শেষ পাতায় সূচনা [৩১]
সাদিয়াসুলতানামনি
আহনাফ সাহেব নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে একহাঁটু গেঁড়ে তাজওয়াদের চেয়ারের সামনে বসে পড়ে। তারপর তাজওয়াদকে বলেন–
—আচ্ছা নানা ভাই, তুমি যদি দাঁত ব্রাশ না করো প্রতিদিন, দুষ্টুমি করো তাহলে তোমার মাম্মা তোমাকে কি আদর দিবে নাকি রাগ করবে তোমার উপর?
তাজওয়াদ তার প্রশ্ন শুনে ভাবুক হয়ে যায়। কিছুক্ষণ ভেবে পরে আদোও আদোও গলায় বলে–
—মাম্মা আমাল উপলে এত লাগ করে না, তাও এসব কললে লাগ করবে না কিন্তু কথা একটু কম বলবে। আর মুখটা (নিজের মুখে বাতাস ভরে গোল করে) এমন করে রাখবে। তখন তাজের মনটা স্যাড স্যাড হয়ে যাবে।
তাজওয়াদের মুখভঙ্গি দেখে সকলে আরেক দফা হেঁসে নেয়। হাসাহাসি থামিয়ে আহনাফ সাহেব বলেন–
—আমার ক্ষেত্রেও বিষয়টা তাই হয়েছে। আমি তো এখন তাজওয়াদের নানাভাই হয়ে গিয়েছি না, তাই তোমার মাম্মামের মতো মুখটা ফুলিয়ে রাখতে পারছি না। তোমার মাম্মা তো ছোট তাই মুখ ফুলায় এখনও।
আহনাফ সাহেবের কথা শুনে পূর্ণতা মেকি রাগ দেখিয়ে বলে–
—বড় বাবা, আমি ছোট না। বরং আমার নিজেরই একটা ছোট বাচ্চা আছে। আমি এখন বড় হয়ে গিয়েছি।
একটু ভাব নিয়ে নাকে আঙুল ডলে বলে। আহনাফ সাহেব এবার দাঁড়িয়ে পূর্ণতার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন–
—বাবা-মায়ের কাছে সন্তানরা কখনোই বড় হয় না আম্মাজান। তুমি আমার কাছে এখনও সেই চঞ্চল, আদুরে আহ্লাদী পূর্ণতা রয়েছো। যে কিনা প্রতিদিন আমি অফিস থেকে ফিরতেই ছুটে আরিয়ানের আগে আমার কোলে চড়তে। তারপর আবদারের ঝুলি খুলে বসতে।আমার মাথা ব্যথা হলে, তোমার ছোট ছোট কোমল হাতজোড়া দিয়ে মাথা টিপে দিতে। পার্থক্যটা এখন শুধু এইটুকু, এখম এসব কিছুই হয় না। সময়ের ব্যবধানে আমাদের মধ্যে একটা বড় দূরত্ব আসলেও, তুমি সবসময় আমার সেই ছোট পূর্ণতা মা’ই থাকবে।
পূর্ণতার চোখ ছলছলিয়ে ওঠে অশ্রুতে। তার মনে পরে যায় সেই সোনালী দিনগুলোর কথা। তখন সে সম্ভবত সারে ছ বা সাত বছরের হবে। তারা অনেক সুখেই ছিলো। বাবা-মা, বড় বাবা-বড় মা, আরিয়ান আর সে। তার দুই ফুপি আছে। একজন মারা গিয়েছেন অনেক আগেই আরেকজন বেঁচে আছেন। কিন্তু ভিন্ন জেলায় বিয়ে হওয়ায় যাওয়া-আসা তেমন একটা নেই বললেই চলে। নানাবাড়ির সাথে তার সম্পর্ক ভালো থাকলেও, তার মায়ের এক্সিডেন্টের পর থেকে তার নানাভাই আর নানুমনি তাকেই দোষী বলে একেবারে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে আহমেদ বাড়ির সাথে।
সে আর আরিয়ান সারাদিন বাড়ি মাতিয়ে রাখত। সে মেয়ে বলেই বোধহয় সকলের একটু বেশিই আদর পেতো। আরিয়ানকে নানান ভাবে হেনস্তা করে নিজেই ভিক্টিম হতো। তাই বলে সে তার ভাইকে কম ভালোবাসে এটা কিন্তু নয়। আরিয়ানের সামান্য জ্বর আসলেও সে কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে যেতো। সবাই তাকে আর আরিয়ানকে একই মায়ের সন্তান বলত তাদের বন্ধন দেখে। কিন্তু সবকিছু বদলে যায় তার মায়ের মৃ””ত্যুর পর থেকে। সবার আগে পরিবর্তন হয় অজান্তা বেগম। একদম হুট করেই সে এমন একটা ব্যবহার শুরু করে পূর্ণতার সাথে যে, পূর্ণতা আর তার সাথে মেশার সাহস করে উঠতে পারে না।। তারপর কীভাবে কীভাবে যেন বড় বাবা, আরিয়ান ভাইয়ের সাথেও তার একটা দূরত্ব চলে আসে। তার দুনিয়া হয়ে ওঠে তার বাবা, আর তার বাবার দুনিয়া সে।
এভাবেই সে বড় হতে লাগল, বাইশ বছর বয়সে এসে সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ও শ্রেষ্ঠ ভুলটা করল। যার দরুন নিজের আত্মাকে তো কষ্ট দিলোই, সেই সাথে হারালো নিজের জন্মদাতাকে। কিন্তু শুধু হারালে বললে ভুল হবে, তার বিনিময়ে পেয়েছে এক নতুন জানকে। যার আগমন ঘটেছে স্বয়ং পূর্ণতার মাধ্যমে।
পূর্ণতা মুখটা বেশখানিকটা নামিয়ে বাম হাত দিয়ে চোখের কোণ মুছে নেয়। তারপর মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলে–
—এখন আবার আবদার করবো। সাথে আমার ছেলেও থাকবে। যদি পূরণ না করতে পারো আমি ভীষণ রেগে যাবো কিন্তু বড় বাবা। তোমার মাথা ব্যথা হলেও তখন টিপে দিবো না।
—করিস মা। তাও দূরত্ব বাড়িয়ে রাখিস না। আমাদের তোরা আর তোর আমাদের ছাড়া আর আছেই বা কে? নিজেকে একা ভাবিস না, তোর এই বড় বাবাকে তুই সবসময় পাশে পাবি মা।
—আমিও আছি কিন্তু বোনু।
পাশ থেকে আরিয়ান বলে ওঠে। পূর্ণতা হেঁসে দেয় তার কথা শুনে। এত সুন্দর একটা ফ্যামিলি টাইমকে জাস্ট বিরক্তিকর ড্রামা ছাড়া আর কিছুই লাগে না আঞ্জুমানের।
পূর্ণতা আজকের দিনটা রেস্ট নিবে, কাল থেকে অফিস করা শুরু করবে। বাড়িতে বর্তমানে সে, তাজওয়াদ ও মি. এন্ড মিসেস আহমেদ। আঞ্জুমান আর আরিয়ান বেরিয়েছে বাহিরে ঘুরতে সেই ব্রেকফাস্ট করেই। পূর্ণতা একটু সুযোগ পাচ্ছে না আঞ্জুমানের সাথে দুদণ্ড কথা বলার। সে কথা বলে বুঝতে চায় তার আসল উদ্দেশ্য কি? কেনোই বা সে জাওয়াদকে ছেড়ে আরিয়ানের বউ হলো? সে কি আসলেই ভালো হয়েছে নাকি পূর্বের মতোই রয়ে গিয়েছে। যদি তাই হয় তাহলে তার আসল রূপের সাথে এই বাড়ির লোকদের পরিচয় করানো উচিত। গত কয়েকদিনে সে যতটুকু পর্যবেক্ষণ করলো, তা থেকে এটাই বুঝতে পারলো যে আরিয়ানরা কেউই আঞ্জুমানের কুকীর্তি সম্পর্কে জানে না। এখন কেন জানে না সেটাই বড় প্রশ্ন।
সে তাজওয়াদকে তাদের বাড়িটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলো তখন তার বড় বাবার রুম থেকে কথা প্রচন্ড কাটাকাটির শব্দ শুনতে পায়। ঐ রুমটা ক্রস করে আসার সময় এমন কিছু কথা শুনে যা তাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। অজান্ত বেগম উঁচু গলায় বলছে–
—গত পাঁচ বছর আপনার ভাতিজি কই ছিলো? আমার ছেলে কত কষ্ট করে ব্যবসাটাকে এখনও টপে রেখেছে, সে আজ কোন আক্কেলে এসে ব্যবসার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে চায়? আর ওর কিসের অধিকার আছে এই সম্পত্তিতে? বিয়ে বসেছিলো না এক ছোট লোককে, সংসার টাও করতে পারল না। তিনমাসের মাথায় চলে আসল। বিয়ের পর ভাই হিসেবে তো আরিয়ানেরই সব পাওয়ার কথা। ও কেন ফিরে এসে এসব দাবী করছে? আর তোমরাই বা কেনো মেনে নিচ্ছো? এমন এক অপয়া মেয়ে, মাকে খেয়ে আবার বাপটাকেও খেলো। এখন আবার ব্যবসার পেছনে লেগেছে।
—অজান্তাআআআ……….
আহনাফ সাহেব স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতে গিয়েও থেমে যান। প্রিয় ভাতিজিকে নিয়ে এত বাজে বাজে কথা বললে কার না রাগ লাগবে? সেও উঁচু গলাতেই বলে–
—এসব যদি আর একদিন শুনি তোমায় বলতে তাহলে ঐদিনই হবে তোমার এই সংসারে শেষ দিন। আমার পূর্ণতা মায়ের কিসের অধিকার ঐ বিজনেসে মানে? ওটা ওর বাবার রক্ত পানি করে গড়ে তোলা ব্যবসা, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আমার ছোট ভাইটা ব্যবসার পেছনে ছুটেছে, যাতে ওর কিছু হয়ে গেলে জন্মদুঃখিনী মেয়েটাকে কারো দাঁড়ে দাঁড়ে না ঘোরা লাগে। ঐ ব্যবসার দিকে লোভ নিয়ে তাকালে আল্লাহ নারাজিতে আমরা শেষ হয়ে যাবো। এতিমের সম্পদ আত্ম হরণ করার এ কি নিকৃষ্ট পরিকল্পনা তোমার হ্যাঁ? বিবেক বুদ্ধি কি সব লোপ পেয়েছে?
আহমেদ গ্রুপ কোনদিন আরিয়ানের ছিলোই না, আর না হবে। ও এতদিন শুধু পাহারা দিয়েছে ব্যবসাটা। এখন এটার মালিক এসে বুঝে নিচ্ছে নিজের আমানত। আমার বিজনেস হয়ত এত বড় না, কিন্তু তাই বলে এত ছোটও না যে নিজের এতিম ভাতিজির সম্পদ আত্মসাৎ করবো। আল্লাহকে ভয় করো অজান্তা আর লোভ পরিত্যাগ করো। এই লোভ তোমাকে একদিন এমন পরিস্থিতিতে ফেলবে, সেদিন তুমি কেঁদেও কুল পাবে না।
কথাটা বলে আহনাফ সাহেব রুমের বাহিরে চলে যাওয়ার জন্য হাঁটা দেয়। এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে ঝগড়াটা আরো বড় পরিসরে হতে পারে, তখন পূর্ণতার কানে গেলে মেয়েটা ভীষণ কষ্ট পাবে।
পূর্ণতা পায়ের শব্দ শুনে বুঝতে পারে আহনাফ সাহেব রুম থেকে বের হবেন এখন, তাই সে চটজলদি সেখান থেকে সরে যায়। ছেলেকে নিয়ে রুমে চলে আসে। তাজওয়াদকে কার্টুন চালিয়ে দিয়ে নিজে ওয়াশরুমে চলে যায়। অনেকক্ষণ নিজের চোখেমুখে পানির ঝাপটা দেয়। এসব কথা সে সহ্য করতে পারে না। সে বাহিরে যতই শক্ত দেখাক না কেন, দিনশেষে সে তো মেয়ে। তার মনটাও ফুলের মতোই কোমল। আপনজনদের এমন নিকৃষ্ট রূপ কেই বা সহ্য করতে পারে?
অজান্তা বেগমের এসব আচরণ সহ্য করতে পারত না বলেই সে চলে গিয়েছিল কানাডা। তার চরম দুঃখের সময় সে পূর্ণতার পাশে এসে দাঁড়াবেন কি, উল্টো কটু কথা বলে তার জীবনটাকে বিষিয়ে দিয়েছিল। পূর্ণতার বেশ কিছুক্ষণ লাগিয়ে নিজেকে শান্ত করে। তারপর আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে নিজেই বলে–
—এই বিজনেস আমার বাবার, আমার বাবার রক্ত ঘাম বানিয়ে গড়ে তোলা এই সাম্রাজ্য। সেটা পরিচালনার জন্য আমাকে ভরসা করে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন বাবা। আমাকে আমার বাবার ভরসা, বিশ্বাসের মান রাখতে হবে। তার সারাজীবনের কষ্টে গড়ে তোলা এই বিজনেসের দিকে কেউ চোখ তুলে তাকালে আমি তার চোখ তুলে নিতে দ্বিতীয় বার ভাববো না। বহুত ভালোমানুষি দেখিয়েছি, সকলে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবেসেছি। কিন্তু দিনশেষে কষ্ট, ধোঁকা আর একাকিত্ব ব্যতীত আর কিছুই পায়নি। এবার নিজেকে নিয়ে ভাববার সময়। নিজের জন্য বাঁচার সময়। আমার সন্তানের জন্য ভাববার সময়।
বিকেলে পূর্ণতা তাজওয়াদকে নিয়ে বের হয় বাহিরে যাবার জন্য। গন্তব্য তাদের পারিবারিক কবরস্থান, যেখানে শায়িত আছে তাকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসা মানুষ দু’টি। তার জন্মদাতা ও জন্মদায়িনী। তাদের সাথে সবসময়ের মতোই রয়েছে টনি। সে বডিগার্ড ও ড্রাইভার দুইয়েরই দায়িত্বে রয়েছে।
পূর্ণতার গাড়ি বের হতেই দূর থেকে একজন লোক তার বসকে ফোন দেয়। বস ব্যস্ত হাতে ফাইল সাইন করছিলো, তখনই পূর্ণতাদের উপর নজর রাখার জন্য নিয়োজিত লোকটির ফোন দেখেই সব ব্যস্ততা ফেলে ফোন রিসিভ করে। ফোন রিসিভ করতেই স্পাই বলে–
—বস ম্যাম গাড়ি নিয়ে বের হয়েছে। সাথে ছোট স্যার আর ম্যামের বডিগার্ড রয়েছে।
লোকটা নিজের দায়িত্ব পূরণ করে বসের পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু বস কিছু না বলেই কল কেটে দেয়। তারপর নিজের পি.এ.কে বলে–
—গাড়ি বের করো হুমায়ূন। আমি বের হবো।
বসের নির্দেশনা পাওয়া মাত্রই ড্রাইভারকে ফোন দিয়ে গাড়ি বের করতে বলে হুমায়ূন। হ্যাঁ পূর্ণতার উপর নজরদারি করা ব্যক্তিটি আর কেউ না বরং জাওয়াদ নিজেই। জাওয়াদ খসখস করে ডিলের পেপারে সাইন করে দিয়ে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তার সামনের চেয়ারে বসে থাকা “আভরণ” কোম্পানির মালিক মি.খসরু আলম ও তার কন্যা আভিরা আলমও উঠে দাঁড়ায়। আজ জাওয়াদের কোম্পানির সাথে “আভরণ” কোম্পানির নতুন ডিল সাইন করেছে। শেষবারের মতো জাওয়াদ খসরু আলম সাহেব ও আভিরার সাথে হ্যান্ডশেক করে। তারপর বরাবরের ন্যায় গম্ভীর গলায় জাওয়াদ বলে–
—আজ আমায় উঠতে হচ্ছে মি.আলম। একটা ইমপোর্টেন্ট কাজ পরে গিয়েছে।
মি.আলম কিছু বলবেন তার আগেই আভিরা এক আবেদনময়ী হাসি দিয়ে বলে–
—লেটস গো ফর অ্যা ডিনার মি.শেখ।
জাওয়াদ স্পষ্ট গলায় আভিরার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে আন্তরিক ভাবে বলে–
—সরি মিস আলম আমাকে আপনার প্রপোজালটা রিজেক্ট করতে হচ্ছে। অন্যকোন দিন হবে ডিনার যাওয়া, যেহেতু এখন আমরা বেশ কিছুদিন একসাথে কাজ করবো। কিন্তু আমাকে এখন সত্যিই যেতে হচ্ছে।
আভিরার জাওয়াদের ব্যক্তিত্ব, কথা বলার স্টাইল, আন্তরিকতা মনে ধরে যায়। সে জাওয়াদের কথা মেনে নেয়। তারা তিনজন একসাথেই অফিস থেকে বের হয়। পার্কিংলটে এসে আরো একবার সে মি.আলম ও আভিরার থেকে বিদায় নিয়ে সে তার গাড়ি দিকে যেতে যেতে হুমায়ূনকে বলে–
—মাহবুব ছাগলটাকে কাল থেকে অফিসে আসতে বল হুমায়ূন। শালার ঘর-সংসার হয়ে গিয়েছে তো তাই আর বাসা থেকে বের হতে মন চায় না৷ এ কেমন বন্ধু আমার বল তো? কই অফিসে এসে আমাকে সুযোগ করে দিবে আমার বউটার মান-অভিমান ভাঙাতে সময় করে দিয়ে, তা না করে ও বউ-বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সত্যি বলছি, ও যদি কাল থেকে অফিসে না আসে, তাহলে ওর বউকে বাচ্চাসহ হানিমুনে ট্রিপে পাঠিয়ে দিবো ওকে অফিসে রেখেই।
ওকে বলবি, আমি কিছুদিন আমি অফিসে আসবো না। তোর ম্যামের রাগ ভাঙানোর মিশনে নামবো। ও’ যেন অফিসে রেগুলার আসে।
বসের কথা শুনে হুমায়ূনের পেট ফেটে হাসি বের হতে চায়। কিন্তু জাওয়াদের শক্ত চোখমুখ দেখে হাসিটা চেপে রেখে বসের কথায় সম্মতি দেয়। তার দুই বসই বউ পাগল। জাওয়াদের পি.এ. সে তিনবছর ধরে। যেহেতু জাওয়াদ তাদের মার্কেটিং দিকটা দেখে তাই স্বাভাবিক ভাবেই জাওয়াদকে একটু বেশিই চাপ নিতে হয়। অন্যদিকে মাহবুব ডিজাইনিং সেকশন পরিচালনা করে। তার আলাদা পি.এ. আছে। কিন্তু সে এই দু’জনকে বেশ ভালো করেই চিনে।
মাহবুব বউয়ের কথায় উঠে বসে। করবেই বা না কেনো? তার বউ সায়রী তার সবচাইতে কঠিন সময় গুলোর একমাত্র সঙ্গী। পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিলো বলে সায়রীর বাবা-মা শুরুতে মেনেই নেয়নি তাদের বিয়ে। কিন্তু সাড়ে চার বছর আগে যখন মাহবুব এই বিজনেস শুরু করলো আর আস্তে আস্তে সফলতা পেতে থাকল তখন তারা মেনে নেয়। বিজনেস শুরুর সময় জাওয়াদ ও মাহবুবের মূল্যধন খুবই সামান্য ছিলো। কিন্তু তারা নিজেদের প্রতিভা ও যোগ্যতা দ্বারা আজ এই পর্যন্ত এসেছে। মাঝে একবার বিজনেসে অনেক বড় একটা লস খেয়েছিলো তারা, ব্যাংক থেকেও লোন দিচ্ছিলো না তখন তাদের। তখন সায়রী তার বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া জমি ও অলংকার মাহবুবের হাতে তুলে দেয়। জাওয়াদের পরিবার থেকেও নিজেদের সবটা তুলে দেয় জাওয়াদকে। তারা দু’জন আবারও শুরু করে সবটা এবং এবারও তারা সফল হয়। পরবর্তীতে তারা নিজেদের পরিবারকে সেসব ফিরিয়ে দিয়েছে, উপরন্তু আরো বেশিই দিয়েছে। কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানো মানুষগুলোই তো প্রকৃত ভালোবাসার মানুষ।
আর জাওয়াদ এই পাঁচ বছরে আরেক বউপাগলে পরিণত হয়েছে। তার মতো এক কালো মানবকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসা মেয়েটাকে বিনা দোষে কতটা কষ্ট দিয়েছে সেগুলো যখন মাঝে মধ্যে মনে পরে তার, তখন নিজেকে নিজেই আহত করে সে। বিয়ের পরের দিন গুলোর কথা মনে করে প্রায়ই রাত কেঁদে পাড় করে।
জাওয়াদ নিজের গাড়ি চালিয়ে চলে যায় বউয়ের পিছু নিতে। এদিকে পেছনে ফেলে রেখে যায় দ্বিধান্বিত, হতভম্বিত আভিরাকে, যে কিনা কিছুক্ষণ আগেই পূর্ণতার শ্যামসুন্দর পুরুষের উপর বড় মাপের একটা ক্রাশ নামক বাঁশ খেয়েছিল। তার একটা ফোনকল আসায় গাড়ির বাহিরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো, তখনই জাওয়াদের কথাগুলো শুনতে পায়। শুনে তো তার টায় টায় ফিস হয়ে গিয়েছে। সে জাওয়াদকে সিঙ্গেল ভেবেছিল, কিন্তু আজ জানতে পারল সে ম্যারিড। আসলে তারও কোন দোষ নেই, জাওয়াদের বিয়ে সম্পর্কে তার কাছের লোক ব্যতীত খুব একটা মানুষ জানে না।
হুমায়ূন যখন আবারও অফিসে চলে যাচ্ছিলো তখন আভিরা তাকে পেছন থেকে ডেকে ওঠে, তারপর জিজ্ঞেস করে–
—মি. জাওয়াদ কি ম্যারিড?
হুমায়ূন একটু ইতস্তত করে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে, কারণ যেখানে তার বসই বিষয়টা পাবলিক করেনি সেখানে তার বলা ঠিক হবে নাকি সে বুঝতে পারছে না। পাঁচ বছর আগে পূর্ণতার নিজের এমপ্লয়িকে বিয়ে করা নিয়ে কনট্রোভার্সি উঠলেও জাওয়াদকে খুব কম লোকই চেনে তার স্বামী হিসেবে। একদমই হাতে গোণা কয়েকজন ছাড়া তেমন কেউ জানে না। আর পূর্ণতার অফিসের কর্মচারীরা জানলেও পরবর্তীতে পূর্ণতা হুট কানাডা চলে যাওয়ায় তারা ভেবেই নেয় পূর্ণতার ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। এজন্য তারাও বিষয়টা নিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি করেনি।
আভিরা বিচক্ষণ মেয়ে হওয়ায় হুমায়ূনের ইতস্ততা টের পেয়ে যায়। তাই সে হুমায়ূনকে আস্বস্ত করে এই বিষয়টা সে পাঁচ কান করবে না। তখন হুমায়ূন বলে–
—জ্বি স্যার ম্যারিড। এর বেশি বলার অনুমতি নেই আমার ম্যাম।
—আচ্ছা, থ্যাঙ্কস আপনাকে।
হুমায়ূন চলে যায় নিজের কাজে। অন্যদিকে আভিরা তার আধা ভগ্নহৃদয় নিয়ে নিজেদের গাড়িতে চড়ে বসে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন।]
শব্দসংখ্যা~২১৫০
~চলবে?
[প্রচন্ড রাইটং ব্লকে ভুগছি তাই গল্প দিতে এমন দেরি হচ্ছে।💔😑
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা গল্পের লিংক
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৬