শেষপাতায়সূচনা [৪৫.২]
সাদিয়াসুলতানামনি [ঈদ স্পেশাল🌙🤍]
মি.শেখ আহমেদ ম্যানশনের ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ছেলে ও নাতির খুনসুটি চোখ ভরে দেখছেন। ছেলেকে এতবছর পর আবার আগের মতো হাসতে দেখে মি.শেখের চোখ খুশির অশ্রুতে ভরে যায়। সে মনে মনে ওপরওয়ালার কাছে দোয়া করে তার ছেলের খুশির কারণগুলো যেন তাকে আবারও ফিরিয়ে দেন তিনি।
হ্যাঁ, আজ মি.শেখ ও জাওয়াদ এসেছে আহমেদ ম্যানশনে। জাওয়াদ এর আগে কয়েকবার আসলেও মি.শেখ আজ নিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো আসল এই বাড়িতে। প্রথমবার এসেছিল সেই পাচঁবছর আগে পূর্ণতার খোঁজে। প্রিয় পুত্রবধূর অসুস্থতা আর একমাত্র নাতির হাত ও মাথা ভা”ঙার খবর শুনে বৃদ্ধ কিছুতেই আর নিজেকে সংবরণ করে রাখতে পারেন নি তাদের দেখার থেকে। নাতির জন্য দুই হাত ভর্তি করে খেলনা, চকলেট, চিপস ইত্যাদি জিনিসপত্র নিয়ে তাকে দেখতে চলে এসেছে আহমেদ ম্যানশনে।
যদিও সে ও তার মিসেস অনেক আগেই আসতে চেয়েছিল, কিন্তু জাওয়াদই তাদের নিয়ে আসেনি। তাদের দেখে যদি পূর্ণতা হাইপার হয়ে যায় তাহলে এটা তার স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলবে। কিন্তু আজ মি. শেখ একপ্রকার জোর করেই এসেছে পুত্রবধূ ও নাতির সাথে দেখা করতে। তবে সাথে করে মিসেস শেখকে নিয়ে আসেন নি।
তার ধ্যান ভঙ্গ হয় পূর্ণতার আগমনে। মাথায় কাপড় টেনে রাখা পূর্ণতা বড় এক ট্র ভর্তি করে নাস্তা নিয়ে এসে শ্বশুরের সামনে এনে রাখে। তার পেছন পেছন মালতী কাকীও ফলের ট্রে এনে রাখেন টি-টেবিলের উপর। পূর্ণতা ছ্যাচানো আদা, পুদিনাপাতা ও বিভিন্ন ধরনের মশলা দিয়ে বানানো এককাপ ধোঁয়া ওঠা লাল চা বাড়িয়ে দেন শ্বশুরের দিকে। কোমল গলায় বলে–
—আঙ্কেল নিন।
আঙ্কেল সম্বোধনটা মি.শেখের বুকে গিয়ে লাগে। বিয়ের পর পূর্ণতা তাকে আব্বা, বাবা, আব্বু এসব সম্বোধন করত। বিষয়টা তারও ভালো লাগত। পূর্ণতাকে তখন তার আরেকটি মেয়ে মনে হতো। সত্য বলতে, পূর্ণতার জাওয়াদকে জোর করে বিয়ে করা ছাড়া এমন কোন অপরাধ ছিলো যা, যার কারণে তাকে মেনে নেওয়া যাবে না নিজের পুত্রবধূ হিসেবে। বরং সে একটু বেশিই গুণান্বিত ছিল সবকিছুতে। রূপ, আর্থিক অবস্থা, ব্যবহার সবেতেই মেয়েটা ছিলো একশ তে একশ।
মি. শেখ হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা নেন। পূর্ণতা অন্যান্য নাস্তাগুলো উনার সামনে এগিয়ে দিয়ে নিজে একটা সিঙ্গেল সোফায় বসে ভাবতে থাকে, আজ আবার কেন উনারা দেখা করতে আসল?
তাজওয়াদ একটা খেলনা পি”স্ত”ল হাতে নিয়ে ছুটতে ছুটতে মায়ের কাছে এসে হাপাতে হাপাতে বলে–
—মাম্মা, দেকো সুন্দল না?
পূর্ণতা ছেলের মুখখানা ওড়নার আঁচল দিয়ে মুছে দিতে দিতে হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলে–
—ভীষণ সুন্দর বাবা। কিন্তু তুমি এত ছুটোছুটি করছো কেনো? পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে তখন কি হবে? কাল প্রমিজ করে আজই ভুলে গিয়ে আবারও দুষ্টুমি করছো? মজিব ঘটককে ফোন দিয়ে তোমার হবু বউকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসতে বলবো কিন্তু।
উফফফফ! এই মাম্মা শুধু তাজকে বিয়ের ভয় দেখায়। তাজ মুখটা ফুলিয়ে মি. শেখের পাশে বসে পড়ে। তারপর থমথমে গলায় বলে–
—দুত্তুমি কই কললাম? আমি তো ভালো আঙ্কেলেল চাতে কেলছিলাম। এখন কি তাজ কেলতেও পালবে না? শুদু বিয়ে কলিয়ে দিবো, বিয়ে কলিয়ে দিবো। উফফ, ভালো লাগে না আল!
সকলে তার কথা শুনে ও ভাব ভঙ্গিমা দেখে উচ্চস্বরে হেসে দেয়। বেচারা তাজওয়াদ মায়ের হুমকিতে অতিষ্ঠ হয়ে নিজের দুঃখ প্রকাশ করলো। কিন্তু সকলে তার কষ্ট না বুঝে হাসছে। এবার তাজওয়াদের সবার উপর অভিমান হয়েছে। কারো সাথে কথা বলবে না। না বড় নানাভাইয়ের সাথে, না ভালো আঙ্কেলের সাথে আর নাই বা নতুন দাদুর সাথে। মাম্মার সাথে কথা বলবে। কারণ মাম্মার সাথে কথা না বললে, তার নিজেরই ভালো লাগে না।
তাজওয়াদ সকলের দিকে অভিমানী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে মলিন গলায় বলে–
—তোমলা সবাই আমাল কষ্টে হাসচো? তাজ আল কথা বলবে না তোমাদেল সাথে। নতুন দাদু তোমাল সাথেও না। আজ থেকে তাজ শুধু মাম্মাল সাথে কতা বলবে।
কথাটা বলে সে তার মায়ের কাছে গিয়ে তার ওড়নার আঁচলে মুখ গুঁজে বসে থাকে। সকলে তো টাস্কি খেয়ে যায় এই ছেলের কাজে। মায়ের রাগ তাদের উপর দেখাচ্ছে। জাওয়াদ তাড়াতাড়ি করে ছেলের কাছে গিয়ে তাকে নিজের কোলে তুলে নেয়। তারপর তাকে সান্ত্বনা দিতে সকলকে মিছে রাগ দেখিয়ে বলে–
—অ্যাঁই আপনারা কেউ তাজওয়াদের কষ্টে হাসবে না। তোমরা তো বুঝো না বিয়ের কত প্যারার জিনিস। একটা করেই আমার মতো বড় এক ছেলের যেই বেহাল অবস্থা। আমার ছোট তাজকে এখনই বিয়ে দিয়ে দিলে, বেচারা তো বউয়ের প্যারায় পাগলই হয়ে যাবে।
আহনাফ সাহেব আর মি.শেখ আবারও হেঁসে উঠেন, সেই সাথে সম্মতিও দেয় জাওয়াদের কথায়। কারণ এই বিষয়ে তারাও ভুক্তভোগী। জাওয়াদ হাসতে হাসতে পূর্ণতার দিকে তাকালে তার হাসি বন্ধ হয়ে যায়। কারণ পূর্ণতা তার দিকে কড়া দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। জাওয়াদ ভ্যাবলার মতো হেহে করে হেঁসে বলে–
—হেহে, মজা করছিলাম। খুব লেইম হয়ে গেলো মজাটা?
পূর্ণতা দাঁতে দাঁত চেপে বলে–
—ভাবনার চেয়েও লেইম ছিলো। আর বলদের মতো হাসা বন্ধ করুন।
জাওয়াদ তার কথা শুনে মুখটা গোমড়া করে নেয়। পূর্ণতা তাজওয়াদকে কোলে তুলে উপরে উঠবার আগে মি.শেখকে উদ্দেশ্য করে বলে–
—আপনারা বসুন আঙ্কেল। আমি ওকে গোসল করিয়ে নিয়ে আসি। বেলা গড়িয়ে গেলে আবার ঠান্ডা লেগে যাবে ওর। আর হ্যাঁ, আজ কিন্তু খেয়ে যাবেন দুপুরের খাবার। না খাইয়ে ছাড়বো না।
মি.শেখ মাথা দুলিয়ে হেঁসে বলে–
—তুমি না বললেও খেয়েই যাবো আজ। কতদিন হলো তোমার হাতের রান্না খাই না।
পূর্ণতা তার কথার প্রতিউত্তরে শুধু একটা মলিন হাসি দিয়ে উপরে চলে যায় ছেলেকে নিয়ে। পূর্ণতারা চলে যেতে জাওয়াদ কেমন উশখুশ করতে থাকে। মি. শেখ আর আহনাফ সাহেব বসে বসে কথা বলছেন। জাওয়াদের তাদের দিকে মনোযোগ নেই। সে বারবার চোখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে উপরের দিকেই তাকাচ্ছে। একটু পর সে বসা থেকে ঠা”স করে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হঠাৎই নিজের পেট চেপে ধরে কাতরানো স্বরে বলে–
—পেটের মধ্যে কেমন কেমন করছে বাবা। আমি ওয়াশরুম থেকে আসছি তোমরা কথা বলো।
কথাটা বলে তাদেরকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সে বড় বড় কদম ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়। মি. শেখ আর আহনাফ সাহেব হা করে তার যাওয়া দেখে আর একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর জাওয়াদের কর্মকাণ্ড বুঝতে পেরে দু’জনই উচ্চস্বরে হেঁসে দেয়। এত বড় ছেলে কি কাণ্ডটাই না করলো বউয়ের কাছে যাওয়ার জন্য।
জাওয়াদ সবগুলো সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার পর লম্বা একটা শ্বাস ফেলে। তারও লজ্জা লাগছে এমন কাহিনি করে উপরে আসার জন্য, কিন্তু সে নিজেকে বুঝ দিলো এখন লজ্জা পাওয়ার সময় না। বউয়ের রাগ ভাঙিয়ে ঘরের লক্ষীকে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়া হোক আগে, তারপর এসব লাজলজ্জা নিয়ে ভাবা যাবে।
জাওয়াদ দ্রুত পা চালিয়ে পূর্ণতার রুমে এসে পৌঁছায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দিলে, কাউকেই দেখতে পায় না। বোধহয় তাজওয়াদকে ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়েছে পূর্ণতা। সে ভেতরে প্রবেশের জন্য পা বাড়াবেই তখনই পূর্ণতার ফোনটা সশব্দে বাজতে শুরু করে। অনবরত ফোন বাজতে থাকায় পূর্ণতা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসে। চঞ্চল হাতে ফোনটা রিসিভ করে কানে লাগালে, সে বুঝতে পারে অফিস থেকে কল করা হয়েছে তাকে। পূর্ণতা গলা উঁচিয়ে তাজওয়াদকে উদ্দেশ্য করে বলে–
—আব্বু, তুমি বাথবো””ম গুলো পানিতে ছাড়ো৷ আমি কলটা পিক করে আসছি।
তাজওয়াদ ওয়াশরুমের ভেতর থেকেই বলে–
—আচ্চা মাম্মা।
পূর্ণতা কথা বলতে বলতে বেলকনিতে চলে যায়। জাওয়াদ এতক্ষণ রুমের বাহিরে দাড়িয়েই সবটা ঘটনা দেখে। পূর্ণতা বেলকনিতে যেতেই সে রুমে প্রবেশ করে। যার জন্য জাওয়াদের আসা সেই তো রুমে নেই, তাই সে যেখানে চলে যায় জাওয়াদ। সে ওয়াশরুমের দরজার সামনে এসে দেখে তাজওয়াদ বাথটাবের পানিতে দাঁড়িয়ে আছে। আর একটা একটা করে বাথবো””ম পানিতে ছাড়ছে। বাথবো””ম গুলো কয়েক মিনিটের মধ্যেই পানির সাথে মিশে গিয়ে একটা একটা করে খেলনা বের হয়ে আসছে। যা দেখে তাজওয়াদ তো মহাখুশি।
তাজওয়াদ আরেকটা বাথবো””ম হাতে নিয়ে পানিতে ছাড়বে তখনই তার নজরে এসে পড়ে জাওয়াদের উপর। তার তো ভালো আঙ্কেলকে দেখে খুশি আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সে মুখভর্তি হাসি নিয়ে জাওয়াদকে ডেকে বলে–
—ভালো আঙ্কেল, তুমি? আচো, এদিকে আচো। দেকো কত সুন্দল না?
জাওয়াদ ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে–
—হ্যা, বাবা অনেক সুন্দর।
তাজওয়াদ তার কথা শুনে দারুণ আনন্দ পায়। সে কিছু একটা ভেবে পুনরায় জাওয়াদকে জিজ্ঞেস করে–
—আঙ্কেল, তুমি আমাল সাতে একতা গেম কেলবে?
গেম? তাও ওয়াশরুমে? ছেলের কথা শুনে জাওয়াদ একটু দ্বিধায় পড়ে যায়। সে অবুঝ গলায় বলে–
—ওয়াশরুমে কি গেম খেলবো সোনা?
তাজওয়াদ তার প্রশ্নের উত্তর দেয় না। বরং হুট করেই তার ছোট মগটা দিয়ে বাথটাব থেকে একমগ পানি উঠিয়ে জাওয়াদের দিকে ছুঁ”ড়ে দিয়ে দাঁত কেলিয়ে বলে–
—ওয়াটার থ্রোয়িং গেইম। (পানি ছো”ড়াছু”ড়ি খেলা)
কথাটা বলেই আরে এক মগ পানি ছুঁ”ড়ে দিয়ে জাওয়াদকে আবারও ভিজিয়ে দেয়। অন্যদিকে তাজওয়াদের এহেন কাণ্ডে জাওয়াদ প্রথমে বোকা বনে গেলেও, একটু পর নিজেকে সামলে নিয়ে সেও আরেকটা মগ নিয়ে তাজওয়াদকেও ভিজিয়ে দেয়। দুই বাপ-বেটা লেগে যায় নিজেদের মতো আনন্দ করতে।
এদিকে পূর্ণতা তার কথা শেষ করে এসে তাড়াতাড়ি করে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু ওয়াশরুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ানোর পরপরই তাদের এমন কাণ্ড দেখে তার মাথা ঘুরে যায়। জাওয়াদ ও তাজওয়াদ দু’জনই কাক ভেজা হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে। পূর্ণতা তাদেরকে মনের সুখে এই অদ্ভুত খেলা খেলতে দেখে কিছু বলতেও ভুলে যায়।
হঠাৎই পূর্ণতার মাথায় আসে, তাজওয়াদ অনেকক্ষণ ধরে পানিতে ভিজছে। তার এতক্ষণ পানিতে থাকা মানে আবার জ্বর-ঠান্ডায় ভোগা। তাই সে তাদের খেলায় বেঘা”ত ঘটিয়ে চিল্লিয়ে বলে ওঠে–
— তাজওয়াদ-জাওয়াদ আপনারা কি করছেন এসব? থামুন আপনারা।
পূর্ণতার গলার আওয়াজ পেয়ে তাজওয়াদ আর জাওয়াদ ভ”য় পেয়ে যায়। জাওয়াদ তার দিকে ফিরে তাকানোর জন্য মোড় নেয় কিন্তু দূ”র্ভাগ্যবশত ফ্লোরে থাকা সাবান পানিতে স্লিপ কে”টে ধাপ করে বাথটাবের পানিতে পড়ে যায়। তাকে এভাবে পড়তে দেখে পূর্ণতার চোখ আগের থেকে দ্বিগুণ বড় হয়ে যায়। তাজওয়াদও বোকা বনে যায় জাওয়াদকে এভাবে পড়ে যেতে দেখে।
পূর্ণতা সাবধানে কিন্তু দ্রুত পায়ে হেঁটে আসে বাথটাবের নিকট। তারপর একহাত দিয়ে জাওয়াদের শার্ট খামচে ধরে তাকে পানি থেকে উঠায়। বেকায়দায় পড়ে যাওয়ায় জাওয়াদ হাবুডুবু খাচ্ছিল পানিতে। পূর্ণতা তাকে উঠানোয় হাফ ছেড়ে বাঁচে। পূর্ণতা উদ্বিগ্ন হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে–
—আপনি ঠিক আছেন তো?
জাওয়াদ মাথা নাড়িয়ে বলে সে ঠিক আছে। পূর্ণতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সেই সাথে তার পূর্বের রা”গ আবারও ফিরে আসে। সে তাদের দু’জনকেই ধমক দিয়ে বলে–
—এসব কি করছিলেন আপনারা, হ্যাঁ? তাজ, তুমি….
পূর্ণতাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই তাজওয়াদ গড়গড় করে বলতে থাকে–
—মাম্মা, আমাল কুনো দোষ নেই। সব কলেছে ভালো আঙ্কেল।
তাজওয়াদকে এমন ইন্সট্যান্ট পল্টি খেতে দেখে জাওয়াদ হা হয়ে যায়। কি বিচ্ছু তার ছেলেটা! নিজে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাকে এই অদ্ভুত খেলা খেলতে বললো। এখন মায়ের বকা থেকে বাঁচতে তার উপরই সব দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে। জাওয়াদ তাজওয়াদের থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে পূর্ণতার দিকে তাকালে, দেখতে পায় পূর্ণতা খেয়ে ফেলা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। জাওয়াদ ভয়ে ঢোক গিলতে থাকে একটু পরপরই।
পূর্ণতা তাজওয়াদকে বাথটাব থেকে বের করিয়ে বকতে বকতে গোসল করাতে থাকে–
—ইচ্ছে তো করছে দুইজনকেই উল্টো করে বেধে পি”টাই। তাজ, তোমার শরীর অসুস্থ। বেশিক্ষণ পানিতে ভেজা নিষেধ তোমার। তুমি কেন তোমার ভালো আঙ্কেলকে মানা করলে না?
তাজওয়াদ মিনমিনিয়ে বলে–
—সরি মাম্মা। আল হবে না এমন।
—আজ শুধু একটা হাচ্চি দাও তুমি। তোমাকে ইয়া বড় ইনজেকশন তো দেওয়াবোই, সেই সাথে কালই বিয়ে করিয়ে দিবো তোমার। তোমার বউ এসে তোমাকে দুষ্টুমি কমাবে, নাহলে দেখছি তুমি দুষ্টুমি কমাচ্ছোই না।
তাজওয়াদ কাঁদো কাঁদো গলায় বলে–
—প্রমিজ মাম্মা, তাজ আর দুট্টুমি কব্বে না। তুমি বিয়ে কলিয়ে দিও না আমায়।
পূর্ণতা আর কিছু বলে না। তাজওয়াদকে তার ছোট বাথরোব পরিয়ে কোলে তুলে নেয়। ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার সময় তার নজর পড়ে ভেজা বেড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জাওয়াদের উপর। তাকে দেখে পূর্ণতার মেজাজ খারাপের পারদ আরো একধাপ বেড়ে যায়। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে–
—শাওয়ার নিতে থাকুন আপনি। মালি কাকার ড্রেস এনে দিচ্ছি আপনাকে।
পূর্ণতার কথা শুনে জাওয়াদ তার মুখটা আরো দুঃখী দুঃখী বানিয়ে নেয়। পূর্ণতা ওয়াশরুম থেকে বাহিরে এসে চটজলদি তাজওয়াদকে রেডি করিয়ে দেয়। তারপর চঞ্চল পায়ে হেঁটে আরিয়ানের রুমে চলে যায়। সেখান থেকে আরিয়ানের একসুট ড্রেস এনে জাওয়াদকে দেয়। আরিয়ানের ড্রেস গুলো যদিও জাওয়াদের একটু টাইট হয়, কারণ আরিয়ানের থেকে জাওয়াদ আরেকটু বেশি লম্বাচওড়া এবং তার স্বাস্থ্যও আরিয়ানের থেকে বেশ ভালোই। তাই বলে জাওয়াদ মোটা নয় কিন্তু। মালি কাকার ড্রেস না পেয়ে সে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আর লক্ষী বাচ্চার মতো পরে নেয় সেগুলোই।
বাহিরে এসে দেখে পূর্ণতা তাজওয়াদকে হ্যান্ডব্যাগ পরাচ্ছে গলায়। মুখটা তার থমথমে। জাওয়াদ একটা শুকনো ঢোক গিলে তাদের কাছে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। ব্যাগটা পরানো শেষে পূর্ণতা তাজওয়াদের থেকে সরে আসতে নিবে তখনই তাজওয়াদ বেডের উপর দাঁড়িয়ে বাম হাত দিয়ে তার মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে, তার গালে চুমু দিতে থাকে। আর বলে–
—মাম্মা, আমাল সুনা মাম্মা, তুমি লাগ কলো না আল। তাজ এবার পাক্কা প্রমিজ কচ্চে আল দুট্টুমি করবে না। দেকো, তাজ তোমাকে তাল স্পেশাল চুমু দিচ্ছে। তাও তুমি লাগ কলে থাকবে?
পূর্ণতা আঁড়চোখে ছেলের মলিন মুখের পানে তাকায়। এত কিউট বেবি ফেইস করে তাজওয়াদ তার কাছে মাফ চায় যে, পূর্ণতা আর রাগ করে থাকতেই পারে না। তাও সে গম্ভীর গলায় বলে–
—আর যদি দুষ্টুমি করেছো, এবার আমি তোমার কোন কথা শুনবো না। একদম বিয়ে করিয়ে দিবো বলে দিলাম।
তাজওয়াদ ভদ্র বাচ্চার মতো মায়ের কথা মেনে নেয় এবারের জন্য। জাওয়াদ এতক্ষণ মা-ছেলের মান-অভিমান ভাঙানোর কাণ্ডকারখানা দেখছিল। সে এগিয়ে আসতেই পূর্ণতা তাকে উদ্দেশ্য করে বলে–
—আপনারা দু’জন নিচে যান। আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি।
—আচ্ছা।
জাওয়াদ তাজওয়াদকে কোলে তুলে বাহিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবে তার আগে পূর্ণতাকে জিজ্ঞেস করে–
—তুমি কি আমার উপর রেগে আছো ওয়াশরুমে তাজওয়াদের সাথে দুষ্টুমি করার জন্য।
পূর্ণতা তার মুখ ভঙ্গি আগের মতো থমথমে করে রেখেই বলে–
—আপনার উপর আমার রাগ-অভিমান করার কোন অধিকার আগেও ছিলো না, এখনও নেই আর নাই বা ভবিষ্যতে হবে। তাই অযথা এসব ভাববেন না।
পূর্ণতার কথাটা এসে আঘা”ত হানে জাওয়াদের বুকে। সে কাতর গলায় বলে–
—ছিলো, আছে আর থাকবে ইনশা আল্লাহ। আ’ম সরি পূর্ণ। আমি খেলতে চাইনি, কিন্তু তাজওয়াদই আমাকে প্রভোক করেছিল।
নিজেরে জারিজুরির ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তাজওয়াদ ভয় পেয়ে। সে দ্রুত জাওয়াদের কোল থেকে নেমে বাহিরের উদ্দেশ্যে দৌড় মা”রে। পূর্ণতা তাকে পেছন থেকে ডেকে উঠলেও সে তার দৌড় থামায় না। পূর্ণতা জাওয়াদের থেকে নজর সরিয়ে নিয়ে ভেজা বাথরোব ও টাওয়াল তুলে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দেয়, কিন্তু পিছ থেকে জাওয়াদ তার ওড়নার একাংশ টেনে ধরে।
ওড়নায় টান পড়ায় পূর্ণতা পেছন ফিরে তাকালে হুট করেই জাওয়াদ তার কাছে এসে ধুপধাপ পূর্ণতার দুই গালে চুমু দিয়ে দৌড় বের হয়ে আসে রুম থেকে। জাওয়াদ দরজার সামনে একটু থেমে পেছনে ফিরে বলে–
—ইট’স এন এপোলজি কিস। প্লিজ অ্যাকসেপ্ট মাই এপোলজি, মাই কুইন।
কথাটা বলেই জাওয়াদ পগারপার। পূর্ণতা কতক্ষণ হা হয়ে তাকিয়ে থাকে তার প্রস্থান পানে। তারপর আচমকাই ঠোঁট এলিয়ে হেঁসে দেয়।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার দিয়ে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন ]
শব্দসংখ্যা~২১৮০
চলবে?
[সবাইকে ঈদ মোবারক। 💜🌙 ঈদ উপলক্ষে এই কুটুমুটু একটা পর্ব দিলাম। কেমন হয়েছে পর্বটা? ভালো নাকি পঁচা?
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪১.২