Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৮


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

পর্ব_৪৮

নিলুফানাজমিননীলা

★★★
রাস্তার হাইওয়ে ধরে আরিয়ানের গাড়িটা তীরের বেগে ছুটে চলেছে। আশেপাশের সব গাড়িকে পেছনে ফেলে সে যেন বাতাসের সাথে পাল্লা দিচ্ছে। আরিয়ানের মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে এখন শুধু তৃণার বলা সেই বিভীষিকাময় কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে ষোলো বছরের এক কিশোরীর কান্নারত মুখ। যে মেয়েটা একসময় পাগলের মতো বৃষ্টি ভালোবাসত, সে আজ বৃষ্টির শব্দ শুনলে হিমাঙ্কিত হয়ে যায়! একটা মানুষ ঠিক কতটা মানসিক আঘাত পেলে বৃষ্টির মতো স্নিগ্ধ জিনিসকে এতটা ভয় পেতে পারে?

​আরিয়ানের ঠিক পেছনেই ছুটে আসছে এনামুল মির্জার গাড়ি। স্টিয়ারিং ধরে আছেন রোহান, আর পাশে অস্থির হয়ে বসে আছেন আদনান ও এনামুল মির্জা। আরিয়ানের রাগের সাথে তারা পরিচিত,সে রেগে গেলে হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। যদিও তাদের এখনো স্পষ্ট জানা নেই, ঠিক কী কারণে সে আজ এতটা বিধ্বংসী রূপ ধারণ করেছে।

​আরিয়ান এক হাতে স্টিয়ারিং সামলে অন্য হাতে মোবাইল বের করে দ্রুত ডায়াল করল উমর হাওলাদারের নাম্বারে। একবার রিং হতেই ওপাশ থেকে উমর হাওলাদার বলে উঠলেন,
“আরিয়ান বাবা, কেমন আছো?”

​আরিয়ান সেই কুশল বিনিময়ের কোনো তোয়াক্কা না করে তীব্র কর্কশ গলায় বলল,
“রিনির মামার ঠিকানা দেন এখনই।”

​উমর হাওলাদার ভীষণ অবাক হয়ে বললেন,
“খলিলের ঠিকানা দিয়ে তুমি কী করবে?”

​“আপনাকে এত কৈফিয়ত দিতে আমি প্রস্তুত নই। যা বললাম সেটা করুন। আর আপনার সাথেও আমার অনেক বড় বোঝাপড়া বাকি আছে,” আরিয়ানের গলায় ফুটে বেরোচ্ছিল চরম ঘৃণা।

​উমর হাওলাদার মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। আরিয়ান তার সাথে কোনোদিন এতটা অভদ্র আচরণ করেনি। কিন্তু আরিয়ানের কণ্ঠের সেই তেজ দেখে তিনি আর দ্বিরুক্তি করার সাহস পেলেন না। তিনি ধীরকণ্ঠে ঠিকানাটা বলে দিলেন। ঠিকানা পাওয়া মাত্রই আরিয়ান সেই দিকে গাড়ি ঘোরালো। স্পিডোমিটারের কাঁটা এখন সর্বোচ্চ সীমানায়।

​পেছনের গাড়িতে থাকা তিনজন ভয়ে নীল হয়ে যাচ্ছেন। আরিয়ান যেভাবে গাড়ি চালাচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। হাইওয়ের জ্যাম আর আরিয়ানের পাগলাটে গতির কারণে এনামুল মির্জাদের গাড়িটা অনেক পেছনে পড়ে গেল। একসময় আরিয়ানের গাড়িটা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেলে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। এবার উপায় না দেখে এনামুল মির্জা দ্রুত তৃণাকে কল দিলেন এবং তার কাছ থেকে সৎ মামার বাড়ির ঠিকানাটা নিয়ে নিলেন।

আরিয়ান তৃণার সৎ মামার বাড়ির সামনে গিয়ে সজোরে ব্রেক কষে গাড়ি থামাল। চোখেমুখে তার খুনের নেশা। হাত থরথর করে কাঁপছে রাগে। সে গাড়ি থেকে নেমেই পিস্তলটা হাতে নিয়ে ঝড়ের বেগে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। ড্রয়িংরুমে তখন কেউ নেই। আরিয়ান বাঘের মতো গর্জে উঠে চিৎকার করে ডাকল, ​“এই খলিলের বাচ্চা! কই তুই? সাহস থাকলে সামনে আয়, কুত্তার বাচ্চা!”

​কারো এভাবে উন্মত্ত ডাকাডাকি শুনে ভেতর থেকে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরা খলিল বেরিয়ে আসল। আরিয়ান লোকটার দিকে বিষাক্ত এক নজর নিক্ষেপ করল। দেখে বোঝার উপায় নেই এই ভদ্রবেশি মানুষটার ভেতরে কতটা কুৎসিত এক শয়তান বাস করে। আরিয়ান এক লাফে গিয়ে খলিলের পাঞ্জাবির কলার শক্ত করে চেপে ধরল। খলিল এর আগে বিয়েতে আরিয়ানকে দেখেছে, তাই চিনতে তার এক মুহূর্ত সময় লাগল না।

​খলিল হকচকিয়ে গিয়ে চিৎকার করে বলল,
“আরে জামাই! পাগল হলে নাকি? করছোটা কী তুমি?”

​আরিয়ান লোকটাকে প্রচণ্ড এক ধাক্কা দিয়ে সোফায় ফেলে দিল। তারপর আবার ঝাপটে ধরে পাঞ্জাবির কলার এমনভাবে মুচড়ে ধরল যে খলিলের দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার দশা। আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বিষ উগরে দিয়ে বলল,
​“কী করছি বুঝতে পারছিস না?তৃণার সাথে কী জঘন্য কাজ করছিলি তুই? মনে নেই তোর?”

​বলেই আরিয়ান নিজের শক্ত হাত মুঠো করে একের পর এক ঘুষি বসাতে লাগল খলিলের নাকে-মুখে। রক্তের ছোপ লাগল সাদা পাঞ্জাবিতে। ড্রয়িংরুমে এমন হুলুস্থুল শব্দ শুনে রৌশনারা বেগম এবং রিনি দুজনেই ছুটে এল। তারা সামনে যা দেখল তাতে তাদের চোখ চড়কগাছ। রৌশনারা বেগম নিজের ভাইকে বাঁচানোর জন্য আরিয়ানকে টেনে সরানোর চেষ্টা করতে লাগলেন, কিন্তু আরিয়ানকে এক বিন্দুও নড়াতে পারলেন না। আরিয়ান এবার কোমর থেকে পিস্তলটা বের করে সরাসরি খলিলের বুকের মাঝখানে তাক করল।

​মুহূর্তেই পুরো রুম স্তব্ধ হয়ে গেল। খলিল জান হাতে নিয়ে দুই হাত জোড় করে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“দয়া করো! মেরো না আমাকে!”

রৌশনারা​ বেগম চিৎকার করে উঠলেন,
“আমার ভাইয়ের কিছু হলে আমি তোমাকে ছাড়ব না, বলে দিচ্ছি!”

রিনি হতভম্ব হয়ে বলল,
“মামাকে এভাবে মারছো কেন আরিয়ান? কী করেছে আমার মামা?”

​আরিয়ানের মাথায় তখন রক্ত চড়ে আছে, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য সে। সে যখন ধীরে ধীরে ট্রিগারে চাপ দিতে যাবে, ঠিক তখনই কয়েকটা শক্ত হাত তাকে টেনে সরিয়ে দিল। আরিয়ান পেছনে তাকিয়ে দেখল আদনান আর রোহান তাকে জাপটে ধরেছে। আরিয়ান আর্তনাদ করে উঠল, ​“ছাড় আমাকে! এই জানো*য়ারদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই!”

