সীমান্তরেখা
লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক
পর্ব_১১
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]
দুপুরের পর থেকে বাড়িতে আয়োজন শুরু হয়েছে। আত্মীয়-স্বজনেরা মোটামুটি সবাই এসেছেন। মেজবাহ’র ফুপুরা কাছাকাছি থাকেন বিধেয়, তারা আগেই চলে এসেছেন৷ মামাদেরকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। ছোট মামারা রওয়ানা দিয়েছেন সকালেই।
গতকাল রাতে মেজবাহ তার আব্বুকে কল করে জানিয়েছে, সে আজ রাজশাহীতে ফিরছে। ভোরে বাসে উঠবে। ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।
মেজবাহ’র মামনি তো ছেলের ফেরার আনন্দে আত্মহারা প্রায়। সেই রাত থেকে রান্নাবান্নার আয়োজন শুরু করেছেন তিনি। রাতে সেমাই রেঁধে ফ্রিজে উঠিয়ে রেখেছেন। ছেলে ফিরলেই তাকে খেতে দেবেন। ছেলেটা তার মোটেও মিষ্টি খেতে পারে না৷ তাই তার জন্য আলাদাভাবে মিষ্টি ছাড়া সেমাই রেঁধেছেন।
আকসা সকাল থেকে ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে। এসব থেকে নিস্তার পাওয়া যায় কিভাবে, সেটাই ভাবছে। রীতিমতো বিরক্ত ও। একজন ফিরছে, তাতে এতো আয়োজনের কী আছে? এমন তো না যে, দশ বছর পরে বিদেশ-বিভুঁইয়ে থেকে ফিরে আসছে! মাত্র দিন পনেরো কেটেছে তার এখান থেকে যাওয়ার। অবশ্য এসব আদিখ্যেতা মেনে নিতেই হবে। কারণ, মেজবাহ তার শ্বশুর-শাশুড়ির একমাত্র ছেলে এবং এই বাড়ির বড় ছেলে। পারলে সবাই তাকে মাথায় তুলে রাখে।
আকসা একবার ভাবলো, ও আজ বাপেরবাড়ি চলে যাবে কোনো অজুহাত দিয়ে। তবে পরবর্তীতে আবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলো, এমন সময়ে এই কাজটা শোভাজনক হবে না। ওর শাশুড়ি সামনাসামনি কিছু না বললেও নিশ্চয়ই মনঃক্ষুণ্ণ হবেন। এতোদিন পরে তার ছেলে বাড়িতে ফিরছে, এসময় তিনি অবশ্যই চাইবেন না, তার বৌমা বাপেরবাড়ি চলে যাক। ব্যাপারটা কেমন দৃষ্টিকটু দেখায়। এবং শাশুড়ি তাদের ভেতরকার সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহও করতে পারে— এই আশঙ্কায় আকসা এখান থেকে চলে যাওয়ার পরিকল্পনাটা বাদ দিলো।
.
.
তখন বেলা পেরিয়ে গেছে। ধরণীতে সন্ধ্যা নামতে আর খু্ব বেশি দেরি নেই।
আকসা পড়ার টেবিলে বসে ক্লাসের পড়াগুলো কমপ্লিট করে রাখছিল।
তখনই জেমি আপু বাবুকে নিয়ে আকসার ঘরে এলেন। জেমি আপুকে দেখে আকসা চটজলদি বইপত্র বন্ধ করে এসে আপুকে বিছানায় বসার জায়গা করে দিলো। জেমি আপুকে বেশ সম্মান করে আকসা। আপু খুব চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। একমাত্র মেজবাহ’র সাথেই মনখোলা তিনি। মেজবাহও তেমনই। চুপচাপ স্বভাবের হলেও আপুর মধ্যে কি যেন একটা আছে। এক অলৌকিক শক্তি, যা তার দিকে আকর্ষিত করে সবাইকে। এজন্য সবাই তাকে বড্ড পছন্দ করে, বড়রা ভীষণ স্নেহ করে আর ছোটরা সম্মান করে। আকসাও তার ব্যতিক্রম নয়।
জেমি আপুর কোল থেকে আয়ানকে নিয়ে ওর সাথে খেলতে ব্যস্ত হলো আকসা। উঠে গিয়ে নিজের ভার্সিটি ব্যাগ থেকে আয়ানের জন্য এনে রাখা চকলেটগুলো বের করে ওর হাতে দিলো। আয়ান চকলেট পেয়ে খুশি হয়ে আকসার গালে একটানা কতগুলো চুমু খেয়ে আধো আধো গলায় বললো, “লাবু মামি। তুমি কুব বালো মামি।”
আকসা মৃদু হাসলো। জেমি আপুর দিকে চোখ পরতেই দেখলো, আপু ওর দিকেই একধ্যানে তাকিয়ে আছেন। যেন, আকসাকে দেখে গভীরভাবে কিছু ভাবছেন তিনি। আকসা একটু ইতস্ততবোধ করলো। হঠাৎই জেমি আপু বলে উঠলেন, “ভাইয়ের সাথে তোমার কথা হয় আকসা?”
হঠাৎ এমন প্রশ্ন! আকসা বিচলিত হলো। মেজবাহ’র সাথে তো ওর কথা হয় না। জেমি আপুকে কী জবাব দেবে এখন? তাহলে কি মিথ্যা বলবে? নাকি সত্যিটাই বলে দেবে? আবার সত্যি কথা বললে যদি পাঁচ কান করে কথাটা ছড়াছড়ি হয়ে যায়? তখন তো আরেক ঝামেলা!
“জি মানে আপু…”
আকসা আমতাআমতা করতে লাগলো। জেমি আপু আচনক ওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “কথা হয়না, তাইতো?”
আকসা মৃদু চমকালো। জেমি আপু এতোটা নিশ্চিত হয়ে একথা কীভাবে বললেন? অবাক হওয়ার মতোই বিষয়। ওকে আরো বেশি আশ্চর্যন্বিত করে জেমি আপু বললেন, “জানতাম এমনটাই হবে। একটু সমঝে-বুঝে চলো আকসা। ভাই কষ্ট পাবে, এমন কোনো কাজ কখনো কোরো না। এমনিতেই আমার ভাইটা কেমন জানো তো? ও সহজে কারো ওপরে রাগ করে না। তবে একবার যদি কারো দ্বারা আঘাত পায়, তবে দ্বিতীয়বার তার মুখোমুখি ঘুরেও দাঁড়ায় না। সেটা ভালোবাসার বিষয় হলেও না। আমার ভাই ও। ছোটবেলা থেকে ওকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি আমি। ওকে আমার চাইতে ভালো আর কেউ চেনে না। একবার কেউ ওর আত্মসম্মানে আঘাত করলে সেই মানুষটাকে ও আর কোনোদিনও মনে জায়গা দিতে পারে না, তার থেকে বরাবরই দূরত্ব বজায় রেখে চলে। তাই তোমাকে সাবধান করছি আকসা, একটু বুঝে-শুনে চলো। এমনিতেই তুমি যা করেছিলে. . .”
আকসা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো জেমি আপুর দিকে। আপুর মুখে এমন সতর্কবাণী! আকসা কিছুটা বুঝেছিল, আপু হয়তো কিছু জানে। তবে আজ তার কথায় মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেল। আকসা কিছু বলতেই যাচ্ছিল। তবে জেমি আপু কথা বাড়ালেন না। বসা থেকে উঠে বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে আকসাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আয়ানকে একটু দেখে রেখো। বাইরে অনেক কাওয়াজ হচ্ছে তো, ওকে ওখানে নেওয়া যাবে না। আমি রান্নাঘরে মামিদের একটু হেল্প করে আসি। আর হ্যাঁ… ভাই তো ঘন্টাখানেকের মধ্যেই চলে আসবে। কল দিয়েছিল আমাকে। অন দ্য ওয়্যেতে আছে। তুমি ঘরটা একটু পরিপাটি করে রেখো। ভাই আবার অগোছালো কোনোকিছু পছন্দ করে না। আর তুমি কামিজ পাল্টে পারলে একটা শাড়ি পড়ে নিও, কেমন? আসি আমি।”
জেমি আপু বাইরে চলে গেলেন। আকসা একটা গাঢ় দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। তারমানে জেমি আপু সব জানেন, সবটাই। কবে থেকে জানেন? হয়তো সেই শুরু থেকেই। কারণ, আকসা এতোদিনে একথা খু্ব ভালোভাবে বুঝে গেছে যে, মেজবাহ এবং জেমি আপু আপন ভাই-বোনের মতো। বেস্টফ্রেন্ড বলা চলে তাদের। মেজবাহ জেমি আপুকে সব কথা শেয়ার করেন। যখন যা ঘটে, সবকিছুই। জেমি আপু আকসাকে কেমনভাবে দেখেন, কে জানে! আকসা ভেবেই চরম অস্বস্তিতে পরলো। ওর পড়ার টেবিলের ওপরে রাখা কিউব আর স্ট্রেস বলটা এনে আয়ান বাবুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঘরটা পুরোদমে পরিপাটি করে গুছিয়ে ফেললো। ওর কানে একটা কথা-ই বারবার বাজছে— “আমার ভাই অগোছালো কোনোকিছু পছন্দ করে না।”
সবকিছু পরিপাটি করে গোছানো হলেও আকসা শাড়ি পরলো না। পরনের যেই পোশাকটা ছিল, সেটা পাল্টেও ফেললো না। খোলা চুলগুলো শুধু বেণী করে সামনের দিকে বুকের একপাশে ফেলে রাখলো।
.
.
আয়ানকে জেমি আপুর কাছে দিয়ে সবে ঘরে এসে ফোনটা হাতে নিয়ে বসেছে আকসা। তখনই রিমু বাইরে থেকে দৌড়ে ভেতরে আসলো। ওর চেঁচামেচিতে কানের বারোটা বেজে গেছে আকসার। ও কানে হাত চেপে ধরে রেখে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো, “কী হয়েছে রিমু? চেঁচাচ্ছো কেন?”
“ভাইয়া, ভাইয়া এসেছে!”
রিমু হাঁপাতে হাঁপাতে কথাটা বললো। আকসা চরম বিরক্ত হয়ে বললো, “তাতে আমি কী করবো? এতো এক্সাইটেড হওয়ার কী আছে?”
রিমু আকসার বিরক্তিটা ধরতে পারলো না। ও পুনরায় বললো, “তাহসিন ভাইয়াকে আনতে গেছে বাইরে। ভাইয়ার হাতে অনেকগুলো লাগেজ আর ব্যাডিং তো। ওইযে আসছে মনে হয়।”
নিচতলায় গেটের কাছ থেকে তাহসিনের আনন্দে করা চেঁচামেচির শব্দ শুনে রিমু সেদিকে ইঙ্গিত করে আকসাকে টেনে ব্যালকনিতে নিয়ে গেল৷ ব্যালকনির সোজাসুজি-ই গেইট। ব্যালকনি থেকে সোজা নিচের দিকে তাকাতেই আকসা দেখতে পেল, মেজবাহ তাহসিনের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। মেজবাহ’র হাতে কোনো ব্যাগ নেই। শুধুমাত্র সানগ্লাসটা। তাহসিনের হাতে সব লাগেজ আর ব্যাগ।
রিমু আকসাকে ওখানে রেখেই বাইরে দৌড় দিলো। আকসা ভেবে পায় না, এই লোকের বাসায় ফেরা উপলক্ষ্যে সবাই এতো বেশি খুশি হয় কেন? মনে হয়, যেন ইদের চাঁদ উঠেছে আকাশে। আকসার তো কোনো আনন্দ-ই হচ্ছে না। বরং, মনে মনে উল্টো আরো আতংকিত হচ্ছে ও। তাহসিন লাগেজগুলো নিয়ে আগেই গেইটের ভেতরে ঢুকে কেচিগেইট খুলে বাসার ভেতরে চলে আসলো। মেজবাহ হাঁটছিল পেছনে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল ও। আকসা ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলো, মেজবাহ ফোনটা পকেট থেকে বের করে কানে ধরেছে। কারো কল এসেছে বোধহয়। আকসার মাথায় হঠাৎ একটা কুকাজ করার বুদ্ধি আসলো। যেই কথা, সেই কাজ! ও দ্রুত ব্যালকনি ছেড়ে ঘরের ভেতরে যেয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। আকসা যখন বেরিয়ে আসলো, তখন ওর হাতে একটা নীল রঙের মগ। এই মগ গোসলের কাজে ব্যবহৃত হয়। মগভর্তি পানি টইটম্বুর। আকসা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো। মেজবাহ তখনও ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত। আকসা দুই মিনিট অপেক্ষা করলো। মেজবাহ কথা বলা শেষ করে ফোনটা কান থেকে নামাতেই তৎক্ষনাৎ ও মগভর্তি পানি সোজা নিচের দিকে ঢেলে দিলো! সম্পূর্ণ পানিটুকু গিয়ে মেজবাহ’র মাথা ছাড়িয়ে গায়ের ওপর পরলো। মেজবাহ’র পরনের অফ হোয়াইট টি-শার্ট আর সম্পূর্ণ ভিজে গেল। সাথে প্যান্টও। আকসা ক্রুর হেঁসে বিরবির করে বললো, “স্বাগতম জনাব মেজবাহ ইফতেখার!”
চোখের পলকে আকসা সেখান থেকে দৌড়ে সরে গেল। মেজবাহ আকস্মিক এমন ঘটনায় কিছু মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে ছিল। চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলে নিয়ে ও পানি পরার উৎস খোঁজার জন্য ওপরে তাকাতেই নিজ রুমের ব্যালকনির দিকে চোখ গেল ও। পানিটা ওখান থেকেই ফেলা হয়েছে। এছাড়া বাসার আর কোনো ঘরের ব্যালকনি এই গেইটের মুখোমুখি নয়। মেজবাহ’র এটুকু বুঝতে কিঞ্চিৎ অসুবিধাও হলো না। ও একদম শান্ত রইলো। গটগট পায়ে হেঁটে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো।
.
.
আকসা তাদের ঘরে নেই। মিহি আর রিমুর একটাই ঘর। সেই ঘরে এসে অনেকক্ষণ যাবত ঘাপটি মেরে বসে আছে ও। শুনেছে, মেজবাহ এসেই আগে নিজ ঘরে গিয়ে জামাকাপড় পাল্টে এসে ড্রয়িংরুমে বসেছে। তার নাকি সম্পূর্ণ শরীর ভেজা ছিল। সবাই জিজ্ঞাসা করেছে, কিভাবে ভিজে গিয়েছে। তবে মেজবাহ কাউকে কিছুই বলেনি। এই নিয়েই মিহি আর রিমু ওর সামনে কিছুক্ষণ আলোচনা করলো। আকসা ঠোঁট চেপে হাসছিল ওদের কথাবার্তা শুনে।
আকসাকে বাইরে ডাকা হয়েছে একবার। তবে ও মাথাব্যথার দোহাই দিয়ে এই ঘরেই রয়ে গেছে। রাত আটটা অবধি ও এই ঘরে একা নিশ্চিন্তেই বসে ফোন স্ক্রল করতে লাগলো। হঠাৎ রিমু বাইরে থেকে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললো, “ভাবী, জলদি ঘরে যাও। ভাইয়া তোমাকে জরুরি তলব করেছে।”
মেজবাহ ডেকেছে! এখনই ওই ঘরে যেতে হবে! আকসার বুকে কম্পন সৃষ্টি হলো। অজানা আশঙ্কায় শরীর পুরো ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগলো ওর। আজ মেজবাহ বোধহয় ওকে ওই ব্যালকনি থেকেই ছুঁড়ে ফেলবে!
চলবে
Share On:
TAGS: ঝিলিক মল্লিক, সীমান্তরেখা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
উড়াল মেঘের ভেলায় গল্পের লিংক
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ২০
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৩
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৮
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৭
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১২
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৯
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১০
-
সীমান্তরেখা পর্ব ১
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ২৩(সমাপ্ত)