Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৪.২


শেষপাতায়সূচনা [৪৪.২]

সাদিয়াসুলতানামনি

ছেলের সাথে কথা বলে জাওয়াদের ভারাক্রান্ত মনটা বেশ হালকা হয়ে যায়। হঠাৎই তার একটা বিষয় ভাবনায় আসলো। তার বিবেক তাঁকে বলে উঠলো–

—নিজের সন্তানের সাথে তোর পরিচয় মাত্র কয়েক মাসের। অথচ সেই সন্তানের জন্য তোর কতই না মন পুড়ে জাওয়াদ। ছেলের চোখের একটু পানি দেখে তোর ভেতরে তা”ণ্ডব শুরু হয়ে গিয়েছিলো। না তুই তার অস্তিত্ব অনুভব করেছিস কখনো, না তাকে জন্ম নিতে দেখেছিস আর নাই বা তার বড় হওয়া। অথচ পূর্ণতার বাবা এসবের সময় উপস্থিত ছিলেন। বরং ভদ্রলোকের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটুকুই ছিলো নিজের একমাত্র সন্তান। সেই সন্তান, যে কিনা তোকে ভালোবেসে চরমভাবে ঠকে গিয়েছ।

তোর মায়ের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কালো থাবা মেয়েটাকে মৃত্যুর দুয়ার অব্দি ঘুরিয়ে নিয়ে এসেছে তোর মাধ্যমে। সেই অসুস্থ সন্তানকে দিনকে দিন আরো ভেঙে পড়তে দেখে ভদ্রলোক না সইতে পেরে দুনিয়াই ছেড়ে চলে গেলেন৷ প্রকৃতপক্ষে তাকে হ’ত্যা করেছিস তোরা মা-ছেলে। নিজের স্ত্রীকে এতিম করে দিয়েছিস তোরা তোদের সো কলড ভালোবাসা নামক বি”ষের মাধ্যমে। তাহলে তুই কি করে এত সহজে তার ক্ষমা আশা করিস? কি করে ভাবিস, ও তোকে এত সহজে ক্ষমা করে তোকে সন্তানের পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দিবে? কেনোই বা দিবে? কি করেছিস সেই সন্তানের জন্য, যার অস্তিত্ব বিনিষ্টের সম্মুখীন হতে নিয়েছিল শুধু মাত্র তোদের কারণে? তুই কি আদৌ সন্তান সুখ পাওয়ার যোগ্য?

পেইন্ট হাউজের নিস্তব্ধ, একাকী, অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ আজ আবারও জাওয়াদকে তার অপরাধগুলো চিৎকার করে জানাচ্ছে সে কতটা নির্বোধ, কাপুরুষ ও স্বার্থপর গোছের লোক। জাওয়াদ এসব ভেবেই হাঁসফাঁস করতে শুরু করে। পূর্ণতাকে দেখার জন্য তার মনটা ছটফট করতে থাকে। তার মনের সেই ছটফটানি দূর করার জন্য জাওয়াদ তখনই গাড়ির চাবি নিয়ে বের হয়ে যায় বাসা থেকে।

হেল্পিং হ্যান্ড মহিলা জাওয়াদের জন্য রাতের খাবার নিয়ে আসছিল তার পেইন্ট হাউজের দিকে, জাওয়াদকে গাড়ি নিয়ে এত রাতে বের হতে দেখে সে খবরখানা পৌঁছে দেয় বাসার অন্দরে। জিনিয়া, মি.শেখ ও মিসেস শেখ মাত্রই রাতের খাবার খেতে বসেছিল তখনই হেল্পিং হ্যান্ড মহিলাকে খাবারের ট্রে সমেত ফেরত আসতে দেখে মিসেস শেখ তাকে প্রশ্ন করেন–

—কি হলো রাহেলা? তুমি খাবারগুলো নিয়ে চলে আসলে যে? জাওয়াদ আজও খাবার না খেয়েই শুয়ে পরেছে?

জাওয়াদ গত পাঁচ বছরে না মিসেস শেখের সাথে ভালো করে কথা বলেছে, নাই বা তাকে মা বলে ডাকে আর নাই বা তার হাতের কোন রান্না খায়। একদিন সে জাওয়াদকে তার হাতের রান্না না খাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে, জাওয়াদ উল্টো তাকেই জিজ্ঞেস করেছিলো–

—এই খাবারে আবারও যে কিছু মিশিয়ে রাখো নি এটা আমি কিভাবে বিশ্বাস করবো? এখন তো পূর্ণতাও নেই, যে কিনা আমায় তোমার ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচাবে। দেখা গেলো তোমার হাতের খাবার খেয়ে রাতে অচেতন হয়ে পরে থাকলাম, সকালে তুমি আর তোমার ভাতিজি নাটক করে আমাকেই দোষী বানিয়ে দিলে। একবার বিশ্বাস করে যেই চরম ঠকা ঠকেছি, সেই একই ভুল আবার কোন সাহসে কি বলতে পারো?

সন্তান হয়ে মাকে এক বিন্দুও বিশ্বাস করে না জাওয়াদ তাকে। এর চেয়ে কষ্টের আর কিছু হতে পারে? মাসের পর মাস চলে যায় কিন্তু মিসেস শেখের সাথে জাওয়াদের দেখা হয় না, কথা হয় না। দিনের পর দিন মিসেস শেখ পথের দিকে চেয়ে বসে থাকেন। উপরওয়ালার কাছে দুই হাত তুলে দোয়া করেন, তার সংসারটা আবারও আগের মতো করে দিতে। তার সন্তানকে সুখের মুখ দেখাতে। কিন্তু সব চাইলেই কি পাওয়া যায়? উপরওয়ালা কি তাদের দেয় কি একটা সুখের সংসার? দিয়েছিলো। কিন্তু তারা কি করলো? নিজেরাই সেই সংসার ভেঙে তছনছ করে দিলো।

জাওয়াদ প্রায়ই দিন বাসায় আসে না। আসলেও তার হাতের রান্না তো খায়ই না, মেইড দিয়ে রাধালেও অনেক সময় খায় না। তার নাকি মেইডের সাথের রান্না ভালো লাগে না। নিজেই নিজের পেইন্ট হাউজে টুকটাক খেয়ে বসে থাকে। আজ জিনিয়া রাতের রান্না করেছিলো বলে খাবার পাঠিয়েছিল তার জন্য।

মিসেস শেখের প্রশ্নের জবাবে হেল্পিং হ্যান্ড মহিলাটি বলে–

—স্যার তো বাড়িতেই নাই মেডাম। স্যার গাড়ি নিয়া কই জানি গেলো।

—বাহিরে গিয়েছে? তুমি যাওয়ার পর বের হয়েছে, তোমার নাকি আগেই চলে গিয়েছিলো?

—আমি খাওন নিয়া যাইতাছিলাম, তখম দেখি স্যার কই জানি যাইতাছে।

—ওহ্হ।

মি.শেখ আনমনেই বলে ওঠেন–

—ছেলেটা এত রাতে কই গেলো আবার? আমার গোছানো, শান্ত, পরিপাটি ছেলেটা কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেলো। কখন আসে, কখন যায়, কি করে, কি খায় কিছুই জানি না। আর নাই বা বাবা হয়ে ওর জন্য কিছু করতে পারি। ছেলেটা সারাজীবন আমাদের জন্য করেই গেলো, প্রতিদানে পেলো শুধু কষ্ট, বিশ্বাসঘাতকতা আর ধোঁকা। মায়ের আদর্শবান ছেলে হতে গিয়ে স্বামী আর বাবা হিসেবে বাজে ভাবে হেরে গেলো।

ভীষণ আফসোসের সহিত কথাগুলো বলেন ভদ্রলোক। মিসেস শেখ অপরাধবোধের দরুন মাথাটা আরেকটু নুইয়ে নেয়। অস্বীকার করার জো নেই, আজ যত অশান্তি, দুঃখ-কষ্ট, অপূর্ণতা তার সূচনাকারী তিনিই।

তাদের তিনজনের মুখে আর খাবার উঠে না তেমন একটা। মি.শেখ ও জিনিয়া অল্পস্বল্প খেয়েই উঠে যায়। ডাইনিং টেবিলের একাকী বসে চোখে পানি ফেলতে ফেলতে ভাবতে থাকেন, আগের দিনগুলোর কথা। পঁচিশ হাজার টাকার ভাড়া বাসায় তারা যেই সুখ-শান্তিতে ছিলেন। আজ ঢাকার বুকের আভিজাত্যপূর্ণ এলাকার ডুপ্লেক্স বাড়িতে থেকেও সেই সুখের কানা-কাড়িটুকুও নেই।


একঘন্টা হয়ে গিয়েছে পূর্ণতা তাজওয়াদকে নিয়ে শুয়েছে তাকে ঘুম পাড়াবে বলে। কিন্তু ছেলেটা ঘুমাচ্ছেই না। হসপিটালে কোন ডাক্তারকে তার কেমন লেগেছে? কোন নার্স আন্টিটা তার দিকে কিভাবে তাকিয়েছে, কতটা জোরে সুচ দিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়গুলো সে বিস্তারিত ভাবে আলোচনায় বসেছে। পূর্ণতাকে শুয়ে রেখে সে বসে বসে আঙ্গুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথাগুলো বলছে।

বিষয়টা অতীব কিউট হলেও পূর্ণতার কাছে বিরক্ত লাগছে। ডাক্তার তাজওয়াদকে দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তে বলেছে। কিন্তু সোয়া দশটা বাজতে চলেছে। কিন্তু এই ছেলের চোখে ঘুমের “ঘ” পর্যন্ত নেই।

হঠাৎই তার মাথায় একটা বুদ্ধি আসে। সে বালিশের পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে মিছেমিছে কল করার নাটক করে। একটু পর ফোন কানে লাগিয়ে কারো সাথে কথা বলার মতো করে বলে পূর্ণতা–

—হ্যাঁ, মজিব ঘটক বলছেন। আপনাকে আমার ছেলের জন্য একটা লাল টুকটুকে মেয়ে দেখতে বলেছিলাম, পেয়েছেন এমন মেয়ে? আর ভাই ছেলেটাকে তো এখনই বিয়ে দিতাম না, কিন্তু কথাই শুনে না সে আমার। ডাক্তার তাকে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে বলেছে, কিন্তু সে আমার কথাই শুনছে না। এখন দেখি বিয়ের পর বউয়ের কথা শুনে নাকি। আরে না না, আমাদের কোন ডিমান্ড নেই। শুধু মেয়ে হলেই চলবে। কালই তাহলে মেয়ে দেখতে যাবো আমি। পছন্দ হলে বিয়ে করিয়ে ছেলের বউ আমার সাথে করে নিয়ে আসবো।

মায়ের কথা শুনে তাজওয়াদের চোখজোড়া মার্বেলের মতো বড় বড় হয়ে যায়। সে তাড়াতাড়ি করে মায়ের কাছে এসে তার বুকের উপর শুয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে–

—মাম্মা, এইতো তাজ চুয়ে পড়েছে। একন গুমিয়েও পলবে। তুমি উই আন্তেলকে মানা কলে দাও। আমি বিয়ে কব্বো না। আজ থেকে তোমাল সব কতা শুনবো। তুমি গতক আন্তেলকে মানা কলে দাও। প্লিজ মাম্মা, তাজ তোমাল সব কতা শুনবে।

পূর্ণতা ফোনটা কানে চেপে ধরেই ছেলের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলে–

—সত্যি সব কথা শুনবে?

—তত্তি শুনবো।

—পিংকি প্রমিজ?

—পিংকি প্লমিজ।

পূর্ণতা আবারও নাটক করে বলে–

—আচ্ছা, ঘটক ভাই। কাল আমি যাচ্ছি না। ছেলে বলেছে আমার সব কথা শুনবে। আপনি মেয়েকে মানা করে দিয়েন না। তাজওয়াদ যদি সামনে কখনো আমার কথা না শুনে তাহলে ঐদিনই ওকে বিয়ে করিয়ে আনবো আমি। রাখছি আজ। আল্লাহ হাফেজ।

তাজওয়াদ যদিও মায়ের শেষােক্ত কথায় সন্তুষ্ট হতে পারে না, তারপরেও কিছু বলে না। চুপচাপ শুয়ে থাকে। তাজওয়াদকে শান্ত হয়ে শুয়ে পড়তে দেখে পূর্ণতা তার অগোচরেই একটা বাঁকা হাসি দেয়। মনে মনে বলে,

— একদম রক্তের ধারা পেয়েছে। ব্ল্যাকমেইল না করলে এদের দিয়ে কোন কাজ করানো যায় না।

তাজওয়াদ ঘুমিয়ে পড়তেই পূর্ণতা শোয়া থেকে উঠে বসে। নিজের কিছু মেডিসিন নিয়ে আবারও শুতে বেডে আসবে, তখনই তার দরজায় কড়া নাড়ে কেউ একজন।

পূর্ণতা দরজা খুলে দেখে আরিয়ান এসেছে। এত রাতে আরিয়ানকে তার রুমের বাহিরে দেখতে পেয়ে সে একটু অবাকই হয় বটে। তার অবাক হওয়াটা আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায় যখন সে খেয়াল করে দেখে আরিয়ান চোখ জোড়া হালকা ফুলে লাল হয়ে আছে। চোখের পাপড়ি গুলোও ভেজা ঠেকল তার কাছে।

বুঝ হওয়ার পর থেকে পূর্ণতা আরিয়ানকে কখনো সহজে কাঁদতে দেখেনি। গত কয়েক বছরে তাদের কত আপনজন মা”রা গিয়েছে। তাদের মৃ”ত্যুতে হালকা-পাতলা চোখ ভেজা দেখেছিল কিন্তু কখনো এমন চোখ ফোলানো কান্না কাঁদতে দেখেনি। আরিয়ান সহজ-সরল, চটপটে গোছের ছেলে। সবাইকে দারুন ভাবে হাসাতে পারে ছেলেটা। সেই সাথে নিজেও প্রচুর হাসতে পারে। সেই ছেলে কেঁদে চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে তারমানে ব্যাপারটা বড়সড়। কিন্তু কেন কাঁদল আরিয়ান? এই প্রশ্নটা থেকেই যায় পূর্ণতার মন ও মস্তিষ্কে।

পূর্ণতা আরিয়ানকে কিছু জিজ্ঞেস করতে নিবে তার আগেই আরিয়ান থমথমে গলায় বলে–

—বোনু তোর পি.এ. আরওয়ার নাম্বারটা দে তো। একটু দরকার ছিলো।

আরিয়ানকে আরওয়ার নাম্বার চাইতে দেখে পূর্ণতা বেশ অবাকই হয় বটে, কিন্তু কোন প্রশ্ন করে না ভাইয়ের থমথমে মুখশ্রী দেখে। সে চুপচাপ নাম্বারটা দিয়ে দেয়। আরিয়ান নাম্বারটা টুকে যখন সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবে, তখনই পূর্ণতা নিজের কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেসই করে বসে–

—আরওয়াকে এত রাতে কি দরকার ভাইয়া?

আরিয়ান গম্ভীর গলায় জবাব দেয়–

—কিছু হিসাব-নিকাশ বাকি আছে ওর সাথে আমার।

কথাটা বলেই সে ঐখান থেকে প্রস্থান করে। পূর্ণতা তার কথার আগামাথা কিছুই না বুঝতে পেরে হা করে কতক্ষণ তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর দরজা বন্ধ করে বেলকনিতে চলে যায়। হালকা ঠান্ডা বাতাস এসে ছুঁয়ে দিতে থাকে পূর্ণতার কোমল বদনখানা। সে গ্রিলের সাথে মাথা ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। আজ আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন। না উঠেছে চাঁদমামা, আর নাই বা কোন তারা। খানিকবাদে বাদে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। রাতে বোধহয় বৃষ্টি নামবে।

আকাশ থেকে চোখ সরিয়ে পূর্ণতা রুমে আসার জন্য পা বাড়াবে তখনই তার নজর যায়, তার বাসার সামনের রাস্তায় জাওয়াদ বসে আছে ফুটপাতের উপর। পাশেই একটা গাড়ি দাঁড় করানো। একটু পরপর মশা বেচারা একবার ডান হাত, আরেকবার বাম হাত চুলকাচ্ছে। বুঝাই যাচ্ছে, মশারা আজ তাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।

পূর্ণতা প্রচণ্ড বিরক্ত হয় জাওয়াদের এই নিব্বাপনায়। রাত বাজতে চলেছে এগারোটা, এখনও এই লোক তার বাসার সামনে বসে আছে। কোন মানে আছে এসব কাজের? পূর্ণতা একবার ভাবে জাওয়াদকে এভাবে ফেলেই রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। মশাদের একটু পার্টি করতে দিক আজ জাওয়াদকে নিয়ে। কিন্তু তার বিবেক সায় না। যতই হোক একসময় পূর্ণতা নিজের সবটা দিয়ে ভালোবেসেছিল জাওয়াদকে।

রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে পূর্ণতা নিচে এসে কিচেন খুঁজে একটা কয়েল বের করে। তারপর সেটা জ্বা”লিয়ে নিয়ে বাসার বাহিরে এসে সিকিউরিটি গার্ডকে সেটা দিয়ে বলে–

—বাসার সামনে বসা লোকটাকে এটা দিয়ে আসবেন। যদি জিজ্ঞেস করে, এটা কে পাঠিয়েছে? তাহলে আমার কথা বলবেন না খবরদার। বলবেন, আপনি তাকে মশার কামড় খেতে দেখে মানবতার খাতিরে নিয়ে এসেছেন। মনে থাকবে?

—জ্বি, ম্যাডাম।

পূর্ণতা সিকিউরিটি গার্ডকে কয়েলটা দিয়ে আবারও নিজের রুমের বেলকনিতে এসে দাঁড়ায়। সেখানে দাঁড়িয়েই দেখতে থাকে সিকিউরিটি গার্ড আর জাওয়াদ কি যেন কথা বলছে। একটু পর জাওয়াদ তার বেলকনির দিকে তাকিয়ে ফ্লায়িং কি”স ছুঁড়ে দেয়। পূর্ণতা থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি করে সেখান থেকে রুমে চলে আসে। তাজওয়াদের পাশে শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকে, জাওয়াদ বুঝল কিভাবে সে তখন ঐখানে দাঁড়িয়ে ছিলো। কারণ, আজ তার বেলকনিটা পুরোপুরি অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলো। রুমের লাইন বন্ধ করে অল্প পাওয়ারের ডিম লাইট জ্বালানো ছিল, যার কারণে সেই আলোতেও আলোকিত হয়নি বেলকনি।

তার এসব ভাবনার মাঝেই পূর্ণতার ফোনে মেসেজ আসার টুংটাং আওয়াজ হয়। এত রাতে আবার কে কি মেসেজ পাঠালো এটা দেখার জন্য পূর্ণতা ফোনটা হাতে তুলে নিলে, দেখতে পায় জাওয়াদের নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে। হসপিটালে থাকাকালীন সময় তাজওয়াদের জন্যই তাদের দু’জনকে দু’জনের নাম্বার এক্সচেঞ্জ করতে হয়েছিল।

মেসেজে জাওয়াদ লিখেছে, “তাজওয়াদের মাম্মাকে ধন্যবাদ রইলো এই অধমের প্রতি এইটুকু রহম করার জন্য। মশা গুলো একটু পরে বোধহয় আমায় উঠিয়েই নিয়ে যেতো এখান থেকে। বলছিলাম কি এখানে প্রচণ্ড গরম লাগছে। না, মানে… এখান বসে না থেকে রুমে আসার পারমিশন দিলে এই বান্দা ঘরের এক কোণেই পড়ে থাকতাম লক্ষী বাচ্চার মতো। একটুও আবদার করতো না তাজওয়াদ ও তার মাম্মাকে জড়িয়ে ঘুমানোর। পারমিশেন পাবো কি?”

পুরোটা মেসেজ পড়ে পূর্ণতার গা রিরি করে ওঠে রাগে। সে দ্রুত হাতে টাইপ করে, “গার্ডকে বলছি কয়েলটা যাতে নিয়ে আসে আপনার কাছ থেকে। বসার সুযোগ দিয়েছিলাম, আপনি তো দেখি শোয়ার আবদার করছেন।”

মেসেজটা সেণ্ড করে পূর্ণতা লম্বা একটা শ্বাস ফেলে। ইদানীং হুটহাট করেই রেগে যাচ্ছে সে। বিষয়টা ভালো লক্ষণ না। শরীর আরেকটু সুস্থ হলে একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর কথা ভাবে সে।

“তার ভাবনার মাঝেই জাওয়াদ ফিরতি মেসেজ পাঠায়। সেখানে লেখা ছিল, “আসতাগফিরুল্লাহ তিনশ তেত্রিশ বার। এমন করে না বউ, মশারা তাহলে আমাকে নিয়ে বারবিকিউ পার্টি করা শুরু করে দিবে। আচ্ছা ঘুমাও লক্ষীটি। গুড নাইট মাই লেডি।”

পূর্ণতার নজর আটকে যায় “মাই লেডি” শব্দটার উপর। ঠোঁট নাড়িয়ে বার কয়েক শব্দটা উচ্চারণ করে। তার অবচেতন মন হুট করেই পূর্ণতাকে প্রশ্ন করে বসে, আসলেই কি তুই তার? নাকি এসবই তার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত ও সন্তান সুখ পাওয়ার জন্য নতুন কোন নাটক?


পুরো বাসা তন্নতন্ন করে খুঁজেও যখন আরওয়া তার ডায়েরিটা পায় না, তখন তার ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসতে শুরু করে। ডায়েরিটায় আরিয়ানে কতগুলো ছবি থাকায় আরো বেশি ভয় করছে তার। কারণ, শুধু ডায়েরিটা পড়লে কেউ আরওয়ার প্রাণসখাকে চিনতে পারত না, একনামে বহু মানুষের নাম থাকে। কিন্তু ছবি থাকায় যে কেউ সহজেই ডায়েরিতে উল্লেখ থাকা পুরুষটিকে চিনতে পেরে যাবে।

তার রুমমেট মেয়েটাও পূর্ণতার অফিসেই চাকরি করে বহুবছর ধরেই। সেই সুবাদে আরিয়ানাকে তার চেনা রয়েছে। তার হাতে পড়লে সে কাল অফিসে গিয়ে বিষয়টা রটিয়ে দিবে। এসব ভেবেই তার ভয় করছে। কিছুক্ষণ পর নিজের ভয়টাকে একটু শান্ত করে সে তৃতীয় বারের মতে, আরওয়া তার রুমমেটকে জিজ্ঞেস করে ডায়েরির কথা। কিন্তু মেয়েটি প্রথম দুইবারের মতো এবারও নেতিবাচক উত্তর দেয়। আরওয়া আবারও হতাশ হয়ে নিজের রুমে এসে বেডের উপর বসে পড়ে। ডায়েরিটা হারিয়ে ফেলার দরুন তার এতটা মন খারাপ হচ্ছে যে, চোখের কোলে অশ্রুরা এসে ইতিমধ্যে হাজির হয়েছে।

ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়েই তো ফেলেছে বেচারী, তাকে কেন্দ্র করে লেখা শেষ স্মৃতি গুলোও হারিয়ে ফেললো। সে যখন তার একান্ত প্রিয় ডায়েরি হারানো শোক পালন করছিল, তখনই তার ফোনে মেসেজের আসার রিংটোন বেজে ওঠে। আরওয়া সাথে সাথে সেটা দেখার আগ্রহ প্রকাশ না করলেও, যখন লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লো তখন তার মেসেজটির কথা মনে পড়ে। ফোনটা তুলে মেসেজটি চেক করতেই তার আক্কেলগুড়ুম অবস্থা হয়ে যায়। মেসেজ টায় স্পষ্ট বাংলায় লেখা রয়েছে,

“কাল বিকেল চারটায় রমনার বটমূলে আসবে।”

ইতি
প্রাণসখা।

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন ]

শব্দসংখ্যা~২১০০
~চলবে?

[আজ আমায় রোজা ধরে গেছে। এতগুলো রোজার মধ্যে আজকেই প্রচণ্ড শরীর খারাপ লাগছে। যেমন মাইগ্রেনের ব্যথা, তেমনই হাত ব্যথা। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। আর আঞ্জুমানের বিষয়টা আগামী পর্বে খোলাসা করবো ইনশা আল্লাহ।

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply