শেষপাতায়সূচনা [০৬]
সাদিয়াসুলতানামনি
—কিহহহহ! পূর্ণতা তোর বোন আর ফিয়োন্সেকে কিডন্যাপ করে তোকে বিয়ে করেছিল? সিরিয়াসলি?
বেশ জোরেই কথাগুলো বলে ওঠে মাহবুব। ছেলেটা এতটাই বিস্মিত হয়েছে যে স্থান, কাল ভুলে গিয়েছে বোধহয়। জাওয়াদ বন্ধুর এমন রিয়াকশন দেখে একটুও চমকায় না, কারণ এই কথা যেই শুনেছে সেই মাহবুবের মতো এমন রিয়াকশন দিয়েছে।
জাওয়াদ একটি হাসি দিয়ে বলে–
—আমার জন্য ওর ম্যাডনেস কতটা ছিল সেটা তো বলাই শুরু করি নি, তার আগেই এমন রিয়াকশন দিচ্ছিস বন্ধু।বিয়ের পরের ঘটনা গুলো বলা শুরু করলে তুই বোধহয় উত্তেজনায় হসপিটালে পৌঁছে যাবি।
কথাটা বলে জাওয়াদ হালকা শব্দ করে হেঁসে দেয়। মাহবুব একরাশ বিস্ময় নিয়ে জাওয়াদের হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। জাওয়াদকে হাসতে দেখাটাও তার কাছে বিস্ময়কর ব্যাপার। কারণ জাওয়াদ সহজে হাসে না। এমন মনখোলা হাসি সে এই চার বছরে কখনো হাসতে দেখেছে নাকি জাওয়াদকে, তাও মনে পরছে না।
জাওয়াদ তার হাসি থামিয়ে মাহবুবকে বলে–
—বস, আরো অনেক কিছু শোনানোর বাকি আছে। তোকে আজ কিছুটা ধারণা দিয়েই যাই, আমার পূর্ণতা পাষাণী ছিল না। বরংচ পূর্ণতার মতো সত্যিকারের ভালোবাসা খুব কম মানুষই বাসতে পারে। আর খুব কম পুরুষই সেই ভালোবাসার অধিকারী হতে পারে। যেটা আমি তখন না বুঝতে পারলেও, এখন ঠিকই বুঝতে পারছি।
বেশ আফসোস নিয়ে কথাগুলো বলে জাওয়াদ। মাহবুব পুনরায় তার চেয়ারে বসে পড়ে। জাওয়াদ আবারও তার স্মৃতির পাতায় উল্টাতে থাকে।
~অতীত~
ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, ব্যান্ড বাজিয়ে বেশ জাঁকযমক পূর্ণভাবে পূর্ণতা প্রথমবারের মতো তার শ্বশুর বাড়িতে পা রাখে। অতিরিক্ত বাদ্য যন্ত্রের আওয়াজে পাড়া-প্রতিবেশীসহ আশপাশের বিল্ডিংয়ের মানুষও নিজেদের ঘরে ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। সকলেরই একটাই প্রশ্ন কার বাড়িতে এত বড়সড় করে বিয়ে হচ্ছে।
জাওয়াদরা যেই এলাকায় থাকে সেটা বেশ শান্ত ও নিরিবিলি হওয়ায় পূর্ণতার হাঁকিয়ে না ব্যান্ডপার্টিতে বেশ চঞ্চলতা সৃষ্টি করেছে এলাকায়। হাতির পিঠে চড়ে পূর্ণতা ও জাওয়াদ আসে। সকলের চোখ এত বড়বড় হয়ে যায় যে, যেনো কিছুক্ষণ পর কোটর থেকে খুলেই বের হয়ে আসবে।
জাওয়াদদের বিল্ডিংয়ের সামনে আসতেই পূর্ণতা মাহুতকে বলে হাতি থামাতে। মাহুত হাতিকে থামিয়ে দিয়ে তাকে বসার নির্দেশ দিলে, হাতিটি বাধ্যগত দাসের মতো তার কথা শুনে। জাওয়াদ প্রথমে হাতির পিঠ থেকে নেমে হনহনিয়ে বাসার ভেতরে চলে যেতে নিলে পূর্ণতা তার পেছন ডেকে ওঠে।
পূর্ণতা একহাতে তাট লেহেঙ্গার একসাইড ধরে আরেক হাত বাড়িয়ে দেয় জাওয়াদের হাতে। তারপর চোখ পাকিয়ে বলে–
—এই আনরোমান্টিক পুরুষ, আমি এত ভারী লেহেঙ্গা পরে এত উঁচু থেকে নামব কি করে? ধরুন আমার হাত।
লাস্টের কথাটা অনেকটা ঝারি দিয়েই বলে পূর্ণতা। জাওয়াদ দাত কটকট করে তার দিকে তাকায়। বর্তমানে তার ভয়াবহ রাগ উঠছে, খুব কষ্ট করে সে তার রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছে। নাহলে এই পুচকির জন্য তার হাতের একটা জোরদার থাপ্পড়ই যথেষ্ট।
জাওয়াদ দাঁতের দাঁত ঘষে বলে–
—তাহলে নামা লাগবে না, এই হাতির পিঠে চড়েই তুমি তোমার বাসায় ফিরে যাও।
পূর্ণতা তার দুইহাত নিজের কোমড়ে রেখে ঢং করে বলে–
—ও মাহ্হ্হ্! আমি তো আমার বাড়িতেই এসেছি। আপনার বাড়িই তো আমার বাড়ি।
—আমার বাড়ি কখনোই তোমার হবে না। তুমি আমি মিলে কখনো আমরা হবো না।
জাওয়াদের এই কথাটা পূর্ণতার হৃদয়ের গভীরে গিয়ে আঘাত হানে। পূর্ণতা জেনে-বুঝেই এই কণ্টকপূর্ণ রাস্তায় পা মাড়িয়েছে। কষ্ট তার এখন প্রতি পদে পদে লেখা। পূর্ণতা সেসব কথা ভাবা বাদ দিয়ে বলে–
— এখন বেশি কথা না বলে হাত ধরে নামান, নাহলে দিলাম কিন্তু কল আমার লোকেদের।
পূর্ণতার লাস্টের কথায় কাজ হয়। জাওয়াদ হাতির কাছে এসে পূর্ণতার দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই পূর্ণতা তার হাত ধরে নেমে আসে। তারপর হুট করেই জাওয়াদের গলা জড়িয়ে ধরে লাফ দিয়ে তার কোলে উঠে যায়। জাওয়াদ থতমত খেয়ে গিয়ে পূর্ণতাকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে কোনমতে ব্যালেন্স করে নিজের।
বিষয়টা কি হলো এটা বুঝতে পেরে জাওয়াদ আবারও রেগে যায়। লাল লাল চোখ দ্বারা সে পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে বলে–
—কি অসভ্যতা শুরু করলে? এটা তোমাদের হাইক্লাস সোসাইটি না। আমি মিডেল ক্লাস ফ্যামিলির ছেলে। আমাদের এখানে জনসম্মুখে জড়িয়ে ধরা, কোলে করে হাঁটা অনেক বড় বিষয়। তাছাড়া আমার বাবার একটা সম্মান আছে এই এলাকায়, প্লিজ এমন কিছু করো না যাতে আমি তোমাকে আরো বেশি ঘৃণা করতে শুরু করি। নামো আমার কোল থেকে।
পূর্ণতা একহাত দিয়ে জাওয়াদের গলা জড়িয়ে ধরে আরেক হাত রাখে তার গালে, তারপর রংঢং করে বলে–
—শ্বশুর বাবার সম্মান মানে আমার সম্মান। তার সম্মানে যে আঁচ দিতে যাবে, তার হাতটাই আমি কেটে আমার পালিত কুকুরকে খাওয়াবো। কিন্তু জামাইজান, আমি কোলে চড়ায় শ্বশুর বাবার বা আপনার সম্মানহানী হবে কেন? আমি তো একটা রিচ্যুয়াল পূরণের জন্য আপনার কোলে উঠেছি। বিয়ের পর মেয়েরা যখন শ্বশুর বাড়ি আসে, তখন স্বামী তাকে কোলে নিয়ে আন্দরে প্রবেশ করে।
কথাটা শেষ করে পূর্ণতা ভুবন ভুলানো একটা হাসি দেয়।জাওয়াদের কাছে এই হাসি বিদ্রুপপূর্ণ মনে হয়। অথচ তার এই হাসি যেকোন ছেলের রাতের ঘুম কেড়ে নিতে সক্ষম।
জাওয়াদ একটুও পূর্ণতাকে সহ্য করতে পারছে না আজ। মেয়েটা কিভাবে তার বোন আর ফিয়োন্সেকে কিডন্যাপ করে বিয়ে করে ফেললো কথাটা মনে করতেই তার দেওয়ালের সাথে মাথা ঠুকতে মন চাচ্ছে। জাওয়াদ আর কথা না বাড়িয়ে বিল্ডিংয়ের ভেতরের দিকে যেতে থাকে।
পূর্ণতা একহাত দিয়ে জাওয়াদের গলা জড়িয়ে ধরে আরেক রাখে জাওয়াদের শক্ত চোয়ালে। চাপ দাঁড়িতে ভরে থাকা শক্ত চোয়ালখানায় নিজের ওষ্ঠের স্পর্শ দিতে মন চাচ্ছে তার, কিন্তু সে এতটাও নির্লজ্জ না যে রাস্তায় দাড়িয়ে বরের সাথে রোমান্স করবে। বর হলো ভালোবাসার কারখানা। তাকে ভালোবাসতে হবে গোপনে, নীরবে, নিভৃতে।
জাওয়াদ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে। তারা যেই বাসায় থাকে সেখানে লিফট নেই। পাঁচ তলা বিশিষ্ট প্রায় অর্ধ শতক পুরাতন হবে হয়ত বাড়িটা। সিঁড়ির দেওয়াল গুলো থেকেও কেমন সিমেন্ট খুলে আসছে। জাওয়াদরা থাকে চার তলায়। তিন রুম, ড্রয়িং-ডাইনিং ও কিচেন নিয়ে তাদের ফ্ল্যাটটা। তারা অবশ্য ভাড়াই থাকে এখানে।
জাওয়াদ তিনতলায় উঠে একটু দাড়িয়ে দম নেয়। পূর্ণতা আহামরি ভারী না হলেও তার ড্রেসটার কারণে ওজন প্রায়ই সত্তর কেজির কাছাকাছি চলে এসেছে। পূর্ণতা তার হাতের মুঠোয় থাকা টিস্যু দিয়ে জাওয়াদের কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে দেয়। জাওয়াদ আঁড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে আবারও হাঁটতে শুরু করে।
পূর্ণতা তার এটিটিউট দেখে বাঁকা হাসে। গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে–
—যতই করো তানা বানা, খতে হবে একথালায় খানা।
পূর্ণতা তার অতি কাছে থাকায় পূর্ণতার গুনগুনানি ঠিকই জাওয়াদ শুনে। পূর্ণতা যেনো আরো একবার তাচ্ছিল্য করে উঠল তার অসহায়ত্বের উপর। পূর্ণতা তার শক্ত চোয়ালের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে–
—”আপনাকে আমি এক সাগরসম ভালোবাসলেও, নিজেকে আমি আকাশসম ভালোবাসি। আপনি আমাকে রিজেক্ট করেছেন, আমি মেনে নিয়েছি। কিন্তু আমার ভালোবাসাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নিজের জীবনের কাল ডেকে এনেছেন।
আমাদের বিয়ে হয়ত এভাবেই লেখা ছিল। সেই আপনি তো আমার হলেনই, শুধু শুধু আমার নিকৃষ্ট রূপ টার সাথে পরিচিত হলেন প্রাণপ্রিয় শোয়ামী। ভালোই হয়েছে,হবু সতিন হয়ে গেলো ননদ। পূর্ণতা তোকে চুমু বেইব। কি খেলটাই না দেখালি।”
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই সে আবারও হেসে ওঠে। পূর্ণতার এই বারংবার হেসে ওঠায় জাওয়াদের রাগের পারদ যেনো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। এরই মাঝে তারা জাওয়াদের ফ্ল্যাটের সামনে এসে উপস্থিত হতে জাওয়াদ তাকে নামিয়ে দিতে চায়। কিন্তু পূর্ণতা খপ করে জাওয়াদের শার্টের কলার খামচে ধরে্ তারপর চোখ গরম করে বলে–
—একদম সকলের সামনে কামড়ে ধরব কথা না শুনলে। বরণ হওয়ার পর একেবারে আপনার রুমে গিয়ে নামাবেন, তার আগে নামালে দিলাম ফোন আমার মেয়েদেরকে। কি দিবো?
মেয়েদের বলতে পূর্ণতা তার গার্ডদের বুঝিয়েছে। তাদের কাছেই রয়েছে জিনিয়া আর আঞ্জুমান, তারা পেছনে গাড়িতে করে আসছে। পূর্ণতার ধমকি শুনে জাওয়াদের মন চাইতে থাকে, এই আটার বস্তাকে মাথার উপরে তুলে আছাড় মেরে কোমড় ভেঙে দিতে।
জাওয়াদ দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে–
—এই আটার বস্তার মতো একজনকে কোলে তুলে বেল বাজাবো কিভাবে? নেমে দাঁড়ালে সুবিধা হতো বেল বাজাতে আর আমার হাতটাও অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যেতো।
জাওয়াদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জব্বর একটা অপমান করেছে তাকে তা পূর্ণতার বুঝতে বাকি থাকে না। কিন্তু পূর্ণতা বিন্দু মাত্র রাগে না। সে জাওয়াদের গালে থাকা হাতটা দিয়ে তার গাল টিপে দিয়ে বলে–
—ওলে লে, সোনা বাবু! এই ব্যাপার। আপনি না পারলে কি হয়েছে, আপনার স্ত্রীর তো দুটো হাতই খালি। সে বাজিয়ে দিচ্ঢ়ে কলিংবেল। নিন আমাকে কলিংবেলের কাছে নিয়ে যান তো শোয়ামী।
পূর্ণতার প্রতিটি কথা, কাজে জাওয়াদ রাগে ফসফস করতে থাকে। সে পূর্ণতাকে কলিংবেলের কাছে নিয়ে যেতেই পূর্ণতা কলিংবেল বাজায়। তার সেকেন্ড কয়েক পরপরই একজন মাঝবয়সী নারী দরজা খুলে দেয়। বলা বাহুল্য, নারীটি আর কেউই না বরং জাওয়াদের মা। পূর্ণতা জাওয়াদের মাকে চেনে আগের থেকেই। অনেক আগেই একবার দেখা হয়েছিল।
পূর্ণতা মিসেস শেখকে দরজার ওপাশে দেখে একটা বড়সড় হাসি দিয়ে বলে–
—হ্যালো শাশু মা। আমি এসে পরেছি আপনাদের জ্বালা।
পূর্ণতার শাশু মা বলে ডাকা আর তাকে গায়ে বিয়ের লেহেঙ্গা পরিহিত অবস্থায় জাওয়াদের কোলে থাকতে দেখে ভদ্রমহিলার বুঝতে বাকি থাকে না ব্যাপারখানা। দূর্বল শরীর ও মন এত বড় ঝটকা নিতে পারে না। সে সাথে সাথেই অজ্ঞান হয়ে নিচে পরে যেতে নিলে মি.শেখ স্ত্রীকে পেছন থেকে আগলে নেয় নিজের বাহুতে।
বিষয়টা দেখে পূর্ণতা বড়বড় চোখ করে হালকা আওয়াজে বলে ওঠে–
—ওওওউউউ! হাউ রোমান্টিক কাপল দে আর!
📌গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রেমী বন্ধুমহলের নিকট পৌঁছে দিন।
শব্দ সংখ্যা~১৩২০
~চলবে?
[
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৭
-
শেষ পাতায় সূচনা গল্পের লিংক