Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪০


রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

পর্ব_৪০

নিলুফানাজমিননীলা

★★★
সকাল সকাল নুসরাত ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। শাওয়ার নিয়ে রুম থেকে বের হতেই দেখল নির্জনের মা মাহমুদা বেগম রান্নাঘরে ব্যস্ত। নুসরাত মাথায় ওড়নাটা টেনে ভালো করে চুলগুলো ঢেকে নিল, যদিও ভেজা চুলের কারণে ওড়নাটা কিছুটা ভিজে উঠছে। রান্নাঘরে ঢুকতেই মাহমুদা বেগম একবার আড়চোখে নুসরাতের দিকে তাকালেন, তারপর অবজ্ঞার সাথে দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন।
​নুসরাত জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে ধীর কণ্ঠে বলল, “আসসালামু আলাইকুম।”

পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো সম্বোধন এই মুহূর্তে নুসরাতের জানা নেই। মাহমুদা বেগম হাতের কাজ থামালেন না, যান্ত্রিকভাবে সালামের উত্তর দিলেন। নুসরাত আবারও বিনীত সুরে প্রশ্ন করল,
“আমি কি কোনো কাজে আপনাকে সাহায্য করব?”

​এবার মাহমুদা বেগম হাতের খুন্তিটা রেখে নুসরাতের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। কড়া গলায় বললেন,
“সকাল সকাল আমার মাথা খেতে চলে আসলে? আচ্ছা, আমার একটা কথার ঠিকঠাক উত্তর দাও তো দেখি।”

​নুসরাত নিচু চোখে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“জি, বলুন।”

​“আমার ছেলেটাকে কি তুমি কোনো জাদু-টোনা করেছো? তোমার জন্য আমার সোনার টুকরো ছেলেটা আমাদের সাথে পর্যন্ত খারাপ ব্যবহার করেছে। কী এমন জাদু আছে তোমার মাঝে? রূপ যা একটু ছিল, তাও তো ওই পোড়া দাগে শেষ! কী দেখে আমার ছেলেটা পাগল হয়ে তোমাকে বিয়ে করতে গেল, আমি তো ভেবেই পাই না!”

​নুসরাত নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। তার দৃষ্টি মাটির দিকে নিবদ্ধ। কী উত্তর দেবে সে? মাহমুদা বেগম তো ভুল কিছু বলেননি! আয়নায় নিজের মুখটা সে নিজেও তো দেখতে পারে না। অপমানে আর কষ্টে নুসরাতের বুক ফেটে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক গম্ভীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
​“ভালোবেসে বিয়ে করেছি, রূপ দেখে নয়।”

নুসরাত এবং মাহমুদা বেগম দুজনেই চরম অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকালেন। দেখলেন নির্জন শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। নির্জন এগিয়ে এসে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী শুরু করলে আম্মু? তোমার থেকে অন্তত এমন ব্যবহার আশা করিনি।”

​মাহমুদা বেগম ছেলেকে থামিয়ে দিয়ে ধমক দিয়ে বললেন,
“তুই একদম চুপ কর নির্জন! বড়দের মাঝে কথা বলবি না।”

​নির্জন এবার মায়ের আরও কাছে এসে নরম সুরে বলল,
“আচ্ছা আম্মু, তুমি তো সবসময় আমার ভালো চেয়েছ। আমি যখন মেডিকেলে চান্স পেলাম, তখন সবচেয়ে বেশি খুশি তুমিই হয়েছিলে। আমি যখন ডাক্তার হলাম, আমার চেয়েও বেশি আনন্দ ছিল তোমার চোখে। কিন্তু আজ যখন আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ, তখন আমার সেই খুশিতে তুমি কেন খুশি হতে পারছ না?”

​মাহমুদা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তাঁর মুখে কোনো উত্তর নেই। নির্জন যখন আরও কিছু বলতে উদ্যত হলো, তখন নুসরাত মাঝপথে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল,
“প্লিজ থামুন! কী শুরু করলেন এসব? এটা আমাদের শাশুড়ি-বউয়ের ব্যাপার, আপনার তো এর মাঝে কথা বলার দরকার নেই। মা-মেয়ের মাঝে কোনো খুনসুটি বা ঝামেলা হলে সেটা আমরাই সমাধান করব। আপনি কেন মাঝখানে কথা বলছেন?”

​নির্জন আর মাহমুদা বেগম দুজনেই যেন আকাশ থেকে পড়লেন। নির্জন মনে মনে ভাবল, ‘যার জন্য করি চুরি, সেই বলে চোর!’ সে আর কথা না বাড়িয়ে গটগট করে নিজের রুমে চলে গেল।
​মাহমুদা বেগম কিছুক্ষণ অবাক হয়ে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে রইলেন। নুসরাত নিচু স্বরে বলল,
“সরি মা। নির্জনের পক্ষ থেকে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।”

মাহমুদা বেগম আর কিছু বললেন না, তবে নুসরাতের এই বুদ্ধিমত্তায় তাঁর মনের বরফ যেন কিছুটা গলতে শুরু করল।
​নুসরাত এক কাপ কফি বানিয়ে রুমে গেল। দেখল নির্জন গম্ভীর মুখে বিছানায় বসে আছে। নুসরাতকে দেখে সে মুখ ফিরিয়ে নিল। নুসরাত মনে মনে হাসল। সে কফিটা টেবিলে রেখে নির্জনের একদম পাশে গিয়ে বসল।
“কী ব্যাপার? খুব রাগ হলো?”

​“রাগ হবে না? আমি তোমার পক্ষ নিলাম আর তুমিই আমাকে ঝাড়ি দিলে!” নির্জন গাল ফুলিয়ে বলল।

“হওয়ার তো কারণ দেখি না। স্বামীকে সবসময় শাশুড়ির সামনে হিরো হতে নেই, মাঝেমধ্যে একটু ভিলেন সাজলে সম্পর্ক ভালো থাকে।”

​নির্জন কথা বলল না, তবে সে যে নুসরাতের উপস্থিত বুদ্ধিতে মনে মনে ভীষণ খুশি হয়েছে, তা প্রকাশ করল না। নির্জনের পরনে তখন একটি সাধারণ টি-শার্ট। নুসরাত মুচকি হেসে মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
“আচ্ছা, এই অবস্থায় বাইরে কেন গিয়েছিলেন? আপনার গলায় যে লিপস্টিকের দাগ লেগে আছে!”

​নির্জন এবার নুসরাতের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। তারপর হঠাৎ নুসরাতকে জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিয়ে বলল,
“থাকুক না একটু আধটু দাগ, কী হয়েছে তাতে? আমার বউয়ের ভালোবাসার চিহ্ন তো!”

​কথাটা বলতে বলতে নির্জন নুসরাতকে আরও শক্ত করে জাপটে ধরল। নুসরাত নির্জনের মতলব বুঝতে পেরে তাকে জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে দূরে গিয়ে দাঁড়াল। গাল দুটো লাল করে বলল,
“এবার ওয়াশরুমে যান তো! আজ মির্জা বাড়িতে যাওয়ার কথা মনে আছে তো?”

​নির্জন অলস ভঙ্গিতে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে বলল,
“এই জন্যই গুণীজনেরা বলে, বোকা মেয়েকে বিয়ে করা উচিত। তোমার মতো বুদ্ধিমতী মেয়েকে বিয়ে করলে তো বাপ হতে দশ বছর সময় লাগবে!”

​নির্জনের মুখে এমন লাগামছাড়া কথা শুনে নুসরাত যেমন অবাক হলো, তেমনি লজ্জায় লাল হয়ে গেল। যে লোকটা এতদিন কেবল আদর্শ প্রেমিক ছিল, সে যে এতটা রসিক হতে পারে, তা নুসরাতের ভাবনার বাইরে ছিল। সে লাজুক হেসে বলল,
“এত লজ্জাহীন আপনি, জানতাম না তো!”

