রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_৫১
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
বাইরে তখন রোদের কড়া তেজ। জানালার পর্দার ভাঁজ দিয়ে সেই সোনালি আলো উঁকি দিলেও রুমের ভেতরের মায়াবী নিস্তব্ধতা ভাঙতে পারছিল না। আরিয়ান আর তৃণা যেন জীবনের শ্রেষ্ঠ কোনো এক সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। আরিয়ানের প্রশস্ত বুকের একপাশে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে তার শ্যামলিনী। আরিয়ানের দুই হাতের শক্ত বাঁধন যেন তৃণার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
হঠাৎ দরজায় সজোর করাঘাতে তৃণার তন্দ্রাটা ভেঙে গেল। ঘুমের ঘোরেই আরিয়ান একটু নড়েচড়ে উঠে তাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। তৃণা আধোবোজা চোখে তাকাতেই দেখল তার ঠিক সামনেই আরিয়ানের সেই পুরুষালি বুক। মুহূর্তের জন্য তৃণা ভুলে গেল যে দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে। পরম আবেশে সে আবারও আরিয়ানের বুকের মাঝে মুখ লুকালো।
কিন্তু দরজার ওপাশ থেকে নৌশির চপল কণ্ঠস্বর এবার স্পষ্ট শোনা গেল,
“বউ মণি! আজ কি তোমরা ঘুম থেকে উঠবে না নাকি?”
নৌশির ডাকে তৃণার পুরো ঘুমটাই এক নিমেষে টুটে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে তো রীতিমতো আঁতকে উঠল সকাল দশটা বেজে বিশ! সে তড়িঘড়ি করে আরিয়ানের লোহার মতো শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা শুরু করল। কিন্তু আরিয়ান যেন ঘুমের ঘোরেও তাকে ছাড়তে নারাজ। অনেক মুচড়ামুচড়ি আর কসরত করে শেষমেশ নিজেকে মুক্ত করে বিছানা থেকে নামল তৃণা।
দ্রুত পায়ে গিয়ে দরজা খুলতেই নৌশির সেই হাসি হাসি মুখটা ভেসে উঠল। ফর্সা চেহারায় লাল টকটকে ঠোঁট জোড়া প্রসারিত করে নৌশি মিটিমিটি হাসছে। তৃণা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
“আসলে… কাল রাতে খুব দেরি করে ঘুমিয়েছি তো, তাই উঠতে একটু দেরি হয়ে গেল।”
তৃণার কথা শুনে নৌশি প্রথমে বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ কী যেন ভেবে মুখ চেপে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি দিল।
তৃণা ভ্রু কুঁচকে নৌশির দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে? হাসছো কেন?”
নৌশি হাসি সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে কোনোমতে বলল,
“কিছু না… যাও, তাড়াতাড়ি শাওয়ার নিয়ে নিচে এসো বউমণি।”
তৃণা বোকার মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। নৌশি চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েও পেছন ফিরে টিপ্পনী কাটল,
“বাড়িতে কিন্তু ছোট একটা অবিবাহিত ননদ আছে! একটু বুঝে-শুনে দরজা খুললে ভালো হতো।”
বলেই সে ফিক করে হেসে দ্রুত পায়ে করিডোর দিয়ে চলে গেল।
তৃণা বিভ্রান্ত হয়ে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। নৌশি কী নিয়ে এত হাসল? ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়াতেই তৃণার যেন বজ্রপাত হলো! নিজের গলার দিকে তাকিয়ে তার চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। গলার ঠিক নিচে গভীর ভালোবাসার স্পষ্ট দাগ এক গাঢ় রক্তিম চিহ্ন! তৃণা হাত দিয়ে দাগটা ঢাকার চেষ্টা করল, আর মনে মনে ভাবল, ‘এই কারণেই তবে নৌশি ওভাবে হাসছিল!’
সে লাজুক হেসে ঘুমে আচ্ছন্ন আরিয়ানের দিকে তাকালো। অগোছালো চুলে আর গভীর প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা লোকটাকে আজ যেন অন্যদিনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সুন্দর লাগছে। তৃণা মোহাবিষ্ট হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল।
এদিকে ড্রয়িংরুমে মির্জা বাড়ির কর্ত্রীরা সবাই তখন সকালের আড্ডায় ব্যস্ত। নৌশি নিচে নামতেই মায়মুনা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
“তৃণারা কি উঠেছে রে?”
নৌশি সোফায় বসে বলল,
“হুম, ডেকে দিয়ে এলাম।”
মায়মুনা বেগম একটু বিরক্তির সুরে বললেন,
“আহা, ডাকতে গেলি কেন? একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছে, হয়তো শরীরটা ভালো নেই। আরেকটু ঘুমালে কী এমন ক্ষতি হতো?”
নৌশি উত্তর না দিয়ে প্রসঙ্গের মোড় ঘুরিয়ে বলল,
“আমি একটু বন্ধুদের সাথে বাইরে যাচ্ছি আম্মু।”
রাহি বেগম (নৌশির মা) শাসন মেশানো গলায় বললেন, “বেশি দেরি করিস না, তাড়াতাড়ি ফিরবি।”
নৌশি উঠে গিয়ে নিজের মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আদরমাখা স্বরে বলল,
“ওসব বলতে হবে না ! তোমার মেয়ে অনেক লক্ষ্মী, আমি ঠিক সময়েই ফিরে আসব।”
বলেই সে বাড়ির তিন কর্ত্রীর গালে টপ টপ করে চুমু খেয়ে নিল। বাড়ির এই এক নিয়ম, নৌশি সবসময় ছোট বাচ্চার মতো বাড়ির বড়দের এভাবেই ভালোবেসে মাতিয়ে রাখে।
★★★
মিতু একদৃষ্টিতে আয়নার দিকে তাকিয়ে যান্ত্রিকভাবে চুল আঁচড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার মন সেখানে নেই, পড়ে আছে কালকের সেই বিষণ্ণ ঘরটিতে। আয়নার নিজের প্রতিবিম্বটাকেও আজ তার কাছে বড় অচেনা মনে হচ্ছে।
রোহান রুমে ঢুকে মিতুর এই শূন্যতা দেখে বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ধীর পায়ে মিতুর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। মিতুর কাঁধে হাত রাখতেই মেয়েটা চমকে উঠল। রোহান মিতুর ঘাড়ে নিজের মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কী হয়েছে আমার নীলাঞ্জনার? মনটা কি কোথাও হারিয়ে গেছে?”
মিতু নিজেকে স্বাভাবিক করার বৃথা চেষ্টা করে অস্ফুট স্বরে বলল,
“না… কিছু না তো।”
রোহান আয়নার ভেতর দিয়েই মিতুর চোখের গভীর বিষাদটুকু মেপে নিচ্ছিল। মিতু হঠাত্ ঘুরে দাঁড়িয়ে রোহানের মুখোমুখি হলো। কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“একটা কথা বলি? রাখবে আমার কথাটা?”
রোহানের ভ্রু কুঁচকে গেল। মিতুর চোখের ওই উদাসীনতা দেখে সে আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিল মিতু কী বলতে যাচ্ছে। সে গম্ভীর গলায় বলল,
“এমন কোনো আবদার করো না নীলাঞ্জনা, যা রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব।”
মিতু রোহানের কথা পাত্তা না দিয়ে এবার বলেই ফেলল,
“প্লিজ তুমি আরেকটা বিয়ে করো রোহান। আমি চাই তুমিও একদিন ‘বাবা’ ডাক শোনো। আমি তোমাকে অনুমতি দিচ্ছি, আমি একটুও রাগ করব না।”
রোহান এবার কোনো পাল্টা যুক্তি দিল না, চুপ করে রইল। রোহানের এই নিস্তব্ধতা মিতুকে দ্বিধায় ফেলে দিল। সে আবারও বলল,
“রাখবে না আমার এই কথাটা?”
রোহান এবার মিতুকে অবাক করে দিয়ে শান্ত গলায় বলে উঠল,
“তোমার কথা কি আমি কখনো ফেলেছি? তাহলে এই বড় কথাটা না রেখে কীভাবে পারি? তুমি যখন বলছ, তবে তাই হোক।”
মিতুর বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই বরফ হয়ে গেল। সে নিজের মন থেকেই রোহানকে বিয়ের কথা বলেছিল, কিন্তু রোহান এত সহজে রাজি হয়ে যাবে তা সে কল্পনাও করেনি। তার সারা শরীর কাঁপতে শুরু করল। মিতু অবিশ্বাসে শুধু বলতে পারল, “হুঁ?”
রোহান এবার একটু বাঁকা হেসে বলল,
“বললাম তাহলে মেয়ে দেখা শুরু করো। দ্বিতীয় বিয়ে করতে রাজি হয়নি এমন পুরুষ কি পৃথিবীতে আছে? চারটা বিয়ে করতে পারলে তো আরও ভালো, আলহামদুলিল্লাহ!”
মিতু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। নিজের অজান্তেই তার দুচোখ বেয়ে গরম অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে নিজের অধিকার অন্য কাউকে বিলিয়ে দেওয়ার কথা মুখ ফুটে বললেও, তার অন্তর যেন এই নিষ্ঠুর সত্যটা নিতে পারছে না।
মিতুকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রোহান আর অভিনয় ধরে রাখতে পারল না। সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। পরক্ষণেই মিতুকে এক ঝটকায় নিজের বুকের সাথে জাপটে ধরে পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। রোহান তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ভারী কণ্ঠে বলল,
“আমার এই অস্তিত্বে নীলাঞ্জনা ছাড়া অন্য কোনো নারীর ছায়া পড়ার আগে যেন আমার মরণ হয়। আমার ভালোবাসা এত সস্তা নয় যে কোনো একটা অপূর্ণতার কারণে আমি তোমাকে দূরে সরাবো । আমার পূর্ণতা শুধু তোমাতেই।”
মিতু রোহানের বুকে মুখ লুকিয়ে শব্দ করে কেঁদে দিল। এই কান্নায় যেমন যন্ত্রণা ছিল, তেমনি ছিল হারানোর ভয় থেকে মুক্তির এক পরম তৃপ্তি।
★★★
ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসতেই ভোরের সেই অদ্ভুত শীতলতা তৃণার শরীর ছুঁয়ে গেল। আরিয়ান তখনও শয্যায় অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাকে জাগানোর কোনো চেষ্টা না করেই তৃণা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে তার নজর স্থির হলো আয়নায় নিজের গলার ওপর। শাওয়ারের উষ্ণ জলের ছোঁয়ায় দাগগুলো যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে, ঠিক যেন কোনো এক গভীর অনুরাগের রক্তিম স্বাক্ষর।
তৃণা নিজের আঙুল দিয়ে সন্তর্পণে সেই দাগগুলো একবার ছুঁয়ে দেখল। মুহূর্তেই গত রাতের সেই মায়াবী স্মৃতিগুলো তার মনে ভিড় করে এলো। এক অনির্বচনীয় আবেশে সে নিজের দুই হাতের তালু দিয়ে নিজের মুখটা ঢেকে ফেলল। সে নিজেই নিজের কাছে আজ বড্ড অচেনা, তার এই লাজুক সত্তা, এই অদ্ভুত শিহরণ সবকিছুই যেন আরিয়ানের পরশে নতুন রূপ পেয়েছে। নিজেকে কোনোমতে স্বাভাবিক করে সে আবারও চুলে তোয়ালে দিয়ে ঝাড়া দিতে শুরু করল।
ঠিক তখনই অবাধ্য চুলের কয়েক ফোঁটা জল ছিটকে গিয়ে পড়ল আরিয়ানের ঘুমন্ত চেহারায়। ঘুমের ঘোরে ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত মুখে চোখ মেলল আরিয়ান। কিন্তু চোখ মেলতেই আয়নার সামনে ভেজা চুলের সেই মায়াবিনীকে দেখে সে যেন এক পলকেই স্তব্ধ হয়ে গেল। অন্য সময় হলে হয়তো এমন কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় একটা কড়া বকুনি দিয়ে বসত লোকটা, কিন্তু আজ তার মুখে কোনো অভিযোগ নেই। বরং সে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল এক শ্যামকন্যার স্নিগ্ধ রূপের দিকে।
আরিয়ান বিছানা ছেড়ে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালো। তৃণা আরিয়ানকে আসতে দেখলেও কোনো কথা বলল না, নিজের মতো চুল মোছায় ব্যস্ত রইল। কিন্তু পরক্ষণেই এক বলিষ্ঠ হাতের বাঁধনে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল আরিয়ান। আচমকা এই স্পর্শে তৃণা একটু শিউরে উঠলেও নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টা করল না।
আরিয়ান তৃণার সেই সুবাসিত ভেজা চুলে নিজের মুখ লুকালো। এক দীর্ঘ গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে সে যেন তৃণার চুলের প্রতিটি কণা থেকে সবটুকু ঘ্রাণ শুষে নিতে চাইল।
আরিয়ানের কণ্ঠস্বর তখন ভোরের কুয়াশার মতো ঘন আর নেশাতুর। তৃণার ভেজা চুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে সে ফিসফিসিয়ে বলল,
“সকাল সকাল আমাকে ধ্বংস করার পায়চারি করছেন বুঝি, মিসেস আরিয়ান মির্জা? এত সুন্দর মায়াকাড়া মুখ নিয়ে জন্মাতে কে বলেছিল আপনাকে? উপরওয়ালার অশেষ রহমত যে আপনি আমার জন্য চিরতরে হালাল, তা না হলে এই রূপ দেখে আমার চোখের জিনার পরিমাণ বোধহয় আকাশ ছুঁত।”
তৃণা আরিয়ানের এই গভীর আর অকপট স্বীকারোক্তিতে নিজের চোখ দুটো বুজে নিল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অভিমানী হাসি ফুটে উঠল। সে ধীর স্বরে বলে উঠল,
“অথচ এই শ্যামলা চেহারার জন্য আপনিই আমাকে কতবার খোঁটা দিয়েছেন, মনে আছে আপনার?”
আরিয়ান এবার তৃণার দুই কাঁধ ধরে আলতো করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তৃণার কাজল ধোয়া চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে সে নরম গলায় বলল,
“আমার কাছে রূপ বা গায়ের রঙ কখনোই বড় ছিল না শ্যামলিনী। তোমাকে কড়া কথা শোনানোর কারণ চেহারা ছিল না, বরং আমার জেদ ছিল। আমি চেয়েছিলাম তুমি যেন আমাকে ঘৃণা করে আমার জীবন থেকে চলে যাও।”
তৃণা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে বলল,
“ওহ, তাই নাকি? তাহলে এক কাজ করি, সুযোগ যখন আছে আমি এখনই চলে যাই?”
“এক পা বাড়িয়ে দেখো শুধু, একদম ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখব!”
আরিয়ান মুহূর্তেই তৃণার কোমরের বাঁধন আরও শক্ত করে নিল। মুখে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে গম্ভীর হওয়ার ভান করল।
আরিয়ানের শাসানি শুনে তৃণা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে উঠল। তৃণার সেই মুক্তোর মতো হাসির শব্দে আরিয়ানের কঠোরতাও মুহূর্তেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। সেও তৃণার হাসিতে যোগ দিল।
★★★
পার্কের চারধারে বিকেলের মায়াবী রোদ ছড়িয়ে পড়েছে। নৌশি, মৌ আর আঁখি তিন বন্ধু মিলে বাদাম চিবোতে চিবোতে হাঁটছে। এইচএসসি পরীক্ষার পর জীবনটা যেন অনেকটা বদলে গেছে। কিছুদিন আগেই নৌশির রেজাল্ট বেরিয়েছে, জিপিএ ফাইভ পেয়ে সে এখন উড়ন্ত পাখির মতো আনন্দিত। কিন্তু বন্ধুদের আড্ডায় তো আর শুধু পড়াশোনার কথা থাকে না!
আঁখি বাদামের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে হঠাৎ কনুই দিয়ে নৌশিকে গুঁতো দিয়ে বলল,
“কিরে নৌশি, রেজাল্ট তো ফাটাফাটি করলি। এবার কি প্রেম-ট্রেম করার কোনো ইচ্ছা আছে? আর কতদিন এই সিঙ্গেল তকমা নিয়ে ঘুরবি?”
মৌ আঁখির কথায় তাল মিলিয়ে যোগ করল,
“একদম ঠিক! আমরা তো কয়েকদিন পর হয়তো বিয়েই করে ফেলব। তুই কি আসলেই সিঙ্গেল নাকি আমাদের কাছে কিছু লুকাচ্ছিস?”
নৌশি হালকা হেসে দূরে দিগন্তের দিকে তাকালো। তার চোখে এক পলকের জন্য অন্যরকম একটা আবেশ ফুটে উঠল। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“আরে না, লুকানোর কিছু নেই। তবে আমি একটা বিশেষ দিনের অপেক্ষায় আছি।”
“কোন দিন?” দুজন একসাথে কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল।
নৌশি একটু লাজুক হেসে বলল,
“যেদিন আমার মনে বসবাস করা মানুষটা নিজে থেকে এসে আমাকে বলবে ‘ভালোবাসি নাদানের বাচ্চা’।”
আঁখি আর মৌ অবাক হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। আঁখি বলল,
“বাহ! তা কে সেই মহাপুরুষ? কবে থেকে উনি তোর মনে ঘর বেঁধেছেন শুনি?”
নৌশি আনমনে বলল,
“কবে থেকে জানি না, তবে এটুকু বুঝি তাকে ছাড়া আমি বড্ড অসহায়।”
কথাটা বলতে বলতেই নৌশির কণ্ঠ হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। তার স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো কিছুটা দূরে পার্কের একটি বেঞ্চের দিকে। সেখানে পাশাপাশি বসে আছে দুজন একজন আদনান, আর অন্যটি একটি অপরিচিত মেয়ে। তারা বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে হাসাহাসি করছে আর বাদাম খাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখা মাত্রই নৌশির বুকের ভেতরটা কেমন যেন জ্বলে উঠল।
বন্ধুরা নৌশিকে ওভাবে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মৌ জিজ্ঞেস করল,
“কিরে, কী হলো? থেমে গেলি কেন?”
নৌশি কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“কিছু না। তোরা চলে যা, আমি আসছি।”
বলেই নৌশি হনহন করে আদনানের দিকে এগোতে শুরু করল। কিছুদূর যেতেই তার পা জোড়া যেন মাটির সাথে গেঁথে গেল। দেখল, মেয়েটি হাসতে হাসতে বারবার আদনানের গায়ে ঢলে পড়ছে, অবলীলায় তার হাত স্পর্শ করছে। নৌশির সারা শরীরে এক অসহ্য রাগের ঢেউ খেলে গেল।
সে আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত গিয়ে তাদের ঠিক সামনে দাঁড়ালো। নৌশিকে আচমকা এভাবে সামনে দেখে আদনান যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল এবং মুখে এক চিলতে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে বলল,
“নৌশি! তুই এখানে?”
“তার আগে বল তুই এইখানে কেন?” নৌশির গলার স্বর কঠিন।
আদনান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এভাবে জিজ্ঞেস করছিস কেন?”
নৌশির গলার স্বর সপ্তমে চড়ে গেল। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে রীতিমতো চিৎকার করে উঠল,
“এভাবে জিজ্ঞেস করব না তো কীভাবে করব? তুই এই মেয়েটার সাথে এখানে কী করিস? কে হয় ও তোর?”
আদনান অপ্রস্তুত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। পার্কের দু-চারজন মানুষ তখন তাদের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে। নৌশি এবার সেই মেয়েটির সামনে গিয়ে রুদ্রমূর্তিতে দাঁড়িয়ে বলল,
“এই মেয়ে! তুমি আদনানের সাথে কী করছ এখানে, শুনি?”
মেয়েটি হকচকিয়ে গিয়ে আদনানের দিকে তাকালো। বিরক্তির সুরে বলল,
“আদনান, এই মেয়েটা কে? এভাবে কথা বলছে কেন আমার সাথে?”
নৌশির রাগ এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল। সে ফেটে পড়ে বলল,
“আমি কে মানে? আমি নৌশি! তুই আদনানের সাথে কেন এত ঘনিষ্ঠ হচ্ছিস?”
নৌশি আরও কিছু কড়া কথা বলতে উদ্যত হতেই আদনান এক ঝটকায় তার হাত টেনে ধরে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে আদনান বলল,
“নৌশি, ওয়াট ইজ রং উইথ ইউ? এসব কীরকম বিহেভিয়ার তোর?”
“তোকে আমি না করছি না কোনো মেয়ের সাথে মিশবি না? তাহলে তুই এখানে বসে কী করিস? লজ্জা লাগে না তোর?”
আদনান এবার চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“লজ্জা লাগবে কেন? আর তুই এরকম ব্যবহার করার মানে আমি বুঝতে পারছি না। আমি যা-ই করি না কেন, তাতে তোর কোনো সমস্যা হওয়ার তো কথা না!”
“তুই একজনের সাথে বসে বসে প্রেম করবি আর সেটা আমি মেনে নেব?” নৌশির গলায় এবার হাহাকার।
আদনান এবার তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল,
“তুই মেনে নেওয়া বা না নেওয়ার কে? আমার পার্সোনাল লাইফ সম্পর্কে নাক গলানোর তুই কে? তুই শুধুই আমার কাজিন, এছাড়া আর কোনো অধিকার তোর নেই আমার ওপর। পরের বার থেকে নিজের ব্যবহার ঠিক করে কথা বলবি।”
বলেই আদনান মেয়েটার দিকে ফিরে গিয়ে বলল,
“চলো মিলি, এখান থেকে যাই।”
আদনান চলে গেল, কিন্তু নৌশি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই পাথরের মতো জমে রইল। তার কানে শুধু একটা কথাই বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল “কে তুই? আমার পার্সোনাল বিষয়ে নাক গলানোর কে তুই?”
নৌশির মনের ভেতর তখন প্রলয়ংকরী ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রকৃতির আকাশটাও যেন নৌশির মনের সাথে তাল মিলিয়ে অন্ধকার হয়ে এল। চারদিক মেঘে ঢেকে গেল, বইতে লাগল তপ্ত বাতাস। নৌশির চোখের কোণে টলটল করতে থাকা জল এবার বাঁধ ভেঙে গড়িয়ে পড়ল।
এতদিন যে মৌন ভালোবাসাকে সে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে, আদনানের শাসনের আড়ালে যে ভালোবাসার স্বপ্ন বুনেছে সবটাই কি তবে ভুল ছিল? আদনান কি তবে কখনোই তাকে সেই বিশেষ জায়গাটা দেয়নি?
চলবে…
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৯
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৯
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৪