল। আকসা নিজের নাম শুনে পেছনে ঘুরে তাকাতেই দেখলো, আনুমানিক বছর সতেরোর একটা মেয়ে হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। এই মেয়েটাকে আসার পর থেকে তো এবাড়িতে দেখেনি৷ কে এই মেয়ে?
আকসা চেনে না, তবু সৌজন্যতার খাতিরে জবাব দিলো, “জি।”
“তোমাকেই খুঁজছিলাম।”
মুখের হাসির রেখা বাড়িয়ে কথাটা বলেই মেয়েটা এসে ধপ করে আকসার পাশে বসে পরলো। মারিয়া ওকে দেখিয়ে আকসাকে বললো, “ওর নাম নীতি৷ আমার ছোট চাচির ছোট মেয়ে। ওকে এর আগে কখনো দেখোনি। আসলে তোমাদের বিয়েতে ও অসুস্থ ছিল। তাই উপস্থিত থাকতে পারেনি। আর আজ ও মামাবাড়িতে গিয়েছিল। তোমরা এসেছো শুনে সঙ্গে সঙ্গে রওয়ানা দিয়ে চলে এসেছে।”
আকসা ঘাড় ঘুরিয়ে নীতি মেয়েটাকে দেখলো। মেয়েটার পরনে একটা কালো রঙা টপস আর জিন্সের প্যান্ট। বয়সে আকসার থেকে বছর পাঁচেকের ছোট। এইটুকু মেয়ে আকসাকে এসে সরাসরি ‘তুমি’ এবং নাম ধরে ডাকাটা আকসার মোটেই পছন্দ হয়নি। তবুও ও ভদ্রতার খাতিরে ভেতরকার বিরক্তিবোধটা প্রকাশ পেতে দিলো না৷ চাপা-ই রাখলো।
আকসা অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক অজানা কারণে নীতির দিকে তাকিয়ে ছিল। নীতিও আড়চোখে আকসাকেই দেখছে। আকসা ওর দিকে তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরে নীতি চুলগুলো সামনের দিকে এনে খুব ভাব নিতে লাগলো৷ আকসা ব্যাপারটা বুঝতে পারা মাত্রই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। এধরনের মেয়েরা এমন হয়ে থাকে সাধারণত। এদের স্বভাব হচ্ছে, কেউ তাদেরকে দেখছে বা অ্যাটেনশন দিচ্ছে বুঝতে পারলে তাদের ভাবের মাত্রা খুব বেশি বেড়ে যায়। তারা নিজেদেরকে অনেক বড় কিছু মনে করে। আকসা এই ব্যাপারটা শুরুতেই ধরে ফেলেছে৷ একারণে ও আর নীতির দিকে একবারের জন্যও তাকালো না। তবে মিহিদের সাথে কথা বলাকালীন বেশ ভালোভাবে উপলব্ধি করলো, নীতি মেয়েটা একদৃষ্টিতে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে৷ কি ব্যাপার! আকসা তো আহামরি সাজগোজও করেনি, আর না তো বিশেষ কোনো ব্যক্তি; তাহলে এভাবে দেখার কী আছে? ও চরম বিব্রতবোধ করলো।
.
.
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। মিহি নিজের ফোনটা রিমুর হাতে দিয়ে মারিয়া আপুর সাথে নিচে গিয়েছে। ওদেরকে ডাকা হয়েছে মাত্র। নিচে অতিথি আপ্যায়নে পিঠাপুলি বানানোর আয়োজন চলছিল সন্ধ্যা থেকে৷ আকসারা আর নিচে নামেনি বলে ওদের জন্য পিঠাপুলি ওপরেই নিয়ে যেতে ডেকেছেন খালামণি। এজন্য মিহিরা নিচে গিয়েছে।
ছাঁদে এখন শুধুমাত্র অবস্থান করছে আকসা, রিমু আর নীতি।
নীতিকে মারিয়া আপু নিচে যাওয়ার জন্য জোরাজুরি করেছিল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এতোবার বলা সত্ত্বেও মেয়েটা নিচে যেতে নারাজ। ভাবখানা এমন, ও যেন এখান থেকে নড়বে না বলে পণ করেছে৷
রিমু ফোন দেখতে ব্যস্ত৷ আকসা এতোক্ষণ মিহি আর মারিয়া আপুর সাথে গল্প করছিল। তারা নিচে চলে যাওয়ার পর দুই মিনিট চুপচাপ বসে থাকলেও এবার ও বিরক্ত হয়ে ফোন স্ক্রল করতে লাগলো। না তাকিয়েও আকসা বুঝতে পারলো, এই আবছা অন্ধকারেও নীতি মেয়েটা একনাগাড়ে পরখ করছে ওকে৷ আকসা চরম অস্বস্তিতে পরলো। বিরক্তি সীমা ছাড়াচ্ছে। হঠাৎ নিরবতা ভেঙে নীতি আকসার হাত টেনে ধরে বললো, “স্বর্ণের বালা? কত ক্যারেটের? আর কয় ভরির? দেখে তো মনে হচ্ছে, কমপক্ষে দেড় ভরি হবেই। তা কে দিয়েছে? তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন?”
“জি?”
নীতির হঠাৎ এমন অদ্ভুত প্রশ্নে আকসা বুঝতে পারলো না কি বলতে চাচ্ছে ও। নীতি পুনরায় সেই অত্যন্ত সুরেলা কন্ঠে বলে উঠলো, “বললাম, এই রুলিগুলো কি তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন দিয়েছে আকসা?”
মেয়েটা ওকে আবারও নাম ধরে ডেকেছে! সম্পর্কে তো আকসা ওর ভাবী হয়। আকসার বিরক্তিটা এবার ধীরে ধীরে রাগে রূপান্তরিত হচ্ছে। তবে নেহাতই শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় বলে ও চুপ করে আছে। হয়তো মেয়েটা বয়সে ছোট বলে বোধবুদ্ধি কম। ছোট ভেবেই আকসা চুপ করে রইলো৷ কিছু বললো না। তবে নীতি চুপ থাকলো না৷ ও আবারও বললো, “বাহ, দেখেশুনে তো বেশ মালদার পার্টি জুটিয়েছো! কি কপাল তোমার! নাকি নিজেই ফাঁসিয়ে নিয়েছো?”
আকসা হতবাক। এই মেয়ে বলে কি! আকসার মুখে কথা বাঁধলো। চরম আশ্চর্য হয়ে যেন ও কথা বলতে ভুলে গেছে। আকসা নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো, “বুঝতে পারছি না, কি বলতে চাইছো তুমি?”
“বোঝার তো কথা। এতোবড় ধাড়ি মেয়ে তুমি। এটুকু বোঝো না কি বলতে চাই? তোমাদের তো প্রেমের সম্পর্ক না৷ আর মেজবাহকে আমি যতদূর চিনি, দু’দিনে মেয়ে পছন্দ করে বিয়ে করার মতো ছেলে না। তাহলে তুমি তার মতো এক্সক্লুসিভ একজনকে পেলে কীভাবে? ফাঁসিয়েছো নাকি?”
“শাট আপ! এতোক্ষণ কিছু বলিনি তোমাকে! এসব আজেবাজে কথা বলার সাহস হয় কীভাবে তোমার? বেয়াদব মেয়ে! আমাকে সেই কখন থেকে নাম ধরে সম্বোধন করে যাচ্ছো। তারওপর মেজবাহ সম্পর্কে তোমার ভাই হয়। তারও সরাসরি নাম উচ্চারণ করছো! আর আমাদের বিয়ে নিয়ে তোমার এতো মাথাব্যথা কেন? বয়স কত তোমার? তোমার চেয়ে কত বড় আমি জানো? বয়সে বড় একজনের সাথে এভাবে কথা বলো! এইটুকু মেয়ের কথার কি শ্রী! এতো বালপাকনা কেন তুমি?”
আকসা রাগে কাঁপছে। ওর বলা এই কঠিন কথাগুলো শুনেও নীতির কোনো হেলদোল হলো না। ও পুনরায় হাসলো। এখানে আসার পর প্রথমে যেই হাসির রেখাটা আকসা ওর মুখে দেখেছিল, ঠিক সেরকম হাসি। এতোক্ষণে আকসা বুঝলো, এই হাসিটা কোনো ভদ্রতার হাসি নয়। বরং, চতুরতার এবং কপটতার হাসি। নীতি হেঁসে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে বললো, “আমার বয়স তোমার দেখতে হবে না আপামণি। তুমি নিজের স্বামীকে দেখো কেমন? এইযে হাতে যেই রুলি, গলায় মোটা চেইন আর নাকে নাকফুল পরেছো না? এগুলো সব আমার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চালাকি করে সব নিয়েছো তুমি। এসবের ওপর কোনো অধিকার থাকার কথা নয় তোমার। এমনকি মেজবাহ’র ওপরেও না। মেজবাহ’র তো আমার. . .”
আকসা এক অজানা আশঙ্কায় আঁতকে উঠলো। বুক দুরুদুরু করতে লাগলো ওর। নীতি কপটতার হাসি দিয়ে বললো, “দুর্ভাগ্যক্রমে তুমি তাকে ফাঁসিয়ে নিলে। অথচ তোমার জায়গায় আমার থাকার কথা ছিল। মেজবাহ’র বুকে মাথা রেখে আমার ঘুমানোর কথা ছিল। তার সাথে আমার সবকিছু হওয়ার কথা ছিল। আমি অষ্টরম্ভা। এমন কিছু নেই আমি পারি না। রান্নাবান্না হতে শুরু করে মানুষকে মুগ্ধ করা, সবকিছু। তোমার ফ্যাশন সেন্সও তো ভালো না। আর আমাকে দেখো! আমার মতো মেয়ে রেয়ার। আমি শুধু ভাবি, তোমাকে উনি কেন বিয়ে করলো! কালোজাদু করেছো নিশ্চয়ই?”
আকসার প্রথম কথাগুলো শুনে শরীর গরম হতে লাগলো। হাত মুঠো করে ফেললো ও।
ও নীতির কথা শুনে ওকে এবার ভালোভাবে লক্ষ্য করলো। মেয়েটার রঙচটা চুল। সোজা কথায় যাকে বলে— “কালার করা।” তা-ও যে-সে কালার না। একেবারে খাস বাদামি রঙ। যেটা তার স্কিন টোনের সাথে একদমই যাচ্ছে না। ভ্রুও প্লাগ করা। সাথে নিয়মিত বোধহয় মুখ হতে পশম তোলে। আকসার মেয়েটার ফ্যাশন নিয়ে মোটেও মাথাব্যথা ছিল না। যার যার ব্যক্তিগত ইচ্ছা আরকি। তবে এই মেয়ের মুখে ফ্যাশন সেন্সের কথা শুনে ও মনে মনে কপট হাসলো৷ নীতি সেই হাসি দেখে কি বুঝলো কে জানে৷ তবে ও দমে গেল না৷ এবার চূড়ান্ত কাজটা করে ফেললো। আকসাকে উদ্দেশ্য করে কটাক্ষে বললো, “তোমাকে একটা জিনিস দেখাই হ্যাঁ? তোমার স্বামীর কীর্তি। একটু দেখো।”
নীতি ওর হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা তুলে ধরে গ্যালারিতে ঢুকে আকসার সামনে মেলে ধরলো। আকসা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। গ্যালারিতে দেখা যাচ্ছে, একটা ফটো। যেখানে মেজবাহ গাছের পাশে বসে ডাব কাটছে। আর নীতি মজা করে মেজবাহ’র পাশে বসে ওর হাত টেনে ধরে রেখেছে৷ দু’জনের মুখেই হাসি। ফটোটা বোধহয় অনেকদিন আগের। আকসা অনুমান করলো। কারণ, সেখানে নীতিকে বেশ ছোট দেখাচ্ছে। বোধহয় তখন বছর পনেরো হবে। ধারণামতে, এটা দুই বছর আগের ছবি। আকসা একদৃষ্টিতে ফটোটা দেখছে। এরইমধ্যে নীতি ওর চাহনি পরখ করে বললো, “তোমার পবিত্র স্বামী আমাকে পছন্দ করতো। তার সাথে সম্পর্ক ছিল আমার৷ আমাকে ঠকিয়ে, অপবিত্র করে সে এখন নাপাক বউ বিয়ে করেছে!”
চলবে
Share On:
TAGS: ঝিলিক মল্লিক, সীমান্তরেখা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৩
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৩
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৪
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৮
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৬
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ২২
-
সীমান্তরেখা পর্ব ১৫
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৩
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৪
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৯