Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র বোনাস পর্ব (আদনান-নৌশি)


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

বোনাস_পর্ব (আদনান-নৌশি)

নিলুফানাজমিননীলা

★★★
আকাশ চিরে মেঘ ভাঙা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। অঝোর ধারায় নামা সেই বৃষ্টিতে মুহূর্তেই চারপাশ ঝাপসা হয়ে এল। মির্জা বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ভিজে একাকার হয়ে ঢুকল আদনান। বাইকটা কোনোমতে গ্যারেজে রেখেই দৌড়ে ড্রয়িংরুমে এসে হাঁফ ছাড়ল সে। শার্টের হাতা দিয়ে কপাল আর ঘাড়ের জল মুছতে মুছতে আঙুলে বাইকের চাবিটা বনবন করে ঘুরাচ্ছিল সে।
​ঠিক যখনই সিড়ির দিকে পা বাড়াবে, তখনই রাহি বেগমের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর তার কানে এল,
“আদনান! নৌশি কোথায় রে? ও কি তোর সাথে ছিল?”

​আদনানের পা সেখানেই থেমে গেল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন কেঁপে উঠল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“নৌশি কোথায় মানে? ও কি বাড়িতে নেই?”

​রাহি বেগম কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে বললেন,
“না তো! ও তো সকালে বলল বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাবে, দুপুরের আগেই ফেরার কথা। এখন দুটো বেজে পার হয়ে গেল, অথচ মেয়েটার পাত্তা নেই। বাইরে দেখছিস কীরকম বৃষ্টি শুরু হয়েছে!”

​আদনান আর মুখ ফুটে বলতে পারল না যে, ঘণ্টাখানেক আগেই পার্কের মাঝখানে নৌশির সাথে তার এক পশলা লড়াই হয়ে গেছে। সে পকেট থেকে মোবাইল বের করে কল দিতে নিতেই রাহি বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“কল দিয়ে লাভ নেই, আমি অনেকবার ট্রাই করেছি। ওর ফোন বন্ধ বলছে।”

​“কী? ফোন বন্ধ!” আদনান নিজের কপালে আঙুল দিয়ে ঘষতে লাগল।

​রাহি বেগমের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। তিনি বললেন,
“খুব টেনশন হচ্ছে আমার। মেয়েটা কখনো এমন করে না।”

​আদনান নিজেকে সামলে নিয়ে বড় মা-কে আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করো না বড় মা। বন্ধুদের সাথেই আছে হয়তো, বৃষ্টির জন্য আটকা পড়েছে। আমি যাচ্ছি, ওকে এখনই নিয়ে আসছি।”

​আদনান আর দেরি করল না। ভিজে শার্টেই আবার বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল। দৌড়ে বাইকে ওঠার সময় সে দ্রুত তার মোবাইল থেকে নৌশির বান্ধবী মৌ-এর নাম্বারটা বের করল। আদনান সবসময়ই একটু সাবধানি, নৌশির সব বন্ধুদের নাম্বার সে নিজের কাছে সেভ করে রেখেছিল কোনো এক বিপদের কথা ভেবে। আজ যেন সেই দিনটাই সামনে এসে দাঁড়াল।
​মৌ-এর ফোনে রিং হতে হতেই আদনানের মনে বারবার নৌশির সেই জলভরা চোখের করুণ মুখটা ভেসে উঠল। পার্কের সেই কড়া কথাগুলোর জন্য এখন নিজের ভেতরেই এক অপরাধবোধ কাজ করছে। বৃষ্টির ঝাপটায় চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছে নৌশির ফোন বন্ধ থাকার কথা শুনে।
আদনানের দূরদর্শিতা আজ সত্যিই কাজে লেগে গেল। মৌ ফোন ধরতেই আদনান কোনো ভনিতা না করে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
“আমি নৌশির কাজিন আদনান বলছি। নৌশি কি তোমার সাথে?”

​ওপাশ থেকে মৌ অবাক হয়ে উত্তর দিল,
“না তো! ও তো অনেকক্ষণ আগেই পার্কে কাকে যেন দেখে বলল আমাদের চলে যেতে, ও পরে আসবে। আমরা তো তখন থেকেই বাসায়। কেন, কোনো সমস্যা হয়েছে?”

​“না, কিছু না,” বলেই আদনান কলটা কেটে দিল।

​আদনানের ভেতরের অস্থিরতা এবার ঝড়ের বেগে বাড়তে লাগল। তার মানে নৌশি সেই পার্ক থেকে আর কোথাও যায়নি! বাইরের বৃষ্টির দাপট আরও বেড়েছে, সাথে বইছে ঠান্ডা হাওয়া। এই দুর্যোগে একটা মেয়ে একা কোথায় থাকতে পারে? নিজের ওপর প্রচণ্ড আফসোস হতে লাগল আদনানের। রাগের মাথায় কেন যে ওভাবে কথা বলতে গেল!
​সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বাইক স্টার্ট দিল। তার একমাত্র লক্ষ্য এখন সেই পার্ক। চারদিকের ঝাপসা অন্ধকার আর বৃষ্টির তোড় ঠেলে সে পাগলের মতো বাইক চালাচ্ছে। ফাঁকা রাস্তায় দু-একটা গাড়ি ছাড়া আর কেউ নেই। আদনানের বুকের ভেতরটা তখন মোচড় দিয়ে উঠছে এক অজানা আশঙ্কায়।
​হঠাৎ রাস্তার মোড় ঘুরতেই আদনানের চোখ আটকে গেল। রাস্তার একপাশে ডিভাইডারের ওপর গুটিসুটি মেরে বসে আছে এক মানবী। আদনান এক ঝটকায় বাইক থামিয়ে দিল। মনে হলো মৃতদেহে যেন প্রাণ ফিরে এল তার।

বাইকটা স্ট্যান্ড করিয়েই সে দৌড়ে এগিয়ে গেল। বৃষ্টির ঝাপটায় তার টি-শার্ট শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে, গায়ের সাদা শার্টের বোতামগুলো খোলা।
​নৌশি রাস্তার ধারে মাথা নিচু করে বসে আছে। পরনের কাপড় আর চুল ভিজে একাকার হয়ে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। আদনান নৌশির সামনে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে থামল। বৃষ্টির জল উপচে না পড়লে হয়তো দেখা যেত আদনানের কপালের ঘাম বৃষ্টির জলের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। নৌশি একবার মাথা তুলে আদনানকে দেখল, কিন্তু তার চোখেমুখে কোনো ভাবান্তর নেই, কোনো অভিযোগও নেই। সে যেন এক পাথরের প্রতিমা।
রাগী অথচ কান্নার মতো শোনানো এক অদ্ভুত স্বরে চিৎকার করে উঠল,
“এই নাদানের বাচ্চা! কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই তোর? এই বৃষ্টির মধ্যে এভাবে রাস্তায় বসে আছিস কেন? কিছু হয়ে গেলে কী হতো?”

​নৌশি কোনো জবাব দিল না। সে আগের মতোই নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে তখন শুধু শোনা যাচ্ছিল আদনানের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ।

আদনান ভেজা রাস্তায় হাঁটু গেঁড়ে নৌশির ঠিক সামনে বসল সে। নিচু হয়ে নৌশির নুয়ে থাকা মুখটা দেখার চেষ্টা করে খুব নরম স্বরে শুধাল,
“কী হয়েছে? খুব রাগ হয়েছে আমার ওপর?”

​আদনানের প্রশ্নটা শেষ হতে না হতেই নৌশি হঠাত্‍ হো হো শব্দে হেসে উঠল। বৃষ্টির তীব্র ঝাপটা আর চারদিকের ধূসর আবহাওয়ার মাঝে নৌশির এই অট্টহাসি কেমন বিদঘুটে আর যন্ত্রণাময় শোনাল। আদনান ভ্রু কুঁচকে পাথরের মতো তাকিয়ে রইল। নৌশি হাসি থামিয়ে একদৃষ্টে আদনানের চোখের দিকে তাকিয়ে এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
​“রাগ? রাগ তো তাদের সাথেই করা যায় যারা আপন হয়, যাদের ওপর অধিকার থাকে। কিন্তু আমি তোর ওপর রাগ করার কে? কেনই বা রাগ করব?”

​আদনান এবার সত্যিই আহত হলো। সে কপাল কুঁচকে বলল,
“আমি তোর আপন না? আমি তোর কেউ না?”

​নৌশি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মনে করিয়ে দিল,
“কেন, কিছুক্ষণ আগেই না পার্কে সবার সামনে চিৎকার করে বললি ‘কে তুই? আমার পার্সোনাল বিষয়ে নাক গলানোর তুই কে?’ মনে পড়ছে না ?”

​আদনান এক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। নিজের বলা বিষাক্ত শব্দগুলো যে এভাবে ফিরে আসবে, সে ভাবেনি। সে কথা না বাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল এবং নৌশির হাতটা শক্ত করে ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করে বলল,
“জেদ করিস না। চল বাড়ি চল।”

​নৌশি এক ঝটকায় আদনানের হাতটা সরিয়ে দিল। তার চোখেমুখে এখন কেবল ঘৃণা আর অভিমান। সে চিৎকার করে উঠল,
“ডোন্ট টাচ মি! একদম ছোঁবে না আমায়!”

​আদনান হতভম্ব হয়ে বলল,
“কী সমস্যা তোর? কেন এমন করছিস?”

​“আমার কী সমস্যা সেটা তোকে বুঝতে হবে না। এখানে মিথ্যে আদিখ্যেতা দেখিয়ে আমাকে খুঁজতে আসলি কেন? যা, ওই মেয়ের কাছে যা। ওখানেই তো তোর সব অধিকার!”

​আদনান এবার মেজাজ হারাল। রাগী স্বরে বলল,
“নৌশি, বাড়াবাড়ি হচ্ছে। পার্কেও অযথা সিন ক্রিয়েট করেছিস, এখানেও করছিস। আর তর্কা-তর্কি না করে চুপচাপ চল আমার সাথে।”

নৌশি দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “অযথা সিন ক্রিয়েট করেছিলাম? তুই কেন ওই মেয়ের সাথে বসো ওমন আদিখ্যেতা করবি?”

আদনান নৌশির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
“আমি যদি কোনো মেয়ের সাথে প্রেমও করি এতে তোর তো কোনো যায় আসার কথা না? হিংসা হয় নাকি তুই সিঙ্গেল আর আমি প্রেম করছি বলে?”

নৌশি অশ্রুভেজা চোখে তাকিয়ে রইল।তারপর হঠাৎ রাগিস স্বরে বলল,
“তোর কি মনে হয় আমি প্রেম করতে পারিনা?”
“না পারিস না।”
“আজ এই বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে আমি কথা দিচ্ছি সাতদিনের মাঝে আমি বিয়ে করবো।দেখে নিস।”

নৌশির কথায় আদনান কিছুটা স্তব্ধ হয়ে গেল পরক্ষণেই বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ, অনেকদিন ধরে কোনো বিয়ে খাওয়া হচ্ছে না। এবার খেতে পারবো।”
নৌশি অসহায় নয়নে তাকিয়ে রইল। আদনান কি তার কথাটা সিরিয়াস ভাবে নেয়নি?
​নৌশি বৃষ্টির জল আর চোখের জল একসাথে মুছে একটা লম্বা শ্বাস নিল। তারপর শান্ত কিন্তু পাথুরে গলায় বলল, “তুই যা এখান থেকে। আমি একাই যেতে পারব।”

​“আমি আবারও বলছি, চল আমার সাথে।”

​“বললাম তো আমি একাই যেতে পারব! কথা কানে যায় না তোর?” নৌশির জেদি কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে গেল।
​আদনান আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। রাগে গড়গড় করতে করতে নিজের বাইকের দিকে হাঁটা দিল। নৌশি অশ্রুভেজা চোখে তাকিয়ে রইল আদনানের চলে যাওয়ার দিকে। তার মনে হলো, সত্যিই কি তবে আদনান তাকে একা ফেলে চলে গেল? বুকটা এক অসহ্য ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল তার। সে যখন উল্টো দিকে ফেরার জন্য পা বাড়াল, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চমকানোর মতো একটা হেঁচকা টানে সে থমকে গেল।
​দেখল, আদনান ফিরে এসেছে। সে কোনো কথা না বলে নৌশির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেছে। আদনান তাকে প্রায় টানতে টানতে নিজের বাইকের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

নৌশি রাগে হাত-পা ছুড়ে বলল,
“ছাড় বলছি! এভাবে আমার ওপর জোর খাটাবি না একদম।”

​আদনান হঠাৎ নৌশির ঠোঁটে নিজের তর্জনী আঙুল চেপে ধরল। এক নিমিষেই নৌশি স্তব্ধ হয়ে গেল। আদনান খুব নিচু স্বরে, অনেকটা হুকুম করার মতো করে বলল,
“হুশশ! একদম বেশি কথা বলবি না। আমি জোর করতে পারি, সেই হক আমার আছে। ভালো মেয়ের মতো না মানলে সত্যি বলছি, ঠেং ভেঙে কাঁধে করে নিয়ে যাব। আমাকে তো চিনিস!”

​নৌশি ভেজা গলায় পালটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলল,
“কিসের জোর দেখাস তুই? কোন অধিকারে?”

​আদনান উত্তর দিল না। বৃষ্টির ঝাপটায় দুজনের মুখ বেয়ে অবিরাম জল গড়িয়ে পড়ছে। আদনান পলকহীন চোখে নৌশির ভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির এই বুনো আবহেও নৌশিকে কী যে মায়াবী লাগছে! নৌশির সব কথা গলায় আটকে গেল আদনানের ওই তপ্ত চাহনি দেখে।
​আদনান পরক্ষণেই চোখ সরিয়ে নিয়ে গলার স্বর কিছুটা পালটে বলল,
“তুই আমাদের বাড়ির মেয়ে, বাড়ির ছোটদের ওপর বড়দের দায়িত্ব থাকে। সেই হিসেবেই জোর করছি।”

​নৌশি মনে মনে একটা বাঁকা হাসল। নিজের ওপর ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করছে তার। অথচ মনে মনে সে কী সব রঙিন স্বপ্নই না বুনে এসেছিল, আদনান তাকে ভালোবাসে! অথচ আজ তার সব স্বপ্ন এক নিমিষেই কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আদনান আবারও ফিসফিস করে বলল, “তুই বড্ড অবুঝ নৌশি। এমনি এমনি তোকে নাদান ডাকি না।”

​নৌশি আর কোনো তর্কে গেল না। আদনান বাইকে উঠে বসলে সে নিঃশব্দে পেছনে গিয়ে বসল। কিন্তু আদনানের শরীর স্পর্শ না করার এক আপ্রাণ চেষ্টা তার মাঝে স্পষ্ট। সে খুব দূরত্ব বজায় রেখে কোনোমতে বাইকের একদম শেষ প্রান্তে বসল।
​আদনান পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল,
“পড়ে যাবি তো, শক্ত করে ধরে বস।”

​নৌশি কোনো নড়চড় করল না, ধরলও না আদনানকে। আদনান একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাইক স্টার্ট দিল। বৃষ্টির তীব্র ঝাপটায় বাইক চালানো বেশ কঠিন, তবুও সে বার বার লুকিং গ্লাসে নৌশির মুখের দিকে তাকাচ্ছে। বৃষ্টির জলে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জল চেনা না গেলেও, নৌশির অস্বাভাবিক লাল হয়ে থাকা চোখ দুটো আদনানের বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। আজ দুজনের মাঝের এই সামান্য কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব যেন কয়েক যোজন মাইলের দূরত্বে পরিণত হয়েছে।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply