Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

পর্ব_৬

কলমে #নিলুফানাজমিননীলা

★★★
ব্যস্ত রাজপথের ভিড় ঠেলে আরিয়ানের গাড়িটা উন্মাদের মতো এদিক-ওদিক ছুটে চলেছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল, কিন্তু এখনো তৃণার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। আরিয়ান হাসপাতালে গিয়েছিল, কিন্তু সেখানে তৃণা নেই। ওমর হাওলাদারও মেয়ের শোকে ভীষণ ভেঙে পড়েছেন।
​হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, তৃণা প্রধান ফটক দিয়ে বের হয়ে গেছে, কিন্তু তারপর জনসমুদ্রের মাঝে সে যেন কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেল। দুশ্চিন্তায় আরিয়ান রীতিমতো ঘামছে। তখনি তার মোবাইলে স্ক্রিনে ভেসে উঠল বাবা আহাদ মির্জার নাম।

​আরিয়ান কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রাগী কণ্ঠ ভেসে এল,
​“এখনো পাওয়া যায়নি তৃণাকে?”

​“না বাবা, আমি…”

​“চুপ! একদম চুপ থাকো!” আহাদ মির্জা ভীষণ রাগী সুরে ধমকিয়ে উঠলেন। “তুমি কেমন ইডিয়ট স্বামী? মেয়েটাকে একা একা হাসপাতালে ছেড়ে এসেছো কোন সাহসে? তুমি জানো না তৃণা রাস্তাঘাট একদমই চিনে না? এখন মেয়েটা কোথায় গেল? যদি ওর কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তবে তোমাকেও ছাড়ব না বলে দিচ্ছি। আমি পুলিশকে ইনফর্ম করে দিয়েছি, তারাও খুঁজছে।”

​আরিয়ান কল কেটে দিয়ে ড্রাইভইং সিটের স্টিয়ারিংয়ে জোরে এক ঘুসি মারল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“স্টুপিড গার্ল! সে কি ছোট বাচ্চা যে হারিয়ে যাবে? রাস্তা চিনে না, সেটা আমাকে অন্তত বলতে পারত! কিন্তু না, চুপচাপ নেমে গেল। একটা কলও তো করতে পারত!”

​আরিয়ান আবারও গাড়ি স্টার্ট দিল। ধীরগতিতে গাড়ি চালিয়ে রাস্তার দুই পাশ গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে করতে এগোচ্ছে সে। হঠাৎ তার নজর গেল রাস্তার ফুটপাতের এক কোণে থাকা একটি টং দোকানের দিকে। সেখানে একটি অতি পরিচিত শাড়ি পরা অবয়ব দেখে আরিয়ান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
​গাড়ি থামিয়ে সে একরকম দৌড়েই সেখানে গেল। দেখল, সেখানে তৃণা বসে আছে। তৃণাকে অক্ষত অবস্থায় দেখে আরিয়ানের বুক থেকে যেন এক বিশাল পাথর নেমে গেল, সে এক দীর্ঘ স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল। তৃণা আরিয়ানকে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়ল, তার মলিন মুখে এক চিলতে অস্পষ্ট হাসি ফুটে উঠল।

​কিন্তু আরিয়ানের দুশ্চিন্তা মুহূর্তেই রূপ নিল প্রচণ্ড রাগে। সে তৃণার সামনে দাঁড়িয়ে তার বাহুটা জোরে চেপে ধরে গর্জে উঠল,
​“কী সমস্যা তোমার, হ্যাঁ? ফাইজলামি পেয়েছ? এখনে কীভাবে আসছো? তুমি জানো তোমাকে কত জায়গায় খুঁজেছি? বাড়ির মানুষগুলো তোমার জন্য কতটা চিন্তা করছে?”

​তৃণা অবাক দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটা চিৎকার করছে ঠিকই, কিন্তু তৃণা লক্ষ্য করল এই রাগের আড়ালে কোথাও বিরক্তির কোনো ছাপ নেই, বরং এক অদ্ভুত অস্থিরতা আর মায়া লুকিয়ে আছে।
​তখনি দোকানের মালিক সেই বৃদ্ধা মহিলা বলে উঠলেন, “বাবা, মেয়েটাকে কিছু বলো না। ও রাস্তা চিনতে পারছিল না। সকাল থেকে এখানে বসে বাচ্চাদের মতো কাঁদছিল।”

​বৃদ্ধার কথা শুনে আরিয়ান তৃণার মুখের দিকে তাকালো। দেখল, তৃণার ডাগর চোখ দুটো কান্নায় লাল হয়ে আছে, দীর্ঘক্ষণ কাঁদার ফলে চোখগুলো ফোলা ফোলা দেখাচ্ছে। তৃণার এই করুণ অবস্থা দেখে আরিয়ানের ভেতরের রাগটা নিমিষেই জল হয়ে গেল। তার কণ্ঠ অজান্তেই নরম হয়ে এলো। সে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“রাস্তা চেনো না তুমি?”

​তৃণা মাথা নিচু করে খুব ধীর কণ্ঠে বলল,
“না, আপনাদের বাড়ির অ্যাড্রেস আমার জানা নেই। আমাদের বাড়ির অ্যাড্রেস জানতাম, কিন্তু সেখানে যাইনি ইচ্ছে করেই। কারণ… সেই বাড়িতে এখন আব্বু নেই।”

“কল করতে পারতে?” আরিয়ান কিঞ্চিৎ অনুযোগের সুরে জিজ্ঞেস করল।

​“আমার মোবাইল বন্ধ ছিল,” তৃণা অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে জবাব দিল।

​আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিল। মেজাজটা খিটখিটে হয়ে থাকলেও তৃণার শুকনো মুখটা দেখে সে আর কথা বাড়াল না। শুধু বলল,
“চলো, আমার সাথে বাড়ি চলো।”

​গাড়িটা রাস্তার ওপারে পার্ক করা। চওড়া ব্যস্ত রাস্তা পার হতে হবে। আরিয়ান স্বাভাবিকভাবেই পার হচ্ছিল, কিন্তু কয়েক কদম গিয়েই লক্ষ্য করল তৃণা পিছিয়ে পড়ছে। বড় বড় গাড়ি আর দ্রুতগতির বাস দেখে তৃণা যেন সিঁটিয়ে যাচ্ছে। তার রাস্তা পার হতে ভীষণ ভয় লাগে। আরিয়ান বিষয়টি খেয়াল করল।
​আরিয়ান হঠাৎ কোনো কথা না বলে তৃণার হিমশীতল হাতটা নিজের শক্ত মুঠোর মধ্যে পুরে নিল। আরিয়ানের হাতের সেই উষ্ণ পরশ তৃণার হৃদস্পন্দন যেন এক নিমেষে স্বাভাবিক করে দিল। জনাকীর্ণ রাস্তার মাঝখানেও তৃণা নিজেকে খুব নিরাপদ অনুভব করতে লাগল। আরিয়ান তাকে আড়াল করে আগলে ধরে রাস্তা পার করিয়ে দিল।
​তৃণা অবাক হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। নিজের বাবার পর এই লোকটাকেই আজ তার সবচাইতে বড় ভরসা মনে হচ্ছে। আরিয়ানের বলিষ্ঠ হাতের বাঁধনে সে যেন তার নিজের আত্মার এক টুকরো আস্থার জায়গা খুঁজে পেল। এই প্রথম আরিয়ানকে তার খুব কাছের কেউ বলে মনে হলো।
★★★
বাড়ির ড্রয়িংরুমে সকলে উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে আছে। কিছুক্ষণ আগেই আরিয়ান ফোন করে জানিয়েছে তৃণাকে পাওয়া গেছে এই সংবাদে সবার মনে যেন স্বস্তি ফিরে এল। তখনি দেখা গেল আরিয়ান আর তৃণা একসাথে ভেতরে ঢুকছে। নৌশি ছুটে গিয়ে তৃণাকে জড়িয়ে ধরল। মিতুও এগিয়ে এসে মমতাভরা কণ্ঠে বলল,
“তুমি ঠিক আছো তো বোন?”

​তৃণা ম্লান হেসে বলল,
“হ্যাঁ ভাবি, একদম ঠিক আছি।”

​আরিয়ান মিতুর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ভাবি, তৃণাকে খেতে দাও। সকাল থেকে ও কিচ্ছু খায়নি।”

​তৃণা অবাক হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। সে যে খায়নি, সেটা আরিয়ান বুঝল কী করে? আরিয়ানের এই সূক্ষ্ম খেয়াল রাখার বিষয়টি তৃণার মনে এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে গেল। মিতুও সায় দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ সত্যিই তো, সকালে এক দানাও পেটে পড়েনি তোমার, চলো কিছু খেয়ে নিবে।”

​তৃণা খাবার টেবিলের দিকে পা বাড়াতে যাবে, অমনি পেছন থেকে মায়মুনা বেগমের তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“দাঁড়াও! খাওয়ার আগে জবাব দাও কোথায় গিয়েছিলে?”

​আহাদ মির্জা পরিস্থিতি সামলাতে বলে উঠলেন,
“আরিয়ান তো বললই, তৃণা রাস্তা ভুল করে অন্য জায়গায় চলে গিয়েছিল। এখন আবার এসব অবান্তর প্রশ্ন করছো কেন?”

​“প্রশ্ন করছি তার কারণ আছে,” মায়মুনা বেগম তিক্ত স্বরে বললেন। “এত বড় একটা ধাড়ি মেয়ে, আর সে কিনা রাস্তা চিনে না? এটা আমায় বিশ্বাস করতে হবে?”

​বড় জায়ের কথায় ঘি ঢেলে ফারহানা বেগম টিপ্পনী কাটলেন, “ঠিকই তো বলেছে আপা। সত্যিই কি হারিয়ে গিয়েছিল, নাকি অন্য কোথাও গিয়েছিল সেটা ভালো করে খোঁজ নেওয়া উচিত।”

​এতক্ষণ আরিয়ান চুপ করে সব শুনছিল, কিন্তু এবার তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়ে গর্জে উঠল,
“সবাই চুপ করো! আমি নিজে তৃণাকে খুঁজে এনেছি, তাই আমিই ভালো জানি ও হারিয়ে গিয়েছিল। এই বিষয়ে বাড়িতে আর একটা শব্দও আমি শুনতে চাই না!”

​আরিয়ানের সেই রণমূর্তি দেখে ড্রয়িংরুমে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। কথাটা শেষ করেই সে গটগট পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল। নিজের ছেলের মুখে এভাবে সবার সামনে কথা শুনতে হবে, সেটা মায়মুনা বেগম কল্পনাও করেননি। তার মুখটা রাগে অপমানে কালো হয়ে গেল। তিনি গজগজ করতে করতে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
★★★
নীরব রাস্তা ধরে ধীরলয়ে হেঁটে আসছে নুসরাত। পরনে সাধারণ সালোয়ার কামিজ, কাঁধে ঝোলানো ভার্সিটি ব্যাগ। ব্যস্ত শহরের এই নিরিবিলি পথে একা হাঁটা তার বহুদিনের অভ্যাস। ভার্সিটির ক্লাস শেষ করে সে একটা টিউশনি করায়। এই টিউশনি নিয়ে বাড়িতে কম অশান্তি হয়নি। মির্জা পরিবারের সবার এক কথা ‘আমাদের কি টাকা-পয়সার অভাব পড়েছে যে বাড়ির মেয়েকে অন্যের বাড়িতে পড়াতে যেতে হবে?’ কিন্তু নুসরাত নিজের জেদ ছাড়েনি। বাড়ির টাকার চেয়ে নিজের উপার্জিত দশটা টাকাও তার কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।

​হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত একটা চড়া গলা ভেসে এল,
“ও চশমাওয়ালি ম্যাডাম, একটু দাঁড়ান না!”

​নুসরাত পেছনে ফিরল না। গলার স্বর শুনেই সে বুঝতে পেরেছে এটা কে। নুসরাতকে দাঁড়াতে না দেখে ছেলেটা দৌড়ে এসে তার পাশাপাশি হাঁটা শুরু করল।
হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ডাকলাম, শুনলেন না?”

​“শুনেছি, তবে দাঁড়ানোর প্রয়োজন মনে করিনি,” নুসরাত সোজাসাপ্টা ও শীতল জবাব দিল।

​ছেলেটা নুসরাতের কাঠখোট্টা জবাবে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে একগাল হেসে বলল, “কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে একটু কথা বলা যাবে কি?”

​নুসরাত সামনে তাকিয়েই উত্তর দিল, “না…”

​নুসরাতের ‘না’-কে পাত্তা না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করল,
“আপনার চোখের এই চশমাটা কি খোলা যায় না?”

নুসরাত এবার একটু অবাক হয়ে তাকালো,
“কেন? চশমায় আপনার কী সমস্যা?”

​ছেলেটা মিটমিট করে হেসে বলল,
“সমস্যা আমার নেই, তবে আমার মনে হয় চশমা ছাড়া আপনার রূপটা আরও স্পষ্ট হবে। এভাবে চশমা পরে থাকলে কেমন যেন দাদি দাদি লাগে!”

​নুসরাত আগুনের দৃষ্টিতে নির্জনের দিকে তাকালো। তার স্বভাব হলো, রাগ হলে সে তর্ক করে না, বরং দ্রুত সেই জায়গা ত্যাগ করে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হলো না। সে রাগে গজগজ করতে করতে সামনে থাকা একটা খালি রিকশা ডেকে ঝটপট উঠে পড়ল।
​নির্জন দাঁড়িয়ে থেকে নিজের মাথার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে নুসরাতের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। এই ছেলেটার নাম নির্জন। নুসরাতের এই গাম্ভীর্যই যেন তাকে প্রতিদিন রাস্তার মোড়ে দাঁড় করিয়ে রাখে।
★★★
তৃণা রুমে ঢুকতেই থমকে দাঁড়ালো। দেখল আরিয়ান বিছানায় হেলান দিয়ে বসে মোবাইলে কারো সাথে কথা বলছে, তার মুখে এক চিলতে হাসি। সেই হাসিতে তৃণার বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবল, ‘হয়তো আরিয়ান তার ভালোবাসার মানুষটার সাথেই কথা বলছে।’
​কোন মেয়ে কি চায় তার স্বামী অন্য কাউকে ভালোবাসুক? তৃণা জানে সে মেনে নিয়েছে, কিন্তু অবচেতন মন যেন বিদ্রোহ করছে। নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে আবার ভাবল, ‘আমিই বা কেন এত ভাবছি? আমি নিজেও তো আরিয়ানকে ভালোবাসি না।’
​তৃণা ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে শুতে নিতেই আরিয়ানের গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“বিছানায় শুয়ে পড়ো। নিচে শুতে হবে না।”

​তৃণা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এমনিতে এই এক ঘরে রাত পার করতেই তার অস্বস্তি লাগছে, তার ওপর আবার এক বিছানায়! সে সোজা বলে দিল,
“পারব না আপনার সাথে এক বিছানায় থাকতে। ছিহ্ ছিহ্! ভাবতেই লজ্জা লাগে।”

​আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তৃণার দিকে তাকিয়ে থেকে ব্যঙ্গ করে বলল, “ছিহ্ ছিহ্ করার কী আছে? আমি তো তোমাকে আমায় জড়িয়ে ধরে শোয়ার প্রস্তাব দিইনি। বলেছি তুমি বিছানায় ঘুমাও, আজকের রাত না হয় আমি সোফায় কাটিয়ে দেব।”

​তৃণা কিছুক্ষণ দ্বিধা নিয়ে চুপ থেকে মৃদুস্বরে বলল,
“না থাক, আপনি উপরেই ঘুমান। আমার নিচে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।”

​আরিয়ান এবার রুদ্রমূর্তি ধারণ করল। রাগে ধমক দিয়ে উঠল, “এক কথা বারবার বলতে হয় কেন? কথা বোঝো না? নাকি থাপ্পড় দিয়ে বোঝাতে হবে?”

​তৃণার শরীরটা ভয়ে কেঁপে উঠল। কী অদ্ভুত এক মানুষ! এইমাত্র শান্ত গলায় কথা বলছিল, আর এক মুহূর্তেই তার রূপ পাল্টে গেল। তৃণা আর তর্কের সাহস পেল না। কোনোমতে সিঁটিয়ে গিয়ে বিছানার এক কোণে উঠে বসল।

​রাত তখন অনেকটা। আরিয়ান এখনো ঘুমোতে পারেনি। নরম বিছানা ছেড়ে এই অস্বস্তিকর সোফায় ঘুমোনোর অভ্যাস তার কোনোকালেই নেই। বিরক্তি আর শরীরের আড়ষ্টতায় সে সোফার উপর উঠে বসল। কিছুক্ষণ রাগী দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ তার চোখ গেল বিছানার দিকে।
​সোফার ঠিক সোজাসুজিই বিছানাটা। শোয়ার সময় তৃণা বেশ সচেতনভাবেই সারা শরীরে কাঁথা জড়িয়ে শুয়েছিল। কিন্তু ঘুমের ঘোরে অজান্তেই শরীর থেকে সেই কাঁথা সরে গেছে। মেয়েটার পেটের ওপর থেকে শাড়ির আঁচলটা খসে গিয়ে উদোম পেটের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে।

​আরিয়ানের দৃষ্টি সেই এক জায়গায় স্থির হয়ে রইল। কী অদ্ভুত! মেয়েটার মুখের চেয়েও তার গায়ের রঙ আরও বেশি ফর্সা আর মসৃণ। আরিয়ান দ্রুত চোখ বন্ধ করে নিল। তার পুরুষালি সত্তা চিৎকার করে বলছে এসবই তো একজন পুরুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা!
​কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল সে। কিন্তু অবাধ্য চোখ জোড়া আবারও সেই একই স্থানে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো। আরিয়ান অনুভব করল, তার শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। এক আশ্চর্য অনুভূতি! ঠিক চার বছর আগে যেমনটা হয়েছিল, হুবহু সেই একই রকম এক আলোড়ন আজ তার শিরায় শিরায় বইছে।
​নিজের ওপর ভীষণ রাগ হলো আরিয়ানের। সে সাথে সাথে দুই হাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। এই দৃশ্য, এই সান্নিধ্য তার সহ্য হচ্ছে না। সে দ্রুত পায়ে ঘর ছেড়ে বেলকনিতে চলে এল।

​বাইরে তখন নিশীথ রাত। চারদিকে পিনপতন নীরবতা। দোতলার বেলকনি থেকে রাস্তার সোডিয়াম বাতির ম্লান আলো দেখা যাচ্ছে। মাথার ওপর রূপালি চাঁদটা রাতের আসল সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরিয়ান কাঁপা হাতে একটা সিগারেট ধরাল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশে ছাড়তেই, চোখ বন্ধ করা মাত্রই তার মানসপটে ভেসে উঠল চার বছর আগের সেই চেনা প্রতিমূর্তি।

«সময়টা ছিল আজ থেকে ঠিক চার বছর আগের এক বর্ষাকাল। আরিয়ান তখন সদ্য উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছে। বন্ধুদের জোরাজুরিতে পাহাড়ে যাচ্ছিল ট্রাভেলে। বাসে করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার অভ্যাস ছিল না বলেই সে বাসের জানালায় মাথা রেখে ঘুমিয়েই পুরো রাস্তা পার করছিল।
​হঠাৎ পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় বাসটি পৌঁছানো মাত্রই আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে ড্রাইভার পাহাড়ের কিনারে বাসটি থামাতে বাধ্য হলেন। ঘুমের ঘোর আর বৃষ্টির শব্দে আরিয়ানের বিরক্তি বাড়ছিল। সে কপালে হাত দিয়ে জানলার কাঁচের ওপারে তাকাল।
​আর ঠিক তখনি তার পৃথিবীটা থমকে গেল!
​রাস্তার ঠিক অপর পাশে, পাহাড়ের ঢালে এক কিশোরী রমণী বৃষ্টির তোড়ে ভিজছে। পরনে তার একটি নীল রঙের রাউন্ড জামা। সে বৃষ্টির মাঝে দুই হাত মেলে আপন মনে ঘুরছিল, যেন এই শ্রাবণধারা একমাত্র তার জন্যই ধরণীতে নেমে এসেছে। তার নাচের সাথে সাথে বৃষ্টির জলগুলো ঝরে পড়ছিল যেন মুক্তোর কণা। আরিয়ান তার জীবনের প্রথম নেশাটা সেদিনই অনুভব করেছিল। সেটা শুধু রূপ ছিল না, সেটা ছিল এক মায়া যাকে এক নজর দেখেই তার হৃদপিণ্ড যেন স্পন্দন হারিয়ে ফেলেছিল।

​আরিয়ান আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ঘোরলাগা মানুষের মতো সে বাস থেকে নেমে দৌড় দিল সেই অজানা কিশোরীর দিকে। তখনো বাসের সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আরিয়ান হাঁপাতে হাঁপাতে সেই জায়গায় পৌঁছালো যেখানে মেয়েটি ভিজছিল।
​কিন্তু একি! সেখানে কেউ নেই। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে সে শুধু মেঘের আনাগোনা আর বৃষ্টির গর্জন ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না। মেয়েটি যেন এক অপার্থিব কল্পনা হয়ে বৃষ্টির সাথেই মিলিয়ে গেছে। আরিয়ান চারদিক পাগলের মতো খুঁজল, কিন্তু সেই রাউন্ড জামা পরা মেয়েটির ছায়াও আর দেখা গেল না।
​আরিয়ান যখন ফেরার জন্য পা বাড়াবে, তখনই তার নজর গেল ঘাসের ওপর পড়ে থাকা একটি রুপালি জিনিসের দিকে। সে নিচু হয়ে কুড়িয়ে নিল এক পায়ের নূপুর। চার বছর ধরে সেই নূপুরটিই হয়ে আছে তার অদেখা ভালোবাসার একমাত্র সাক্ষী।»

​মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা চিরে পেছন থেকে তৃণার কোমল কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“এত রাতে এখানে? ঘুমাননি আপনি?”

​তৃণার কণ্ঠস্বর আরিয়ানের কানে পৌঁছানো মাত্রই তার ভেতরের সেই মায়াভরা অতীত স্মৃতি বিষাক্ত এক দহনে রূপ নিল। মুহূর্তের মধ্যে তার শান্ত মুখটা অগ্নিবর্ণ ধারণ করল। আরিয়ান ঝট করে পেছন ফিরল। তার চোখের মণি দুটো এতটাই রক্তবর্ণ হয়ে ছিল যে, তৃণা ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
​আরিয়ান হিংস্র কোনো পশুর মতো এক পা এক পা করে তৃণার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তৃণা দেওয়ালের সাথে মিশে গিয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে বলল, “ক…কী হয়েছে আপনার?”

​কিন্তু কথাটি শেষ করার সুযোগও সে পেল না। আরিয়ান অতর্কিতে তৃণার হাতটা ধরে হ্যাঁচকা টানে তাকে ঘুরিয়ে দিল এবং হাতটা পিঠের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে মুচড়ে ধরল। তৃণা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে আর্তনাদ করল,
“আহ্! ছাড়ুন, লাগছে!”

​আরিয়ানের কানে সেই আর্তনাদ পৌঁছাল না, বরং তার হাতের বাঁধন আরও শক্ত হলো। তার অন্য হাতে থাকা জ্বলন্ত সিগারেটটা কোনো রকম মায়া ছাড়াই চেপে ধরল তৃণার কোমল হাতে। আগুনের শিখা চামড়া পুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে তৃণা অসহ্য যন্ত্রণায় গগনবিদারী চিৎকার করে উঠল। সেই মরণ-চিৎকারে আজ কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, কেবল ছিল নিজের হারানো মায়ের প্রতি শেষ আকুতি,
​“ও আম্মুউউউউ!”

​তৃণার দুচোখ বেয়ে শ্রাবণের ধারার মতো জল গড়িয়ে পড়ল। আরিয়ান হঠাৎ করেই হাতের বাঁধন আলগা করে দিল। তৃণার পুড়ে যাওয়া স্থানটি টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। সে ব্যথায় নীল হয়ে ফ্লোরে আছড়ে পড়ল এবং ডুকরে কেঁদে উঠল।

​ঠিক সেই মুহূর্তে আরিয়ান আকাশের দিকে মুখ তুলে এক অমানুষিক আর্তনাদ করে উঠল। নিজের মাথার চুলগুলো মুঠো করে ধরে সে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল। তৃণা বিস্ময়ে নিজের কান্না ভুলে গেল। তার মনে হলো, তার সামনে বসে থাকা মানুষটি আরিয়ান নয়, বরং অন্য কোনো অশুভ ছায়া তাকে গ্রাস করেছে। আরিয়ান ফ্লোরে নিজের কপাল ঠেকিয়ে ছোট বাচ্চার মতো হাহাকার করে কেঁদে উঠল। তার ছটফটানি দেখে মনে হচ্ছে সে নিজের অস্তিত্ব থেকেই মুক্তি চাইছে।
​তৃণা নিজের শরীরের দাহ ভুলে গেল। এক অদ্ভুত মায়ায় সে আরিয়ানের কাছে এগিয়ে গেল। কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “ঠিক আছেন আপনি? কী হয়েছে আপনার?”

​আরিয়ান হঠাৎ কোনো এক অজানা তৃষ্ণায় তৃণাকে জাপটে ধরল। তৃণার গলায় মুখ লুকিয়ে সে ভেঙে পড়া স্বরে ফিসফিস করে বলতে লাগল,
“শান্তি… একটু শান্তি দাও খোদা… আমাকে মুক্তি দাও!”

​আরিয়ানের সেই তপ্ত নিশ্বাস আর আর্তনাদ তৃণার কাঁধে গিয়ে আছড়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটা যতটা নিষ্ঠুর, তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি কোনো এক অদৃশ্য যন্ত্রণায় ভেতর থেকে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।

চলবে…

(লেখার কোনো ভুল থাকলে প্লিজ ধরিয়ে দিন।যাতে আমি ভুল থেকে শিখতে পারি।আপনারা যদি আমার ভুল চিহ্নিত না করে দেন তাহলে আমি নিজেকে পরিপক্ব করে কীভাবে তুলব বলুন!?”)

(বিশাল বড় পর্ব দিয়ে দিলাম😑)

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply