Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪১ (স্পেশাল)


রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

পর্ব_৪১ (স্পেশাল)

নিলুফানাজমিননীলা

★★★
সন্ধ্যার ক্যাফেটা চারদিকে আলোকোজ্জ্বল। চারদিকে মৃদু আলো আর সুগন্ধি মোমবাতির এক চমৎকার মায়াবী পরিবেশ। পুরো ক্যাফেটা আরিয়ান আগে থেকেই বুক করে রেখেছে, তাই সেখানে ক্যাফের কর্মচারীরা ছাড়া বাইরের আর কেউ নেই।
​ক্যাফের সামনে এসে দুটি গাড়ি থামল। একটি আরিয়ানের গাড়ি, যেটাতে আরিয়ান আর তৃণা এসেছে। অন্য গাড়ি থেকে একে একে নামল নৌশি, আদনান, মিতু আর রোহান,নুসরাত,নির্জন।

পুরোটা রাস্তা তৃণা একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। একবারের জন্যও আরিয়ানের দিকে তাকায়নি সে। আরিয়ানও তাকে অকারণে ঘাঁটায়নি। তৃণা স্বভাবতই শান্তশিষ্ট, কিন্তু আজ তার মধ্যে যে নিস্তব্ধতা আরিয়ান দেখল, তা আগে কখনো দেখা হয়নি।
​গাড়ি থামতেই তৃণা ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরল। আরিয়ান গাড়ি থেকে নেমে তৃণার দিকের দরজা খুলে দিয়ে বলল,
“নামো শ্যামলিনী।”

​তৃণা গাড়ি থেকে নেমে অন্যদিকে তাকিয়েই ঝাপসা গলায় বলল,
“এই নামে ডাকবেন না আমাকে। অসহ্য লাগে শুনতে। আমার একটা সুন্দর নাম আছে, সেই নামে ডাকলেই হবে।”

​আরিয়ান পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল, “ঠিক আছে বউজান।”

​তৃণা অন্যমনস্ক ছিল, কিন্তু ‘বউজান’ শব্দটা কানে আসতেই তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে নিশ্চিতভাবে কথাটা শুনেছে কিনা বুঝতে পারছে না, বিশ্বাস করতে পারছে না। সে ভ্রু কুঁচকে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী বললেন আপনি? আবার বলুন তো!”

​“বললাম, ঠিক আছে মায়াবতী।” আরিয়ান খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জবাব দিল।

​তৃণা অস্থির হয়ে বলল, “না, না! আপনি এটা বলেননি। আপনি অন্য কিছু বলেছেন।”

​আরিয়ান এবার তৃণার আরও কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, “বলেছি ঠিক আছে জানপাখি।”

​তৃণার বিস্ময় যেন কাটছেই না, সে মাথা নেড়ে বলল,
“না, এটাও বলেননি। আমি স্পষ্ট অন্য কিছু শুনেছি।”

​তৃণার এই চরম বোকামো আর বিভ্রান্ত চেহারা দেখে আরিয়ান মনে মনে হাসল। এরকম বোকাও বুঝি মানুষ হয়! মেয়েটা নিজেকে কতটা শক্ত দেখানোর চেষ্টা করছে, অথচ সামান্য একটা সম্বোধনেই খেই হারিয়ে ফেলছে। আরিয়ান আর দাঁড়াল না, তৃণার উত্তরের তোয়াক্কা না করে মুচকি হাসতে হাসতে ক্যাফের ভেতরের দিকে ঢুকে গেল।
​তৃণা সেখানে দাঁড়িয়ে হাঁ করে আরিয়ানের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল, ‘স্বামীর শোকে কি আমার মাথাটাই খারাপ হয়ে গেল? নাকি রাগী সাহেবের পাগলামি রোগটা এখন আমার মাথায় ভর করল! ভুল শুনছি কেন বারবার?’

তখনি পেছন থেকে নৌশি এসে তৃণার কাঁধে হাত রাখল। “কী হলো বউমনি? দাঁড়িয়ে কেন?”

​তৃণা নিজের ঘোর কাটিয়ে বলল,
“হুঁ? না, কিছু না।”

​পেছনে সবাই তখন ক্যাফের গেটে পৌঁছে গেছে। নুসরাত-নির্জন, মিতু-রোহান আর আদনান। নৌশি তৃণার সাথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ধীর গলায় প্রশ্ন করল,
“বউমনি, তুমি কি দাদাভাইকে একটুও ভালোবাসো না?”

​তৃণা নৌশির প্রশ্নে থমকে গেল। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চাইল। কী করে বলবে এই মানুষটা তার প্রতিটি নিশ্বাসে মিশে আছে! তৃণা ম্লান হেসে বলল, “ভালোবাসা? যে সম্পর্ক তাসের ঘরের মতো ঠুনকো, সে সম্পর্কে ভালোবাসলেই কী আর না বাসলেই কী!”

​বলেই তৃণা দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেল। নৌশি এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছনে তাকাল। তার চোখ গিয়ে পড়ল আদনানের ওপর। ছেলেটা বরাবরের মতো স্টাইলিশ শার্টের উপরের বোতাম খোলা রেখে স্মার্টলি হাঁটছে। নৌশি বিড়বিড় করে বলল,
“বউমনি তো কিছুক্ষণ পর সারপ্রাইজ পেয়ে খুশিতে পাগল হয়ে যাবে, কিন্তু আমার কপালে কি কোনোদিন সুখ হবে?”

​ভেতরে ঢুকে নুসরাত একটা আলাদা টেবিলে গিয়ে চুপচাপ বসল। নির্জন এসে তার পাশের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসল। নুসরাতকে কিছুটা জড়োসড়ো দেখে নির্জন নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“মন খারাপ?”

​নুসরাত হাসার চেষ্টা করে বলল,
“মন খারাপ কেন হবে?”

“ও ভালো। আজ কিন্তু তৃণা বিশাল একটা সারপ্রাইজ পেতে যাচ্ছে, তাই না বলো?”

​নুসরাত হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে কোথাও যেন একটা বিষণ্ণতা মিশে ছিল। সে বলল,
“হুম, মেয়েটা সত্যিই অনেক বেশি খুশি হবে। ওর এই খুশিটা খুব প্রয়োজন ছিল।”

​নুসরাতের নজর গেল আরিয়ানের দিকে। আরিয়ান এক ধ্যানে তৃণার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে আজ কোনো রাগ নেই, আছে কেবল গভীর প্রেম। নুসরাত দ্রুত চোখ সরিয়ে নির্জনের দিকে তাকাতেই দেখল নির্জনও তার দিকেই তাকিয়ে আছে। দুজনের চোখাচোখি হতেই মুহূর্তের মধ্যে তারা চোখ নামিয়ে নিল। এক অদ্ভুত লজ্জার আবেশ ছড়িয়ে পড়ল দুজনের মাঝে।

​হঠাৎ আদনান ক্যাফের ছোট মঞ্চে উঠে সবার উদ্দেশ্যে এনাউন্স করল,
“প্রিয় আমার বড় ভাই ও আপুরা! আপনাদের এতগুলো যুগল বা কাপলদের মাঝে আমি আর এই নাদানের বাচ্চা ওরুপে নৌশি হলাম এক নাম্বারে পিওর সিঙ্গেল। তাই আমাদের দুই সিঙ্গেলের পক্ষ থেকে আপনাদের জন্য একটা গেইমের আয়োজন করেছি। আশা করি সবাই এনজয় করবেন!”

নৌশি এবার মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ঘোষণা করল,
“গেমটা হলো এখানে তিনজন সুইট কাপল রয়েছে। আমরা টেবিলে একটা কলম ঘুরাব। যে কাপলদের দিকে কলমের ক্যাপটা গিয়ে থামবে, তারা দুজন মিলে একটা গান গাইবে।”

​সকলেই হাততালি দিয়ে রাজি হলো। কিন্তু তৃণা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল,
“যার জন্য এত আয়োজন তাকে আসতে দাও, তারপর না হয় কাপল গেম খেলা যাবে। এখন তো এখানে মাত্র দুইটা কাপল।”

​তৃণার কথা শুনে সবাই আড়চোখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল, শুধু নুসরাত কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে রইল। মিতু এগিয়ে গিয়ে তৃণার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“আরে বাবা, ও আসলে পর না হয় অন্য কিছু খেলা যাবে। আপাতত চলো এই গেমটাই খেলি।”

​তৃণা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সবার জোরাজুরিতে রাজি হলো। টেবিলের মাঝখানে কলমটা রাখা হলো। তৃণা মনে মনে দোয়া করছিল যেন কলমটা অন্তত তাদের দিকে না থামে। কিন্তু নিয়তি বোধহয় অন্য কিছু ঠিক করে রেখেছিল। কলমটা বনবন করে ঘুরে ঠিক তৃণা আর আরিয়ানের সামনে এসেই স্থির হলো।
​সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠল,
“বাহ! একদম পারফেক্ট মানুষের সামনেই কলম থেমেছে।”

​তৃণা মাথা নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে বলল,
“প্লিজ না, আমি গান গাইতে পারি না।”

মিতু ছাড়ার পাত্রী নয়, সে বলল,
“কোনো তালবাহানা চলবে না। আমি জানি তুমি ভালো গাইতে পারো।”

​আরিয়ান এবার তৃণার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। শান্ত স্বরে বলল,
“একটা গানই তো, শুরু করো।”

​তৃণা বুঝতে পারল পালানোর পথ নেই। এই মুহূর্তে তার মাথায় একটাই গান ঘুরপাক খাচ্ছিল, সে ধীর লয়ে গাইতে শুরু করল,
​“মনের ভেতরে, মনের বাহিরে
তুমি ছাড়া আর কেহ নাই
আমার এই দেহের দখল
আমার এই রূপের সকল
তোমায় দিলাম তাই…
তুমি ছাড়া আর কেহ নাই।”

​গানটা গাইতে গাইতে তৃণার কণ্ঠ কিছুটা বুজে এল। সে আরিয়ানের গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে আর স্থির থাকতে পারল না। দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে নিচের দিকে তাকাল। তখনই আরিয়ান দরাজ গলায় পরের অংশটুকু সুর তুলল, তার দৃষ্টি তৃণার মায়াবী মুখের ওপর নিবদ্ধ,
​“জল বিনে মাছ মরে যেমন
তুমি বিনে আমি তেমন গো…
আগুনে পুড়ে পতঙ্গ, তোমার প্রেমে আমার অঙ্গ গো।
তিলক চন্দনে, বাহু বন্ধনে
তোমার প্রেমে পুড়ে হবো ছাই…
তুমি ছাড়া আর কেহ নাই।”

​গানের কথাগুলো যেন তীরের মতো গিয়ে তৃণার কলিজায় বিঁধল। তৃণা আর সেখানে থাকতে পারল না। দ্রুত উঠে গিয়ে ক্যাফের অন্ধকারাচ্ছন্ন এক কোণে দাঁড়াল। দুচোখ বেয়ে অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়ছে। সে কতবার পণ করেছিল এই পাষাণ লোকটার জন্য আর কাঁদবে না, কিন্তু আজ কেন জানি সব বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।
★★★
সোফায় বসে আছেন রৌশনারা বেগম। তাঁর মুখটা গত কয়েক দিনে বিশ্রীভাবে শুকিয়ে গেছে, দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছে স্পষ্ট। সম্পত্তির লোভে যে জাল পেতেছিলেন, তা ছিঁড়ে যাওয়ায় তিনি এখন দিশেহারা। রিনি পাশে বসে বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করল,
“কী হয়েছে? মুখটা এমন করে আছো কেন?”

​রৌশনারা বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“কী আর হবে? আমও গেল, ছালাও গেল। জীবনে সম্পত্তির এই সাধ আর পূরণ হলো না রে রিনি।”

​রিনি হতাশার সুরে বলল,
“কী করবে আর? জালিয়াতি করেও তো শেষ রক্ষা হলো না। সেদিন যে গিয়ে ডেডির পায়ে পড়ে অত নাটক করে ক্ষমা চাইলে, তবুও তো বুইড়া মাফ করল না।”

​রৌশনারা বেগম বেশ কিছুক্ষণ গুম হয়ে চিন্তা করলেন। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“উকিলের সাথে গোপনে কথা হয়েছিল। সে বলল, বুইড়া তার সব সম্পত্তি এরই মধ্যে কৌশলে তৃণার নামে লিখে দিয়েছে।”

​রিনি চমকে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। চিৎকার করে বলল,
“কী বলো মাম্মি! ডেডি এতটা খারাপ কাজ করতে পারল? আমাদের কথা একবারও ভাবল না?”

​রৌশনারা বেগম বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে বললেন, “তোর কথা কেন ভাববে? তুই কি তার আপন মেয়ে? তোকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার জন্য কি সে বসে আছে?”

​রিনি দমে গিয়ে আবার বসল, কিন্তু তার চোখেমুখে অস্থিরতা।
“তাহলে বলো না, এখন আমরা কী করব? এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো পথে বসতে হবে!”

​রৌশনারা বেগম এবার হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি বদলে গেল, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক ভয়ংকর কুটিল হাসি। রিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
“কী হলো? এই অবস্থায় তোমার হাসি পাচ্ছে কী দেখে?”

​“উপায় পেয়ে গেছি রে রিনি, উপায় পেয়ে গেছি!”
রৌশনারা বেগমের কণ্ঠে এক ধরনের নিষ্ঠুর উল্লাস।
​রিনি উৎসুক হয়ে ঝুঁকে এল,
“কী উপায়? তাড়াতাড়ি বলো না!”
​রৌশনারা বেগমের মুখে হাসি যেন উপচে পড়ছে।
★★★
তৃণার বুকের ভেতরটা তখন হাহাকার করছিল। সে অপলক দৃষ্টিতে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল একটু পরই হয়তো কোনো এক অপার্থিব সুন্দরী এই আলোকোজ্জ্বল ক্যাফেতে প্রবেশ করবে, আর আরিয়ান তাকে সবার সামনে আপন করে নেবে। ঠিক তখনই পেছনে কারো অস্তিত্ব টের পেয়ে তৃণা পেছন ফিরল। দেখল আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে, তার হাত দুটো পেছনে লুকানো।
​তৃণা এক পলক তাকিয়েই তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “আপনার সেই কাঙ্ক্ষিত মায়াবতী কন্যা কি এখনো এলো না? কোন সুদূর দেশে থাকে যে আসতে এত দেরি হচ্ছে?”

​আরিয়ান ঠোঁটের কোণে মায়াবী হাসি ফুটিয়ে বলল,
“সে কোনো ভিনদেশে থাকে না তৃণা, সে আমার মনের রাজ্যে থাকে।”

​তৃণা বিষাদ মাখা হাসলো।
​আরিয়ান ধীর পায়ে তৃণার আরও কাছে এগিয়ে এল। একদম সামনে দাঁড়িয়ে গভীর চোখে তাকিয়ে বলল,
“এসে গেছে । আমার দীর্ঘদিনের লুকানো ভালোবাসা এখন একদম আমার সামনে।”

​তৃণা উৎসুক হয়ে চারদিকে তাকাল, কিন্তু পরিচিত মুখগুলো ছাড়া কাউকে দেখতে পেল না। সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কোথায়? কাউকেই তো দেখছি না!”

​আরিয়ান এবার তার পেছনের হাত থেকে ফ্রেমের মতো কিছু একটা বের করে আনল, যার অর্ধাংশ লাল মখমল কাপড়ে ঢাকা। তৃণা অবাক হয়ে বলল,
“ছবি দেখাবেন? শুধু একটা ছবি দেখানোর জন্য এত আয়োজন করার কী মানে ছিল?”

​আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে এক ঝটকায় ফ্রেমের ওপর থেকে লাল কাপড়টা সরিয়ে নিল। মুহূর্তেই ভেসে উঠল একটি অপূর্ব কারুকাজ করা আয়না, যার চারপাশটা সোনালি পাতে বাঁধানো। আয়নার স্বচ্ছ কাঁচে তৃণার নিজের মুখচ্ছবি প্রতিফলিত হলো। ক্যাফের মৃদু আলোয় তৃণার কাজল কালো চোখ আর চন্দনের মতো কপালটা আয়নায় যেন এক জীবন্ত ছবি হয়ে ধরা দিল।
​তৃণা স্তব্ধ হয়ে গেল। সে একবার আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাচ্ছে, তো পরক্ষণেই আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখছে। আরিয়ান এবার নিচু স্বরে একদম তৃণার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“দেখে নিয়েছো আমার মায়াবতীকে? দেখেছো আমার সেই অবাধ্য পাহাড়ি কন্যাকে? যার মায়ায় পড়ে এই আরিয়ান মির্জা আজ দিশেহারা? এই আয়নায় যাকে দেখছো, সেই আমার একমাত্র ভালোবাসা।”

​তৃণার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। এক অজানা অনুভূতিতে কণ্ঠনালী বুজে আসছে তার। চোখের কোণে জমা জলগুলো বাঁধ মানছে না। আরিয়ান আয়নাটা সযত্নে পাশের টেবিলে রেখে দিল।
​এদিকে টেবিলের নিচে লুকিয়ে থাকা আদনান এই দৃশ্য দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, আরিয়ানের সংকেত পাওয়ার কথা সে ভুলেই গেল। তার হাতে একশ গোলাপের বিশাল এক তোড়া। আরিয়ান বারবার পেছনে হাত দিয়ে ইশারা করছে তোড়াটা নেওয়ার জন্য, কিন্তু আদনান তখন ঘোরের মধ্যে। বাধ্য হয়ে আরিয়ান আদনানের পায়ে একটা মৃদু লাথি দিল। আদনান সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দ্রুত তোড়াটা আরিয়ানের হাতে বাড়িয়ে দিল।
​আরিয়ান এবার গোলাপের সেই তোড়াটি হাতে নিয়ে তৃণার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল।

দেয়ালের ওপাশ থেকে সবাই দম আটকে এই রোমান্টিক দৃশ্য উপভোগ করছিল। মিতু, নৌশি সবার মুখে চওড়া হাসি, কিন্তু নুসরাত যেন সেখানে থেকেও নেই। তার চোখ দুটো বারবার চঞ্চল হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে। নির্জন নুসরাতের এই অস্থিরতা খেয়াল করল, কিন্তু কিছু বলল না।
​মঞ্চের মাঝখানে আরিয়ান তখনো হাঁটু গেঁড়ে বসা। তার চোখেমুখে মিনতি আর ভালোবাসা মাখানো। তৃণা নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখে কোনো খুশির ঝিলিক নেই, এমনকি কোনো যন্ত্রণার ছাপও নেই পুরো চেহারাটাই যেন পাথর হয়ে গেছে। আরিয়ান আবারও গভীর স্বরে বলল,

​“যাকে আমি সাড়ে চার বছর ধরে হন্যে হয়ে খুঁজেছি, যার জন্য আমি জায়নামাজে চোখের জল ফেলেছি, সে যখন আমার সহধর্মিণী এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে! আমার শ্যামলিনীকে মনের কথা জানানোর মতো কোনো উপযুক্ত শব্দ আমার জানা নেই। শুধু বলব,
থেকে যাও শ্যামলিনী, তোমার এই রাগী সাহেবের জীবনে কলঙ্কের দাগের ন্যায় অক্ষয় হয়ে থেকে যাও। আমি তোমাকে আগলে রাখব, কথা দিচ্ছি। কখনো কষ্টের ছায়া তোমার ওপর পড়তে দেব না। ভালোবাসি, বড্ড ভালোবাসি আমার শ্যামলিনীকে।”

​তৃণা স্থির দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। আরিয়ানের চোখে রাজ্যের সুখ উপচে পড়ছে। তৃণা ধীর হাতে ফুলের তোড়াটা গ্রহণ করল। আরিয়ান ভেবেছিল তৃণা হয়তো এখন আবেগে কেঁদে দেবে, অথবা তাকে জড়িয়ে ধরবে। সে হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু পরক্ষণেই তৃণার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, শীতল আর বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।

​আরিয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই তৃণা সর্বশক্তি দিয়ে হাতের গোলাপের তোড়াটা সজোরে ছুড়ে মারল। গোলাপের পাপড়িগুলো ছিঁড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
​তৃণা চিৎকার করে বলে উঠল,
“সাড়ে চার বছরের ভালোবাসা? আজ হঠাৎ মায়া জেগে উঠল? এতদিন কোথায় ছিল এই ভালোবাসা যখন আপনি আমাকে প্রতিদিন অপমান করেছেন? যখন আমাকে একটা আসবাবপত্রের চেয়েও কম গুরুত্ব দিয়েছেন? আজ সাজিয়ে গুছিয়ে প্রপোজ করলেই কি সব অপমান মুছে যায়?”

​আরিয়ান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার হাসি মাখা মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। দেওয়ালের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। কেউ কল্পনাও করেনি তৃণা এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

আরিয়ান বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। তৃণার চোখের সেই আগুন আর কন্ঠের ঘৃণা তাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। বাড়ির বাকি সবাই যেখানে খুশির অপেক্ষায় ছিল, সেখানে এক শ্মশান নীরবতা নেমে এসেছে।
​তৃণা নিজের ভেতরের দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ আজ আগ্নেয়গিরির মতো উগরে দিচ্ছে। তার চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে, গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়লেও কন্ঠস্বরে কোনো দুর্বলতা নেই। সে আবারও চিৎকার করে উঠল,
“ভালোবাসার মানে বুঝেন আপনি? আজ যখন জানতে পারলেন আমিই সেই পাহাড়ি মেয়ে, আপনার হারিয়ে যাওয়া মায়াবতী তখন আসলেন ভালোবাসার কথা শোনাতে? তার আগে আমি কে ছিলাম আরিয়ান মির্জা? আপনার কেনা দাসী?”

​তৃণা বিদ্রূপের হাসি হাসল। সেই হাসিতে আরিয়ান চাবুকের মতো আঘাত পেল। তৃণা দম না নিয়ে বলতে থাকল,
“কেন, আমি কি শুধু আপনার সহধর্মিণী হিসেবে ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার রাখতাম না? আপনি কি পারতেন না স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সঠিক দায়িত্ব পালন করে আমাকে ভালোবাসতে? কিন্তু না, আপনি প্রতিনিয়ত আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন, সবার সামনে আমাকে ছোট করেছেন। আপনি ভালোবেসেছেন এক কাল্পনিক পাহাড়ি কন্যাকে, আপনার পাশে রক্ত-মাংসের যে মেয়েটা দিনের পর দিন আপনার অবহেলা সয়ে গেছে, তাকে আপনি চিনতেই পারেননি।”

​আরিয়ান এবার ধরা গলায় বিড়বিড় করে বলল,
“আমি কি সত্যিই ভালোবাসিনি তৃণা? নাকি আমার ভালোবাসা বোঝাতে পারিনি? নাকি তুমি আদৌ আমার ভেতরের দহনটা বুঝতে চাওনি?”

​তৃণা চোখ রাঙিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
“চুপ করুন প্লিজ! অনেক হয়েছে। আপনার ওই মায়াবী বুলি শোনার মতো মানসিকতা এখন আমার নেই। আমার ভীষণ দম বন্ধ লাগছে এই নাটকীয় পরিবেশে।”

​তৃণা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। তপ্ত নিশ্বাস ফেলে ক্যাফের দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল। যাওয়ার আগে সবার উদ্দেশ্যে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“কেউ কি আমাকে বাড়ি পর্যন্ত দিয়ে আসবে, নাকি আমি একাই মাঝরাস্তায় চলে যাব?”

​মিতু আর নৌশি দৌড়ে এসে তৃণাকে থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। মিতু হাত ধরে বলল,
“তৃণা, ও তো ভুল বুঝতে পেরেছে, লক্ষ্মীটি শান্ত হও!”
কিন্তু তৃণা এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আদনান দ্রুত এগিয়ে এল। সে জানে এই মুহূর্তে তৃণা কারো কথা শুনবে না। আদনান শান্ত স্বরে বলল,
“চলো ভাবি, আমি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি।”

​আদনানের সাথে তৃণা গটগট করে বেরিয়ে গেল। ক্যাফেতে এখন এক বিষণ্ণ নিস্তব্ধতা। মিতু, রোহান আর নির্জন সবার মুখে গভীর চিন্তার ছাপ। আরিয়ান তখনো ছড়িয়ে থাকা গোলাপের পাপড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই শ্মশান নীরবতার মাঝেও ক্যাফের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নুসরাতের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি খেলা করে যাচ্ছে। তার সেই হাসিতে কোনো সহানুভূতি নেই, আছে অন্য কোনো এক গূঢ় তৃপ্তি।
★★★
আরিয়ানের গাড়িটা রাতের অন্ধকারে ছুটছে অজানা কোনো গন্তব্যে। তার দৃষ্টি সামনের রাস্তায় আর হাত স্টিয়ারিংয়ে থাকলেও তার মন এখানে নেই। আরিয়ানের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে নীরব অশ্রু বিসর্জনে। বারবার মাথায় ঘুরছে তৃণার সেই একটা কথা,
​“এতদিন কোথায় ছিল এই ভালোবাসা যখন আপনি আমাকে প্রতিদিন অপমান করেছেন? যখন আমাকে একটা আসবাবপত্রের চেয়েও কম গুরুত্ব দিয়েছেন? আজ সাজিয়ে গুছিয়ে প্রপোজ করলেই কি সব অপমান মুছে যায় ?”

​আরিয়ানের ঠোঁট কাঁপছে, চোখ ঝাপসা হয়ে সবকিছু ঘোলাটে দেখছে। আরিয়ান শহরের অনেকটা বাইরে চলে এসেছে। কয়টা বাজে আরিয়ানের জানা নেই। মোবাইলটা সাইলেন্ট অবস্থায় পেছনের সিটে পড়ে আছে। মোবাইলের স্ক্রিনে বারবার কল বেজে যাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা বলছে রাত এগারোটা বিয়াল্লিশ।
​আরিয়ান গাড়িটা এবার রাস্তার সাইডে দাঁড় করালো। এই রাস্তাটা বিশাল নির্জন। পাশেই একটা ছোট মুদির দোকান। দোকানদার দোকানটা এখনই বন্ধ করে ফেলত, কিন্তু আরিয়ানের জন্য থামল। আরিয়ান গাড়ি থেকে নেমে শুকনো গলায় বলল,
“সিগারেট হবে?”

​দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট আর একটা লাইটার কিনে নিল আরিয়ান। তারপর গাড়ির ডিকিতে বসে আকাশের বিশালতায় একে একে সব সিগারেটের ধোঁয়া উড়াতে লাগল। এভাবে প্যাকেটের অর্ধেক সিগারেট শেষ প্রায়।
​আরিয়ান ডিকি থেকে নেমে পিচঢালা রাস্তায় হাঁটতে লাগল। হঠাৎ তার নিজের ওপরই খুব রাগ হলো, আবার পাগলের মতো হাসিও পেল। আরিয়ান তাই করল, মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পাগলের মতো জোরে জোরে হাসতে লাগল। আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
“আমি খারাপ খোদা! কেন রাখলে এই খারাপ লোকটাকে পৃথিবীতে? আমি কাউকে ভালোবাসতে পারি না! আমি ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য না।”

​আরিয়ানের হাসি আর কান্না দুটো একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। কখন সে নেশার ঘোরে রাস্তার মাঝখানে চলে গেছে ঠিক জানা নেই। হঠাৎ দেখল এক বিদ্যুৎ গতিতে বিশাল এক ট্রাক এগিয়ে আসছে তার দিকে। আরিয়ানের নড়ার মতো শক্তি নেই, মস্তিষ্ক কাজ করছে না। দুটো পা যেন মাটির সাথে অবশ হয়ে লেগে গেছে। শুধু চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠল গাড়ির বড় বড় হেডলাইটের তীব্র সাদা আলো।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply