Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৪.১


শেষ পাতায় সূচনা [৪৪.১]

সাদিয়াসুলতানামনি

পূর্ণতাকে ডাক্তার কম করে একমাসের জন্য বেড রেস্ট নিতে বলেছে। সাতাশ বছর বয়সে দুই দুইবার ব্রেন স্ট্রোক হওয়া মোটেও কম ঝুঁকির কথা না। পূর্ণতার স্বাস্থ্যের কথা শুনে তার কানাডার ডাক্তার আচ্ছামতো ঝেড়েছে তাকে। মাত্রই তার শরীর সুস্থতার দিকে যাচ্ছিল, তখনই আবার এত বড় ধাক্কা।

আহনাফ সাহেব কড়া গলায় বলেছেন, যদি সে তাকে সত্যিই নিজের বাবার মতো ভালোবেসে থাকে, শ্রদ্ধা করে থাকে তাহলে তার আদেশ মোতাবেক আগামী একমাস যেন সে অফিসের ধারেকাছেও না যায়। হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে কয়েক ঘন্টার জন্য গিয়ে সব দেখে আসতে পারবে। কিন্তু এর বাইরে কোন দৌঁড়-ঝাপ করতে পারবে না।

বাবার পর এই একজন গুরুজনই আছে পূর্ণতার মাথার উপর। তাই তার কথা ফেলার কোন প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সেও বলেছে, প্রতিদিন আরওয়া এসে অফিসের সব আপডেট দিয়ে যাবে, সে জাস্ট চেক করবে। আহনাফ সাহেব না মেনেও পারেন না। কারণ, এত বড় একটা বিজনেস একমাসের জন্য ফেলে রাখা মানে বিজনেসে ধস নামানো। আরিয়ান বর্তমানে তার বাবার বিজনেস নিয়েই মোটামুটি ভালোই ব্যস্ত। আহনাফ সাহেব আঞ্জুমান ও অজান্তে বেগমের সত্য ফাঁস হওয়ার পর থেকে নিজেও অনেকটাই অসুস্থ হয়ে পরেছেন মানসিক ও শারীরিক উভয় ভাবেই। তাই বাবার অনুপস্থিতিতে তাকেই সব দেখতে হচ্ছে।

এতদিন আরওয়া সন্ধ্যায় হসপিটালে গিয়ে অফিসের যাবতীয় আপডেট দিয়ে আসত পূর্ণতাকে। কিন্তু আজ যেহেতু পূর্ণতারা বাসায় এসে পড়েছে, তাই আরওয়াকেও বাসায় আসতে হয়।

দুরুদুরু বুকে কাঁধের ব্যাগটা চেপে ধরে আরওয়া কলিংবেলে প্রেস করে। তার ভয়টা মূলত আরিয়ানকে ঘিরে। কিছুক্ষণ পর মালতী কাকী এসে দরজা খুলে দেয়। আরওয়াকে দেখে মালতী কাকী সৌজন্যতা মূলক কুশলাদি বিনিময় করে তাকে উপরে পূর্ণতার রুমে চলে যেতে বলে। পূর্ণতা তাকে আগেই বলে রেখেছে, আরওয়া আসলে যেন সে তাকে উপরে পাঠিয়ে দেয়।

আরওয়া বড় বড় কদম ফেলে তাড়াহুড়ো করে পূর্ণতার রুমের দিকে যেতে থাকে। বাড়িতে প্রবেশের সময় আরিয়ানের গাড়ি পার্ক করা দেখে বুঝে গিয়েছে, আরিয়ানও বাসায় আছে। সে কোনক্রমেই আরিয়ানের সামনে পড়তে চাইছে না আজ। টনির মাধ্যমে আঞ্জুমানের সব কীর্তির কথাই জানতে পেরেছে আরওয়া। সব জানার পর থেকে সে প্রচণ্ড অপ”রাধবোধে ভুগছে।

আরিয়ানের সামনে না পড়েই আরওয়া পূর্ণতার রুমে পৌঁছে যায়। আরওয়াকে দেখে তাজওয়াদ ভীষণ খুশি হয়। সে নেচে-কুঁদে তার এঞ্জেল আন্টির কাছে আসে। পূর্ণতা বারবার মানা করছে লাফালাফি না করতে কিন্তু তার এই বন্দিত্ব আর ভালো লাগছে না।

আরওয়া নিজের ব্যাগ থেকে তিন-চারটা ফাইল বের করে পূর্ণতাকে দেয়। পূর্ণতা চোখে চশমা লাগিয়ে সেগুলো দেখতে বসে যায়। তাজওয়াদ তখন বায়না ধরে আরওয়ার কাছে, আরওয়া যেন তাঁকে একটু ছাঁদ থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসে। পূর্ণতা যদিও প্রথমে ছেলেকে পারমিশন দেয় না ছাঁদে যাওয়ার, কিন্তু পরবর্তীতে তাজওয়াদের মুখ ফোলানো দেখে পারমিশন দিয়ে দেয়।মায়ের থেকে পারমিশন পেতেই তাজওয়াদ তার এঞ্জেল আন্টির সাথে ছাঁদে চলে যায়।

ছাঁদে এসে তাজওয়াদ আরওয়ার হাত ধরেই ঘুরতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করার পর মালতী কাকী এসে তাদের ডেকে নিচে নিয়ে যায়। তারা দু’জন পুনরায় রুমে ফিরলে আসলে, সেখানে পূর্ণতার সাথে আরিয়ানকেও দেখতে পায়। তাজওয়াদ তার আলু মামাকে দেখে আরওয়ার হাত ছেড়ে দৌড়ে তার কাছে যেতে নিলে কার্পেটের সাথে পা বেঁধে উষ্টা খেয়ে পড়ে যেতে নেয়। কিন্তু আরিয়ান তাড়াতাড়ি উঠে তাঁকে নিচে পড়া থেকে বাঁচিয়ে নেয়।

এমনিতেই ভাঙা হাত আর ফাটা মাথা নিয়ে আজই হসপিটাল থেকে ফিরেছে বাচ্চাটা। তারউপর এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটতে ঘটতে বেঁচেছে। আরিয়ান যখন তাজওয়াদকে ধরার জন্য লাফ দিয়ে সোফার উপর থেকে উঠেছিল, তখন তার হাঁটুর সাথে জোরে বারি লাগে সোফার সামনে থাকা সেন্টার টেবিল সাথে। সে যদিও ব্যথা পায় নিজের হাঁটুতে, কিন্তু সেদিকে এতটা ধ্যান দেয় না। সেন্টার টেবিলের সাথে আরিয়ানের পায়ের সংঘর্ষ হওয়ার কারণে টেবিলটা নড়ে গিয়ে সেটার উপর থাকা আরওয়ার ব্যাগটা উল্টে নিচে পড়ে যায়। ব্যাগটার চেইন খোলা থাকার কারণে ব্যাগ ভেতরে থাকা সবকিছু ফ্লোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। আর তাদের সকলের অগোচরেই তার ব্যাগের ভেতরে থাকা ডায়েরিটা সোফার নিচে চলে যায়।

পূর্ণতা ছেলেকে ভাইয়ের কোলে থেকে নিয়ে প্রথমে বুকে আগলে নিলেও, পরে বেশ বকা দেয়। বকবেই না কেন? যদি পড়ে যেতো, তাহলে হাতের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যেতো না? কিন্তু আরিয়ান ও আরওয়ার জন্য এতটা বকতে পারে না। আরিয়ান তাজওয়াদকে নিজের কোলে টেনে নিয়ে তাকে নিয়ে চলে যায় বেলকনিতে। আর আরওয়া পূর্ণতাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। মায়ের বকুনি খেয়ে তাজওয়াদ কাঁদছে বলে আরিয়ান তাকে বেলকনিতে নিয়ে এসে নানান কথা বলে তার কান্না থামানোর চেষ্টা করতে থাকে।কিন্তু তাজওয়াদ কিছুতেই কান্না থামাচ্ছে না দেখে আরিয়ানের মাথায় হুট করে একটা বুদ্ধি আসে। সে নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে জাওয়াদকে ভিডিও কল দেয়।

জাওয়াদ আরিয়ানের কলটা রিসিভ করার পর ছেলেকে কাঁদতে দেখে অস্থির হয়ে যায়। সে আরিয়ানকে জিজ্ঞেস করে–

—আরিয়ান, তাজ কাঁদছে কেন? ও কি আবারও ব্যথা পেয়েছে?

—আরে ভাই, আপনার ছেলে উপরে যতটা শান্ত দেখায় তার চেয়েও বেশি অশান্ত সে। একটু আগে আরেকটা অঘটন ঘটাতে যাচ্ছিল। দৌড়ে আমার কাছে আসছিল, কার্পেটের সাথে পা বেঁধে পড়ে যাচ্ছিল। আমি ধরে ফেলায় রক্ষা পেয়েছে। এরজন্য ওর মা আর আপনার আধ-পা”গল বউ বকেছে বাচ্চাটাকে। তাই কাঁদছে। নিন থামান ওকে।

আরিয়ান তাজওয়াদকে কোলে নিয়ে বেলকনিতে থাকা কাউচে বসে পড়ে। তারপর ফোনের স্ক্রিনটা তাজওয়াদের মুখোমুখি করে। তাজওয়াদকে ঠোঁট উল্টে, চোখ ডলতে ডলতে কাঁদতে দেখে জাওয়াদের বুকটা হুহু করে ওঠে। সে আদুরে গলায় বলে–

—সোনা বাচ্চা, তাকাও আমার দিকে। বাবা, কান্না করে না আর। মাম্মা কি তোমায় বকা দিতো, যদি তুমি পড়ে যেতে না ধরতে? মাই প্রিন্স, ডোন্ট ক্রাই এনি মোর। ইট’স হার্ট মি ডিপলি বাচ্চা।

জাওয়াদের কথা শুনে আস্তে আস্তে তাজওয়াদের কান্না থামতে থাকে। কিন্তু পুরোপুরি থামে না সাথে সাথেই। সে নাক টানতে টানতে বলে–

—হোয়াই ইউ আল কপিং মাই মাম্মা, ভালো আন্তেল? আল ইউ অ্য কপিক্যাট?

জাওয়াদ বুঝতে পারে না সে পূর্ণতার কোন কাজটি আবার কপি করলো। সে অবুঝ গলায় ছেলেকে জিজ্ঞেস করে–

—কি কপি করলাম আবার সোনা?

—এই যে মাই প্রিন্স, বাবা, চুনা এচব তো আমাল মাম্মাই তো বলে। আল এত আদল কলে মাম্মাই বলে আমাকে।

জাওয়াদ এবার বুঝতে পারে বিষয়টা। সে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে–

—ভালো আঙ্কেল বুঝি তাজওয়াদকে আদর করে না?

—হুম, কলে তো। মাম্মাল মতোই কলে আদুল কলে। আল মাম্মাকে কপিও কলে ভালো আন্তেল।

কথাটা বলেই তাজওয়াদ খিলখিল করে হেঁসে দেয়। যেন সে ভালো আঙ্কেলকে কপিক্যাট প্রমাণ করতে পেরে ভীষণ খুশি হয়েছে। তাজওয়াদকে হাসতে দেখে জাওয়াদের বুকের ভেতরের ভারী ভাবটা কমে যায় অনেকটাই। আরিয়ানও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তাজওয়াদ কিছুক্ষণ আগে মায়ের বকুনি ভুলে গিয়ে চঞ্চল চিত্তে ভালো আঙ্কেলের সাথে কথা বলতে থাকে।

সুস্থ হলে সে কি কি করতে চায়, স্কুলে আর কয়টা ফ্রেন্ড বানাবে ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়ে প্রফুল্ল মুখে জাওয়াদকে বলতে থাকে। জাওয়াদও বিরক্তহীন ভাবে ছেলের কথা শুনতে থাকে। কখনো কোন বিষয়ে তার মতামত দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলে তাও নিঃসংকোচে দেয়। আরিয়ান তাদের বাপ-বেটার কাণ্ডকারখানা বসে বসে দেখতে থাকে। তারা দু’জন একপ্রকার আরিয়ানের অস্তিত্বকে ভুলে গিয়েই, নিজেদের খেয়াল মতো কথা বলছে বলে দেখে আরিয়ান মিছে অভিমান দেখিয়ে বলে–

—তোমাদের দু’জনের কথা বলিয়ে দিলাম আমি, আর আমাকেই তোমরা ভুলে গেলে। যাও কাট্টি তোমাদের সাথে।

কথাটা বলে আরিয়ান তাজওয়াদকে নিজের কোল থেকে নামিয়ে পাশে বসিয়ে দেয়। তারপর নিজে মুখ গোমড়া করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। আলু মামাকে অভিমান করতে দেখে তাজওয়াদের একটুও ভালো লাগে না। তাই সে জাওয়াদকে বলে–

—ভালো আন্তেল, আলু মামা লাগ কচ্চে কিন্তু কিনু? তাজওয়াদ তাকে কি কললো?

—তুমি যে শুধু ভালো আঙ্কেলের সাথে কথা বলছো তাই হয়ত অভিমান করেছে।

—আমি একুন কি কব্বো, যা আলু মামা অবিমান না কলে আল?

ঠোঁট উল্টে নিঃষ্পাপ গলায় জিজ্ঞেস করে তাজওয়াদ। জাওয়াদ একটু ভাবুক হয়ে বলে–

—উমমমমম,, তুমি তাকে তাজওয়াদ’স স্পেশাল কিসসি দিয়ে দেখতে পারো।

—আচ্চা।

তাজওয়াদ ফোনটা কাউচের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে আরিয়ানের কাছে আসে। তারপর নিজের বাম হাত দিয়ে আরিয়ানের মুখটা নিজের দিকে ফিরিয়ে তার গালে একটা হামি দেয়। একটা হামি দেওয়ার পরও যখন আরিয়ান কথা বলছে না, তখন সে একের পর এক দিতেই থাকে। যতক্ষণ না আরিয়ানের অভিমান দূর হয়। এত আদুরে ভাবে অভিমান দূর করদর চেষ্টা করা হলে, সেই অভিমানের স্থায়িত্ব কি বেশিক্ষণ হয়? একদমই না। আরিয়ানও আর অভিমান করে করতে থাকতে পারে না ভাগ্নের সাথে।

তাজওয়াদ আরো কিছুক্ষণ জাওয়াদের সাথে কথা বলে, মনটা একটা ফুরফুরে তারপর আরিয়ানের সাথে রুমে চলে আসে। রুমে এসে দেখে আরওয়া ততক্ষণে বাসায় চলে গিয়েছে। তার রুমমেট মেয়েটার নাকি হঠাৎই শরীর খারাপ করেছে তাই তাড়াহুড়ো করে চলে গিয়েছে। পূর্ণতা ছেলেকে কোলে তুলে ওয়াশরুমে নিয়ে যায় তাকে ফ্রেশ করাতে।

এরই মাঝে এশারের আজান দিয়ে দেওয়ায় আরিয়ান নামাজের পড়বে বলে পূর্ণতাদের থেকে বিদায় নিয়ে সেন্টার টেবিলের উপরে থাকা তার ফোনটা নিতে গেলে, তার হাতে লেগে একটা কলম পড়ে গিয়ে সেটা গড়িয়ে সোফার তলে চলে যায়। আরিয়ান কলমটা তোলার জন্য নিচে বসে সোফার তলে উকি দিলে সেখানে কলম টার সাথে আরেকটা কিছু দেখতে পায়। আরিয়ান কৌতূহল বসত সেটা বের করলে বুঝতে পারে এটা একটা ডায়েরি। সে গলা উঁচিয়ে পূর্ণতাকে জিজ্ঞেস করে–

—বোনু, তোর কোন ডায়েরি পড়ে গিয়ে সোফার তলে চলে গিয়েছিলো?

পূর্ণতা ওয়াশরুম থেকেই উত্তর দেয়–

—না, তো ভাইয়া। কেনো? কি হয়েছে?

—তোর সোফার নিচে একটা ডায়েরির মতো পেলাম। দাঁড়া, দেখি জিনিসটা কি।

আরিয়ান প্রচণ্ড কৌতূহল নিয়ে ডায়েরিটা খুললে প্রথম পেইজে দেখতে পায়, সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা রয়েঢ়ে, “আমার জীবনের প্রিয় মানুষ ও তাকে নিয়ে হওয়া অনুভূতিগুলো লেখা শুরু করলাম আজ থেকে।” নিচে কয়েক বছর আগের ডেট দেওয়া। আরিয়ান পূর্ণতার লেখা বেশ ভালো করেই চিনে। তাই সে চট করে বুঝে যায় এটা তার বোনের ডায়েরি না। তাহলে কার ডায়েরি এটা? আর এখানেই বা আসলো কি করে? তাদের পরিবারের কারো ডায়েরি লেখার মতো শখ নেই।

এসব ভাবতে ভাবতেই আরিয়ান আরেকটা পেইজ উল্টালে সেখানে তার একখান ছবি পায়। ছবিটা দেখে যথেষ্ট ভালোই চমকে গিয়েছে। তার ছবি তাও এমন একজন ব্যক্তির ডায়েরিতে রয়েছে, যাকে সে চেনেই না। আরিয়ান ছবিটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখলে সে বুঝতে পারে, এটা তার বেশ কয়েক বছর আগের ছবি। ছবিটা ডায়েরির উপর থেকে সরিয়ে নেওয়ার সেখানে থাকা লেখাগুলো স্পষ্ট রূপে ধরা দেয় আরিয়ানের কাছে। সেখানে লেখা আছে, “ভাইয়ের বন্ধুকে ভালোবাসার মতো এত বড় পাপ কিভাবে করলাম আমি? এই পাপের কি আদৌও কোন মাফ আছে? তার পরিবারের স্টেটাস আর আমার পরিবারের স্টেটাস যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। এসব জেনেও কি করে পারলাম আমি এমন ভুল করতে। এই ভুলের মাশুল কি আমায় আজীবন বয়ে যেতে হবে?”

খানিক নিচে আবার লেখা, “আচ্ছা প্রকৃতির নিয়মের বাহিরে গিয়ে কি আমার ভালোবাসা পূর্ণতা পেতে পারে না? আমি কি আমার প্রাণসখাকে নিজের জীবনের সখা হিসেবে পেতে পারি না?”

“প্রাণসখা” নামটা দেখে বিস্ময়ে আরিয়ান চোখ এত বড় হয়ে যায় যে, যেন সেটা কোটর ছেড়ে বের হয়ে আসবে। প্রাণসখা নামটা তার প্রেমিকা মানে আঞ্জুমান দিয়েছিল তাদের প্রেম চলাকালীন সময়ে। কিন্তু তার জানা মতে, আঞ্জুমানের তো ডায়েরি লেখার শখ-টখ নেই। তাহলে?

সে ডায়েরিটা হাতে নিয়েই পূর্ণতার রুম থেকে বের হয়ে আসে। তারপর নিজের রুমে গিয়ে সেটা পড়তে শুরু করে। তার মাথায় বর্তমানে ঢাকার শহরের কারেন্টের তারের মতো জটলা পাকিয়ে আছে। ডায়েরির দ্বিতীয় পৃষ্ঠা লেখা ভাইয়ের বন্ধুকে ভালোবাসা কথা, আবার প্রাণসখা এই দুটো শব্দই মূলত এই জটলা সৃষ্টির কারণ।

আজ থেকে তিনবছর আগে আরিয়ান সিলেটে রাসেলের বাড়িতে গিয়েছিল। মূলত অন্য একটা কাজে গিয়ে সেখানকার আবহাওয়া আকস্মিক খারাপ হয়ে যায় রাসেলদের বাসায় তিনদিন থাকতে হয়েছিল। ঐ ঘটনার পর সে ঢাকায় ফিরে আসলেও, এর কিছুদিন পর থেকে একটা নাম্বার থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের মেসেজ আসতো। কখনো প্রেমময় উক্তি, কখনো কবিতা, কখনো বা তার হালচাল জিজ্ঞেস করে মেসেজ করত আগন্তুক। আরিয়ান শুরুতে শুরুতে পাত্তা না দিলেও, একটা সময়ের পর বিষয়টা নিয়ে সে ভাবতে বাধ্য হয়।

একদিন সে নিজেই ফোন করে সেই আগন্তুকের নাম্বারে। আগন্তুক প্রথমবার কলটা রিসিভ না করলেও, দ্বিতীয়বার ঠিকই করে। তার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে জানতে পারে ব্যক্তিটি একজন মেয়ে। কিন্তু মেয়েটি কিছুটা চাপা গলায় কথা বলছিলো। আরিয়ান তাকে এমন মেসেজ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে, সেই মেয়েটি বলে, সে আরিয়ানকে পছন্দ করে। আরিয়ান পরবর্তীতে তার উপর সন্দেহ করা শুরু করলে সেই মেয়েটি জানায়, কিছুদিন আগে যখন আরিয়ান সিলেটে এসেছিল তখন সে আরিয়ানকে দেখেছে এবং এরপর থেকেই তাকে পছন্দ করা শুরু করেছে।

আরিয়ান কি মনে করে, তার সাথে কথা বলা শুরু করে। একসময় সে নিজেও মেয়েটিকে পছন্দ করে ফেলে। মেয়েটি আরিয়ানের ব্যাপারে সব জানলেও, আরিয়ান তার সম্পর্কে কিচ্ছুটি জানত না। একদিন আরিয়ান তাকে তার পরিচয় জানানোর জন্য অনেক ফোর্স করলে, মেয়েটি শুধু জানায় তার নাম “আরু”। এবং এ-ও বাকি বাকি পরিচয় সে সামনাসামনি দেখা করে বলবে।

এভাবে দু’টো বছর চলে যায়। ততদিনে আরিয়ান আরুকে ভালোবেসে ফেলেছে। একদিন আরিয়ান আরুকে দেখা করার প্রস্তাব দিলে, আরু শুরুতে দেখা করতে চায় না। তারপর আরিয়ান যখন তার সাথে তিনদিন কথা বলে না, তখন আরু দেখা করার প্রস্তাবে রাজি হয়। আরিয়ান প্রেয়সীকে দেখতে দ্বিতীয় বারের মতো ছুটে যায় সিলেটে। সিলেটের এক চা বাগানে সেদিন প্রথমবারের মতো আরিয়ান আর আরুর দেখা হয়। মেয়েটিকে দেখে আরিয়ান একটু অবাকই হয়। কেননা মেয়েটি ছিলো, আঞ্জুমান রুহী। তার দুটো নাম ছোট করে সে আরু বলেছিল।

সেখানে পাঁচ দিন থাকার প্ল্যান করে গিয়েছিল আরিয়ান। কিন্তু সিলেটে যাওয়ার তৃতীয় দিনে আরিয়ানকে একপ্রকার বাধ্য হয়েই আঞ্জুমানকে বিয়ে করতে হয়। আঞ্জুমান আরিয়ানকে বলে, সে এতিম বলে পরিবারের কোন বিষয়ে তার মতামত নেওয়া হয় না। এমনকি তার বিয়ে নিয়েও তাকে একবারের জন্যও জিজ্ঞেস করা হয়নি। তাকে নাকি একটা রাজমিস্ত্রীর সাথে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে তার পরিবার। আরিয়ান যদি আঞ্জুমান মানে আরুকে সত্যিই ভালোবেসে থাকে তাহলে সে যেন ঐদিনই বিয়ে করে।

আরিয়ান দ্বিধাবোধ করলে আঞ্জুমান তাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করে। বলে আরিয়ান যদি তাকে বিয়ে নাও করে তাতেও সমস্যা নেই তার। সে ঐ রাজমিস্ত্রীকে বিয়ে করার বদলে সু”ই”সা”ই”ড করবে। সহজ-সরল আরিয়ান তার কথায় প্রভাবিত হয়ে যায়, আর সেদিনই লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলে। তারপর আঞ্জুমানই তার গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করার জন্য একটা বছর সময় চায় আরিয়ানের কাছে। আরিয়ানও নিজেকে আরেকটু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য সময় দেয়।

ডায়েরিটা অর্ধেক পড়েই পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন শুরু করে আরিয়ান। সেসব ভাবনা থেকে বের হয়ে এসে আরিয়ান ডায়েরির আরেকটা পেইজ উল্টালে সেখানে লেখা পায়, “নিজের বোন রূপী বেস্টফ্রেন্ডের থেকে এত বড় ধোঁকা পাবো কল্পনাতেও আনি নি কখনো। আঞ্জুমান আমার থেকে আমার ভালোবাসা কেড়ে নিলো ছল করে। আমার আরিয়ানকে কেড়ে নিলো। আমি আরওয়া, কখনো আমার জন্য একটা ড্রেস কিনলে আমি ওর জন্যও কিনতাম। ভাবতাম আমার তো তাও মা আর ভাই আছে। ওর তো সকলে থেকেও নেই। সেই আঞ্জুমান আমায় এত বড় ধোঁকা দিলো।

আমার থেকে আরিয়ানকে কেড়ে নেওয়ার জন্য আমার ক্ষতি করতেও পিছ পা হলো না ও। ও তো জানত আমি সাঁতার পারি না, তাও কি করে আমায় পানিতে ফেলতে পারলো? জ্বরের শরীর নিয়ে ওর ডাকে সাড়া দিয়ে ঘাটে গিয়েছিলাম। কিন্তু ও কি করলো? আমায় ছলচাতুরী করে পানিতে ফেলে দিলো। একটুর জন্য ম” রতে ম”রতে বেঁচে ফিরলাম এই যাত্রায়। আজ সাতদিন পর কিছুটা সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলাম হসপিটাল থেকে। কিন্তু ফিরেও লাভ হলো কি? আমি যেই তিনদিন অচেতন ছিলাম সেই তিনদিনই যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। আমার প্রাণের সখী আমার আত্মাকে মেরেই ফেলেছে, আমার প্রাণসখাকে আমার থেকে চিরতরে কেড়ে নিয়ে। আমি সেজে সে চারদিন আগে আমার ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের নামে দলিল করে নিয়েছে। ওকে বিশ্বাস করে আমার সব কথা বলতাম, আর ও আমার বিশ্বাসের এই দাম দিলো?

খুলে রাখা পৃষ্ঠার সবগুলো লেখা পড়া হয়ে গেলেও ঘুরেফিরে আরিয়ানের চোখটা আরওয়ার নামের উপর গিয়ে আবার আটকে যায়। তার মানে আরওয়াই তার আরু, যাকে সে ভালোবেসেছিল। আঞ্জুমান মাঝ দিয়ে আহমেদ বাড়ি প্রবেশের জন্য তাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করেছে।

আরিয়ান আজ অনেকদিন পর নিজের চোখে অশ্রুর উপস্থিতি পেলো। সেদিন আঞ্জুমান আর তার মাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার সময়ও সে কাঁদে নি ছেলেটা। কিন্তু আজ কাঁদছে। জীবনে এত বড় একটা ধোঁকা পেয়ে ছেলেটা আজ ভীষণই ভেঙে পড়েছে। তাই না চাইতেও অশ্রু ঝরিয়ে মনটাকে হালকা করতে চাইছে সে।


সাতসকালে পূর্ণতার ফোনটা কর্কশভাবে অনবরত বেজেই চলেছে। পূর্ণতা প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে একটা চোখ কোনমতে খুলে বেড সাইড টেবিলের উপর থেকে ফোনটা পিক করে। কিন্তু ফোনটা কানে লাগিয়ে পরবর্তীতে যা শুনে, তাতেন তার ঘুম পালিয়ে যায়। সে একপ্রকার হুংকার দিয়েই ফোনের অপর পাশে থাকা পুলিশ অফিসারকে জিজ্ঞেস করে–

—কিহ্হ্হ্হ? কিভাবে পালালো আঞ্জুমান হসপিটাল থেকে? আপনারা কোথায় ছিলেন?

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন ]

শব্দসংখ্যা~২৪১৫

চলবে?

[এক প্যাচ খুলে আরেক প্যাচ লাগিয়ে দিয়ে ভালো লাগছে😇

আজ যে বলবে ছোট হয়েছে, তাকে বালি চাপা দিয়ে দিবো😒🔪 আর অবশ্যই কমেন্ট করবেন কিউটিস😚

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]


[ই-বুক প্রচার]

পূর্ণতার_সংসার

জাওয়াদ পূর্ণতাকে জড়িয়ে ধরে আবারও ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতে থাকে তখনই পূর্ণতা লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। নিজেকে জাওয়াদের এত কাছে দেখে সে একটু ঘাবড়েই গিয়েছে। সাফাই দেওয়ার মতো করে বলে–

—সরি, সরি। আমি ইচ্ছে করে আসিনি আপনার কাছে বিশ্বাস করুন। ঘুমের ঘোরে এসে পরেছি হয়ত। আ’ম এক্সট্রিমলি স…..

পরের টুকু আর উচ্চারণ করতে পারে না পূর্ণতা। তার আগেই জাওয়াদ তার হাতের বাহু ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে নিজের বুকের উপর এনে ফেলে। তারপর চার হাত-পা দিয়ে পূর্ণতাকে অক্টোপাসের মতো পেঁচিয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে বলে–

—আমি ঘুমাবো আরো। নো টক, নো নড়াচড়া, অনলি ঘুমাঘুমি।

পূর্ণতা জাওয়াদের এহেন কাজে এতটা অবাক হয়ে গিয়েছে যে কিছু বলার মতো কোন শব্দই মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না। জাওয়াদ পূর্ণতা জড়িয়ে ধরে আবারও ঘুমিয়ে যায়। এদিকে পূর্ণতার সবটা বুঝে উঠতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগে। কিন্তু যখন বুঝতে পারে তখন খুশিতে তার চোখ উপচে পানি পড়ে জাওয়াদের টি-শার্ট ভিজিয়ে দিতে থাকে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply