শেষপাতায়সূচনা [৩২]
সাদিয়াসুলতানামনি
পূর্ণতাদের গাড়ি জীর্ণশীর্ণ কবরস্থানের গেইটের সামনে এসে থামে। গাড়ি থামিয়ে টনি পূর্ণতাকে বলে ওঠে–
—ম্যাম আমরা এসে পরেছি।
টনির কথায় পূর্ণতা চোখ মেলে তাকায়। মাথাটা ভার ভার লাগায় সে চোখ বন্ধ করে সিটে মাথা এলিয়ে রেখেছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে “আহমেদ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থান” নামটা দেখে তার বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। সে তাজওয়াদকে নিয়ে গাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। কিউট তাজওয়াদের মাথায় একটা ছোট টুপি পরিয়ে দেয় পূর্ণতা, এতে যেন তার কিউটনেস আরো বেড়ে গিয়েছে। টনিও নিজের মাথায় একটা টুপি পরেছে। তারপর তারা তিনজন কবরস্থানে ভেতরে প্রবেশ করে।
নিজের বাবা-মায়ের কবরস্থানের সামনে এসে পূর্ণতার কষ্টে নিজেকে দিশেহারা লাগতে শুরু করে। নিঃশব্দে গলগলিয়ে চোখ বেয়ে অশ্রুতে শ্রোত বইতে থাকে। টনি তাজওয়াদকে নিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়েছে। পূর্ণতাই তাকে এটা করতে বলেছে। বাবা-মায়ের উপর ভীষণ অভিমান নিয়ে বলতে থাকে–
—বাকি সবার মতোই আমাকে তোমরা কখনোই ভালোবাসো নি। যদি ভালোবাসতে তাহলে এত জলদি আমাকে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে একা করে চলে যেতে পারতে না। জানো বাবা, আম্মু এখন কেউ আমাকে আদর করে না। ভালোও বাসে না। আমি না খেয়ে থাকলে কেউ এসে খেতে জোর করে না। অসুস্থ হয়ে গেলে কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় না। কেন চলে গেলে তোমরা আমায় একা করে? গেলে তো গেলে আমায় সাথে করেই নিয়ে যেতে। আমাকে কেন একা রেখে গেলে এই ভালোবাসাহীন দুনিয়ায়? যেখানে কেউ নিজের স্বার্থ ছাড়া অন্যকে ভালোবাসে না। তোমরা তো ম”রে গিয়ে বেঁচে গিয়েছো আর আমাকে একটু একটু করে ম”রার জন্য পৃথিবীতে রেখে গিয়েছো।
পূর্ণতা কাঁদতে কাঁদতে তার বাবার কবরের সামনে বসে পরে। তারপর কবর আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—বাবা, ও বাবা। উঠো না বাবা। তোমার পূর্ণতা আজ ভীষণ একা অনুভব করছে বাবা। আমার আপন বলতে কেউ নেই বাবা। সবাই আমাকে কষ্ট দেয়, কথার বাণ দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে আমার হৃদয়। কেউ একবার ভেবেও দেখে না আমারও একটা হৃদয় আছে, কথার সূচ আমাকেও বিদ্ধ করে।
বাবা উঠো না, আমি জাওয়াদ সাহেবের জন্য আর কষ্ট পাই না। আর কাঁদব না জাওয়াদ সাহেবের জন্য। আমি যদি জানতাম উনাকে ভালোবেসে আমায় তোমাকে হারাতে হবে, তাহলে বিশ্বাস করো আমি উনাকে ভালোবাসার স্পর্ধা দেখাতাম না। উনি ছিলেন দূর্লভ্যতায় ঘেরা এক শ্যাম রাজকুমার। যাকে পাওয়ার মতো ভাগ্য আমি নিয়ে আসিনি।
জানো বাবা, এখন সে কত আকুতি-মিনতি করে আমার কাছে ফেরার জন্য, তাজওয়াদের বাবা হওয়ার জন্য।কিন্তু এখন এসব করে কোন লাভ আছে বলো? আমার হৃদয়কে সবচাইতে বেশি আহত করেছে আমারই ভালোবাসার মানুষটি। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে রাতের আঁধারে আমাকে বের করে দিয়েছে নিজের বাসা থেকে। আমি এখন কেন তার কাছে ফিরে যাবো? তার কাছে ফিরে যাওয়া কি ঠিক হবে? বাবা বলো না আমি কি করবো? যখন আমি কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম না, তখন তুমিই তো আমাকে সবসময় সঠিক পরামর্শ দুয়ে সাহায্য করতে। আজ কেন বলছো না আমায় তুমি কিছু? কেন আমার কান্না দেখেও তুমি ঘুমাচ্ছো? তার মানে তুমিও আমাকে ভালোবাসো না। পূর্ণতাকে কেউ ভালোবাসে না। সবাই শুধু পূর্ণতাকে ভালোবাসার লোভ দেখিয়ে তাকে ছেড়ে চলে যায়। পূর্ণতার কেউ নেই, কেউ……
—মাম্মা……..
হঠাৎই তাজওয়াদ পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দেয়। সে যখন দেখলো তার মাম্মা মাটিতে পড়ে কাঁদছে, তখন টনি জোর করেও তাকে নিজের কাছে আঁটকে রাখতে পারেনি। সে টনির হাতে কামড় দিয়ে তার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে দৌড়ে পূর্ণতার কাছে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।
পূর্ণতা বহু কষ্টে নিজেকে সামলায়। কারণ সে যদি এখন কান্না বন্ধ না করে তাহলে তাজওয়াদও থামবে না। সে ছেলেকে পিঠের উপর থেকে সরিয়ে নিজের কোলের নিয়ে আসে। অনেক আদর দিয়ে বুঝানোর পর তাজওয়াদ শান্ত হয়। তারপর ছেলেকে কোলে বসিয়েই কবরের দিকে তাকিয়ে চোখে অশ্রু আর ঠোঁটে স্মিত হাসি নিয়ে বলে–
—বাবা, আম্মু দেখো ও আমার ছেলে। তাজওয়াদ আহমেদ আদর। দেখো আজ আমিও মা হয়ে গিয়েছি। আমাকেও কেউ একজন মাম্মা বলে ডাকে। উপরওয়ালা তোমাদেরকে আমার থেকে নিয়ে গেলেও পরিবর্তে তাজওয়াদকে দিয়েছে আমায়। জানো, ও না একদম মা পাগল। আমার এইটুকু ছেলে এখনই আমার পারসোনাল বডিগার্ড হয়ে গিয়েছে। বিষয়টা কি দারুণ না?
মা’কে একটা উঁচু মাটির ডিবির সাথে কথা বলতে দেখে তাজওয়াদ কনফিউজড হয়ে যায়। সে আদো আদো গলায় বলে–
—মাম্মা, তুমি কাল চাতে কতা বলচো? একানে তো তাজ আর মাম্মা ছাড়া কেউ নেই। টনি আঙ্কেল তো কুতো দুলে।
পূর্ণতা ছেলের প্রশ্নের জবাবে বলে–
—কে বলেছে কেউ নেই? এই যে এই দু’টো জায়গা দেখছো না বাবা (কবর দু’টো দেখিয়ে বলে) এখানে আমার আম্মু আর বাবা ঘুমিয়ে আছে। আমি তাদের সাথেই কথা বলছি।
তাজওয়াদ এবার আরো কনফিউজড হয়ে যায়। একে তো সে কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না। দুয়ে, তার মাম্মা বললো তার মাম্মামের আম্মু আর বাবা নাকি ঘুমিয়ে আছে। ঘুমিয়ে থাকলে কথা শুনছে কিভাবে?
তাজওয়াদ নিজের মনের কৌতূহল চেপে না রেখেই পটপট করে বলে–
—মাম্মা তুমাল বাবা আর আম্মু গুমিয়ে তাকলে তোমাল কতা চুনচে কিবাবে? তাজ তো কখনো গুমিয়ে গুমিয়ে কথা শুনতে পালে না।
পূর্ণতা এবার ছেলের প্রশ্নে আরো একবার হেঁসে দেয়। তার ছেলেটা একটা চলতি ফিরতি প্রশ্নব্যাংক। প্রত্যেক কথার পরে তার একটা প্রশ্ন থাকবেই থাকবে। সে সময় নিয়ে বুঝায় তার আম্মু আর বাবা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হয়ে গিয়েছেন আর আল্লাহই তার সকল কথা তার ঘুমন্ত আম্মু আর বাবার কাছে পৌঁছে দিবেন। তাজওয়াদ এরপর আর কোন প্রশ্ন করে না। পূর্ণতারা সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত সেখানে থাকে। মাগরিবের নামাজের কিছুক্ষণ আগেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসে।
কবরস্থান থেকে বের হয়ে পূর্ণতা টনিকে বলে টিএসসি যেতে। সেখানে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করবে ছেলেকে নিয়ে। মনটা এখনও তেমন একটা ভালো নেই তার তাই। টিএসসিতে এসে এত এত মানুষের সমাগম দেখে তাজওয়াদ বিস্ময়ে হা হয়ে যায়। টিএসসি এমন এক জায়গা যেখানে কোন বিশেষ দিনের প্রয়োজন হয় না মানুষের সমাগম হতে। সন্ধ্যার পর যেন সেখানে মানুষের মেলা বসে।
তাজওয়াদ গাড়িতে বসে থেকেই বলে–
—মাম্মা, দিস প্লেস ইজ এক্সট্রিমলি ক্রাউডেড। অ্যান্ড তাজওয়াদ রিয়েলি ডোন্ট ফিল কামফোর্টেবল গোইং।
পূর্ণতা ছেলেকে আশ্বাস দিয়ে বলে–
—বাট ইউ’ল হ্যাভ টু গো, ডিয়ার। হিয়ার আর সো মেনি এক্সাইটিং অ্যান্ড ইন্টারেস্টিং থিংস।
মায়ের থেকে আস্বস্ত হয়ে কিছুটা দ্বিধান্বিত মন নিয়ে তাজওয়াদ গাড়ি থেকে বের হতে সম্মতি দেয়। টনি গাড়িটাকে এক নির্জন জায়গায় পার্ক করে এসে তাদের পেছন পেছন হাঁটতে থাকে। কার্জনে কোন এক ফ্যাস্টিবেল হচ্ছিলো বলে পূর্ণতা ছেলেকে নিয়ে সেখানে ঘুরতে থাকে। ফাঁকে ফাঁকে তাজওয়াদের কিছু পছন্দ হলে সেগুলো কিনে দেয়। বেশ কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরির পর পূর্ণতা ফুচকা খাওয়ার কথা ভাবে।
তাজওয়াদ আজই প্রথমবার ফুচকা দেখছে। সে ভীষণই আগ্রহ নিয়ে ফুচকাওয়ালাকে ফুচকা বানাতে দেখতে থাকে। ফুচকাওয়ালার দোকানে আরো কিছু মেয়ে কাস্টমার থাকে যারা তাজওয়াদের মতো একটা পুতুলকে দেখে হাসাহাসি করতে থাকে নিজেদের মাঝে। তাদের মাঝ থেকে এক মেয়ে পূর্ণতার কাছে এসে বলে–
—আপু, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড একটা প্রশ্ন করতে পারি?
পূর্ণতা আন্তরিকতার সাথে সম্মতি দেয়। তখন মেয়েটি বলে–
—আপু বাবুটা কি বাহিরের কোন দেশে জন্মগ্রহণ করেছে? না মানে ফেইস কাটিং আপনার মতো হলেও এত কিউট বাচ্চা সচরাচর আমাদের দেশে খুব একটা দেখা যায় না। নাকি ভাইয়ার মতো দেখতে হয়েছে?
পূর্ণতা হাস্যোজ্জ্বোল মুখে বলে তাজওয়াদের জন্ম কানাডায় হয়েছে এবং সেখানকার জলবায়ুর কারণে এবং জন্মগত ভাবেই তাজওয়াদ এমন দেখতে হয়েছে। সব শুনে মেয়েগুলো তাজওয়াদকে আদর করার আবদার জানায়। পূর্ণতা সম্মতি দিলে মেয়েগুলো একে একে সবাই তাজওয়াদকে কোলে নিয়ে আদর করে। তারা টানাহেঁচড়ার না করলেও তাজওয়াদ ভীষণ বিরক্ত হয়। সে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলে–
—মাম্মা, দিস গার্লস আর সো এনোয়িং। এরা তাজওয়াদকে বিলক্ত কলছে। তাজওয়াদ কিন্তু এখন লেগে যাচ্ছে, কামুল দিয়ে দিবো কিন্তু চবাইকে।
ছেলের কথা শুনে পূর্ণতা বুঝে যায় ছেলে তার বেশ রেগে গিয়েছে। সে চটজলদি তাজওয়াদকে নিজের কোলে তুলে নেয়। মেয়ে গুলো তাজওয়াদের কথা শুনে আরেক দফা ফিদা হয়ে যায়। এইটুকু বাচ্চার কি এটিটিউড! মেয়েগুলো যাওয়ার আগে অনেকগুলো চকলেট উপহার দিয়ে যায় তাজওয়াদকে। পূর্ণতা নিতে চায় না কিন্তু তারা জোর করে দিয়ে যায়।
এরই মাঝে ফুচকাওয়ালা এক প্লেট ফুচকা দিয়ে যায়। পুরো একটা নাগা মরিচ দিয়ে বানানো ফুচকা টপাটপ কয়েকটা নিজের মুখে চালান করে চোখ বন্ধ করে নেয় পূর্ণতা। প্রায় অনেকগুলো বছর পর খেয়ে আলাদা এক তৃপ্তি পাচ্ছে সে। তাজওয়াদ এবারও আগ্রহী দৃষ্টি নিয়ে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। এক প্লেট শেষ করে আরেক প্লেটে অর্ডার দিয়ে পূর্ণতা ঝালে শোসাতে থাকে। টনি পানির বিক্রি করে এমন ছেলেদের খুঁজলে পায় না, অগ্যাত সে একটু দূরে চলে যায় পূর্ণতার জন্য।
এদিকে সময়ের সাথে সাথে পূর্ণতার ঝাল কমছে না যেন আরো বাড়ছে। চোখে অলরেডি পানি জমে গিয়েছে। গাল দুটো আর ঠোঁট দু’টো টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছে টোকা দিলেই র””ক্ত বের হবে। তাজওয়াদ ভয় পেয়ে যায় মা’কে এমন করতে দেখে। পূর্ণতা ছেলেকে অভয় দিবে কি নিজেই ঝালে কথা বলতে পারছে না।
হুট করে কেউ একজন এক বোতল ঠান্ডা পানি এগিয়ে দেয় পূর্ণতার দিকে। পূর্ণতা কোনদিকে না তাকিয়েই পানিটা নিয়ে এক নিমিষে শেষ করে দেয়। পানি খাওয়া শেষ হতেই ব্যক্তিটি একটা আইসক্রিম খুলে এগিয়ে দেয়। পূর্ণতা সেটাও নিয়ে খেতে থাকে। কয়েক সেকেন্ড পর পূর্ণতার ঝাল একটু কমতেই সে ছেলেকে এক হাত দিয়ে নিজের কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে–
—থ্যাঙ্কস টনি। আইসক্রিমটার ভীষণ প্রয়োজন ছিলো।
পূর্ণতা আগন্তককে টনি ভেবে কথাটা বলে। তখনই পূর্ণতার কথার পরিপ্রেক্ষিতে আগন্তক ব্যক্তিটি গম্ভীর গলায় বলে–
—ওহে কালো জাওয়াদের সুন্দরী বউ! চোখটা একটু খুলে দেখো। আমি তোমার হায়ার করা বডিগার্ড না, বরং তোমার পারসোনাল বডিগার্ড।
ব্যক্তিটির কন্ঠস্বর শুনে পূর্ণতার আইসক্রিম মুখ দিয়ে বের হয়ে যায় ফিক করে। সে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকালে দেখতে পায় তার ধারণাই সঠিক। জাওয়াদ এসেছে। মুখে সুন্দর একটা হাসি ঝুলছে যেটা দেখে আগে প্রায়ই প্রায়ই জাওয়াদের প্রেমে আছাড় খেতো পূর্ণতা।
নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে পূর্ণতা চোখেমুখে বিরক্তি নিয়ে বলে–
—আপনি? আবারও? বাই এনি চান্স আপনি কি আমাদের স্টক করছেন? নাহলে হুটহাট যখন-তখন, যেখানে-সেখানে কিভাবে টপকে যাচ্ছেন?
জাওয়াদ পূর্ণতার পাশের চেয়ার কিছুটা গা এলিয়ে বসে। মাথা পেছনের দিকে এলিয়ে রেখেই পূর্ণতার দিকে ফিরে বলে–
—বেহুদা কথা বলা শিখেছো ইদানীং বেশি। নিজের বউ-বাচ্চাকে পাহারা দিলে সেটাকে স্টক করা বলে? তোমাদের চোখে চোখে রাখছি যাতে আবারও ফাঁকি দিয়ে হারিয়ে যেতে না পারো।
জাওয়াদের কথা শুনে পূর্ণতা প্রহসন মূলক হাসি দেয় একটা। তারপর আবারও আগের মতো চোয়াল শক্ত করে বলে–
—বেহুদা কাজও করতাম আগে, যার ফল ভুগছি আজও। সে যাইহোক, আমাদের এমন স্টক করা বন্ধ করুন নাহলে আমি পুলিশে কমপ্লেন জানাতে বাধ্য হবো।
জাওয়াদ ক্লান্ত হাতে নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে কিছুক্ষণ টাইপ করে, তারপর একটা নাম্বারে কল দিয়ে কানে লাগিয়ে কথা বলতে থাকে—
—হ্যালো ইন্সপেক্টর শরাফাত মির্জা বলছেন?। আমি জাওয়াদ শেখ বলছি। আমার বউ আপনার কাছে কমপ্লেন করতে চায় আমার নামে, জাস্ট বিকজ আমি তাদের উপর নজরদারি করছি যাতে সে যেনো লুকিয়ে লুকিয়ে আমার সন্তানসহ দেশ ছেড়ে চলে যেতে না পারে। আমাদের ডিভোর্স হয়নি, এবং একটা ভুল বুঝাবুঝির জন্য আমরা পাঁচ বছর একে অপরের থেকে দূরে ছিলাম। আমি এখন অনুতপ্ত এবং নিজের ভুল বুঝতে পেরে আমার স্ত্রীকে ফিরে পেতে চাই। কিন্তু সে অভিমান করে রয়েছে। আপনি কি আমার বউয়ের কমপ্লেন নিবেন? নিলে টিএসসিতে এসে পরুন, আমি এখানেই পাবেন।
পুলিশ অফিসার আর পূর্ণতা দু’জনই বেআক্কল হয়ে যায় জাওয়াদের কথা ও কাজে। পুলিশ লোকটা ভাবে, এ কোন পাগলছাগল ফোন দিলো ভরসন্ধ্যায়। কিন্তু অফিসার শারাফাত চটজলদি নিজেকে সামলে নিতে সক্ষম হয়, আর ফোনটা পূর্ণতাকে দিতে বলে। জাওয়াদ নিজের ফোনটা পূর্ণতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে–
—নাও, কি কি ধারায় কেস করবে আমার উপর সে বিষয়ে কথা বলে নাও আগেভাগে।
জাওয়াদের কথা শুনে পূর্ণতার চোখ কোটর ছেড়ে বের হয়ে আসতে চায়। এই লোক এত শয়তান কি করে হলো? পূর্ণতা একটু দ্বিধান্বিতভাবেই ফোনটা কানে তুলে। তখন ইন্সপেক্টর শারাফাত মির্জা বলেন–
—ম্যাম, আমি জানি না আপনাদের মাঝে কি হয়েছে। কিন্তু যাই হয়ে যাক সেটার পর একটা লম্বা সময় পাড় হয়ে গিয়েছে। এবং আপনার হাসবেন্ড এখন অনুতপ্ত। অনুতপ্ততার উপর আর কিছু হতে পারে না। ক্ষমা মহৎ গুণ। অভিমানের জেরে বিয়ের মতো একটা সম্পর্ক শেষ করবেন না। আপনার স্বামী যেহেতু এখনও আপনাকে এতটা ডেস্পারেটলি চাইছেন তার মানে তার ভালোবাসা খাঁটি। যা হয়েছে মিটিয়ে নিয়ে সংসার করুন।
পূর্ণতা শান্ত গলায় ইন্সপেক্টরকে বলে–
—তার দেওয়া কষ্ট আমার রুহতে দাগ কেটে গিয়েছে। এত সহজে ভোলা সম্ভব নয় ইন্সপেক্টর। তার দিকে তাকালেই আমার সেসব কষ্টের দিনের কথা মনে পড়ে যায় যেদিন গুলোতে আমার ছায়া ব্যতীত আর একটা মানুষও আমার পাশে ছিলো না। এগুলো ভোলা কি এতই সহজ? আপনি উনার কথা শুনে আমায় পরামর্শ দিলেন, এখন আমার কথা শুনে প্লিজ উনাকে বুঝান, আমি তাকে ছাড়া নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছি। সঙ্গী ছাড়াও লাইফ লিড করা যায় এটা তাকে বুঝান। রোজ রোজ তার এত স্টক, জ্বালাতন আমি জাস্ট নিতে পারছি না।
কথাগুলো বলে পূর্ণতা ফোনটা জাওয়াদের কোলের উপর ঢিল দিয়ে ছুড়ে মে””রে সেখান থেকে উঠে যায়। তারপর ফুচকাওয়ালা দোকানদারকে বিল দিয়ে সে তাজওয়াদকে নিয়ে হাঁটা দেয়। জাওয়াদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা কানে তুলে বলে–
—সরি শারাফাত, কাজের সময় তোমায় ডিস্টার্ব করার জন্য।
—আরে সমস্যা নেই। কিন্তু ভাবীর কথা শুনে যা মনে হলো, তার অভিমানের বরফ গলানো সহজ নয়। যা ব্লান্ডার করে রেখেছো তা সহজে মিটমাট করা যাবে না। তাই বলবো, হতাশ না হয়ে লেগে থাকো। আগেরবার বিনা পরিশ্রমে ভাবীকে পেয়ে গিয়েছিলে, তাই যথাযথ কদর করতে পারো নি। এবার না হয় একটু খেটেখুটে আদায় করলে নিজের সুখকে।
শারাফাতের কথা গুলো শুনে জাওয়াদ মনে মনে এক আলাদা শক্তি পায়। সে বসা থেকে উঠতে উঠতে বলে–
—থ্যাঙ্কস ইয়ার। তোমার মতো শুভাকাঙ্ক্ষী থাকা ভাগ্যের।
—মাই প্লেজার।
হাসিমুখে কথাটা বলে শারাফাত কলটা কেটে দেয়। জাওয়াদ ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে দেখে পূর্ণতা তাজওয়াদকে নিয়ে বেশ খানিকটা দূরে চলে গিয়েছে। সে ছুট লাগায় সেদিকে। একদম পূর্ণতার সমানে এসে থেমে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে–
—একটু আস্তে দৌড় করাও বউ, বয়স হচ্ছে আমার। এই বয়সে মানুষ বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে আর আমি আমার বউয়ের পেছন পেছন দৌড়াচ্ছি।
—তো আমি বলেছি আমার পেছন পেছন দৌড়ান।ওয়েট অ্যা মিনিট, এসেছেন ভালো করেছেন। আপনার পানি আর আইসক্রিমের দামটা তো দেওয়াই হয়নি।
জাওয়াদ মলিন চোখে পূর্ণতার দিকে তাকায়। বউকে পানি আর আইসক্রিম খাইছে বলে সেটার টাকা নিবে? এতটা পর করে দিচ্ছে পূর্ণতা তাকে।
পূর্ণতা ব্যাগ থেকে একশ টাকার দুটো নোট বের করে জাওয়াদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে–
—বিপদের সময় করা সাহায্যের মূল্য সবসময়ই বেশি হয়। তাই বেশিই দিলাম। নিন ধরুন।
জাওয়াদ একবার পূর্ণতার দিকে তাকায় আরেকবার তার ধরে রাখা টাকার দিকে। তারপর হঠাৎই তার মাথায় একটা শয়তানি বুদ্ধি খেলে যায়। সে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বলে–
—তুমি আমার ধার সত্যিই সোধ করতে চাও?
—করতে চাই বলেই তো টাকাটা দিলাম। নিন ধরুন।
—কিন্তু আমি তো টাকা নিবো না। যেহেতু তোমার বিপদে আমি সাহায্য করেছি, তাই সাহায্যের মূল্যটাও আমিই নির্ধারণ করব।
—আচ্ছা বলুন কত টাকা লাগবে? সাহায্য যখন নিয়েছি তখন সোধ তো করতেই হবে।
—বেশি কিছু চাই না গো আমি। জাস্ট একটা গরম গরম নরম নরম চুমু দিলেই আমি সোনামুখ করে হেলতে দুলতে বাসায় চলে যাবো। তারপর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নে তোমার সাথে…. ইয়ে মানে….
দাঁত কেলিয়ে কথাগুলো বলে জাওয়াদ। পূর্ণতা তার কথা শুনে চোখ বড় বড় করে নিয়ে লাগায় এক ধমক–
—চুপপপপপপ……
তারপর পূর্ণতা রেগেমেগে টাকাগুলো জাওয়াদের প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে তাজওয়াদকে নিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে আসতে থাকে। ফোন দিয়ে টনিকে গাড়ির কাছে আসতে বলে সে গাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকে। জাওয়াদ হাসতে হাসতেই পূর্ণতার পেছন পেছন হাটতে থাকে। আজকের মতো নাকানিচুবানি সে আর কখনোই খাওয়ায়নি পূর্ণতাকে। কারণ কাজটা তো পূর্ণতার ছিলো। সবসময় জাওয়াদকে নাকানিচুবানি খাওয়ানো।
টনি পানি নিয়ে গাড়ির কাছে যেতে যেতে পূর্ণতাও পৌঁছে যায়। পূর্ণতা তাজওয়াদকে নিয়ে গাড়িতে উঠতে যাবে তখনই তাজওয়াদ তাকে থামিয়ে দেয়। তারপর আদো আদো গলায় বলে–
—মাম্মা, আমাকে দুটো চক্কেত দাও তু।
পূর্ণতা কপাল কুঁচকে বলে–
—বাসায় যেয়ে খেও বাবা। রাস্তায় খেতে হবে না।
—আহা মাম্মা দাও না। আমি কাবু না তো।
—তো কি করবে?
—তুমি দাও না আমালে। একতা কাজ কব্বো।
পূর্ণতা তার ব্যাগ থেকে দুটো চকলেটের প্যাকেট বের করে দেয়। চকলেট গুলো হাতে নিয়ে তাজওয়াদ পূর্ণতার থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পেছনে জাওয়াদের দিকে হাঁটতে থাকে। পূর্ণতা ছেলের পেছন ডেকে উঠলে তাজওয়াদ বলে–
—আমি আচ্চি মাম্মা, তুমি একতু দালাও
পূর্ণতা অবাক দৃষ্টি নিয়ে তাজওয়াদের কর্মকাণ্ড দেখতে থাকে। শুধু সে নয়, টনি আর জাওয়াদও অবাক হয়ে যায়। তাজওয়াদ জাওয়াদের সামনে এসে ভ্রু কুঁচকে বলে–
—অ্যাঁই একতু নিচু হও তো।
জাওয়াদ ছেলের কথামতো বিনা বাক্য ব্যয়ে একহাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। সে বসার পর তাজওয়াদ চকলেটগুলো জাওয়াদের হাতে দিয়ে বলে–
—থ্যাঙ্কস ফর হেল্পিং মাই মাম্মা। তুমি বেশি বেশি পঁচা না এখন আল, একতু ভালোও আচো। তাই তাজ আজ থেকে তুমাকে মন্সটার বলে ডাকবে না। আর এগুলো তুমাল জন্য।
তাজওয়াদের কথা শুনে জাওয়াদের খুশিতে মনটা নেচে ওঠে। তার ছেলে তাকে ভালো বলেছে। তাকে চকলেট গিফট দিয়েছে এত খুশি কই রাখবে। জাওয়াদের ইচ্ছে করে ছোট এই পুতুলটাকে নিজের বুকে পুড়ে নিতে। আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে লাল টমেটো হয়ে থাকা গাল দু’টো। কিন্তু সে তা করে না। নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলে–
—ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম মাই প্রিন্স।
জাওয়াদের “মাই প্রিন্স” বলা শুনে তাজওয়াদ নিজের ভ্রু আরো কুঁচকে নেয়। তারপর বড়দের মতো গম্ভীর ভাব নিয়ে বলে–
—আ’ম নট ইউর প্রিন্স। আ’ম জাস্ট মাই মাম্মাস প্রিন্স, এন্ড শি ইজ মাই কুইন।
জাওয়াদ ছেলের কথায় হেসে দেয়। তাজওয়াদ পুনরায় মায়ের কাছে এসে পড়ে। তারপর তার হাত ধরে গাড়িতে করে চলে যায়।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন]
শব্দসংখ্যা~২৬০৩
~চলবে?
[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