​এনামুল মির্জা দ্রুত আরিয়ানের হাত থেকে পিস্তলটা ছিনিয়ে নিয়ে নিজের পকেটে লুকিয়ে ফেললেন। রৌশনারা বেগম এবার সাহস পেয়ে আবার চিল্লিয়ে উঠলেন,
“আমি এখনই পুলিশকে কল করছি। একটা গুণ্ডা কোথাকার…”

​আরিয়ান এবার রোহান আর আদনানের বাঁধন থেকে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তার সামনে থাকা ভারি কাঠের চেয়ারটা দুই হাতে উঁচিয়ে সরাসরি রৌশনারা বেগমের শরীরের দিকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল। চেয়ারটা একদম সই করে মহিলার শরীরে গিয়ে পড়ল। রৌশনারা বেগম সজোরে আছাড় খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং “ও মাগো!” বলে বিকট চিৎকার করে উঠলেন।

আদনান আর রোহান আবারও এসে আরিয়ানকে জাপটে ধরল। আরিয়ান তখন হাপরের মতো হাঁপাচ্ছে, ওর চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল,
​“এই খাচ্চোর মহিলাকে মনটা চাচ্ছে পিঁপড়ার মতো টিপে মে*রে দিতে! কত বড় সাহস তোদের, আমার শ্যামলিনীর ওপর এত বড় অন্যায় করার!”

​রিনি এবার খ্যাপে গিয়ে আরিয়ানের সামনে এসে দাঁড়াল। সে চেঁচিয়ে বলল,
“কী সমস্যা আরিয়ান? কী করেছে মামা? কেন এমন উন্মাদের মতো করছো তুমি?”

​আরিয়ান এবার স্থির হয়ে দাঁড়াল। ওর কণ্ঠস্বরটা যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে এল। সে দাঁতে দাঁত চেপে কয়েকবছর বছর আগের সেই বিকেলের প্রতিটি বীভৎস মুহূর্ত বর্ণনা করল। আরিয়ানের মুখে সব শুনে ড্রয়িংরুমের বাতাস যেন বিষিয়ে উঠল। এনামুল মির্জা, আদনান আর রোহান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
​রিনি চরম বিস্ময় আর ঘৃণা নিয়ে তার মায়ের দিকে তাকালো। রৌশনারা বেগম মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছেন, তাঁর মুখে কোনো কথা নেই। রিনি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“মাম্মি, এসব যা বলছে সব কি সত্যি?”

​রৌশনারা বেগম তবুও চুপ। রিনি এবার ঘৃণায় কুঁচকে গিয়ে খলিলের দিকে তাকালো,
“মামা, নিজের মেয়ের বয়সী তৃণার সাথে তুমি এরকম নোংরামি করার চেষ্টা কীভাবে করতে পারলে?”

​খলিল এবার শেষবারের মতো বাঁচার চেষ্টা করে বলে উঠল,
“আরে এসব কিছু করিনি আমি! ও সব মিথ্যা বলছে।”

​আরিয়ান এবার আবারও বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে খলিলের গলা চেপে ধরল,
“সব সত্যি করে বল জা*নোয়ার, না হলে এখনই তোকে শেষ করে দেব!”

​খলিলের দম তখন আটকে আসছে। সে উপায় না পেয়ে গোঙাতে গোঙাতে বলল, “ব… বলছি।”

​আরিয়ান ওর গলা ছেড়ে দিল। খলিল হাঁপাতে হাঁপাতে আর কাশতে কাশতে স্বীকার করল,
“হ্যাঁ, আমি এসব করার চেষ্টা করেছিলাম। আর রৌশনারা পরে সেটা জানতে পারে। কিন্তু নিজের আর আমার মান-সম্মান বাঁচাতে তৃণার মুখ ও-ই বন্ধ করে রেখেছিল।”

​ততক্ষণে বাইরে সাইরেনের শব্দ শোনা গেল। পুলিশ ফোর্স বাড়িতে ঢুকে পড়ল। পুলিশকে দেখে এনামুল মির্জা অবাক হলেন। তিনি তো এখনো পুলিশকে খবর দেননি! যদিও এখন দিতেন। এনামুল মির্জা অফিসারকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনাদেরকেই কল করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আপনারা কীভাবে এখানে?”

​পুলিশ অফিসার শান্ত গলায় বললেন,
“আমাদেরকে মির্জা বাড়ি থেকেই কল দেওয়া হয়েছিল।”

​রিনি এতক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে সোফায় বসে ছিল। তার দুচোখ দিয়ে অবিরল জল ঝরছে। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। রিনি ঘৃণাভরা কণ্ঠে বলল, “মাম্মি, তুমি এটা কীভাবে করতে পারলে? সবকিছু জেনেও তুমি উল্টো অপরাধীকে বাঁচিয়ে তৃণাকেই মেরেছো?যদি এই কাজটা আমার সাথে হতো তখনও কি তুমি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারতে? তোমাকে আজ মা ভাবতে আমার লজ্জা হচ্ছে। ছিঃ!”

​বলেই রিনি ড্রয়িংরুম থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। পুলিশ তখন খলিল আর রৌশনারা বেগমকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
​কিন্তু আরিয়ানের রাগ কোনো মতেই থামছে না। যথাযথ শাস্তি সে নিজের হাতে দিতে পারেনি, এই আক্ষেপ তাকে পুড়িয়ে মারছে।

আরিয়ানদের গাড়িটা যখন আবারও বাড়ির দিকে যাচ্ছে, আরিয়ান রাগে তার কাকাকে বলল,
“পুলিশকে খবর দিতে কে বলেছিল? ওই শতানটাকে জ্যান্ত মে*রে ফেলা উচিত ছিল আমার।”

​এনামুল মির্জা আরিয়ানের কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর স্বরে বললেন,
“কেন নিজের হাতে পাপ তুলে নিবি? যা করার আইন করবে। তুই এখন তৃণার কাছে যা, ওই মেয়েটার তোকে এখন সবচেয়ে বেশি দরকার।”

আরিয়ান এনামুল মির্জার কথা শুনে এক তিক্ত হাসি হাসল। সে হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল সমাজ আর ব্যবস্থার প্রতি চরম ঘৃণা। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
​“আইন? আমাদের দেশে আইন শব্দটা বড় হাস্যকর শোনায় চাচ্চু!”

​গাড়িতে থাকা সকলে আরিয়ানের দিকে অবাক হয়ে তাকালো। আরিয়ান আবারও বলতে শুরু করল, তার গলার স্বর রাগে আর ক্ষোভে কাঁপছে,

“আমাদের দেশে এসব অপরাধের বিচার কখনোই ঠিক করে হয়নি, আর হবেও না। যদি হতোই, তবে আজ এই দেশটাতে প্রতিদিন এত ধর্ষণের খবর আসত না। এত নারীর ইজ্জত লুটে নেওয়া হতো না। এই মানুষরূপী জা’নো:য়ারগুলোকে জ্যা’ন্ত কবর দিয়ে দেওয়াই উত্তম। এদের শাস্তি হওয়া উচিত এমন ভয়াবহ, যা দেখে বাকি অপরাধীদের আত্মা কেঁপে ওঠে।”

​এনামুল মির্জা আরিয়ানের কাঁধে হাত রেখে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন,
“তোর মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি বাবা। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াও তো একটা অপরাধ।”

​আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালার বাইরে রাতের অন্ধকারের দিকে তাকালো। বিষণ্ণ গলায় বলল,
“তুমি বলতে পারো চাচ্চু, কবে আমাদের মা-বোনরা নিশ্চিন্তে রাস্তায় চলতে পারবে? কবে ওই ছোট ছোট নিষ্পাপ শিশু গুলোকে ইজ্জত হারিয়ে অতটা নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করতে হবে না? কবে এই পৃথিবীর বাগান থেকে ফুলগুলো অসময়ে ঝরে পড়বে না?”

​গাড়ির ভেতর এক অসহ্য নীরবতা নেমে এল। কেউ কোনো উত্তর দিতে পারল না।
​বাংলাদেশে বর্তমানে ধর্ষণের যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠছে, তা শিউরে ওঠার মতো। খবরের কাগজ খুললেই দেখা যায় ঘর, রাস্তা, গণপরিবহন কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোথাও নারীরা আজ নিরাপদ নয়। যে দেশে ছয় থেকে দশ বছরের শিশুরাও পাশবিক লালসার শিকার হয়, সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক একজন মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলাটা সত্যিই হাস্যকর মনে হয়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর আইনের দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগ নিয়ে এই নরপশুরা দিনের পর দিন বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ক্ষমতার দাপট আর সামাজিক লোকলজ্জার দোহাই দিয়ে অনেক সময়ই ধামাচাপা দেওয়া হয় এই অন্ধকার ঘটনাগুলোকে, ঠিক যেমনটি তৃণার সাথে বছরের পর বছর ঘটে এসেছে। আরিয়ানের ক্ষোভ কেবল একজনের ওপর নয়, বরং এই পচে যাওয়া পুরো ব্যবস্থার ওপর।
★★★
তৃণা জানালার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। বসন্তের পাগলা হাওয়া হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে তার চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছে। তৃণার চোখে এখন আর জল নেই, তবে সেখানে জমে আছে একরাশ বিষণ্ণতা আর ক্লান্তির ছাপ। সেই দুপুরটা আজ আবার নতুন করে তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। হঠাৎ পেছন থেকে সেই চেনা গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
​“শ্যামলিনী।”

​তৃণা খুব ধীর গতিতে পেছন ফিরল। আরিয়ান এগিয়ে এসে তৃণার দুই বাহুতে নিজের হাতটা আলতো করে রাখল। আরিয়ানের চোখে এখনো সেই আগুনের রেশ রয়ে গেছে। সে অপরাধবোধ মাখা গলায় বলল,
“আমাকে ক্ষমা করো শ্যামলিনী, আমি ওই বদমাইশটাকে আজ উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারলাম না। যদি পারতাম, তবে পিস্তলের সব কটা গুলি ওর শরীরের ভেতরে ঢুকিয়ে দিতাম।”

​তৃণা কোনো কথা না বলে হঠাৎ আরিয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আরিয়ানের বুকের ওপর মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল,
“তখন কি পুলিশ আপনাকে ছেড়ে দিত? ওরা কি আপনাকে আমার কাছে থাকতে দিত?”

​আরিয়ান জেদি গলায় বলল,
“আমি ওইসব ভয় পাই না। দরকার হলে ওকে মে’রে আমি জেলে যেতাম, এমনকি ফাঁ’সির দড়িতেও ঝুলতে পারতাম। কিন্তু ওর র’ক্ত দেখাটা খুব দরকার ছিল।”

​তৃণা আরিয়ানের বুকে মুখ লুকিয়ে ধরা গলায় বলল, “তখন আমার কী হতো? কী করে থাকতাম আমি আপনাকে ছাড়া? আমি যে আমার এই রাগী সাহেবকে ছাড়া বড্ড অসহায়।”

​তৃণার মুখে অসহায় শব্দটা শুনে আরিয়ানের পাথরের মতো শক্ত মুখেও ছোট্ট একটা হাসি ফুটল। সে পরম মমতায় তৃণার দুই গালে হাত রেখে ওর মুখটা তুলে ধরল। আরিয়ান বলল,
“আমিও যে আমার শ্যামলিনীকে ছাড়া শূন্য, ঠিক যেমন করে গভীর রাত শূন্য থাকে অন্ধকার ছাড়া।”

​কিছুক্ষণ তারা একে অপরের চোখের অতল গহ্বরে ডুব দিয়ে রইল। চারদিকের নিস্তব্ধতায় শুধু দুজনের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। হঠাৎ তৃণা বলল,
“আপনি আব্বুর সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছেন। আমি জানি তখন আপনার মাথায় রাগ ছিল, কিন্তু তাই বলে ওরকম ব্যবহার করবেন? আব্বু আপনার কথায় অনেক কষ্ট পেয়েছেন।”

​তৃণার মুখে তার বাবার প্রতি এই সাফাই শুনে আরিয়ানের কপালে আবারও রাগের ভাঁজ ফুটে উঠল। সে ঝটকা দিয়ে তৃণাকে ছেড়ে দিয়ে গর্জে উঠল,
“ওই লোকটা কি এখনো এই বাড়িতে আসেনি? আসলে ওই লোককেও আমি ছেড়ে কথা বলব না। কেমন বাপ উনি, যে নিজের মেয়েকে ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে পারেন না? দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন বউ নিয়ে আসলেন ঠিকই, কিন্তু নিজের মেয়েটা যে বাড়ির ভেতরে নরকযন্ত্রণা ভোগ করছিল, সেটার খবর রাখার প্রয়োজন মনে করলেন না? ছিঃ! এরকম বাপের মুখে থু…”

​কথাটা শেষ করার আগেই ঘরে ঠাস করে একটা শব্দ হলো। আরিয়ান নিজের গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে অসীম বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল তৃণার চোখ দুটো রাগে টকটকে লাল হয়ে আছে, আর তার তোলা হাতটা এখনো কাঁপছে। নিজের প্রিয়তম শ্যামলিনীর কাছ থেকে এমন প্রতিদান সে কল্পনাও করতে পারেনি।
আরিয়ান পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের গালে তৃণার হাতের শক্ত চ’ড় আর তার চেয়েও তীব্র শ্লেষ মাখানো কথাগুলো যেন আরিয়ানকে মুহূর্তের জন্য দিশেহারা করে দিল। তৃণা এবার আরিয়ানের শার্টের কলার খামচে ধরে রাগে ফেটে পড়ল,
​”আপনি কী জানেন আমার আব্বুর ব্যাপারে? আপনার সাহস কী করে হয় ওনাকে নিয়ে এত কথা বলার?”

​আরিয়ান কোনো পাল্টা উত্তর দিল না, শুধু গভীর এক বিষাদ নিয়ে তৃণার অগ্নিশর্মা চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তৃণা ঝটকা দিয়ে আরিয়ানের কলার ছেড়ে দিয়ে পেছনে সরে দাঁড়াল। তার বুকটা হাপরের মতো উঠছে নামছে। কান্নাভেজা গলায় সে চিৎকার করে বলতে শুরু করল,
​“আমার আব্বু আমার কাছে পৃথিবীর সেরা মানুষ! যখন আম্মু আমাদের ছেড়ে সারাজীবনের জন্য চলে গেল, তখন একমাত্র আব্বুর জন্যই আমি বেঁচে ছিলাম। তখন আমাদের আর্থিক অবস্থা মোটেও ভালো ছিল না। আম্মুকে হারিয়ে আমি দিনরাত কাঁদতাম। আমার সেই কান্নার জন্য আব্বু নিজের কাজ ফেলে সবসময় বাড়িতে আমার পাশে থাকার চেষ্টা করতেন। কয়েক মাস পর আমি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ি। হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তাররা জানিয়েছিলেন আমার দুটো কিডনিই বিকল হয়ে গেছে। ইমার্জেন্সি ট্রান্সপ্ল্যান্ট দরকার ছিল। আব্বুর সামর্থ্য ছিল না কিডনি কেনা বা বড় অপারেশনের খরচ জোগানো। তখন আমার বাবা নিজের একটা কিডনি আমার শরীরে দিয়ে আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। আজ যে আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে নিশ্বাস নিচ্ছি, সেটা আমার বাবার দেওয়া জীবন!”

​তৃণা একটু থামল, নিজের চোখের জল মোছার চেষ্টাও করল না সে। গলার স্বর ভারী হয়ে এল তার,
​“আম্মুকে হারিয়ে আমি সারাক্ষণ ‘মা মা’ বলে বায়না করতাম। আত্মীয়-স্বজনরা আব্বুকে জোর করতে লাগল যে, বাড়িতে একজন নারী না থাকলে এই মাতৃহীন মেয়েটার গতি হবে না। তাছাড়া আব্বুর ডাক্তারি পেশাটাও তখন হুমকির মুখে। নিরুপায় হয়ে শুধুমাত্র আমার একটা মায়ের অভাব পূরণ করতে উনি রৌশনারা বেগমকে ঘরে নিয়ে এসেছিলেন। উনি জানতেন না ওনার আড়ালে আমার ওপর কতটা বিভীষিকা নেমে আসত। সৎ মা সবসময় আমাকে ভয় দেখাতেন যদি আমি আব্বুকে কিচ্ছু বলি, তবে তিনি আব্বুর খাবারে বিষ মিশিয়ে ওনাকে মেরে ফেলবেন। তখন ওই কথাগুলো আমার মনে পাহাড়সম ভয় তৈরি করত। আমি ভাবতাম সব সইতে পারি, কিন্তু আম্মুর পর যদি আব্বুকেও হারিয়ে ফেলি তবে আমি কোথায় যাব? আমি আমার আব্বুকে ভীষণ ভালোবাসি। ওনার মাঝেই আমি আমার মাকে খুঁজে পাই। উনিই আমার পৃথিবী!”

​বলেই তৃণা ডুকরে কেঁদে উঠল। তার দুচোখ বেয়ে অবিরল অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। এতক্ষণ যে আরিয়ান রাগে অন্ধ হয়ে ছিল, তৃণার এই জীবনের গল্প শোনার পর তার ভেতরের সবটুকু জেদ মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, সে যাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ভেবে ঘৃণা করছিল, সেই মানুষটি আসলে নিজের শরীর আর জীবন বাজি রেখে তার শ্যামলিনীকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
আরিয়ান মুহূর্তের মধ্যে পাথর হয়ে গেল।

​তৃণা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। দুই হাতে মুখ ঢেকে সে ডুকরে কেঁদে উঠল। আরিয়ান এবার খুব অপরাধীর মতো ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। তৃণার সামনে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে তার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। অত্যন্ত অনুতপ্ত স্বরে বলল,
“আই এম সরি তৃণা… এক্সট্রিমলি সরি। আমি সত্যিই জানতাম না তোমার আব্বু তোমার জন্য কতটা ত্যাগ করেছেন। আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম রাগে।”

​আরিয়ান এবার তৃণার কোলে মাথা রেখে শান্ত গলায় বলল,
“কথা দিচ্ছি শ্যামলিনী, আজ থেকে তোমার সব দায়িত্ব আমার। আর কখনো তোমাকে চোখের জল ফেলতে দেব না।”

​ঘরের গুমোট পরিবেশটা যখন একটু স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, তখনই দরজায় টোকা পড়ল। আরিয়ান সোজা হয়ে দাঁড়াতেই বাইরে থেকে নৌশির কণ্ঠ ভেসে এল,
“বউমণি!”

​আরিয়ান উত্তর দিল, “ভেতরে আয় নৌশি।”

​নৌশি ঘরে ঢুকে কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
“বউমণি, তোমার বোন রিনি এসেছে। নিচে ড্রয়িংরুমে বসে আছে।”

​নৌশির কথা শুনে আরিয়ান আর তৃণা দুজনেই চমকে উঠল। একে অপরের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল তারা। এখন, নিজের মা আর মামার এমন কলঙ্কজনক অধ্যায় উন্মোচিত হওয়ার পর রিনি কেন এখানে এল? সে কি কোনো অভিযোগ নিয়ে এসেছে, নাকি অন্য কোনো মতলবে তার এই পদার্পণ?

চলবে…

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply