Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৫


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

পর্ব_৪৫

নিলুফানাজমিননীলা

★★★
রাতের গভীরতায় আকাশের চাঁদ তার রূপালি আভা ছড়িয়ে পুরো ভুবন আলোকিত করে রেখেছে। তারার মেলা যেন আকাশের গায়ে নকশা এঁকেছে, আর নিচে ঝোপঝাড়ের আড়ালে জোনাকিরা আপন মনে আলোর খেলা খেলছে। স্নিগ্ধ এই আলোয় সাদা পাঞ্জাবি পরা উমর হাওলাদার একা দাঁড়িয়ে আছেন ছাদের রেলিং ধরে। অদ্ভুত এই পৃথিবী চারপাশে এত মানুষ, এত কোলাহল, অথচ মানুষ দিনশেষে কতটা একা!
​রেলিংয়ে হাত রাখতেই স্মৃতির জানলা খুলে গেল উমর হাওলাদারের। মনে পড়ে গেল সেই কলেজ লাইফের দিনগুলো। মেহেরজান যেদিন প্রথম কলেজে পা রেখেছিল, উমর হাওলাদার তখন ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। মেহেরজান ছিল সম্ভবত পুরো কলেজের সবচেয়ে মায়াবী চেহারার মেয়ে। প্রথম দেখাতেই যে খুব প্রেম হয়েছিল তা নয়, কিন্তু ধীরে ধীরে মেহেরজানের সেই শান্ত স্বভাব উমর হাওলাদারের মনের গহীনে জায়গা করে নিয়েছিল।
ভালোবাসি শব্দটা বলতে উমর হাওলাদার দীর্ঘ তিন বছর সময় নিয়েছিলেন।

​ভার্সিটি জীবনে এসে যখন মনের কথা জানালেন, মেহেরজান তখন মেডিকেলের ছাত্রী। পড়াশোনা চলাকালীনই তাদের পরিণয়। বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ঘর আলো করে জন্ম নিল এক কন্যাসন্তান,তৃণা। বাবা-মা দুজনেই রাজপুত্তুর-রাজকন্যার মতো ফর্সা, অথচ মেয়ে হয়েছে কিছুটা শ্যামলা। এই এক অজুহাতে উমর হাওলাদারের মা মেহেরজানকে মেনে নিতে পারেননি। এমনকি তার চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করতেও দাদিমা পিছপা হননি। কিন্তু মেহেরজান ছিল অটল,তৃণার ভবিষ্যতের কথা ভেবে সে নিজের ডক্টরি পড়াশোনা শেষ করেও কোথাও প্র্যাকটিস করেনি। তৃণা ছিল তাদের চোখের মণি।
​অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! এক আকস্মিক পথ দুর্ঘটনায় হারিয়ে গেল সেই মণি, মেহেরজান। নিঃস্ব হয়ে গেল উমর হাওলাদারের সাজানো সংসার, একা হয়ে গেল ছোট্ট তৃণা।

​স্মৃতিগুলো মনে পড়তেই উমর হাওলাদারের চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে ঝাপসা চোখে ফিসফিস করে বললেন,
​“মেহেরজান, তুমি বলেছিলে তোমার কিছু হয়ে গেলে আমি যেন আমাদের মেয়েকে দেখে রাখি। তোমার সেই আমানত রক্ষার জন্য, তৃণার ভালোর কথা ভেবেই আমি ওকে একজন মা এনে দিতে চেয়েছিলাম। অথচ আমি ঘুণাক্ষরেও জানতাম না, আমি বাড়িতে না থাকার সময় আমার মেয়ের এক মুঠো ভাত পর্যন্ত জুটত না। ওই ছোট বয়সেই ও কত মার খেয়েছে! মেয়েটা ঠিক তোমার মতোই হয়েছে হাজার কষ্টে থাকলেও বাবার সামনে কখনো মুখ খোলেনি।”

