Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৩


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

পর্ব_৫৩

নিলুফানাজমিননীলা

★★★
মির্জা বাড়িতে এখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। একদিকে বিয়ের সানাইয়ের তোড়জোড় আর হইহুল্লোড়, অন্যদিকে গুমোট এক নিস্তব্ধতা। এই হইহুল্লোড়ের খবর বাইরের সবাই জানলেও, সেই নিস্তব্ধতার দহন কয়জনেই বা টের পাচ্ছে? নৌশির বিয়ে ঠিক হয়েছে শুক্রবার, আজ বুধবার। অর্থাৎ হাতে মাত্র একটা দিন। বাড়ির লোকজনের দম ফেলার সময় নেই, সবার চোখেমুখে উৎসবের আনন্দ।
​কিন্তু আদনান দাঁড়িয়ে আছে নিজের রুমের বেলকনিতে। বাইরের এই আনন্দ-উচ্ছ্বাস তার কাছে বিষের চেয়েও তিতো ঠেকছে। নৌশিকে সে কত বোঝাল এই বিয়েটা না করতে, কিন্তু মেয়েটা যেন পাথরের চেয়েও শক্ত হয়ে আছে। আদনানের ইচ্ছে করছে এখনই ছুটে গিয়ে চিৎকার করে বলে দিতে
“এই নাদানের বাচ্চা, তোকে আমি ভালোবাসি!” কিন্তু পরিস্থিতি এখন আর সেই পর্যায়ে নেই। চাইলেই সবটা ওলটপালট করা যায় না।

​আদনান ধীরপায়ে রুমে ফিরে এল। ড্রয়ার টেনে বের করে আনল একটা পুরনো জীর্ণ ডায়েরি। ডায়েরির পাতায় পাতায় আগডুম-বাগডুম অনেক কথাই লেখা, কিন্তু তার বেশির ভাগ জুড়েই রাজত্ব করছে একটা নাম ‘নৌশি’। আদনান ডায়েরির পাতায় আঙুল বোলাতে বোলাতে এক পৃষ্ঠা উল্টাতেই থমকে গেল। কাঁচা হাতে বড় বড় করে লেখা
​“তোরে আমার বউ বানাবো নাদান।”

​লেখাটা দেখে আদনানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাদমাখা হাসি ফুটে উঠল। তখন আদনানের বয়স বড়জোর আট। প্রেম- ভালোবাসা বুঝত না ঠিকই, কিন্তু সেদিন হয়তো অবুঝ মনেই নৌশিকে নিজের করে রাখার এক অদ্ভুত জেদ কাজ করেছিল। সেদিন পাশে বসে নৌশিও খিলখিল করে হেসেছিল। অথচ আজ সেই ছোটবেলার স্বপ্নটা নিছক এক অলীক কল্পনা মনে হচ্ছে। আদনানের দুচোখ বেয়ে দুফোঁটা নোনা জল ডায়েরির পাতার ওপর গড়িয়ে পড়ল।

​পরক্ষণেই সে ঝটকা দিয়ে চোখের জল মুছে ফেলল। তার দুচোখে তখন ফিরে এল সেই পরিচিত দৃঢ়তা। তাকে এখন জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটা নিতে হবে। আদনান ডায়েরিটা সশব্দে বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলল,
​“তুই শুধুই আমার হবি নৌশি। অন্য কারও হলে যে আমি বাঁচব না। তোকে হারাতে দেওয়ার চেয়ে আমি সবকিছু ধ্বংস করে দিতে রাজি আছি।”
★★★
মির্জা বাড়িতে সাজ সাজ রব। বাড়ির আদরের মেয়ের বিয়ে বলে কথা, আয়োজনের কোনো কমতি নেই। সময় কম হলেও কাজের বহর পাহাড়সম। আত্মীয়-স্বজনে বাড়ি গিজগিজ করছে, অথচ এই মহাব্যস্ততার মাঝেও একজনের দেখা নেই আরিয়ান। নতুন কোম্পানির একটা অত্যন্ত জরুরি মিটিংয়ের জন্য তাকে আজ সকালেই বের হতে হয়েছে।
​তৃণা ড্রয়িংরুমের এক কোণে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। সকাল থেকে কয়েকবার কল করেছে আরিয়ানকে, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। অদ্ভুত এক শূন্যতা আর অভিমানে তার কিছু করতে ইচ্ছে করছে না। ঠিক তখনই মায়মুনা বেগম কাজের তদারকি করতে করতে ওদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। তৃণাকে এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। দ্রুত এগিয়ে এসে কপালে হাত দিয়ে বললেন,
​“কী হয়েছে তৃণা? শরীর কি অসুস্থ লাগছে? দেখি তো!”

​শাশুড়ির এই সামান্য বিষয় নিয়ে এমন ব্যাকুলতা দেখে তৃণার ঠোঁটে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। মায়মুনা বেগম তৃণার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও শুধালেন,
“সারাদিনের এই হট্টগোলের মাঝে তোমার ঠিকমতো খেয়ালই করা হয়নি। কিছু খেয়েছো মা?”

​তৃণা মাথা নেড়ে নিঃশব্দে জানিয়ে দিল সে কিছু খায়নি। সাথে সাথে মায়মুনা বেগমের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। কিছুটা রাগী স্বরেই বললেন,
“খাওনি মানে? কেন খাওনি শুনি?”

​“ইচ্ছে করছিল না আম্মু।”

​“কয়েক দিন ধরেই শুনছি তোমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। শরীরটা কি বেশি খারাপ লাগছে? কোনো সমস্যা হলে আমাকে লুকিও না কিন্তু!”

​তৃণা আমতা আমতা করে বলল,
“না আম্মু, তেমন কিছু না। আসলে আপনার ছেলে সেই সকালে বের হয়েছে, এর মাঝে একবারও ফোনটা রিসিভ করল না।”

​ছেলের ওপর বউমার এমন মিষ্টি অভিমান দেখে মায়মুনা বেগম মৃদু হাসলেন। তৃণার চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বললেন,
“ও আচ্ছা! এই জন্য বুঝি মহারানির মন খারাপ? ঠিক আছে, মুখ ভার করে থাকতে হবে না। তুমি বরং একটা কাজ কর, এখনই আরিয়ানের অফিসে চলে যাও। আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি তোমাকে পৌঁছে দিতে।”

মায়মুনা বেগমের কথা মতো তৃণা আর দেরি করল না। ড্রাইভারকে সাথে নিয়ে আরিয়ানের অফিসের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল। তার মনে একদিকে আরিয়ানের জন্য অভিমান, অন্যদিকে এক অজানা উৎকণ্ঠা কাজ করছিল।

​আরিয়ান মাত্রই মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে নিজের কেবিনে ঢুকল। তার চোয়াল শক্ত, দুচোখ আগুনের মতো জ্বলছে। ম্যানেজারের অদক্ষতার কারণে নতুন প্রজেক্টে শুরুতেই বড়সড় লোকসান হয়েছে, তার ওপর বায়ারদের ক্রমাগত চাপ আরিয়ানের ধৈর্য চ্যুত করেছে। কেবিনে ঢুকেই সে গায়ের কোটটা রাগে ছুড়ে মারল চেয়ারের ওপর। দুই হাতে নিজের চুল মুঠো করে ধরল। মাইগ্রেনের তীব্র যন্ত্রণায় তার মাথা যেন ফেটে যাচ্ছে, আর এই মানসিক চাপ সেই যন্ত্রণাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
​আরিয়ান নিজেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু পারছিল না। তার এই আকস্মিক আর প্রচণ্ড রেগে যাওয়ার পেছনে রয়েছে Intermittent Explosive Disorder (IED)। টেবিলের ওপর রাখা জলের গ্লাসটা হাতে নিয়ে দেখল ওটা খালি। মুহূর্তেই তার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে গেল, গ্লাসটা সজোরে ফ্লোরে ছুড়ে মারল সে। কাঁচের টুকরোগুলো ঝনঝন শব্দে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

​ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে তৃণা। ঘরের রণক্ষেত্র দশা দেখে সে শিউরে উঠল। আরিয়ান তখনও তৃণাকে লক্ষ্য করেনি, সে পাগলের মতো টেবিলের ফাইলগুলো ফ্লোরে ছুড়ে ফেলছে। তৃণা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান তাকে মেনে নেওয়ার পর থেকে এই ভয়াবহ রূপ আর দেখা যায়নি। নিয়মিত ওষুধ খেয়ে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখত, কিন্তু আজ বোধহয় সব বাঁধ ভেঙে গেছে। তৃণা প্রায়ই লক্ষ্য করে, আরিয়ান যন্ত্রণায় ছটফট করলেও মুখ ফুটে কিছু বলে না।

​হঠাৎ আরিয়ানের নজর দরজার দিকে যেতেই সে থমকে গেল। কিন্তু তৃণাকে দেখে সে শান্ত হলো না, বরং তার ভেতরের অস্থিরতা যেন আরও বেড়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে রক্তাভ চোখে তৃণার দিকে তাকিয়ে রইল। তৃণা জানে, এই অবস্থায় আরিয়ানের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না এটা কেবল রাগ নয়, এক ধরণের মানসিক অসুস্থতা। এখন তাকে শান্ত করতে যাওয়া মানেই আগুনের ওপর ঘি ঢালা।
​তবুও তৃণা নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ধীরপায়ে আরিয়ানের দিকে এগোতে লাগল। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী করছেন এসব? কেন নিজেকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছেন?”

​তৃণাকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে আরিয়ানের দৃষ্টি হঠাৎ নিচের দিকে গেল। তৃণা খেয়ালই করেনি যে ফ্লোরজুড়ে ভাঙা কাঁচের ধারালো টুকরো পড়ে আছে। আর মাত্র দুই কদম ফেললেই তৃণার পা সেই কাঁচের ওপর পড়বে।

আরিয়ান মুহূর্তের মধ্যে ঝড়ের গতিতে সামনে এগিয়ে এল। তৃণা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরিয়ান নিজের দুহাত বাড়িয়ে দিল ওর পায়ের তলায়। তৃণা চমকে গিয়ে পা থমকে নিল। আরিয়ানের হাতের তালুর ওপর তৃণার পায়ের ভার পড়তেই সে দ্রুত ওকে একপাশে সরিয়ে নিল।
​তৃণা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। এই তো কয়েক সেকেন্ড আগে মানুষটা রাগে অন্ধ হয়ে সব তছনছ করছিল, অথচ পরক্ষণেই তার এই অবিশ্বাস্য সতর্কতা! আরিয়ান বিরক্ত মেশানো উদ্বেগে বলে উঠল,
“একটু সাবধানে হাঁটবে না? এখন যদি কাঁচ পায়ে বিঁধে যেত, তখন কী হতো?”

​তৃণা ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে ভাবল এই কি সেই ভয়ানক ‘রাগী সাহেব’? যার ক্রোধের সামনে সবাই কাঁপত, সে আজ নিজের হাতের তোয়াক্কা না করে ওর পায়ের নিচে ঢাল হয়ে দাঁড়াল! তৃণা আমতা আমতা করে বলল,
“আপনার হাতে লাগেনি তো?”

​আরিয়ান সেদিকে পাত্তা না দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তোমার জুতো কোথায়? খালি পায়ে অফিসে ঢুকেছ কেন?”

“গাড়ি থেকে নামার সময় ছিঁড়ে গিয়েছে, তাই ওটা ওখানেই রেখে এসেছি।”

​আরিয়ান আর কথা বাড়াল না। আলতো করে তৃণার বাহু ধরে ওকে সোফায় বসিয়ে দিল। এরপর সে নিজেই নিচু হয়ে ফ্লোরে ছড়িয়ে থাকা কাঁচের টুকরোগুলো খুঁটে খুঁটে সরাতে লাগল। তৃণা ওর এই শান্ত রূপ দেখে সাহস পেয়ে জিজ্ঞেস করল,
“অফিসে কি কোনো সমস্যা হয়েছে? এভাবে রেগে ছিলেন কেন?”

​আরিয়ান মুখ না তুলেই একটা ম্লান হাসি হাসল।
“কই, আমি কি রেগে আছি? না তো।”

​তৃণা মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে বলল,
“উহু, এখন আপনাকে একদমই ‘রাগী সাহেব’ মনে হচ্ছে না। আপনি বড্ড বদলে গেছেন।”

​আরিয়ান এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ফাইলগুলো গুছিয়ে টেবিলের ওপর রাখল। তৃণার সামনে এসে দাঁড়িয়ে কৌতুক করে বলল,
“কেন? এখন কি তুমি চাচ্ছো আমি তোমার সামনে আবারও চিল্লাপাল্লা করি? সারাদিন ক্যাচরক্যাচর করি?”

​আরিয়ানের কথার ধরনে তৃণা হেসে ফেলল। আরিয়ান এবার ওর পাশে বসে জিজ্ঞেস করল,
“হঠাৎ এখানে যে? কোনো বিশেষ কারণ?”

​“আপনাকে কতগুলো কল দিলাম, একবারও ধরলেন না। তাই ভাবলাম বাড়িতে তো হুল্লোড় চলছেই, আপনার জন্য খাবার নিয়ে একবারে অফিসেই চলে আসি।”

​আরিয়ান তীক্ষ্ণ চোখে তৃণার দিকে তাকিয়ে বলল, “নিশ্চয়ই তুমি নিজেও কিছু খাওনি?”

​তৃণা মাথা নিচু করে নিশ্চুপ রইল। আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টিফিন বক্সটা খুলল। ভাত মাখিয়ে এক লোকমা তৃণার মুখের সামনে ধরে বলল,
“চুপচাপ খেয়ে নাও। আমিই আজ খাইয়ে দিচ্ছি তোমায়।”

​তৃণা মৃদু আপত্তি জানিয়ে বলল,
“উহু, আমাকে খাইয়ে দিতে হবে না। আপনি খেয়ে নিন, আমি বাসায় গিয়ে খেয়ে নেব।”

​আরিয়ান এবার ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,
“একদম কথা বাড়াবে না শ্যামলিনী। আমার কথার ওপর কথা বলা আমার একদম পছন্দ না, সেটা তো জানো!”

​তৃণা আর দ্বিরুক্তি করার সাহস পেল না। এই আদুরে ধমকের মাঝে যে কতটা অধিকার লুকিয়ে আছে, তা সে জানে। আরিয়ান এক লোকমা নিজে খেল আর পরের লোকমাটা পরম মমতায় তৃণার মুখে তুলে দিতে লাগল। বাইরের ঝড় আর ভেতরের অশান্তি সব যেন এই মুহূর্তের স্নিগ্ধতায় ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে গেল।
★★★
আদনান অনেকক্ষণ ধরে নিজের রুমে পায়চারি করছে। সে নিজের সবটুকু সাহস এক জায়গায় জড়ো করার চেষ্টা করছে। ঘড়িতে এখন রাত আটটা ছুঁইছুঁই। ড্রয়িংরুমে এখনো আত্মীয়-স্বজনের কলকাকলি থামেনি। বিয়ের তারিখটা এত দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে, সেটা আদনানের কল্পনারও বাইরে ছিল। সময় কম বলে আয়োজন খুব জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও প্রস্তুতির কোনো কমতি নেই। আর এই প্রতিটি সেকেন্ড আদনানের বুকের ভেতর যেন উত্তাল ঢেউ তুলছে। প্রতিটা মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে, নৌশি বুঝি তার জীবন থেকে চিরতরে হাজার মাইল দূরে হারিয়ে যাচ্ছে।
​আদনান ধীরপায়ে তার বাবা আহাদ মির্জার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে দরজায় নক করল। ভেতর থেকে আহাদ মির্জা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“কে? ভেতরে আসো।”

​আদনান রুমে প্রবেশ করল। আহাদ মির্জা বিছানায় আধশোয়া হয়ে ছিলেন, ছেলেকে দেখে উঠে বসলেন। রুমে এখন তিনি ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বললেন,
“আদনান? হঠাৎ আমার রুমে! কিছু বলবি?”

