শেষপাতায়সূচনা [৪১.২]
সাদিয়াসুলতানামনি
জাওয়াদের আকস্মিক আগমন, পূর্ণতাকে নিজের কাছে টেনে নেওয়া, নওশাদের সাথে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়া বিষয়গুলো এতটা তাড়াতাড়ি ঘটে যায় যে, পূর্ণতা কোন প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময় অব্দি পায় না। কিন্তু জাওয়াদের শেষের কথাগুলো তার কান ও হৃদয়ে বেশ জোরে ধাক্কা লাগে। ওয়াইফ? রেসপনসেবলিটি? সোলমেট? শব্দ গুলো বড়ই হাস্যকর ঠেকলো পূর্ণতার কাছে।
পূর্ণতা আশেপাশে তাকিয়ে দেখে পার্কে আগত অন্যান্য বাচ্চা ও তাদের মায়েরা পূর্ণতাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। আর থাকবেই না কেনো? ফ্রি-তে এমন বিনোদন পেলে কে মিস করতে চাইবে?
পূর্ণতা পরিস্থিতি সামাল দিতে কঠোর গলায় বলে–
—মি.শেখ আমায় ছাড়ুন আর প্লিজ সিনক্রিয়েট করবেন না।
জাওয়াদও রেগে বলে–
—আমি সিনক্রিয়েট করছি নাকি এই লাইফলেস লোকটা সিনক্রিয়েট করছে? উনার সাহস কি করে হয় তোমাকে স্পর্শ করার?
পূর্ণতার এবার রাগের পারদ তিরতিরিয়ে বাড়তে থাকে। সে এক ঝটকায় নিজেকে জাওয়াদের থেকে ছাড়িয়ে নেয়। তারপর চোখমুখে দৃঢ়তা নিয়ে বলে–
—আমি তাকে পারমিশন দিয়েছি বলে সাহস পেয়েছে, নাহলে আপনিই ভেবে দেখুন না, কার এত স্পর্ধা যে কিনা আনাবিয়া আহমেদ পূর্ণতাকে স্পর্শ করবে।
পূর্ণতার কথা শুনে জাওয়াদের যেমন রাগ পায় তেমনই বুকের ভেতরে চিনচিনে ব্যথার সৃষ্টি হয়। এটা সত্যি, পূর্ণতা পারমিশন না দিলে তাকে কোন পুরুষ কেন পুরুষের ছায়া অব্দি স্পর্শ করার সাহস পাবে না। জাওয়াদ এই ভেবে কষ্ট পায় যে, সে ব্যতীত পূর্ণতা অন্য এক পুরুষকে তাকে স্পর্শ করার অনুমতি দিয়েছে। জাওয়াদ তো আর এটা জানে না, এই নওশাদ তার কোন সময়টাতে আগলে রেখেছিল।
জাওয়াদ আহত গলায় বলে–
—তুমি কীভাবে পারলে অন্য এক পরপুরুষকে তোমায় স্পর্শ করার অনুমতি দিতে?
পূর্ণতা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে–
—যেভাবে আপন পুরুষ হয়ে গেলো পর, সেভাবেই পর হয়ে গেলো আপন।
—আমি তোমার পর নই পূর্ণ…..
—আপনও তো নন। আপন পুরুষ হলে, আজ নিজের অধিকারের জন্য আপনার এমন হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে হতো না। আর নাই বা আমায় আমার সন্তানকে একা হাতে মানুষ করতে হতো। তাই প্লিজ, এসব লেইম কথাবার্তা, নাটক বন্ধ করুন। আ’ম জাস্ট ফেডআপ। আ……
—ভালো আন্তেল, তুমি একাকে?
পূর্ণতা আর জাওয়াদের বাকবিতন্ডার মাঝেই তাজওয়াদ এসে সেখানে উপস্থিত হয়। খেলতে খেলতেই হঠাৎই তার নজর যায় জাওয়াদের উপর। জাওয়াদকে দেখা মাত্রই সে খেলা ছেড়ে ছুটে এসেছে তার কাছে।
তাজওয়াদ এসেছে দেখে পূর্ণতা আর কথা বাড়ায় না। নিজের ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে ছেলের ঘর্মাক্ত মুখ মুছে দিতে নিবে তার আগেই জাওয়াদ কাজটা করে। সে সুন্দর করে ছেলের মুখখানা মুছিয়ে দিয়ে তাজওয়াদের এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো গুছিয়ে দেয়। বাচ্চাটা একটু খেলতেই গরমে লাল টমেটো হয়ে গিয়েছে।
জাওয়াদ তাজওয়াদের দুই গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বলে–
—এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎই দেখো একটা প্রিন্স কি সুন্দর করে খেলছে। তাই না এসে পারলাম না সোনা। বাই দ্যা ওয়ে, কেমন আছো তুমি?
—আ’ম ফাইন আন্তেল।
তাজওয়াদের হঠাৎই মনে পড়ে, ভালো আঙ্কেলের সাথে তার বাবাইয়ের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি। সে টুকুর টুকুর চাহনি নিয়ে বলে–
—ভালো আন্তেল, আচো তোমাকে আমাল বাবাইয়েল সাথে ইন্ট্রডিউস কলিয়ে দেই।
“বাবাই” ডাকটা শুনে জাওয়াদের অন্তস্তলে তীক্ষ্ণ এক ব্যথার সৃষ্টি হয়। তার সন্তান বাবাই ডাকছে আরেক লোককে। সবই তার কর্মফল। তাজওয়াদ জাওয়াদের হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে নওশাদের সামনে। তারপর নওশাদকে দেখিয়ে বলে–
—ভালো আন্তেল, উনি হচ্ছেন আমাল বাবাই। আর বাবাই উনি হচ্ছেন, ভালো আন্তেল। তোমাকে উনাল কথা ফোনে বলেছিলাম।
নওশাদ একটা বাঁকা হাসি দিয়ে জাওয়াদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে–
—হ্যালো আমার চ্যাম্পের ভালো আঙ্কেল। মাইসেল্ফ তাজওয়াদ’স বাবাই।
নওশাদ এমন ভাবে বলে, যাতে জাওয়াদ আরো জ্ব-লে উঠে। আর হয়ও তাই। জাওয়াদ শিকারী দৃষ্টি নিয়ে নওশাদের দিকে তাকিয়ে থাকে চোয়াল শক্ত করে। জাওয়াদ তাজওয়াদের সামনে বেশি সিনক্রিয়েট করতে চায় না বলে, নওশাদের বাড়িয়ে দেওয়া হাতে হাত মেলায়। কিন্তু এত শক্ত করে ধরে যেনো মনে হচ্ছে, হাতটার হাড়-গোড় ভে-ঙেই তবেই আজ দম নেবে সে।
নওশাদ হাতে ব্য”থা অনুভব করার পরও সে এটার কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে না বা মুখে ফুটিয়ে তুলছে না। তাদের দু’জনকে আলাদা করে তাজওয়াদই। সে জাওয়াদের হাত ধরে বলে–
—আন্তেল চলো কেলা কলি। তুমি, আমি, মাম্মা, বাবাই, পিপি আমরা সবাই।
জাওয়াদ তাজওয়াদের কথায় সম্মতি দিতে নিবে তার আগেই পূর্ণতা অসম্মতি জানিয়ে বলে–
—আজ আর খেলতে হবে না তাজ। বাসায় যেতে হবে আমাদের এখন। সন্ধ্যা হয়ে আসছে।
তাজওয়াদ গো-বেচারার মতো মুখভঙ্গি করে মাকে বলে–
—মাম্মা, আকতু কেলি। ভালো আন্তেলেল সাথে একতু কেলেই বাসায় চলে যাবো।
—আরেকদিন খেলো আঙ্কেলের সাথে। আজ মাম্মা বলেছে না আর খেলতে হবে না। যদি আমার কথা না শুনো তাহলে আমি আর নিয়ে আসবো না তোমায় পার্কে।
কি আর করার! মায়ের হুমকি শুনে তাজওয়াদ আর জেদ করে না। চুপচাপ রাজি হয়ে যায় বাসায় যেতে। জিনিয়ার থেকে বিদায় নিয়ে পূর্ণতারা নিজেদের গাড়িতে চড়ে বসে। জাওয়াদ মলিন চোখে তাদের প্রস্থান দেখে। জিনিয়ার ভীষণ খারাপ লাগে ভাইয়ের মলিন মুখশ্রী দেখে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে দেখে জাওয়াদও জিনিয়াকে নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
আজ আঞ্জুমান অনেকক্ষণ লাগিয়ে বেশ কয়েক পদ রান্না করেছে। চিংড়ি মাছের মালাই কারী, বিফ রেজালা, বেগুন দিয়ে শুঁটকি মাছের তরকারি, ডাল, ভাত এছাড়া আরো কয়েকটা পদ রেধেছে। এমনি এমনি রাঁধেনি, তার নতুন একটা নেকলেস চাই। এজন্য আজ এত পদ রেঁধে খাওয়ানোর পর নেকলেসের আবদার করবে। এমনিতে তাদের সকল রান্নাবান্না
পূর্ণতা আঞ্জুমানের রান্না করা খাবার না নিজে খায় আর নাই বা ছেলেকে খাওয়ায়। তার হাতের রান্না খাওয়ানোর প্রশ্নই আসে না। তার মতো বিষাক্ত মনমানসিকতার মানুষ খাবারে কি না কি মিশিয়ে রাখে বলা তো যায় না।
খেতে বসে আঞ্জুমান অন্যান্য দিনের মতো খাবার সকলের পাতে বেড়ে দিতে থাকে। কিন্তু আরিয়ানের পাতে যখন চিংড়ি মাছ দিতে নিবে, তখনই আরিয়ান নিজের প্লেট সরিয়ে নেয়। তাকে প্লেট সরিয়ে নিতে দেখে আঞ্জুমান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে–
—প্লেট সরালে কেন আরিয়ান? আজ আমি এসব রান্না স্পেশালি তোমার জন্য করেছি। নাও, খেয়ে বলো কেমন হয়েছে?
আরিয়ান থমথমে মুখে একবার তরকারির বাটিগুলোর দিকে তাকায় তো আরেকবার আঞ্জুমানের মুখের দিকে। মূলত সে বুঝতে পারছে না, আঞ্জুমান কি তার সাথে কোন প্র্যাঙ্ক করছে নাকি সত্যিই এসব তার জন্য রান্না করেছে। কিন্তু আরিয়ান আঞ্জুমানের উৎসুক মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করলে বুঝতে পারে, এটা কোন প্র্যাঙ্ক নয়। আঞ্জুমান সত্যিই এসব তার জন্য রেঁধেছে।
আরিয়ান গম্ভীর গলায় বলে–
—আমার চিংড়ি মাছ, বিফ আর বেগুনের অ্যালার্জি আছে জানার পরও তুমি এসব আমার জন্য রান্না করেছো। আর ইউ কিডিং উইথ মি?
আরিয়ান আর আঞ্জুমানের সংসারের আড়াই মাস চলছে। এতদিন কি যথেষ্ট নয় সঙ্গীর ভালো-মন্দ, পছন্দ-অপছন্দ, অসুখ-বিসুখ সম্পর্কে জানার? বিয়ের আগেও তাদের কয়েক বছরের রিলেশন ছিলো। তখনও কি তাদের এসব বিষয়ে কথা না হয়েছে? অবশ্যই হয়েছে। আরিয়ানের উপরিউক্ত কথাটি তো সেটাই প্রমাণ করে। আসলে উড়ে এসে জুড়ে বসে অন্যের জায়গা দখল করলে কি চট করে জানা যায় ছোটবড় সব ধরণের বিষয়াদি । তাও যদি আঞ্জুমানের সদিচ্ছা থাকে তাহলে এতদিনে সে ঠিকই জানত, আরিয়ানের কোনটা পছন্দ আর কোনটা অপছন্দ। কিসে তার অ্যালার্জি আছে আর কিসে নেই। সে তো শুধু নিজের কি চাই, কি লাগবে এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
আরিয়ানের কথা শুনে পূর্ণতা, আহনাফ সাহেব, অজান্তা বেগম সকলের হাত থেমে যায়। তারাও আরিয়ান ও আঞ্জুমানের দিকে তাকিয়ে আছে। সকলের সেই দৃষ্টিতে খেলা করে অবাকত্ব ও সন্দেহ। আঞ্জুমান তার ভুল উপলব্ধি করতে পারে তাড়াতাড়িই, তাই সে নিজের ভুলের উপর পর্দা দিতে বলে–
—আরে, একদিন খেলে কিছু হবে না। আমি কত যত্ন ও ভালোবাসা নিয়ে তোমার জন্য এতসব রান্না করেছি। অল্প কিছু হলেও নাও। খেয়ে পরে না-হয় ঔষধ খেয়ে নিও।
সকলের বিস্ময়ভাব আরো একধাপ বেড়ে যায়। এ কেমন স্ত্রী যে কিনা, নিজের স্বামীর অসুস্থতার কথা জেনেও তাকে ইচ্ছে করে আরো অসুস্থতার দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। পূর্ণতা এবার মুখ না খুলে পারে না। সে শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলে–
—ভাইয়ার এসবে মারাত্মক অ্যালার্জি রয়েছে। একবার সে এক পিস চিংড়ি খেয়েছিল বলে, তাকে তিনদিন হসপিটালে ভর্তি থাকতে হয়েছিল অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্টের কারণে। তাই ভাইয়ার এসব না খাওয়াই উচিত।
কথাটা বলে আবারও তাজওয়াদকে খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অজান্তা বেগমও পূর্ণতার কথায় সায় দেয়। পরক্ষণেই চিন্তিত হয়ে বলেন–
—তাহলে ছেলেটা খাবে কি দিয়ে? এসবেই তো ওর অ্যালার্জি। হ্যা রে বাবা, তুই একটু বস। মালতি তোর জন্য কিছু একটা বানিয়ে আনছে।
অজান্তা বেগম ছেলেকে এতটাই ভালোবাসেন যে, নিজে গিয়ে রান্না করতে পারবেন না। ছেলের জন্য মালতি কাকীকে রান্না করতে পাঠাচ্ছেন। হায় রে, মা! হায় রে, ভালোবাসা! দু’জন প্রিয় নারীকেই আজ কেমন পরপর লাগলো আরিয়ানের কাছে। সে মন খারাপ করে খাওয়ার টেবিল ছেড়ে উঠে যেতে যেতে বলে–
—আমার ক্ষুধা মিটে গিয়েছে। তোমরা খাও।
আরিয়ান চলে যাবে তখন পূর্ণতা বলে–
—বড় বাবা, আমার জানা মতে, রান্নাটা এতটাও খারাপ করিনা যে মুখেও দেওয়া যাবে না। যদি মন চায়, তাহলে তোমার ছেলে আমার রান্না খেতে পারো।
আরিয়ান বুঝতে পারে কথাটা পূর্ণতা তাকে উদ্দেশ্য করেই বলেছে। বোনের এমন ঘুরিয়ে পেচিয়ে বলায় আরিয়ানের বেশি একটা ভালো লাগে না। তাদের সম্পর্ক তো এমন ছিলো না। বরংচ আপন ভাই-বোনের মতোই ছিল সম্পর্কটা। কিন্তু গত একমাস ধরে পূর্ণতা তার সাথে কেমন একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলছে। কথাও তেমন একটা বলে না। আরিয়ান বুঝে পায়, তার কোন একটা কাজ পূর্ণতাকে কষ্ট দিলো যার কারণে তাদের এত সুন্দর ভাই-বোনের সম্পর্কটা ভেঙ্গে গেলো।
আরিয়ান আবারও তার চেয়ারে বসে পড়ে। তারপর নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে বলে–
—বাবা তোমার ভাতিজি তো আর আমার জন্য রেঁধেছে নাকি যে আমি খাবো? আগে তাে জিজ্ঞেস করতো, এখন তাও করে না।
পূর্ণতা ছেলের মুখে আরেক লোকমা ভাত দিয়ে বলে–
—আজব কথা বার্তা নিষেধ করো তোমার ছেলেকে বড় বাবা। নিজের বাড়ি, নিজেদের ডাইনিং, রান্না নিজের আপন চাচাতো বোন করেছে সেটাও নাকি তাকে সেধে সেধে খাওয়াতে হবে। আমি বাপু এত তেল আমার ছেলেকেও মারি না। এই তাজ, তোমাকে আমি এত তেল মারি?
তাজওয়াদ বেচারা মায়ের কথা কিছুই বুঝে না। কিন্তু পূর্ণতা তাকে ইশারায় না বুঝানোতে সেও মাথা নাড়িয়ে নাবোধক জবাব দেয়। আহনাফ সাহেব খেতে খেতে ভাতিজি ও ছেলের খুনসুটি উপভোগ করছে। সে ঠিক বুঝতে পেরেছে, এই দুটোর মাঝে হয়ত কোন বিষয় নিয়ে মনমালিন্য হয়েছে। তাই তারা কথা বলার মাধ্যম হিসেবে বারবার তাকে টানছে। সে আর জিজ্ঞেস করে না, তাদের মাঝে কি নিয়ে মনমালিন্য হয়েছে। ছেলে-মেয়ে দুটোই বেশ বড় ও বুঝদার হয়েছে। এই বয়সে এসে তাদের ঝামেলা নিজেরা নিজেরাই মিটমাট করে নিলে ভালো হয় বলে তিনি মনে করেন।
পূর্ণতা ছেলের সম্মতি পেয়ে বলে–
—খেতে চাইলে খেতে পারে তোমার ছেলে, বড় বাবা।
তরকারির বাটি গুলো আরিয়ানের দিকে এগিয়ে দিয়ে কথাটা বলে পূর্ণতা। আরিয়ান যতই তার সাথে অন্যায় করুক, তার মন কেন জানি সায় দেয় না ভাইকে খালি পেটে ঘুমাতে যেতে দিতে। আরিয়ান পূর্ণতার রান্না করা তরকারি দিয়েই খেতে থাকে। অনেক ছোটবেলায় রান্না শেখার কারণে বেশ ভালোই রাঁধতে পারে পূর্ণতা।
অন্যদিকে আঞ্জুমান মনে মনে রাগে ফেটে পড়ে। মনের রাগ মনেই চেপে সেও খেতে বসে যায়। খাওয়াদাওয়া শেষে যে যার রুমে চলে যায় ঘুমাতে। আঞ্জুমান ফ্রেশ হয়ে একটা আকর্ষণীয় নাইটি পরে আরিয়ানের কাছে যায়। এমনিতেই তাকে দেখতে ভীষণ আবেদনময়ী লাগছে, তারউপর তার অঙ্গভঙ্গি গুলো তাকে আরো আবেদনময়ী করে তুলেছে।
আরিয়ান তখন সোফায় বসে ল্যাপটপে একটা কাজ করছিল, আঞ্জুমান তার কাছে গিয়ে তার থেকে ল্যাপটপটা নিয়ে শাটার বন্ধ করে দিয়ে সেটা সেন্টার টেবিলের উপর রেখে দেয়। তারপর আরিয়ানের কোলের উপর বসে তাকে বিভিন্নভাবে সিডিউস করার চেষ্টা করে। কিন্তু আজ কেন জানি আরিয়ানের মন চায় না আঞ্জুমানের ডাকে সাড়া দিতে। সে কোমল হাতে আঞ্জুমানকে নিজের কোলের উপর থেকে নামিয়ে তার পাশে বসিয়ে দেয়। তারপর শান্ত গলায় বলে–
—তুমি শুয়ে পড়ো রুহী। আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি আছে, সেটা শেষ করে আমিও শুয়ে পড়বো।
আঞ্জুমান আবারও তাকে সিডিউস করার চেষ্টা করতে চায়, কিন্তু সে মুখ খোলার আগেই আরিয়ান তার ল্যাপটপ নিয়ে বেলকনিতে চলে যায়। নিজের কার্যসিদ্ধি করতে না পেরে আঞ্জুমানের বুকের ভেতরে জমা হওয়া রাগটায় যেন পেট্রোলের ছিটা পড়ে আরো দাউদাউ করে জ্ব-লতে থাকে। সে বেলকনির দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত গলায় হিসহিসিয়ে বলে–
—এই বলদকে এত সহজে হাতছাড়া করা যাবে না। ও হলো আমার ভাগ্য বদলের ট্রাম কার্ড। ও যতদিন আমার হাতে আছে, ততদিন আমার এই আহমেদ বাড়ির ঐশ্বর্য-বৈভব উপভোগ করতে পারবো। এটা আমি ঠিক ততদিন পেতে চাই, যতদিন পর্যন্ত না আমার মন ভরছে। আর এই সুখ টুকু পাওয়ার জন্য আমার যা করতে হয় আমি তাই করবো।
প্রচন্ড মাথা ব্যথায় নিয়েই পিটপিটিয়ে চোখ মেলে তাকায় পূর্ণতা। চোখ মেলতেই উপরের সিলিংটাকে অপরিচিত ঠেকে তার কাছে। তার রুমের সিলিং তো এমন না। ধীরে ধীরে যখন তার ব্রেনটা সচল হতে থাকে, তখনই তার মনে পড়ে পূর্বের সকল ঘটনা। লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠলে হাতে চিনচিনে ব্যথা অনুভব করে সে। বাম হাতের দিকে তাকালে দেখতে পায় তার হাতে স্যালাইন চলছে। চোটটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রুমটা পর্যবেক্ষণ করলে সে বুঝতে পারে, সে বর্তমানে হসপিটালে আছে।
হঠাৎই তার মনে পড়ে, তার ছেলে, তার যক্ষের ধন, তার বেচে থাকার একমাত্র অবলম্বন তার বুকে নেয়। পূর্ণতা নিজের মুখ থেকে মাস্কটা টেনে খুলে ফেলে, সেই সাথে হাত থেকে স্যালাইনের নলটাও। তারপর দূর্বল পা জোড়া নামিয়ে দৌড়ে কেবিন থেকে বের হতে নিলে তখনই কেবিনে প্রবেশ করে টনি আর আরওয়া। তাদের চোখ-মুখের অবস্থাও বেশ একটা ভালো না। কেমন ভঙ্গুর লাগছে তাদের।
তারা কেবিনে প্রবেশ করেই পূর্ণতাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে যায়। কেনো? কারণ আজ দুইদিন পর পূর্ণতার জ্ঞান ফিরেছে। পূর্ণতা টনিদের টপকিয়ে কেবিন থেকে বের হতে নিলে আরওয়া তাকে ধরে ফেলে। ছেলের কাছে যেতে বাঁধা দেওয়ায় পূর্ণতা প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। সে ঝটকা দিয়ে নিজেকে আরওয়ার থেকে ছাড়িয়ে নিতে চায়, কিন্তু তার শরীর অত্যধিক দূর্বল হওয়ায় তেমন একটা সফল হয় না। নিজেকে ব্যর্থ পেয়ে পূর্ণতা এবার কেঁদে দেয়। সে আহাজারি করে কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—আমাকে ছাড়ো আরওয়া, আমাকে আমার ছেলের কাছে যেতে দাও। আমার তাজ, আমার যক্ষের ধনের কাছে আমায় যেতে দাও। ছাড়ো আমায় আরওয়া….
আরওয়া তাকে শক্ত করে ধরে আবারও নিয়ে যায় বেডের কাছে। টনি গিয়েছে ডাক্তার ডাকতে। মিনিট খানেকের মাঝেই ডাক্তার সহ সে আবারও প্রবেশ করে পূর্ণতার কেবিনে। ডাক্তার পূর্ণতাকে হাইপার হতে দেখে ঘুমের ইনজেকশন রেডি করতে থাকে। পূর্ণতা নওশাদ আর টনিকে দেখে কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—নওশাদ, ও টনি! ভাই আমার, আমাকে আমার ছেলে এনে দাও না প্লিজ। আমার সন্তান কই? আমার তাজওয়াদ কই?
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন ]
শব্দসংখ্যা~২১০০
চলবে?
[লাস্টের সিনটুকু আপনাদের জন্য মিস্ট্রি রেখেছি। আশা করি আগামী পর্বেই সেটা সলভ করে দিবো ইনশা আল্লাহ।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। সকলে একটা হলেও কমেন্ট করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