​উমর হাওলাদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুকটা হালকা করতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না। তিনি আবারও বললেন, “জানো মেহেরজান, আমি এখন শুধু তোমার কাছে যাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছি। কিন্তু মৃত্যুটা বড় বেইমানি করছে, তোমার মতো সেও আমার কাছে আসতে চাইছে না। এই একাকী জীবন বিষের চেয়েও তিতকুটে।”
★★★
তৃণা নিজের ঘরের ওয়ার্ডরোবের কাপড়গুলো গুছিয়ে রাখছিল। আজ শুক্রবার, আরিয়ানের অফিস নেই। ছুটির দিনে লোকটা যেন দিন দিন বড্ড বেশি লাগামছাড়া হয়ে যাচ্ছে। আজ সকালেই ঘুম থেকে উঠে কী অদ্ভুত এক বায়না ধরল তাকে নাকি একটা চুমু দিতে হবে! সকালের সেই পাগলামি মাখা মুহূর্তটার কথা মনে পড়তেই তৃণার ওষ্ঠদ্বয়ে আপনমনেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে যতবারই আরিয়ানকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়, লোকটা যেন তত বেশি মায়ার বাঁধনে তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে।
​হঠাৎ বিছানায় রাখা তৃণার মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে বেশ অবাক হলো আরিয়ানের নাম্বার! সকালে চুমু না পেয়ে লোকটা এতক্ষণ বাচ্চাদের মতো গাল ফুলিয়ে ছিল, তৃণার সাথে একটা কথাও বলেনি। অবাক হয়েই তৃণা কলটা রিসিভ করল।

​“কী ব্যাপার? একই বাড়িতে থেকেও কল দিচ্ছেন কেন?” তৃণার গলায় হালকা বিস্ময়।

​ওপাশ থেকে আরিয়ানের প্রাণখোলা হো হো হাসির শব্দ ভেসে এল। তৃণা ভ্রু কুঁচকে আবারও প্রশ্ন করল,
“কী হলো, হাসছেন কেন এভাবে?”

​এবার আরিয়ান বেশ গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,
“আমি এখন ছাদে।”

​তৃণা কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল,
“তো আমি কী করতে পারি?”

​“বউ থাকার পরও জীবনে সুখ খুঁজে পাচ্ছি না, এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কী হতে পারে! তাই জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললাম,” আরিয়ানের গলায় এক ধরনের চূড়ান্ত বিদায়ের সুর।

​কথাটা শুনেই তৃণা মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল। বুকটা ধক করে উঠল তার লোকটা কি তবে ছাদ থেকে ঝাঁপ দেবে? সে প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে আর্তনাদ করে উঠল,
“আরে শুনুন! এমন পাগলামি করবেন না। জীবন একবার হারিয়ে গেলে আর ফিরে পাবেন না। প্লিজ, নিচে নামুন, ঝাঁপ দেবেন না!”

তৃণার আকুল আর্তনাদ শুনে আরিয়ান ওপাশ থেকে আবারও অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসি তৃণার কানে যেন তীরের মতো বিঁধল। সে আর এক সেকেন্ডও ঘরে স্থির থাকতে পারল না। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। পাগলের মতো দৌড় লাগালো ছাদের দিকে। সিঁড়ি ভেঙে হন্তদন্ত হয়ে যখন সে ছাদের দরজায় এসে দাঁড়ালো, তখন তার হৃদপিণ্ড যেন গলার কাছে উঠে এসেছে। চোখের সামনে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা হারানোর তীব্র ভয় তাকে আষ্টেপৃষ্টে জাপটে ধরল।

​তৃণা গলা ছেড়ে সর্বোচ্চ চিৎকার করে উঠল,
“প্লিজ এটা করবেন না রাগী সাহেব!”

​তৃণার গলার স্বর পেয়ে আরিয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তৃণার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে সে এক চিলতে বাঁকা হাসল। আরিয়ানের হাতে মিহু।আরিয়ান হাতটা ছাদের একদম কার্নিশের বাইরে ঝুলিয়ে রেখেছে। একটু নড়চড় হলেই মিহু সরাসরি কয়েক তলা নিচে পড়ে যাবে।
​তৃণা আর স্থির থাকতে পারল না। সে ঝড়ের বেগে আরিয়ানের কাছে গিয়ে মিহুকে কেড়ে নিতে চাইল। কিন্তু আরিয়ান দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলল,
“উহু! কাড়াকাড়ি করো না শ্যামলিনী। এদিক থেকে ওদিক হলেও মিহু ডাইরেক্ট নিচে পড়ে যাবে। তখন কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবে না।”

​তৃণা এবার রাগে আর কান্নায় ফেটে পড়ল। ভাঙা গলায় বলল,
“এমন কেন করছেন আপনি? এত খারাপ কেন? একটা অবুঝ প্রাণীকে নিয়ে এভাবে কেউ খেলে?”

​আরিয়ান তৃণার অসহায়ত্ব দেখে আবারও শব্দ করে হাসল। তৃণা এবার প্রায় অনুনয়-বিনয় করতে শুরু করল,
“প্লিজ মিহুকে আমার কাছে দিয়ে দিন। আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না। ও তো আমার সন্তানের মতো! আপনি যা বলবেন আমি তাই শুনব, শুধু ওকে ওখান থেকে সরিয়ে আনুন।”

​আরিয়ানের চোখে এবার ধুরন্ধর এক চিলতে ঝিলিক খেলে গেল। সে শান্ত গলায় বলল,
“আচ্ছা দিয়ে দেব, তবে একটা শর্ত আছে।

​তৃণা ভ্রু কুঁচকে, চোখের জল মুছতে মুছতে বলল,
“কিসের শর্ত? আচ্ছা, আপনার সব শর্ত মেনে নেব। আগে প্লিজ মিহুকে আমার হাতে দিন। ওর ভয় লাগছে, ও পড়ে যাবে তো!”

​আরিয়ান তার হাতটা আগের মতোই ঝুলিয়ে রেখে এক পা এগোলো। শীতল কিন্তু জেদি গলায় বলল,
“উহু! আগে শর্ত পূরণ করো, তারপর মিহু তোমার কোলে যাবে। তার আগে নয়।”

তৃণা উপায়ন্তর না পেয়ে চটজলদি বলল,
“কী করতে হবে বলুন!”

​আরিয়ান মুচকি হেসে তার সেই ভুবনভোলানো চাহনি দিল। খুব শান্ত গলায় বলল,
“সকালে যখন মিষ্টি স্বামীর মতো একটি চুমু দেওয়ার জন্য আবদার করলাম, তখন তো দিলে না বউজান। এবার দয়া করে দুই গালে মিলিয়ে দশটি চুমু দাও।”

​তৃণা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে রীতিমতো চিৎকার করে উঠল, “কী?”

​আরিয়ান নির্বিকার, “কানে শোনো না?”

​“আপনি কি সাইকো?” তৃণার কণ্ঠে চরম বিস্ময়।

​“হ্যাঁ আমি সাইকো, এবার খুশি? আর একটা বাড়তি কথা বললে সোজা মিহু ধপাস!” আরিয়ান হাতটা কার্নিশের আরেকটু বাইরে নেওয়ার ভান করল।

​তৃণা এবার চরম অসহায় বোধ করল। মিহুর জীবনের মায়া বড় মায়া। সে কাঁপা গলায় বলল,
“আচ্ছা… দিচ্ছি।”

​তৃণা ধীরপায়ে আরিয়ানের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু আরিয়ান তো লম্বায় বেশ উঁচু। তৃণা বিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“মুখটা অন্তত নিচে নামান! এই নারিকেল গাছকে আমি নাগাল পাচ্ছি না।”

​আরিয়ান যেন আকাশ থেকে পড়ল,
“আমি নারিকেল গাছ?”

​“তা নয়তো কী?”

​আরিয়ান এবার বেশ ভাব নিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল,সে একচুলও নড়ল না, আগের মতোই কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।বলল,
“এত লম্বা হয়ে লাভ কী হলো যদি চুমু দেওয়ার জন্য স্বামীর গালের নাগাল না পাও!”

​তৃণা এবার নিরুপায় হয়ে নিজের পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁচু হলো। খুব সাবধানে চোখ বন্ধ করে আরিয়ানের গালে ঠোঁটের আলতো ছোঁয়া দিল। স্পর্শটা পেতেই তৃণা চট করে সরে এল। লজ্জায় তার মুখটা লাল হয়ে গেছে, সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
​আরিয়ান তৃণার এই লজ্জামাখা মুখের মায়ায় পড়ে গেল। তার ঠোঁটের কোণে এবার বিজয়ী এক চিলতে হাসি। সে হঠাৎ করে এক কদম এগিয়ে এসে তৃণার গালে পালটা হালকা একটা চুমু খেল। তৃণা হকচকিয়ে অবাক হয়ে তাকাল। আরিয়ান এবার মিহুকে খুব আলতো করে তৃণার হাতে দিয়ে দিল।
​মিহুকে কোলে পেয়েই তৃণার প্রাণ ফিরে এল। আরিয়ান তৃণার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
“একটা দিয়েছ, এখনও নয়টা পাওনা। পরে একসময় শোধ করে দিও।”

​তৃণা প্রচণ্ড বিরক্তিতে মুখ বাঁকাল। মিহুর লোমশ গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে আরিয়ানের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে বলল,
“আপনি আর কখনো আমার মিহুর গায়ে স্পর্শ করবেন না! এমনকি মিহুর ধারেকাছেও আসবেন না, সাবধান বলে দিলাম!”

আরিয়ান আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
“মিহু এখন তোমার চেয়েও আমার সাথে বেশি বন্ধুত্ব পাতিয়েছে।”

​তৃণা অবিশ্বাসের সুরে বলল,
“কক্ষনো না! ও আমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারে না।”

​আরিয়ান এবার তৃণার চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করল। সে মিহুর দিকে তাকিয়ে খুব আহ্লাদী সুরে ডাকল,
“মিহু সোনা! আসো তো আমার কাছে, আসো।”

​তৃণা ভাবল মিহু বোধহয় যাবে না। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে মিহু তৃণার কোল থেকে নামার জন্য ছটফট শুরু করল। মিউমিউ আওয়াজ তুলে সে যেন আরিয়ানের কাছে যাওয়ার জন্যই ব্যাকুল। আরিয়ান তৃণার কোল থেকে অনায়াসেই মিহুকে নিজের কোলে তুলে নিল। তৃণা মিহুর বিশ্বাসঘাতকতায় থমকে গিয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই অভিমানী সুরে বলল,
​“এতদিন মাছ-মাংস খাইয়ে এই কালসাপ পুষেছি? আমার খেয়ে, আমার পড়ে এখন আমাকেই চিনে না!”

​আরিয়ান মিহুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে টিপ্পনী কাটল,
“ওই যে! তুমি যেমন আমার সাথে এক বিছানায় ঘুমিয়েও আমাকে স্বামী বলে মানছো না, মিহুও বোধহয় তোমার ওপর সেই রাগটাই ঝাড়ছে।”

​তৃণা চরম বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করল,
“কী মন্ত্র পড়েছেন আপনি মিহুর ওপর? ও আমার কাছে আসতে চাইছে না কেন?”

​আরিয়ান রহস্যময় হাসি হেসে বলল,
“তেমন কিছু না। মিহুকে কেবল বোঝালাম যে ওর একাকীত্ব দূর করার জন্য খুব দ্রুত একটা বিয়ে করিয়ে দেব। ব্যস! এতেই কাজ হয়ে গেল।”

​তৃণা বোকার মতো হাঁ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর অস্ফুটে বলল,
“বিয়ে? একটা বিড়ালের বিয়ে?”

​আরিয়ান গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
“অবশ্যই! সন্তান বড় হলে তাকে বিয়ে করানো বাবা-মায়ের নৈতিক দায়িত্ব। আমি তো আর তোমার মতো নৈতিক দায়িত্ব ভুলে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। তাই মিহুর জন্য জলদি একটা বউ আনছি।”

​তৃণা আর কথা বাড়ালো না। নাক-মুখ কুঁচকে শুধু বলল,
“পাগলে যা করার করুন আপনি। আমি চললাম!”

​বলেই তৃণা দ্রুত পায়ে নিচে নেমে গেল। আরিয়ান যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে নিজের সেই চিরচেনা মায়াবী হাসিটা হাসল।
​ ★★★
ছাদের দোলনায় খোলা আকাশের নিচে বসে আছে দুজন। রাতের জোছনা বিলাসে মগ্ন তারা। নির্জন আর নুসরাতের চোখের দৃষ্টি নিবদ্ধ আকাশের পানে। রাতের এই অন্ধকারে বিশাল আকাশটা আজ যেন মায়াবী এক চাদর বিছিয়ে রেখেছে। নির্জন এবার আকাশের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নুসরাতের দিকে তাকালো। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। নির্জন সহসা অস্ফুট স্বরে বলল,
​“কী আছে তোমার এই মুখশ্রীতে নুসরাত? আমি কেন এক মুহূর্তের জন্য চোখ সরাতে পারি না?”

​নির্জনের কথায় নুসরাত তার দিকে ফিরল। কিছুটা কুণ্ঠিত স্বরে বলল,
“এসিডে ঝলসে যাওয়া এই কদর্য চেহারার দিকে তাকিয়ে এভাবে মিথ্যা প্রশংসা করবেন না। মিথ্যা প্রশংসা করা আল্লাহ তাআলা নিজেও নিষেধ করেছেন।”

​নির্জন এবার আরও গভীর ও পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে তাকালো। নুসরাতের খুব কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল,
“কই, আমার চোখে তো তোমার মুখে কোনো দাগ ধরা পড়ছে না! চাঁদেরও তো কলঙ্ক আছে, কিন্তু আমার চশমাওয়ালি ম্যাডামের কোনো কলঙ্ক থাকতে পারে না। তুমি আমার কাছে পূর্ণিমা।”

​নুসরাত ম্লান হাসল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“চাঁদের কোনো কলঙ্ক নেই। ওটা কেবল ছায়া। অথচ মানুষ শুধু শুধু বলে চাঁদের কলঙ্ক।”

​নির্জন আর তর্কে গেল না। নুসরাত এবার নির্জনের প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। রাতের আকাশ তার ভীষণ পছন্দ ছিল একসময়, কিন্তু গত কয়েক বছরের বিভীষিকা তার সব পছন্দকে মেরে ফেলেছিল। আজ নির্জনের সান্নিধ্যে সেই পুরনো ভালো লাগাগুলো যেন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।
​হঠাৎ নির্জন নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রশ্ন করল,
“তুমি কি আমার আগে অন্য কাউকে ভালোবেসেছিলে?”

​নির্জনের এমন অতর্কিত প্রশ্নে নুসরাত ভীষণ ঘাবড়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল তার। এই প্রশ্নের উত্তর সে কীভাবে দেবে? অতীতে লুকিয়ে থাকা সেই ধূসর অধ্যায়টা কি এখন খোলা উচিত? নুসরাত পাথর হয়ে চুপ করে রইল।
​নির্জন তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ঝুলিয়ে বলল,
“আমি তোমার চোখের ভাষা বুঝি চশমাওয়ালি ম্যাডাম। তোমার এই নীরবতাই অনেক কথা বলে দিচ্ছে।”

​নুসরাত এবার নির্জনের মুখের দিকে তাকালো। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। সে বুঝতে পারল না, নির্জন কি তবে সব জানে? নাকি কেবলই তার মনের গভীরতা মাপার চেষ্টা করছে?

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply