শেষ পাতায় সূচনা [৩৬]
সাদিয়াসুলতানামনি
বেডসাইড টেবিলের উপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে পাওয়ার অন বাটন প্রেস করে সময় দেখে নেয় পূর্ণতা। তিনটা বাজতে আর তিন মিনিট বাকি আছে। এত রাত হয়ে গিয়েছে অথচ আজ তার এখনও ঘুম আসছে না। ঘুম আসবেই বা কীভাবে আজ যে সে স্লিপিং পিল নেয় নি। তার কানাডার ডাক্তারের সাথে কাল কথা হয়েছিল। বাংলাদেশ আসার আগে পূর্ণতা তার হেল্থ টেস্ট করে এসেছিল। সেই রিপোর্টগুলো দেখে তার ডাক্তার বলেছে, আস্তে আস্তে স্লিপিং পিল ছাড়া ঘুমানোর চেষ্টা করতে। কারণ এটা তার রক্তের সাথে মিশে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আর স্লিপিং পিল দিয়ে ঘুমালে পরবর্তী এটা একসময় ড্রাগের মতো হয়ে যাবে। তখন এটা ছাড়া অচল হয়ে যাবে পূর্ণতা। তাই এখন থেকেই স্লিপিং পিল ছাড়ার অভ্যাস করতে বলেছে।
ডাক্তারের কথা মোতাবেক আজ পূর্ণতা ঘুমের ঔষধ খায় নি, এজন্য এখনও জেগে রয়েছে সে। মাথাটাও কেমন চিনচিন করে ব্যথা শুরু করেছে। পূর্ণতা শোয়া থেকে উঠে বসে। তাজওয়াদকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে তার চারপাশে বালিশ দিয়ে ঘেরাও করে নিজে বেড ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর ছোট ছোট কদমে পা চালিয়ে বেলকনিতে এসে দাঁড়ায় । রাতের হিমেল হাওয়া এসে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে পূর্ণতার তনু। কেমন একটা কাটা দিয়ে ওঠা ঠান্ডা বাতাস, তাও পূর্ণতার বেশ ভালোই লাগছে। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বাতাস গায়ে মাখে। ইলেকট্রিসিটি দিয়ে চলিত এসি, ফ্যানের বাতাসে এই ভালো লাগাটা এতক্ষণ পাচ্ছিল না সে।
ঢাকার শহরের মতো যান্ত্রিক ও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে প্রকৃতির বিশুদ্ধ বাতাস পাওয়া একপ্রকার ভাগ্যের বিষয়। চারদিকে উঁচু উঁচু ইট-পাথরের তৈরি বিল্ডিং, অফিস-আদালত তৈরি করতে গিয়ে এখানকার মানুষ ভুলেই যাচ্ছে, প্রকৃতির বিশুদ্ধ বাতাস তাদের জীবন ধারণের জন্য কতটা প্রয়োজন।
এত অশুদ্ধ বাতাসের মধ্যেও পূর্ণতাদের বাড়িতে একটু হলেও বিশুদ্ধ বাতাস পাওয়া যায়। কীভাবে? কারণটা হলো, পূর্ণতার মরহুম মা মিসেস পায়েল আহমেদ ছিলেন একজন প্রকৃতি প্রেমী মানুষ। বিয়ে করে এই বাড়িতে আসার পর থেকে সে বাড়ির আশেপাশে অনেক ফল-ফলাদি, ফুল ও সবজির গাছ লাগিয়েছিলেন। অজান্তা বেগমও তাকে গাছের পরিচর্যা করতে সহায়তা করতেন। কিন্তু পায়েল বেগম মা-রা যাওয়ার পর ফুল ও সবজির গাছগুলো যত্নের অভাবে নষ্ট হয়ে গেলেও ফলের গাছ গুলো এখনও রয়েছে। সেগুলো থেকে বিভিন্ন মৌসুমে নানান রকমের মৌসুমি ফল পাওয়া যায় এখনও। মূলত সেই গাছগুলোর কারণেই এখনও আহমেদ বাড়ির লোকেরা অল্প পরিমাণে হলেও প্রাকৃতিক বিশুদ্ধ বাতাস পায়।
এই বিশুদ্ধ বাতাসে পূর্ণতার বেশ ভালো লাগে। তার মনে হচ্ছে, তার সকল অস্থিরতা, খারাপ লাগা এই প্রকৃতি নিজের মাঝে টেনে নিয়ে তাকে সুস্থ করে তুলছে। কেমন একটা তন্দ্রা ভাব লাগতে শুরু করে পূর্ণতার। রুমে যেতে মন চাইছে না বলে, পূর্ণতা বেলকনিতে রাখা ডিভানের উপর গা এলিয়ে দেয়। ভাবে আরো কিছুক্ষণ থেকে ঘুমটা যখন একদম পাকাপোক্ত ভাবে এসে তার চোখে চেপে বসবে, তখনই সে রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু তার এই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে ক্লান্ত দেহ-মন-মস্তিস্ক নিয়ে পূর্ণতা গভীর ঘুমিয়ে তলিয়ে যায়।
পূর্ণতা ঘুমিয়ে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর একটা সুঠাম দেহের ছায়ামূর্তি তার সামনে এসে উপস্থিত হয় সেই সিলেটের মতোই। হ্যাঁ, একদম ঠিক ধরেছেন। ছায়ামূর্তিটি আর কারও নয়, বরং পূর্ণতার শ্যামসুন্দর পুরুষেরই। জাওয়াদ ডিভানের সামনে এসে বসে পড়ে। আগের দিনের মতোই অপলক ফেলা ব্যতীত তাকিয়ে থাকে অভিমানী স্ত্রীর দিকে।
আজ পূর্ণিমার রাত। অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশে চাঁদ তার আপন রূপ দেখাচ্ছে রাতজাগা অনেক পাখিদের। জাওয়াদ আকাশের চাঁদের আলোয় নিজের ব্যক্তিগত চাঁদকে দেখছে। এ দেখার কোন শেষ নেই যেন। যখনই জাওয়াদ পূর্ণতাকে একটু দেখার ফুরসত পায়, তখনই সে নিজের এতগুলো বছরের তৃষ্ণা মিটিয়ে নেয়।
দেখাদেখির মধ্য দিয়ে আরো কিছু সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। জাওয়াদ লক্ষ্য করে পূর্ণতা কেমন হাত-পা কুঁকড়ে নিচ্ছে। রাত যতই বাড়ছে ঠান্ডাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। নভেম্বর মাসের শুরু দিন আজ। ঢাকার শহরে এই সময়ে এতটা ঠান্ডা না পরলেও এমন খোলামেলা জায়গায় ঠান্ডা লাগা অস্বাভাবিক কিছু নয়৷ জাওয়াদ অতি সাবধানে পূর্ণতাকে নিজের কোলে তুলে নেয়। বুকের ভেতরটা ভয়ে টিপটিপ করছে। উপরওয়ালার কাছে একটাই দোয়া করছে সে, পূর্ণতার ঘুম যেন না ভাঙে এখন।
উপরওয়ালা বোধহয় তার দোয়া কবুল করল। জাওয়াদ একদম বিড়াল পায়ে হেঁটে পূর্ণতাকে তার জায়গায় শুয়ে দেয়। কিন্তু সে যখন পূর্ণতাকে শুয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে যায়, তখনই পূর্ণতা আদোও আদোও ভাবে চোখ মেলে তাকায়। জাওয়াদ ভয়ে সেভাবেই ঝুকে থাকে পূর্ণতার উপর। কিন্তু হঠাৎই পূর্ণতা তাকে অবাক করে দিয়ে জাওয়াদের টি-শার্টের কলার ধরে টান দেয়। জাওয়াদ ব্যালেন্স ধরে রাখতে না পেরে পূর্ণতার উপর এসে পড়তে নিলে দুইহাত পূর্ণতার পাশে রেখে উঁচু হয়ে থাকে, যাতে তার পুরো ভারটা পূর্ণতার উপর না পরে।
পূর্ণতা ঘুম জড়ানো গলায় বলে–
—ও শ্যামসুন্দর পুরুষ, একটু থাকেন না আমার কাছে প্লিজ। এত পালাই পালাই করেন কেন শুধু? একটু কি থাকা যায় না আমার সাথে? একটু কি ভালোবাসা যায় না আমায়? নাকি এখনও ভাবেন, এই পূর্ণতা চরিত্রহীন? আপনি ব্যতীত অন্য পুরুষের সানিধ্যে যাই।
পূর্ণতা এসব কিছুকেই স্বপ্ন ভেবে উল্টাপাল্টা বকছে। জাওয়াদ আস্তে আস্তে নিজের ভর ছাড়তে থাকে পূর্ণতার উপর। একসময় সে তার পুরো ভর পূর্ণতার উপর ছেড়ে দেয়। গভীরভাবে আলিঙ্গন করে থেমে থেমে বলে–
—তুমি আমার সেই ফুল, যাকে বহু মৌমাছি ঘিরে রাখে ঠিকই, কিন্তু তার পাপড়ির পবিত্রতা টুকু পর্যন্ত কেউ নষ্ট করতে পারে না। তোমার সৌন্দর্য সবার নজর কাড়তে সক্ষম। আর তোমার চরিত্র তোমার সৌন্দর্যের মতোই বিশুদ্ধ, নিখুঁত, পবিত্র।
বাকি রইলো ভালোবাসার কথা। নিজের কৃতকর্মের জন্য আমি আজও লজ্জায় মূর্ছা যাই। তোমার চোখের দিকে তাকালে নিজেকে এত বড় আসামী মনে নয়, যেন আমার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যু হলেই বোধহয় ঠিক হবে। আমার সন্তানের কাছেও আমি মস্ত বড় অপরাধী। আজ আমার জন্যই সে তার বাবার সাথে পরিচিত নয়। আমার সন্তান জানেই না, আমি তার বাবা। আমি যদি তোমায় একটু বিশ্বাস করতাম, সত্য-মিথ্যা যাচাই করতাম তাহলে তোমার আর আমার সন্তানের জীবনটা এমন ছন্নছাড়া হতো না।
জাওয়াদের অশ্রু ভিজিয়ে দিতে থাকে পূর্ণতার কাঁধ ও বালিশের একাংশ। এত অশ্রু শুধু নিজের কৃতকর্মের জন্য বইছে না, বরং নিজের জন্য হওয়া আফসোস গুলোও অশ্রু হয়ে ঝরছে। পূর্ণতা সম্পূর্ণ ঘুমের ঘোরেই তাকে জড়িয়ে ধরে দুই হাত দিয়ে। পুনরায় ঘুমে ঢলে পরতে পরতে বলে–
—আমার একটা সংসার হলো না জাওয়াদ। আপনি আমায় সন্তান তো দিলেন ঠিকই, কিন্তু সংসার দিলেন না। আমার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো। এ জীবনে বোধহয় আমার সংসার করার স্বপ্ন পূরণ হবে না।
পূর্ণতার এই কথাটা জাওয়াদের বুকের একদম গহীনে আঘা-ত করে। তার হৃদয়ের পীড়া বাড়িয়ে তুলতে পূর্ণতার এই একটা কথাই যথেষ্ট ছিলো। জাওয়াদ তার হাতে বাঁধন পূর্বের থেকেও শক্ত করে পূর্ণতার কাঁধে মুখ গুঁজে বিরবিরিয়ে বলে–
—তোমার সংসার হবে পূর্ণ। বাবা-মা, জিনি, তুমি, আমি আর আমাদের সন্তান সবাইকে নিয়ে তোমার একটা ভরা সংসার হবে। তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্ব নিলাম আমি। তোমার একটা সংসার হবে পূর্ণ। ওয়াদা করলাম।
অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ পূর্ণতার ঘুম একটু দেরিতেই ভাঙে। ভাঙত না, তাজওয়াদের ডাকাডাকিতে ভেঙেছে তার ঘুমটা। পূর্ণতা চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে ছেলে তার কেমন দুঃখী দুঃখী মুখ বানিয়ে তার উপর ঝুঁকে রয়েছে। পূর্ণতা ছেলেকে নিজের আগে উঠতে দেখে একটু ভড়কে যায়। কারণ প্রতিদিন তারই তাজওয়াদকে তেল দিয়ে দিয়ে উঠাতে হয়। আর তাছাড়া নিজেকে রুমে দেখে আরো ভড়কে যায়। সে তো কাল বেলকনিতে ঘুমিয়েছিল, তাহলে রুমে আসল কিভাবে? নাকি ঘুমের ঘোরে এসে পরেছিলো পরে? কিছুই মনে নেই তার।
পূর্ণতার ভাবনায় ছেদ হয় তাজওয়াদের কথায়। তাজওয়াদ বলছে–
—মাম্মা, আ’ম হাংগ্রি। তাজওয়াদের অনেক কুদা পেয়েছে মাম্মা।
পূর্ণতা শোয়া থেকে উঠে এলোমেলো হয়ে খুলে থাকা চুলগুলো হাত খোঁপা করতে করতে বলে–
—বাব্বাহ্, আজ সূর্য কোন দিক দিয়ে উঠেছে শুনি? আদর সাহেবের ক্ষুধা পেয়েছে? তাও এই সাতসকালে? আমার ছেলে দেখি দিনকে দিন গুড বয়ের উপর পিএইচডি করে ফেলছে।এমন চলতে থাকলে, তোমার বউ হওয়ার জন্য বাসার বাহিরে মেয়েদের লাইন পরে যাবে আব্বাজান।
বউ ও বিয়ে কথাগুলো শুনে তাজওয়াদ মুখ ফুলিয়ে নেয়। তার মাম্মাটা দিনকে দিন দুষ্টু হয়ে যাচ্ছে। খালি বিয়ে আর বউয়ের কথা বলে তাকে লজ্জায় ফেলে। তার কি বয়স হয়েছে নাকি বিয়ে করার যে, মাম্মা এখনই বিয়ে বিয়ে করছে। তাজওয়াদকে মুখ ফুলাতে দেখে পূর্ণতা ঠোঁট এলিয়ে হেঁসে দেয়। তারপর ছেলেকে জাপ্টে ধরে টপাটপ কতগুলো চুমু দিয়ে বলে–
—চলো ফ্রেশ হয়ে খেতে যাই। আসো আমার সাথে।
তাজওয়াদ তখনও মুখ ফুলিয়ে বলে–
—তাজ ফ্রেশ হয়েছে এবং ব্রাশও করেছে প্রোপারলি। এই দেখো।
তাজওয়াদ তার দাঁত দেখিয়ে বলে। পূর্ণতা দেখে না বেশ ভালো ভাবেই দাঁত ব্রাশ করেছে তাজওয়াদ। তাই সে ছেলেকে বেডে বসিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ায়। দেওয়াল ঘড়ির দিকে নজর দিকে তার চক্ষু কপালে। দশটা পাড় হয়ে গিয়েছে। সে চঞ্চল পায়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলে–
—হায় খোদা! এত লেট হয়ে গেলো কিভাবে আজ!
পূর্ণতা চটপট ফ্রেশ হতে থাকে। বেসিনে দাড়িয়ে মুখ ধুতে থাকে তখনই আয়নায় চোখ পরে তার। তার গলার বামপাশে কেমন ছোট ছোট লাল লাল র্যাশ উঠেছে। এই দাগগুলো সাথে পরিচিত পূর্ণতা। পাঁচ বছর আগে বিয়ের পর প্রায়ই দেখতে পেতো সে এগুলোকে। জাওয়াদ মাঝে মধ্যে যখন তার কাঁধে মুখ গুঁজে ঘুমাতো তখন তার চাপ দাঁড়ির ঘষা লেগে এমন র্যাশ উঠত। কিন্তু আজ হঠাৎ এগুলো উঠলো কেন? তখন তো এগুলো যার কারণে উঠত সে তার পাশে ছিলো, কিন্তু আজ তো নেই। তাহলে? পূর্ণতার মাথায় চিন্তারা জেঁকে বসে। সে তার মাথায় একটু চাপ দিতেই আবছা আবছা মনে পরতে থাকে কাল রাতের কিছু কথা। কাল রাত জাওয়াদের মতো কেউ একজন তার কাছে এসেছিল। পূর্ণতা আকুতিমিনতি করে তাকে নিজের সাথে থাকতে বললো। যদিও সবটাই তার এখন স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে, তবুও কোথাও একটা কিন্তু রয়েই যায়।
পূর্ণতা আপাততের জন্য সব চিন্তাভাবনা ভুলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ছেলেকে নিয়ে নিচে নেমে আসে ব্রেকফাস্ট করতে। নিচে এসে মালতী কাকীর থেকে জানতে পারে, তার বড় বাবা অফিসে চলে গিয়েছে, বড় মা সোসাইটির কি একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছে। মিসেস অজান্তা আবার এগুলো বেশ মেইনটেইন করে চলে। পূর্ণতা ব্রেকফাস্ট করে ছেলেকে নিয়ে বের হয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে।
—আরওয়া রে, আজ প্রাইমারিতে নিয়োগ পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। তুই চাকরিটা পেয়ে গিয়েছিস।
আরওয়ার ভাই রাসেল বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে উঁচু গলায় কথাটি বলে। রাসেলের গলার স্বর শুনে আরওয়া, তার মা ও ভাবী বের হয়ে উঠোনে এসে উপস্থিত হয়। রাসেলের মা ছেলের সামনে এসে বলে–
—বাজান, সত্যি আরওয়া চাকরিটা পাইছে?
রাসেল হাসি হাসি মুখে বলে–
—হ আম্মা। আমাদের আরওয়া চাকরিটা পাইছে। এই দেখো আমি ওর রেজাল্ট প্রিন্ট আউট করে নিয়ে আসছি কম্পিউটারের দোকান থেকে।
আরওয়া শান্তভাবে রেজাল্টের শিটটা নিজের হাতে তুলে নেয়। হ্যাঁ সে সত্যি সত্যিই চাকরিটা পেয়ে গিয়েছে। এত ভালো একটা চাকরি পেয়েছে তাও তার মুখে কোন হাসি নেই। যেন সে আগের থেকেই জানত এটাই হবে। তাদের মতো একটা হতদরিদ্র পরিবারের জন্য চাকরিটা একটা স্বপ্নের মতোই। আরওয়ার ভাবী তাকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানায়। গদগদ হয়ে বলে–
—আরওয়া রে, আমাগো সুখের দিন আইলো মনে হয়।
আরওয়া একটা জোড়াতালির হাসি দিয়ে বলে–
—ইনশা আল্লাহ ভাবী।
আরওয়ার মা ও ভাবী খুশিতে ভালো মন্দ রাঁধতে চলে যান। সকলে চলে যাওয়ার পর আরওয়ার ভাই তার কাছে আসে। বোনের মাথায় হাত রেখে বলে–
—আমি জানতাম বোন, চাকরিটা তুই পাবিই। তোর মতো মেধাবী যদি চাকরিটা না পায়, তাহলে ভাবতাম আব্বার কথাই সঠিক। দেশের সর্বত্র দূর্নীতির কালো ছায়া ছেয়ে গিয়েছে।
আরওয়া মাথা নিচু করে ভাইয়ের কথাগুলো শুনে। আগে তাদের আর্থিক অবস্থা এত খারাপ ছিলো না। তাদের বাবা ছিলেন একজন সৎ পুলিশ অফিসার। একবার একজন দূর্নীতিবাজ নেতাকে গ্রেফতার করেছিলো বলে ঐ নেতার লোকেরা তাকে নির্মমভাবে হ–ত্যা করে এক্সিডেন্ট বলে চালিয়ে দেয়। তখন আরওয়া অনেক ছোট। তারপর তারা দেশের বাড়ি চলে আসে এবং এখানেই বসবাস শুরু করে। তার ভাইও বাবা মারা যাওয়ার পর বেশি একটা পড়ালেখা করতে পারেনি। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে নিজেও পড়ালেখা থেকে দূরে ছিটকে পরেছে।
রাসেল আবারও কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়। সকলে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলে আরওয়াও নিঃশব্দে চলে যায় তাদের বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়ে। সেখানে এসে পুকুরে পানিতে পা ডুবিয়ে হাটুতে মাথা রেখে বসে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে শেওলা পরা পুকুরের পানির দিকে। ইদানীং এটা তার অন্যতম একটা প্রিয় কাজ হয়ে উঠেছে। সময় পেলেই এখানে এসে বসে থাকে, আর নিজের বুকে জ্বলতে থাকা আগুন শান্ত করতে অশ্রু ঝরাতে থাকে। অন্যান্য দিনের মতোই আজও পুরোন দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তার চোখের কোল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরতে থাকে। সেই অশ্রুগুলো একসময় পুকুরের পানির সাথে মিশে যেতে শুরু করে। ভালোবাসা না পাওয়ার কষ্ট এত তীব্র, এতই গভীর ও ভয়াবহ যা আরওয়া নামক এই কোমলমতি রমণী কখনো কল্পনাও করে।
টুপটাপ করে আকাশ থেকে কয়েক ফোটা পানি পরতেই, আরওয়া হাটু থেকে মাথা তুলে ঘন কালো মেঘে ছেয়ে যাওয় আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনেই বিরবিরায়–
—হে উপরওয়ালা, সে যদি আমারই হবে না তাহলে আমার মনে তার জন্য এত ভালোবাসা দিলে কেন? আজ সে অন্যের স্বামী, তাও আমি তাকে ভুলতে পারছি না। তাকে ভাবাও পাপ, তাও আমার এই অবাধ মন তাকে ভাবা থামাচ্ছে না। আমার মন থেকে তাকে চিরকালের জন্য মুছে দাও, নাহলে তাকে আমার করে দাও।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন]
শব্দসংখ্যা~১৯০৬
~চলবে?
[আঞ্জুমান ওর প্রাপ্য শাস্তি পাবে, ওর শাস্তি দেখার জন্য এত বিচলিত হবেন না। এর আগে কিছু ঘটনা রয়েছে, সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে আমি ডাইরেক্ট আঞ্জুমানের শাস্তি দেখাতে পারছি না আপাতত। একটু ধৈর্য ধরে পড়তে থাকুন, ইনশা আল্লাহ সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে আপনাদের হতাশ না করার।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