শেষপাতায়সূচনা [৪৩.১]
সাদিয়াসুলতানামনি
—মাম্মা, সবাল পাপা আছে… কিন্তু তাজওয়াদেল পাপা কুতায়?
মায়ের কাঁধে মাথা রেখে নিষ্পাপ স্বরে প্রশ্নটা করে তাজওয়াদ। শিশুসুলভ উচ্চারণে বলা কথাটা যেন বজ্রপাত হয়ে আছড়ে পড়ে কেবিনের নীরবতায়। মুহূর্তেই সময় থমকে যায়। পূর্ণতার শ্বাস আটকে আসে। তার আঙুলগুলো অনিচ্ছায় শক্ত হয়ে জড়িয়ে ধরে সন্তানের জামার কোণা।
কেবিনে উপস্থিত আরওয়া, টনি, নওশাদ তারাও একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। কেউ কিছু বলে না, অথচ না-বলা কথার ভারে বাতাস ঘন হয়ে ওঠে। যেন দেয়ালগুলোও প্রশ্নটার উত্তর খুঁজছে।
শুধু যে তারা থমকে তাই নয়, থমকে গিয়েছে আরো একজন যে কিনা মাত্র প্রবেশ করতে নিয়েছিলো তাজওয়াদের কেবিনে। ব্যক্তিটি হলো জাওয়াদ।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই শূন্য হয়ে যায়। খুব সূক্ষ্ম, খুব ধারালো এক ব্যথা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সারা অস্তিত্বে। এতদিনের দমিয়ে রাখা অনুভূতিগুলো যেন একসাথে গলা টিপে ধরে তাকে।
নিজের সন্তানের মুখে নিজের অস্তিত্বের অভাব শুনে একজন পুরুষের ভেতরটা কেমন ভেঙে যায় তার কোনো ভাষা নেই। পৃথিবীর সব পরিচয় নিয়েও যদি সন্তানের সামনে ‘বাবা’ পরিচয়টা দিতে না পারে, তবে সে কেমন বাবা? দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে জাওয়াদ অনুভব করে সে আছে, অথচ নেই। সে জীবিত, অথচ সন্তানের জীবনে অদৃশ্য।
তার চোখের কোণে জমে ওঠা আর্দ্রতা সে দ্রুত সামলে নেয়। কারণ এই মুহূর্তে কাঁদার অধিকারও যেন তার নেই। শুধু বুকের গভীরে নিঃশব্দে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে একটাই শব্দ “পাপা” কিন্তু সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার অধিকার থেকেও সে বঞ্চিত। সে ছুটে গিয়ে তাজওয়াদকে নিজের বক্ষে মাঝে নিয়ে পিতার অধিকার সহিত বলতে পারছে না–
—এই তো সোনা, আমি তোমার পাপা। তাজওয়াদের পাপা তার কাছেই আছে।
বুকের ব্যথাটি ক্রমশই জাওয়াদকে কাবু করে ফেলতে থাকে মানসিকভাবে। সে তার বাড়িয়ে দেওয়া পা-খানা পিছিয়ে আনে। এবং একসময় নিঃশব্দেই সেখান থেকে প্রস্থান করে।
সন্ধ্যায় পূর্ণতা হসপিটালে এসে দেখে তাজওয়াদ হাপুস নয়নে কাঁদছে। আরওয়া বহু চেষ্টা করেও তার কান্না থামাতে পারছে না। ছেলেকে এমনভাবে কাঁদতে দেখে পূর্ণতা বেশ ঘাবড়ে যায়। দ্রুত তাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে মাতৃস্নেহে আগলে নেয়। কত-শত সান্ত্বনা, কৌতূক, গল্প শুনিয়ে তাজওয়াদের কান্না থামাতে পারলেও, তার মন ভালো করতে পারেনি এখনো। ছেলেটা সেই যে মুখটা বেজার করে রেখেছে তো রেখেছেই। নিজের লাল টমেটোর মতো আদুরে মুখ টায় পূর্ণতার মাতৃমনে শান্তির বাতাস বইয়ে দেওয়া হাসি ফুটিয়ে তোলে নি।
পূর্ণতাসহ সবাই অনেক চেষ্টা করেও তাকে হাসাতে পারেনি। আরওয়াকে তাজওয়াদের কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে, সে জানায়– ঘুম থেকে উঠার পর তাজওয়াদ কান্নাকাটি করেনি পূর্ণতাকে না দেখে। বিকালে একটু ফ্রুটস খেয়ে তাজওয়াদ বায়না ধরে, সে একটু কেবিনের বাহিরে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করবে। কেবিনের ভেতরে তার আর ভালো লাগছে না। আরওয়া বেশ কয়েকবার মানা করার পরও যখন দেখে তাজওয়াদ শুনছে না তখন না পারতে আরওয়া তাকে কেবিনের বাহিরে সামনের করিডরে হাঁটতে নিয়ে যায়।
সেখানে গিয়ে তাদের থেকে একটু দূরে দেখতে পায়, একটা অসুস্থ বাচ্চাকে ইনজেকশন দেওয়ার সময় সে অনেক কান্না করছিল, তখন বাচ্চাটির বাবা তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বিভিন্ন গল্প শোনাতে থাকে। গল্প শোনার একফাঁকে ডাক্তার বাচ্চাটিকে ইনজেকশন দিয়ে দেয় যা কিমা বাচ্চাটি টেরও পায়নি। ইনজেকশন দেওয়া শেষে বাচ্চাটির বাবা বাচ্চাটিকে কোলে করে তাদের সামনে দিয়েই চলে যায়। তাদের যাওয়ার সময় তাজওয়াদ শুনতে পায়, বাচ্চাটি তার বাবার গালে একটা হামি দিয়ে বলছে–
—ইউ আর দ্যা বেস্ট পাপা ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড। আই লাভ ইউ বাবা।
কথাটি ছোট তাজওয়াদের মস্তিষ্কে গেঁথে যায়। কানাডাতেও সে অনেক বাচ্চাকেই দেখেছে তাদের পাপাদের সাথে খেলতে। সবার পাপা আছে, তাহলে তাজওয়াদের পাপা কই? প্রশ্নটি তার ছোট মস্তিষ্ক একা একাই আবিষ্কার করে ফেলে।
পুরো ঘটনা বুঝতে পেরে সকলের মন খারাপ হয়ে যায়। পূর্ণতা ছেলের প্রশ্ন শুনে সেই যে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে, একবারের জন্যও আর মাথা তুলেনি। কিছুক্ষণ পর তাজওয়াদ একা একাই মায়ের বুকে ঘুমিয়ে পড়লে, পূর্ণতা সকলকে বলে–
—তোমরা সবাই বাসায় চলে যাও। আমি একটু রেস্ট নিবো। ক্লান্ত আমি ভীষণ।
কেউ আর কথা বাড়ায় না। পূর্ণতার কথা মতো নিঃশব্দে তারা প্রস্থান নেয়। নওশাদ, টনি ও আরওয়া কেবিন থেকে বের হয়েই জাওয়াদকে ওয়েটিং চেয়ারগুলোর একটিতে বসে থাকতে দেখে। টনি জাওয়াদের কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে–
—জাওয়াদ স্যার, বাসায় যাবেন না?
জাওয়াদ বেশ কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকে। টনির প্রশ্নের উত্তর দেয় না। তারপর হঠাৎই বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে। নওশাদ তার এমন কাজে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। জাওয়াদ ছোট ছোট কদম ফেলে তাদের চোখের আড়াল হতেই নওশাদ বিরবির করে বলে–
—ভণ্ড কোথাকার! কোথায় বউয়ের পা ধরে বসে থাকবি না তার মান ভাঙানোর জন্য, তা না করে শালা ভণ্ডামি লাগিয়েছে। নাহ্, আমাকেই কিছু একটা করতে হবে।
আরওয়া ও টনি একই বিল্ডিংয়ে থাকে। পূর্ণতাদের অফিসে কর্মচারীদের জন্য থাকার জায়গা দেওয়া হয়। কিন্তু মাস শেষে বাসা ভাড়ার জন্য কিছু টাকা রাখা হয়। এতে যাদের ভালো লাগে তারা থাকে, যাদের ভালো লাগে না তারা অন্যত্র বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে।
গত কয়েকদিনের দৌড়াদৌড়িতে টনি ও আরওয়া দু’জনই প্রচণ্ড ক্লান্ত। যে যার ফ্ল্যাটে চলে যায়। টনি ফ্রেশ হয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে বসে ভাবতে থাকে কি রান্না করা যায়। তাট এত ক্লান্ত লাগছে যে, রান্নাঘরে অব্দি যেতে মন চাচ্ছে না। টেবিলে মাথা এলিয়ে দিয়ে আনমনেই বলে–
—ইশশশশ, একটা বউ থাকলে কত ভালোই না হতো। সুন্দর করে রান্নাবান্না করে আমার জন্য খাবার নিয়ে অপেক্ষা করত। ইয়া আল্লাহ! হয় একটা বউ জুটিয়ে দাও কপালে, নাহয় আপাততের জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করে দাও। শরীর আর সায় দিচ্ছে না মাবুদ।
আল্লাহ তা’য়ালা তার বান্দাদের একটু বেশিই ভালোবাসেন বোধহয়। তাই তো, টনি তার কাছে আর্জি পেশ করতে দেরি কিন্তু তার আর্জি কবুল হতে দেরি হয়নি। হঠাৎই কলিংবেলের আওয়াজ শুনে টনি টেবিল থেকে মাথা উঠায়। অলস পায়ে হেঁটে গিয়ে দরজা খুলে সামনে আরওয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খানিক অবাকই হয় বটে। আরওয়ার হাতে একটা ট্রে দেখে আরো বেশি অবাক হয়। সে নিজের মনের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে তাকে প্রশ্নই করে বসে–
—তোমার হাতে কি এগুলো আরওয়া?
আরওয়া ট্রে’টা টনির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে স্মিত হেঁসে বলে–
—খাবার এনেছিলাম ভাইয়া। আজ সারাদিন হসপিটাল আর ম্যামের পেছন ছুটতে ছুটতে নিশ্চয়ই আপনি ভীষণ ক্লান্ত। আমার রুমমেট আমার জন্য রান্না করে রেখেছিল। তাই ভাবলাম আপনার জন্যও নিয়ে আসি। ক্লান্ত শরীর নিয়ে আপনার রান্নার প্রয়োজন নেই আর।
আরওয়ার কথা শুনে টনি যেমন অবাক হয়েছে,তেমনই খুশিতে তার মনটা নেচে উঠে। সেই সাথে সে বেশ ইমোশনাল হয়ে যায়। তার লাইফে তাকে নিয়ে ভাবার মানুষের সংখ্যা একদমই কম। নেই বললেই চলে। পূর্ণতা তাকে ঝাড়ির উপর রাখলেও, কম স্নেহ করে না বড়বোন মতো। পূর্ণতার পর আজ এই আরওয়া তাকে নিয়ে ভাবলো। টনি মনে মনে নিজেকে বলে–
—কে বললো তোর কেউ নেই টনি? এই তো তোর কথা ভাবার জন্য উপরওয়ালা তোকে দু’টো বোন দিয়েছে। তারা তোর রক্তের কেউ না হলেও, তাদের সাথে তোর আত্মার সম্পর্ক রয়েছে।
—কি হলো, ভাইয়া ধরুন ট্রে’টা।
টনি হাত বাড়িয়ে ট্রেটা নেয়। তারপর মুচকি হেঁসে বলে–
—শুধু শুধু কষ্ট করলে। ভাত আর ডিম ভাজা করতে কতক্ষণই লাগতো। আমি ঠিক করে নিতে পারতাম।
—পারতেন তো সেটা আমি জানিই। কিন্তু আমার তো বোন হিসেবে একটা দায়িত্ব রয়েছে না ভাইয়ের খেয়াল রাখার। আর কষ্ট কিসের? আমার জন্যও তো রান্না করে রেখেছে আরেকজন।
টনি আর কথা বাড়ায় না। আরওয়া তাকে শুভ রাত্রি জানিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে চলে যায়। টনি দরজা বন্ধ করে এসে খেতে বসে। খাওয়াদাওয়া শেষ করে নোংরা প্লেটগুলো ধুয়ে শুয়ে পড়ে। সে যখন শুয়ে শুয়ে অফিসের মেইল গুলো চেক করছিল, তখনই তার ফোনে কল আসে। কলদাতা আর কেউ নয়, সেই অজ্ঞাত ব্যক্তিটি। মাঝের তিনদিন এই অজ্ঞাত ব্যক্তির কোন খোঁজ খবর না থাকায় টনির মাথা থেকে প্রায় বেরই হয়ে গিয়েছিল তার কথা। কিন্তু আজ আবার কল করায় তার কপালে কয়েকটা ভাজ পড়ে।
টনি কলটা রিসিভ করলে অপর পাশের ব্যক্তিটি সালাম দেয়। টনিও সালামের জবাব নিয়ে টুকটাক কুশন বিনিময়ের করার পর টনিই জিজ্ঞেস করে–
—কি ব্যাপার মি. অর মিস স্ট্রেঞ্জার? গত তিনদিন আপনি ফোন দিলেন না যে?
অপর পাশের ব্যক্তিটি তাৎক্ষণিকভাবে টনির প্রশ্নের উত্তর দেয় না। সে একটু রয়েসয়ে জবাব দেয়–
—একটু কাজে বিজি ছিলাম তো। আর ভাবলাম, ডেইলি ডেইলি আপনাকে কল দিয়ে বিরক্ত করাটা ঠিক না তাই আরকি কল দেই নি। কেন আপনি বুঝি আমাকে মিস করছিলেন?
—মিস করার মতো কেউ কি আপনি আমার? আর বিরক্তির বিষয়ে যে বললেন, এখন অনেক আনন্দ দিচ্ছেন বোধহয় কথা বলে। তাই না?
—বিরক্ত হচ্ছে নাকি?
—হওয়ার কি কথা না? এমন অজ্ঞাত ব্যক্তির সাথে দিনের পর দিন কথা বলতে কারই বা ভালো লাগবে? ইভেন, আপনি ছেলে নাকি মেয়ে সেটাও বলেন নি আজ পর্যন্ত আমায়।
— বাব্বাহ! এত জানার আগ্রহ আমাকে! আমার তো কপাল খুলে গেলো।
ব্যক্তিটির কথা শুনে টনি সত্যি সত্যিই বিরক্তবোধ করে। হুট করে তার মাথায় একটা শয়তানি বুদ্ধি আসে। সে ব্যক্তিটিকে আচমকা বলে–
—আজ না তাজওয়াদ অনেক কাঁদছিল তার পিপির কাছে যাওয়ার জন্য।
—কিহ্হ্হ্? তাজ সোনা আমার কাছে আসার জন্য কাঁদছিল। আগে বলেন নি কেনো?
কথাটা শেষ করেই জিনিয়া তার জিভে এক কামড় লাগায়। তারপর ঠাস করে কলটা কেটে দিয়ে বালিশে মুখ লুকিয়ে নেয়। কি একটা চরম ধরা খেলো বেচারী। নিজের উপর এখন তার প্রচন্ড রাগ হচ্ছে।
অন্যদিকে টনি ফোনটা হাত থেকে রেখে উচ্চস্বরে হাসতে থাকে। তার লাস্ট কিছুদিন ধরে জিনিয়ার হাবভাবে সন্দেহ হচ্ছিল। তাজওয়াদের এক্সিডেন্টের পর এই অজ্ঞাত ব্যক্তির কল না আসায় তার সন্দেহ আরো তীব্রভাবে হতে থাকে। তাই তো আজ সে তাকে এমন ডস দিলো। টনি যদিও এতটা সিউর ছিলো না জিনিয়ার বিষয়ে। কিন্তু কাকতালীয় ভাবে তার ভাবনাই সত্যি হয়ে গেলো।
বেশ কিছুক্ষণ পর টনি নিজের হাসি থামিয়ে ফোনটা আবারও তুলে নেয়। তারপর জিনিয়ার নাম্বারে একটা টেক্সট দেয়। সেখানে সে বলে–
—কাল আপনার ভার্সিটিতে আসছি মিস লিলিপুট শেখ। আপনাকে সত্যি সত্যি মাথার উপরে তুলে আছাড় মা-রার জন্য। বি প্রিপেয়ার্ড।
মেসেজ আসার টোনে জিনিয়া বালিশ থেকে মুখ উঠিয়ে ফোনটা তুলে ইনবক্স চেক করলে টনির মেসেজটা দেখতে পায়। মেসেজটা দেখার পর সে ঘনঘন ঢোক গিলতে থাকে। কেন জানি হুট করেই তার ভয় লাগছে টনিকে।টনির মেসেজটা দেখার পর সে আনমনে ভেবেই নেয় কাল ভার্সিটিতে যাবে না। শুধু কাল কেন আগামী একমাসও যাবে না ভার্সিটিতে। কিন্তু তখনই তার মনে পড়ে কাল তার একটা গুরুত্বপূর্ণ এক্সাম আছে। ঐ কোর্সের টিচার তাদেরকে কড়াকড়ি ভাবে ওয়ার্নিং-ও দিয়ে বলেছে, কাল যে এক্সাম না দিবে ফাইনালের সময় তার সমস্যা হবে।
উফফফ! সব প্যারা একসাথেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে জিনিয়াকে। কাল গেলেও বাঁশ খাবে, না গেলেও বাশ খাবে। কি করবে সে বুঝতে পারছে না। আপাততের জন্য সব ভাবনাচিন্তা ভুলে সে ঘুমে মনোযোগ দেয়, কিন্তু তার অবাধ্য মন কালকের কথা ভেবেই ঘুম হারাম করে ফেলে। বাকিটা রাত শুধু এপাশ-ওপাশ করতে করতেই জিমিয়া কাটায়।
সকাল হতেই একটা মাত্র ব্রেড খেয়েই জিনিয়া ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। এক্সাম দিয়ে ফ্রেণ্ডের সাথে কথা বলতে বলতে হল থেকে বের হয়ে আসে সে। বাসা থেকে আসার সময় ভেবে এসেছে, সে আজ সামনের রাস্তা দিয়ে ভার্সিটি থেকে বের না হয়ে পেছনের রাস্তা দিয়ে বের হবে। এতে করে আজকের মতো টনিকে ফাঁকি দেওয়া যাবে। কেননা টনি তো তার জন্য সমানের রাস্তায় অপেক্ষা করবে। তাই সে পেছনের রাস্তা বেছে নেয়। এসব ভেবেই সে নিজেকে অনেক বুদ্ধিমতী ভেবে নিজের কাঁধ চাপড়াতে থাকে।
কিন্তু তার সকল প্ল্যানকে গুঁড়ো বালি ছিটিয়ে দিয়ে টনি অপেক্ষারত দেখা যায়, জিনিয়ার ভার্সিটির পেছনের রাস্তায়। টনি বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে একটা টেডি হাসি দিয়ে জিনিয়াকে “হাই” দেখায়।
জিনিয়া টনিকে দেখেই উল্টো পথ ধরতে নিলে টনি দৌড়ে এসে খপ করে তার হাত ধরে ফেলে। তার একটা বাকা হাসি দিয়ে বলে–
—আপনার ছোটছোট পা দুটোকে একটু রহম দিন মিস লিলিপুট শেখ। আর কম বুদ্ধিসম্পন্ন মাথাটাকে কাজে লাগানো বন্ধ করুন। নাহলে এই দু’টো অকালেই কাজ করা বন্ধ করে দিবে। পরে আমার হবে যত জ্বালা।
শেষের কথাটা টনি একদমই আস্তে বলে, যার কারণে জিনিয়া শুনতে পায় না। টনি জিনিয়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলে–
—তো মিস স্ট্রেঞ্জার, অবশেষে আপনাকে ধরেই ফেললাম।
জিনিয়া টনির দিকে না তাকিয়েই নিজের হাতটা তার থেকে ছাড়ানোর জন্য মোচড়ামুচড়ি করতে থাকে। কিন্তু সে প্রতিবারই ব্যর্থ হয়। টনি জিনিয়ার হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে তাকে নিজের অনেকটা কাছে নিয়ে আসে। আচমকা টান পড়ায় জিনিয়া ভয় পেয়ে তার অপর হাত দিয়ে অজ্ঞাতবসত টনির শার্টের একপাশ চেপে ধরে। এই পুরো ঘটনাটিই দূর থেকে সিফাত ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা।
মূলত তারা ভার্সিটির পেছনের বটগাছটাই তাদের আড্ডাখানা। আড্ডা দিতে দিতেই তাদের নজর পড়ে জিনিয়াদের উপর। টনিকে এমনভাবে জিনিয়ার হাত ধরে টানাটানি করতে দেখে সিফাত রেগে যায়। সে তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে সেখানে হাজির হয় টনিকে মা-রবে বলে।
সিফাত টনিদের কাছে এসেই হুংকার দিয়ে বলে–
—কি হচ্ছে এখানে এসব? এই ছেলে তুমি ওকে ডিস্টার্ব করছো কেনো?
সিফাতের কর্কশ গলার আওয়াজে টনির হুঁশ ফিরে। কিন্তু সে জিনিয়াকে ছাড়ে না। বরং জিনিয়ার ধরে রাখা হাতটা আরেকটু কোমল ও দৃঢ়ভাবে ধরে। তারপর সিফাতের দিকে তাকিয়ে বেহায়ার মতো একটা হাসি দিয়ে বলে–
—গার্লফ্রেন্ড রাগ করেছে তাই রাগ ভাঙাচ্ছি। এটাকে আপনারা ডিস্টার্ব মনে করলে আমার কিছু করার নেই। আগে আমার ঘরের লোকের মান ভাঙাতে হবে, এরপর পরের লোকদের নিয়ে ভাববো।
সেদিন টনিকে অবাক করেছিল জিনিয়া আর আজ জিনিয়াকে অবাক করছে টনি। টনির কথা শুনে জিনিয়া বিস্ময়ে পলক ফেলতে ভুলে যায়। টনি তার দিকে ফিরে আদর আদর গলায় বলে–
—চলো তো জান, এখানে বহুত ডিস্টার্ব করার মতো মশা-মাছি আছে। আমরা অন্যকোথাও গিয়ে কথা বলি।আর রাগ ভাঙাই। চলো জান।
কথাটা শেষ করে টনি জিনিয়ার কাঁধে হাত দিয়ে তাকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে নিজের বাইকের উদ্দেশ্যে। জিনিয়াও কাঠ পুতুলের ন্যায় হেঁটে তার পেছনে গিয়ে বসে পড়ে। টনি বাইক স্টার্ট দেওয়ার আগে সিফাতকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে–
—আমাকে ধরে বসো। দেখো রাগ-অভিমান যাই করো না কেন আমার সাথে করো। কিন্তু কখনো নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে না। তাহলে তোমার বারোটা বাজাবো আমি।
জিনিয়া ইতস্তত করে তার একহাত নিয়ে রাখে টনির কাঁধের উপর। জিনিয়া টনিকে ধরে বসতেই টনি হাই স্পিড তুলে সাই করে সিফাতদের চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়। তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সিফাত কটমট করে তাকিয়ে থাকে। ওদের এত মাখোমাখো ভাব একটুও সহ্য হচ্ছে না তার। আসলে সিফাত অন্যান্য মেয়েদের মতোই জিনিয়ার সাথে টাইমপাস করতে চেয়েছিল। তাই তার পেছনে গত কয়েকমাস পরে ছিল। কিন্তু ভালোবাসার অভিনয় করতে করতে সে যে কখন জিনিয়াকে সত্যি সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছে সেটা সে নিজেও জানে না।
একজন সম্পূর্ণ অচেনা মেয়ের ডায়েরিতে নিজের ছবি দেখে আরিয়ান বেশ চমকেই যায়। ডায়েরির মালিক তার এতটাও পরিচিত না আবার অপরিচিতও নয়। ছবিটা হাতে নিয়ে ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সে। নাহ্, ব্যক্তিটি সে নিজেই। কয়েক বছর আগের ছবিটা। আরিয়ান ডায়েরির সেই পেইজটা খুলে পড়তে শুরু করে, যেখানটায় এখনও তার আরো একটি ছবি অর্ধেক বের হয়ে আছে। সেই পৃষ্ঠায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা রয়েছে–
—ভালো থেকো ভালোবাসা, অন্য কারোর সাথে,
আমি দূর থেকেই হাসব, তোমার সুখের হাসি দেখলে পরে।
(অনুপ্রাণিত)
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন ]
শব্দসংখ্যা~২২০৩
চলবে?
[সক্কলে কমেন্ট করে জানাবেন কেমন হয়েছে।🥹 আমি আপনাদের সবার কমেন্ট পড়তে বসলুম🧘♀️
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৮.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩+বোনাস
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪০.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪১.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৪