শেষ পাতায় সূচনা [১৮]
সাদিয়াসুলতানামনি
প্রায় ভোররাতে ঘুমিয়েও পূর্ণতার ঘুম সকাল সকালই ভেঙে যায়। এমনি এমনি ভাঙেনি, বুকের উপর প্রচন্ড তাপের কারণে তার ঘুমটা ভেঙেছে। কীসের জন্য এমন তাপ হতে পারে প্রশ্নটি পূর্ণতার মস্তিস্ক অর্ধজাগ্রত অবস্থাতেই জিজ্ঞেস করে ওঠে তাকে। ঘুমটা আরেকটু ছেড়ে গেলে কীসের থেকে এমন গরম তাপ আসছে সেটা বুঝতে পেরে পূর্ণতা হুড়মুড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে।
তাজওয়াদের আবারও গা কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে। তাজওয়াদ তার বুকে থাকায় তার শরীরের জ্বরের তাপের কারণেই পূর্ণতার ঘুম ভেঙে গিয়েছে। সারারাত ছেলেটা জ্বরের কারণে একপ্রকার অচেতনই ছিল। পূর্ণতা রাত জেগে ছেলের মাথায় জলপট্টি দিয়েছে। জ্বর যদিও কমে শেষ রাতের দিকে, কিন্তু এরই মাঝে আবারও ঠান্ডা লেগে গিয়েছে। পূর্ণতা ভেবে পায় না, তার মতো একটা আয়রন ওমেনের উদরে এত নাজুক বিড়ালের বাচ্চা হলো কিভাবে?
পূর্ণতা খুব সহজে অসুস্থ হয় না। কালেভদ্রে হয় বছরে এক-আধবার। তখন আবার অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়। পূর্ণতা তাড়াতাড়ি বেড ছেড়ে দাঁড়ায়। ওয়াশরুম থেকল চটপট ফ্রেশ হয়ে এসে ছেলেকেও কোলে করে নিয়ে গিয়ে ফ্রেশ করিয়ে আনে। তাজওয়াদের এতটা হুঁশ নেয়। ছোট জানটা জ্বরের প্রকোপে কাঁপছে মায়ের বুকে মাথা রেখে। পূর্ণতা ছেলেকে বুকের সাথে চেপে ধরে ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে বসে। যদিও আজ ভালোই গরম পরেছে, আর এসি এবং ফ্যান উভয়ই বন্ধ। তাও পূর্ণতা সকল কষ্ট সয়ে নেয়।
রিসেপশনে ফোন দিয়ে হালকা পাতলা নাস্তা অর্ডার দেয়। আর টনিকেও ফোন দিয়ে ডাক্তার আনতে বলে দেয়। আধা ঘন্টার মাঝে খাবার ও ডাক্তার উভয়েই হাজির হয়। ডাক্তারকে আসতে দেখে সকলের মনেই প্রশ্নের উদগ্রীব হয়, কে অসুস্থ? কার জন্য উনি এসেছেন? সকলে টনিকে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করতেই, টনি জানায় তাজওয়াদের অসুস্থতার কথা। সবাই ছুটে পূর্ণতার রুমে উপস্থিত হয়। পূর্ণতার কাজিন, তার ফুফু, আরিয়ানও যেতে নেয় কিন্তু তার মা তাকে আঁটকে দেয় হাত ধরে।
আরিয়ান প্রশ্নবোধক চাহনি নিয়ে মায়ের দিকে তাকালে, তার মা কিছুটা ঝাঁজালো গলায় বলে–
—আর একটু পর তুই বিয়ে করতে যাবি, এখন ঐ মেয়ের রুমে যাওয়ার দরকার নেই। রেডি হতে যা।
আরিয়ান হতবিহ্বল হয়ে যাওয়া গলায় বলে–
—মানে? আমার ভাগনা এত অসুস্থ আর আমি তাকে দেখতে না গিয়ে নিজের বিয়ের জন্য রেডি হতে যাবো? রেডি কি ওকে দেখে এসে হওয়া যাবে না?
আরিয়ানের মা বিরক্তি নিয়ে বলে–
—এত দেখার কি আছে! ঐ অপয়া মেয়ের ছেলেকে দেখতে যাওয়ার কি আছে? সামান্য জ্বরই তো এসেছে, মরে তো যায়নি আর…..
—আম্মু……
—অজান্তা…..
আরিয়ান ও তার বাবা আহনাফ হুংকার দিয়ে বলে তার মাকে থামিয়ে দেয়। অজান্তা বেগম নিজেও থতমত খেয়ে যায় স্বামী ও ছেলের হুংকার শুনে। কি বলতে গিয়ে কি বলে ফেললেন। তার স্বামীও রিসোর্টে ফিরে পূর্ণতার ঘরেই যাচ্ছিলেন, তাই তিনিও পেছন থেকে এসে কথাটি শুনে ফেলে।
আরিয়ান মায়ের এহেন কথায় রাগে কাঁপতে থাকে। আরিয়ানের বাবা ও পূর্ণতার বড় বাবা আহনাফ সাহেবও প্রচন্ড ক্ষেপে গিয়েছে। সে রিসেশনের উন্মুক্ত স্থানে দাঁড়িয়েই স্ত্রীকে উঁচু গলায় বলেন–
—মুখে লাগাম টানো অজান্তা। কি বলছিলে খেয়াল আছে তোমার? এত বাজে কথা তোমার মুখে আসলো কিভাবে সেটা ভেবেই আমি হতভম্ব হয়ে যাচ্ছি।
আরিয়ানও বাবার সাথে তাল মিলিয়ে বলে–
—এসব কি বলছিলে মা? ঐটুকু বাচ্চার মরার কথা কিভাবে বলতে পারলে? এ আমি আমার মায়ের কোন রূপ দেখলাম! তুমি এটা ভাবলেই বা কিভাবে? ঐ এতিম, জন্মদুঃখিনী মেয়েটার শুধু ঐ ছোট জানটা ছাড়া আছেই বা কে? সেদিনও দেখলাম তুমি পূর্ণতাকে কত বাজে কথা বলছিলে। আজ এটা বললে। আমি এবার সিউর হয়ে গেলাম, পূর্ণতার হুট করে কানাডা চলে যাওয়ার পেছনে তোমারই হাত রয়েছে।
ছেলে ও স্বামীকে এত ক্ষেপে যেতে দেখে অজান্তা বেগম বেশ ঘাবড়ে যান। সেই সাথে নিজের এতদিন আগের কুকীর্তি ফাঁস হয়ে যাচ্ছে দেখে ভয় পেয়ে যান। সে ঘাবড়ে গিয়ে বলেন–
—না না বাবা। ওকে তো আমি আমার মেয়ের মতোই মনে করি। আর আমার তো বয়স হয়েছে বল, তোর বিয়ের এত ঝক্কি-ঝামেলা সামলাতে গিয়ে মেজাজটা একটু চটে আছে। ভুলে মুখ দিয়ে কথাটা বের হয়ে গিয়েছে, কিন্তু আমি ইচ্ছে করে বলিনি।
ও গো! (নিজের স্বামীর দিকে ফিরে বলে) তুমি বিশ্বাস করো আমায়। আমার মুখ ফসকে ভুলে কথাটা বের হয়ে গিয়েছে, আমি কখনো এসব ভাবতেও পারি না।
অজান্তা বেগম আরো কত কথা বলেন স্বামী ও ছেলের মান ভাঙাতে কিন্তু তারা আজ প্রচন্ড রেগে গিয়েছে। আহনাফ আহমেদ পূর্ণতার রুমে যাওয়ার আগে কড়া গলায় স্ত্রীকে বলে যান–
—খবরদার এসব কথা যদি আর কোনদিন শুনেছি, তাহলে জিভ ছিড়ে হাতে ধরিয়ে দিবো। আমার মৃত ভাইয়ের একমাত্র সন্তান, আমার গুরুত্বপূর্ণ আমানত পূর্ণতা। ও’ বা ওর ছেলেকে নিয়ে আর কোনদিন এহেন কথা শুনলে সেদিন কি করবো আমি নিজেও জানি না। মেয়েটাকে ভালো না বাসতে পারো, তাকে কষ্ট দেওয়ার চেষ্টাও করবে না। ফলাফল কিন্তু মোটেও ভালো হবে না।
কথাগুলো বলে আহনাফ আহমেদ ও আরিয়ান চলে যায় পূর্ণতার রুমে। অজান্তা বেগম সেই রিসেশন এরিয়ার মধ্যখানে দাড়িয়েই রাগে ফুঁসতে থাকে। তার মনে পূর্ণতার জন্য আরো ক্ষোভের জন্ম হয় আজকের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তিনি ভেবেই নেন, ছেলের বিয়ের ঝামেলা মিটে গেলে সে পুনরায় পাঁচ বছর আগের মতোই এমন কিছু করবেন যাতে পূর্ণতা আবারও আহমেদ বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়।
হ্যাঁ, অজান্তা বেগমের কারণেই পূর্ণতা পাঁচ বছর আগে কানাডা পাড়ি দিয়েছিল। কিন্তু সে কি এমন করেছিলো যার কারণে পূর্ণতা দেশ ছেড়েছিল?
ডাক্তার তাজওয়াদকে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে বলেন, সাধারণ জ্বর-ঠান্ডা। বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথে খাপ খাওয়াতে হিমশিম খাচ্ছে বেচারা বাচ্চাটা। গতকাল অতিরিক্ত ঘাম হওয়া এবং সেই ঘাম থেকেই মূলত আজকের এই জ্বর। ডাক্তার কিছু ঔষধ লিখে দিয়ে যান, আর বলেন ঔষধ গুলো খাওয়ালেই ঠিক হয়ে যাবে।
ডাক্তার চলে যেতেই পূর্ণতা সকলের সামনে কিছুক্ষণ কথা বলে তাদেরও বিদায় দিয়ে ছেলেকে ব্রেকফাস্ট করিয়ে ঔষধ খাওয়ায়। ছেলের টেনশনে তার ভেতরে আর খাবার ঢুকে না। ঔষধ খাওয়ানোর প্রায় দুই ঘণ্টা পর তাজওয়াদের জ্বর ঘাম দিয়ে ছাড়ে। পূর্ণতা তাড়াতাড়ি করে ফ্যান ছেড়ে দিয়ে একটা ভেজা টাওয়াল দিয়ে তাজওয়াদের বুক-পিঠ মুছিয়ে তাকে চেঞ্জ করিয়ে দেয়। তাজওয়াদের জ্বর কমেছে দেখে পূর্ণতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
বেলা বারোটার দিকে আরিয়ান আবারও পূর্ণতার রুমে আসে। তাজওয়াদ তখন মায়ের সাথে শুয়ে শুয়ে গল্প করছিল। তাজওয়াদ অনেক শান্ত একটা বাচ্চা। তার সকল চঞ্চলতা, দুষ্টুমি, আবদার তার মায়ের কাছে। পূর্ণতার পৃথিবী যেমন তার ছেলে, তাজওয়াদের পৃথিবী বলতে তার মা’ই। আরিয়ান তার রুমে এসে তাজওয়াদকে অনেক আদর করে আর তাকে কিছু চকলেট উপহার দেয়। উপহার পেয়ে গোলুমোলু তাজওয়াদের চুপসে যাওয়া মুখে হাসি ফুটে। সে আদো আদো গলায় বলে–
—ত্যানকু আলু মামা, ইউ আল দি বেস্ট মামা ইন দি ওয়ার্ল্ড।
“আলু মামা” ডাকটা শুনে আরিয়ানও পূর্ণতার মতো ভরকে যায়। সে ড্যাবড্যাব করে পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে বুঝাতে চায়, সে এটা কি শুনলো? সে আলু মামা হলো কবে? কীভাবে?
পূর্ণতা তার অবাক হওয়ার বিষয়টা বুঝতে পেরে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে থাকে বেডে। আরিয়ান এবার আরো অবাক হয়ে যায়। কারণ বিগত পাঁচ বছরে সে পূর্ণতাকে এমন করে হাসতে দেখেনি। পূর্ণতা হেসেছে এই বছর গুলোতে, কিন্তু নিতান্তই তা জোড়াতালির হাসি ছিলো। এমন প্রাণ খোলা, বাঁধ ভাঙা হাসি সে পূর্ণতাকে এতগুলো বছরে একবারও হাসতে দেখেনি।
পূর্ণতা কিছুক্ষণ পর তার হাসি থামিয়ে আরিয়ানকে বলে–
—বড় ভাইয়া তোমাকে আরু বলে ডাকে না, আর আমি ওকে বলেছি তুমি ওর মামা হও। ও’ সেই আরুকে আলু বানিয়ে এখন আলু মামা ডাকছে।
কথাটা বলতে বলতে পূর্ণতা ফিক করে আবারও হেঁসে দেয়। মায়ের হাসির সাথে তাল মিলিয়ে এবার তাজওয়াদও হাসতে থাকে। আরিয়ানও কিছুটা হাসে কিন্তু সে নিজে বেশি হাসার চেয়ে পূর্ণতার হাসি হাসি মুখখানা মন ভরে দেখতে থাকে।
পূর্ণতার হাসিমাখা মুখটা দেখতে দেখতেই তার চোখে অশ্রুকণা এসে উপস্থিত হয়। সে মন থেকে চায়, তার এই এতিম বোনটার একটা সংসার হোক। পূর্ণতার ভরসা যোগ্য একটি মানুষ হোক। পূর্ণতা ও তাজওয়াদকে সকল বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করবে এমন এক মানুষ আসুক তার মনে।
পূর্ণতা হাসতে হাসতে তার নজর পরে আরিয়ানের উপর। তাকে কাঁদতে দেখে পূর্ণতা বোকার মতো প্রশ্ন করে–
—অ্যাঁই ভাইয়া, আমার ছেলে তোমায় আলু বলেছে বলে কেঁদে দিয়েছো?
আরিয়ান তার কথা শুনে হেঁসে দেয়। তারপর পূর্ণতার মাথায় টোকা দিয়ে বলে–
—বলদি, আমাকে কি বাচ্চা পেয়েছিস যে এই ছোট কথায় কেঁদে দিবো? তুই আসলেই বলদি।
পূর্ণতার তার ব্যথা পাওয়া জায়গাটা ডলতে ডলতে মেকি রাগ দেখিয়ে বলে–
—ভাইয়াআআআ… তুমি এখনও আগের মতো শয়তানই আছো। আমার ছেলের সামনে আমাকে মেরে তুমি আমার প্রেস্টিজের চটপটা চটপটি করে দিলে। আমি কি এখনও ছোট আছি নাকি?
তাজওয়াদ নিজের হাসি থামিয়ে দিয়ে তার আলু মামা ও মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের একসাথে এত বাংলা কথা বলতে সে সবটা ক্যাচ করতে পারে না। কিন্তু তার মায়ের মাথায় মামাকে টোকা দিতে দেখে এবং মাকে ব্যথা পাওয়া জায়গা ডলতে দেখে সে ফুঁসে ওঠে। সে বেডের উপরই আরিয়ানের সামনে দাড়িয়ে কোমড়ে দুই হাত রেখে চোখ বড় বড় করে বলে ওঠে–
—অ্যাঁই মামা! তুমি আমাল মাম্মাকে মাললে কেনু? একদম পুলিশে দিয়ে দিবু কিনতু।
পূর্ণতা ছেলেকে রাগ করতে দেখে মুখ চেপে হাসে। অন্যদিকে আরিয়ান আরো একবার অবাক হয়ে যায়। জ্বরে শরীর অনেকটা কাহিল হয়ে গিয়েছে, তাও তেজ কি ছেলের। মা’কে সামান্য একটা টোকা দিয়েছে বলে রেগেমেগে হুমকি দিচ্ছে আবার।
আরিয়ান তাকে বলে–
—বাপ তোর মাকে মারলাম কই আমি?
—একুন যে মাম্মার হেডে দিলে।
—ওটাকে মারা বললে, মারকে তো অসম্মান করা হবে। আমি তো দুষ্টুমি করেছি তোমার মাম্মার সাথে।
—না এতা দুট্টুমি না। আমিও তো দুট্টুমি করি, কিন্তু এমন তো ককুনো করিনি।
আরিয়ান হতাশ হয়ে বলে–
—তুমি আর আমি এক হোলাম নাকি? আমি হলাম তোমার মাম্মার ভাই, আমার সাথেই ও বড় হয়েছে। একসাথে আমরা কত দুষ্টুমি করেছি। আমি কি আমার বোনকে একটা টোকাও দিতে পারবো না?
—না, পালবে না। আমার মাম্মা বেতা পেয়েছে। দেকু মাথায় হাত ডলতে। এমুন কললে তাজ আর তুমাল সাতে কতা বলবে না।
পূর্ণতা বুঝতে পারে বিষয়টা অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। তাজওয়াদ ক্ষেপে যাচ্ছে মাকে ব্যথা পেতে দেখে। সে চট করে ছেলেকে আরিয়ানের সামনে থেকে টেনে নিজের কোলে নিয়ে আসে। তারপর ছেলেকে বুঝ দিতে বলে–
—আব্বু সোনা, তোমার আলু মামা আমায় মা”রেনি আমায়। একটু দুষ্টুমি করেছে জাস্ট। ভাই-বোনদের মাঝে এমন হই। তোমার যদি বোন থাকত তুমিও তার সাথে এমনটা করতে।
আরো বিভিন্ন কথা বলার পর তাজওয়াদ বুঝে, তার আলু মামা তার মাম্মাকে মারেনি। পূর্ণতা বড় করে একটা হাফ ছাড়ে। তারপর ছেলেকে বলে–
—সোনা তুমি মামার সাথে উঁচু গলায় রাগ দেখিয়ে কথা বলেছিলে একটু আগে, কাজটা কি তুমি ভালো করেছো?
পূর্ণতার কথা শুনে তাজওয়াদ মাথা নিচে নামিয়ে ফেলে। আরিয়ান তাড়াতাড়ি করে বলে–
—আরে আমি কিছু মনে করিনি। এইটুকুর জন্য আমার ভাগিনাকে বকবি না কিন্তু বলে দিলাম বোন।
পূর্ণতা ইশারায় আরিয়ানকে চুপ থাকতে বলে। আরিয়ান তার ইশারা দেখে চুপ হয়ে যায়। পূর্ণতা এবার মুখটা গম্ভীর করে বলে–
—মাম্মার কিন্তু তাজের এই কাজটা একটুও ভালো লাগেনি। বুঝলাম তাজ তার মাম্মাকে মার খেতে দেখে তাকে প্রটেক্ট করার চেষ্টা করেছে কিন্তু আলু মামাও তো তাজের বড় হয়। তাজ তার সাথে উঁচু গলায় রাগ দেখিয়ে কথা বলে কি ঠিক করেছে?
তাজওয়াদ মাথা নিচু করেই ডানে-বামে ঘুরায়। পূর্ণতা বলে–
—মুখে বলো। ঠিক করেছে তাজওয়াদ কাজটা? তার এই কাজটা কি ভালো হয়েছে নাকি পঁচা হয়েছে?
—পঁচা হয়েছে।
তাজওয়াদ জবাব দেয়। পূর্ণতা তার উত্তর শুনে বলে–
—পঁচা কাজ করলে কি করতে হয়, সেটা কি তাজওয়াদের মাম্মা তাকে শিখিয়েছে?
—হুম।
—তাহলে করো সেই কাজটা।
পূর্ণতা তখনও তার মুখটা গম্ভীর করে রেখেছে। তাজওয়াদ তার মায়ের মুখের দিকে একবার তাকায়। মাকে এমন গম্ভীর মুখ করে থাকতে দেখে তার একটুও ভালো লাগে না। তার মাম্মা যখন হাসে তখন সেও হ্যাপি হ্যাপি ফিল করে। সে তো জানে তার মাম্মা যখন স্যাড হয়ে থাকে তখনই তার মুখটা এমন হয়ে যায়। তার মানে তার মাম্মা তাজওয়াদের কাজে স্যাড হয়েছে। বিষয়টা তাকেও স্যাড করে ফেলে।
তাজওয়াদ পূর্ণতা কোল থেকে উঠে আরিয়ানের সামনে যায়। তারপর দুই হাত দিয়ে দুই কান ধরে মলিন গলায় বলে–
—আলু মামা আই এম সরি। তুমি আমাল উপল লাগ করে তেকো না। তাজওয়াদ ভীষণ সরি। প্লিজ এক্সেপ্ট মাই সরি মামা। তাজ আর কখনো তুমায় আলু মামা বলে ডাকবে না তুমি লাগ কললে।
আরিয়ান তার কান থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে তাকে নিজের কোলের উপর বসায়। তারপর তাজওয়াদকে আদর করে বলে–
—তাজওয়াদ আমাকে আলু মামা বলে না ডাকলে তাহলে আমি তার সরি এক্সেপ্ট করবো না। আর এখনই যদি সরি এক্সেপ্ট করাতে চাও তাহলে অনেক গুলো পাপ্পি দিতে হবে।
তাজওয়াদ তার মায়ের মুখে হাসি ফুটাতে আর আরিয়ান যাতে তার সরি এক্সেপ্ট করে নেয় এজন্য আরিয়ানের গালে, কপালে অনেক গুলো পাপ্পি দেয়। তারপর বলে–
—একন এক্সেপ্ট কলেছো তো?
—এতগুলো পাপ্পি দিলে কেউ কি সরি এক্সেপ্ট না করে থাকতে পারে সোনা? ইউর সরি এক্সেপ্টেড।
তাজওয়াদ এবার আরিয়ানের কাছ থেকে সরে এসে তার মায়ের কোলে বসে গলা জড়িয়ে ধরে বলে–
—ও মাম্মা, আলু মামা সরি এক্সেপ্ট কলেছে। তুমি কি একনও স্যাড ফেস করে থাকবে? তাজওয়াদের একটুও ভালো লাগে না তোমাল স্যাড ফেস দেখতে। কেমন কানু কানু পায়।
পূর্ণতা ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখে, তাজওয়াদ ঠোঁট উল্টে দিয়েছে ইতিমধ্যেই। পূর্ণতা যদি আর এক মিনিটও তার সাথে রেগে থাকে তাহলে এখনই অশ্রু বর্ষণ হতে থাকবে ছোট ছোট চোখ বেয়ে। পূর্ণতা নিজের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে ছেলেকে বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়। ছেলের কপালে চুমু দিয়ে বলে–
—আমি কলিজা, আমি আর স্যাড নেই। তুমি মায়ের কথা শুনেছো তাহলে কি আর মাম্মা স্যাড ফেস করে থাকতে পারে তার বাবা টার সাথে।
তাজওয়াদও খুশি হয়ে মায়ের বুকের সাথে লেপ্টে থাকে। তাদের মা-ছেলের মান-অভিমানের পর্ব শেষ হলে আরিয়ান পূর্ণতাকে জিজ্ঞেস করে–
—বোন তুই কি যাবি না আমার বিয়েতে?
—কিভাবে যাই বলো ভাইয়া, তাজওয়াদের এমন শরীর নিয়ে যেতো একদমই মন সায় দিচ্ছে না। ছেলেটা একদম দূর্বল হয়ে গিয়েছে।
আরিয়ানও বুঝে পূর্ণতার কথা। সেন্টারে অনেক লোকজন, হৈ-হুল্লোড়ের মাঝে ছেলেটা আরো অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। এরচেয়ে রিসোর্টে থেকেই রেস্ট করুক। কিন্তু একা একটা মেয়েকে ছোট একটা অসুস্থ বাচ্চার সাথে রেখে যেতে মন সায় দিচ্ছে না তার। আজ আরিয়ানরা সকলেই তার ও রুহীর বিয়ে পড়ানোর পর রুহীর নানা বাড়িতেই থাকবে। কাল সকালে রিসোর্টে ফিরে এসে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে রাতের ট্রেনে ঢাকায় ব্যাক করবে। ঢাকায় গিয়ে আরিয়ান ও রুহীর রিসেপশন পার্টি হবে।
আরিয়ান কপালে চিন্তার ভাজ ফুটিয়ে তুলে বলে–
—কিন্তু তুই একা একটা ছেলেকে নিয়ে রিসোর্টে কিভাবে থাকবি? আমরা তো আজ রুহীর নানা বাড়িতেই থাকব। কাল সবাই আসবো।
—রুহী?
পূর্ণতা প্রশ্ন করে ওঠে। আরিয়ান জবাব দেয়–
—তোর ভাবীর নাম রুহী। সাথে আরেকটা নাম আছে, আপাতত মনে পড়ছে না। ঐটা অনেক প্যাচানো, এটা সহজ লাগে আমার তাই আমি এই নামে ডাকি।
—ওহ্হ। তো কি হয়েছে একা থাকবো? আমি তো সবসময় একাই ছিলাম।সেই আট বছর বয়স থেকেই। মাঝে কিছু সময়ের জন্য ভেবেছিলাম, এই বুঝি আমার একাকিত্ব ঘুচলো। সঙ্গী দিলো উপরওয়ালা আমায়। কিন্তু…..(তাচ্ছিল্য করে হেঁসে ওঠে পূর্ণতা) চিন্তা করো না ভাইয়া। সেই আট বছর বয়স থেকে শুধু হয়েছে আমার একাকিত্বের গল্প, আজ আমি সাতাশের ঘরে পা দেওয়া একজন মা। জীবনের এতগুলো বছর একা চলে গিয়ে আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। এখন কেউ পাশে থাকলেও ভয় করে। কারণ আমি তো জানি, ব্যক্তিটি দিনশে আমায় ছেড়েই যাবে, শুধু শুধু কয়েকদিনের জন্য সহানুভূতি দেখাতে থাকছে।
আর একা বলছো কেনো? আমার ছেলে কিন্তু ওয়ান ম্যান আর্মি। দেখলে না তোমাকে পর্যন্ত ভয় দেখিয়ে ছাড়ল। কাল তৌফিক ভাইয়াকেও শাসিয়েছে। আমার ছেলে কম নাকি।
পূর্ণতার কথাগুলো শুনতে শুনতে আরিয়ান চোখ আবারও ভিজে উঠছিল। কিন্তু শেষের কথাগুলো শুনে তার কপালে ভাজ পড়ে। তৌফিক আবার কি করেছিলো যার জন্য তাজওয়াদ তাকে শাসিয়েছে? আরিয়ান প্রশ্নটা নিজের মধ্যে চেপে না রেখে জিজ্ঞেসই করে বসে–
—তৌফিক ভাইয়া কি করেছিল যার জন্য তাজ উনাকে শাসিয়েছে? আমাদের তাজ তো এমন বাচ্চা না যে যার-তার সাথে বেয়াদবি করবে।
পূর্ণতা হাসতে হাসতে বলে–
—আরে তোমার কাজিনের ভীমরতি পেয়েছে। এনগেজড তাও আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি আর অনেকটা কাছাকাছি চলে আসছিল কথা বলতে বলতে, তাই তাজ শাসিয়েছে।
পূর্ণতার কথা শুনে বিস্ময়ে আরিয়ানের চোখ কপালে উঠে যায়। এই লোক এত বছর পরও পূর্ণতাকে ভুলতে পারেনি। কয়েকমাস পর বিয়ে তার অন্য মেয়ের সাথে সে এখন পূর্ণতাকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে।
আরিয়ান রেগে গিয়ে বলে–
—তুই দাঁড়িয়ে শুনছিলি? দিতে পারলি না কষিয়ে একটা চড়?
—কি যে বলো না ভাই। উনি আমার কতো বড় আর আমি নাকি তাকে চড় দিবো। সেসব কথা বাদ দাও, একটা বাজতে চললো, যাও রেডি হও গিয়ে।
আরিয়ান সময়ের স্বল্পতার কারণে আর কথা আগাতে পারে না। পূর্ণতা ও তাজওয়াদের থেকে বিদায় নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসে। তারপর বুকপকেটে রাখা ফোন টার ভিডিও কল কেটে অডিও কল লাগিয়ে নিজের রুমে এসে পড়ে।
অপর পাশের ব্যক্তিটি সাথে সাথে কল রিসিভ করে রাগে হিসহিসিয়ে বলে–
—তৌফিক কে? ও কেন পূর্ণতাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলো? সে কি জানে না, পূর্ণতা এখনও ম্যারিড সাথে এক বাচ্চার মা?
আরিয়ান স্বভাব সুলভ শান্ত গলায় বলে–
—আমার কাজিন হয় মায়ের দিকের। এককালে পূর্ণতার জন্য পাগল ছিল। এমন কোন পাগলামি ছিলো না যা সে পূর্ণতাকে পেতে করেনি। কিন্তু বোকা বোন আমার এক গণ্ডমূর্খের প্রেমে পড়লো আর তাকে বিয়ে করে নিজেকে থেকে কুমির ভর্তি খালে ঝাপ দিলো।
আমার কি লাগে জানেন, তৌফিক ভাই ইজ দ্য বেস্ট গাই ফর মাই সিস্টার, নট জাওয়াদ শেখ।
কথাটা বলে আরিয়ান তাচ্ছিল্যের সহিত হাসে। আরিয়ানের কথা অপর পাশের ব্যক্তির কর্নগোচর হতেই তার রাগের আগুনে যেনো ঘি পড়ে। সে হাতে থাকা ফোনটা দূরে ছুঁড়ে মারে।
📌গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধু মহলের নিকট পৌঁছে দিন।
শব্দসংখ্যা~২৫৬০
চলবে?
[লাস্টে ভিডিও কলে থাকা লোকটা কে ছিলো বলেন তো?
সকলের রেসপন্স আশা করছি। আপনারা বেশি বেশি রেসপন্স করলে আমিও এমন বড় বড় পর্ব দিবো। আর যদি না করেন, তাহলে আগের মতো পর্ব আসবে।🤷♀️
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩+বোনাস
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১১
-
শেষ পাতায় সূচনা গল্পের লিংক