রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
পর্ব_৪২
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
যে মির্জা বাড়ি সবসময় হাসি-খুশিতে প্রাণবন্ত থাকতো, আজ সেখানে শ্মশানের নীরবতা। চারদিকে শুধু কান্নার হাহাকার। মায়মুনা বেগম মেঝের ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছেন, বারবার জ্ঞান হারিয়ে নিথর হয়ে যাচ্ছেন তিনি। বাড়ির প্রতিটি মানুষের চোখে জল, প্রতিটি কোণ থেকে ভেসে আসছে বুকফাটা আর্তনাদ।
মির্জা বাড়ির উঠোনে রাখা সাদা কাফনে মোড়ানো সেই নিথর দেহটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তৃণা। তার চোখ বেয়ে অবিরাম জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আর্তনাদ বেরোচ্ছে না—কান্না যেন পাথরের মতো গলায় আটকে গেছে। সাদা কাফনটার বুক সমান অংশ রক্তের লাল ছোপে ভিজে আছে। তৃণা অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বলল, “আরিয়ান…”
হঠাৎ উন্মাদিনীর মতো মায়মুনা বেগম ছুটে এসে তৃণার গালে কষে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। একে একে আরও কয়েকটা শক্ত চড়। তৃণা ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়ল। মায়মুনা বেগম চিৎকার করে বলতে লাগলেন, “তোকে তো আমি নিজের মেয়ের মতো, পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম। তবুও তুই আমার ছেলেটাকে বাঁচতে দিলি না! কেন করলি এমনটা? কেন কেড়ে নিলি আমার আরিয়ানকে?”
সবাই মিলে মায়মুনা বেগমকে সরিয়ে নিয়ে গেল। তৃণা টলতে টলতে উঠে গিয়ে সেই সাদা কাফনে ঢাকা লাশের পাশে গিয়ে বসল। সে যেন বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। বাতাসের এক ঝাপটায় আরিয়ানের মুখের ওপর থেকে কাপড়টা সরে গেল। সেই শান্ত, গম্ভীর মুখটা এখন চিরস্থায়ী নীরবতায় ঢাকা।
তৃণার শরীর কাঁপছে। সে কাঁপাকাঁপা হাতে আরিয়ানের শীতল মুখটা স্পর্শ করল। ধরা গলায় ডাকল,
“রাগী সাহেব শুনছেন আপনি? সবাই বলছে আপনি নাকি আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন! কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করি না। প্লিজ উঠুন আপনি।আমি জানি,আপনি আমাকে ছেড়ে যেতে পারেন না।উঠে বলুন আপনার কিচ্ছু হয়নি। এভাবে সাদা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় আপনাকে দেখতে একদম ভালো লাগছে না। এই লাশের খাটিয়াতে আপনাকে মানাচ্ছে না। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রাগী সাহেব, দয়া করে আর কষ্ট দিয়েন না। এমনিতেই তো জীবনে সুখ পাইনি, তাহলে আপনি কেন এমন মরণ-ছলনা করছেন?”
কিন্তু আরিয়ান উঠল না। রক্তশূন্য ফ্যাকাসে মুখটা একই ভাবে পড়ে রইল। লোকটার বুঝি আজ বড্ড অভিমান হয়েছে। তৃণা আর নিজেকে সামলাতে পারল না, আরিয়ানের বুকের ওপর আছড়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। ভাঙা গলায় শুধু বলতে লাগল,
“প্লিজ উঠুন রাগী সাহেব, একবারটি চোখ মেলুন!ভালোবাসি আপনাকে সত্যি বলছি।এবার উঠুন।বাঁচবো কি করে আপনাকে ছাড়া?”
হঠাৎ তৃণা ধড়ফড় করে ঘুম থেকে জেগে উঠল। বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। ক্যাফে থেকে ফিরে এসে নিজের ঘরে ফ্লোরে বসে আলমারিতে পিঠ ঠেকিয়েই সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর এতক্ষণ যা দেখছিল, তা ছিল এক বিভীষিকাময় স্বপ্ন।
তৃণার সারা শরীর এখনো থরথর করে কাঁপছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ঘরের চারপাশটা তার কাছে কেমন অন্ধকার আর অচেনা ঠেকছে। সেই রক্তমাখা কাফন, আরিয়ানের সেই ফ্যাকাসে মুখ আর শাশুড়ির সেই অভিশাপ সবকিছু যেন চোখের সামনে এখনো জীবন্ত হয়ে আছে। এতটা ভয়াবহ স্বপ্ন সে আগে কখনো দেখেনি। স্বপ্নের রেশ যেন বাস্তবতাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।
ঘরটা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। চারদিকের অন্ধকার আর আসবাবপত্রগুলো যেন কোনো দানব হয়ে তাকে গিলতে আসছে। তৃণা হাঁটুতে মুখ গুঁজে কুঁকড়ে বসে রইল। এই মেয়েটা এমনিতে পরিস্থিতির সাথে লড়াই করতে পারে, কিন্তু নির্জন অন্ধকারে সে বড় বেশি একা, বড় বেশি ভীরু।
হঠাৎ দরজার পাল্লাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। তৃণার হৃৎপিণ্ড যেন গলার কাছে চলে এলো। তার মনে হলো, স্বপ্নের সেই ভয়াবহতা এবার বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। দরজায় একটি দীর্ঘ ছায়া একটি লম্বা অবয়ব। তৃণা আতঙ্কে দেয়ালের সাথে মিশে যেতে চাইল, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল গুমরে ওঠা কান্নার শব্দ।
সেই অবয়বটি দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে তৃণার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। খুব চেনা, গম্ভীর কিন্তু মোলায়েম এক কণ্ঠে ডাকল,
“তৃণা…”
কণ্ঠস্বরটা শোনামাত্র তৃণার ভেতরের সব বাঁধ ভেঙে গেল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সামনের মানুষটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কাঁদতে কাঁদতে অস্ফুট স্বরে ডাকল,
“রাগী সাহেব… আপনি…”
আরিয়ান প্রথমে থতমত খেয়ে গেলেও পরক্ষণেই তৃণার পিঠে হাত রাখল। তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল,
“কী হয়েছে তোমার? এভাবে পাগলের মতো করছো কেন?”
তৃণা আরিয়ানকে ছেড়ে দিয়ে দুই হাতে ওর পুরো মুখে হাত বুলাতে লাগল। যেন নিশ্চিত হতে চাইছে এই রক্ত-মাংসের মানুষটা বেঁচে আছে। তৃণার কাঁপা হাতগুলো আরিয়ানের কপাল, গাল আর চিবুকে বিচরণ করছে। সে রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল,
“আ… আপনার কিছু হয়নি তো? আপনি ঠিক আছেন তো?”
আরিয়ান অবাক চোখে তাকিয়ে রইল এই শ্যামলা মেয়েটির দিকে। তৃণা আবার অস্থির হয়ে বলল,
“বলুন আপনার কিছু হয়নি!”
“আমার কিচ্ছু হয়নি। দেখো, আমি একদম ঠিক আছি। কিন্তু তুমি এমন কেন করছো?”
আরিয়ানের কণ্ঠে বিস্ময়।
তৃণা ঘোরলাগা চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ বাস্তবে ফিরল। সে অস্বস্তিতে কিছুটা দূরে সরে গেল। আরিয়ান আর কিছু না বলে উঠে গিয়ে রুমের মেইন লাইটটা অন করে দিল। তীব্র আলোয় তৃণার লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো স্পষ্ট হলো। হঠাৎ তৃণার নজর পড়ল আরিয়ানের বাঁ হাতের কনুইয়ের দিকে। সেখানে ছাল উঠে গিয়ে টাটকা লালচে দাগ হয়ে আছে। তৃণা অভ্যাসবশত এগিয়ে যেতে গিয়েও থেমে গেল। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল সেই জায়গাতেই।
আরিয়ান তৃণার সামনে থেকে সরে গিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। তার মনে পড়ে গেল কিছুক্ষণ আগের সেই মুহূর্তটার কথা, যখন সে সত্যিই মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছে। রাস্তায় অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটার সময় একটা দ্রুতগামী ট্রাক প্রায় তাকে পিষে দিচ্ছিল। ঠিক সেই সময় হঠাৎ কেউ একজন তাকে হ্যাঁচকা টানে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়।
আরিয়ান অবাক হয়ে দেখেছিল, তাকে বাঁচানো মানুষটি এক মধ্যবয়সী মহিলা। পরনে তার অত্যন্ত সাধারণ এক শাড়ি, চোখে-মুখে অকৃত্রিম উদ্বেগ। মহিলাটি অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“বাবা! তোমার লাগেনি তো?”
আরিয়ান নিজের পোশাকের ধুলো ঝেড়ে বলেছিল,
“না, আমি ঠিক আছি। আপনি ঠিক আছেন তো?”
মহিলার পায়ে চোট লেগেছিল, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। তিনি বলেছিলেন,
“রাস্তাঘাটে সাবধানে চলাফেরা করো বাবা। জীবনটা বড় দামী, একবার গেলে আর ফেরত পাওয়া যায় না।”
আরিয়ান কেন জানি সেই অচেনা মহিলার সাথে কথা বলতে বলতে নিজের মনের সবটুকু ভার নামিয়ে দিয়েছিল। তৃণার সাথে তার ঝগড়া, জেদ সব। তখন সেই মহিলা ম্লান হেসে বলেছিলেন,
“মেয়েদের অধিকার থাকে রাগ করার, অভিমান করার। আর তুমি আমার ছেলের মতো, তাই বলছি স্ত্রীর অভিমান ভাঙাও। তোমার স্ত্রীর অভিমান করাটা কিন্তু খুব স্বাভাবিক ছিল।”
বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আরিয়ান একটা সিগারেট ধরাল।সিগারেটের ধোঁয়া আকাশের বিশালতায় উড়িয়ে দিল।
★★★
রাত গভীর। চারদিকের শুনশান নীরবতা যেন বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে। জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নুসরাত। বাহিরের গাঢ় অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকলেও তার চোখের কোণে চিকচিক করছে নোনা জল। বিছানায় নির্জন পরম ঘুমে আচ্ছন্ন, কিন্তু নুসরাতের চোখে ঘুম নেই। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে সেই দৃশ্যটি যেখানে আরিয়ান সবার সামনে তৃণাকে প্রপোজ করেছিল।
নুসরাতের মনে বারবার একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে এতটা কষ্ট হওয়ার তো কথা ছিল না! আরিয়ানকে তো সে তিন বছর আগেই নিজের মন থেকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। তবে আজ কেন এই পুরনো ক্ষত আবার নতুন করে রক্তাক্ত হচ্ছে? কেন এই হাহাকার?
স্মৃতিগুলো ডানা মেলে ফিরে গেল তিন বছর পেছনে। নুসরাত তখন সবেমাত্র ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। ভালোবাসা কী, তা বোঝার পর থেকে তার পুরো পৃথিবী জুড়েই ছিল শুধু আরিয়ান। সেই গোধূলি বেলার কথা আজও নুসরাতের মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আরিয়ান ছাদে দাঁড়িয়ে ফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ত ছিল। নুসরাত গিয়ে পাশে দাঁড়াতেই আরিয়ান নির্লিপ্তভাবে জিজ্ঞেস করেছিল,
“কী হয়েছে?”
নুসরাত অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি উপেক্ষা করে একটা রক্তগোলাপ আরিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল,
“আরিয়ান ভাই, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
আরিয়ান তখন অবাক হয়ে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে হোহো করে শব্দ করে হেসে দিয়েছিল। বলেছিল,
“আমি তোর ভাই হই নুসরাত, এসব কী বলছিস?”
নুসরাত ম্লান হেসে উত্তর দিয়েছিল,
“আপন ভাই তো নও।”
মুহূর্তেই আরিয়ানের হাসি থেমে গিয়েছিল। মুখটা গম্ভীর করে শক্ত গলায় বলেছিল,
“ফাইজলামি করিস? তোর বয়স কত রে? পড়াশোনা বাদ দিয়ে এসব কী শুরু করেছিস?”
নুসরাতের চোখ দুটো তখন ছলছল করছিল। আরিয়ান আবারও ধমকের সুরে বলেছিল,
“দেখ, অন্য সময় এমন করলে ঠাস করে গালে চড় লাগিয়ে দিতাম। ভালো করে পড়াশোনা কর, এসব ভন্ডামি বাদ দিয়ে।”
নুসরাতের আত্মসম্মানবোধ ছিল প্রচণ্ড। মুহূর্তেই নিজের ভেঙে যাওয়া হৃদয়টাকে আড়াল করে কৃত্রিম হাসি মুখে এনে বলেছিল,
“আরে আরিয়ান ভাই, আমি তো জাস্ট মজা করছিলাম! দেখো না, এই গোলাপটা আমাকে ভার্সিটির নবীন বরণে দিয়েছে, তাই তোমাকে দিয়ে একটু প্র্যাঙ্ক করলাম।”
আরিয়ান বিশ্বাস করেছিল কি না জানা নেই, কিন্তু সেদিন কোনো নবীন বরণ ছিল না সেটা আরিয়ানও জানত। আরিয়ান চলে যাওয়ার পর নুসরাত সেই গোলাপটা নিজের হাতের মুঠোয় পিষে ফেলেছিল। সেই থেকেই নুসরাত নিজেকে পাথরের মতো শক্ত করে নিয়েছে। কিন্তু আজ কেন জানি সব বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।
নুসরাত সেই রাত থেকেই বদলে গিয়েছিল। সেদিনের পর আরিয়ানের সামনে দাঁড়ায়নি সে। কিন্তু আরিয়ান কি জানত না? আরিয়ান খুব ভালো করেই জানত, নুসরাতের ওই ‘মজা করা’ ছিল আদতে এক বুক পাহাড়সম ভালোবাসা।
সেবার যখন আরিয়ান সেই পাহাড় থেকে ফিরে এসে ওই পাহাড়ি কন্যা ওরফে তৃণার জন্য মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিল, তখন এই নুসরাত নিজের দিন-রাত এক করে দিয়েছিল। নুসরাত ছিল আগাগোড়া এক ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, যার নামের পাশে সব ক্লাসে ‘এ প্লাস’ বাধা ছিল। কিন্তু আরিয়ানের সেবা করতে গিয়ে নিজের এইচএসসি পরীক্ষার কথা সে ভুলেই গিয়েছিল। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো পড়ালেখায় মন না থাকায় তার রেজাল্ট খারাপ হলো। আরিয়ান সুস্থ হলো ঠিকই, কিন্তু নুসরাত তার শ্রেষ্ঠত্ব হারালো।
নুসরাত আর কখনো আরিয়ানকে ভালোবাসার কথা বলেনি। নিজের মনকে বুঝিয়েছিল, আরিয়ান যখন ভাই বলেছে, তবে ভাই-ই সই। কিন্তু প্রথম ভালোবাসা কি এত সহজে মুছে ফেলা যায়? যে চঞ্চল মেয়েটা বাড়ি মাথায় করে রাখত, সে-ই হয়ে গেল সবচেয়ে গম্ভীর। দুই বছর আগে যখন আর নিজের আবেগকে দমিয়ে রাখতে পারল না, তখন সে তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, তার বাবা এনামুল মির্জার কাছে গিয়ে মনের সুপ্ত ইচ্ছার কথা বলেছিল। বলেছিল,
“বাবা, আমি যদি কাউকে বিয়ে করি, তবে সে আরিয়ান।”
এনামুল মির্জা আর আরিয়ানের বাবা রক্তের সম্পর্কের আপন ভাই হলেও, এনামুল মির্জা আর আরিয়ান ছিল বন্ধুসুলভ। কিন্তু মেয়ের এই আবদার তিনি মেনে নিতে পারেননি। সেদিন তিনি নুসরাতের গায়ে হাত তুলেছিলেন। সেই অভিমানে নুসরাত আত্মহত্যার চেষ্টা করে। টানা সাত দিন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছিল সে। এনামুল মির্জা বাড়ির কাউকে সেটা জানতে দেননি, সবাই জেনেছিল নুসরাত তার নানু বাড়ি গেছে।
আরিয়ান জানত নুসরাত হাসপাতালে, কিন্তু ওই সাত দিনে সে একবারের জন্যও নুসরাতকে দেখতে যায়নি। নুসরাতের জন্য ওই অবজ্ঞা ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা। এরপরই সে বাড়ি ছেড়ে হোটেলে থাকতে শুরু করে। সেই নিঃসঙ্গ জীবনে নির্জন দ্বিতীয় পুরুষ হিসেবে আসে। দীর্ঘ তিন বছর পর নুসরাতের ঠোঁটে হাসি ফুটিয়েছিল এই নির্জন।
আজ সন্ধ্যায় আরিয়ানকে যখন তৃণার জন্য ছটফট করতে দেখল, তখন নুসরাতের মুখে এক অদ্ভুত হাসি ফুটেছিল। কিসের হাসি ছিল সেটা? প্রতিহিংসার? নাকি প্রাপ্তির? আরিয়ান আজ ঠিক সেই যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা তিন বছর আগে নুসরাতকে দিয়ে গিয়েছিল। আরিয়ান যাকে অবহেলা করেছিল, আজ সেই শ্যামলা মেয়ের অবহেলাই আরিয়ানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। নুসরাত হয়তো এটাই ভাবছিল “সময়ের চাকা ঘোরে, আজ তোমার সেই দম্ভ কোথায়?”
নুসরাত জানালা থেকে সরে এলো। অন্ধকার রাতের সেই বিষণ্ণ স্মৃতিগুলোকে সে ঝেড়ে ফেলতে চায়। আরিয়ান তার অতীত হতে পারে, কিন্তু তার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ জুড়ে আছে কেবল একজনই ডক্টর নির্জন ইমতিয়াজ। তার প্রিয় ‘বাদামওয়ালা’। নুসরাত জানে, নির্জন তাকে যেভাবে আগলে রেখেছে, তেমনটা আর কেউ পারেনি।
নির্জন এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার শান্ত, মায়াবী চেহারার দিকে তাকিয়ে নুসরাতের ঠোঁটে এক টুকরো আমায়িক হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরপায়ে বিছানার কাছে গিয়ে বসল। পরম মমতায় নির্জনের কপালে আর গালে নিজের ঠোঁটের গভীর স্পর্শ দিল। এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল নুসরাতের সারা শরীরে।
কিন্তু নুসরাত ভাবতেও পারেনি নির্জন জেগে আছে। হঠাৎ এক হ্যাঁচকা টানে নির্জন নুসরাতকে নিজের বুকের ওপর শুইয়ে দিল। আচমকা এই ঘটনায় নুসরাত চমকে উঠে অস্ফুট স্বরে একটা শব্দ করল। নির্জন তার চোখের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমিভরা হাসি নিয়ে বলল,
“কী ব্যাপার চশমাওয়ালা ম্যাডাম? এই মাঝরাতে বুঝি স্বামীর সোহাগ পেতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে?”
নুসরাত লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে নির্জনের বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“ধ্যাৎ! কী যে বলো না তুমি!”
নির্জন তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমি কিছু বললেই দোষ? তুমি যে চোরের মতো লুকিয়ে আমার কপালে রাতে চুমু খাবে, আর আমি কিছু বললে অন্যায়? এটা তো মোটেও ঠিক না, ম্যাডাম।”
নুসরাত আর কোনো কথা বলতে পারল না। সে আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল। আরিয়ানের দেওয়া সেই অবহেলার ক্ষতগুলো যেন নির্জনের এই ভালোবাসার পরশে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে। নুসরাতের বন্ধ চোখের কোণ বেয়ে দুফোঁটা আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এই অশ্রু কষ্টের নয়, এই অশ্রু পূর্ণতার। সে মনে মনে ভাবল,
‘মানুষের জীবনে প্রথম ভালোবাসা সব নয়, ঠিক মানুষটি জীবনে আসাই হলো আসল সার্থকতা।’
যে সার্থকতা নুসরাত পেয়ছে।যে সার্থকতা প্রত্যেকটা মেয়ে চায়।
চলবে…
(কমেন্ট বক্স চেক করবেন।আপনাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা কমেন্টে দিয়ে দিয়েছি)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৯
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৭