Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫২ (প্রথমাংশ)


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

পর্ব_৫২ (প্রথমাংশ)

নিলুফানাজমিননীলা

★★★

তৃণা নিজের ঘর গোছানোয় ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ নিচতলার ড্রয়িংরুম থেকে আরিয়ানের জোর শোরগোল আর হাঁকডাক শুনে তার হাত থেমে গেল। আরিয়ান সাধারণত এভাবে চেঁচামেচি করে না, তবে আজ কী এমন হলো! তৃণা কৌতূহল সামলাতে না পেরে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ওপরের বেলকনি থেকে নিচের দিকে উঁকি দিতেই দেখল, বাড়ির সবাই গোল হয়ে কোনো একটা জিনিসের দিকে তাকিয়ে আছে।
​তৃণা আর দেরি না করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। ভিড় ঠেলে সামনে যেতেই তার চোখ কপালে উঠল। দেখল একটা সুন্দর খাঁচায় একটা বিড়াল বসে আছে। বিড়ালটার গায়ের রঙটা ভারি চমৎকার হালকা ব্রাউন বা শ্যামলা রঙের। তৃণা ভ্রু কুঁচকে সেদিকে তাকিয়ে থাকল। আরিয়ান তৃণার উপস্থিতি টের পেয়ে উজ্জ্বল মুখে এগিয়ে এসে বলল,
​“দেখো তো লিলিকে কেমন লাগছে? বিড়ালটা কি পছন্দ হয়েছে তোমার?”

​তৃণা কোনো উত্তর না দিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান হেসে খাঁচাটা খুলে বিড়ালটাকে হাতে তুলে নিল। এদিকে মিহু তো আগে থেকেই ছিল। সে দূরে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ চোখে এই নবাগতকে পর্যবেক্ষণ করছিল। মিহু এগিয়ে আসতেই তৃণা তাকে কোলে তুলে নিল। মিহু তার বড় বড় চোখ করে আরিয়ানের হাতের বিড়ালটার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে ‘মিউ মিউ’ করে উঠল, যেন বলতে চাইছে ‘আমার আদরের ভাগ বসাতে আবার কাকে নিয়ে এলে!’
​আরিয়ান তৃণার মনের ভাব বুঝতে পেরে হাসিমুখে বলল,
“ওর নাম রেখেছি লিলি। ও একটা ফিমেল ক্যাট। নামটা সুন্দর না?”

​তৃণা আলতো হেসে বলল,
“হ্যাঁ, নামটা বেশ সুন্দর।”

​আরিয়ান এবার তৃণার দিকে তাকিয়ে মজা করে বলল,
“তাহলে মুখটা অমন প্যাঁচার মতো করে রেখেছ কেন? নিজের হবু ছেলের বউকে দেখেও কি শাশুড়িমার পছন্দ হলো না?”

​তৃণা আকাশ থেকে পড়ল! অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ছেলের বউ মানে? তুমি কি ওদের বিয়ে দেবে নাকি?”

​আরিয়ান বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বলল,
“অবশ্যই দেব! মিহুর জন্য তো একটা জীবনসঙ্গিনী দরকার, তাই না?”

​আরিয়ান দুষ্টুমি করে লিলিকে মিহুর নাকের কাছে নিতেই মিহু এক অদ্ভুত কাণ্ড করল। সে ঝটপট তৃণার গলার কাছে মুখ লুকালো। দৃশ্যটা দেখে বাড়ির সবাই হেসে উঠল। মনে হলো মিহু হয়তো সত্যিই খুব লজ্জা পেয়েছে!
আরিয়ান মিহুর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন পারলে এখনই ওটাকে বাসা থেকে বের করে দেয়। মনে মনে গজগজ করতে করতে ভাবল,
“বেয়াদব বিড়াল! আমার বউয়ের কাছ থেকে তোকে দূরে সরাতেই এত কষ্ট করে এই লিলিকে নিয়ে আসলাম, আর তুই কি না সুযোগ পেয়ে উল্টো আরও সেঁটে বসে আছিস! মন চাচ্ছে একদম গলা টিপে ধরি।”

​আসলে আরিয়ানের এই অসময়ে কাজ ফেলে বিড়াল কিনে আনার পেছনে এক বিরাট রহস্য আছে। গতকাল রাতে সে এক ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নে দেখল তৃণা তাকে একদম পাত্তাই দিচ্ছে না, সারাক্ষণ মিহুকে নিয়ে মেতে আছে। এমনকি আরিয়ানকে রুমে ঢুকতেও দিচ্ছে না সে! স্বপ্নে যখন আরিয়ান রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে মিহুকে জিজ্ঞেস করল,
“তুই সারাদিন আমার বউয়ের কোলে থাকিস কেন?”

তখন মিহু মানুষের গলায় চোখ রাঙিয়ে উত্তর দিল,
“ও তোর চেয়ে আমাকেই বেশি ভালোবাসে, বুঝলি?”

​আরিয়ানের কাছে এর চেয়ে ভয়ংকর স্বপ্ন আর হতে পারে না! কত বড় সাহস! তাকে রেখে তার বউ একটা বিড়ালকে বেশি ভালোবাসবে এটা আরিয়ান মির্জা বেঁচে থাকতে হতে দেবে না।
​তৃণা আরিয়ানকে ওভাবে গুম মেরে থাকতে দেখে কৌতূহলে জিজ্ঞেস করল,
“কী ভাবছেন এত?”

​আরিয়ান সম্বিত ফিরে পেয়ে গম্ভীর হওয়ার ভান করল। কড়া গলায় বলল,
“উঁহু, কিছু না। দাও, মিহুকে আমার কাছে দাও। আজ থেকে মিহুকে তুমি আর একদম কোলে নেবে না, বলে দিচ্ছি। ওর জন্য এখন বউ আছে, ও ওর বউয়ের সাথেই থাকুক। খবরদার! আজ থেকে মিহুকে নিয়ে আর আমাদের সাথে ঘুমাবে না ও।”

​তৃণা আরিয়ানের এই ‘বিড়াল-বিদ্বেষ’ দেখে হেসেই আকুল। সে বুঝতে পারছে না যে একটা বিড়ালের সাথে তার স্বামী রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছে!
তৃণা কিছুটা বিরক্ত হওয়ার ভান করে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“কী সব আবোল-তাবোল বলছেন! এই জন্য কি আমি মিহুকে একটু আদরও করতে পারব না?”

​আরিয়ান এবার সুযোগ বুঝে তৃণার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। তৃণার কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আদর করতে চাইলে তোমার স্বামীকে করবে, বিড়ালকে কেন?”

​তৃণা লজ্জায় লাল হয়ে ভ্রু কুঁচকে এক পা পিছিয়ে গেল। আরিয়ান নিজের গলার টাইটা একটু আলগা করে দুষ্টুমি ভরা চোখে তাকিয়ে আবারও বলল,
“জলদি রুমে আসো, কাজ আছে।”

​তৃণা এবার আরিয়ানের চোখের ভাষা দেখে কিছুটা কুঁচকে গেল। লজ্জামাখা মুখ নিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“পারব না।”

​আরিয়ান ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে তুলল। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ছিঃ! কী নষ্ট মাইন্ড শ্যামলিনী তোমার! আমি তো এমনিই রুমে আসতে বললাম, কাজের কথা বলতে। তুমি কী ভাবলে?”

​তৃণা এবার সত্যিই অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে চটজলদি চারদিকে তাকিয়ে দেখে নিল কেউ তাদের কথা শুনে ফেলল কি না। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে বলল,
“আস্তে কথা বলুন! বাড়িতে সবাই আছে তো, কেউ শুনে ফেললে কী ভাববে?”
​আরিয়ান সেদিকে পাত্তা না দিয়ে বিজয়ী হাসি হাসল। ওদিকে ড্রয়িংরুমের কার্পেটে বসে নৌশি আর মিতু লিলি আর মিহুকে নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত।বিড়ালের এই নতুন জুটিটা দেখতে একদম আরিয়ান আর তৃণার মতোই। আরিয়ান ফর্সা আর তৃণা মায়াবী শ্যামলা, ঠিক তেমনই মিহু ধবধবে সাদা আর লিলি ব্রাউন আর সাদার মিশ্রণ।
★★★
ভার্সিটির ক্যাম্পাসে আড্ডা দিচ্ছে আদনান। সাথে তার তিন বন্ধু মিলি, কাউসার এবং রিফাত। আদনান নৌশির বিষয়গুলো নিয়ে মাঝেমধ্যে তাদের সাথে আলাপ করে। মিলি হঠাৎ প্রসঙ্গটা তুলে বলল,
​“আদনান, ওইদিন নৌশি ওরকম ব্যবহার করল কেন বল তো? ও কি আমাকে তোর গার্লফ্রেন্ড ভেবেছিল?”

​আদনান আনমনে অন্য কিছু ভাবছিল। মিলির কথা শুনে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দিল। বলল,
“হ্যাঁ, ভীষণ হার্ট হয়েছে নাদানের বাচ্চা!”

​মিলি কিছুটা অনুযোগের সুরে বলল,
“তাহলে তখনি বলে দিলি না কেন যে আমি জাস্ট তোর ফ্রেন্ড? মেয়েটা তোকে ওভাবে দেখে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে।”

​পাশ থেকে রিফাত ফিসফিস করে বলল,
“এই ব্রো, নৌশি এভাবে রিয়েক্ট করল, তার মানে কি ও তোকে পছন্দ করে?”

​কাউসার রিফাতের মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
“ওরে বলদ! অবশ্যই পছন্দ করে। তা না হলে কি আর কেউ ওভাবে এসে সিন ক্রিয়েট করত?”

​বন্ধুদের কথা শুনে আদনানের ঠোঁটের কোণে হাসিটা আরও চওড়া হলো। নৌশির পাগলামিগুলোর কথা মনে পড়লে সে নিজেকে সামলাতে পারে না। সে আবারও বলল,
​“জানিস, নৌশি আজ আমাকে রীতিমতো থ্রেট দিয়েছে! বলেছে, সাত দিনের মাঝে অন্য কাউকে বিয়ে করে ও আমায় দেখিয়ে দিবে।”

​কথাটা শেষ করেই আদনান হো হো করে হেসে উঠল।
মিলি বলল,
“সবকিছু মজা ভেবে নিস না আদনান। মেয়েদের ইগো ভয়ংকর হয়। যদি সত্যি সত্যি কাউকে বিয়ে করে ফেলে তখন কী করবি?”

​“আরে না, ওকেও কি এখনই বিয়ে দিবে নাকি বাড়ি থেকে? এই তো মাত্র ইন্টার পাশ করল। এত তাড়াতাড়ি আমাদের বাড়ির মেয়েদের বিয়ে দেয় না।” আদনান বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিল।

​মিলি আবারও সতর্ক করল,
“তবুও ভাই আদনান, একটু সিরিয়াস হ।”

​রিফাত হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা আদনান, তুই কি নৌশিকে লাভ করিস?”

রিফাতের পিঠে একটা চাপড় দিয়ে কাউসার বলল,
“যে ছেলে সারাদিন ওই মেয়ের নাম জপ করে, তুই এখনো বলছিস ভালোবাসে কি না!”

​আদনান আর কোনো তর্কে গেল না। কাঁধে ব্যাগটা টেনে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোরা কি আমার সাথে ফুলের দোকানে যাবি?”

“না, কেন?”

“কিছু ফুল কিনব।”

“নৌশির জন্য?”

“হুম, নাদানের বাচ্চা ফুল খুব পছন্দ করে।”
★★★
তখন গোধূলির মায়াবী আলো জানলা দিয়ে এসে ঘরের মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে। আরিয়ানের দীর্ঘদিনের অভ্যাস, বাইরে থেকে ফিরে শাওয়ার নেওয়া। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। সে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো চুল ভেজা, কাঁধে একটা আধভেজা তোয়ালে ঝোলানো। পরনে কেবল একটা ক্যাজুয়াল ট্রাউজার আর ধূসর রঙের টি-শার্ট।
​তৃণাকে সেই কখন বলেছিল রুমে আসতে, অথচ মেয়েটার পাত্তা নেই! আরিয়ান মনে মনে অভিমান আর বিরক্তি নিয়ে ফুঁসছিল। ঠিক তখনই করিডরে পরিচিত পায়ের নূপুরের শব্দ শোনা গেল। আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টুমি ভরা হাসি ফুটে উঠল। সে চট করে দরজার আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়ালো।

​তৃণা যেই না ঘরে পা বাড়িয়েছে, আরিয়ান বিদ্যুতের গতিতে তার নরম বাহু ধরে হেঁচকা টানে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। আকস্মিক এই আক্রমণে তৃণা চমকে গিয়ে বড় বড় চোখে তাকালো। সামলে নিয়ে কৃত্রিম বিরক্তি দেখিয়ে বলল,
“আপনি সত্যিই একটা বিরক্তিকর মানুষ! কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ করে এভাবে কেউ ভয় দেখায়?”

​আরিয়ান তার দুই হাত তৃণার দুপাশে দেয়ালের ওপর রেখে তাকে খাঁচাবন্দি করে ফেলল। খুব কাছ থেকে তৃণার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ওহ তাই? আমি যে তোমাকে অনেকক্ষণ আগে রুমে আসতে বলেছিলাম, সেটা কি মহারানির মনে আছে?”

​তৃণা কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে গেল। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল আরিয়ানের দিকে। আরিয়ানের ভেজা চুল থেকে টুপটুপ করে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে তার ফর্সা গলায়। টি-শার্টটা পানির ছাঁটে ভিজে শরীরের পেশির সাথে লেপ্টে আছে। আরিয়ানের এই সিক্ত রূপ আর তার পুরুষালি সুগন্ধ তৃণাকে যেন এক অন্য জগতে নিয়ে যাচ্ছিল।
​আরিয়ান তৃণার মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে বাঁকা হাসল। তার সেই সুবিন্যস্ত দাড়ি আর কিলার স্মাইলটা এই মুহূর্তে ভীষণ আবেদনময়ী লাগছে। সে তৃণার কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“স্বামীর কাছে আসতে চাও না, অথচ এমন ভাবে তাকিয়ে থাকো যে আমারই লজ্জা লেগে যায়, শ্যামলিনী!”

​তৃণা ঘোর কাটিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে ‘ধ্যাৎ’ বলে আরিয়ানের শক্ত বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। মুখটা নিচু করে লাজুক স্বরে বলল,
“আপনার বুঝি আবার লজ্জাও আছে?”

​আরিয়ান এক পা এগিয়ে আবারও তৃণার খুব কাছে এসে দাঁড়ালো। তার চোখের গভীরে চোখ রেখে গাঢ় স্বরে বলল,
“উহু, পুরুষ মানুষের লজ্জা থাকতে নেই… বিশেষ করে নিজের স্ত্রীর সামনে।”

তৃণা পরিবেশটা কিছুটা হালকা করার জন্য কথা পাল্টে বলল,
“আজ মামা আর মা জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে।”

​খবরটা শোনামাত্রই আরিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। মুহূর্তেই তার শান্ত চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল, দাঁতে দাঁত চেপে সে যেন নিজের ভেতরের ক্ষোভটা দমানোর চেষ্টা করল। তৃণা বুঝতে পারল আরিয়ানের ভেতরের ঝড়টা। সে আলতো করে আরিয়ানের শক্ত হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নরম স্বরে বলল,
“শান্ত হোন। আশা করি তারা তাঁদের ভুল বুঝতে পেরেছেন। সেসব পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে এখন আর মন খারাপ করার কোনো প্রয়োজন নেই।”

​আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে সামলে নিল। কথা না বাড়িয়ে হেয়ারড্রায়ার দিয়ে ভেজা চুলগুলো শুকাতে শুরু করল। ঘরজুড়ে ড্রায়ারের শোঁ শোঁ শব্দ। এর মাঝেই আরিয়ান হঠাৎ নিচু স্বরে ডাকল,
“ও শ্যামলিনী!”

তৃণা আলমারি গোছাতে গোছাতে ছোট করে উত্তর দিল, “হুঁ।”

​“তোমাকে কখনো কালো শাড়ি পরতে দেখিনি। আজ একটা কালো শাড়ি পোরো তো।”

​তৃণা আরিয়ানের ভেজা তোয়ালেটা হাতে নিতে নিতে বলল,
“শ্যামলা মেয়েদের কালো শাড়িতে মানায় না। অন্ধকারে মিশে যাব যে!”

​আরিয়ান ড্রায়ারটা বন্ধ করে ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। তার চোখেমুখে বিস্ময় আর কিছুটা বিরক্তি। গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল,
“কে বলল এই অদ্ভুত কথা?”

​তৃণা তোয়ালেটা নিয়ে বেলকনির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে নির্লিপ্তভাবে বলল,
“কেউ বলেনি, আমিই বললাম।”

​তৃণা বেলকনিতে চলে গেল তোয়ালেটা শুকাতে দেওয়ার জন্য। আরিয়ান কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, এই মেয়েটা নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে কতটা উদাসীন! সে কি জানে না যে তার এই শ্যামলা রূপটাই আরিয়ানের কাছে সবচেয়ে মায়াবী? আর কালো শাড়ি? সেটা তো তার তনুতে আগুনের মতো জ্বলবে!
★★★
আজ সন্ধ্যার পর থেকেই তৃণার শরীরটা ঠিক লাগছিল না। মাথাটা কেমন ভার ভার ঠেকছিল, তাই রুমের আলো নিভিয়ে শুয়ে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল সে। আরিয়ান বিকেলের দিকে কোনো কথা না বলেই বেরিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ রুমের আলো জ্বলে উঠতেই তৃণা চোখ কুঁচকে তাকালো। দেখল আরিয়ান ঘরে ঢুকেছে, আর তার দুই হাতে এক গাদা শপিং ব্যাগ।
​আরিয়ানের ঠোঁটে যেন রহস্যময় এক চিলতে হাসি। তৃণা অবাক হয়ে সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করল,
“হাতে এতগুলো শপিং ব্যাগ! কী এনেছেন এসব?”

​আরিয়ান কোনো উত্তর না দিয়ে ব্যাগগুলো তৃণার সামনে বিছানায় ঢেলে রাখল। তারপর বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বলল,
“নিজের হাতেই খুলে দেখো।”

​তৃণা কৌতূহল নিয়ে প্রথম ব্যাগটা খুলতেই দেখল একটা কুচকুচে কালো শাড়ি। সে অবাক হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি এই কালো শাড়ি কেনার জন্যই বাজারে গিয়েছিলেন?”

​আরিয়ান মুচকি হেসে বলল,
“পরের ব্যাগগুলোও খোলো।”

​তৃণা একে একে সবকটি ব্যাগ খুলল এবং প্রতিবারই তার বিস্ময়ের মাত্রা বাড়তে লাগল। প্রতিটি ব্যাগেই শাড়ি, আর অবাক করা বিষয় হলো সবগুলোই কালো রঙের! তবে বৈচিত্র্য আছে কাপড়ে কোনোটা মসলিন, কোনোটা জামদানি, কোনোটা পিওর সিল্ক কিংবা অর্গাঞ্জা। বিছানাটা মুহূর্তেই কালো রঙের স্তূপে পরিণত হলো।
​তৃণা বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল,
“এত কালো শাড়ি দিয়ে কি আপনি ব্যবসা করবেন নাকি?”

“মাত্র বিশটা। আর সবগুলোই শুধু তোমার জন্য।”

​তৃণা একবার বিছানায় ছড়ানো শাড়িগুলোর দিকে তাকাচ্ছে, আর একবার আরিয়ানের দিকে। এটাকে ঘোরতর পাগলামি ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়! আরিয়ান এবার তৃণার খুব কাছে এসে গাঢ় স্বরে বলল,
“আজ থেকে প্রতিদিন আমার সামনে এই কালো শাড়ি পরেই ঘুরবে তুমি।”

​তৃণা অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“আপনি কি পাগল হয়েছেন?”

​“হুম, তোমার জন্য পাগলই সই। যেটা বলেছি সেটাই করবে।”

​“মানুষ প্রতিদিন একই রঙের শাড়ি পরে নাকি? দেখতে কেমন লাগবে!” তৃণার আপত্তি।

​আরিয়ান জেদি গলায় বলল,
“একই রকম তো নয়, শুধু রঙটাই এক। আমি দেখতে চাই আমার শ্যামলিনীকে কালো শাড়িতে কেমন লাগে। ব্যাস!”

​তৃণা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইল। এই লোকটাকে পাগল বললেও যেন কম বলা হয়!

চলবে…

(রেসপন্স দিন দিন কমে যাচ্ছে কেন? আপনারা এত বড় একটা গল্প পড়তে পারেন কিন্তু রিয়েক্ট বা কমেন্ট করতে পারেন না!)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply