শেষ পাতায় সূচনা [৩৩]
সাদিয়াসুলতানামনি
পরের দিন সকাল আটটার দিকে পূর্ণতা একেবারে অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে বের হয়। পরনে হোয়াইট শার্ট, ব্ল্যাক সুট, চোখে কালো পাওয়ার চশমা৷ মাথায় হাই পোনিটেল করেছে। মুখে পর্যাপ্ত মেক-আপ যতটুকু না করলেই নয়। সাথে তাজওয়াদকেও মানানসই ড্রেসআপ করেছে।
পূর্ণতাকে দেখা মাত্রই আহনাফ সাহেব হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলে ওঠেন–
—ঐ তো আমার আম্মা এসে পরেছে।
সকলে মাত্রই বসেছিল ব্রেকফাস্ট করতে। আহনাফ সাহেবের কথায় সকলেই তার দিকে তাকায়। মিসেস আহমেদ পূর্ণতাে দেখা মাত্রই চোখ-মুখ শক্ত করে নেন। আঞ্জুমানের মুখভঙ্গি দেখে বুঝা গেলো না তার মনের খবর।
পূর্ণতা নিজের জন্য বরাদ্দকৃত চেয়ারে বসে পড়ে। গতদিনের মতো আজও আঞ্জুমানই সকলকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। যখনই সে পূর্ণতার প্লেটে খাবার বেড়ে দিতে নিবে, পূর্ণতা তখন হাত উঠিয়ে থামিয়ে দেয়। গমগমে গলায় বলে–
—ধন্যবাদ, আমি নিজেরটা নিয়ে নিতে পারব।
আঞ্জুমান অপমানবোধ করে এমন মুখের উপর রিজেকশনে। আরিয়ানের কাছেও বিষয়টা ভালো লাগে মা। অন্যদিকে মিসেস আহমেদের চোখে কেমন একটা খুশির ঝলক দেখা দেয়। আঞ্জুমান সকলের সামনে নিজের ভালো ইমেজ ধরে রাখতে হাসিমুখেই বলে–
—কেন ননদিনী আমি বেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়?
—উপস্থিত সকলেই জানে আমি নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করি।
আঞ্জুমান আরো কিছু বলবে, তখন আরিয়ান বলে–
—হ্যা রুহী, বোনুকে ওর মতো ছেড়ে দাও। তুমি এসে বসো খেতে।
আঞ্জুমান স্বামীর কথার উপর দ্বিরুক্তি করে না। নিজের জায়গায় এসে খেতে বসে পরে। খাওয়া শেষে আহনাফ সাহেব আরিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলেন–
—তোমাদের রিসেপশনটা আপাতত পেছাতে হচ্ছে আরিয়ান। কারণ তোমায় কালকের মধ্যে দুবাই যেতে হবে, সেখানকার একটা কোম্পানি থেকে অফার এসেছে। ডিলটা সাইন হলে আমাদের কোম্পানির জন্য বেশ লাভজনক হবে। আর আমি চাইছি তুমি তোমার সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করো ডিলটা পেতে। আ’ম আই ক্লিয়ার টু ইউ?
—জ্বি বাবা।
—কাল দুপুরের দিকে মিটিং। তুমি আজ বিকেলের ফ্লাইটে রওনা হও। রাতটা রেস্ট নিতে পারবে তাহলে। সকালে মিটিংয়ের জন্য টুকটাক প্রিপারেশন নিলে।
—আচ্ছা বাবা।
আহনাফ সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বলেন–
—আমার বিশ্বাস, তুমি পারব ডিলটা নিতে। এবার আমার বিশ্বাসের প্রমাণ দেওয়ার পালা তোমার।
আরিয়ান আত্মবিশ্বাসের সহিত বলে–
—আমি তোমার বিশ্বাসের মান রাখবো ইনশা আল্লাহ।
আহনাফ সাহেব ছেলের কথায় স্বস্তি পান। সে নিজের রুমে চলে যায়। মিসেস আহমেদ তার পেছন পেছন যান। পূর্ণতা তাজওয়াদের মুখ টিস্যু দিয়ে মুছিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুখে স্মিত হাসি ফুটিয়ে তুলে বলে–
—বেস্ট অফ লাক ভাইয়া। সফল হয়ে ফিরে আসো।
—ধন্যবাদ বোনু।
তাজওয়াদ আরিয়ানের কাছে গিয়ে তাকে ঝাপটে ধরে বলে–
—আলু মামা বেস্ট অফ লাক।
—আলু মামার ভাতিজাকে ধন্যবাদ।
পূর্ণতা ছেলেকে নিয়ে বের হয়ে যায় অফিসের উদ্দেশ্যে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর সেই পুরাতন দম্ভ, কঠোর ব্যক্তিত্ব ও গম্ভীর মুখ নিয়ে ছেলের হাত ধরেই অফিসে প্রবেশ করে পূর্ণতা। আজ পূর্ণতা আসবে বলে সকলে ফুল নিয়ে অপেক্ষা করছে তাকে স্বাগতম জানানোর জন্য। বর্তমান ম্যানেজার রওনাক ইশতিয়াক পূর্ণতাকে একটা ফুলের বুকে এগিয়ে দিয়ে নম্র গলায় বলে–
— ওয়েলকাম ব্যাক ম্যাম। মাই সেল্ফ রওনাক ইশতিয়াক। নাইস টু মিট ইউ ম্যাম।
পূর্ণতা বুকেটা নিয়ে গমগমে গলায় বলে–
—নাইস টু মিট ইউ ঠু মি.ইশতিয়াক।
অফিসের সকলে এক এক করে ফুল দিয়ে স্বাগতম জানায় পূর্ণতাকে। স্বাগতম জানানো শেষে পূর্ণতা অফিস রুমের একদম মাঝখানে দাঁড়িয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলে–
—সবাই আমার সালাম নিবেন। আশা করি আপনারা সকলে ভালো আছেন। আমাকে অনেকেই চিনেন আবার অনেকেই চিনেন না। নতুনরা হয়ত আমার কথা পুরাতন এমপ্লয়িদের মুখে শুনেছেন, তাও আমি নিজের পরিচয় নিজে দিতে পছন্দ করি।
মাই সেল্ফ আনাবিয়া আহমেদ পূর্ণতা। ডটার অফ মি. আফজাল আহমেদ। মাদার অফ তাজওয়াদ আহমেদ আদর। এতদিন কিছু কারণ বসত আমার ভাই আরিয়ান আহমেদ আমার স্থলাভিষিক্ত ছিলেন, কিন্তু আজ থেকে আমিই আপনাদের সাথে কাজ করবো, আপনাদের সহকর্মী হিসেবে। আমাকে বস ভাবার দরকার নেই, আপনাদের একজনই ভেবেন। কিছু বিষয় আমি আজ নিজে আপনাদের বলে দিতে চাই।
আমার কোম্পানির প্রতি আপনারা যত বেশি ডেডিকেটেড থাকবেন, তত বেশি আমাকে আপনাদের একজন হিসেবে নিজেদের কাছে পাবেন। কিন্তু যখনই আপনাদের ডেডিকেশনে বিন্দুমাত্র ক্ষুত পাবো, তখনই আমার কঠোর দিকের সাথে পরিচিত হবেন।
আগেই হয়ত শুনেছেন, কিন্তু আমি আজ নিজেই বলছি, ভুলেও আমার সাথে ডাবল টাইমিং বা ধোঁকা দেওয়ার কথা ভাববেন না। আমি যদি কারো ধোঁকা পাই, তার করপোরেট লাইফ তো হেল করবোই, পারসোনাল লাইফেও এ-র প্রভাব খুব কঠোরভাবে টের পাবে। তাই আবারও বলছি, টু ডিসিভ মি ইজ টু উইলিংলি টার্ন ইওর ওন লাইফ ইনটু আ লিভিং হেল। আ’ম আই ক্লিয়ার টু ইউ গাইজ?
—ইয়েস ম্যাম।
সকলকে সমস্বরে বলে ওঠে। পূর্ণতা আগের থেকেও কঠোর গলায় বলে–
—লাউডার, আ’ম আই ক্লিয়ার?
—ইয়েস ম্যাম।
—গুড। নাও গেট ব্যাক টু ওয়ার্ক।
সকলকে আদেশ দিয়ে ছেলেকে নিয়ে নিজের কেবিনে ঢুকে পূর্ণতা। এদিকে সে যেতেই সব এমপ্লয়িরা হাফ ছেড়ে বাঁচে। পূর্ণতা কানাডা যাওয়ার পর যেসব নতুন এমপ্লয়িরা জব নিয়েছে তাদের তো ভয়ে অবস্থা খারাপ। এতদিন তাদের যে বস ছিলে আরিয়ান, সে একজন মানুষ হিসেবে যেমন চমৎকার ছিলো, তেমনই বসে হিসেবেও। তাই সকলে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য ভাবেই অফিসে কাজ করত। কিন্তু আজ পূর্ণতার সাথে তাদের পরিচয় হয়ে তাদের অন্তরে ভয় ঢুকে গিয়েছে। তারা ঠিকই বুঝতে পেরে গিয়েছে, পূর্ণতা মুখে যতই বলুক সে তাকে তাদের একজনই ভাবতে, কিন্তু আসলে বস তো বসই হয়। এখন থেকে তাদের ডেডিকেশনের উপর তাদের পরিবারের রুজি রুটির নির্ভর করবে।
কেবিনে এসে পূর্ণতা তার ডেস্কের সামনে এসে মনে মনেই ইমোশনাল হয়ে পড়ে। তার পাঁচ বছর পূর্বে এই চেয়ারে তার বাবা বসত। পূর্ণতা কোম্পানির অলিখিত বস হলেও সে কখনোই এই চেয়ারে বসেনি। আফজাল সাহেব কত জোর করেছে মেয়েকে নিজের চেয়ারে বসানোর জন্য, কিন্তু পূর্ণতা বসেনি। আরিয়ান এতদিন দায়িত্বে ছিলো, সেও কখনো বসেনি এই চেয়ারে। সে অন্য কেবিনে কাজ করত।
পূর্ণতা চেয়ার টার কাছে এসে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিতে থাকে। মনে মনে বাবার উদ্দেশ্যে বলে–
—আগেরবার আমাকে গাইড করার জন্য তুমি ছিলে বাবা, কিন্তু এবার নেই। কেন চলে গেলে এত তাড়াতাড়ি? এবার আমাকে কে গাইড করবে তোমার মতো করে বাবা?
—মাম্মা, তাজের ঘুমু ঘুমু পাচ্ছে।
মায়ের কোর্টের কর্ণার টেনে ধরে বলে তাজওয়াদ। পূর্ণতার ছেলের গলার আওয়াজে ধ্যান ভঙ্গ হয়। সে ছেলেকে কোলে নিয়েই চেয়ারটাতে বসে পড়ে। তারপর তাজওয়াদকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–
—ঘুমাও। মাম্মা তোমার কাছেই আছি সোনা।
তাজওয়াদের এত সকালে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস নেই। সময়ের ব্যবধানে তাজওয়াদ ঘুমিয়ে পড়লেও পূর্ণতা তাকে কোলে নিয়েই বসে থাকে। কিছুক্ষণ বাদে পূর্ণতার কেবিনে নক হয়। পূর্ণতা মৃদু গলায় পারমিশন দিতেই ম্যানেজার কেবিনে প্রবেশ করে। ম্যানেজার কেবিনে এসে কতগুলো ফাইল পূর্ণতার ডেস্কের উপর রেখে কিছু বলতে নিবে, তখনই পূর্ণতা তাকে থামিয়ে দেয় ইশারা করে। তারপর ছেলেকে কোলে নিয়েই তার কেবিনের সাথে থাকা এটার্চ রুমে গিয়ে শুয়ে দেয়। রুমটায় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য একটা ছোট বেড, দুইজনের বসার মতো সোফা, মিনি ফ্রিজ ও একটা টিভিও রয়েছে। পূর্ণতা তাজওয়াদকে ভালো করে শুয়ে দিয়ে পুনরায় নিজের জায়গায় এসে বসে।
তারপর গভীর মনোযোগ দিয়ে ফাইলগুলো দেখতে থাকে। ফাইলগুলোতে গত পাঁচ বছরের তাদের সব আয়-ব্যয়ের হিসাব রয়েছে। আরিয়ানের বদৌলতে কোম্পানির আয় ততটা না বাড়লেও ব্যয়ও খুব একটা হয়নি। সবকিছু ঠিক থেকেও হঠাৎই একটা জায়গায় পূর্ণতার চোখ আঁটকে যায়। গত পাঁচ বছরে আরিয়ান কোন যৌক্তিক কারণ ছাড়াই আহমেদ গ্রুপ থেকে পয়ষট্টি লক্ষ টাকা নিয়েছে। এমনটা না টাকা সে ধার হিসেবে নিয়েছে। জাস্ট বিভিন্ন সময় একটা মোটা এমাউন্ট উঠিয়েছে কোম্পানির একাউন্ট থেকে।
এটা দেখে তো পূর্ণতা ভীষণ অবাক হয়ে যায়। কারণ তার জানা মতে আরিয়ান কখনই এটা করবে না। আরিয়ান খুবই সৎ একজন ছেলে তার বাবার মতোই। সে মনে করে, অসৎ পথে একহাজার টাকা কামানোর চেয়ে, কষ্ট করে একশ টাকা কামানো শ্রেয়। কারণ কষ্ট করে অর্জন করা অর্থে বরকত থাকে বেশি, যা অসৎ পন্থায় অর্জন করা অর্থে থাকে না।
পূর্ণতা ম্যানেজারকে হিসাবের ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে বলে–
—আরিয়ান ভাইয়া ঠিক কি কারণে এই টাকাগুলো তুলেছে আপনাকে কখনো বলেছে মি. ইশতিয়াক?
ইশতিয়াক ফাইল নির্দেশিত জায়গা দেখেই চিনে যায় কাজটা কার। সে সাবলীল ভঙ্গিতেই বলে–
—ম্যাম, এখানে একাউন্ট হোল্ডার হিসেবে আরিয়ান স্যারকে দেখালেও, আদতে সেটা তুলেছে উনার মা মিসেস আহমেদ।
—হোয়াটটটটট?? বড় মা?
—জ্বি ম্যাম। উনিই বিভিন্ন সময় আরিয়ান স্যারের সাইন করা চেক এনে টাকাগুলো তুলেছেন।
—তা আপনি এই বিষয়ে আরিয়ান ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করেন নি, বড় মা কেন এতগুলো টাকা তুলছে কয়েকদিন পরপর?
—ম্যাম, আমি আপনাদের বেতনভুক্ত কর্মচারী। এমন প্রশ্ন আমাকে করা সাজে না। এতে সে ভাবতে পারেন, আমি তার কাছে জবাবদিহি চাইছি।
ইশতিয়াকের কথাগুলো শতভাগ সত্য। পূর্ণতার অবর্তমানে আরিয়ান যেহেতু আহমেদ গ্রুপের বস ছিল, সেই হিসেবে মিসেস আহমেদও বস ছিলেন। আর সে কিভাবে কর্মচারী হয়ে বসকে টাকা কেন তুলছে এটা জিজ্ঞেস করতে পারে? পূর্ণতা ম্যানেজারকে বিদায় করে ভাবতে বসে তার বড় মা কেন এত বড় এমাউন্ট তুলেছে গত পাঁচ বছরে? অনেক ভেবেচিন্তেও যখন কোন কারণ খুঁজে পায় না, তখন পূর্ণতার মেজাজ খারাপ হতে থাকে। তার মন কেন জানি বলছে, মিসেস আহমেদ কোন জরুরি কাজে টাকাগুলো নেন নি। আলতু-ফালতু খরচের জন্যই নিয়েছেন। আর সত্যিই যদি এটা হয়, তাহলে সে অবশ্যই টাকাগুলো আদায় করে ছাড়বে।
পূর্ণতা বাজ পাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে হিসাবের ফাইলের দিকে তাকিয়ে আনমনেই বিরবির করে–
—আমার বাবার র””ক্ত পানি করে অর্জন করা এক একটা পয়সার হিসাব আমি পাই পাই করে নিবো। যদি হিসাব না দিতে পারে, তাহলে গলার ভেতর হাত ঢুকিয়ে সেই টাকা বের করে তবেই দম নিবো। মেয়ে হিসেবে আমি যেমন নরম, একজন ব্যবসায়ী হিসেবে তার চেয়েও হাজার গুণ কঠিন।
প্রথম দিন আর কোন ঝামেলা হয় না। সন্ধ্যায় ছেলেকে নিয়ে বাসায় ফিরে আসে পূর্ণতা। এসে ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে তাজওয়াদকে নাস্তা করিয়ে সে কিচেনে চলে আসে নিজেদের জন্য রাতের খাবার বানাতে। আঞ্জুমান বাসায় নেই। আরিয়ানকে প্রথমে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে সে তার কোন এক খালামনির বাসায় গিয়েছে। কয়েকটা দিন সেখানেই থাকবে নাকি।
মিসেস আহমেদ যদিও একটু আপত্তি করেছিলেন নতুন বউয়ের এত ঘুরাঘুরি নিয়ে, কিন্তু মি. আহমেদ পুত্রবধূকে অনুমতি দেয় যাওয়ার। ভদ্রলোক ভাবে, বিয়ের তৃতীয়দিন স্বামীকে বিদেশ সফরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন সে তাই হয়ত বউমায়ের মন খারাপ। খালামনির কাছে গিয়ে থেকে যদি মন ভালো হয় তাহলে এতেই তিনি খুশি। আজ যদিও পূর্ণতা আঞ্জুমানকে একা পেতো কথা বলার জন্য, কিন্তু আঞ্জুমান নিজেই নেই। সে কেমন জানি পালিয়ে বেড়াচ্ছে পূর্ণতার থেকে। কিন্তু কেনো? এতই যদি ভয় তাহলে তার ভাইকে কেন বিয়ে করলো? প্রশ্ন একটা থেকেই যাচ্ছে।
কেটে যায় আরো চারটা দিন। আবহাওয়া জনিত কারণে ফ্লাইট চলাচল না করায় এবং ডিল নিয়ে আরো কিছু কাজ থাকায় আরিয়ান এখনও দুবাইতে অবস্থান করছে। চাচীর সাথে টাকার বিষয়টা নিয়ে বসবে পূর্ণতা আরিয়ান আসার পর। ছেলের সামনেই তাকে ধরবে যাতে পালানোর পথ খুঁজে না পায় মিসেস আহমেদ। শুধু আহনাফ সাহেবকে জানিয়ে রেখেছেন। সে শুনে খুবই রেগে যায় এবং তখনই মিসেস আহমেদকে ধরতে চাইলে, পূর্ণতা মানা করে দেয়। আর আপাতত চুপ থাকতে বলেছে।
অন্যান্য দিনের ন্যায় আজও পূর্ণতা তাজওয়াদকে নিয়েই অফিসে এসেছে। এই কয়েকদিনে তাজওয়াদের সাথে অফিসের বেশ কয়েকজন এমপ্লয়ির ভাব হয়ে গিয়েছে। কাজে সময় তাজওয়াদকে পূর্ণতা হয় নিজের কেবিনে বা রেস্ট রুমে রাখলেও ব্রেক টাইম গুলো এমপ্লয়িরা নিজেরাই এসে তাজওয়াদকে নিয়ে যায় গল্পসল্প করার জন্য।
পূর্ণতা তাজওয়াদকে ফোনে কার্টুন ছেড়ে দিয়ে নিজের কাজ করছিলো ল্যাপটপে তখনই বাহির থেকে বেশ হইচইয়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। এত হইচই কেনো হচ্ছে দেখার জন্য পূর্ণতা কেবিন থেকে বের হয়ে আসলে দেখতে পায়, একটা মেয়ের সাথে টনির ঝগড়া চলছে। মেয়েটার পিঠ পূর্ণতার দিকে দেওয়া। টনি মেয়েটার হাতের বাহু চেপে ধরে তাকে টানছে, কিন্তু মেয়েটা নাছোড়বান্দি যাচ্ছে না। উল্টো অনেক চিৎকার-চেঁচামেচি করছে আর অন্যহাত দিয়ে টনিকে কিল দিচ্ছে। টনির মতো একটা সুস্বাস্থ্যবান ছেলেকে একটা পুঁচকে মেয়ে মারছে দেখে পূর্ণতার চক্ষু কপালে উঠে যায়। টনি ভদ্রতার খাতিরে মেয়েটার গায়ে হাত তুলছে না, নাহয় সে যদি এই মেয়েকে একটা থাপ্পড় মা””রে মেয়েটা দ্বিতীয় বার উঠে দাড়াতে পারবে নাকি সন্দেহ।
বিষয়টা অনেক গোলমেলে হয়ে যাচ্ছে দেখে পূর্ণতা এবার গলার স্বর বাড়িয়ে বলে–
—কি হচ্ছে কি এখানে? আমার অফিসে এত হইচই কেনো?
পূর্ণতার গলার আওয়াজ শুনে যারা টনি আর মেয়েটির হইচই ইনজয় করছিলো তারা সকলে হুড়মুড়িয়ে নিজেদের ডেস্কে গিয়ে বসে পড়ে। এদিকে সেই মেয়েটি পেছন ফিরে তাকালে পূর্ণতা দেখতে পায়, মেয়েটি আর কেউ না বরং তার ননদ জিনিয়া। মেয়েটার মুখটা কি মলিন হয়ে আছে। সে পূর্ণতাকে দেখা মাত্রই হৈ-হৈ করে বলে ওঠে–
—ও ভাবীপু, দেখো না এই খাটাশ লোকটা কিছুতেই আমাকে তোমার কাছে যেতে দিচ্ছে না। উনাকে ছাড়তে বলো তো।
জিনিয়া হুটোপুটি করতে করতে কথাগুলো বলে। পূর্ণতা শুরুতে জিনিয়াকে দেখে বেশ অবাক হলেও তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে কাঠকাঠ গলায় বলে–
—তোমার আমার কাছে কোন কাজ আছে বলে আমার মনে হয় না। ভালো হবে তুমি চলে যাও জিনিয়া।
কথাটা বলে পূর্ণতা ঘুরে চলে যেতে নেয়, তখনই জিনিয়া টনির হাতে বেশ জোরে একটা কামড় দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে এসে পূর্ণতাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—সেদিনও আমায় ফিরিয়ে দিয়েছো, আজও দিচ্ছো। এবার কিন্তু আমি অনেক কাঁদব বলে দিলাম। তুমি আমার প্রতি এত কঠোর হচ্ছো কেনো ভাবীপু? আমার কি দোষ?
পূর্ণতা ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সকলে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পূর্ণতা বুঝে যায় আজ জিনিয়াকে সহজে বিদায় করানো যাবে না, তাই সে তার দিকে ফিরে বলে–
—আমার সাথে আসো।
কথাটা বলেই সে চলে যায় নিজের কেবিনে। জিনিয়াও চোখ মুছতে মুছতে তার পেছন পেছন যায়। অন্যদিকে জিনিয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে টনি বিড়বিড়িয়ে বলে–
—সেদিন দিলো ভাতিজা কা””মড়, আজ আবার ফুফু। এরা ফুফু-ভাতিজা আমাকে পেয়েছে টা কি? বউয়ের কামড় খাওয়ার বয়সে এই পিচকি-পুচকের কামড় খেতে হচ্ছে। ছ্যাহ্, শালার জিন্দেগী!
কেবিনে ঢুকে আরেক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে যায়। জিনিয়া কেবিনে এসেই সোফায় ছোট তাজওয়াদকে দেখতে পেয়ে কোলে নিয়ে উড়াধুরা চুমু দিতে থাকে। এতে তারা মা-ছেলে দুইজনই থতমত খেয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর তাজওয়াদ নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য হুটোপুটি শুরু করে দেয়। সে আদো আদো গলায় বলে–
—মাম্মা, ও মাম্মা। দেকু একতা মেয়ে কিভাবে আমাল প্রেস্টিজে হাত দিচ্চে। তুমি আমাল প্রেস্টিজ বাঁচাও মাম্মা।
পূর্ণতা জিনিয়ার কাছে এসে শান্ত গলায় বলে–
—একটু শান্ত হয়ে বসো। ভয় পাচ্ছে তাজ।
তাজওয়াদ ভয় পাচ্ছে শুনে জিনিয়া একটু শান্ত হয়। তাজওয়াদ সুযোগ বুঝে লাফ দিয়ে জিনিয়ার কোল থেকে নেমে মায়ের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। পূর্ণতা ছেলেকে সাথে নিয়েই বসে বিপরীত সোফায়। তারপর শান্ত গলায় বলে–
—দেখো, বারবার আমার কাছে এসে এভাবে কেঁদেকেটে ফিরিয়ে যাওয়ার কোন মানে দেখছি না। আমি আমার লাইফে এগিয়ে গিয়েছি আমার ছেলেকে নিয়ে। তোমরাও তোমার ভাইকে বিয়ে দিয়ে নতুনভাবে সবকিছু করো।
জিনিয়া আবারও ঠোঁট ভেঙে কাঁদতে শুরু করে দেয়। বাম হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলে–
—কীভাবে সব শুরু করবো তোমাকে ছাড়া? তোমার মতো কেউ এত যত্ন নিতে পারবে নাকি আমাদের? প্লিজ ভাবীপু ফিরে চলো না। আম্মু ভাইয়া ভীষণ লজ্জিত নিজের কৃতকর্মের জন্য। ভাইয়া আম্মুর কর্মকাণ্ডের কথা শুনে আজ পাঁচ বছর পর্যন্ত ভালো করে একদিনও কথা বলেনি। বাবাও মায়ের সাথে কথা বলে না। আমিও অভিমান করে হোস্টেলে থাকি এসএসসির পর থেকে। তুমি চলে যাওয়ার সাথে সাথে আমাদের পরিবারের সব সুখ-শান্তিও চলে গিয়েছে ভাবীপু।
হঠাৎই পূর্ণতার মাথায় একটা প্রশ্ন আসে। সে ফট করে জিনিয়াকে জিজ্ঞেস করে–
—আচ্ছা একটা কথা বলো তো, মিসেস শেখ আর আঞ্জুমানের কীর্তিকলাপের কথা তোমরা বা তোমার ভাই জানলো কীভাবে? মানে তাদের মুখোশ উন্মোচন হলো কি করে?
জিনিয়া নাক টানতে টানতে বলে–
—আমি করেছি তাদের মুখোশ উন্মোচন।
পূর্ণতা ফাটা চোখ নিয়ে জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই পুঁচকে আলাভোলা মেয়েটা কিভাবে সেই দুই ডাই””নীর কীর্তি ফাঁস করলো?
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন ]
শব্দসংখ্যা~২৩০০
~চলবে?
[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৮
-
শেষ পাতায় সূচনা গল্পের লিংক
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২১