শেষ পাতায় সূচনা [৩৭]
সাদিয়াসুলতানামনি
দীর্ঘ সাত দিনের বিজনেস ট্যুর দিয়ে আরিয়ান ফেরে। এবারও আসার সময় আঞ্জুমানকে নিয়ে আসে। ছেলে বিদেশ সফর থেকে ফিরে এসেছে বলে অজান্তা বেগম অনেকদিন পর কিচেনে ঢুকে ছেলের পছন্দের খাবারগুলো রান্না করতে থাকেন। তার হাতে হাতে কাজ করছে আঞ্জুমান।
আঞ্জুমানকে অজান্তা বেগম একটুও সহ্য করতে পারেন না। কেন যেন তার বিচক্ষণ দৃষ্টি তাকে বলে, আঞ্জুমানের মিষ্টি মিষ্টি কথা, তাদের সাথে এত তাড়াতাড়ি মিশে যাওয়া এসবই তার লোক দেখানো। মন থেকে করছে না সে এসব। কিন্তু তার এটা কেন মনে হয় সে সেটা নিজেও জানে না। এছাড়া আরো একটি কারণ আছে, সেটা হলো আঞ্জুমানের স্টেটাস। আঞ্জুমানের পরিবারের আর্থিক অবস্থা তাদের মতো হাই না বলে সে তাকে দেখতে পারে না। কিন্তু ছেলের ভালোবাসার মানুষ বলে কিছু বলতেও পারে না।
রাতে তারা সবাই একসাথে খাওয়াদাওয়া করে ড্রয়িংরুমে এসে বসে সকলে একসাথে কিছু সময় আড্ডা দেওয়ার জন্য। পূর্ণতাই প্রথমে আরিয়ানকে জিজ্ঞেস করে–
—মিটিং কেমন হলো ভাইয়া? ডিলটা পাওয়ার সম্ভাবনা কেমন?
আরিয়ান একগাল হেঁসে বলে–
—আলহামদুলিল্লাহ বেশ ভালো হয়েছে। আর সম্ভাবনা কি ধর পেয়েই গিয়েছি। তাদের আমাদের প্রজেক্ট এত ভালো লেগেছে যে, তারা ভীষণ আগ্রহ প্রকাশ করেছে আমাদের সাথে কাজ করার।
সকলে বেশ খুশি হয় আরিয়ানের কথা শুনে। আহনাফ সাহেব বলেন–
—আমি জানতাম তুমি আমার ভরসা বিফলে যেতে দিবে না। আ’ম প্রাউড অফ ইউ মাই সান।
এরপর তারা অন্যান্য বিষয়ে টুকটাক কথা বলতে থাকে। কথা বলতে বলতেই আরিয়ান খেয়াল করে তার বাবা পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে ইশারা কিছু বলছে আর পূর্ণতা মানা করছে। তাদের এমন ইশারায় কথা বলতে দেখে আরিয়ান জিজ্ঞেসই করে বসে–
—কি হয়েছে বাবা? তুমি আর বোনু এমন ইশারায় কি বলছো? আমাদেরও বলো, আমরাও শুনি।
ধরা পড়ে যাওয়ার পরও আহনাফ সাহেবের মাঝে একটুও বিচলিতা দেখা গেলো না। বরং সে শান্ত গলায় বলে–
—পূর্ণ মা তোমাকে কিছু বলবে আরিয়ান।
আরিয়ান এবার পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে বলে–
—কি বলবি বল বোনু। আমার সাথে এত সংকোচ, লুকোচুরি কিসের?
পূর্ণতা নড়েচড়ে বসে। তারপর শান্ত গলায় বলে–
—আমি তোমাকে বলতামই ভাইয়া, আজ তুমি টায়ার্ড ভেবে বলিনি। আচ্ছা শুনো, তোমার উপর ভরসা করেই আমি আমার বাবার হাড়ভাঙ্গা খাটুনির বিনিময়ে দাঁড় করানো এই বিজনেস কোন দ্বিধা ছাড়াই তোমার হাতে রেখে চলে গিয়েছিলাম। আর আমিও এই ভরসার মূল্য পেয়েছি। কিন্তু একটা জায়গায় কিছু সমস্যা পেয়েছি।
আরিয়ান শান্ত হয়ে এতক্ষণ সবটা শুনে। কিন্তু সমস্যার কথা শুনে সে বিচলিত হয়ে যায়। সে অস্থির গলায় বলে–
—কি সমস্যা? আমায় আগে কেন বলিস নি?
—বলতে চেয়েছিলাম। ভাবলাম আমারই হয়ত বুঝায় ভুল হচ্ছে তাই নিজ থেকেই বিষয়টা হ্যান্ডেল করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু হিসাব বারবারই গড়মিল খেয়ে যাচ্ছে। তাই এখন তোমায় না বললেই নয়।
—কোন হিসাবে গড়মিল খেয়ে যাচ্ছে? আমি গত পাঁচ বছরের সব হিসাব ম্যানেজারকে বুঝিয়ে দিয়েছি তো।
—তা দিয়েছো। কিন্তু ষাট লক্ষ টাকার হিসাবটা বুঝিয়ে দাওনি তো।
ষাট লক্ষ টাকার কথা শুনে ভয়ে মিসেস আহমেদের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। সে বুঝতে পেরে যায় আজ হাঁটে তার গোপন হাড়ি ভাঙতে চলেছে। সে ভয়ে সেখান থেকে কেটে পড়তে চায়, তখনই আহনাফ সাহেব বলেন–
—অজান্তা কোথায় যাচ্ছো?
অজান্তা বেগম আমতা আমতা করে বলেন–
—অনেক ঘুম পাচ্ছে গো। আমি গেলাম শুতে, তোমরা কথা বলো।
—একটু শুনেই যাও পুরোটা। বসো চুপচাপ।
স্বামীর শান্ত গলায় করা নির্দেশ অমান্য করতে পারে না অজান্তা বেগম। চুপচাপ বসে পড়েন। পূর্ণতা নিজের ফোনটা ঘেটে হিসাবের ফাইল থেকে তোলা ছবিটা বের করে আরিয়ানের দিকে দিয়ে বলে–
—এই ষাট লাখ টাকার কোন সুষ্ঠ হিসাব নেই ভাইয়া। কিন্তু কেনো? এক-দুই লাখ হতো আমি এতটা আমলে নিতাম না বিষয়টা, কিন্তু ষাট লাখ কম কথা না ভাইয়া।
আরিয়ান ছবিটা ভালো করে খেয়াল করে দেখে ভাবনায় পড়ে যায়। একাউন্টন হোল্ডার হিসেবে তাকে দেখাচ্ছে। কিন্তু তার তো মনে পড়ছে না সে কখনোই এত বড় বড় এমাউন্ট আহমেদ গ্রুপের একাউন্ট থেকে নিয়েছে। টেনশনে পড়ে যায় সে। কিভাবে হিসাব মিলাবে? যদি সে সঠিক হিসাব না দিতে পারে, তাহলে তার বোনের ভরসার অপমান করা হবে। যতই পূর্ণতা তাকে ভাই হিসেবে টাকার বিষয়টা নজরে না করুক, তার মনেই কেমন খচখচ করবে।
আরিয়ান মাথায় একটু চাপ দেয়। টাকার সংখ্যা গুলো দেখে তার মনে পড়ছে কিছু কিছু ঘটনা। হঠাৎই তার মনে পড়ে যায়, এসব টাকা তার মা তার ছোট বাবা ও ছোট মায়ের নামে প্রত্যন্ত গ্রামে একটা মাদ্রাসা ও মসজিদ করবে বলে নিয়েছে। সে ফট করে বলে–
—বোনু, এসব টাকা তো আম্মু ছোট বাবা ও ছোট মায়ের নামে মাদ্রাসা ও মসজিদ করবে বলে নিয়েছিল।
সকলের আরিয়ানের এহেন কথা শুনে অবাক হয়ে যায়। কিন্তু পূর্ণতা একটুও হয় না। হবেই বা কেনো? মিথ্যাে শুনে অবাক হওয়ার কোন মানেই নেই। আহনাফ সাহেব বলেন–
—কি ব্যাপার অজান্তা, এসব আবার তুমি কবে করলে? আমার ভাই ও ভাইয়ের বউয়ের জন্য মাদ্রাসা মসজিদ দিতে টাকা নিয়েছো কিন্তু আমাকে জানানোর প্রয়োজন অব্দি করলে না?
অজান্তা বেগম এবার চূড়ান্ত পর্যায়ে ঘাবড়ে যান। সকলের দৃষ্টি তার দিকেই তাক করে রাখা হয়েছে। আজ যে তার সব মিথ্যের পর্দা উঠতে চলেছে তা সে বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন। সে ইতিউতি করতে থাকে ব্যাপারটা টলানোর জন্য।
পূর্ণতা তার বড় মায়ের দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলে–
—বড় বাবা, বড় মা হয়ত আমাদের সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছে বলে বলেনি। সে যাইহোক, চলো কাল আমরা সকলে গিয়ে দেখে আসি মাদ্রাসা ও মসজিদটা।
এবার পুরো বাঁশঝাড় এসে পড়ে অজান্তা বেগমের মাথার উপর। তিনি তো এসবের কিছুই করেন নি, তাহলে দেখাবেন কি? মূলত এই টাকা গুলো দিয়ে সে বেহিসাবি ভাবে খরচ করেছেন ও একটা জায়গা কিনে সেখানে খামার দিয়েছেন। এসব করেছেন ভালো কথা, কিন্তু পূর্ণতার সম্পত্তি থেকে কেন করবেন? তার স্বামীর হয়ত পূর্ণতার তো এত বড় কোম্পানি নেই, কিন্তু আহনাফ সাহেবেরও টাকা পয়সা কম নেই। কিনে আবার কত বড় মিথ্যে বলেছেন সকলকে।
পূর্ণতা এবার ভাবে, অনেক ঠাট্টা-তামাশা হয়েছে। এবার একশনে আসার সময়। সে সেখান থেকে উঠে ছেলেকে নিয়ে নিজের রুমে চলে আসে। তাজওয়াদকে ফোনে কার্টুন ছেড়ে দিয়ে তারপর একটা ফাইল নিয়ে পুনরায় নিচে নেমে আসে। ফাইলটা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে–
—বড় মা এই টাকা গুলো দিয়ে কোন মাদ্রাসা বা মসজিদ বানায়নি, বরং এগুলো বেহিসাবি খরচ করেছে আর ঢাকার বাহিরে খামার করেছে। কিছুদিন আগে আমার এক পুরোনো ক্লাইন্টের মাধ্যমে এটা আমি জানতে পেরেছি। মূলত সেই জায়গাটা আমার ক্লাইন্টেরই ছিলো।
আরিয়ান ফাইলটা হাতে নিয়ে দেখে, জায়গার দলিল। পূর্ণতার ক্লাইন্ট যে জায়গাটা অজান্তা বেগমের কাছে বিক্রি করেছে তার দলিল। আহনাফ সাহেব ছেলের হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে নিজেও দেখেন। পূর্ণতার কথার সত্যতা পেয়ে তিনি প্রচন্ড রেগে যান। রাগে গর্জিয়ে উঠে বলেন–
—এত মিথ্য, এত মিথ্যে তুমি কিভাবে বলো অজান্তা একটু বলো তো? মিথ্যা বলার আগে তোমার মুখ কাঁপে না? তুমি মাদ্রাসা ও মসজিদ বানানোর কথা বলে টাকা নিয়ে এসব করেছো? তোমার নৈতিকতার কত অধঃপতন ঘটেছে তুমি বুঝতে পারছো? ছিঃ ছিঃ! লজ্জায় আমি পূর্ণতার সাথে চোখ মেলাতে পারছি না।
অ্যাঁই, আমার কি কম আছে যে তোমার বারংবার আমার ভাইয়ের সম্পত্তির দিকে হাত বাড়াতে হবে? বলো, কম আছে আমার?
ধমকে কথা গুলো বলেন মি.আহনাফ। পূর্ণতা তার বড় বাবাকে শান্ত করতে বলে–
—বড় বাবা শান্ত হয়ে বসো। এত হাইপার হয়ো না, শরীর খারাপ করবে তোমার।
—হাইপার না হয়ে উপায় আছে বল? তুই আমাদের একটা আমানত দিয়ে গিয়েছিস, এই মহিলার কারণে সেটার খেয়ানত হয়েছে। ওর খামার করার শখ আমায় বলতে পারত, কিন্তু না। ও শুধু সারাটা জীবন অন্যের জিনিসের প্রতিই লোভ করে গেলো।
লজ্জায়, অপমানে অজান্তা বেগমের মুখ একটু খানি হয়ে যায়। আঞ্জুমান এতক্ষণ অবাক চোখে সবটা দেখছিলো। হঠাৎই সে খেয়াল করে আরিয়ান তাকে চোখ দিয়ে ইশারা করে সেখান থেকে চলে যেতে বলছে। আঞ্জুমানের যদিও ইচ্ছে ছিলো সবটা দেখার, তাও সে উঠে চলে যায়। কিন্তু দ্বিতীয় তলায় গিয়ে করিডরের একটা পিলারের পেছনে লুকিয়ে থেকে সবটা দেখতে থাকে ডাইনিটা।
পূর্ণতা আহনাফ সাহেবের হাত ধরে বসিয়ে দেয় সোফার উপর। তারপর এক গ্লাস পানি এনে তাকে খেতে দেয়। পানিটা খাওয়ার পর পূর্ণতা শান্ত গলায় বলে–
—এত ভেবে নিজের প্রেশার বাড়িয়ে ফেলো না তো বড় বাবা। তুমি তো জানোই, বড় মা যেই টাকাটা খচর করেছে তাতে বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে এক পার্সেন্টও হবে না খরচ হয়েছে। আমি এসবের হিসাব চাইছি , কারণ আমি যেন মৃত্যুর পর বাবাকে তার পরিশ্রমে অর্জন করা এক একটা পয়সার হিসাব বুঝিয়ে দিতে পারি।
পূর্ণতার এহেন কথা শুনে আঞ্জুমানের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। সে আনমনেই বিরবিরিয়ে বলে–
—এতগুলো টাকা খরচ করার পরও নাকি মোট সম্পত্তির এক পার্সেন্টও খরচ হয়নি। তাহলে এর মোট সম্পত্তির পরিমাণ কতো?
আঞ্জুমানের ভাবনার বাহিরে পূর্ণতা মালিকানাধীন সম্পত্তির পরিমাণ। পরিশ্রমিদের অর্থ কখনো ফুরোয় না, কিন্তু যারা অলস, কাজ করতে এতটা ভালোবাসে না তাদের অর্থ-সম্পত্তি এক না একসময় ফুরিয়ে যায় ঠিকই। পূর্ণতা পরিশ্রম করা শিখেছে তার বাবার কাজ থেকে। বুঝ হওয়ার পর থেকে দেখেছে, তার বাবা কখনো কাজ ফেলে রেখে বসে থাকেনি। বাবার দেখাদেখি একসময় পূর্ণতাও ভীষণ পরিশ্রমি হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে তাদের ক্রমাগত সফলতা এনে দিতে দিতে আজ ঢাকার বুকে সিনা টান করে দাঁড় করিয়েছে আহমেদ গ্রুপ অফ ইন্ড্রাস্ট্রিকে।
আহনাফ সাহেব অজান্তা বেগমকে কিছুই বলতে চেয়েও বলেন না আর। আসলে সে কথা বলার রুচি পাচ্ছে না এই মিথ্যােবাদী মহিলার সাথে। তিনি পূর্ণতাকে তখনই টাকাটা ফিরিয়ে দিতে চাইলে পূর্ণতা টাকাটা নিতে নাকচ করে দেয়। কিন্তু আহনাফ সাহেবের অসম্ভব জোড়াজুড়ির কারণে পূর্ণতা পরবর্তীতে টাকাটা নিয়ে বাধ্য হয়। সেদিনের মতো সবটা মিটমাট হয়ে গেলোও অজান্তা বেগমের মন পূর্ণতার জন্য আরো বিষিয়ে যায়। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে আজকের এই ঘটনার জন্য পূর্ণতাকে একদিন সে চরমভাবে কাঁদাবে।
পরের দিন পূর্ণতা অফিসে এসেই জানতে পারে, তাদের কোম্পানির জন্য একটি বড় ডিলের প্রস্তাব এসেছে।
আহমেদ গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রি মূলত একটি মাল্টি-সেক্টর ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। শহরের সরকারি ভবন থেকে শুরু করে কর্পোরেট স্থাপনা , সর্বত্রই তাদের পদচারণ রয়েছে।
এই ডিলটা মূলত ঢাকার শহরের দুটি নামকরা ক্লোদিং ব্র্যান্ড পক্ষ থেকে এসেছে। তারা যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অভিজাত তিনটি এলাকায় তিনটি শো-রুম স্থাপন করবে। এই শো-রুমগুলোর জন্য উপযুক্ত লোকেশন নির্বাচন থেকে শুরু করে নকশা, নির্মাণ এবং সম্পূর্ণ ডেভেলপমেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আহমেদ গ্রুপের ওপর। এতদিন পর এত বড় একটা ডিলের প্রস্তাব পেয়ে পূর্ণতা বেশ এক্সাইটেড হয়ে পরে কাজটার জন্য।
পূর্ণতার নতুন ক্লায়েন্টরা তাকে পরেরদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। পূর্ণতা মিটিংয়ের বিষয়ে সম্মতি দিতেই তার পি.এ ই-মেইল করে জানিয়ে দেয়। পূর্ণতার পক্ষ সম্মতিসূচক ই-মেইল দেখে জাওয়াদের ঠোঁটের কোণে হাসি দেখা দেয়।
সন্ধ্যায় পূর্ণতা ছেলেকে নিয়ে বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে কিচেনে এসে দেখে আঞ্জুমান পূর্বে থেকেই সেখানে উপস্থিত রয়েছে আর সেও রান্না করছে। গরুর গোস্তের কালা ভুনা, গরম ভাত, ঘন করে ডাল, সবজি আর সালাদ। এই হচ্ছে আজ রাতের মেন্যু।
পূর্ণতা সম্পূর্ণ তাকে ইগনোর করে মালতি কাকীকে বলে–
—রুই মাছ বের করে ভিজিয়ে দাও না গো কাকী। আমি ততক্ষণে সবজি কেটে নিচ্ছি।
মালতি কাকী এক গাল হাসি নিয়ে বলে–
— সারাদিন অফিস কইরা ক্লান্ত হইয়া আছো না আম্মা? তুমি রেস্ট নাও গিয়া। আমি রান্তাছি তুমাগো খাওন।
পূর্ণতা ফ্রিজ থেকে সবজির ঝুড়ি নামাতে নামাতে বলে–
—মায়েদের আবার ক্লান্তি আছে নাকি কাকী? তারা চব্বিশ ঘন্টা কাজ করলেও সন্তানের মুখের দিকে তাকালে নিজের সকল ক্লান্তি ভুলে যায়। ছেলেটার কাল মাছের তরকারিটা ভীষণ পছন্দ হয়েছে, তাই আজ আবারও খাওয়ার আবদার জানিয়েছে। ওর আবদার পূরণ না করা অব্দি আমি নিজেই স্বস্তি পাবো না।
মালতি কাকী আর পূর্ণতা এমন ভাবে কথা বলছে যেন তারা দু’জন ব্যতীত আর কেউ নেই কিচেনে। আঞ্জুমান তরকারির জাল কমিয়ে দিয়ে পূর্ণতার কাছে এসে তার হাত থেকে ছু””ড়ি নিয়ে বলে–
—তুমি গিয়ে একটু বসে রেস্ট নাও, আমি কেটে দিচ্ছি।
আঞ্জুমানের এই আলগা দরদ পূর্ণতার সহ্য হয় না। সে ঝটকা দিয়ে সবজি কা””টার ছু””ড়িটা তার হাত থেকে নিয়ে কর্কশ গলায় বলে–
—আপনাকে আমি বলেছি আমার কথা ভাবতে? নিজের চরকায় তেল দিন। নিজের কথা ভাবুন।
—তুমি এমন করে কথা বলছো কেনো আমার সাথে? কি দোষ আমার? এসেছি পর থেকেই এমন আচরণ করছো?
এবার পূর্ণতা ভয়াবহ ভাবে রেগে যায়। সে রেগে হিসহিসিয়ে বলে–
—ওয়াও! কি এক্টিং মাইরি আপনার! ওহ্হ, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম আপনার গুরু কে। সরি সরি। কিন্তু আপনার অভিনয়ের প্রশংসা না করে আর পারলাম না। পাঁচ বছরে বেশ ভালোই উন্নতি করেছেন অভিনয়ে। আগের থেকেও বেশ ভালোই গোবেচারা সাজতে পারেন। তা কোন এক্টিং টিম জয়েন করেছেন নাকি? কোন প্রডিউসারের খোঁজ দিবো? আমার হাত আবার অনেকদূর পর্যন্ত আছে। লাগলে নির্দ্বিধায় বলবেন ভাবীইইইইইই…..
“ভাবী” সম্বোধনটা একটু টেনেই বলে পূর্ণতা। আঞ্জুমান এবার চোখে পানি নিয়ে এসে পূর্ণতা দুইহাত জড়িয়ে ধরে বলে–
—আমি আমার পূর্বের কৃতকর্মের জন্য সত্যিই লজ্জিত। প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও। আমি এখন ভালো হয়ে গিয়েছি, আর তোমার ভাইকে সত্যিই মন থেকে ভালোবাসি।
—আমার হাসবেন্ডকেও বাসতেন মন থেকেই। যার বদৌলতে আমার সন্তান আজ তার পিতা বিহীন বড় হয়ে উঠছে।
পূর্ণতার কথা শুনে মালতি কাকী ভয়াবহ রকমের চমকে যায়। সেই সাথে কিচেনের বাহিরে থাকা আরেকটা ছায়ামূর্তিও। কিন্তু তার চমকানো ভাবটা কিছু সময়ের মাঝেই সরে গিয়ে সেখানে ঠায় নেয় কুটিলতা।
আঞ্জুমান অপরাধী গলায় বলে–
—সেই অপরাধের বোঝা আমি আজও বয়ে বেড়াচ্ছি। সেই ঘটনা আমার পুরো জীবন বদলে দিয়েছে। আমার পরিবার থেকে আমি একপ্রকার বিতাড়িত হয়েছি। এই পাঁচটা বছর আমি প্রকৃত অর্থে এতিমের মতো বেঁচে আছি। বিশ্বাস করো তোমার ভাইয়ের সাথে সম্পর্কে যাওয়ার পর থেকে আমি কতবার তার মাধ্যমে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছি কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছি। আমাকে প্লিজ মাফ করে দাও পূর্ণতা ভাবী।
পূর্ণতা ঝটকা দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে–
—আপনাকে আর মাফ? আপনাদের মাফ করলে আমার নিজের রুহের উপর জুলুম করা হয়ে যাবে। তোমরা সকলে আমার সাথে যেই অন্যায় করেছে, তার জন্য তোমাদের শাস্তি আমি দিবো না ঠিকই, কিন্তু আমার আল্লাহ দিবেন। সংসার করতে এসেছো সংসার করায় মন দাও। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো অন্য একটা মেয়ের সংসার ভেঙে দিয়ে কেউ কখনো নিজের সংসার সাজাতে পারেনি।
আঞ্জুমান পূর্ণতার কথা শুনে নিচের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলতে থাকে। পূর্ণতা মালতি কাকীকে বলে আঞ্জুমানের রান্না হয়ে গেলে সে যেন পূর্ণতাকে ডেকে দেয় রান্নার জন্য। তারপর কিচেন থেকে বের হয়ে নিজের রুমে চলে যায়। পূর্ণতা কিচেন থেকে বের হওয়ার আগেই সেই ছায়ামূর্তি সেখান থেকে চলে যায়।
নিস্তব্ধ একাকী রাতে কলমের খসখস আওয়াজ তুলে আরওয়া ডায়েরিতে লিখে–
—যাদের আমরা বুকের গভীরে আশ্রয় দিই, দিনের শেষে তারাই সবচেয়ে অনুপস্থিত থাকে আমাদের ভাগ্যে।
বিষণ্ন মন নিয়ে আরিয়ান বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। আজ এতদিন পর বাড়ি ফিরল, কিন্তু ফেরার পর নিজের মায়ের এমন কাজে তার মনটা ভীষণ ভর হয়ে আছে। হঠাৎই একজোড়া নরম হাত এসে তাকে পেছন থেকে আঁকড়ে ধরে। হুট করে এমনভাবে জড়িয়ে ধরায় আরিয়ান কিছুটা হকচকিয়ে যায়। কিছুটা সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে হাতের মালিককে পেছন থেকে সামনে আনে। কিন্তু কিছু বলে না, চুপচাপ আগের মতোই দাড়িয়ে থাকে। আরিয়ানকে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আঞ্জুমান বলে–
—মন খারাপ?
আরিয়ান পাল্টা প্রশ্ন করে বলে–
—খারাপ না হওয়ার কথা ছিলো কি? নিজের মায়ের এমন ছলচাতুরী জানলে কার মন খারাপ হবে না বলো?
আঞ্জুমান তার কাছে আরেকটু ঘেঁষে এসে আবেদনময়ী ভাবে বলে–
—চলো তাহলে রুমে, তোমার মনটা ভালো করে দেই।
আরিয়ান এবারও তাট হাত নিজের গলা থেকে ছাড়িয়ে বলে–
— আজ না। ভীষণ ক্লান্ত আমি শারীরিক ও মানসিক উভয় ভাবেই। চলো ঘুমাতে যাই।
আঞ্জুমান শুধু “হুম” বলে হনহনিয়ে রুমে গিয়ে নিজের জায়গা গিয়ে শুয়ে পরে। আরিয়ান তার প্রস্থানের পথে তাকিয়ে ভাবতে থাকে–
— বিয়ের পর থেকে রুহীকে আমার এত কেন অচেনা লাগছে? একবছর আগেও তো এত লাজ হীন ছিলো না। একটু কিছু বলতেই লজ্জাবতী পাতার ন্যায় নুইয়ে পড়তো। কিন্তু স্ত্রী রুহী আর প্রেমিকা রুহী একদমই ভিন্ন মানুষ। ফোনের অপর পাশে মানুষটা সামনে আসার পর এত পরিবর্তন লাগছে কেন আমার কাছে?
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে, আপনার গল্পপ্রেমী বন্ধুমহলের নিকট পৌঁছে দিন ]
শব্দসংখ্যা~২৩৭১
~চলবে?
[কি আজকের পর্ব পড়ে কিছুটা ক্লিয়ার হলেন তো? এক পর্বেই যদি সব জানতে চান, তাহলে দুঃখিত। আস্তে আস্তে সবটা ক্লিয়ার হবে, আর আঞ্জুমানও যথাযথ শাস্তি পাবে।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৮