Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪২.৩


শেষপাতায়সূচনা [৪২.৩]

সাদিয়াসুলতানামনি

অজান্তা বেগম নিজের বুক চাপড়ে চাপড়ে চোখ বন্ধ করে আহাজারি করছেন। একটা মাত্র সন্তানকে কিনা গু”লি করা হলো, মা হিসেবে তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। তার কান্নার সমাপ্তি ঘটালো তারই সন্তান।

আরিয়ান বিরক্তিকর গলায় বলে–

—আম্মু, স্টপ ইউর মেলো ড্রামা। আমার কিছুই হয়নি। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখো।

ছেলের কর্কশ গলা শুনে অজান্তা বেগম চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে আরিয়ান একদম সুস্থসবল রয়েছে। পূর্ণতার ছুঁড়ে দেওয়া গু”লি আরিয়ানের বাম কাঁধের উপর দিয়ে গিয়ে লেগেছে তার পেছনের দেওয়ালে। শুধু মাত্র ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে পূর্ণতা গু”লিটা ছুঁড়েছিল। অজান্তা বেগম বিষয়টা বুঝতে পেরে বোকা বনে যান।

তিনি আরিয়ানের থেকে নজর সরিয়ে সামনে দণ্ডায়মান পূর্ণতার দিকে দৃষ্টি স্থাপন করলে তার পিলে চমকে যায়। কারণ পূর্ণতা এবার তার কপাল বরাবর গা”ন তাক করে রেখেছে। মুখে কিছুক্ষণ আগের অস্বাভাবিক হাসি ঝুলছে। পূর্ণতা হিসহিসিয়ে বলে–

—ড্রামা তো বেশ সুন্দরই করেন। আমার পেছনে না লেগে নাটক-সিনামায় যোগ দিলেও তো পারতেন। এতদিনে বহু সম্পদের মালিক হয়ে যেতেন।

অজান্তা বেগম ভয়ে কাঁপতে থাকেন। পূর্ণতা গা”ন ঠেসে ধরে অজান্তা বেগমের কপালে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে–

—নিজের এত বড় সন্তানের গায়ে আচ এসেছে বলে, আপনার আহাজারির শেষ নেই। আমার সন্তান তো দুনিয়ায় এসেছে এই সেদিন। মাত্র আদো আদো গলায় “মা” ডাকতে শুরু করেছে আমায়। আমার সেই দুধের সন্তানকে আপনি মে-রে ফেলার জন্য এত ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করেছিলেন? আমার কেমন লেগেছে একবার ভেবে দেখেছেন, ওর র-ক্তা-ক্ত মুখখানা দেখে?

আপনি পাষাণী সেটা জানি, কিন্তু এত নিষ্ঠুর আমি ভাবতেও পারিনি। আচ্ছা, আপনার কাছে একজন মানুষের থেকে সম্পদ এত প্রিয় হয়ে গেলো? এখন যদি আমি নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে, আপনার সন্তানকে মেরে ফেলি? আপনার কোল খালি করে দেই? আজকে এতসব দেখার পরও মনে হয় , আমি কোমলতা দেখাবো? যে আমার কোল খালি করতে চেয়েছে, আমিও তার কোল খালি করে দেই? হিসাব বরাবর হয়ে যায়। গুলিটা দুই সেন্টিমিটার দূর থেকে গিয়েছে। আমি চাইলে কিন্তু সেই দূরত্বটা এক সেকেন্ডের ব্যবধানেই শেষ করে দিতে পারি। কী, দিবো?

কথাগুলো বলতে বলতে ক্রোধ ও কষ্ট উভয়েরই অশ্রু এসে পূর্ণতার চোখে উপস্থিত হয়। তার চোখ আবারও লাল বর্ণ ধারণ করতে থাকে। অজান্তা বেগম নিজের দুই হাত জোর করে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে–

—এমন করিস না মা, আমার কোল খালি করিস না। বিশ্বাস কর, আমি ওকে বলি নি এসব করতে। আমি শুধু বলেছি, পাঁচ বছর আগের মতো যদি এবারও তোকে দেশ ছাড়া করা যায় তাহলে আরিয়ানই তোর সব সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবে। আর আরিয়ান সব সম্পত্তির অধিকারী হওয়া মানে, ওর বউয়েরও হওয়া। কিন্তু আঞ্জুমান যে এসব করে ফেলবে, আমি ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।

অজান্তা বেগমের কথা শুনে চমকে যান আহনাফ সাহেব ও আরিয়ান। আহনাফ স্ত্রীকে প্রশ্নই করে বসেন–

—তার মানে, আমার ধারণাই সঠিক। পাঁচ বছর আগে, আমার ভাইয়ের মা-রা যাওয়ার পর তুমিই ওকে বাধ্য করেছিলে দেশ ছাড়তে। ছিঃ অজান্তা! ছিঃ! এতটা নিকৃষ্ট, লোভী আর স্বার্থপর মহিলা কিনা আমার স্ত্রী এটা ভেবেই আমার ম-রে যেতে ইচ্ছে করছে।

আহনাফ প্রচন্ড ঘৃণা নিয়ে কথাগুলো বলেন। পূর্ণতা তাদের কথা শুনে উন্মাদের মতো হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে পেট ধরে নিচে বসে যায়। তাকে এমনভাবে হাসতে দেখে সকলে আরো একদফা চমকে যায়। মেয়েটা অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর হয়ে গেলো নাকি?

হাসি থামিয়ে পূর্ণতা মাথাটা ধীরে ধীরে উঁচু করে উপরের দিকে তাকায়। চোখ দুটো ভিজে উঠেছে তার, ঠোঁট কাঁপতে থাকে অধিক কষ্টে, তবু কণ্ঠে অদ্ভুত এক স্থিরতা বিরাজ করে। নালিশ দেওয়ার মতো করে বলে ওঠে–

—হে মালিক… আমাকে দুনিয়াতে পাঠালে, ঠিক আছে। কিন্তু আমাকে ভালোবাসার মতো একটা মানুষও কি পাঠাতে পারতে না? আমি কি এতটাই অযোগ্য ছিলাম? সবাই শুধু আমার কাছ থেকেই নিয়ে গেলো। আমার ভালোবাসা, আমার বিশ্বাস, আমার দুর্বলতা… সব। কেউ কোনোদিন আমাকে আগলে রাখার কথা ভাবলো না।

আমার নাম যদি ‘পূর্ণতা’ হয়েও থাকে, ভালোবাসা পাওয়ার জায়গায় আমি বোধহয় সবচেয়ে বেশি অপূর্ণ। সবার থেকে শুধু ধোঁকাই তো পেলাম আমি… শুধু ধোঁকা…

শেষ কথাটার সাথে সাথে তার কণ্ঠ ভেঙে যায়। শব্দটা বাতাসে মিলিয়ে যায়, কিন্তু সে ভাঙার যন্ত্রণাটা থেকে যায় সবার বুকে কাঁটার মতো।

চারপাশ নিস্তব্ধ। কেউ কোনো কথা বলতে পারে না। সবার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে অপরাধবোধে। চোখগুলো নুয়ে পড়ে আত্মগ্লানিতে। টনি খুব সাবধানে চোখের কোণে জমে থাকা নোনাপানিটা মুছে নেয়, কেউ দেখে ফেলার আগেই। পূর্ণতার এই হাহাকার নতুন নয় তার জন্য। মেয়েটা বহুবার না বলা কান্না গিলে ফেলেছে। আজ শুধু শব্দ পেয়েছে তার ব্যথা।

পূর্ণতা হঠাৎই হঠাৎই হেসে ওঠে। এক অদ্ভুত, ভাঙা হাসি।
হাসিটা যেন নিজের দুঃখগুলোকে ব্যঙ্গ করছে।তার চোখ দুটো বিশ্বাসঘাতকতা করে তার সাথে, বিরামহীন অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তে থাকে গাল বেয়ে।

জাওয়াদ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে পূর্ণতার দিকে। মেয়েটার মলিন মুখটা, কাঁপতে থাকা ঠোঁট, অসহায় চোখ সবকিছু তার ভেতরটা ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। তার বুকের ভেতরে যেন কেউ ধারালো কিছু দিয়ে বারবার আঘাত করছে।
গভীর এক র”ক্তক্ষরণ হচ্ছে সেথায়, কিন্তু তা বাইরে থেকে তা বোঝার উপায় নেই। সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। চোখে একরাশ অনুতাপ, ঠোঁটে নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি। যেন সে বলতে চায়–

—তোমার অপূর্ণতার জন্য দায়ী যদি কেউ হয়… তবে সেই তালিকায় আমিও আছি।

কিন্তু শব্দগুলো বেরোয় না একটা শব্দও তার কণ্ঠনালি থেকে।

কিছুক্ষণ পর পূর্ণতা নিজেকে সামলে নিয়ে নিচ থেকে উঠে দাঁড়ায়। তারপর আহনাফ সাহেবের সামনে গিয়ে বলে–

—তোমার আমাকে কিছু বলার আছে, বড় বাবা? এই যেমন ধরো, তোমার ওয়াইফের মতোই কিছু। কোন অভিযোগ বা কষ্ট দেওয়ার থাকলে আজই দিয়ে নাও। তোমার জন্য সব কষ্ট দেওয়া উন্মুক্ত। তোমার ছেলে দিলো বিশ্বাসঘাতকতার কষ্ট, তোমার ওয়াইফ কম দেয়নি। এমন একটু একটু করে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে একদিনেই সব পেয়ে নেই। পরে হয়ত আমায় আর নাও পেতে পারো কষ্ট দেওয়ার জন্য।

আহনাফ স্ত্রী আর সন্তানের করা অপরাধের লজ্জায় আরো নুইয়ে যান। সে যদিও জানেন না আরিয়ান কি অপরাধ করেছে, কিন্তু পূর্ণতা যেহেতু বলেছে, সেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তার মানে আসলেই হয়ত করেছে। সে মৌনতা অবলম্বন করে এখন।

অন্যদিকে নিজেকে বারবার বেই”মান, বিশ্বাসঘাতক বলে সম্বোধন করায় আরিয়ান আর চুপ থাকে না। সে সজ্ঞানে এমন কোন অপরাধ করেনি, যার জন্য তাকে এসব নামে ডাকা হবে বারংবার। সে রাগে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে–

—কি এমন করেছি যার জন্য, বারবার আমায় বিশ্বাসঘাতক, বেই’মান বলছিস? বুঝ হবার পর থেকে তোকে মায়ের পেটের বোন ব্যতীত অন্য কিছু ভাবি নি। তোর অবর্তমানে তোর কোম্পানিকে সততার সাথে দেখাশোনা করেছি। চাইলেই লাখ লাখ টাকা হাতাতে পারতাম। কিন্তু করেনি। তাও কেন তুই বারবার আমায় এসব বলছিস?

পূর্ণতা তার কথার প্রতিত্তোরে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে–

—সব জেনেও যদি না জানার ভান করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাও, তাহলে আমার কিছুই বলার নেই।

আরিয়ান এবার অতিষ্ঠ হয়ে আগের থেকেও দ্বিগুণ জোরে চেঁচিয়ে বলে ওঠে–

—ফর গড সেক, আমার অপরাধটা কি বলবি দয়া করে? কিছু না করেই বিশ্বাসঘাতক, বেই”মান উপাধি পেতে নারাজ আমি। আমার ভুলগুলো আমায় বল।

পূর্ণতাও আগের মতোই ভায়োলেন্ট হয়ে যায়। উচ্চস্বরে বলে–

—আমার সংসার ভেঙেছে যার কারণে, তাকেই তুমি সব জানার পরও বিয়ে করো নি? যার জন্য আমি মিথ্যা অপবাদ মাথায় নিয়ে সংসার থেকে বিতাড়িত হলাম, নিজের বাবাকে হারিয়েছি যার ষড়যন্ত্রের কারণে, আমার সন্তান বাবা বিহীন বড় হচ্ছে যেই ব্যক্তিটির জন্য, তার সব ভুল অদেখা করে ভালোবেসে বিয়ে করো নি তুমি? এই নিকৃষ্ট মানুষটির জন্য (আঞ্জুমানকে দেখিয়ে) আমি বিগত পাঁচটা বছর ধরে মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এসব কিছু জানার পরও তুমি কি সুন্দর তার সাথে সংসার করছো। তার অনুশোচনা, আত্মগ্লানি, অপরাধবোধ আমার গত পাঁচ বছরের কষ্ট ভুলিয়ে দিবে? পারবে আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিতে? পারবে আমার ভাঙা মনকে জোড়া লাগাতে?

উত্তর তোমারও জানা, আমারও জানা। এখানে উপস্থিত সকলেরই জানা। কিন্তু তাও তুমি আমায় জিজ্ঞেস করছো, তুমি কি করেছো? তোমায় বেই”মান, বিশ্বাসঘাতক কেন বলছি? লজ্জা করে না এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে? আমায় নিজের মায়ের পেটের বোন দাবী করো, অথচ আমার সাথে সবচাইতে বেশি অন্যায়কারীকেই ভালোবেসে তার সাথে সংসার বেঁধেছো। ওয়াও! চমৎকার। হাত তালি হয়ে যাক।

আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে যায় পূর্ণতার কথা শুনে। আঞ্জুমান তার বোনের সংসার ভেঙেছে? কিন্তু কিভাবে? আর পূর্ণতা এসব কি বলছে? সে এসব জানবে কি করে? হ্যাঁ, তাদের বিয়েটা লাভ ম্যারেজ কিন্তু সে তো এসব জানত না।

পূর্ণতার কথা শুনে আরো একজন ব্যক্তিও অবাক হয়ে যায়। সে হলো জাওয়াদ। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না, আরিয়ান এসব জেনে আঞ্জুমানকে বিয়ে করেছে। সে এগিয়ে আসে আরিয়ানের কাছে। বিভ্রান্ত মনকে শান্ত করতে সুধায়–

—আরিয়ান, তুমি এসব জানার পরও আঞ্জুমানকে কিভাবে বিয়ে করতে পারলে? তাছাড়া ও তো শুধু পূর্ণতাকেই কষ্ট দেয়নি, বরং তোমার নামেও কালিমা লেপন করেছে। এমন মেয়েকে বিয়ে করতে পারলে? ভালোবাসা ভালো, কিন্তু এমন অন্ধ ভালোবাসা তো ভালো নয়। এই দেখো আমি আজও ভুগছি, নিজের মাকে অন্ধের মতো ভালোবেসে, বিশ্বাস করে।

পূর্ণতা ও জাওয়াদের বেশিরভাগ কথাই আরিয়ান বুঝতে পারছে না। তার নামে কবে নোংরামি ছড়ালো রুহী? সে নিজের পক্ষে সাফাই দিতে বলে–

—আপনারা দুইজন কি বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। পূর্ণতা, রুহী তোর সংসার ভেঙেছে? কিন্তু কিভাবে? আমি তো শুনেছিলাম তোর শ্বাশুড়ি আর জাওয়াদ ভাইয়ের কাজিন, যে কিনা তার বাগদত্তাও ছিল। তাদের কারণে জাওয়াদ ভাই তোকে ভুল বুঝে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিল।

—নাটক করছো তুমি আমার সাথে? এমন ভাব করছো, যেন তুমি জানোই না আঞ্জুমান আর জাওয়াদ সাহেবের এক্স ফিওন্সে একজনই।

—হোয়াদ দ্য হে’ল….

পূর্ণতার কথা শুনে বিস্ময়ে যেন আরিয়ান কথা বলতেই ভুলে গিয়েছে। তার আটাশ বছরের জীবনে এত অবাক বা বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেনি, যা আজ ঘটছে। তার মাথা গোলগোল ঘুরতে থাকে। পায়ের শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে বলে সে বোধ করে, তাই ধপ করে পেছনে থাকা সোফায় বসে পড়ে।

এদিকে পূর্ণতা তার এমন রিয়াকশন দেখে নিজেই বিভ্রান্ত হয়ে যায়। সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে আরিয়ানের দিকে। সে বুঝতে পারছে না, আজ আরিয়ান এমন না জানার নাটক করছে কেনো? সেদিন সে যখন জিজ্ঞেস করলো তখন তো ঠিকই স্বীকার করলো। তাহলে আজ আবার এমন করছে কেন? নাকি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে এমনটা করছে। তার মনে কেমন জানি সন্দেহ হয় আজ আবারও।

পূর্ণতা রাশ ভারী গলায় বলল—

—কি হয়েছে? এমন একটা করছো কেনো? নাকি নিজের আসল রূপটা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার কারণে ভয় পাচ্ছো। আরে আমি আর এমন কে, যার সামনে আসল রূপ প্রকাশিত হয়ে যাওয়ায় ভয় পাচ্ছো। জলে ভাসা খড়কুটোকে কেউ ভয় পায় নাকি।

আরিয়ান পূর্ণতার কথা শুনে তার দিকে তাকায়। নিজেকে যথাসম্ভব সামলে নেওয়ার চেষ্টা চালায় ছেলেটা, কিন্তু এত সহজে তা পারে না। খানিক ধরা গলায় বলে–

—অকল্পনীয় কিছু সত্য জানার পর যেমন করা উচিত তাই করছি। বিশ্বাস কর, এর চেয়ে একবিন্দু বেশি রিয়াক্ট করছি না।

এবার অবাক হওয়ার পালা যেন পূর্ণতার। আরিয়ানের কথা তার এতদিনের জানাকে নিমিষেই ভুল প্রমাণ করে দেয়। সেই সাথে তার মনে থাকা অবিশ্বাসের পাহাড়ে একটু একটু করে ভাঙন ধরতে থাকে।

পূর্ণতা বুঝে যায় এই খবিশ মেয়েটা এত এত পরিমাণে মিথ্যা বলে তাদের বিভ্রান্ত করেছে যে, যার অন্ত অব্দি এখনও সে পৌঁছাতে পারেনি। তাই সকল মিথ্যের শেষ করতে সে আঞ্জুমানের কাছে গিয়ে তার চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরে নিচ থেকে টেনে দাঁড় করায়। তারপর টনির উদ্দেশ্যে বলে–

—টনি, কিছুদিন আগে আমার গাড়ীর ব্যাটারির জন্য এক বোতল এসিড আমি নিজের হাতে কিনেছিলাম। সেগুলো গাড়ীর ডিকিতে আছে এখনও। যাও, গিয়ে নিয়ে আসো তো। আজ এই অসম্মানীয়, অমাননীয় মিথ্যুকের রাণীর সকল মিথ্যা বের তো করবো ওর পেট থেকে। সেই সাথে ওর ত্বককে এভারগ্রীন রাখার জন্য এসিড থেরাপিও দিবো। একমাত্র ভাবী আমার, তার প্রতি আমার একটা দায়িত্ব-কর্তব্য আছে না? দৌড়ে গিয়ে নিয়ে আসো তো ভাই।

পূর্ণতার কথা শুনে তার পরিবারের সবাই ভয় তো পায়-ই, তাদের সাথে যোগ হয় ভাড়ায় আসা গু”ন্ডাগুলো। এমন সাইকো পাবলিক তারা নিজেদের জীবনে এই প্রথম দেখলো কিনা, তাই বেচারাদের ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। উপস্থিত সকলের বুঝা শেষ, পূর্ণতার যে কঠিন মানসিক রো*গে আক্রান্ত। নাহলে এমন চিন্তা ভাবনা কোন সাধারণ মানুষের জন্য করা পসিবল?

পূর্ণতার কিছুক্ষণ আগের হাত ভাঙা থেরাপি আর চেহারা ভসকানো থেরাপি নিয়ে আঞ্জুমান এমনিতেই লটকে আছে। অতিরিক্ত মার খাওয়ায় চেতনাও নেই তার তেমন। এরই মাঝে আবার এসি*ড থেরাপি। আঞ্জুমান হুহু করে কেঁদে উঠে। পূর্ণতার পা ধরে বিনীত করে বলতে থাকে–

—আ…মাকে মাফ করে দাও। প্লিজ এ..মনটা করো না। আমি স…ব সত্যি বলছি।

আঞ্জুমানের চুল ধরে রাখা পূর্ণতার হাতটি আরো শক্তপোক্ত অবস্থান নেয়। এমনভাবে চুলের মুঠি ধরে আছে, মনে হচ্ছে মাথাটার ত্বক থেকে উঠিয়েই নিয়ে আসবে চুল। পূর্ণতা রেগে হিসহিসিয়ে বলে–

—পেটের মধ্যে আর একটা কথাও যদি রেখেছিস, আর আমি যদি পরে তা জানতে পারি তাহলে সেদিন তোকে এ”সি”ড দিয়ে গোসল করাবো।

আঞ্জুমান ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মুখ খুলে। সে বলে–

— আরিয়ান পাঁচ বছর আগের কিছুই জানত না। আমি ওকে শুধু বলেছিলাম, আমি আমার এক কাজিনকে ভালোবাসি। ইমোশনাল কথাবার্তা বলে বুঝাই আমার মতো অসহায় কেউ নেই আর ও যাতে আমায় ছেড়ে না যায়। এটাও বলি, ওর পরিবারের যদি কেউ আমার অতীত জানতে চায় তাহলে ও যেন বলে আমার সব জেনেই এই বিয়েটা করেছে। সেদিন তোমায় বলা কথা গুলো সবই আম্মা আর আমার প্ল্যান ছিল।

একদিন আমি আর তুমি কিচেনে কথা বললাম না, সেদিন উনি আড়াল থেকে সেসব শুনে ফেলেন এবং আমায় বলেন আরিয়ানের প্রতি তোমার বিশ্বাসকে নড়বড়ে করে দিতে। তোমার আর আরিয়ানের সম্পর্কটা নষ্ট হলে, তোমাকে এই বাড়ি থেকে তাড়ানোটা সহজ হবে। যেহেতু উনি সব জেনেই গিয়েছিলেন, আর হুমকিও দিয়েছিলেন উনার কথা মতো না কাজ করলে আরিয়ানকে জানিয়ে দিবে। আরিয়ান জানতে পারলে, হয়ত আমায় ছেড়েও দিতে পারত। কারণ ও তোমাকে নিজের বোনের মতোই ভালোবাসে। তাই আমি নিজেকে বাঁচাতে আম্মার কথা মতোই কাজ করি। এতে আমি যেমন দোষী, উনিও দোষী।

অজান্তা বেগম নিজের হয়ে সাফাই গাইতে চান। কিন্তু তখনই সকলকে অবাক করে দিয়ে আহনাফ সাহেব তাকে থাপ্পড় মে”রে বসেন। সাঁইত্রিশ বছরের সংসারে আজই প্রথম তিনি স্ত্রীর গায়ে হাত তুললেন। তুলতে বাধ্য হলেন। স্ত্রীকে ভর্ৎসনা করে বলেন–

—তুমি কি আদৌও মানুষ? সামান্য সম্পত্তির লোভে তুমি কি কি করেছো এই এতিম মেয়েটার সাথে। আরে আজ মরলে কাল দু’দিন। কি হবে এত সম্পত্তি দিয়ে? নিয়ে যেতে পারবে ঐ সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরে? বা তোমার ছেলে পারবে এত সম্পত্তি নিজের সাথে করে নিতে? এই সম্পত্তির জন্য এত কর্মকাণ্ড করেছো, এতিম মেয়েটাকে আগলে নেওয়ার বদলে দূরে সরিয়ে দিয়েছো, কাল হাশরের ময়দানে এসবের জবাব দিতে পারবে ওর বাবা-মায়ের কাছে? ছিঃ অজান্তা ছিঃ! এত লোভী, নিকৃষ্ট মেয়ে মানুষ তুমি আমি ভাবতেও পারিনি।

স্বামীর ভর্ৎসনায় অজান্তা বেগম গালে হাত দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকেন। একটা টু শব্দও মুখ বের করার সাহস পান না তিনি আর।

পূর্ণতার মনের সকল সংশয় দূর হয়ে যায়। সে টনিকে বলে পুলিশ ডাকতে। আঞ্জুমান অনেক আকুতিমিনতি করে তাকে পুলিশে না দেওয়ার জন্য, কিন্তু কেউ তার কথা শুনে না। এমনকি আরিয়ানও না। উপরন্তু, সে টনিকে থামিয়ে দিয়ে নিজেই পুলিশকে কল করে। অল্প সময়ের মধ্যেই পুলিশ এসে আঞ্জুমান ও অজান্তা বেগমকে ধরে নিয়ে যায়। অজান্তা বেগম প্রত্যক্ষ ভাবে আঞ্জুমানের সহায়তা না করলেও পরোক্ষভাবে তাকে মদদ দিয়েছে। এছাড়া ছোটবেলা থেকে পূর্ণতাকে গোপন ও সূক্ষ্ম ভাবে মানসিক অত্যাচার করার জন্যও সে দোষী। পুলিশ আসার আগেই পূর্ণতা গু”ন্ডাদের বিদায় করে।

পূর্ণতা যেহেতু অসুস্থ এবং পুলিশ ইনস্পেক্টরও তাদের চেনাপরিচিতই তাই সে বাসায় বসেই সকলের সামনেই নিজের স্টেটমেন্ট দেয়। পূর্ণতার দেওয়া স্টেটমেন্টই আরিয়ানরা পাঁচ বছর আগের পুরো ঘটনা জানতে পারে, আঞ্জুমান কত নিকৃষ্ট পরিকল্পনা করেছিল তার বোনকে জাওয়াদের সংসার ছাড়া করতে। তার সাথে পূর্ণতার সম্পর্ক আছে এই কথা শুনে আরিয়ান পুলিশের সামনেই আঞ্জুমানকে একটা থাপ্পড় মারতে চায়, কিন্তু আঞ্জুমান অতিরিক্ত মা”র খেয়ে আর এরেস্টের কথা শুনে আরো অসুস্থ হয়ে গিয়েছে। তাকে বর্তমানে হসপিটালে পাঠানো হবে, একটু সুস্থ হতেই তাকে আদালতে তোলা হবে। জাওয়াদের কাছে জিনিয়ার পাঠানো সেই পাঁচ বছর আগের ভিডিও থাকায় সেটাও সে পুলিশকে দেখায়। সেই সাথে পূর্ণতা তাদের বাসার সিসিটিভি ফুটেজর কপিও ইনস্পেক্টরকে সেন্ড করে। যদিও আঞ্জুমানকে এহেনভাবে মা”রার জন্য পূর্ণতার উপরও কেস লাগার সম্ভাবনা থেকেই যায়, কিন্তু পূর্ণতা এক্ষেত্রে একটু অনৈতিকতা অবলম্বন করে।

পুলিশ আঞ্জুমান আর অজান্তা বেগম কে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরপরই পূর্ণতার ফোনে কল আসে। হসপিটাল থেকে আরওয়া কল দিয়েছে। তাজওয়াদের ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ হয়েছে মাকে দেখেনি বলে কান্নাকাটি করছে। এতসব ঘটনার মধ্যে কারো সময়ের খেয়াল ছিল না বিন্দুমাত্রও। রাত হয়ে গিয়েছে। পূর্ণতা টনিকে নিয়ে পুনরায় হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। জাওয়াদের আর কাজ কি, বউয়ের পেছন দৌঁড়ানো ছাড়া। তাই সেও ছুটে পূর্ণতার পেছন পেছন।

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে, আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]

শব্দসংখ্যা~২৪৪২

চলবে?

[গল্পের স্বার্থে আইন সম্পর্কে কিছু বিষয় সংযোজন করা হয়েছে, এবং পরবর্তীতে আরো করা হতে পারে। আশা করি বিষয়টা গল্প পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখবেন।

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply