Golpo romantic golpo সীমান্তরেখা

সীমান্তরেখা পর্ব ১৪


সীমান্তরেখা

লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক

পর্ব_১৪

[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]

ভোর প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে তখন।
আকসার যখন ঘুম ভাঙলো, তখন ও নিজেকে মেজবাহ’র বাহুতে অবস্থান করতে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। রাতে তো মেজবাহ ব্যালকনিতে চলে গিয়েছিল। এরপর আকসা সোজা এসে বিছানার একপাশে ঘুমিয়ে পরেছে। তারপর আর কিছু মনে নেই ওর। এখন ঘুম ভাঙার পরে নিজেকে বিপরীত পাশে মেজবাহ’র বুকের ওপরে দেখে হতচকিত হলো ও। আকসার খোলা চুলগুলো মেজবাহ’র মুখের ওপরে গিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। আকসা মনে করার চেষ্টা করতে লাগলো, রাতে আর কিছু হয়েছে কিনা! আকসার মাথায় নানান কথা ঘুরছে, তখনই মেজবাহ চোখ মেলে তাকালো। সবে ঘুম ভেঙেছে। চোখ হালকা লাল হয়ে আছে। বোধহয় রাতে ঘুম ভালো হয়নি। মেজবাহকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আকসা তড়িৎ গতিতে চট করে সরে গেল ওর গায়ের ওপর থেকে। গতকাল রাতে শাড়ির আঁচলটা গায়ের ওপরে দুই পাশ থেকে ভালোভাবে টেনে নিয়ে ঘুমালেও এখন পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছে। বিছানার এককোণে মেঝের ওপর ঝুলে পড়ে আছে আঁচলটা। আকসা দ্রুত আঁচল টেনে এনে গায়ে ভালোভাবে জড়িয়ে নিলো। মেজবাহ’র দিকে তাকাতেই দেখলো, মেজবাহ বালিশে হাত ঠেকিয়ে শুয়ে নির্বিকারভাবে একদৃষ্টিতে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। আকসা চরম বিব্রতবোধ করলো। কিঞ্চিৎ সরে বসে চড়চড়ে গলায় মেজবাহকে উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো, “আপনি বিছানায় কেন?”

“ফ্লোরে থাকার কথা?”

নিজ প্রশ্নের বিপরীতে পাল্টা প্রশ্নটা পেয়ে আকসার মেজাজ প্রচন্ড খারাপ হলো। ও আরো জোর গলায় বললো, “আপনি তো ব্যালকনিতে ছিলেন। তাহলে বিছানায় এসেছেন কী কারণে?”

“অ্যাজ মাই উইশ। হোয়াই শুড আই গিভ ইউ অ্যান এক্সপ্লেনেশন?”

মেজবাহ’র রূঢ় জবাবটা শুনেও আকসা দমে গেল না। বরং, বিছানার চাদর টেনে ধরে পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ ভ্রু কুঁচকে বললো, “ওকে। মেনে নিলাম, আপনার ইচ্ছা, আপনি আমাকে এই বিষয়ে কোনো কৈফিয়ত দিবেন না। তবে এই কথাটা অন্তত বলবেন, আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন? লজ্জা করে না সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে? একটা মেয়ের অজান্তে তার সাথে বাজে কাজ করার চেষ্টা করেন কোন বিবেকে?”

আকসার রাগে শরীর কাঁপছে। ইচ্ছা হচ্ছে, এখনই মেজবাহ’র গাল বরাবর জোরেসোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিতে। তবে নেহাতই বয়সে বড় বিধেয় আকসা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো। মেজবাহ এবার শোয়া থেকে উঠে বসলো। আকসার মুখোমুখি বসে ওর চোখের সামনে আঙুল রেখে বললো, “কাম অন! আমি তোমার কাছে যাইনি। বরং তুমি নিজ জায়গা ছেড়ে আমার কাছে এসেছো। মেমোরি কি খুব বেশি উইক তোমার? মনে করে দেখো, রাতে কোথায় ঘুমিয়েছিলে তুমি। ঘুমালে তো কোনো হুঁশ থাকে না তোমার! পাশে যে একজন নিরীহ মানুষ ঘুমিয়ে থাকতে পারে, সেটাও ফিল করতে পারো না। গায়ে-মাথায় হাত-পা উঠিয়ে দাও। মানুষের ওপর টর্চার করে ছাড়ো। ফারদার এমন কিছু করলে ধাক্কা মেরে ফেলে দিবো বিছানা থেকে। পাগল-ছাগল!”

মেজবাহ’র কথা শুনে আকসা এবার ভালোভাবে খেয়াল করে দেখলো, ও রাতে ডানপাশে ঘুমালেও বাম পাশে চলে এসেছে পরে। ঘুমের ঘোরেই এই ঘটনা ঘটেছে। এদিকে আকসা আরো মেজবাহ’র ওপরে চড়াও হচ্ছিল। তবে মেজবাহ’র এই কথার বিপরীতে ও আর পাল্টা কিছু বলতে পারলো না। ওদিকে সাথী বাইরে থেকে ডাকছে। সকালের নাস্তাটা সেরে আধঘন্টার মধ্যেই বেরিয়ে পরবে ওরা। বাসায় ফিরে আবার ব্যাগপত্র গোছাতে হবে। সেখান থেকে দু’দিনের জন্য নাটোরে।
.
.
নাটোর, লালপুর উপজেলা, হালসা গ্রাম। এই গ্রামে মেজবাহ’র খালামণির বাড়ি। আজ সবাই বেড়াতে এসেছেন এখানে। মেজবাহ আসা মাত্রই খালাতো আর মামাতো ভাইদের সাথে বেরিয়েছে। আকসা মিহি আর রিমুর সাথে সরিষা ক্ষেতে ঘুরতে এসেছে। বাকিরা সবাই বড়ঘরে বসে গল্প-গুজব করছেন। আকসাদের ওর শাশুড়ি-ই বলেছেন, বাইরে থেকে একটু ঘোরাঘুরি করে আসতে। দুপুরের খাবার সময় হতে এখনো ঘন্টাখানেক। আর যেহেতু এখানে বেশিদিন থাকাও হচ্ছে না এবং একইসাথে ঘোরার জায়গাও অনেক; তাই সময়-সুযোগ পেলেই চারপাশ ঘুরে দেখা ভালো। নচেৎ, ঘোরাঘুরির জন্য দু’দিন তুলনামূলক খুব কম সময়।

আকসা ফোন ক্যামেরায় মিহি আর রিমুকে ফটো তুলে দিতে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ একটা নোটিফিকেশন আসায় স্ক্রিনে চোখ রাখতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভ্রু কুঁচকে গেল আকসার। পরমুহূর্তেই ও স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো। জোরপূর্বক মুখে সামান্য হাসির রেখা টেনে এনে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে মিহিদের বললো, “তোমরা একটু এদিকে ঘুরতে থাকো। আমি ওপাশে গেলাম।”

মিহি আবার আকসার লেজুড় বলা চলে। আকসার প্রায় সমবয়সী হওয়ায় ওকে ছাড়তেই চায় না। ওদের জমেও ভালো। মিহি আবদার করে বললো, “আমরাও তোমার সাথে আসি ভাবী?”

আকসা তৎক্ষনাৎ মাথা নেড়ে দ্বিরুক্তি করে বললো, “না না। তোমরা এখানে ঘুরো না৷ ওই দেখো, ওখানে কত সুন্দর একটা প্লেস। দারুণ ফটো আসবে কিন্তু। আর একটু পরেই রোদ পড়ে যাবে। তখন ছবি ভালো আসবে না৷ এখনই সময় থাকতে গিয়ে তুলে আসো। আমি আশেপাশেই আছি। কিছুক্ষণ পরে এসে তোমাদের সাথে ফিরবো।”

আকসা ইনিয়ে-বিনিয়ে ওদেরকে ধাতিয়ে পাঠিয়ে দিলো। মিহি আর রিমু কিছুটা দূরে যেতেই আকসা দ্রুত সরে গেল সেখান থেকে।
সরিষা ক্ষেতের আশেপাশে অনেক গাছপালা। একটা বড় তালগাছের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো আকসা৷ সেখান থেকে উঁকি দিয়ে দেখে নিলো, এখানে দাঁড়ালে দূর থেকে ওকে ভালোভাবে লক্ষ্য করা যায় না। এবার নিশ্চিন্ত হলো ও। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ফোনের লক খুলে তড়িঘড়ি করে কাজটা করতে লাগলো। কল রিসিভ করে ফোন কানে নিতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কন্ঠস্বরটা শুনে মৃদু হাসলো আকসা। এরপর প্রায় মিনিট পনেরো সময় একটানা কথা বললো ও। যতক্ষণ কথা বললো, পুরোটা সময়-ই ওর ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে রইলো।
.
.
দুপুরে আকসাদের খেতে দেওয়া হয়েছে ছাঁদে। বাড়িভর্তি মানুষজন। নিচতলায় মেজবাহ’র খালার বড় জায়েরা থাকেন। ওপরতলায় তারা।
দোতলায় ডাইনিং-এ বড়রা সবাই খেতে বসেছেন। মেজবাহ ডাইনিং-এ বসতে যাচ্ছিল। মিহি বড়ভাইকে টেনে নিজেদের সাথে নিয়ে এসেছে।
আকসার পাশেই ভাইকে বসিয়ে দিয়েছে ও। আকসার মনোযোগ ফোনের দিকে ছিল। মেজবাহকে আসতে দেখে নড়েচড়ে বসলো ও। লোকটা বোধহয় মাত্রই ফিরেছে এখানে। এতোক্ষণ কোথায় ছিল কে জানে! আকসা অবশ্য জিজ্ঞাসা করবে না। ও আড়চোখে মেজবাহকে দেখলো। মেজবাহ পাশে বসা মামাতো ভাই আফিফের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। পাশে মিহিও রিমুর সাথে গল্প করছে। বাকিরাও নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলায় ব্যস্ত। আকসা এই ফাঁকে পায়ের কাছে রাখা ফোনটা ধীরে ধীরে তুলে নিলো। ফোনে কল এসেছে মাত্র। এদিকে সামনে খাবার দেওয়া হচ্ছে। আকসা দ্বিধান্বিত হলো। হাত কাঁপছে ওর। কি করবে বুঝতে পারছে না৷ এখন খাবার না খেয়ে উঠলে সকলের চোখে পরবে। আবার এদিকে কল রিসিভ করাও জরুরি। যেভাবেই হোক এখান থেকে উঠতে হবে। খালামণি খাবার বেড়ে দিচ্ছেন সামনে। আকসা হঠাৎ পানির বোতল একটা তুলে নিয়ে উঠে গেল। খালামণি ওকে মাদুর থেকে উঠে যেতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কোথায় যাচ্ছো আম্মু?”

“এইতো একটু মুখ ধুতে যাচ্ছি খালামণি। জানি না কি হয়েছে। মুখ জ্বালাপোড়া করছে অনেক।”

আকসা মৃদু হাসার চেষ্টা করে কথাটা বললো। খালামণির ‘আচ্ছা যাও’ বলতে দেরি; ওর চট করে সরে যেতে দেরি হলো না।
.
.
এই বাড়িটা মান্দা আমলের মাঝারি আকৃতির দোতলা বাড়ি। গ্রাম হিসেবে এমন বাড়ি সচারাচর দেখা যায় না। তবে যৌথ পরিবারের জন্য একদম যথোপযুক্ত বলা চলে। এই বাড়ির ছাঁদটা ঠিক সোজাসাপ্টা নয়। বরং, এটা কতোগুলো ভাগে বিভক্ত বলা যায়। ছাঁদের পেছন দিকে বেশ খানিকটা অংশ রয়েছে। সামনের দিকে বসলে পেছন দিকটা দেখা যায় না। মাঝখানের ছোট চিলেকোঠার দেয়ালের জন্য আড়াল হয়ে থাকে। আকসা সেদিকেই চলে আসলো দ্রুত। ফোন সাইলেন্ট করা ছিল ওর। তখনও অনবরত বেজেই চলেছে। ও চটপট কল রিসিভ করে কানে ধরে অস্থির কন্ঠে বললো, “খেতে বসেছি আমি। এখন কল দিয়েন না প্লিজ। কেউ দেখে ফেলবে তো!”

ফোনের ওপাশ থেকে কিছু একটা বলা হতেই আকসা মৃদু হেঁসে বললো, “জানি। আমাকে তো প্রয়োজন আপনার। আমাকে যে খুব লাগবে, সেটাও জানি৷ তবে একটু সময় দিবেন তো। আমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ভাবতে হবে। যতোই হোক, এতোদিন পর! তা-ও ফেরাটা কি এতোই সোজা? যদি না ফেরা হয়, তখন? তখন আপনি কী করবেন? দুঃখে-বিরহে নদীতে ঝাঁপ দিবেন?”

আকসা কথা বলতে বলতে মৃদু হাসলো। ওপাশ থেকে বিপরীত ব্যক্তি কথা বলতেই ও পুনরায় বললো, “জি না, কেউ কিছু জানে না। আমি জানতেও দিবো না। চাই না, এদিকে কেউ কিছু জানুক বা আমাকে সন্দেহ করুক। আমি কারো কাছে ধরা পরতে চাই না। আপনার সাথে আমি যোগাযোগ রাখবো। সবসময়ই থাকবে। আপনি যেটা চান, সেটাও হবে। কিন্তু আমাকে একটু সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। আপনি প্লিজ অসময়ে কল দিবেন না। ধরা পড়ে গেলে সমস্যা হবে। আপনি আমাকে রাতে কল দিয়েন। তখন আমি লুকিয়ে আপনার সাথে কথা বলার চেষ্টা করবো। ওটা বেস্ট সময়।”

“আকসা!”

পেছন থেকে দৃঢ় কন্ঠস্বরটা শোনামাত্র আকসার হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠলো। কাঁপা কাঁপা হাতে দ্রুত ফোন কান থেকে নামিয়ে কল কেটে দিলো ও। চকিতে পিছু ফিরে দেখলো, ওর থেকে ঠিক হাত দুয়েক দূরে মেজবাহ কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আকসা হতচকিত হয়ে মেজবাহ’র চোখে চোখ রাখলো। ভ্রু কুঁচকে আছে তার। হাতদু’টো প্যান্টের পকেটে। চোখ সরু। তীক্ষ্ণ সরু সেই চোখজোড়া আকসার দিকেই তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। ওর মুখ পড়ছে যেন। আকসা না চাইতেও পিছু সরে গেল কিছুটা। মেজবাহ ধীর পায়ে এগিয়ে আসলো ওর দিকে। আকসা একেবারে ছাঁদের রেলিঙের সাথে মিশে গেল। হাতের ফোনটা ওড়নার নিচে লুকিয়ে ফেললো দ্রুত। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেজবাহ এই কাজটা খেয়াল করে আকসার দিকে দৃষ্টি ফেরালো। মেজবাহকে ওইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আকসার বুক ধুকপুক করতে লাগলো।

“খেতে যাচ্ছি। খালামণি ডাকছে বোধহয়।”

আকসা কোনোরকমে কথাটা বলেই দ্রুত যাওয়ার জন্য মেজবাহকে পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে ওর হাত খপ করে টেনে ধরলো মেজবাহ। আকসার হৃদপিণ্ড যেন কেউ খামচে ধরেছে— এই মুহূর্তে এমন অনুভূতি হচ্ছে ওর। একটা ঢোক গিলে নিলো ও।
আকসাকে সামনে টেনে এনে দাঁড় করালো মেজবাহ। আকসার বুক ধ্বক করে উঠলো। শরীর অবশ হয়ে যেতে লাগলো ওর। মেজবাহ ধরা গলায় প্রশ্ন করলো, “নার্ভাস তুমি?”

“উহুঁ।”

আকসা ঘনঘন মাথা নেড়ে জবাবটা দেয়। মেজবাহ পুনরায় জিজ্ঞাসা করে, “তাহলে কী? ভয় পাচ্ছো?”

“হুঁ? না!”

মেজবাহ’র প্রশ্নে আকসা কিঞ্চিৎ চমকে উঠে জবাবটা দিলো। ওর কথা শুনে মেজবাহ সামান্য হাসলো। হাসিটা কেমন অদ্ভুত। বোঝা গেল না, ঠিক কি কারণে হাসলো। আকসা মেজবাহ’র পুরো মুখে দৃষ্টি বিচরণ করে লোকটার হাবভাব বোঝার চেষ্টা করতে লাগলো। মেজবাহ সামান্য ঝুঁকে গম্ভীর গলায় বললো, “জানো তো মানুষ কখন ভয় পায়?”

“কখন?”

আকসা কাঁপা কাঁপা গলায় পাল্টা প্রশ্ন করলো। মেজবাহ জবাব দিলো, “যখন সে কোনো অন্যায় করে। বিনা কারণে তো আর মানুষের ভয় পাওয়ার কথা না। ব্যাসিক সাইকোলজি। বাই দ্য ওয়্যে, তারপর বলো, তুমি কী অন্যায় করেছো?”

মেজবাহ’র এমন সরাসরি প্রশ্ন করাতে আকসার চোখের পাতা কাঁপলো। ও আমতাআমতা করতে লাগলো।
“মেজবাহ আমি আসলে. . .খিদে পেয়েছে। খেতে যাবো।”

আকসা পুনরায় পা বাড়াতেই মেজবাহ ওকে টেনে আনলো আবার। এবার আর হাত ছাড়লো না। ধরে রাখলো শক্ত করে। হাতের বাহু চেপে ধরে নিজের কাছে টেনে এনে রেলিঙের সাথে মিশিয়ে নিলো ওকে৷ মেজবাহ একদম শান্ত। কিছু হয়নি যেন। ওর চোখেমুখে নির্বিকারত্ব। আকসা বুঝতে পারছে না, মেজবাহ কিছু বুঝেছে কিনা। লোকটার হঠাৎ এখানে আসার কি দরকার ছিল! আকসার ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড আফসোস হতে লাগলো। কেন যে এখন এখানে আসতে গেল! পরে কথা বললেও তো হতো।
মেজবাহ’র নিয়মিত ব্যায়ামকৃত শক্তপোক্ত হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও পারলো না আকসা। মেজবাহ ওকে সামনে প্রশ্ন করেই চলেছে। ‘কেন ভয় পাচ্ছো, কি করছো’— এসব। কিন্তু আকসা কোনো জবাব দিতে পারছে না। এবার মেজবাহ হুট করে বলে উঠলো, “রাতে কার সাথে এতো জরুরি কথা তোমার? কে সেই ব্যক্তি? যার সাথে রাতে লুকিয়ে কথা বলতে হয়, দিনে বলা যায় না! বলো আমাকে। আমারও তো জানা দরকার। কুইক আকসা! খাওয়া ছেড়ে উঠে এসেছি। টাইম ওয়েস্ট কোরো না আমার।”

আকসার থুতনি উঁচু করে ধরে বারবার প্রশ্ন করতে লাগলো মেজবাহ। আকসা পারলে কেঁদে ফেলে এবার। মুখের এক্সপ্রেশন আপাতত তেমনই ওর। মেজবাহ ওর ওই কষ্টদায়ক অবস্থা দেখেও গললো না৷ আকসাকে এবার টেনে ছাঁদের ওপরের সেই ছোট চিলেকোঠা ঘরটার ভেতরে নিয়ে গেল। আকসা ভয় পেল। মেজবাহ ওকে ভয় পেতে দেখে বললো, “ভয় নেই। তোমাকে এখানে আঁটকে রেখে যাবো না। চাই না, আমাদের স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যকার কথাবার্তা কেউ শুনুক। আমাদের ভেতরকার কনভারসেশন কারো সামনে রিভিল করতে রাজি নই আমি। তোমাকে ছেড়ে দেবো আকসা। কিছু বলবো না৷ জাস্ট আমার কোয়েশ্চনের অ্যান্সার দিয়ে দাও প্লিজ। রিকোয়েস্ট করছি।”

আকসা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কেঁদে ফেলবে— এমন একটা অবস্থা। মেজবাহ ওর কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে জবাবের আশায়। তবে আকসা একেবারে নিশ্চুপ। একটা কথাও বের হচ্ছে না ওর মুখ থেকে। হঠাৎ হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখা ফোনের স্ক্রিন জ্বলজ্বল করে উঠলো। আকসা একবার ফোন দেখে সামনে তাকিয়ে দেখলো, মেজবাহ কঠিন মুখে ওর ফোনস্ক্রিনের দিকেই তাকিয়ে আছে।
ফোনে কল এসেছে। সেটাই স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে।মেজবাহ তড়িৎ গতিতে ফোনটা টেনে নিলো আকসার হাত থেকে। কল রিসিভ করার চেষ্টা করলো। তবে কোনো লাভ হলো না৷ কল রিসিভ করতে হলে আগে ফোনের লক খুলতে হবে। মেজবাহ আকসাকে কঠিন সুরে জিজ্ঞাসা করলো, “লক বলো।”

“বলবো না। বলবো না আমি।”

আকসা আতঙ্কিত হয়ে বারবার মাথা নেড়ে জবাবটা দেয়। মেজবাহ এবার ছেড়ে দিলো ওকে। ফোনটা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিলো ঘরে পড়ে থাকা কাগজপত্রের স্তুপের ওপর। আকসা ভয়ার্ত চাহনিতে দেখলো মেজবাহকে। মেজবাহ রূঢ় স্বরে বললো, “পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষকে আমি সবসময় ঘৃণা করি। তাদের মধ্যে একপক্ষ হলো, প্রতারণাকারী। প্রতারকদের আমি খুব ঘৃণা করি। অনস অ্যা চিটার, অলওয়েজ অ্যা চিটার। দ্যাটস হোয়াই, আই হেইট চিটার’স।”

গম্ভীর গলায় কঠিন সুরে কথাটা আকসার দিকে ইঙ্গিতাত্মকভাবে ছুঁড়ে দিয়ে মেজবাহ উল্টোদিকে ফিরে এক কদম পা বাড়াতেই আকসা আচনক পেছন থেকে মেজবাহ’র হাতের বাহু গলিয়ে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। কান্নারত স্বরে বলে উঠলো, “আমি প্রতারক না মেজবাহ!”

চলবে

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply