Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪০.২


শেষপাতায়সূচনা [৪০.২]

সাদিয়াসুলতানামনি

জাওয়াদ আজও এসেছিলো। মই বেয়ে উপরে উঠেছে এখন রেলিং টপকে এক কদম রেখে মাত্র বেলকনিতে তখনই পূর্ণতা আর তার সাক্ষাৎ হয়ে যায়। পূর্ণতাকে এখনও জেগে থাকতে দেখে জাওয়াদ থতমত খেয়ে যায় আর তাড়াহুড়ো করে উল্টো পায়েই মই দিয়ে নামতে নিলে মইটা নড়েচড়ে সরে যায় আর জাওয়াদ পড়ে যেতে নেয়। জাওয়াদকে পড়ে যেতে দেখে পূর্ণতার কলিজার পানি নাই হয়ে যায়। সে ভয়ে মৃদু আর্তনাদ করে বলে ওঠে–

—আল্লাহ! সাবধানে তাজওয়াদের বাবা……..

পূর্ণতা দৌড়ে গিয়ে জাওয়াদের একহাত শক্ত করে ধরে ফেলে নিজের দুহাত দিয়ে। জাওয়াদও নিজের অন্যহাত দিয়ে আরেক পাশের রেলিং চেপে ধরে। পূর্ণতা বহু কসরত করে টেনেটুনে জাওয়াদকে রেলিং টপকে বেলকনির ভেতরে নিয়ে আসে। মূলত জাওয়াদ ভয় পেয়ে তাড়াহুড়ো করে নিচে নামায় কারণে মই নড়েচড়ে যায়। সেই সাথে সে ব্যালেন্স হারিয়ে যাওয়ায় তার পা ফসকে পড়ে যেতে নিয়েছিল, আর তখনই পূর্ণতা এসে ধরে ফেলায় সিলেটের মতো পড়ে যাওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছে।।

পূর্ণতা নিচে বসে পেছনের দেওয়ালের সাথে গা এলিয়ে দিয়ে হাঁপাতে থাকে। তার বুকটা এখনও ভয়ে ধকধক করছে। মস্তিষ্কে শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে–

—যদি সময় মতো উনাকে ধরতে না পারতাম? এত উপর থেকে পড়ে গিয়ে কি অবস্থাটাই না হতো উনার!

কথাটা ভাবতেই ভয়ে পূর্ণতার কলিজা ধক ধক করে ওঠে। সে চোখ তুলে সামনে বসা জাওয়াদের দিকে তাকায়। জাওয়াদও তখন তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো, তার চোখ দু’টো কেমন ঘোলাটে ঠেকলো পূর্ণতার কাছে। এত রাতে এইভাবে জাওয়াদকে নিজের রুমে আসতে দেখে পূর্ণতা ভয়াবহ রাগ চেপে বসে মস্তিষ্কে। তার মানে এতদিন তার গা থেকে সকাল বেলায় যেই অচেনা সুঘ্রাণটা আসতো, গলার নিচে ছোপ ছোপ দাগ এসবই করত জাওয়াদ। লোকটা কি পাগল? নাকি বুড়ো বয়সে ভীমরতি পেয়েছে?

পূর্ণতা প্রচন্ড ক্রোধ নিয়ে বলে–

—আপনি এখানে এত রাতে কি করছিলেন? সাহস কি করে হয় আপনার আমার রুমে আসার? তাও মই বেয়ে?

জাওয়াদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে–

—আমার বউয়ের রুম,আমি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে আসবো।

জাওয়াদ মনে মনে ভয় পাচ্ছে ঠিকই, এইভাবে পূর্ণতার কাছে ধরা পড়ে যাওয়ায়। কিন্তু উপরে শক্ত হয়ে রয়েছে। পূর্ণতার সামনে যতই নরম হবে, পূর্ণতা তাকে ততই দূরে সরিয়ে দিবে।

অন্যদিকে জাওয়াদের কথা শুনে পূর্ণতার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে। সে অবজ্ঞার সুরে বলে–

—বউ? জোক অফ দ্যা ইয়ার।

পূর্ণতার অবজ্ঞা জাওয়াদের হৃদপীড়া বাড়িয়ে দেয়। ইদানীং তার পূর্ণতার সাথে কথা বলতে প্রচন্ড ভয় লাগে, কখন পূর্ণতা একটা তিক্ত সত্য বলে বসে মুখের উপর এজন্য। পূর্ণতা নিচ থেকে উঠে দাঁড়ায়, জাওয়াদের উদ্দেশ্যে কাঠকাঠ গলায় বলে–

—সসম্মানে বাসা থেকে বেড়িয়ে যান, নাহলে অসম্মানিত হওয়ার পর আমায় দোষ দিতে পারবেন না কিন্তু। এমনিতেই আমি মানুষ ভালো না, আমাকে আরো নিচে নামতো বাধ্য করবেন না। আর হ্যাঁ, ভুলেও যদি কোনদিন এহেন কাজ আবারও করেছেন সেদিন আপনাকে পুলিশে দিতে আমি বাধ্য হবো।

কথা শেষ করে পূর্ণতা আর জাওয়াদের সামনে দাঁড়াতে চায় না, নিজের বেয়ারা মনের উপর পূর্ণতার দুই টাকার ভরসা নেই। সে ভারী কদম ফেলে সেখান থেকে চলে যেতে নেয়, কিন্তু বিধিবাম! জাওয়াদ তাঁকে যেতে দেয় না। উপরন্তু তার হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে তাকে নিচে নিজের কোলের উপর বসিয়ে নেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় পূর্ণতার নাক গিয়ে বারি খায় জাওয়াদের শক্ত-পোক্ত সিনায়। হালকা ব্যথায় “আহ” করে ওঠে নাক ধরে সে।

পূর্ণতার ব্যথাতুর শব্দে জাওয়াদ অস্থির হয়ে যায়। পূর্ণতার গ্রীবায় হাত রেখে তার মুখটা উঁচু করে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে–

—ব্যথা পেয়েছো জান? কোথায় লেগেছে দেখি!

জাওয়াদ পূর্ণতাকে নাকে হাত দিয়ে ধরে থাকতে দেখে বুঝে নেয় পূর্ণতা তাকে ব্যথা পেয়েছে। সে নিজ উদ্যোগে পূর্ণতার হাতটা নাকের উপর থেকে সরিয়ে নিজের বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দ্বারা আলতো করে বুলিয়ে দিতে থাকে। পূর্ণতা ততক্ষণে সামলে নিয়েছে নিজেকে। আসলে তার নাকটা অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই সেন্সেটিভ। নাকে একটা টোকা লাগলেও মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায়।

পূর্ণতা নিজের নাকের উপর থেকে জাওয়াদের হাতটা ছুঁড়ে ফেলার মতো করে সরিয়ে দিয়ে রাগে হিসহিসিয়ে বলে–

—নাটক হচ্ছে রাত-দুপুরে? ব্যথা দিয়ে জিজ্ঞেস করছেন ব্যথা পেয়েছি কিনা? পুরোনো স্বভাব যায়নি দেখি এখনও।

আর আপনার সাহস দেখে অবাক হচ্ছি, মি.শেখ। একে-তো আমার বাড়িতে এমন চোরের মতো ঢুকেছেন। তারউপর আবার এমন, জোরাজোরি শুরু করেছেন। নিজের মান সম্মান খোয়ানোর ভয় বুঝি বিসর্জন দিয়েছেন? আপনি কি চাচ্ছেন, আমি সিকিউরিটি গার্ড ডেকে আপনাকে অসম্মানের সহিত বের করি আমার বাসা থেকে? ছাড়ুন আমাকে, আর বের হয়ে যান এই বাসা থেকে। না আমার মন, আর নাই বা আমার বাসায় আপনার কোন জায়গা আছে মি.শেখ।

জাওয়াদ নিজের কপাল পূর্ণতার কপালের সাথে ঠেকিয়ে ধরে আসা গলায় বলে–

—আরেকবার তাজের বাবা বলে ডাকো না জান। প্লিজ, একবার।

—আপনার মতো কাপুরুষ আর মেরুদণ্ডহীন লোককে আমি আমার সন্তানের পিতা বলেই মানি না। সম্বোধন তো দূরের থাক। তখন জিভ স্লিপ করে বলে ফেলেছিলাম।

একদম শান্ত গলায় কথা দিয়ে জাওয়াদের বুকে আঘা”ত করে পূর্ণতা। এদিকে আবার নিজেকে জাওয়াদের নিকট থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা তো রয়েছেই। জাওয়াদ এবার পূর্ণতার থেকে কিছুটা সরে আসে, কিন্তু তাকে ছাড়ে না পুরোপুরি। উল্টো তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে মুখ গুঁজে দেয়। তারপর ভাঙা ভাঙা গলায় আবদার করে–

—এই কাপুরুষ, মেরুদণ্ডহীন পুরুষকে নিজের ভালোবাসা দিয়ে সুপুরুষ তৈরি করে নাও না জান। আরেকবার ভালোবেসে দেখো, এবার ঠকবে না।

পূর্ণতা জাওয়াদের বাহু থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য হাসফাঁস করতে থাকে, কিন্তু কিছুতেই নিজেকে ছাড়াতে পারে না। তার এই অপারগতা একসময় ক্রোধের অশ্রু হয়ে বের হয়ে আসে। সে জাওয়াদের পিঠে কিল-ঘুষি দিতে দিতে বলে–

—আমি বোকা হতে পারি, কিন্তু এতটাও বোকা নই যে এক ভুল বারবার করবো। একবার ভালোবেসে আমার বাবাকে হারিয়েছি, নিজের বেঁচে থাকার কারণ হারিয়েছি, নিজেকে মানসিক রোগীতে পরিণত করেছি। সেই ভুল আবারও করার সাহস দেখাই কি করে?

আপনি জানেন, এই বিগত বছরগুলো আমি কিভাবে কাটিয়েছি? কতটা শারীরিক-মানসিকতা যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছি? আমাকে এখনও ডিপ্রেশনের মেডিসিন নেওয়া লাগে, প্যানিক অ্যাটাক হয় যখন আপনার কথা ভাবি। শুধু মাত্র আমার ছেলের জন্য আজও বেঁচে আছি। আমি চাই না ওকে একা ফেলে চলে যেতে, এত তাড়াতাড়িই ওকে এই পৃথিবীর নিষ্ঠুর বাস্তবতার সাথে পরিচিত করাতে চাই না। বাবা-মা ছাড়া পৃথিবীতে কেউ সন্তানের আপন না, সে যতই ভালোবাসার মানুষ হোক না কেনো।

আপনি চলে যান জাওয়াদ, আমাদের মা-ছেলের জীবন থেকে চলে যান। আমাদেরকে আমাদের মতো বাঁচতে দিন। আমার ছেলের জন্য আমি একাই যথেষ্ট। নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে রেখে ওকে জন্ম দিতে পারলে, বাকিটা জীবন ওকে……ও…কে….

কথা বলার মাঝেই পূর্ণতা কেমন নিশ্চুপ হয়ে যেতে থাকে। শ্বাসও কিছুটা টেনে টেনে নিচ্ছে। জাওয়াদ তাকে এমন চুপ হতে দেখে তাঁর কাঁধ থেকে মুখ উঠিয়ে পূর্ণতার মুখের দিকে তাকালে চাঁদের আলোয় দেখতে পায়, পূর্ণতার নোজ ব্লি””ডিং হচ্ছে। অতিরিক্ত হাইপারনেস ও অ্যানজাইটির কারণে এমনটা হচ্ছে তার।

জাওয়াদ আর তাঁকে কথা বলতে দেয় না। কোলে করে উঠিয়ে নিয়ে রুমে চলে আসে। বেডের মাঝ বরাবর শুয়ে দিয়ে নিজেও তার পাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–

—ঘুমাও জান। আর কথা বলো না, তোমার সকল অভিযোগ মাথা পেতে নিলাম। তোমার অসুস্থতার কারণ যেমন আমি, তোমার সুস্থতার কারণও আমি হবো। তুমি যত ইচ্ছে আমাকে দূরছাই করো না কেন, আমি এবার তোমার মন জয় করে নিবো। একদিন তুমি নিজ থেকেই আমায় তাজওয়াদের বাবা হিসেবে মেনে নিবে।

অসম্ভব মাথা ব্যথার সময় কেউ যদি একটু মাথায় হাত বুলিয়েও দেয়, তাহলে সেই সময়টাতে কতটা যে আরাম ও স্বস্তি লাগে সেটা বলে বোঝানো যাবে না। কান্নাকাটি করার কারণে পূর্ণতার আবারও মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে জাওয়াদ হাত বুলিয়ে দেওয়ায় আরামে তার ঘুম এসে উপস্থিত হয়েছে চোখের পাতায়।

পূর্ণতার ঘুমে ঢলে পড়ার আগে শেষবারের মতো আধো আধো চোখে জাওয়াদের দিকে তাকায়। তাজওয়াদ একদম অন্ধকার করা রুমে ঘুমাতে ভয় পায় বলে রাতে অল্প পাওয়ারের ডিম লাইট জ্বালিয়ে রাখতে হয় ঘরে। সেই অল্প আলোতেও পূর্ণতা স্পষ্ট দেখতে পায় জাওয়াদের ছোট ছোট চোখজোড়া অশ্রুতে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। চোখের পলক ফেলালেই গড়িয়ে পড়বে যখন-তখন। পূর্ণতা ঘুমে জড়িয়ে আসা গলায় বলে–

—আমি ভালোবাসতে ভয় পাই। ঠকা ও হারানোয় পরিপূর্ণ আমার এই জীবনে আমি আর কাউকে ভালোবাসতে চাই না। কারণ #ভালোবাসাভীষণকাঁদায়, এটাই ভালোবাসার ধর্ম।

—হুঁশশশশ!! ঘুমাও। ঘুম প্রয়োজন তোমারও, আমারও।

পূর্ণতার চোখ আর তাকে তাকিয়ে থাকার অনুমতি দেয় না। আপনা-আপনিই বন্ধ হয়ে যায় ঘুমে। পূর্ণতা ঘুমিয়ে পড়লেও ঘুমায় না জাওয়াদ। প্রতিবারের মতোই এবারও মন ভরে দেখতে থাকে তার প্রিয়তমা, তার অর্ধাঙ্গিনী, তার সন্তানের মাকে। সন্তানের কথা মাথায় আসতেই জাওয়াদ পূর্ণতার থেকে চোখ সরিয়ে পাশে শোয়া তাজওয়াদের দিকে তাকায়। ছেলেটা উল্টোপাল্টা হয়ে শুয়ে আছে।

জাওয়াদ কোমল হাতে তাজওয়াদকে এনে পূর্ণতার বাম হাতের এক বাহুতে শুয়ে দেয়। পূর্ণতা ঘুমের ঘোরেই তাজওয়াদকে জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে। বিষয়টা দেখে জাওয়াদের মলিন মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। তাদের মা-ছেলেকে মন ভরে আদর দিয়ে জাওয়াদও তার মাথা এলিয়ে দেয় পূর্ণতার অন্য খালি বাহুটিতে। মনে মনে নিজেকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, আজ এই কাজটি পূর্ণতার অসম্মতিতে করলেও, এমন একদিন ঠিক আনবে সে যেদিন পূর্ণতার সম্মতিতে সে আবারও পূর্ণতার বুকে মাথা রাখবে।


পরের দিন সকালে উঠে পূর্ণতা জাওয়াদকে না পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তারপর লেগে যায় নিজের প্রত্যাহিক দিনের কাজে। ফ্রেশ হয়ে, ব্রেকফাস্ট করে ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অফিসের উদ্দেশ্যে। পথে টনিকে আদেশ দেয়, তার রুমের বেলকনি পুরোটা গ্রিল দিতে। টনি যদিও জানে পূর্ণতা কেন এমনটা করতে বলেছে, তাও সে কোন রূপ এক্সট্রা প্রশ্ন করে না। চুপচাপ বাধ্যগত দাসের ন্যায় আদেশ পালনে লেগে পড়ে।

আরো কিছুদিন কেটে যায়। এরই মাঝে আরওয়ার চাকরিটাও হয়ে যায়। এখন পূর্ণতার অফিসের বাহিরে কোন সাইট ভিজিটিংয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লে সে তাজওয়াদকে আরওয়ার কাছেই রেখে যেতে পারে। তাজওয়াদও এতে দ্বিমত করে না।

পুরো দিন পেরিয়ে প্রায় বিকেল হয়ে যাওয়ার পরও তাজওয়াদ যখন মায়ের দেখা পায় না, তখন তার ছোট হৃদয়ে মন খারাপের মেঘ জমতে শুরু করে। সেই মেঘ আস্তে আস্তে বর্ষণের রূপ নেয়। রেস্ট রুম থেকে বেরিয়ে কাজে মগ্ন আরওয়ার কাছে গিয়ে তার শাড়ির আঁচল ধরে টানতে থাকে।

আরওয়া হাতের ফাইল থেকে চোখ উঠিয়ে তাজওয়াদের দিকে তাকালে বেশ অবাক হয়ে যায় তার ভেজা চোখ দেখে। ফাইলটা বন্ধ করে পাশে রেখে তাজওয়াদকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে আদুরে গলায় সুধায়–

—কি হয়েছে আমার তুলতুল বাচ্চাটার? চোখে এত এত পানি কেন আসলো তার?

তাজওয়াদ নাক টানতে টানতে অস্পষ্ট সুরে বলে–

—তাজওয়াদ মিস মাম্মা, আন্টি। মাম্মা কুতায়? সেই সকালে গিয়েছে, এখনও আসলো না। কি এমন সালপ্লাইজ নিতে গিয়েছে? আমাল লাগবে না কোন সালপ্লাইজ, তুমি মাম্মালে ফুন দিয়ে বলো তালাতালি আচতে। তাজওয়াদেল একুন কান্না পাচ্চে।

আসলে পূর্ণতা আজও সাই ভিজিটিংয়ের জন্য গিয়েছে।সেখান থেকে ফেরার সময় তাজওয়াদের জন্য সারপ্রাইজ আনবে বলেছে, তাই এত দেরি হচ্ছে। আজ তাজওয়াদ স্কুলও যায়নি এই গিফট দেখার চক্করে।

তাদের কথার মাঝেই পূর্ণতা কেবিনে প্রবেশ করে হাস্যজ্জ্বোল গলায় বলে–

—মাম্মা এতসময় লাগিয়ে তাজওয়াদের জন্য সারপ্রাইজ আনলো, আর সে কিনা এখন বলছে সারপ্রাইজ লাগবে না। কি আর করার! তাহলে সারপ্রাইজকে বলি চলে যেহেতু তাজওয়াদ নিজেই তাকে রিজেক্ট করে দিচ্ছে ।

মায়ের কণ্ঠস্বর শুনে তাজওয়াদ পেছনে ফিরে তাকায়। পূর্ণতাকে দেখতে পেয়ে সে তড়িৎ গতিতে আরওয়ার কোল থেকে নেমে ছুটে মায়ের কাছে গিয়ে তার কোমড় জড়িয়ে ধরে। পূর্ণতা ছেলের মন খারাপী বুঝতে পেরে হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসে তাকে জড়িয়ে ধরে। সে যখন তাজওয়াদকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, তখনই একটা পুরুষালি গলা বলে ওঠে–

—ওওওএমমমজিিি! তাজওয়াদ নাকি আমাকে দেখতে রিজেক্ট করে দিয়েছে। উপারওয়ালে উঠালে মুঝে।

বেশ নাটুকে ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে পুরুষটি। তাজওয়াদ বহুদিন পর আরেকটি পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে মায়ের বুক থেকে মুখ তুলে তাকালে নিজের অতিব প্রিয় একজন মানুষকে দেখতে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। সে পূর্ণতাকে ছেড়ে দিয়ে সেই পুরুষটির কাছে গিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ভীষণ উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে–

—বাবাইইইইই! সত্যি তুমি এচেচো???

—ইয়েস মাই প্রিন্স, তোমার টানে অবশেষে চলেই আসলাম।

তাজওয়াদকে কোলে তুলে ঘুরাতে ঘুরাতে কথাটা বলে যুবকটি।

টনি একটু দূর থেকে তাজওয়াদ ও সেই পুরুষটির উচ্ছ্বসিত মূহুর্তের ছবি তুলে জাওয়াদের নাম্বারের সেন্ড করে দেয়। সেই সাথে ছোট্ট একটা টেক্সট করে–

—আপনাড সতীন এসে পড়েছে জাওয়াদ স্যার।

জাওয়াদ তখন মাত্র একটা মিটিং শেষ করে বেরিয়েছিলো। নিজের কেবিনে এসে রেস্ট নিচ্ছিলো, তখনই টনির মেসেজের আওয়াজে চোখ মেলে তাকায়। ফোনটা হাতে নিয়ে মেসেজটা চেক করতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। ছোট ছোট চোখজোড়ায় অপ্রাপ্তি ও রাগ দুয়েরই প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

টনির পাঠানো ছবিটা দেখে জাওয়াদের বুকে চিনচিনে ব্যথার সৃষ্টি হয়। ছবিটাতে স্পষ্ট দেখতে পায়, তাজওয়াদ সেই সুদর্শন লোকটির কোলে চড়ে আনন্দে আত্মহারা, তাদের থেকে কয়েক কদম দূরে পূর্ণতা হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তাজওয়াদ ও সেই অচেনা যুবকটিকে হাসতে দেখেই পূর্ণতার এই হাসি। অন্য কোন পুরুষের জন্য পূর্ণতার মুখে হাসি ফুটেছে ব্যাপারটা অনুধাবন করতে পেরে, জাওয়াদের হৃদপীড়া আরো বেড়ে যায়।

সে ছবিটির দিকে তাকিয়ে ভাবে–

—আমার এক বউয়ের পেছনে আর কত শকুন যে লাগবে, উপরওয়ালাই ভালো জানেন। প্রথমে, তৌফিক। এখন আবার এই শালা। উফফফফফ! সুন্দরী বউ থাকলে সেই লোকের প্রেশার বোধহয় আমার মতোই হাই হয়ে থাকে চিন্তায়।

জাওয়াদ টনিকে তৎক্ষনাৎ ফোন লাগায়। দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য টনি মাত্রই অফিসের ক্যান্টিনে এসে বসেছিলো। জাওয়াদের ফোন দেখে টনির নিজের উপরই ভীষণ মায়া হয়। এরা বউ-জামাই তাকে একটু শান্তি মতো খেতেও দেয় না। দুই পায় দিয়েই চাপের উপর থাকতে হয়।

টনি ফোনটা ধরে সালাম দিলে, জাওয়াদ সালামের জবাব নিয়েই জিজ্ঞেস করতে থাকে–

—কে এই শালা? আর আমার সতীন বলছো কেনো? ওর সাথে পূর্ণতা আর তাজওয়াদের এত গভীর সম্পর্ক কেনো? এ টু জেড সব বলো।

টনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করে–

—ছবিতে দেখানো পুরুষটি হলো, ম্যামের মায়ের বান্ধবী ডা.মিতু রহমানের ছেলে, ডা.নওশাদ রহমান। কানাডায় এর কাছেই গিয়েছিল ম্যাম। ম্যামের বান্ধবী আর ডা.মিতু খুবই ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিলেন। ম্যামের মাকে বাসা থেকে পালিয়ে এসে ম্যামের বাবাকে বিয়ে করতে ইনিই সাহায্য করেছিলেন। পরবর্তীতে ম্যামের মা মারা যাওয়ার পর ডা.মিতুই উনার মেডিকেল সমস্যা গুলো দেখতেন।

ম্যাম একবার আমায় বলেছিল, ছোট বেলায় নাকি ডা.মিতু ও ম্যামের মা তার ও নওশাদ ভাইয়ের বিয়ে দিবেন বলে ঠিক করেছিল। দুই বান্ধবীর সম্পর্কটা আরেকটু মজবুত করার জন্যই ছিলো এই সিদ্ধান্ত। ম্যামের বাবাও নাকি রাজি ছিলো। কিন্তু পূর্ণতা ম্যামের ৮বছর বয়সের যখন বড় ম্যাম মা””রা গেলেন, তারপর থেকে ম্যাম অনেক জেদি, রাগী, আর অবাধ্য হয়ে যেতে লাগলেন। এই অবাধ্যতার জেরেই ২২বছর বয়সে আপনাকে গিয়ে বিয়ে করলেন। প্রিয়তমা স্ত্রীর শেষ ইচ্ছে পূরণ না করতে পারায়, ম্যামের বাবা এই বিষয়ে বেশ আপসেট ছিলেন। তারউপর আপনার আর উনার সম্পর্কের জটিলতা। সব মিলিয়েই স্যারের শারীরিক ও মানসিক উভয়ের উপরই বড় প্রভাব ফেলে।

ম্যাম আপনাকে বিয়ে করার পরও ডা.মিতু তার খোঁজ খবর রাখতেন। তাই একসময় আপনার থেকে কষ্ট পেয়ে সে যখন একদমই একা হয়ে গেলো, তখন ছুটে গিয়েছিল ডা.মিতুর কাছে। উনি অবশ্য তাকে ফিরিয়ে দেননি। গোপনীয়তা বজায় রেখেই তাকে কানাডা চলে যেতে সাহায্য করেন। কানাডায় ম্যামের রক্ত সম্পর্কীয় কেউ নেই। একমাত্র নওশাদ ভাই তাকে এই পাঁচ বছর ছায়ার মতো আগলে রেখেছিলেন।

লম্বা বক্তব্য শেষে টনি একটা হাফ ছাড়ে। জাওয়াদ এই পুরোটা সময় মন দিয়ে টনির কথাগুলো শুনেছে। কথা শেষ করে কলটা আনমনেই কেটে দিয়ে ভাবতে বসে।

—তারমানে সেদিন এইজন্যই পূর্ণতা বাবাই মানে নওশাদকে আমার সতীন বলছিলো। না, না। যে করেই হোক এই নওশাদকে পূর্ণতা আর তাজওয়াদের থেকে দূরে দূরে রাখতে হবে। এমনিতেই বউ রেগে বো–ম হয়ে আছে, তারউপর যদি এই শালা কোন মতে পটিয়ে ফেলে আমার বউকে, তাহলেই হলো।

নওশাদকে কিভাবে পূর্ণতাদের থেকে দূরে রাখবে সে চিন্তায় জাওয়াদের মাথা ঘুরতে থাকে।

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন।]

শব্দসংখ্যা~২৩০০

চলব?

[সকলে রেসপন্স করবেন আশা করি। অন্তত একটা হলেও কমেন্ট করিয়েন।🥹 অনেক অসুস্থতা নিয়েও বড় করে দিলাম।

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply