শেষপাতায়সূচনা [৪৬.২]
সাদিয়াসুলতানামনি
আজ থেকে প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় আগে ধুলোমাখা এক বিকেলে, পারিবারিক আয়োজনে আঞ্জুমানের পিতা আতিকুল সাহেবের সঙ্গে রায়হানা আক্তারের শুভ পরিণয় সম্পন্ন হয়েছিল। চারপাশে ছিল আত্মীয়স্বজনের কোলাহল, প্রথার আবরণে মোড়া এক নিঃশব্দ সমঝোতা, আর নিয়তির অদৃশ্য লিখন।
কিন্তু এই পরিণয়ের পূর্বে, ঘটেছিল আরো একটি প্রণয়ের কাহিনি। রায়হানার হৃদয়ের গহীনে গোপনে বাস করত করিম ব্যাপারী নামক এক যুবক। একই গ্রামের চেয়ারম্যানের ছেলে হওয়ায়, করিমের উপস্থিতি ছিল যেন এক অঘোষিত প্রভাবের প্রতিচ্ছবি। তার দাপুটে স্বভাব, চোখের চাহনিতে লুকানো কর্তৃত্ব সব মিলিয়ে গ্রামজুড়ে তার এক আলাদা আধিপত্য ছিল।
বখাটে স্বভাবের করিমও হুট করেই আসক্ত হয়ে পড়ল এক নারীতে। মাধ্যমিক স্তর পার করতেই রায়হানার পিতা কন্যাদায় গ্রস্ত মুক্ত হতে চাইলে। তার সেই চাওয়াকে সামনে রেখেই রায়হানার জন্য ছেলে দেখা শুরু হলো। এই খবর যখন করিম জানল, তখন সে তার পিতাকে তাদের প্রণয়ের কথা জানিয়ে দেয়।
করিমের পিতা ছিলো– এক নাক উঁচু, অহংকারী ও কঠোর হৃদয়ের লোক। করিমের নিকট এই কথা জানতে পেরে, সে প্রচন্ড রেগে যান। সব দোষ চাপিয়ে দেয় গরিব ঘরের রায়হানার উপর। রাতের আধারে রায়হানার বাড়িতে গিয়ে তাদের হুমকি ধমকি দিয়ে আসলেন, যাতে রায়হানা করিমের থেকে দূরে থাকে এবং অতি দ্রুতই রায়হানাকে অন্যকোথাও বিয়ে দিয়ে দেয় তার পরিবার। অন্যথায়, রায়হানার পরিবারকে গ্রাম ছাড়া করবে।
করিমের পিতার হুমকিতে রায়হানার পরিবার ভয় পেয়ে যান। এবং মাত্র একসপ্তাহের মাঝে রায়হানাকে আতিকুল সাহেবের সাথে বিয়ে দিয়ে বিদায় করেন। রায়হানার বিয়ের খবর শুনে, করিম উন্মাদের মতো ছুটে যেতে চায় তার কাছে কিন্তু তার পিতা তাকে ভুল বুঝিয়ে থামিয়ে দেন। বলেন, রায়হানা চরিত্র ভালো না এবং এই বিয়েটা তার সম্মতিতেই হয়েছে। বাবার কথায় বিশ্বাস করে নেয় করিম এবং রায়হানার উপর অভিমান ও ক্রোধ নিয়েই আরেক মেয়েকে বিয়ে করে সংসার করতে থাকে।
কেটে যায় বেশ কয়েকটা বছর। আতিকুল সাহেবকে ভালো না বেসেও রায়হানা তার সংসার করতে থাকে। তাদের প্রথম সন্তান হিসেবে জন্ম নেয় এক কন্যা। আতিকুল সাহেব তার নাম রাখেন আঞ্জুমান রুহী। আতিকুল সাহেব একজন পুলিশ অফিসার হওয়ায় বেশিরভাগ সময়ই তাকে বাড়ির বাহিরে কাটাতে হতো। স্ত্রীকে পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারার কারণে, রায়হানা বেগমের মনেও স্বামীর জন্য বিশেষ কোন মায়া-ভালোবাসা জন্ম নেয় না।
অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা শেষে রায়হানা বেগম মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে যান বাপের বাড়ি। সেখানেই আবার বহুবছর পর দেখা হয় তার প্রথম প্রণয় পুরুষ করিমের সাথে। করিমও তাকে প্রথম দেখায় পূর্বের টান অনুভব করেন। সেও বিয়ে করে বউকে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। সৌজন্যতা বজায় রাখার জন্য তারা টুকটাক কথা বলতে বলতে একসময় রায়হানা করিমকে জানিয়ে দেয়, তার পিতা যে তাদের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারকে হুমকি দিয়ে এসেছে। এসব জানার পর করিমের মনে পিতার প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা জন্ম নেয়। সে এতদিন যা জানত তাও রায়হানাকে জানায়। সব জানার পর দুইজনের মন আবারও একে অপরের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ে।
করিম রায়হানাকে প্রস্তাব দেয় বিয়ের। রায়হানা পুরোনো প্রেমিকের সাথে ঘর বাঁধার আশায় নিজের বর্তমান স্বামী, সংসার, সন্তান কোন কিছুর কথা না ভেবেই করিমকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায়। সেবার বাপের বাড়ি থেকে ফিরে এসেই আতিকুল সাহেব অর্থাৎ আঞ্জুমানের বাবাকে তালাক দেন রায়হানা। আতিকুল সাহেব তালাক দেওয়ার সময় শর্ত দেন তার মেয়ে তার কাছে থাকবে। রায়হানা বেগম তখন নিজের প্রেমিককে বিয়ে করতে এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিল যে, সেই শর্ত মেনেই তালাক দিয়ে দেয় এবং করিমের কাছে ফিরে যায়।
আঞ্জুমান এসব কিছুই জানত। কারণ তখন সে যথেষ্ট বুঝদার হয়ে উঠেছিল। বাবার সাথে থাকতে তার কোন আপত্তি ছিল না। উপরন্তু তার মা-বাবার তালাকের কয়েক মাস পর যখন, তার বাবা আতিকুল সাহেব এক স”ন্ত্রা”সীকে ধরতে গিয়ে নি”হ”ত হলেন তারপর থেকে আঞ্জুমান তার দাদা বাড়ির সকলের চোখের মনি হয়ে ওঠে। তার সকল আবদার, ইচ্ছে, চাওয়া পূরণ করতে সবাই সদা তৎপর থাকত।
করিমকে বিয়ে করে রায়হানা সব দিক দিয়ে সুখী হলেও সন্তান সুখ আর পায়নি এ জীবনে দ্বিতীয় বার। করিমের প্রথম স্ত্রী স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে না মানতে পেরে হার্ট অ্যাটাক করে মা”রা যান। করিমের প্রথম স্ত্রীর ঘরে এক পুত্র সন্তান ছিলো। তার নাম ছিলো কবির। কবির মায়ের মৃ”ত্যুর পর বাবাকে অনেক বেশি ঘৃ”ণা করতে থাকে তাকে। এবং একপ্রকার জোর করেই শহরে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা শেষ করে।
পাঁচ বছর আগে আঞ্জুমান সকলের কাছে যখন পরিত্যাগ হয় তখন সে নিজেই তার মায়ের সাথে যোগাযোগ করে। এবং নিজের বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানায়। এতদিন পর সন্তানের খবর মেয়ে রায়হানা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। পরবর্তী সে যখন মেয়ের বর্তমান পরিস্থিতির কথা শুনে তখন তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে চায়। কিন্তু আঞ্জুমান যায় না। দাদার বাড়িতেই থেকে যায় সকলের লাঞ্চনা, কটুক্তি, অপমান সহ্য করে। কারণ সে তখনও মনে মনে আশা করত যে, একদিন না একদিন সে জাওয়াদকে নিজের ঠিক করে নিবে।
মূলত পাঁচ বছর আগের থেকেই আঞ্জুমান ও তার মায়ের যোগাযোগ হয় পুনরায়। তাদের এই যোগাযোগের কথা তার দাদার বাড়ির কেউই জানত না।
পূর্ণতার কাছে ধোলাই খাওয়ার পর আঞ্জুমানকে হসপিটালে আনা হলে, দ্বিতীয় দিনই সে তার মায়ের সাথে যোগাযোগ করে এসে নার্সের মাধ্যমে। নার্সটি একদম নতুন জয়েন করেছে। অভাবের তাড়নায় আঞ্জুমান যখন তাকে টাকার লোভ দেখিয়ে বলে, তাকে পালাতে সাহায্য করতে। তখন সে রাজি হয়ে যায় তাকে পালাতে সাহায্য করতে। প্ল্যান অনুযায়ী, যেদিন আঞ্জুমানকে হসপিটাল থেকে পুলিশের কাস্টাডিতে নেওয়া হবে, সেদিন ভোরে তাকে পাহারা দেওয়া কনস্টেবলটি নামাজ পড়তে গেলে নার্সটির সহায়তায় আঞ্জুমান হসপিটাল থেকে পালাবে। হসপিটালের পেছনের গেইটে তার মা গাড়ি ও ভাড়া করা গুন্ডা নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করবে।
নার্সটি টাকার লোভে আঞ্জুমানকে পালাতে সহায়তা করলেও শেষ মূহুর্তে এসে সে নিজেও চরমভাবে ঠকে যায়। তারা যাতে পুলিশ বা পূর্ণতার কাছে ধরা না পড়ে এজন্য সেই নার্সটিকেও কিডন্যাপ করে নিজেদের সাথে নিয়ে যায় রায়হানারা।
রায়হানা ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে আঞ্জুমানকে নিয়ে সিলেটে না গিয়ে চট্টগ্রাম চলে আসে। তার স্বামী এসবের কিছু কিছু ঘটনা জানেন, তো কিছু কিছু ঘটনা জানেন না। স্ত্রীকে অন্ধের মতো ভালোবাসার কারণে সে কখনোই কোন কাজে আটকায় নি।
সময়ের পরিক্রমায় দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে আরো পয়তাল্লিশটা দিন, অর্থাৎ দেড়মাস। পূর্ণতা আর তাজওয়াদ বর্তমানে পুরোপুরি সুস্থ। আগের মতোই তারা নিজেদের অফিস ও স্কুলেও যাওয়া শুরু করেছে। পূর্ণতা এখন নিজেই ছেলেকে স্কুলে দিয়ে আসে আবার নিজেই নিয়ে আসে স্কুল থেকে। সে তার যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন।
শান্তশিষ্ট তাজওয়াদ তার পূর্বের রূপ বদলে নতুন এক রূপ ধারণ করেছে। বর্তমানে সে এত দুষ্টু হয়েছে সকলের আদরে আদরে তা বলার বাহিরে। তবে হ্যাঁ, সে দুষ্টুমি করলেও কখনো বেয়াদবি করে না। এদিকে তার মায়ের সজাগ দৃষ্টি রয়েছে। সকলের চোখের মণি সে।
এই দেড় মাসে আঞ্জুমানকে খোঁজার কোন কমতি রাখেনি পুলিশ বাহিনী ও পূর্ণতা। কিন্তু সে যেন কর্পূরের ন্যায় মিলিয়ে গিয়েছে। গ্রামের বাড়িতেও তাকে খুঁজতে অভিযান চালানো হয়েছে, কিন্তু বরাবরই ব্যর্থ হতে হয়েছে।
আজ বাদে কাল আমাদের ছোট তাজের পঞ্চম জন্মবার্ষিকী। তাজওয়াদের জন্মদিনে প্রতি বছর পূর্ণতা, টনি ও তাদের বাসার আশেপাশের কয়েকজন প্রতিবেশী এবং তাদের বাচ্চাদের নিয়েই স্বল্প পরিসরে উৎযাপন করা হতো।
জন্মদিন পালন করা যদিও উচিত নয় ইসলাম ধর্ম মতে, কিন্তু তাজওয়াদ যখন তার প্রতিবেশীদের বাচ্চাদের দেখত বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে জন্মদিন পালন করছে, তখন বাচ্চাটা মন খারাপ করত। নিজের জন্মদিনও সেভাবেই সেলিব্রেট করতে চাইত। পূর্ণতা তাদের মতো বড় পরিসরে যদিও করত না, কিন্তু তাজওয়াদের মন রাখার জন্য ঘরটা সুন্দর করে সাজিয়ে, ভালোমন্দ রেঁধে, প্রতিবেশীদের বাচ্চাদের নিয়ে হইচই করে দিনটা কাটাত।
কিন্তু এবার জনাব তাজওয়াদ আবদার পেশ করেছে তার মায়ের কাছে। আবদারটি হলো– এবার ভালো আঙ্কেল, নতুন দাদু, পিপি, এঞ্জেল আন্টি, বাবাই, আলু মামা, বড় নানাভাই সবাইকে নিয়ে নিজেদের বাসায় দিনটি সুন্দর করে কাটাবে। এবং এই আবদারটি তার মাম্মাকে রাখতেই হবে। নয়ত সে নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করবে না, স্কুলে যাবে না, গেলেও ভালো করে পড়াশোনা করবে না ইত্যাদি ইত্যাদি কাজ সে করবে না। ছেলের কথা শুনে পূর্ণতার কপালে ভাজ পড়লেও সে তেমন একটা কিছু বলে না। তাজওয়াদ খুব একটা আবদার করে না। এবার যেহেতু ছেলে নিজের জন্মদিন তার আপনজনদের নিয়ে কাটাতে চাচ্ছে, তাহলে সে কি করে মানা করতে পারে?
কালকের দিনটাকে কেন্দ্র করে এখন তারা যাচ্ছে জাওয়াদের অফিসে। মূলত তাজওয়াদ স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ায় এখন তারা বাসায় যাচ্ছিল। মাঝপথে তাজওয়াদ বলে, আজ সে স্কুলের মিসের সাহায্য নিয়ে একটা পিকচার আর্ট করেছে, সেটা সে ভালো আঙ্কেলকে দেখাবে এবং কালকের জন্য ইনভাইটও করে আসবে। পূর্ণতা দুয়েকবার মানা করলেও, তাজওয়াদ কিউট ফেস করে ঠিকই তাকে মানিয়ে নেয়।
জ্যামের মধ্যে গাড়িতে বসে থাকা অবস্থায় পূর্ণতা তাজওয়াদকে জিজ্ঞেস করে–
—তাজ, জন্মদিনে তোমার কি গিফট চাই মাম্মার থেকে সোনা?
মায়ের প্রশ্ন শুনে তাজওয়াদ ভাবনায় পড়ে যায়। তার আসলে তেমন কিছুই চাই না, কারণ সে কিছু চাওয়ার আগেই পূর্ণতার তার চাহিদার কথা বুঝতে পেরে সেটা তার সামনে হাজির করে। অনেক ভেবেচিন্তে তাজওয়াদ হুট করেই বলে বসে–
—আমি আমাল পাপাকে চাই মাম্মা। সবাল পাপা আছে, কিন্তু তাজওয়াদেল তো পাপা নেই। তাই তাজওয়াদ এবাল পাপাকে চাই বার্থডে গিফটে।
তাজওয়াদ যে এমন একটা কিছু চাইবে পূর্ণতা সেটা কল্পনাও করতে পারে নি। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা টনিও এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছে। জ্যাম ছেড়ে দিতেই টনি আবারও গাড়ি চালাতে শুরু করে। কিন্তু তার কান পেছনের কথা ঠিকই শুনছে। সে শুনতে পায়, তাজওয়াদ তার মায়ের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলছে–
—জানো মাম্মা, আমাল স্কুলের ফ্রেন্ডদেল পাপালা পুতিদিন এচে ওদেল দিয়ে যায়। কত আদল কলে যাওয়াল আগে। আমালই পাপা নেই, তাই পাপাল আদলও পাই না।
কথাগুলো বলতে বলতে বাচ্চাটা ঠোঁট উল্টে নিয়েছে। কান্না কান্না ভাব মুখশ্রীতে। পূর্ণতা হাত বাড়িয়ে ছেলেকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। তাজওয়াদও মন খারাপ করে মায়ের বুকের সাথে সেঁটে থাকে।
জোহরের আজানের কিছুক্ষণ আগে পূর্ণতারা জাওয়াদের অফিসে এসে পৌঁছায়। সামনের গেইটের দিকে কতগুলো পিক-আপে বেশকিছু কাপড় ও অন্যান্য জরুরী জিনিস আসায় সেখান টায় বর্তমানে গোঁজামিল হয়ে রয়েছে । তাই পার্কিংলটের গাড়ি পার্ক করে সেখানকার লিফট দিয়ে উপরে যাবে এটাই ঠিক করে পূর্ণতা। পার্কিং-এ গাড়ি আসতেই পূর্ণতা ও তাজওয়াদ গাড়ি থেকে নেমে পড়ে, আর টনি গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য জায়গা খুঁজতে থাকে।
পূর্ণতা ও তাজওয়াদ গাড়ি থেকে নেমে লিফটের দিকে যাচ্ছিল, তখনই তাদের নজরে পড়ে জাওয়াদের উপর। কিন্তু জাওয়াদ তখন একা ছিল না, তার সাথে আভিরাও ছিলো। এবং তারা একে অপরের অনেকটাই কাছে ছিল। বলতে গেলে জাওয়াদ আভিরার উপর ঝুঁকে ছিল। বিষয়টা দূর থেকে দেখলে মনে হবে, একটা রোমান্টিক মুহূর্ত। পূর্ণতা জাওয়াদকে অন্য একটা মেয়ের এতটা কাছে দেখে সেখানেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
তাজওয়াদ তার ভালো আঙ্কেলকে দেখে খুশি হয়ে চিৎকার দিয়ে ডেকে ওঠে–
—ভালো আঙ্কেল…….
তার চিৎকারে জাওয়াদ ও পূর্ণতা উভয়েরই ধ্যান ভঙ্গ হয়। পূর্ণতা জাওয়াদের থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ছেলের হাত শক্ত করে ধরে তাকে টানতে টানতে সেখান থেকে নিয়ে যেতে থাকে। তার মুখশ্রী ইতিমধ্যে ইস্পাতের ন্যায় কঠোর ভাব ধারণ করেছে। তাজওয়াদ তার মাকে বলছে, সে ভালো আঙ্কেলের কাছে যেতে চায় কিন্তু পূর্ণতা কিছুতেই ছাড়ছে না।
অন্যদিকে এই অসময়ে স্ত্রী আর ছেলেকে নিজের অফিসে দেখে জাওয়াদ হতভম্ব হয়ে রয়েছে। সেই সাথে নিজের সাথে আভিরার এমন নৈকট্যপূর্ণ দৃশ্য পূর্ণতা দেখে ফেলায় সে ভয় পেয়ে যায়। সে ইচ্ছে করে আভিরার এতটা কাছে আসেনি। মূলত, আভিরা আজ তার সাথে একটা কাজের জন্য দেখা করতে এসেছিল। তাদের কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর আভিরা যখন চলে আসতে নেয়, তখন জাওয়াদও তার সাথে সাথে বের হয়ে। তার উদ্দেশ্য ছিল ছেলের স্কুলে গিয়ে দেখা করা।
পার্কিং-এ এসে আভিরা ফোন চালাতে চালাতে বেখেয়ালি ভাবে হাঁটছিল, তখনই অন্য একটা গাড়ি তার দিকে ধেঁয়ে আসতে দেখে জাওয়াদ তাঁকে টান দিয়ে গাড়িটির সামনে থেকে সরিয়ে নেয়। হুট করে হ্যাঁচকা টান লাগায় আভিরা হকচকিয়ে গিয়ে নিজের অজান্তেই জাওয়াদের কোর্ট খামচে ধরে। এর ফলে, দু’জনই দু’জনের অজান্তেই কিছুটা কাছাকাছি চলে আসে এবং জাওয়াদ কিছুটা তারউপর ঝুঁকে যায়। আর ঠিক সেই মূহুর্তেই পূর্ণতা আর তাজওয়াদ সেখানে এসে উপস্থিত হয়।
পূর্ণতাকে তাজওয়াদকে টেনে নিয়ে যেতে দেখে জাওয়াদ বুঝে যায়, পূর্ণতা তাকে ভুল বুঝেছে। সে আভিরার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তাকে ডাকতে ডাকতে তার পেছন পেছন দৌড় দেয়–
—পূর্ণ, দাঁড়াও। তুমি যেটা দেখেছো সেটা সঠিক নয়। লেট মি এক্সপ্লেইন জান।
জাওয়াদকে পূর্ণতার পেছন পেছন এমন করে দৌড়াতে দেখে আভিরার কপালে ভাজ পড়ে। সে ভাবতে থাকে, পূর্ণতাকে কেন জাওয়াদ এতটা সাফাই দিবে? কে হয় জাওয়াদ পূর্ণতার? আভিরা জাওয়াদের লাস্টে বলা “জান” ডাকটা শুনেনি। শুনলে হয়ত অনেক কিছুই বুঝতে পারত সে।
আভিরাও জাওয়াদের পেছন পেছন যেতে চায়, কিন্তু তখনই তারা বাবা ফোন করে তাকে ইমিডিয়েটলি অফিসে যেতে বলায় সে আর জাওয়াদের পেছনে যায় না। গাড়িতে বসে চলে যায় নিজের গন্তব্যে।
এদিকে পূর্ণতা তার প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে টনিকে কল দিয়ে হিসহিসিয়ে বলে–
—গাড়ি নিয়ে তাড়াতাড়ি আসো। বাসায় যাবো।
পূর্ণতার কথা শুনে টনি কিছুটা অবাকই হয় বটে। কারণ তারা এসেছে মাত্রই। তাও সে কোন কথা না বাড়িয়ে পুনরায় গাড়ি নিয়ে আসে মেইন গেইটের দিকে।
টনি গাড়ি নিয়ে সেখানে আসার আগেই জাওয়াদ পূর্ণতার কাছে এসে উপস্থিত হয়। সে অস্থির গলায় পূর্ণতাকে বুঝানোর উদ্দেশ্যে বলে–
—শুনো একটু আমার কথা, জাস্ট একবার শুনো। তুমি যেমনটা দেখেছো সেটা সত্য নয়। আভিরা…..
—আমি আপনার কাছে কোন এক্সপ্লেনেশন চেয়েছি? আপনি যা ইচ্ছে করুন, যার সাথে ইচ্ছে থাকুক, জড়িয়ে ধরুন আই ডোন্ট কেয়ার। তবে হ্যাঁ, আমার এবং আর আমার ছেলের থেকে দূরে থেকে করুন। চলো তাজওয়াদ….
টনি ততক্ষণে গাড়ি নিয়ে আসায় পূর্ণতা তাজওয়াদকে জোর করে গাড়িতে উঠাতে চায়। কিন্তু তাজওয়াদ তার পেইন্টিং না দেখিয়ে যাবে না। সে গাড়িতে উঠছে না দেখে পূর্ণতা আজ অনেকদিন পর তাকে ধমক দিয়ে বলে–
—কি হলো? গাড়িতে উঠছো না কেনো?
পূর্ণতার ধমক খেয়ে তাজওয়াদ কেঁদে দেয়। জাওয়াদ তাড়াতাড়ি করে তার পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসে তাকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে। তারপর পূর্ণতাকে রাগ দেখিয়ে বলে–
—ওর সাথে এমন ভাবে আচরণ করছো কেনো?
—আমার ছেলের সাথে কেমন আচরণ করবো, সেটা এখন আমার আপনার থেকে শিখতে হবে?
—প্রয়োজন পড়লে হবে শিখতে। তুমি আমার রাগ ওর সাথে দেখাতে পারো না। আর কি আমার আমার লাগিয়েছো? আমাদের বলো। তোমার একার সন্তান না ও’।
পূর্ণতা না চাইতেও রাগ দেখিয়ে ফেলছে জাওয়াদকে আভিরার সাথে দেখে। যতই রাগ করুক, অভিমান করে দূরে থাকুক কিন্ত তার মন এখনও কিছুটা হলেও দূর্বল এই শ্যামসুন্দর পুরুষের উপর। জাওয়াদ ছেলেকে কোলে তুলে দাঁড়ায়। তারপর পূর্ণতার দিকে এক পলক তাকিয়ে অফিসের ভেতরে যেতে যেতে বলে–
—ভেতরে আসো।
পূর্ণতা রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে তার পেছন পেছন যেতে থাকে। অসহ্য লাগছে জাওয়াদকে তার বর্তমানে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন ]
শব্দসংখ্যা~২১৪০
চলবে?
[আজ কত বড় করে দিয়েছি, দেখেছেন?🥹😒 সবাই একটু রেসপন্স করিয়েন। তাহলে পরবর্তী পর্বও বড় করে দিবো ইনশা আল্লাহ।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৩.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪১.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪২.৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৮.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৫.১