সমুদ্রকথন
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
সূচনা পর্ব
❝ সিকদার বাড়িতে আজ আয়োজনের তোড়জোড়। চারদিকে ম ম করা খাবারের ঘ্রাণ। বসার ঘর থেকে সিঁড়ির ওপরটাও ফুল দিয়ে সাজানো। বাড়ির চার কর্তার হাক-ডাকে পুরোদস্তুর সরব নিবাস। পিউ ঘেমে-নেয়ে মাত্রই ঢুকলো। গোটা ঘরের চোখ ধাধানো সাজগোজের চেয়েও খাবারের গন্ধে পেট মুচড়ে উঠল তার। সেই কোন সকালে স্কুলে গিয়েছিল। তারপর কোচিং,রাস্তার এক গাদা জ্যাম পার করে মাত্রই এসেছে। এত গরম যে পরনের ইউনিফর্মটা অবধি ভিজে লেগে গেছে পিঠে। তবে মনে হলো না বাড়ির কারোর ওর দিকে চোখ-টোক পড়বে। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। ওই তো অদূরে আব্বু হাত তুলে তুলে লোকজন দিয়ে ফুল টানানোর তর্জন-গর্জন দিচ্ছেন। মেজো চাচ্চু – ছোটো চাচ্চুর সাথে কী নিয়ে যেন আলোচনায় মশগুল! সেজো চাচ্চুও রাঙামাটির কাজবাজ ফেলে গতকাল বাড়ি চলে এসেছেন। পিউ চুপচাপ ঘরের পথ ধরল। এই বিশাল ভবনের দোতলায় তার কামরা। ছিমছাম, পরিপাটি! যদিও আজ অবধি কোনো গোছগাছ পিউ নিজের হাতে করেনি। ও যাওয়ার পর হয় মা,নাহয় মেজো মা করে দেন। পিউ সবে কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামাল,
তক্ষুনি কোত্থেকে ছুটে এলো পুষ্প। হড়বড় করে বলল,
“ এসে গেছিস? তোর জন্যেই বসেছিলাম।”
পিউ কপাল কুঁচকে বলল,
“ কিন্তু তুই তো দাঁড়িয়ে আছিস।”
“ উফ,বাজে কথা ছাড়। আচ্ছা এই দুটোর মধ্যে আমাকে কোন জামাটায় মানাবে বলতো।”
দু রঙের দুটো চুরিদার পুষ্প দুহাত দিয়ে বাড়িয়ে ধরে। ঠোঁটে তার টইটম্বুর হাসি। পিউ নাক-চোখ কুঁচকে বলল,
“ আচ্ছা,তোরা সবাই এমন অতিরিক্ত আহ্লাদ করছিস কেন বলতো আপু। মা-মেজো মায়েদের ব্যাপারটা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু তুই কেন এরকম ঝাকানাকা জামাকাপড় পরবি? বাড়ির ছেলে বাড়ি ফিরছে,তোর জন্যে তো পাত্রপক্ষ আসছে না।”
পুষ্প চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ বেশি পকরপকর করিস না। বাড়িতে কত আত্নীয়-স্বজন আসবে জানিস? সবগুলো গেস্ট রুম অলরেডি বুকড। মামারাও প্রায় কাছাকাছি। আব্বু আজ গোটা গোষ্ঠী দাওয়াত দিয়েছেন। তার মধ্যে কি আমি ছেড়া জামা পরে যাব?”
পিউ ক্লান্ত শ্বাস ফেলল। তার এসব ভালো লাগছে না। বাড়ির ছেলে বাড়ি আসবে,তা নিয়ে সবার কী গদগদ ভাব! সবথেকে দুঃখ লাগছে মেজো মায়ের আদরটা এবার দুভাগ হয়ে যাবে। নিজের ছেলে এলে কি আর মেজো মা ওকে এত ভালোবাসবেন? তখন ছেলে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবেন না? তখন পিউকে কে চুল বেঁধে দেবে? মা বকতে এলে কে বাঁচাবে? ও
অনীহ চিত্তে আঙুল দিয়ে দেখাল একটা জামা।
“ এটা পর।”
পুষ্প তড়িৎ জামাটা নিয়েই ঘরে ছুটে গেল। পিউ তাজ্জব হয়ে বলল,
“ এ আজকে একটু বেশিই খুশি!
ধুর,তাতে আমার কী? আমার এখন খুব খিদে পেয়েছে। খেতে পারলেই হবে।”
পিউ মুখ কালো করে ওয়াশরুমে ঢুকল। আজকে এ বাড়ির বড়ো ছেলে নিউইয়র্ক থেকে ফিরছে। তাও পাক্কা সাত বছর পর। শুনেছিল,একটা চরম বেয়াদবির কেসে আব্বু তাকে বেধরম পিটিয়ে দেশ ছাড়া করেছেন। তারপর থেকে ছেলে আর বাড়িমুখো হয়নি। জেদ করে নিজের একটা ছবিও পাঠায়নি। ভিডিও কলে আসা তো দূর। মাঝেমধ্যে মায়েদের সাথে কলে কথা শেষ করতেন,খবরাখবর দিতেন ব্যস ওইটুকু। তাই এখনো কেউ জানে না সে লোক দেখতে কেমন! সাত বছরে নিশ্চয়ই অনেক বদলে গেছে!
পিউয়ের বয়স তখন মাত্র ৮। তাই ওর কিছু মনে থাকা তো দূর,মাথাতেও নেই। আর সে মাথাতে আনতেও চাইছে না। যে লোক আব্বুর মার খেয়ে বাড়ি ছাড়ল,তিনি নিশ্চয়ই সাধুবাবা নন!
পিউ সকালে শাওয়ার নিয়েই স্কুলে গিয়েছিল। তাই কোনোরকম হাত মুখ ধুয়ে,জামা পালটে নিচে নেমেছে। সামনে তার এস এস সি পরীক্ষা। সেজন্য এখন পড়াশোনার প্রচুর চাপ। বাড়ির এই আড়ম্বরপূর্ণ ব্যাপারস্যাপারেও ক্লাস মিস দিতে পারেনি।
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে দেখল,বাড়ির চার গিন্নিরা সমানে ছোটাছুটি করছেন। সদ্য এসে বসা অতিথিদের আপ্যায়নে তটস্থ সবাই। এমনকি পুষ্পও বিশ্রাম নিতে পারছে না।
পিউ গলা তুলে আবার আশেপাশে তাকাল। সাদিফ,রাদিফ আর সেজো চাচ্চুকে দেখা যাচ্ছে না।
ও নেমে দাঁড়াল এক কোণে। তখন সামনে দিয়ে হন্তদন্ত পায়ে রান্নাঘরে যাচ্ছিলেন মিনা।
ওকে দেখেই বললেন,
“ ওমা,তুই কখন এলি?”
“ আমিতো….
ভদ্রমহিলা কথা টেনে নিলেন। পালটা প্রশ্ন করলেন,
“ কিছু খেয়েছিস?”
পিউ ফের কথা হাঁ করতে গেলে এবারেও কথা টেনে নিলেন তিনি,
“ আর এ কী, তুই এমন একটা ম্যাড়ম্যাড়ে জামা পরেছিস কেন? কত লোক বাড়িতে। যা যা গিয়ে পালটে আয়। আমি যাই,অনেক কাজ! ধূসর এয়ারপোর্টে নেমেছে। বলতে বলতে চলে আসবে। খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে না!”
নিজের মতো হড়বড়িয়ে বলে চলে গেলেন মিনা। পিউ ঠোঁট ফোলায়। ওর কথা যদি নাই শুনবে জিজ্ঞেস করল কেন? হুহ,আসতে না আসতেই সারাদিন শুধু ধূসর ধূসর আর ধূসর।
তক্ষুনি হইচই শুরু হলো। বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে একটা সাদা গাড়ি ঢুকছে। কেউ একজন চ্যাঁচাল,
“ চলে এসেছে,চলে এসেছে। ধূসর চলে এসেছে…”
পুষ্প সবার হাতে হাতে শরবতের গ্লাস দিচ্ছিল। ঘোষণা শুনেই সোজা হলো তড়িৎ। ট্রে নামিয়ে রেখেই উদ্বেগী পায়ে ছুটে এলো গেইটে। যেতে যেতে চ্যাঁচাল,
“ মা,মেজো মা, সবাই এসো। ভাইয়া এসে গেছে।”
বাড়ির বড়ো কর্তা আমজাদ সিকদার ফোনে কথা বলছিলেন। লাইনটা কেটেই জোরালো পায়ে এগোলেন তিনি। গলা তুলে বললেন,
” আফতাব,আফতাব নিচে এসো। ওরা ওকে এসে গেছে তো।”
গিন্নিরাও কেউ থেমে নেই,যে যার মতো চঞ্চল কদমে সদর দরজা পার হলেন। পিউ এগোলো আস্তেধীরে।
তার বাসিমুখে হাসি নেই। পেটের ভেতর ইঁদুর চ্যাওম্যাও করছে। অথচ ওর নিজের মা-ও একটু খবর নিলো না!
ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়েদের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। পনের বছর বয়সে আর উচ্চতাই বা কত! বড়ো বড়ো মানুষগুলোর পেছনে ক্ষুদ্র শরীরটা হারিয়ে গেল তাই।
বাড়ির একদম সামনে এসে দাঁড়াল গাড়িটা। মূহুর্তে রাদিফ, আজমল নামলেন।
ড্রাইভারের পাশের জানলায় বসা সাদিফও তড়িঘড়ি করে নামল।
হইহই করে বলল,
“ পুষ্প ফুল ছেটা,ফুল ছেটা। কী রে ফুল কই?”
পুষ্পর ব্যগ্র চাউনি অন্য কোথাও। ঘাড় উঁচিয়ে সে ভিন্ন কাউকে খুঁজছে। কথাটায় নড়েচড়ে চাইল,
“ হ্যাঁ? ফুল! ফুল তো আনিনি।”
সাদিফ চ সূচক শব্দ করল। চশমাটা নাকের ডগায় ঠেলে গমগম করে বলল,
“ তুই কোনো কাজের না। পিউকে বললে ও ঠিক করে রাখতো।”
পুষ্প ঠোঁট উল্টাল।
ও কি আজ নিজের মাঝে ছিল নাকি। সারাদিন অপেক্ষার উচাটনে মরেছে। আর সেই উচাটন কমাতেই পেছনের দরজা খুলে পাঞ্জাবি পরা এক সুদর্শন যুবক নামল। যার আড়চোখের নজরটা প্রথমেই বর্তাল,পুষ্পর পানে। অমনি শিরদাঁড়া সোজা করে ফেলল মেয়েটা। চোখসহ চিবুক ঝটপট নামিয়ে নিলো গলায়। ততোধিক দ্রুত চোখ সরাল ইকবাল। ঠোঁটে হাসি টেনে,
খুব উৎফুল্ল গলায় বলল,
“ আসসালামু আলাইকুম। আন্টি, কেমন আছেন আপনারা?”
মিনা বেগম গদগদ হয়ে বললেন,
“ ওমা ইকবাল! এসেছ তাহলে। আমিতো ভাবলাম আজকেও পাবো না তোমাকে।”
“ কী যে বলেন আন্টি,আমার জান-প্রাণ,কলিজার অর্ধেক ফেরত এলে, আমি না এসে পারি? অন্তত ওর খাবার-দাবারে ভাগ বসাতে হলেও আমাকে আসতে হতো আন্টি!”
আমজাদ সিকদার এতক্ষণ উদগ্রীব হয়ে ছিলেন। ইকবালকে দেখেই ভ্রুতে ভাঁজ পড়ল। বিরক্তিতে গুটিয়ে বসল নাকটা। এই অকর্মা ছেলের আজকেই আসা চাই? যেই খবর পেয়েছে ধূসর ফেরার,অমনি হাজির। আবার রিসিভ করতে এয়ারপোর্টেও গেছিল?
ইকবাল তাকাল তখনই। ভদ্রলোকের তপ্ত চোখে যেন ঝলসে গেল ছেলেটা। মিনমিনে গলায় বলল,
“ আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল। ভালো আছেন?”
আমজাদ গলা ঝারলেন। থমথম করে বললেন,
“ আছি। তুমি?”
ইকবাল ফোস করে শ্বাস ফেলল। মনে মনে বলল,
“ আপনার মেয়ে স্বপ্নে এসে যা জ্বালিয়ে মারছে। আর ভালো থাকা!”
কিন্তু মুখে হাসল সে। মাথা নেড়ে বলল,
“ ভালো।”
রুবায়দা আকুল হয়ে বললেন,
“ কই,আমার ছেলে কই?”
ভাবির অস্থিরতায় আজমল হাসলেন। পিছু ফিরে দরজা খুলে বললেন,
“ কী রে আয়।”
দু সেকেন্ড পর এক জোড়া চকচকে জুতো পরা পা মাটিতে এসে দাঁড়াল । বেরিয়ে এলো একটা লম্বা-চওড়া শ্যামলা দেহ। রুবায়দা অমনি ছুটে গেলেন। দুহাতে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন হাউমাউ করে। হাহাকার করে ডাকলেন,
“ ধূসর,আমার ধূসর।”
এতক্ষণের নীরস পিউ একটু উৎসুক হলো এবার। ওপাশে কী হচ্ছে দেখবে না!
ভিড়ভাট্টা দুহাত দিয়ে ঠেলে ঠুলে কোনোরকম মাথাটা বের করে উঁকি দিলো সে। গাড়ির কাছের ছোট্টো জটলা ছাপিয়ে দীর্ঘদেহী মানুষটাতেই চোখ পড়ল প্রথমে। একটা শ্যামলা চেহারা! গোছানো ট্রিম করা চুল। হালকা খোচা দাড়ি, পরনে সাদা শার্ট। চোখা নাক,চিকণ দুটো চোখের সাথে পুরুষালি পাতলা রক্তাভ ঠোঁট নাড়িয়ে মাকে কিছু বলছে সে। এত বছর পর বাড়ি ফিরলেও,সৌজন্যতার খাতিরেও মুখে এক টুকরো হাসি নেই। গম্ভীর আদল,কপালে ভাঁজ ফেলে মায়ের চোখের পানি মুছল শুধু।
অথচ অকারণে ছ্যাৎ করে উঠল পিউয়ের বুক। মুগ্ধতার জোরালো কম্পনে হৃদয়ের একটা সুনিশ্চিত কম্পন হারালো বহুদূর। হাঁ হওয়া ঠোঁটের সাথে ফ্যালফ্যাল করে তামাটে পুরুষ পানে চেয়ে রইল সে। চোখ ঝাপটে ঝাপটে ভাবল,
“ বাবারে বাবা!
এটা আমার কাজিন!
এ তো আস্ত একটা ডেইরিমিল্ক রে ভাই।”
পিউ চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ধূসরের পা হতে মাথা অবধি মাপল। এত সুন্দর, এত ধারালো মুখের গড়ন, এমন লম্বা! ওমা, এ যে পুরো বোমা!
এই এটম বোমকে এখন পিউ ভাই ডাকবে কেমন করে?”
(০২)
পিউ এক ছুটে ঘরে চলে এলো। দরজা চাপিয়ে পিঠ ঠেসল তাতে। বুকে হাত দিয়ে বলল
“ হায় আল্লাহ, এ আমি কী দেখলাম? কাকে দেখলাম? কেন দেখলাম! কেউ এতটা হ্যান্ডসাম কী করে হয়!”
পিউ তড়িৎ ছুটে এসে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
নিজের এই অগোছালো,ম্যাড়মেড়ে বেশভূষা দেখে কুঁচকে বসল কপাল। মনে হলো অমন সুন্দর মানুষটার পাশে ওকে একটুও মানাবে না। সাজতে হবে,প্রচুর সাজতে হবে।
পিউ তাড়াহুড়ো করে নতুন জামা নিয়ে ওয়াশরুমে ছুটল। পালটে এসে বেনি খুলে চুল খুলে ছড়িয়ে দিলো পিঠে। পুরন্ত ঠোঁট জোড়া ভরে ম্যাচিং লিপস্টিক পড়ল,কাজল টানল টানা টানা চোখে। কপালে টিপ পড়ল ছোট্ট দেখে। হাতের কব্জি ভরল রেশমি চুড়ি দিয়ে। সব শেষ করে ফের দেখল সুন্দর লাগছে কিনা। লাগছে বোধ হয়। পিউ স্লিপার পরতে গিয়ে থামল আবার। মানুষটা তো খুব লম্বা! ও পাশে দাঁড়ালে ছারপোকার মতো লাগবে। কিন্তু ওর যে হিল জুতোও নেই, কী করবে এখন!
পিউ মাথা চুলকায়,ভাবে। তারপর ছুটে যায় পুষ্পর রুমে। তার শেল্ফে কয়েক রকম জুতো দিয়ে ভরা। পুষ্প নতুন এক জোড়া জুতো খুব দাম দিয়ে কিনেছিল। এখনো প্যাকেটও খোলেনি। পিউ তাড়াহুড়ো করে ওটাই পরল পায়ে। কিন্তু ওর থেকে এক ইঞ্চি বড়ো,ঢিল হচ্ছে তারওপর।
এটা পরে ও সিঁড়ি বেয়ে নামতে পারলেই হলো!
পিউ যখন বসার ঘরের কাছাকাছি এলো,তখন সারাদিকে মানুষ গিজগিজ করছে। ওই তো ওর একমাত্র প্রিয় বন্ধু তানহাও হাজির। কী সেজেগুজে এসেছে রে!
পিউ ছুটতে গিয়েও নিজেকে সামলায়। হাতল ধরে ধরে খুব সাবধানে নামে।
ধূসরকে সোফায় বসানো হয়েছে। তার চারপাশ ঘিরে অসং্খ্য মানুষ। আত্নীয়-স্বজন প্রত্যেকে কুশলাদি জানতে মশগুল হয়ে পড়েছেন। এখনো ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছেন রুবায়দা। এত বছর পর ছেলেকে কাছে পেয়ে চোখের পানি যেন থামে না। ধূসরকে দেখে মনেও হলো না মায়ের কান্নাকাটিতে বিরক্ত সে। বরং খুব শান্ত হয়ে থেকে সবার সাথে কথাবার্তা বলছে। যতবার পাতলা ঠোঁট জোড়া নড়ছে,কপালে ভাঁজ পড়ছে একটু।
মাঝেমধ্যে আঙুল তুলে ঘষছে থুত্নিতে। আর ঠিক ততবার একটু করে খেই হারাচ্ছে পিউ। উফ,একটা মানুষ এত চমৎকার দেখতে কেন হবে! কেন?
তানহা সেসময় পাশে এসে দাঁড়াল। ফিসফিস করে বলল,
“ পিউ,তোর কাজিনটা কী হ্যান্ডসাম রে ভাই! ক্রাশ খেয়ে ফেললাম। আল্লাহর দুনিয়ায় সব হ্যান্ডু ছেলে কেন শিকদার বাড়ির হবে?”
পিউ চোখ রাঙিয়ে বলল
“ একদম নজর দিবি না।”
“ কেন?”
পরপরই তানহা ভ্রু কপালে তুলে বলল
“ কী রে ভাই,তুই কি ওনার প্রেমে-ট্রেমে পড়েছিস নাকি!”
পিউ হাসল,মাথা নাড়ল গর্ব করে।
জবা বেগম হঠাৎই তাকালেন ওর পানে।
“ ওমা পিউ,তুই ওখানে দাঁড়িয়ে কেন? ভাইয়ের সাথে আলাপ হয়েছে? আয় এদিকে আয়।”
পিউ নড়ে উঠল।
রুবায়দা বললেন,
“ আয় পিউ। ধূসর, ওর কথা তোর মনে আছে? তুই যখন গেলি, ও তখন খুব ছোটো ছিল।”
ধূসর পাশ ফিরে চাইল এতক্ষণে। সেই প্রথম হলো চোখাচোখি। ছুরির ফলার মতো চাউনিটা সোজাসুজি বর্তাতেই পিউয়ের কলিজা সুদ্ধ ছলাৎ করে ওঠে। শুকিয়ে আসে বুকের ধার। বাপ্রে,এত মারাত্মক দৃষ্টি কারো হয়?
এগোবে কী,পা-ই তো চলছে না। এত দেরি দেখে মিনা খ্যাক করে উঠলেন,
“ কী রে,ডাকছে শুনতে পাচ্ছিস না? আয়।”
পিউ মায়ের ধমকে একটু তাড়াতাড়ি আসতে চাইল। একে ঢিলে জুতো,তারওপর হিল! পা-টা বাড়াতেই নড়েবড়ে জুতো কাত হয়ে,ধপাস করে পড়ে গেল অমনি। ধূসর তাকিয়েছিল,একটু চমকে যাওয়ার ছাপ পড়ল মুখে। পরপরই কপালে হাত ঘষতে ঘষতে নিঃশব্দে হেসে ফেলল সে। একই সঙ্গে হুহা করে হেসে উঠল বাকিরাও। তানহা পারছে না হাসির চোটে ফ্লোরে শুয়ে পড়তে।
কিন্তু মুখখানা চুপসে গেল পিউয়ের। এক ঘর মানুষের মাঝে এমন আছাড় খাওয়ায় লজ্জায় মিশে রইল মাটিতে। রুবায়দা ছুটে আসছিলেন ওকে ধরতে,কিন্তু পিউ সুযোগটুকু দিলো না। উঠেই ছুটল। কিন্তু দু পা এগোতেই দুম করে পড়ে গেল ফের। অমনি হাসির তোড়ে ঘর ছেঁয়ে গেল। পিউ লজ্জায় কী করবে বুঝতে পারল না। ধূসরের সামনে দু দুবার আছাড় খেয়ে ওর কি এখন কেঁদে মরে যাওয়া উচিত!
আমজাদ শিকদার অনেকক্ষণ নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন,যাতে ধূসরের কাছে যেতে না হয়। গেলেই কথা বলতে হবে। ওসব তিনি পারবেন না। এদিকে বাড়িতে আসা পুরুষ আত্নীয়দের নিয়ে আলোচনায় মশগুল থাকার নাটকটাও বেশিক্ষণ ধরে রাখা যাচ্ছিল না। মিনা বারবার এসে ঘুরে যাচ্ছেন। রুবায়দাও ডাকছেন।
উফ, কেউ তার দিকটা বুঝতেই চাইছে না। এর মাঝেই আফতাব পাশে এসে দাঁড়ালেন। মিনমিন করে ডাকলেন,
“ ভাইজান,ইয়ে…”
আমজাদ বললেন,
“ ইয়ে থেকে এবার একটু সামনে এগোও আফতাব। তখন থেকে এসে শুধু ইয়ে ইয়েই করছো।”
“ ভাইজান, বলছিলাম যে ও ঘরে যাবেন না?”
“ পরে যাব।”
“ চলুন না যাই।”
“ আশ্চর্য, আমার সাথে তোমার কী? তুমি যাও না।”
আফতাব মাথা নুইয়ে বললেন,
“ আমি একা একা যেতে পারছি না ভাইজান। আমার খুব ইয়ে লাগছে।”
“ আবার ইয়ে!”
“ চলুন ভাইজান, চলুন প্লিজ।”
আমজাদ চুপ করে রইলেন। যেতে তারও মনে চাইছে,কিন্তু পারছেন কই। এখনো চোখের পর্দায় স্পষ্ট সেই দিনটা। ছেলেটাকে জোর করে মেরেধরে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন। আগের দিন খুব কাঁদল,অনুরোধ করল যাবে না। কিন্তু বাড়ি ছাড়ার সময়, শক্ত পাথরের মতো বসে রইল কেমন। একটা কথাও কারো সাথে না বলে,বিদায় অবধি না নিয়ে চুপচাপ উঠে বসল গাড়িতে। ছেলেটার সেই পাথুরে চাউনির কথা ভাবলেই,আমজাদ কেমন নার্ভাস হয়ে যাচ্ছেন। নিশ্চয়ই অনেক অভিযোগ পুষে রেখেছে ধূসর! কী করে বোঝাবেন,ওসব তো ওর ভালোর জন্যেই করেছিলেন তিনি। নাহলে যে রাজনীতির ফ্যাসাদে এতদিনে আষ্ঠেপৃষ্ঠে আটকে যেত ছেলেটা!
আমজাদ ফোস করে শ্বাস ফেললেন,আচমকা একটি ধীর স্বর ডাকল,
“ চাচ্চু!”
ঝট করে পেছনে ফিরে চাইলেন তিনি। ধূসর এসে দাঁড়িয়েছে। হাস্যহীন,গম্ভীর একটা মুখ! আমজাদের খুব খারাপ লাগল। ছেলেটা তাকে বড়ো আব্বু ডাকতো! সিকদার বংশের প্রথম সন্তান হওয়ায় আদর ছিল আকাশ সমান। আজ এতটা দুরুত্ব হয়ে গেল,যে ডাকটাও বদলে ফেলেছে! আস্তেধীরে উঠে দাঁড়ালেন আমজাদ।
কিছু বলার আগেই, ধূসর আচমকা এসে জড়িয়ে ধরল। হতবাক হলেন ভদ্রলোক। বিস্ময় নিয়ে চাইলেন ভাইয়ের দিকে। আফতাব বুক ভরে হাসলেন। ধূসর যেমন দ্রুত জড়িয়ে ধরল,তার চেয়েও দ্রুত সরে গেল আবার। আমজাদ ‘’ কেমন আ..” বলতে বলতেই লম্বা পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে।
ভদ্রলোক আহত হলেন। তার চেয়েও কালো হলো আফতাবের মুখখানা। ভাইজানকে জড়িয়ে ধরল,আর উনি? উনি কী দোষ করলেন!
আমজাদ রেগেমেগে বললেন,
“ তোমার ছেলের তেজ দেখলে? আমি যে গুরুজন একটু সম্মান পর্যন্ত দিলো না। মন চাইল,জড়িয়ে ধরল,আর চলে গেল? কী বেয়াদব দেখেছ!”
আফতাব চুপ করে রইলেন।
আমজাদ ফোসফোস করে ফের বসলেন জায়গায়। বিশদ মন খারাপ নিয়ে ভাবলেন,
“ ঠিক করে একটা কথাও বলতে দিলো না। সাত বছর ধরে এত রাগ কে পুষে রাখে কে জানে!”
“ একটু শরবত হবে পুষ্প?”
নাম শুনে চকিতে ফিরল মেয়েটা। কাজে ব্যস্ত হাত জোড়া থতমত গেল ইকবালকে দেখে। অমনি গুটিয়ে গিয়ে বলল,
“ জি দিচ্ছি। বসুন।”
ইকবাল বসল না। হাত দুটো পিঠের সাথে বেধে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
পুষ্প জগ থেকে গ্লাসে শরবত ঢালল। ইকবাল স্পষ্ট দেখল মেয়েটার লম্বা-ফরসা আঙুলগুলো ঠকঠক করে কাঁপছে। ঠিক যেমন করে কাঁপছে ওর বুক।
ইকবাল জানে পুষ্প ওকে পছন্দ করে। সেও করে। বরং বেশিই করে! কিন্তু এই পছন্দ না চাইতেও বুকের ভেতর দাফন করতে হবে। ধূসরের বোন পুষ্প। তার বেস্টফ্রেন্ডের কাজিন। ও নিশ্চয়ই এই সম্পর্ক মানবে না। আর একটা সম্পর্ক আগাতে এত বছরের বন্ধুত্ব কী করে কোরবান করবে ইকবাল?
কিন্তু চেয়েও পুষ্পর থেকে দূরে যাওয়া হচ্ছে না। এ কদিন যেমন তেমন হলেও,এই যে আজ সারাদিন মেয়েটাকে চোখের সামনে দেখছে বুকের ভেতর টালমাটাল ঘূর্ণিঝড়টা ফেরত এসছে কেমন!
ইকবাল কী করবে এখন? কোনদিকে যাবে? ধূসর না পুষ্প কাকে বেছে নেবে! তার চেয়েও বড়ো কথা ওই হিটলার ব্যাটা আমজাদ সিকদার। ওই ব্যাটা তো ওকে দেখলেই অদৃশ্য ভঙ্গিতে খিটমিট করে ওঠে। যেন ইকবাল কেরোসিন আর সে আগুন। কাছাকাছি এলেই কেমন দাউদাউ করে ওঠে। সেখানে পুষ্পর জামাই হিসেবে আদৌ মানবে ওকে!
“ শরবত,ভাইয়া!”
ইকবাল নড়ে উঠল। বিমর্ষ চিত্তে গ্লাস নিয়ে খেল অর্ধেক।
মন খারাপের তোড়ে আর গলা দিয়ে নামল না। গ্লাসটা রেখে বলল,
“ থ্যাংকিউ।”
সৌজন্যবোধে একটু হেসে চলে গেলে ইকবাল। পুষ্প একবার গলা তুলে তার যাওয়ার পথ দেখে নেয়। তারপর সতর্ক চোখে তাকায় আশেপাশে। পরপরই গ্লাস তুলে ইকবালের রেখে যাওয়া শরবতটা খায় ঝট করে। দৃশ্যটা আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখল ইকবাল। বিস্ময়ে চোখ প্রকট করে ফেলল সে। পরপরই মনে হলো
তার একটু আগের ভেঙেচুরে আসা বুকটা জোড়া লেগে গেছে। চলে এসেছে এক অন্য দুনিয়ায়! যেখানে ভয় নেই,ডর নেই,চিন্তা নেই, ধূসর নেই,নেই কোনো হিটলার আমজাদ। আছে শুধু আর শুধু ভালোবাসা। ইকবাল বুক টানটান করল। মুচকি হাসল,ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে হাঁটা ধরল। ফুরফুরে মেজাজে গুনগুন করে গাইল,
“ এই মনে দিলে তালা,
না কমে না রে জ্বালা,
না কাটে না রে এ যাদুর ঘোর…
আরে যত বেধে রাখি,
এ মন উড়ো পাখি,
খাটে না তো প্রেমে কোনো জোর….”
রাত হয়েছে। দশটা বাজে হয়ত। পিউ সারাদিনে আর ঘর থেকে বের নাহলেও,এখন আর বসে থাকতে পারল না। বাড়ি থেকে লোকজন কমেছে,একমাত্র দূর- দূরের আত্মীয়রা বাদে ফিরে গেছেন বাকিরা।
পিউ পা টিপেটিপে এসে ধূসরের ঘরের সামনে দাঁড়াল। ভেতরে আলো জ্বলছে,মোটা পর্দার ফাঁক হতে আসছে এসির হাওয়া। এর মানে উনি ভেতরেই। পিউ দুটো আঙুল দিয়ে আস্তে করে পর্দা একটু সরাল।
তক্ষুনি ধূসর ঝট করে হটালো পুরোটা। অমনি মুখোমুখি হয়ে গেল দুজন। ভ্যাবাচেকা খেয়ে সোজা হলো পিউ। এই রে,ধরা পড়ল তো!
ধূসর কপাল কুঁচকে বলল,
“ পিউ! কিছু বলবে?”
পিউয়ের বুক ধ্বক করে উঠল। বাবারে বাবা, এত সুন্দর করে ডাকল ওকে! কানটা কেমন মুগ্ধতায় ঝাঁ ঝাঁ করছে।
ধূসর আবার ডাকল,
“ পিউ!”
মেয়েটা পিঠের হাড় সটান করে দাঁড়াল। তোলপাড় হওয়া চিত্ত সামলে আমতাআমতা করে বলল,
“ না মানে, দেখছিলাম আপনার কোনো অসুবিধে হচ্ছে কিনা।”
ধূসর বলল,
“ ভেতরে এসো।”
পিউ নরম পায়ে ঢুকল।
“ বোসো।”
দু মাথার ওরনা গুছিয়ে বসল ও। ধূসর একটা প্যাকেট বাড়িয়ে বলল,
“ এটা তোমার।”
পিউ হাঁ করে ফেলল। ভীষণ খুশিতে লুটপাট হয়ে ভাবল,
“ উনি আমার জন্য গিফট এনেছেন? ওমাই গড,এর মানে উনিও আমাকে পছন্দ করেন নাকি!
কিন্তু উনি আমাকে শেষ যখন দেখেছিলেন,তখন তো আমি ল্যাদাবাচ্চা ছিলাম। তাহলে কি উনি আমাকে সেই ল্যাদাবাচ্চা থেকেই পছন্দ করেন। হায় আল্লাহ,এত সুখ আমার কপালে! আমি তো মরেই যাব।”
ধূসর নিজেই বলল,
“ বাড়ির সবার জন্যে কিছু না কিছু এনেছিলাম। তুমি ছিলে না ওখানে,তাই দেয়া হয়নি।”
পিউয়ের বাকবাকুম হাসিটা দপ করে নিভে গেল অমনি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল,
“ ওহ,আমার একার জন্য না, বাড়ির সবার জন্যেই এনেছে। আর আমি মগার মতো কত কী ভেবে ফেললাম!”
এর মাঝে ধূসরের ফোন বাজল। রিসিভ করে
কথায় ব্যস্ত হলো সে।
“ হ্যাঁ বল,
না ফ্রি আছি। কাল? আচ্ছা আয়।”
পুরোটা সময় অনিমেষ চেয়ে রইল পিউ। ও বসে থাকায়, দাঁড়ানো ধূসরকে পাহাড়ের মতো লাগছে। লম্বা,ফিগার উফ সব মিলিয়ে একটা টসটসে স্ট্রবেরি!
আচ্ছা এত সুন্দর লোকটা কি সিঙ্গেল? ওদের ক্লাসের তেঁতুল সাইজের ছেলেগুলোও তো গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরছে। সেখানে যদি ধূসরেরও আগে থেকে কেউ থাকে! না না, রিস্ক নেয়া যাবে না। প্রেমটা গুরুতর হওয়ার আগেই ভালো করে জেনে নিতে হবে।
ধূসর লাইন কাটল। দেখল,পিউ চেয়ে আছে। জিজ্ঞেস করল,
“ কিছু বলবে?”
পিউ জিভে ঠোঁট ভেজায়। গলা ঝেরে বলে,
“ একটা কথা বলতাম।”
“ হু!”
“ আপনার গার্লফ্রেন্ড নেই?”
ধূসরের স্থূল ভ্রু বেঁকে গেল সহসা।
নিশ্চিত হতে শুধাল,
“ কী?”
“ মানে,আপনার গার্লফ্রেন্ড নেই?”
ধূসর মুখ শক্ত করে বলল,
“ তোমার বয়স কত?”
পিউ ঘাবড়ে যায়,
“ জি? পনের।”
“ কোন বয়সে কাকে কী বলতে হয়,এখনো জানো না। কিন্তু গার্লফ্রেন্ড- বয়ফ্রেন্ড সম্পর্কে ঠিক জেনে বসে আছো। এতটাও পাকা উচিত নয়,যতটা পাকামো দেখলে বড়োরা বিরক্ত হয়। বোঝা গেল?”
কঠিন কঠিন কথাগুলোয় সব গুলিয়ে ফেলল পিউ। ঢোক গিলে বলল,
“ জি।”
“ আর কিছু বলবে?”
“ জি না।”
“ যাও।”
পিউ চুপচাপ উঠে বেরিয়ে গেল। সেদিক চেয়ে ধূসর বিরক্ত চোখে বিড়বিড় করল,
“ ইঁচড়েপাকা মেয়ে!”
পরদিন।
বাসায় আজকেও আয়োজনের কমতি নেই। বাজার-সদাই, রান্নাবান্নায় গোটা ঘরবাড়ি মুখোরিত। হৈ-হুল্লোড় আনন্দ-উল্লাস সারাক্ষণ চলছে। মায়েরা সারাক্ষণ ব্যস্ত ধূসরকে কে কখন কী খাওয়াবে। কী লাগবে ছেলেটার! চাচারা ব্যস্ত তাকে একটু পাশে বসিয়ে গল্প-গুজব করতে।
সাদিফও কম যায় না। কিন্তু তার ফুরসত আপাতত নেই। গ্রাজুয়েশনের লাস্ট স্টেজ চলছে। এখন খুব প্যারা,খুব ব্যস্ততা। সারাক্ষণ ছোটাছুটি চলে।
কিন্তু পিউ! পিউ বিভোর ধূসরের প্রেমে। চোখের সামনে মানুষটাকে প্রতি ঘন্টায় যতবার দেখছে অতবার একবার করে মরছে সে।
বুঝতেই পারছে না,এমন গাঢ় ভাবে প্রেমে পড়া সর্বনাশে কী করে আরো বেশি করে ডুবে যাচ্ছে ও।
তখন প্রায় সকালের শেষ।
ধূসর রেডিশেডি হয়ে নামছিল। ইকবাল আসবে,এলেই একসাথে বের হবে দুজন। পিউয়ের স্কুল নেই। বসে বসে টেলিভিশন দেখছিল। জুতোর শব্দ শুনে তাকাল ফিরে। অমনি এক চোট বিহ্বলতায় কেঁপে উঠল অন্তঃপট। ধূসরের পরনে মেরুন শার্ট,কালো ডেনিম প্যান্ট। হাতে চকচক করছে ঘড়ির চেন। সানগ্লাস বুকপকেটে। শ্যামলা মুখটায় ট্রিম করা খোচা দাঁড়ি কী চমৎকার, কী নজরকাড়া!
ধূসর সোজা ফ্রিজের কাছে গিয়ে ঠান্ডা পানির বোতল বের করল। ছিপি খুলল,অমনি পিউ এসে দাঁড়াল টেবিলের কাছে। কোন কাজ নেই,অহেতুক ছুঁতো দিয়ে এটা ওটা ধরল। ধূসর আড়চোখে লক্ষ্য করল ব্যাপারটা। যখনই চোখে চোখ পড়ে,মাথা নোয়ায় পিউ। দৃষ্টিতে কেমন লজ্জা,জড়োতা। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুতুরে টিমটিমে হাসি।
ধূসর উদ্বেগ দেখায় না। বোতল তুলে পানি মুখে নেয়,আচমকা কানে আসে ওর রিনরিনে কণ্ঠের খুব মৃদূ সুর,
“ ছেলে তোর প্রেমে পড়ার কারণ,
তোর শ্যামলা শ্যামলা বরণ,
ওই শ্যামলা গালের কালো দাড়ি ভাল্লাগে!”
পানি ধূসরের মাথায় উঠে গেল। খুকখুক করে কেশে উঠল অমনি। ফিরল হতভম্ব চোখে। অথচ পিউয়ের ওপর প্রভাবই পড়ল না। লজ্জা লজ্জা ভাব করে ঠোঁট টিপল সে। নখ দিয়ে খুটল টেবিল ক্লথটা।
ধূসর কিছুক্ষণ নির্বোধ হয়ে চেয়ে থাকে। এইটুকু মেয়ে! এই দুফুট সাইজের মেয়ে ওকে ইঙ্গিত করে গান গাইছে!
ইকবাল গাড়ি ভিড়িয়ে সদর দরজার চৌকাঠে তক্ষুনি এলো। ওখানে দাঁড়িয়েই ডাকল,
“ বন্ধুউউউউ!”
ধূসর লম্বা পায়ে এগিয়ে এলো। ইকবালের হাতটা টেনে নিয়ে গেল ওপাশে। পিউ সাগ্রহে পথটা দেখল। উনি তো কিছু বললেন না। এর মানে কী বুঝতে পারেননি?
“ আরে কী হলো!”
ধূসর অতীষ্ঠ চিত্তে বলল,
“ ওই পিচ্চি আমাকে লাইন মারছে,ইকবাল।”
ইকবাল এদিক-ওদিক তাকাল।
“ কোন পিচ্চি?”
“ পিউ।”
ইকবাল হোচট খেল। তাকাল ভীষণ শক পাওয়ার মতো।
পরপরই হইহই করে বলল,
“ কংগ্রাচুলেশনস বন্ধু কংগ্রাচুলেশনস!”
সাথে হ্যান্ডশেক করতে করতে ধূসরের হাতটা ধরে ঝাঁকাল সে। ও আশ্চর্য হয়ে বলল,
“ কীসের কংগ্রাচুলেশনস!”
“ কীসের আবার? পিউ যে তোকে লাইন মারছে সেটার।”
তারপর অদূরের পিউকে ডেকে বলল,
“ হেউ পিউ,
হাউ আর ইউ?”
পিউ ডাক শুনে তাকাল।
ধূসর মেজাজ খারাপ করে বলল,
“ চুপ শালা গাধা, এটা কি খুব আনন্দের কথা?”
“ নয়?”
“ না। ঠিক বয়সে বিয়ে করলে এতদিনে আমার এই সাইজের মেয়ে থাকতো।”
ইকবাল অবাক হয়ে পা থেকে মাথা অবধি দেখল ওর। হাহুতাশ করে বলল,
“ তোর ডি এন এ এত ফাস্ট ধূসর! ২৫ বছরে এত্ত বড়ো মেয়ে? হাউ ভাই, কোনো বিশেষ টিপস!”
ধূসর নাক ফুলিয়ে ধমকায়,
“ শাট আপ ইকবাল!”
তক্ষুনি পিউ ছুটে এসে দাঁড়াল। ইকবাল ওর দিক ফিরেই বলল,
“ শাট আপ পিউ।”
কিছু ভড়কে গেল মেয়েটা। নিষ্পাপ কণ্ঠে বলল,
“ আমি কী করলাম?”
“ তাহলে আমি কী করলাম!”
বেচারি কিছুই বুঝল না। চেয়ে রইল বোকা বোকা চোখে। ধূসর শক্ত কণ্ঠে শুধাল,
“ এখানে কী চাই?”
পিউ চিবুক নোয়াল। ওরনার মাথা আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল,
“ আপনাকে।”
ধূসর বজ্রের ন্যায় শব্দ ছুড়ল সহসা,
“ কীইইইইই!”
পিউ হড়বড়িয়ে কথা শুধরে নেয়,
“ না মানে, আপনাকে একটা কথা বলতে এসেছি। মা বলেছিল আজকে ইকবাল ভাইকে নিয়ে দুপুরে এখানেই খেতে।”
ইকবাল চোখ বড়ো করে ভাবল,
“ আমাকে!
ওয়ে হোয়ে এক্ষুনি জামাই আদর দেবে নাকি।”
হেসে বলল,
“ আমি নিশ্চয়ই আসব পিউপিউ। হাতের কাজটা সেরেই আসব।”
পিউ মাথা নাড়ল,কিন্তু জায়গা ছাড়ল না। তার লাজুক,নিভন্ত দৃষ্টিজোড়া বারবার ধূসরেতে ঘুরছে। ঠোঁটের ভাঁজে মিটমিটে হাসি। ইকবাল নিজেও ঠোঁট চেপে হাসল তাতে। এই যে ধূসরের কটমটে চাউনিটা, মজা লাগছে ওর।
ধূসর বিরক্ত চোখে বলল,
“ আর কিছু বলবি?”
পিউ মুখ তুলল। পল্লব ঝাপটে বলল,
“ আপনি তো আমাকে তুমি করে বলেন!”
“ এবার থেকে তুই বলব। কোনো সমস্যা?”
পিউ মিহি স্বরে বলল,
“ উহু, আপনি যা বলবেন, তাই সই।”
ধূসরের নাকের পাটা ভীষণ রাগে ফুলে উঠল অমনি। ধমকে বলল,
“ যা এখান থেকে,যা।”
পিউয়ের বুক ছ্যাত করে উঠল। এত জোরে ওর সাথে কেউ কক্ষনো কথা বলেনি। মিনসে গলায় বলল,
“ এরকম করছেন কেন! আমি কি কিছু করেছি?”
“ তুই যাবি?”
ধূসরের কর্কশ রূপটা এই প্রথম দেখল পিউ। চোখদুটো লাল,চিবুকের ধার কেমন মটমট করে ফুটছে। পিউয়ের আর দাঁড়ানোর সাহস হলো না। আবেগে,অসহায়ত্বে অন্তঃপুরের ফুলকো জোয়ার নিয়ে তড়িৎ ছুটে গেল সে।
ইকবাল বলল,
“ আহা, বকলি কেন মেয়েটাকে?”
“ দেখছিস কেমন করছিল!”
ইকবাল দুষ্টু হাসল। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“ দেখছিলাম তো। ভালোই লাগছিল। উফ ধূসর,তোদের যা মানাবে না ভাই। আমিতো ভেবেও ফেলেছি তোদের বাচ্চাকাচ্চা হলে কী নাম রাখব। ছেলে হলে ধুলা,মেয়ে হলে বালি। ইজ ইকুয়াল টু ধূলাবালি। ধূসর রে,বিয়ের পর বউ পেয়ে আমাকে কিন্তু ভুলে যাস না বন্ধু।”
ধূসর হূঙ্কার ছুড়ল কঠিন স্বরে,
“ ইকবাল!”
“ ধূসর!”
“ মার খাবি?”
“ তুই খাবি?”
ধূসর অমনি শার্টের হাতা গোটায়,
“ আয়, মার।”
ইকবাল মশা তাড়ানোর মতো হাত নাড়ল,
“ এহ,মাথা খারাপ? তোর মতো পোকা মেরে আমার এতদিনের জিম করা বডিতে ডিফেক্ট ফেলব নাকি!”
ধূসর ভ্রু নাঁচাল,
“ আচ্ছা? তাই! দাঁড়া তবে…”
কিন্তু ইকবাল দাঁড়াল না। ধূসরকে তেড়েমেরে আসতে দেখেই ছুট লাগাল সজোরে। পিছু পিছু ধূসরও ছুটল তার।
পিউ এসে ঘরের চেয়ার টেনে ধপ করে বসল। ঠোঁট জোড়া ফুলিয়ে টেনেটুনে খাতা বের করে লিখল,
“ ধূসর ভাই, আপনি এই প্রথম বার আমাকে ধমকেছেন। জানেন কত ভয় পেয়েছি আমি? ভালোবাসি বলে কী ভয় দেখিয়ে মেরে ফেলবেন নাকি! আমি কিন্তু এখনো অত সিরিয়াস প্রেমে পড়িনি। আর আপনার এত মেজাজ কীসের হ্যাঁ? ডেইরিমিল্কের মতো দেখতে বলে অহংকার করছেন! আমার মতো সুইট-কিউট মেয়েকে এইভাবে জোরেশোরে ধমকাতে আপনার গলার ভেতর একটুও আটকাল না? এত নিষ্ঠুর কোনো মানুষ হয়! ”
পিউ খাতা বন্ধ করে গালে হাত দিয়ে বসল। চোখ দুটো ঘুরিয়ে থম ধরে রইল কিছুক্ষণ। পরপরই মুচকি হেসে বলল,
“ থাক, একটু ধমকালে কিছু হয় না। উনি না ধমকালে কে ধমকাবে? উনি তো আমার নিজেরই লোক।
আচ্ছা, ধমকানোর সময় ওনাকে কী সুন্দর লাগছিল না? মনে হচ্ছিল কষে একটা চুমু খেয়ে গাল টেনে দিই।
“ হায় মেরে এটম বোম,তেরে পেয়ার মে পিউ তো মার গায়্যি!”
পিউ ছটফট করে ছুটে এসে বালিশের গায়ে উলটে পড়ল। পা জোড়া নাড়তে নাড়তে লাজুক কণ্ঠে গাইল,
“ আব ইয়ে ন্যায়না বোলে ইয়ার,
বোলে এহি লাগাতার,
কোয়ি চাহে, কিত্না রোকে কারুংগি পেয়্যার.
মেরে সাইয়া সুপারস্টার,
ও মেরে সাইয়া সুপারস্টার।
ম্যায় ফ্যান হুয়ি উনকি,
ও মেরে সাইয়া সুপারস্টার।”
[ অনেকেই ধরতে পারেননি,পিউয়ের বয়স কম বলছেন। আসলে এটা এক সমুদ্র প্রেমের আলোকে লেখা। যেখানে ধূসরের প্রেমে পড়া পিউয়ের বয়স ১৫ বছর ছিল।
পর্ব দুটো ডিলিট করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ভাই রে ভাই,এত অনুরোধ 😭। সাথে দেখলাম নোটে পড়ে আছে
তাই আবার পোস্ট করলাম।]
Share On:
TAGS: নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি, সমুদ্রকথন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১
-
সমুদ্রকথন গল্পের লিংক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৪ খ
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৪ ক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১২