রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_৫০ (প্রথমাংশ)
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
ডক্টরের কেবিনে বসে আছে রোহান এবং মিতু। মিতুর মুখে চিন্তার চাপ স্পষ্ট। আজ মিতুর জেদাজুড়িতেই আসতে হয়েছে ডক্টরের কাছে। ডক্টর রিপোর্টগুলো খুঁটিয়ে দেখছেন। রোহান মিতুর হাতের ওপর নিজের হাত রেখে আশ্বস্ত করার সুরে বলল,
“এসব পরীক্ষা করানো কি খুব দরকার ছিল মিতু? আমরা দুজন তো বেশ ভালো লাইফ কাটাচ্ছি, তাই না বলো?”
মিতু ধীর কণ্ঠে উত্তর দিল,
“পরীক্ষা করিয়ে অন্তত কারণটা জানলে আর ওষুধ খেলে তো কোনো সমস্যা নেই। মনের খটকাটা তো দূর হবে।”
রোহান আর কিছু বলল না। মহিলা ডক্টর রিপোর্টগুলো ভালো করে দেখে রোহান আর মিতুর দিকে তাকালেন। তিনি পেশাদার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনাদের বিবাহিত জীবন কত দিন হলো?”
রোহান জানাল,
“চার বছর পার হয়ে পাঁচ বছরের কাছাকাছি।”
মিতু উদাস চোখে ডক্টরের দিকে তাকিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
“রিপোর্ট দেখে কী বুঝলেন ম্যাম?”
ডাক্তার প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে রিপোর্টগুলোর দিকে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। কেবিনের নিস্তব্ধতা যেন মিতুর বুকের ওপর বিশাল পাথরের মতো চেপে বসেছে। ডাক্তার নরম কণ্ঠে বললেন,
“মিতু আপনার কিছু টেস্ট করেছিলাম। হরমোন প্রোফাইল, আল্ট্রাসনোগ্রাফি সব রিপোর্ট মিলিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার আপনার ডিম্বাশয় নিয়মিতভাবে ডিম্বাণু তৈরি করছে না।”
রোহান পাথরের মতো চুপ করে রইল। মিতু কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে ধীর কণ্ঠে বলল,
“মানে?”
ডাক্তার একটু থামলেন, হয়তো শব্দগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। তারপর বললেন,
“প্রতি মাসে মেয়েদের শরীর থেকে একটা ডিম্বাণু বের হয়, যেটাকে আমরা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ওভুলেশন’ বলি। আপনার ক্ষেত্রে সেটা নিয়মিতভাবে হচ্ছে না। আপনার রিপোর্ট অনুযায়ী এটা Polycystic Ovary Syndrome (PCOS)-এর কারণে হতে পারে।”
মিতুর চোখ ভিজে উঠল নিমেষেই। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে সে প্রশ্ন করল,
“তাহলে… আমি কি কখনও মা হতে পারবো না?”
ডাক্তার শান্তভাবে অভয় দেওয়ার সুরে বললেন,
“আমি এটা বলছি না যে একেবারেই পারবেন না। কিন্তু স্বাভাবিক উপায়ে মা হওয়ার সম্ভাবনা আপনার ক্ষেত্রে খুবই কম। কারণ আপনার শরীরের হরমোনের ভারসাম্য ঠিক নেই। ডিম্বাণু ঠিকমতো পরিপক্ব হচ্ছে না আর পিরিয়ড চক্রটাও অনিয়মিত।”
তিনি আরও যোগ করলেন, “চিকিৎসা আছে। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, নিয়মিত ওষুধ, প্রয়োজনে আরও উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি সবই চেষ্টা করা যায়। কিন্তু এতে সময় লাগবে, আর আপনাকে মানসিকভাবে খুব শক্ত থাকতে হবে।”
রোহান তখনো নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে। তার কানে শুধু একটা কথাই বারবার তীরের মতো বিঁধছে “মা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম…”। সে আলতো করে মিতুর কাঁপতে থাকা হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল। এক বুক আশা নিয়ে রোহান জিজ্ঞেস করল,
“ওষুধ খেলে কি সব ঠিক হবে ডক্টর?”
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আমি কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি, তবে বাচ্চা হওয়া না হওয়াটা পুরোপুরি সৃষ্টিকর্তার হাতে।”
হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে মিতু এক অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসল,
“আমার স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করে, তাহলে সে কি বাবা হতে পারবে না?”
মিতুর এই কথায় রোহান বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে তার দিকে তাকালো। ডাক্তারও মিতুর মুখের দিকে কিছুটা অবাক হয়ে চাইলেন। রোহান ঝট করে মিতুকে আগলে ধরে জড়িয়ে ধরল, ওর গলার স্বর কান্নায় ভারী হয়ে এল, “মিতু! এসব কী কথা বলছো তুমি?”
ডাক্তার মিতুর চোখের বিষাদ দেখে সমব্যাথী কণ্ঠে বললেন,
“হ্যাঁ, মিস্টার রোহান বাবা হতে পারবেন। কারণ ওনার শরীরে কোনো সমস্যা নেই।”
রোহান আর এক সেকেন্ড সেখানে বসল না। মিতুর হাত ধরে প্রায় টেনেই কেবিন থেকে বের হয়ে গেল। মিতুর চোখের জল তখন টলমল করছে তার মনে হচ্ছে পৃথিবীটা বুঝি তার পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে। দীর্ঘ চার বছরের সাজানো সংসারটা এক লহমায় যেন বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
★★★
মির্জা বাড়ির বিশাল ডাইনিং টেবিলে আজ এক থমথমে নীরবতা। প্রতিদিন এই সময়টায় ঘর হাসাহাসি আর খোশগল্পে মুখর থাকলেও, আজ যেন সবার মুখে কুলুপ আঁটা। তৃণা আর হেনা ব্যস্ত হাতে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। হেনা মেয়েটি নতুন কাজের মেয়ে, বয়স বড়জোর সতেরো হবে। সাধারণত মিতুও এই কাজে হাত লাগায়, কিন্তু আজ তার দেখা নেই। সন্ধ্যাবেলা যখন সে হাসপাতাল থেকে ফিরল, তার ফ্যাকাসে মুখ আর চোখের কোণেই স্পষ্ট ছিল যে মনের ওপর দিয়ে বড় কোনো ঝড় বয়ে গেছে। শরীর খারাপ আর ঘুমের অজুহাত দিয়ে সে ঘরে খিল দিয়েছে, তাই তৃণা আর বেশি জোরাজুরি করেনি।
মির্জা বাড়ির নিয়ম হলো ছোট-বড়, ছেলে-মেয়ে সবাই একসাথে বসে খাবার খাওয়া। তৃণা খাবার না নিয়ে দাঁড়িয়ে পরিবেশন করছিল, কিন্তু আরিয়ান আর সহ্য করতে পারল না। নীরবতা ভেঙে সে গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
“তৃণা, তোমাকে আর বেড়ে দিতে হবে না। তুমি বসে পড়ো।”
মরিয়ম বেগমও সায় দিয়ে বললেন,
“আমি তো আগেই বললাম, তুমি বসে পড়ো। হেনা আছে, আর আমরাও যার যার খাবার তুলে নিতে পারব। নাও, বসো তো।”
সবার জোরাজুরিতে তৃণা অবশেষে চেয়ার টেনে বসল। নুসরাত একটু দূরে সোফায় বসে তূর্ণাকে খাওয়াতে ব্যস্ত। তৃণা সেদিকে তাকাতেই নুসরাত মুচকি হেসে বলল,
“তৃণা, তুমি খেতে থাকো। আমি তূর্ণাকে খাইয়ে পরে খেয়ে নেব।”
ডাইনিং টেবিলে এই অদ্ভুত নিস্তব্ধতার বড় কারণ রিনি। বাড়ির নতুন মেহমান, তার ওপর আজ যা যা ঘটে গেছে তাতে কেউ স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারছে না। রিনিও মাথা নিচু করে খুব ধীরগতিতে খাবার নাড়াচাড়া করছে। মির্জা পরিবারের বিশাল ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট বিজনেসের ব্যস্ততার মাঝে এই ডাইনিং টেবিলটাই ছিল মেলামেশার একমাত্র জায়গা, যা আজ রিনির উপস্থিতিতে গুমোট হয়ে আছে।
ওদিকে সোফায় তূর্ণা সমানে বায়না ধরেছে। নুসরাত চামচ মুখে দিতে গেলেই সে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। তার ছোট ছোট চোখদুটো বারবার ডাইনিং টেবিলে বসা রিনিকে খুঁজছে। সে রিনির কাছে যেতে চায়, কিন্তু নুসরাত তাকে কোনোভাবেই যেতে দেবে না। ব্যক্তিগতভাবে রিনিকে নুসরাতের একটুও পছন্দ নয়, বিশেষ করে তূর্ণার ‘মা’ ডাকের পর থেকে সে আরও সতর্ক হয়ে গেছে।
তূর্ণা যখন বারবার রিনির দিকে যাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল, তখন নুসরাত ধৈর্য হারিয়ে একটু কড়া গলায় ধমক দিয়ে উঠল,
“তূর্ণা! একদম বেশি বাড়াবাড়ি করছ কিন্তু। এবার কিন্তু আমার সত্যি সত্যি রাগ হচ্ছে। লক্ষ্মী মেয়ের মতো খেয়ে নাও বলছি!”
ধমক খেয়ে তূর্ণার ঠোঁট দুটো উল্টে এল, চোখে জল চিকচিক করে উঠল। ডাইনিং টেবিল থেকে রিনি একবার আড়চোখে সেদিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না।
নুসরাতের ধমকে তূর্ণা যেন পাথর হয়ে গেল। এতটুকু মেয়ে, অথচ তার কান্নার ধরন দেখে উপস্থিত সবাই অবাক। সে শব্দ করে কাঁদল না, শুধু ঠোঁট উল্টে চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সাত বছরেরও কম বয়সী একটা বাচ্চার এমন নিঃশব্দ হাহাকার নুসরাতের বুকেও গিয়ে বিঁধল।
ডাইনিং টেবিল থেকে তৃণা দ্রুত উঠে তূর্ণার কাছে এসে বসল। পরম মমতায় তার চোখের জল মুছে দিয়ে বলল,
“কী হয়েছে মামণির? এই তো আমি খাইয়ে দিচ্ছি, চলো।”
তূর্ণা হেঁচকি তুলে অস্পষ্ট স্বরে বলল,
“না, আমি আমার আম্মুর হাত থেকে খাব।”
কথাটা টেবিলে থাকা সবাই শুনল ঠিকই, কিন্তু তৃণা, নুসরাত আর রিনি ছাড়া কেউ আসল রহস্যটা জানল না। বাকিরা ভাবল তূর্ণা হয়তো তার মৃত মায়ের অভাব অনুভব করছে। তৃণা আর নুসরাত অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তূর্ণার এক কথা।সে তার আম্মুর কাছেই যাবে।
হঠাৎ এক জোড়া হাত তূর্ণার দিকে এগিয়ে এল। শান্ত স্পষ্ট স্বরে রিনি বলল,
“দাও, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”
রিনির কণ্ঠে এমন কিছু একটা ছিল যে নুসরাত আর তৃণা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। রিনি তাদের উদ্দেশ্যে বলল, “তোমরা গিয়ে খেয়ে নাও, আমার খাওয়া হয়ে গেছে। আমিই ওকে খাওয়াচ্ছি।”
তূর্ণার মলিন মুখটা মুহূর্তেই শরৎের আকাশের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। রিনির বাচ্চাদের খাওয়ানোর কোনো অভ্যাস নেই। সে যখন আনড়ি হাতে তূর্ণাকে লোকমা দিচ্ছিল, ভাতের কিছুটা অংশ তূর্ণার গালের পাশে মেখে গেল। কিন্তু তূর্ণার সেদিকে খেয়াল নেই, সে অপলক দৃষ্টিতে রিনির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এই মুখটাই তার আজন্ম চেনা। রিনিও বাচ্চার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। তূর্ণা সত্যিই খুব মায়াবী,বড় বড় চোখ আর ঘন পাপড়িতে ঢাকা ওর দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
ঠিক তখনই নুসরাতের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘মেহরাব দেওয়ান’ তূর্ণার বাবা। নুসরাত কলটা ধরতেই ওপাশ থেকে মেহরাবের মার্জিত কণ্ঠ শোনা গেল। কুশল বিনিময়ের পর নুসরাত ফোনটা তূর্ণার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“মামণি, তোমার পাপা ফোন দিয়েছে।”
তূর্ণা খুশিতে আত্মহারা হয়ে ফোনটা নিয়ে বলল,
“পাপা!”
“লক্ষ্মী মামণি আমার, কেমন আছো তুমি? বাবার কথা বুঝি মনে পড়ে না?” মেহরাবের গলায় ছিল অগাধ ভালোবাসা।
তূর্ণা উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“পাপা! আমি আম্মুকে পেয়ে গেছি! আম্মু ঠিক আমার পাশেই বসা।”
ওপাশ থেকে মেহরাব একটা করুণ অথচ মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ মামণি, তোমার আম্মু তো সবসময় আমাদের পাশেই থাকে, তার দোয়া আমাদের সাথেই আছে।” মেহরাব ভাবল তূর্ণা হয়তো তার মৃত মায়ের স্মৃতির কথা বলছে।
তূর্ণা এবার জেদ ধরল,
“না পাপা, তুমি ভিডিও কল দাও। এখনই দাও!”
রিনি পরিস্থিতি বুঝতে পেরে উঠে চলে যেতে চাইল, কিন্তু তূর্ণার ছোট ছোট আঙুলগুলো রিনির শাড়ির আঁচল শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে। মেহরাব ভিডিও কল দিতেই তূর্ণা বড় করে একটা হাসি দিয়ে ফোনের ক্যামেরাটা রিনির দিকে ঘুরিয়ে ধরল। চিৎকার করে বলল,
“পাপা দেখো! এই তো আমার আম্মু!”
রিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্ক্রিনের দিকে তাকাল। ফোনের ওপাশে টি-শার্ট পরা এক সুদর্শন পুরুষ। তার শান্ত চোখের দৃষ্টি রিনির ওপর পড়তেই যেন সময় থমকে গেল। মেহরাব তূর্ণার কথার পিঠে হাসতে গিয়েও হাসিটা মাঝপথে উধাও হয়ে গেল তার। সে পলকহীন দৃষ্টিতে মোবাইলের স্ক্রিনে রিনির মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। স্তব্ধতা নেমে এল ফোনের দুপাশেই।
নুসরাত একপাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল।
মেহরাবের গভীর কণ্ঠস্বর ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এল। সে দীর্ঘক্ষণ রিনির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর নিজেকে সামলে নিয়ে খুব মার্জিত স্বরে বলল,
“ক্ষমা করবেন, তূর্ণা তো ছোট মানুষ। তাই হয়তো ভুল করে আপনাকে তার মা ভেবে অনেক বিরক্ত করছে।”
রিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাব ভুল করেও কি কাউকে মা ডাকা যায়? মেহরাব আবারও চমৎকার এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে তুলল তার সুদর্শন মুখে। বলল, “আসলে আপনাকে দেখতে অনেকাংশে আমার স্ত্রী রাধিকার মতো। তাই তূর্ণা হয়তো সেই চেহারার আদল দেখেই আপনাকে আঁকড়ে ধরেছে।”
রিনি কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু মেহরাবের শান্ত চোখের দিকে একবার তাকিয়ে মোবাইলটা তূর্ণার হাতে ফিরিয়ে দিল। মেহরাব এবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মামণি, আমি এইমাত্র বাসায় ফিরে এলাম। আমি কি এখনই আসব তোমাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য?”
তূর্ণা মাথা নেড়ে দৃঢ়ভাবে বলল,
“না না পাপা, আমি এখন যাব না। আমি আমার আম্মুর সাথেই থাকব।”
বলেই তূর্ণা মোবাইলটা নুসরাতের দিকে বাড়িয়ে দিল। নুসরাত পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল,
“থাক ভাইয়া, আজ রাতটা ও এখানেই থাকুক। কাল না হয় আমিই ওকে পৌঁছে দিয়ে আসব।”
মেহরাব একটু ম্লান হাসল। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত একাকীত্ব ফুটে উঠল। সে বলল,
“যখন থেকে বাসায় এসেছি, কেমন শূন্য শূন্য লাগছে ঘরটা। এই ছোট মেয়েটাই যে আমার বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে আগামীকাল তুমিই ওকে নিয়ে এসো।”
নুসরাত সম্মতি জানিয়ে কলটা কেটে দিল।
★★★
রান্নাঘরের মৃদু আলোয় কাঁচ আর সিরামিকের বাসনের ঠুংঠাং শব্দ হচ্ছে। তৃণা সিঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে জমে থাকা এঁটো পাত্রগুলো পরিষ্কার করছে। বাড়ির নতুন সাহায্যকারী হেনার ওপর এই ভর সন্ধ্যায় কাজের সবটুকু চাপ দিতে ওর মন চাইল না। মায়াভরা মন নিয়ে তৃণা হেনার সাথে কথা বলতে বলতেই হাত চালাচ্ছে। এক পর্যায়ে ও জিজ্ঞেস করল,
“তোমার পরিবারে আর কে কে আছে হেনা?”
হেনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষণ্ণ স্বরে উত্তর দিল,
“আম্মা আর আব্বা আছে গো আপা। কিন্তু আব্বা সারাদিন মাতাল হইয়া পইড়া থাকে। ট্যাহার নেশায় চুর হইয়া যখন-তখন আম্মার শইলে হাত তুলে। আম্মাও এহন খুব অসুস্থ, সবসময় যক্ষ্মা রোগডায় ভুগতাছে।”
তৃণার বুকটা এক মুহূর্তের জন্য হাহাকারে ভরে উঠল। মাত্র পনেরো বছরের এই কিশোরী মেয়েটার কাঁধে কত বড় এক সংসারের বোঝা! যেখানে ওর স্কুলে যাওয়ার কথা, সেখানে পরের বাড়িতে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হচ্ছে কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে।
ঠিক তখনই পাশে কারো নিঃশব্দ উপস্থিতি টের পেল তৃণা। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল আরিয়ান দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর গভীর চোখের দৃষ্টি সরাসরি তৃণার ওপর নিবদ্ধ। আরিয়ানকে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে তৃণা জিজ্ঞেস করল,
“হঠাৎ এখানে? কিছু লাগবে আপনার?”
আরিয়ান এবার একদম তৃণার শরীর ঘেষে দাড়ালো।আরিয়ান একটুও সময় না নিয়ে শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“হুম, লাগবে।”
তৃণা হাতের কাজ থামিয়ে কৌতূহলী চোখে চাইল,
“কী লাগবে?”
আরিয়ান তৃণার খুব কাছে এগিয়ে এল। ওর ঠোঁটের কোণে খেলে গেল এক চিলতে রহস্যময় হাসি। তৃণার চোখের মণির দিকে তাকিয়ে সে সোজাসুজি বলে উঠল, “তোমাকে।”
সে পুরোই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। হেনা একপাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছিল, সেও আরিয়ানের এমন কথা শুনে লজ্জায় মুখ নিচু করে আলতো হাসতে শুরু করল। পরক্ষণেই সে আড়চোখে পাশেই কাজ করা হেনার দিকে তাকালো। পনেরো বছরের মেয়েটা লজ্জায় মাথা নিচু করে মুখ টিপে হাসছে। তৃণার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে উঠল। সে আরিয়ানের দিকে ঝুঁকে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে খুব নিচু স্বরে বলল,
“কী শুরু করলেন আপনি? হেনার সামনে এসব বলতে আপনার লজ্জা করছে না? যান এখান থেকে!”
আরিয়ান কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না। বরং আরও একধাপ এগিয়ে এসে তৃণার খুব কাছাকাছি দাঁড়াল। ওর গম্ভীর অথচ মাদকতাপূর্ণ কণ্ঠে বলল,
“লজ্জার কী আছে? আমার ঘুমোতে হবে, তাই তোমাকে নিতে এসেছি।”
তৃণা বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলল,
“তো যান না, গিয়ে ঘুমোন। বাধা দিচ্ছে কে?”
“একা একা ঘুম আসে না আমার। ঘুমোতে গেলে তোমাকেও লাগবে। চলো আমার সাথে,” আরিয়ানের চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত জেদ।
তৃণা ভ্রু কুঁচকে ঝামটা দিয়ে উঠল,
“এসব অসভ্য আলাপ বাদ দিয়ে এখান থেকে বিদায় হোন তো। দেখছেন না আমার কাজ বাকি?”
আরিয়ান নিচু গলায় আবারও জিজ্ঞেস করল,
“শেষবারের মতো বলছি, আসবে না আমার সাথে?”
“বললাম তো না। এখন যাব না।”
আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে এবার এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে তৃণার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“শুধু ঘুমোতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি তো রাজি হলে না। এবার তবে অন্য উপায়, অন্য কিছু করতে হবে… ”
তৃণা কৌতূহলী হয়ে পালটা প্রশ্ন করল,
“কি করবেন??”
“এবার তোমাকে এখান থেকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে যাব!”
তৃণা এবার বাঁকা হাসল। সে জানত ড্রয়িংরুমে পরিবারের সব বড়রা আড্ডায় মশগুল। সে জয়ের হাসিতে বলল,
“ড্রয়িংরুমে আব্বু, মা সবাই বসে আছে। সাহস থাকলে তুলে নিয়ে দেখান তো!”
আরিয়ান একবার বাইরের ঘরের দিকে নজর দিল। তারপর তৃণার দিকে ফিরে এক গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“আচ্ছা, তোমাকে এখন ছাড় দিলাম। কিন্তু তোমাকে ওই রুমেই ফিরতে হবে। আর তখন কিন্তু বিন্দুমাত্র ছাড়ও তুমি পাবে না। এর কড়ায়-গণ্ডায় হিসেব নেব আমি।”
বলেই আরিয়ান গটগট করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তৃণা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে কিছুক্ষণ সেই শূন্য দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। আরিয়ানের চোখে সে আজ এক অন্যরকম আগুনের ঝিলিক দেখেছে, যা আগে কখনো দেখেনি।
একপাশ থেকে হেনা খিলখিল করে হেসে উঠে বলল,
“আপা, ভাইজান মনে লয় আপনেরে কলিজা দিয়া ভালোবাসে। যান না আপা, ওনার কাছে যান। এই থালা-বাসন আমি একলাই মাজতে পারমু।”
তৃণা অপ্রস্তুত হয়ে হেনার দিকে তাকিয়ে মৃদু ধমকের সুরে বলল,
“বেশি পাকা কথা না বলে চুপচাপ নিজের কাজ করো তো। কার কলিজায় কত ভালোবাসা তা আমার জানা আছে!”
তৃণা পুনরায় হাতের কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করল বটে, কিন্তু ওর মনটা এখন আর রান্নাঘরে নেই। আরিয়ানের সেই ‘ছাড় না দেওয়ার’ হুমকিটা ওর কানে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মনে মনে সে এক গোপন শপথ নিল যাই হয়ে যাক, আজ আরিয়ান না ঘুমোনো পর্যন্ত সে কোনোভাবেই ওই রুমে পা রাখবে না!
চলবে…
(বর্ধিতাংশে শুধু আরিয়ান আর তৃণাকেই দেখানো হবে।)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্রের পর্ব ৪৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