​নির্জন মাথা তুলে তাকিয়ে বলল,
“এই যে ম্যাডাম, ‘আপনি আপনি’ করা এবার বন্ধ করো তো বউজান। স্বামী হই তোমার, এখন থেকে ‘তুমি’ করে ডাকবে।”

​নুসরাত আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। মুচকি হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নির্জন নুসরাতের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই হাসল। জীবনের শ্রেষ্ঠ মানুষটাকে পাওয়ার সুখ আজ তার পুরো অস্তিত্বে মিশে আছে
★★★
আরিয়ান ঘুম থেকে উঠে দেখল পাশে তৃণা নেই। সকাল সকাল মেয়েটার মুখ না দেখে মনটা কিছুটা ব্যথিত হলো। তবে তখনি তার মাথায় গতকালের করা প্ল্যানটা এল। আজ সন্ধ্যায় একটা ক্যাফে বুক করেছে সে। সেখানেই তৃণাকে আরিয়ান মনের সব জমানো ভালোবাসার কথা বলবে। আর এই বিশেষ পরিকল্পনাটির কথা নৌশি, আদনান, মিতু আর রোহান সবাই জানে। আরিয়ান নিজের মনেই মুচকি হাসল।
​রাতে সারপ্রাইজটা পুরোপুরি সার্থক করার জন্য ভাবল, এখন তৃণার সাথে একটু অন্যরকম আচরণ করা দরকার। ঠিক তখনি দেখা গেল তৃণা রুমে ঢুকছে, হাতে কফির মগ। কয়েক দিন ধরে আরিয়ানের একটা বদভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে তৃণার হাতের কফি ছাড়া সকালটা শুরু হতে একদম ভালো লাগে না।
তৃণা ঘরে ঢুকেই স্বাভাবিক স্বরে বলল,
“উঠে পড়েছেন?”

​আরিয়ান চট করে নিজের মুখ গম্ভীর করার নাটক করে বলল,
“দেখতেই তো পাচ্ছো।”

​তৃণা একবার ভ্রু কুঁচকে আরিয়ানের দিকে তাকাল। তবে আরিয়ানের কর্কশ কথাগুলো এখন আর আগের মতো গায়ে মাখে না সে। কফির মগটা এগিয়ে দিল। তৃণা কিছু বলার আগেই আরিয়ান বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বলল,
“কফি দিতে হবে না, আমি নিজেই কফি বানিয়ে খেতে পারব।”

​তৃণা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। বিয়ের প্রথম দিন ঠিক এই কথাগুলোই আরিয়ান বলেছিল। সেই স্মৃতিগুলো অনায়াসেই ভেসে উঠল তার মনে। তৃণা আর জোরাজোরি করল না। ম্লান মুখে বলল,
“আচ্ছা, খাবেন না যেহেতু, তাহলে নিয়ে চলে যাচ্ছি।”

​আরিয়ান বুঝল তৃণা অতটা জেদ করবে না। তাই নিজে থেকেই কফির মগটা এক প্রকার কেড়ে নিয়ে বলল,
“আচ্ছা, এনেছ যখন তখন দেখি কেমন হলো।”

​আরিয়ান এক চুমুক দিল। তৃণার হাতের কফির মজাই আলাদা, এক চুমুকেই মনটা শান্ত হয়ে যায়। তবুও নিজের নাটক বজায় রাখার জন্য আরিয়ান মুখ বিকৃত করে বলল,
“ছেহ্! কী বানালে এটা? একে কফি বলে? জঘন্য হয়েছে!”

তৃণা কিছু বলল না। মাথা নিচু করে শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আরিয়ান নিজের মাথা সামান্য কাত করে তৃণার মুখের অভিব্যক্তি পড়ার চেষ্টা করল। তৃণা চলে যাওয়ার জন্য পেছন ফিরতেই আরিয়ান বাঁকা স্বরে বলে উঠল,
“রাতের বেলা তুমি যে আমার কাছে আসতে চাও, এটা কি ঠিক?”

​তৃণা থমকে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তাকাল। ভ্রু জোড়া কুঁচকে বলল,
“আমি আপনার কাছে আসতে চাই? কখন?”

আরিয়ান কফির মগ হাতে নিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “থাক, এত ভালোমানুষ সাজার চেষ্টা করতে হবে না। কাল রাতে তো খুব আহ্লাদ দেখাচ্ছিলে!”

​তৃণা আরিয়ানের এই অদ্ভুত ব্যবহারের কোনো মানে খুঁজে পেল না। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“নিচে আসুন, খাওয়া-দাওয়া করে ঔষধ খাবেন।”

​আরিয়ান এবার ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে বলল,
“তুমি তো আমার সেই মায়াবতীকে দেখতে চেয়েছিলে। দেখবে না?”

​তৃণা আরিয়ানের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দিল। সেই দৃষ্টিতে কষ্ট, হাসি কিংবা ঘৃণা কিছুই তেমন লক্ষ করা গেল না। তৃণা শান্ত স্বরে বলল,
“দেখা করাবেন?”

“হু, আজ সন্ধ্যায় মায়াবতীকে প্রপোজ করব। তুমি যাবে আমার সাথে?”

​তৃণা তৎক্ষণাৎ আরিয়ানের থেকে চোখ সরিয়ে নিল। বুকটা যেন কোনো এক অদৃশ্য চাপে দুমড়ে গেল। সে ধরা গলায় বলল,
“আমি গিয়ে কী করব?”

“দেখবে আমার ভালোবাসার মানুষকে। নাকি হিংসার কারণে দেখতেও যাবে না?”

​তৃণা নিজের ঠোঁটে বিষণ্নতার এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“যাব না কেন? অবশ্যই যাব। নিজে ভাগ্যবতী না হতে পারি, সেই ভাগ্যবতীকে তো দেখাই যায়!”

​বলেই তৃণা দ্রুত পেছন ফিরল। এক পা এগিয়ে আবারও থামল সে। তারপর ধীর পায়ে পেছন ফিরে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“একটা কথা বলব?”

আরিয়ান ভ্রু নাচিয়ে বলল, “হু, বলো।”

​“মানুষের পোষা প্রাণীর ওপরও মায়া হয়, এমনকি দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত আসবাবপত্রের ওপরও মায়া বা ভালোবাসা জন্মায়। আমি কি সেসব জিনিসের চেয়েও নিকৃষ্ট যে দীর্ঘদিনের পথচলায় আমার প্রতি আপনার এক ফোঁটা মায়া বা ভালোবাসা জন্মাল না?”

​আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তৃণা আর সেখানে এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, চটজলদি জায়গা ত্যাগ করল।
★★★
রোহান ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো নিজেকে পরখ করে নিচ্ছিল। বিছানা গোছাতে গোছাতে মিতু আড়চোখে স্বামীর দিকে তাকাল। রোহান সুগন্ধি মাখতে মাখতে জিজ্ঞেস করল,
“কিছু লাগবে তোমার? ফেরার পথে নিয়ে আসবো?”

​মিতু হাতের কাজ থামিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“না, কিছু লাগবে না। আচ্ছা, আজ অফিসে না গেলে হয় না?”

​রোহান হাসল। মিতুর পেছনে গিয়ে দুহাতে তার কোমর জড়িয়ে ধরল সে। আয়নায় স্ত্রীর প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বলল,
“একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং আছে জান। বেশি সময় লাগবে না, এই ধরো ঘণ্টাখানেক, তারপরই চলে আসব।”

​মিতু চুপ করে রইল, তার চোখেমুখে একরাশ দুশ্চিন্তা। রোহান মিতুর কাঁধে মুখ রেখে আদুরে গলায় বলল,
“কী হলো? কিছু বলতে চাচ্ছো বলে ফেলো। তোমার এই প্রেমিক পুরুষ তোমার সব কথা শুনতে প্রস্তুত।”

​মিতু ঘুরে দাঁড়িয়ে রোহানের শার্টের বোতাম ঠিক করতে করতে বলল,
“আমাকেও সাথে নিয়ে যাও।”

রোহান ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
“তুমি অফিসে গিয়ে কী করবে?”

​“অফিস থেকে ফেরার পথে দুজনে মিলে একবার ডক্টরের ওখান থেকে ঘুরে আসতাম।”

​রোহানের মুখটা মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল। সে মিতুর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
“এত ডক্টর ডক্টর কেন করছো নীলাঞ্জনা? আমাদের পরিবার তো সুখেই আছে। একটা বাচ্চাই কি সব?”

​“সব না ঠিকই, তবে সংসারটা তো পরিপূর্ণ হয় না।” মিতুর কণ্ঠে আর্তনাদ।

​রোহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিতুর চোখের দিকে তাকিয়ে আচমকা বলে বসল,
“আমাকে ছেড়ে যাওয়ার এত তাড়া তোমার?”

​রোহানের মুখ থেকে এমন কথা শুনে মিতু চমকে তাকাল। টলমল চোখে চেয়ে থেকে বলল,
“এসব কী বলছো? তোমাকে কেন ছেড়ে যাব?”

​“যদি ডক্টর বলে সমস্যা আমার, তখন তো নির্ঘাত আমায় ছেড়েই যাবে, তাই না?” রোহানের গলায় একরাশ অনিশ্চয়তা।

​মিতু আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দ্রুত রোহানের চওড়া বুকে মুখ লুকাল সে। ডুকরে কেঁদে উঠে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“কখনো না! একমাত্র সাদা কাপড় পরেই এই ঘর আর তোমাকে ছেড়ে যাব, তার আগে নয়।”

​রোহান মিতুকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, “এভাবে বলো না, কষ্ট হয়। আমি তোমাকে কোনোভাবেই হারাতে চাই না।”
★★★
সন্ধ্যার দিকে ক্যাফেতে যাওয়ার জন্য তৃণা তৈরি হয়েছে। তবে এই সাজগোজের পেছনে কোনো আনন্দ নেই, আছে একরাশ বিষণ্ণতা। নিজের স্বামী অন্য কোনো মেয়েকে প্রপোজ করবে আর তাকে সেখানে দাঁড়িয়ে সাক্ষী থাকতে হবে এটা ভাবতেই তৃণার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। বাইরে থেকে সে নিজেকে যতটা শক্ত দেখানোর চেষ্টা করছে, ভেতরটা ঠিক ততটাই ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। মানুষের যখন আর কিছু করার থাকে না, তখন কেবল দীর্ঘশ্বাসই হয় তার একমাত্র সঙ্গী।

​কিন্তু সবকিছুর মাঝে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে শাড়িটা নিয়ে। সিল্কের এই শাড়িটা একা সামলে পরা তৃণার জন্য বেশ কঠিন। অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও সে কুঁচিগুলো ঠিক করতে পারছে না। নিরুপায় হয়ে তৃণা নৌশি আর মিতুর কাছে সাহায্য চেয়েছিল, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো সবাই আজ তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। একেকজন একেকটা অদ্ভুত অজুহাত দিচ্ছে। মিতুকে যখন তৃণা বলল,
“ভাবি, আমাকে একটু শাড়িটা পরতে হেল্প করো না!”

​তখন মিতু কোনোদিকে না তাকিয়েই বলল,
“আরে তৃণা, এখন তো পারব না।বাচ্চাকে খাবার খাওয়াতে হবে।”

​তৃণা বোকার মতো তাকিয়ে রইল। এই বাড়িতে বাচ্চা এলো কোত্থেকে যে মিতু তাকে খাবার খাওয়াবে? মিতু তৃণা আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দ্রুত পায়ে চলে গেল। এরপর তৃণা যখন নৌশিকে ধরল, তখন নৌশি মুখ কুঁচকে বলল,
“বউমনি, আমার না হাতে খুব ব্যথা। আমি একদম হাত ওপরে তুলতে পারছি না।”

​শাড়ি ঠিক করে দিতে গেলে হাতে ব্যথা বাড়ে কি না, সেটা তৃণার মাথায় ঢুকল না। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মনেই ভাবছে সবাই কি তার ওপর কোনো কারণে রেগে আছে? না হলে এমন অদ্ভুত ব্যবহার কেন করছে?

​এদিকে নৌশি আর মিতু দরজার আড়ালে উঁকি দিয়ে চুপিচুপি সব দেখছিল। মিতু ফিসফিস করে নৌশিকে জিজ্ঞেস করল, “আরিয়ান কোথায়?”

নৌশি উত্তর দিল,
“দাদাভাই তো নিচে আমাদের আর বউমনির জন্য অপেক্ষা করছে।”

​মিতু নৌশির দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসল। বলল,
“যাও, গিয়ে আরিয়ানকে বলো যে তৃণা ওকে রুমে ডাকছে।”

​নৌশি অবাক হয়ে তাকাল। সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কিন্তু কেন ভাবি? আর আমরাই বা কেন বউমনিকে শাড়ি পরতে সাহায্য করছি না? ও একা খুব কষ্ট পাচ্ছে।”

​মিতু নৌশির গালে একটা চিমটি কেটে হেসে বলল, “তোমার ছোট মাথায় অত কিছু ঢুকবে না গো নৌশি। যেটা বললাম সেটাই করো। যাও!”

​নৌশি মনে মনে বেশ ক্ষুব্ধ হলো। আঠারো বছরের পূর্ণবয়স্ক একটা মেয়েকে সবাই বারবার ‘ছোট’ বলছে, এটা কি মানা যায়? তবে মিতুর কথা অমান্য না করে সে নিচেই গেল। আরিয়ানকে গিয়ে বলল,
“দাদাভাই, বউমনি তোমাকে উপরে রুমে ডাকছে। জরুরি কোনো কাজ আছে বোধহয়।”

তৃণা এদিকে শাড়ি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, কোনোভাবেই ঠিক করতে পারছে না। ইচ্ছে হচ্ছে শাড়িটা ছুড়ে ফেলে দিতে। এই শাড়ি পরার চেয়ে বিশ জনের রান্না করাও ঢের সহজ। ঠিক তখনি দরজা খোলার আওয়াজ হলো। তৃণা ভেতর থেকে লক করেনি, শুধু দরজাটা ভিড়িয়ে রেখেছিল। আরিয়ানকে ঘরে ঢুকতে দেখে তৃণা হকচকিয়ে গেল। শাড়িটা তাড়াহুড়ো করে শরীরের সাথে পেঁচিয়ে নিয়ে বলল,
“কী সমস্যা আপনার? নক না করেই চলে এসেছেন কেন?”

​আরিয়ান নির্লিপ্ত মুখে বলল,
“নিজের রুমে আসতেও কি এখন নক করতে হবে? বাই দ্য ওয়ে, ডাকছিলেন কেন?”

​“কই, না তো!”

​“কিন্তু নৌশি যে বলল তুমি আমাকে ডাকছো!”

​তৃণা আবারও বিরক্তি নিয়ে বলল,
“ডাকিনি আপনাকে, যান এখান থেকে।”

​আরিয়ান মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ফিরে যেতে নিলে তৃণা দোটানায় পড়ে আবারও ডেকে উঠল,
“শুনুন!”

​আরিয়ান মনের ভেতর মুচকি হেসে পেছন ফিরল,
“হুম, বলো।”

তৃণা আমতা আমতা করে বলল,
“শাড়ি পরতে একটু সাহায্য করবেন?”

​আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে ভেতরে ঢুকল। ঠোঁটের কোণে হাসি নাচিয়ে বলল,
“আমি পরিয়ে দেব? তারপর একটু স্পর্শ লাগলে তো বলবে আমি চরিত্রহীন!”

​তৃণা আরিয়ানের কথায় প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে বলল,
“ফালতু কথা বন্ধ করুন। আপনি শুধু কুচিটা ধরবেন, বাকিটা আমি সামলে নেব।”

​আরিয়ান রাজি হলো। কিন্তু সমস্যা হলো, কোনোভাবেই তৃণা কুচির ভাঁজ ঠিক করতে পারছে না। আরিয়ান এবার তৃণার হাত থেকে শাড়ির অংশটা নিয়ে নিখুঁতভাবে কুচি তুলে দিল। কাজ শেষ করে দুষ্টুমিভরা গলায় বলল,
“কুচি কি আমিই গুঁজে দেব?”

​তৃণা ঝট করে আরিয়ানের হাত থেকে কুচিটা কেড়ে নিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“অসভ্য!”

বলেই সে উল্টো দিকে ফিরে কুচি গুঁজে নিল। পুনরায় এপাশ ফিরতেই দেখল আরিয়ান রাগী চোখে তাকিয়ে আছে এবং এক পা এক পা করে সামনে এগোচ্ছে। তৃণা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“কী হলো আবার?”

​“কী বললে আমাকে? আমি অসভ্য?” আরিয়ানের গলার স্বর গম্ভীর।

“অবশ্যই!”

​আরিয়ান আরও কাছে এগিয়ে এসে বলল,
“আবার বলো।”

তৃণা সাহসী হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“আপনি তো অসভ্যই। বউ হিসেবে মানেন না অথচ যেভাবে তাকান, মনে হয় গিলে খাবেন!”

​পেছাতে পেছাতে তৃণার পিঠ দেয়ালের সাথে ঠেকে গেল। আরিয়ান তৃণার দুপাশে দেয়ালের ওপর হাত রেখে তাকে আটকে ফেলল। একদম কাছে ঝুঁকে এসে বলল,
“বউয়ের দিকে তাকালে কি মানুষ অসভ্য হয়ে যায়অসভ্যতা না করেও অসভ্যের ট্যাগ যেহুতু পেয়েই গেলাম।তাহলে আজ একটু অসভ্য হই? ”
কথাটা বলেই আরিয়ান মনে মনে কুটিল হাসলো।

তৃণার ভয়ে বুক কাঁপছে কাঁপা গলায় বলল,
“না,আপনি অসভ্য না আপনি ভালো মানুষ।”

​আরিয়ান এখন তৃণার একদম কাছে। ওর তপ্ত নিশ্বাস তৃণার মুখে আছড়ে পড়ছে। তৃণার বুক দুরুদুরু করছে, সেটা ভয়ের নাকি অন্য কোনো অজানা অনুভূতির, তা সে জানে না। আরিয়ান একদৃষ্টে তৃণার কাজল কালো চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। তৃণা অস্বস্তিতে চোখ বন্ধ করে নিল। হঠাৎ আরিয়ান অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,

“আমি কি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি তৃণা?”

​তৃণা চোখ বন্ধ রেখেই উত্তর দিল,
“হয়তো না।”

“যদি না-ই হয়, তাহলে তোমার সান্নিধ্যে এলে বুকের ভেতর তীব্র কিসের ব্যথা অনুভব হয়? কেন তোমার নিকট হলে নিজেকে হারিয়ে ফেলি? কেন এই মায়াবী মুখটা দেখলে এত মায়া লাগে?”

​তৃণা তৎক্ষণাৎ চোখ খুলল। সে কি ভুল শুনল? নাকি আরিয়ান সত্যিই এসব কথা বলেছে? আরিয়ান যেন হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেল। আবেগের বশে সত্যিটা প্রকাশ করে ফেলেছে বুঝতে পেরে সে চটজলদি সরে গেল। তৃণা বিস্ময় নিয়ে বলল,
“এইমাত্র কী বললেন আপনি?”

​“কখন কী বললাম?” আরিয়ান আকাশ থেকে পড়ার ভান করল।

“এই যে মাত্রই বললেন!”

​“না, বলিনি তো কিছু। তোমার কানে সমস্যা হয়েছে বোধহয়।”

​তৃণা বোকার মতো তাকিয়ে রইল। সে কি চোখ বন্ধ করে ভুল স্বপ্ন দেখল? হয়তো তাই। তৃণা নিজেকেই মনে মনে ধমক দিল রাগী সাহেবের মুখ থেকে নিশ্চয়ই এত মধুর বাণী বের হবে না, অন্তত তার জন্য তো নয়ই।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply