শেষপাতায়সূচনা [১৬]
সাদিয়াসুলতানামনি
ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে বেডের মাঝখানে শুয়ে দেয় পূর্ণতা। তারপর দু’পাশে বালিশ দিয়ে নিজে বেড ছেড়ে উঠে দাড়ায়। এলোমেলো পায়ে হেঁটে এসে দাঁড়ায় তার রুমের সাথে এলার্চ বেলকনিতে।
নিস্তব্ধতার চাদরে মুড়িয়ে থাকা রাতের আধারে পূর্ণতা তার সকল ক্লান্তি প্রকৃতিকে দিয়ে দিতে চায়। একটু সুখের কাঙ্গাল সে ছোট থেকেই। চাহিদা তার সবসময়ই ছিলো নগন্য। কিন্তু এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইচ্ছে গুলোও অপূর্ণ রয়ে গিয়েছে বরাবরের মতোই।
আজ মিসেস শেখকে দেখে পূর্ণতার অতীতের বহু কথা মনে পরে যায়। মনে পরে যায়, একসময় সেও এমনই আকুতি মিনতি নিয়ে মিসেস শেখের পেছন পেছন ঘুরত শুধু মাত্র একটু মায়ের আদর, ভালোবাসা, স্নেহ পাওয়ার জন্য। কিন্তু মিসেস শেখ সবসময়ই তাকে পুত্রবধূ ভেবে দূরে সরিয়ে রেখেছে, পূর্ণতা শতশত চেষ্টা করার পরও তার পাথর মন গলাতে পারেনি।
শেখদের সকলেই তাকে কম-বেশি কষ্ট দিয়েছে। কষ্ট পেতে পেতেই তো আজ সেও তার মনকে পাথর করে নিয়েছে। একমাত্র তার ছেলে ছাড়া দুনিয়ায় আর কেউ তার কাছে ম্যাটার করে না। এমনকি জাওয়াদও নয়।
আসলেই কি জাওয়াদ তার কাছে ম্যাটার করে না? পূর্ণতার মন পূর্ণতাকে প্রশ্ন করে ওঠে।
অতীত~
আরো কিছুদিন কেটে যায়। দিন যত যাচ্ছে পূর্ণতার প্রতি জাওয়াদ ততই দূর্বল হয়ে পড়ছে। পূর্ণতা সহ সকলেই জাওয়াদের মধ্যকার পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে। পূর্ণতা তো খুশিতে আত্মাহারা শ্যামসুন্দর পুরুষের অমূল পরিবর্তন দেখে।
ইদানীং জাওয়াদের দিন শুরু হয় পূর্ণতাকে দিয়ে, শেষও হয় পূর্ণতাকে নিয়ে। পূর্ণতা তার মন ও মস্তিষ্কে এমনভাবে জেঁকে বসেছে যে, সে ব্যতীত অন্যকোন মেয়ের ভাবনা তার মাথার দূরদূরান্ত পর্যন্ত নেই।
জাওয়াদের এই পরিবর্তনে মি.শেখ ও জিনিয়া খুশি হলেও, অখুশি হলেন মিসেস শেখ। সেও বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে, ক্রমেই জাওয়াদের রাগের পাহাড় ভাঙতে শুরু করে দিয়েছে। অচিরেই যে পূর্ণতা ও জাওয়াদের একটা সুখের সংসার হতে চলেছে সে তার অভিজ্ঞতার দরুন বেশ বুঝতে পারছে।
মিসেস শেখ তার অভিজ্ঞতা দিয়েও এ-ও বুঝতো পেরেছে, পূর্ণতা ও জাওয়াদ তাদের বিয়ের পর একবারও কাছাকাছি আসেনি। তাদের এই একটা শূন্যস্থানকে সে কাজে লাগানোর পায়তারা করছে।
এক ছুটির দিনের কথা। জাওয়াদ-পূর্ণতার সম্পর্কের উন্নতি দেখে চিন্তায় চিন্তায় মিসেস শেখের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে। যার কারণে কয়েকদিন ধরে প্রচন্ড মাথা ব্যথায় ভুগছে সে। পূর্ণতা ও জাওয়াদের আজ অফিস না থাকায় এবং শ্বাশুড়ি মায়ের মাথা ব্যথা থাকার কারণে পূর্ণতাই আজ সারাদিনের রান্নাবান্নার দায়িত্ব জোর করে নিজের কাঁধে তুলে নেয়। মিসেস শেখ জেদ দেখিয়ে রান্নাঘরে গেলেও সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা সে রেস্ট করতে বাধ্য হয়।
সকালে হালকা-পাতলা নাস্তা করেই পূর্ণতা দুপুরের জন্য বিরিয়ানি ও চিকেন চাপের ব্যবস্থা করতে থাকে। জিনিয়া টুকটাক তাকে এগিয়ে এগিয়ে দিলেও সব কাজ পূর্ণতা একা হাতেই করছে। কিন্তু জাওয়াদ আজ পূর্ণতাকে অবাক করে দিয়ে নিজের স্বভাব বিরুদ্ধ কাজ করছে। সে একটু পরপর কিচেনে আসছে এটা ওটার অজুহাতে। আবার বিনা কারণেই কিচেনের দরজায় এসে দাড়িয়ে তাদের কাজ দেখছে।
বেলা হয়ে আাছে দেখে পূর্ণতা জিনিয়াকে শাওয়ার নিতে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেই বাকি কাজগুলো করতে থাকে। পূর্ণতা একা দেখে ও আশেপাশে কেউ না থাকার সুযোগ নিয়ে জাওয়াদ কিচেনে ঢুকে পূর্ণতার পেছনে দাঁড়িয়ে তার কাজ দেখতে থাকে। পূর্ণতা বাসায় বেশিরভাগ শাড়ি পরে, মাঝে মধ্যে সালওয়ার সুট পরে। আবার কখনোসখনাে লং কুর্তি ও প্যান্ট সালওয়ার পরে। এমনটা সে তখনই পরে যখন বেশি গরম পড়ে। মধ্যবিত্ত হওয়ার দরুন জাওয়াদের বাসায় এসি নেই। তাই সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো পূর্ণতার গরমের দিনগুলোতে একটু বেশিই কষ্ট হয়। কিন্তু পূর্ণতা কখনো এসব নিয়ে অভিযোগ করেনি।
আজও প্রচন্ড গরম পরায় পূর্ণতা লং কুর্তি ও প্যান্ট সালওয়ার সাথে ওড়না পরেছে। ওড়নাটা কাধের উপর দিয়ে নিয়ে কোমড়ের একপাশে বেঁধে চুলগুলো খোঁপা করে তরকারি নাড়ছে। পূর্ণতার চুল লেয়ার কাটিং করার কারণে খোঁপা থেকে কয়েকটা চুল বের হয়ে তার ঘার্মাক্ত কাঁধের সাথে সেটে আছে। কানের পাশ বেয়ে ঘাম বেয়ে বেয়ে বুকের কাছে গিয়ে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। ফর্সা কাঁধে ঘামের বিন্দু গুলো বড়ই আকর্ষনীয় লাগে জাওয়াদের কাছে। সে তার মুখটা পূর্ণতার কাঁধের কাছে নিয়ে এসে নিজের দুই ঠোঁট গোল করে ফু দেয়। জাওয়াদের এমন কান্ডে পূর্ণতা হকচকিয়ে পেছনের দিকে তাকালে তাদের দু’জনের কপালের একে অপরের সাথে টোকা লেগে যায়।
কপালে টোকা খেয়ে জাওয়াদ যেনো নিজের ঘোর থেকে বের হয়। কেমন বোকার মতো কাজ করছিলো সে বুঝতে পেরে দেওয়ালের সাথে গিয়ে নিজের কপাল ঠুকতে মন চায় জাওয়াদের। পূর্ণতা একহাত দিয়ে চুলার আচ একদম কমিয়ে দিয়ে জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে তার কপালে ব্যথা পাওয়া জায়গায় ডলতে থাকে। আর চিন্তিত গলায় বলে–
—বেশি লেগেছে? সরি আমি খেয়াল করিনি আপনি আমার পেছনে ছিলেন। ব্যথা করছে? আইস লাগিয়ে দিবো?
পূর্ণতা নিজেই একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে জাওয়াদকে। এদিকে নিজেও যে ব্যথা পেয়েছে সেদিকে তার খেয়াল নেই। জাওয়াদ মেয়েটাকে যত দেখছে ততই অবাক হচ্ছে। এই মেয়েটা ঠিক কোন মাটির তৈরি সে বুঝে উঠতে পারছে না। জাওয়াদের কারণে পূর্ণতা ব্যথা পেলো অথচ নিজেই সরি চাচ্ছে।
পূর্ণতা আরো কিছু বলতে চায়, কিন্তু জাওয়াদ তার ঠোঁটে আঙুল রেখে তাকে চুপ করিয়ে দেয়। তারপর নিজেই বলে–
—নিজেই তো সব বলছো। আমাকে বলতে দিবে কি?
পূর্ণতা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। জাওয়াদ পুনরায় বলে–
—আমি তেমন ব্যথা পাই নি, আর আইসও লাগানো লাগবে না। তুমি বেশি ব্যথা পেয়েছো?
কথা বলতে বলতে পূর্ণতার ঠোঁট থেকে নিজের আঙুল সরিয়ে আনে জাওয়াদ। পূর্ণতা হালকা হেঁসে বলে–
—হুঁশশ! এটাকে ব্যথা বলে নাকি। তা আপনি কিচেনে আমার পেছনে কি করছিলেন? কিছু লাগবে কি আপনার?
এই রে! আবারও একটা ধরা খেয়ে গেলো।আসলেই তো সে কিচেনে আসলো কেনো? আর আসলো তো আসলো পূর্ণতার এত কাছে এসে এহেন কান্ড কেন ঘটালো? এই প্রশ্নগুলোর একটারও উত্তর নেই জাওয়াদের কাছে।
ইদানীং মেয়েটার আশেপাশে থাকতে তার প্রচন্ড ভালো লাগে। রাতেও যখন মেয়েটা জোর করে তার বুকে এসে শোয় তখন সে মিছেমিছি রাগ দেখালেও, পূর্ণতা ঘুমিয়ে পড়তেই সেও শক্ত করে তাকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে। পূর্ণতার অগোচরে তার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকতেও কেন যেনে একটু বেশিই ভালো লাগে। জাওয়াদ আমতা আমতা করতে করতে বলে–
—ঐ তো একটা কাজে এসেছিলাম।
—কিচেনে আপনার কি কাজ জনাব? তাও আবার আমার কাছে, যেনো তেনো কাছে না একদম কাঁধে।
জাওয়াদের লুকোচুরি অনেকক্ষণ আগেই পূর্ণতার কাছে ধরা পরেছিল। সে কাজের ফাঁকে ফাঁকে জাওয়াদের কিচেনে উঁকিঝুকি লক্ষ্য করেছিল, কিন্তু সে না দেখার ভান করে নিজের কাজগুলো করছিল।
জাওয়াদ ইতি-উতি করতে থাকে। পূর্ণতা তাকে আর বিব্রতবোধ করাতে চায় না। সে পুনরায় নিজের রান্নায় মনোযোগ দেয়। বিরিয়ানির মাংশ নাড়তে নাড়তে বলে–
—একটু পর জুম্মার আজান পরে যাবে, আপনি এখনও গোসল দেন নি কেনো? যান গোসলে যান, আমি মাংশটায় পানি দিয়ে এসে আপনার পাঞ্জাবি আয়রন করে দিচ্ছি।
জাওয়াদ ভদ্র ছেলের মতো কিচেন ছেড়ে চলে যায় রুমে। যেতে যেতে নিজের বোকামির জন্য মনে মনে হেঁসে দেয়। সে জানে পূর্ণতা ইচ্ছে করেই কথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। পূর্ণতা এত বোকা না যে তার কান্ডকারখানা ধরতে পারবে না।
বেশ কিছুক্ষণ পর জাওয়াদ শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে দেখে পূর্ণতা নিজের হাতে কি জানি একটা লাগাচ্ছে। চোখ-মুখ কোঁচকানো তার। জাওয়াদ দ্রুত কদম ফেলে তার কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে–
—কি হয়েছে হাতে?
পূর্ণতা বার্নার লাগাতে লাগাতে বলে–
—আরে ঐ একটু লেগে গিয়েছে ইস্ত্রিতে। সমস্যা নেই।
কথা বলতে বলতেই বার্নার লাগানো শেষ করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। জাওয়াদ দেখে একটু খানি না বেশ খানিকটাই হাত পুড়ে গিয়েছে পূর্ণতার। জাওয়াদ হুট করেই কেমন অস্থির হয়ে যায়। সে পূর্ণতার হাতটা ধরে নিজের কাছে নিয়ে এসে বলে–
—অ্যাঁই পূর্ণ! হাতটা তো অনেকখানি পুড়ে গিয়েছে। কিভাবে হলো এটা? সাবধানে কাজ করবে না।
জাওয়াদের কণ্ঠে ব্যথা ও ভর্ৎসনা উভয়েরই উপস্থিতি রয়েছে। সে অল্প অল্প করে ফু দিতে থাকে পূর্ণতার পোড়া জায়গাটায়। জাওয়াদের এই অল্পস্বল্প চিন্তা, বকা পূর্ণতার চোখে অভাবনীয় সুখের অশ্রু এনে দেয়। সে একধ্যানে তাকিয়ে থাকে জাওয়াদের চিন্তিত শ্যাম মুখখানার দিকে।
পূর্ণতার থেকে কোন রেসপন্স না পেয়ে জাওয়াদ তার হাত থেকে চোখ সরিয়ে মুখের দিকে তাকালে, দেখতে পায় পূর্ণতার চোখ অশ্রুতে টইটম্বুর। জাওয়াদ ভাবে পূর্ণতার হয়ত পোড়া জায়গাটায় জ্বলছে। সে তার একটা হাত পূর্ণতার গালে রেখে মলিন গলায় বলে–
—কেঁদো না। ঔষধ লাগিয়েছো না, একটু পর ঠিক হয়ে যাবে।
জাওয়াদ তাকে ছোট বাচ্চাদের মতো সান্ত্বনা দেয়। পূর্ণতা জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই বলে ওঠে–
—আপনার ক্ষুদ্রতম যত্ন, অল্পস্বল্প চিন্তা আমার ক্লান্ত হৃদয়ের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
জাওয়াদ থমকে যায় পূর্ণতা কথাটি শুনে। দু’জনে বিনা সংকোচে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে অবিশ্রান্তভাবে। জাওয়াদের মন হুট করেই তাকে বলে ওঠে–
—এই মেয়েটা ভালোবাসার কাঙ্গালি। তোর উচিত নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে ওকে ভালোবাসা। কম তো চেষ্টা করছে না তোর ভালোবাসা অর্জনের জন্য।
তাদের দু’জনের ঘোর কাটে মি.শেখের গলার আওয়াজে।
~চলবে?
[রেসপন্স করিয়েন আপনারা বেশি বেশি। তাহলে দেখা যেতে পারে, কালও গল্প দিতে পারি।🤷♀️
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১০
-
শেষ পাতায় সূচনা গল্পের লিংক
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৫