​আদনান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর অস্ফুট স্বরে বলল,
“জি আব্বু, তোমার সাথে একটা খুব জরুরি কথা ছিল।”

​আহাদ মির্জা কিছুটা কৌতূহলী হয়ে তাকালেন।
“জরুরি কথা? কী এমন কথা, বল।”

​আদনান কথাগুলো গুছিয়ে নেওয়ার জন্য কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। তার গলার স্বর কিছুটা বুজে আসলেও দৃঢ়তা হারাল না। সে সরাসরি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বিনীত অথচ মরিয়া কণ্ঠে বলে উঠল,
“আব্বু, নৌশির এই বিয়েটা ভেঙে দাও!”

​ছেলের মুখ থেকে এমন অভাবনীয় কথা শুনে আহাদ মির্জা থমকে গেলেন। ঘরের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘনীভূত হলো। তিনি বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আদনানের দিকে, যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে তার শান্ত ছেলেটা আজ এমন এক দাবি নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়েছে।
তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন,
“মানে? বিয়ে ভেঙে দেব মানে? এটা কোন ধরনের পাগলামি আদনান?”

​আদনান কাকুতিভরা স্বরে আবারও বলল,
“প্লিজ আব্বু, যেভাবে হোক এই বিয়েটা আটকে দাও।”

​আহাদ মির্জা কিছুটা ধমকের সুরে বললেন,
“আমি বুঝতে পারছি, ছোটবেলা থেকে তুই আর নৌশি খুব ভালো বন্ধু, তাই বলে ওর বিয়ে ভেঙে দেওয়ার কথা বলবি? বোকা ছেলে, এটা ওর জীবনের ব্যাপার।”

​আদনান এবার চোখ বন্ধ করে বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। নিজের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে এক নিশ্বাসে বলে ফেলল,
“আমি নৌশিকে ভালোবাসি আব্বু! অন্য কোথাও ওর বিয়ে হতে পারে না। আমিই ওকে বিয়ে করব।”

​কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে আহাদ মির্জার শক্ত হাতের দুটো প্রচণ্ড থাপ্পড় এসে পড়ল আদনানের গালে। থাপ্পড়ের চোটে আদনান টাল সামলাতে পারল না। আহাদ মির্জা রাগে কাঁপতে কাঁপতে আবারও হাত তুলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই মায়মুনা বেগম রুমে ঢুকে আদনানকে আগলে ধরলেন। তিনি এই রণক্ষেত্র দশা দেখে আঁতকে উঠলেন।
​“কী করছেন আপনি? এত বড় ছেলের গায়ে এভাবে হাত তুলছেন কেন?”

​আহাদ মির্জা গর্জে উঠে বললেন,
“এখন তো শুধু থাপ্পড় মেরেছি, এই ছেলেকে তো মে*রে ফেলা উচিত! কত বড় বেয়াদব হলে নিজের ছোট বোনকে বিয়ে করার কথা মুখে আনে!”

​আদনান গালের ব্যথা তোয়াক্কা না করে জেদি গলায় বলে উঠল,
“আব্বু, নৌশি আমার আপন বোন না। ইসলাম আর সমাজ উভয় ক্ষেত্রেই চাচাতো বোনকে বিয়ে করা জায়েজ। তাহলে তোমরা কেন এটাকে পাপ ভাবছ?”

​আহাদ মির্জা আবারও তেড়ে আসলেন ছেলেকে মারার জন্য, কিন্তু মায়মুনা বেগম ঢাল হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি কঠোর স্বরে স্বামীকে বললেন,
“আপনি আগে নিজেকে শান্ত করুন!” তারপর ছেলের দিকে ফিরে ধরা গলায় বললেন,
“তুই কি পাগল হয়েছিস আদনান? তুই জানিস না এই মির্জা বাড়িতে কোনোদিন চাচাতো ভাই-বোনের বিয়ের নিয়ম নেই? আমাদের বংশের মর্যাদা লুণ্ঠিত হবে যে!”

​আদনান এবার উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করে উঠল,
“কেন নিয়ম নেই? কিসের নিয়ম এটা? যেখানে সৃষ্টিকর্তার বিধানে কোনো বাধা নেই, সেখানে তোমাদের বানানো এই সেকেলে নিয়ম আমি কেন মানব? আমি নৌশিকে ছাড়া বাঁচব না আম্মু!”

আহাদ মির্জা রাগে ফেটে পড়ে চিৎকার করে উঠলেন, “আদনান! আর একটা কথা বললে তোর গায়ের চামড়া তুলে নেব আমি। তুই যেটা বলছিস, সেটা এ জন্মে অন্তত সম্ভব নয়। ভুলে যা এসব অলীক কল্পনা!”

​আদনান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সব আভিজাত্য আর ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে সে সজোরে আহাদ মির্জার পা জড়িয়ে ধরল। পাথর চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ল ছেলেটা। ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“আব্বু, দোহাই তোমার… একটু দয়া করো! তোমার এই ছেলেটা বাঁচবে না আব্বু, মরে যাব আমি। ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত আমার কোনো শখ কি তুমি অপূর্ণ রেখেছ? তাহলে আজ কেন এত নিষ্ঠুর হচ্ছো? দয়া করে নৌশির বিয়েটা অন্য কোথাও দিও না। আমি ওকে ছাড়া নিঃশ্বাস নিতে পারছি না আব্বু, আমি সত্যিই মরে যাব!”

​ছেলের এই করুণ দশা দেখে আহাদ মির্জার মনটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। তিনি নিচু হয়ে আদনানকে টেনে তুললেন। পরম মমতায় মাথায় হাত রেখে বোঝানোর স্বরে বললেন,
“দেখ আদনান, আবেগ দিয়ে পৃথিবী চলে না। এটা সম্ভব না বাবা। বিয়েটা সামাজিকভাবে পাকা হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে যদি আমরা বিয়ে ভেঙে দেই, তবে মির্জা বাড়ির মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। আত্মীয়-স্বজনের সামনে আমরা মুখ দেখাতে পারব না। বড় হয়েছিস, একটু বোঝার চেষ্টা কর।”

​আদনান অসহায় দৃষ্টিতে একবার তার বাবা আর একবার মায়ের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, পায়ের তলার মাটি সরে গিয়ে এক বিশাল শূন্যতায় তলিয়ে যাচ্ছে সে। তার সাজানো পৃথিবীটা মুহূর্তেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে আর একটা কথাও বলল না। টলটলায়মান পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই দেখল করিডরে নুসরাত দাঁড়িয়ে আছে। নুসরাতের করুণ চাহনির দিকে একবার তাকিয়ে সে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।
​নুসরাত আদনানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,
“নিজের অজান্তেই আমার মতো একই ভুল তোরাও করলি!”

​আদনান নিজের রুমের দিকে যাওয়ার সময় একবার নৌশির দরজার দিকে তাকাল। ওপাশ থেকে কোনো শব্দ নেই, দরজাটা শক্ত করে বন্ধ। খুব ইচ্ছে হলো একবার চিৎকার করে নৌশিকে ডাকতে, কিন্তু দরজায় নক করার মতো নূন্যতম শক্তিও তার শরীরে অবশিষ্ট নেই।
​নিজের রুমে ঢুকে আদনান সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল। পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল নিথর হয়ে। অন্ধকার ঘরে তার নজর গেল ওপরের সিলিং ফ্যানটার দিকে। একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল সে। তার দুচোখে তখন কোনো জল নেই, আছে কেবল এক ভয়ংকর শূন্যতা আর চরম এক সিদ্ধান্তের হাতছানি।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply