রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
পর্ব_৩৯
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
রাত তখন গভীর নিশীথ। পুরো ঘরটা তাজা ফুলের মিষ্টি গন্ধে মৌ মৌ করছে। বিছানার চারদিক নিপুণভাবে সাজানো হয়েছে বাহারি সব ফুলে। সেই বিছানার এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে নুসরাত। তার একজোড়া স্থির দৃষ্টি ফ্লোরের কার্পেটে আটকে আছে। মির্জা বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে আসার সময়ও নুসরাত একবারের জন্যও নির্জনের দিকে তাকায়নি, আর নির্জনও তাকে দেখার কোনো বিশেষ চেষ্টা করেনি।
নুসরাতের বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। তবে তা নতুন স্বামীর সামনে আসার লজ্জায় নয়, বরং এক অজানা আশঙ্কায়। নির্জনের প্রতি নুসরাতের মনে আকাশছোঁয়া অভিমান জমে আছে। কিন্তু যে মানুষটি এখন তার জীবনসঙ্গী, তার প্রতি এমন অভিমান কি আসলেই সাজে? এখন রাত এগারোটা। নুসরাতকে নিয়ে বাড়িতে প্রবেশের পরপরই হাসপাতাল থেকে জরুরি একটি কল আসায় নির্জনকে দ্রুত বেরিয়ে যেতে হয়েছিল। এখন হয়তো তার ফেরার সময় হয়ে গেছে।
নির্জনদের বাড়িতে ঢোকার পর নুসরাতের শ্বশুর-শাশুড়ি কোনো খারাপ ব্যবহার করেননি ঠিকই, তবে তাঁরা যে এই বিয়েতে খুব একটা খুশি নন, তা নুসরাতের বুঝতে বাকি নেই। নুসরাত এখন একটি মেরুন রঙের শাড়ি পরে বসে আছে। মুখে কোনো মেকআপের প্রলেপ নেই। মেকআপহীন মুখে বাম দিকের সেই পোড়া দাগটা এখন স্পষ্ট। নুসরাত তার অবাধ্য চুলগুলো দিয়ে দাগটা যতটা সম্ভব আড়াল করার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দ হলো। নুসরাত চমকে উঠে সেদিকে তাকাল। দরজা খুলতেই সামনে ভেসে উঠল তার সেই ‘বাদামওয়ালা’ ওরফে বর্তমান স্বামী নির্জন। পরনে ধবধবে সাদা শার্ট, যার হাতা দুটো কুনুই পর্যন্ত ফোল্ড করা। হাসপাতাল থেকে ফিরে সে সোজা নিজের রুমেই এসেছে। নুসরাতকে বিছানায় বসা দেখে নির্জনের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
নুসরাত আজ অপলক চোখে নির্জন নামক এই পুরুষটির দিকে তাকিয়ে রইল। নির্জনের ব্যক্তিত্ব আর সৌন্দর্য আজ যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। নির্জনকে দেখে নুসরাতের শরীরটা হিমশীতল হয়ে আসছে। উঠে গিয়ে স্বামীকে সালাম করবে, সেই শক্তিটুকুও যেন আজ তার শরীরে নেই।
নুসরাতের শরীর কাঁপছে। কেন এই কাঁপুনি? আজ তো সব অপেক্ষার অবসান হলো, আজ তো পূর্ণতার দিন! নুসরাত লজ্জায় আর সংকোচে মাথা পুরোপুরি নিচু করে রেখেছে। তার মনে হচ্ছে, এই পোড়া দাগওয়ালা মুখটা সে নির্জনের সামনে তুলবে কী করে!
নির্জন ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে নুসরাতের একেবারে সামনে বসল। নুসরাতকে স্পর্শ না করেও নির্জন অনুভব করতে পারছে মেয়েটা কতটা কাঁপছে। নুসরাতের মুখটা চুলে ঢাকা। নির্জন গভীর মমতায় নুসরাতের থুতনিতে আঙুল ঠেকিয়ে মুখটা একটু ওপরে তুলল। দুইজোড়া চোখ একে অপরের ওপর নিবদ্ধ হলো। নুসরাতের সেই মেকআপহীন, দাগওয়ালা মুখটা দেখার পরও নির্জনের ঠোঁটে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটে উঠল। সে গভীর আবেশে বিড়বিড় করে বলল,
“মাশাআল্লাহ! আকাশের চাঁদ আজ আমার ঘরে নেমে এসেছে।”
নুসরাত নির্জনের কথা শুনে আরও একবার থমকে গেল। এসিডে ঝলসানো এই মুখ দেখেও নির্জন এত সুন্দর কথা কী করে বলতে পারে! নুসরাতের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের কষ্টের পাহাড়টা যেন মুহূর্তেই ধসে গেল। তার ঠোঁট কাঁপছে, চোখের কোণে জল টলমল করছে। সে প্রাণপণে নিজের কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পারল না।
নির্জন হঠাৎ পরম আদরে নুসরাতকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। নির্জনের চওড়া বুকে মাথা রাখা মাত্রই নুসরাত ডুকরে কেঁদে উঠল। মনে হলো, এই মেয়েটা যেন এতদিন এই একটা নিরাপদ আশ্রয়স্থলের জন্যই অপেক্ষা করছিল। অনেকটা সময় এভাবেই নিস্তব্ধতায় কাটল। নির্জন নিজের চোখের কোণ মুছে নিয়ে ডাকল,
“চশমাওয়ালি ম্যাডাম?”
নুসরাত ধরা গলায় অস্ফুট স্বরে বলল,
“উমম?”
“আমার ওপর খুব অভিমান হয়েছিল, তাই না?”
“হুম, ভীষণ! এতটা পাষাণ কী করে হতে পারেন আপনি? আমার সেই বিপদের দিনগুলোতে আপনাকে পাশে পাইনি কেন?” নুসরাতের কণ্ঠে একরাশ অভিযোগ।
নির্জন এবার নুসরাতকে ছেড়ে সোজা করে নিজের সামনে বসাল। তার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “সবসময় কি কাছাকাছি থাকলেই পাশে থাকা হয়? আমি তো তোমার পাশেই ছিলাম নুসরাত, তবে তোমার চাক্ষুষ অগোচরে।”
নুসরাত অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
“কিন্তু কেন? আপনি কি পারতেন না আমাকে আজকের মতো ভরসা দিতে?”
নির্জন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।নুসরাতের দুই গালে নিজের হাত রেখে বলল,
“আমি মনে মনে ওয়াদা করেছিলাম আমার চশমাওয়ালি ম্যাডামকে কেবল আমার স্ত্রীরূপেই দেখব। তোমার ওই যন্ত্রণার মুহূর্তে যদি তোমাকে দেখে আমার অন্তরের কোনো এক কোণেও এক সেকেন্ডের জন্য তোমাকে কুৎসিত মনে হতো, তবে আমি নিজেকে অনন্তকাল ক্ষমা করতে পারতাম না।”
নুসরাত স্তব্ধ হয়ে গেল। ধরা গলায় বলল,
“আপনার কি নিজের ওপর ভরসা ছিল না?”
নির্জন হাসল, তবে সেই হাসিতে বিষাদ ছিল।
“হুম, নিজের ওপর ভরসা ছিল, কিন্তু আমার ‘নফসের’ ওপর ভরসা ছিল না। আমি চেয়েছিলাম আমার হৃদয়ে তোমার সৌন্দর্য যেন সারাজীবন অমলিন থাকে।”
নুসরাত অপলক দৃষ্টিতে নির্জনের দিকে তাকিয়ে রইল। একটা মানুষ এতটা অমায়িক, এতটা গভীর চিন্তার অধিকারী হয় কী করে! নুসরাত পরম শ্রদ্ধায় বলল, “আমার দেখা শ্রেষ্ঠ পুরুষ আপনি,আমার স্বামী।”
নির্জন নুসরাতের কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, “
আর আমার দেখা সবচেয়ে মায়াবতী আর সুন্দরী নারী হলে তুমি আমার চশমাওয়ালি ম্যাডাম,আমার স্ত্রী।”
সেই ললাট চুম্বনের মধ্য দিয়েই শুরু হলো তাদের অনন্তকালের এক নতুন যাত্রা। সমস্ত ক্ষত আর দাগ যেন ভালোবাসার স্পর্শে মিলিয়ে গেল।
★★★
সারাদিনের ধকলের কারণে তৃণা আজ একটু তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়েছে। তৃণার ঘুমের অভ্যাস খুব শান্ত, সে ঘুমানোর পর খুব একটা নড়াচড়া করে না। একই বিছানায় আরিয়ানের সাথে ঘুমানোর অস্বস্তি থেকে বাঁচতে সে সাধারণত কম্বল মুড়ি দিয়েই ঘুমায়। কিন্তু আজ আবহাওয়াটা তুলনামূলক গরম, তাই কম্বল গায়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তৃণা নিজের শাড়িটা বেশ ভালোভাবেই শরীরের সাথে পেঁচিয়ে নিয়ে শুয়েছে।
নিঝুম রাত। আরিয়ান এক হাত মাথার নিচে রেখে অপলক দৃষ্টিতে তৃণার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কী অসম্ভব মায়াবী লাগছে মেয়েটাকে! ঠিক যেন কোনো ছোট বাচ্চা গভীর শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। তৃণার এই নিষ্পাপ ভঙ্গি দেখে আরিয়ানের বারবার হাসি পাচ্ছে। আরিয়ানের চোখে আজ ঘুম নেই, হৃদয়ে এক অদ্ভুত চঞ্চলতা। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোসের সুরে বিড়বিড় করে বলল,
“বউ গো, একবার তো ঘুমের ঘোরেও ভুল করে আমার শরীরে হাত-পা ছুড়ে মারতে পারো। তাতে কি আমি খুব রাগ করব নাকি!”
তৃণার কপালে আর গালে কিছু অবাধ্য কাজল কালো চুল ছড়িয়ে আছে। আরিয়ান আর থাকতে না পেরে আলতো হাতে সেই চুলগুলো সরিয়ে দিতে গেল। এক পর্যায়ে সে তৃণার কপালে গভীর অনুরাগে একটা চুমু খেতে চাইল। কিন্তু আরিয়ান তৃণার ওতটা কাছাকাছি হওয়া মাত্রই তৃণা ট্যাপট্যাপ করে চোখ খুলে ফেলল।তৃণার ঘুম বরাবরের মতোই খুব পাতলা।সামান্য শব্দ বা স্পর্শেও ঘুম ভেঙে যায়।
তৃণাকে হঠাৎ সজাগ হতে দেখে আরিয়ান মুহূর্তের জন্য ঘাবড়ে গেল, হার্টবিট যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। তবে সে নিজেকে সরাল না। আরিয়ানের মুখ তখন ঠিক তৃণার মুখের খুব কাছে। তৃণা ভয়ার্ত এবং কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“আপনি এখানে কী করছেন? সরুন!”
তৃণার কথা শুনে আরিয়ান মৃদু হাসল। তৃণা কিছুতেই আরিয়ানের মতিগতি বুঝতে পারছে না এই লোকটা কি সত্যিই তাকে ঘৃণা করে, নাকি সবটাই অভিনয়?
আরিয়ান নিজেও এক দোটানায় পড়ে গেল। এখন যদি সে ঝট করে তৃণা থেকে দূরে সরে যায়, তবে স্পষ্ট প্রমাণ হয়ে যাবে যে সে ইচ্ছে করেই তৃণার কাছে এসেছিল। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য আরিয়ানের মাথায় হুট করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে নিজের মুখে চরম গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে অদ্ভুত এক চাউনিতে তৃণার দিকে তাকিয়ে বলল,
”কে তুমি? আমার বিছানায় কী করছো?”
তৃণার মুখ অবাক হয়ে হাঁ হয়ে গেল। সে বিস্ময়ভরা স্বরে বলল,
“আমাকে চিনেন না?”
আরিয়ান নিজের ভেতরে দলা পাকিয়ে আসা চাপা হাসিটা অতি কষ্টে চেপে রেখে বলল,
“না। আমার বিছানায় তোমার কী কাজ?”
তৃণা নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। কী বলছে এই লোকটা? আরিয়ান এবার আরও এক কাঠি বাড়িয়ে বলল,
“একটা অপরিচিত ছেলের রুমে একা এভাবে চলে আসলে তোমার লজ্জা করল না? আজকাল ছেলেরা কোথাও নিরাপদ না।”
তৃণা অবাকের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে।হঠাৎ করে মানুষের স্মৃতি শক্তি কি করে চলে পারে,
“আপনার কি মাথায় সমস্যা হচ্ছে? এভাবে উল্টোপাল্টা কথা বলছেন কেন?”
আরিয়ান মনে মনে হাসল। পরিকল্পনা সফল হচ্ছে দেখে সে এবার একই ভাবে তৃণার ওপর ঝুঁকে থাকা অবস্থায় বিছানায় জোরে জোরে কয়েকটা আঘাত করল নিজের হাত দিয়ে। এমন একটা ভাব করল যেন সে প্রচণ্ড উত্তেজিত আর তার মাথায় সত্যিই কোনো বড় সমস্যা হচ্ছে। আরিয়ানের এই বুদ্ধি হাতেনাতে কাজে লাগল, তৃণার চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। তৃণা আবারও আরিয়ানকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“সরুন! আমি আপনাকে ঔষধ এনে দিচ্ছি।”
আরিয়ান চিৎকার করার ঢঙে বলল,
“কিসের ঔষধ? আমার কোনো ঔষধ লাগবে না!”
তৃণা কিছুতেই মেলাতে পারছে না। সাধারণত প্রত্যেকবার আরিয়ানের মাথায় সমস্যা হলে সে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করে অথবা রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে তৃণার ওপর হাত তোলে। কিন্তু আজকের এই পাগলামির ধরনটা এমন অন্যরকম কেন? হঠাৎ আরিয়ান তৃণার ঘাড় আর চুলের গভীরে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তৃণার নিশ্বাস যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। এই প্রথম সজ্ঞানে সে আরিয়ানের এত নিবিড় আর উষ্ণ স্পর্শ টের পাচ্ছে।তৃণা চোখ কিচিয়ে বন্ধ করে নিল। শ্বাসরুদ্ধকরের মতো অবস্থা হয়ে গেছে তৃণার।
আরিয়ান মনে মনে মুচকি হাসল। মনে মনে পণ করল, এখন থেকে এই বুদ্ধিটাই কাজে লাগাতে হবে। তাতে অন্তত এই জেদি মেয়েটার কিছুটা কাছে আসা যাবে। তৃণা অস্বস্তিতে আরিয়ানকে ঠেলে দূরে সরাতে চাইলে আরিয়ান তাকে আরও জোরেশোরে চেপে ধরল। আরিয়ান এবার গম্ভীর স্বরে ধমক দেওয়ার মতো করে বলল,
“হুহ! একদম নড়বে না। নড়লে একদম মেরে ফেলব!”
তৃণা ভয়ে একটা শুকনো ঢোক গিলল। লোকটা যে এখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য, তা সে পুরোপুরি বিশ্বাস করে নিয়েছে। আরিয়ানের অবাধ্য আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর কোনো পথ না পেয়ে, তৃণা পাথরের মূর্তির মতো একদম সোজা হয়ে শুয়ে রইল। ঘরময় শুধু তপ্ত নিশ্বাসের শব্দ।
হঠাৎ তৃণার মনের ভেতরের জমাট বাঁধা অভিমানগুলো গলে এক অদ্ভুত মায়ার সৃষ্টি হলো। সে নিজের একটি হাত আরিয়ানের পিঠে রাখল, আর অন্য হাতটি অতি সন্তর্পণে আরিয়ানের চুলে ডুবিয়ে দিল। পরম আবেশে সে আরিয়ানকে নিজের হৃদস্পন্দনের কাছে টেনে নিল।
আরিয়ান তৃণার এই অভাবনীয় কাণ্ডে ভীষণ অবাক হলো, বুকের ভেতরটা ওর তোলপাড় করে উঠল। নিজের অভিনয় বজায় রাখতে আরিয়ান এবার গভীর ঘুমের ভান করল। সে ছন্দময় জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগল যাতে তৃণা মনে করে লোকটা সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে।
আরিয়ানের সেই নিশ্বাসের শব্দ শুনে তৃণা নিশ্চিত হলো যে সে ঘুমিয়ে গেছে। তৃণা এবার আরিয়ানের কপালে আলতো করে নিজের আঙুল ছোঁয়াল। অস্ফুট স্বরে আপন মনেই বলে উঠল,
“রাগী সাহেব! আপনার সেই মায়াবতী কন্যা নিঃসন্দেহে ভাগ্যবতী। দেখুন না, আমি আপনার কেবল নামমাত্র স্ত্রী। এখন আপনি নিজের মাঝে নেই বলেই হয়তো আমার এত কাছে। মানুষ কতটা অভাগী হলে নিজের স্বামীকেও আপন করার অধিকার পায় না! জানেন, মেয়েদের মন বড় অবুঝ আর নির্লজ্জ। আপনি আমার নন জেনেও, আপনাকে ঘৃণা করতে চেয়ে বারবার আপনার এই কঠিন রূপেরই প্রেমে পড়েছি। আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি মিস্টার আরিয়ান।”
তৃণার কথাগুলো তীরের মতো আরিয়ানের হৃদয়ে বিঁধল। সে আর চুপ থাকতে পারল না। ঘোরের মাঝেই আরিয়ান হঠাৎ গম্ভীর অথচ অত্যন্ত আর্দ্র কণ্ঠে বলে উঠল,
“তবে থেকে যাও না আজীবন আমার পাশে, আমার সত্যিকারের সহধর্মিণী হয়ে। তোমায় অনেক ভালোবাসবো… আমি ভালোবাসি তোমায়, আমার শ্যামলিনী।”
তৃণা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর ম্লান কিন্তু মধুর এক চিলতে হাসল। সে ভাবল আরিয়ান হয়তো ঘুমের ঘোরে বা অসুস্থতার ঘোরেই কথাগুলো বলছে। তৃণা অনুচ্চ স্বরে বলল,
“যাক, আপনার এই অসুস্থতার খাতিরে হলেও যে আপনার মুখ থেকে ‘ভালোবাসি’ শব্দটা শুনতে পেলাম, এটাই আমার পরম সৌভাগ্য। আপনার এই মায়া মাখানো মিথ্যাটুকুই না হয় আমার সারাজীবনের পুঁজি হয়ে থাক।”
আরিয়ান তৃণার বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে মৃদু হাসল। তবে সেই হাসির আড়ালে থাকা গভীর তৃপ্তি তৃণার চোখে ধরা পড়ল না। তৃণা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারল না যে, আরিয়ান যা বলেছে তা সম্পূর্ণ সজ্ঞানে এবং হৃদয়ের অন্তস্থল থেকেই বলেছে। রাতের সেই নিভৃত অন্ধকারে, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর তপ্ত নিশ্বাসের ভিড়ে এক অসমাপ্ত প্রেমের গল্প যেন নতুন করে প্রাণ পেল।
★★★
রাতের গভীর অন্ধকারে বেলকনিতে একা দাঁড়িয়ে আছেন এনামুল মির্জা। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। সব বাবার কাছে সম্ভবত সবচেয়ে কষ্টের সময় এটিই নিজের কলিজার টুকরোকে তিল তিল করে বড় করে একদিন অন্যের ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া। এনামুল মির্জার চোখের সামনে ভেসে উঠছে ছোট্ট নুসরাতের মুখটি, ওই তো সেদিনও মেয়েটা কতটুকু ছিল! অথচ আজ সে অন্য বাড়ির ঘরণী, কারো স্ত্রী।
স্মৃতির পাতায় ডুব দিতেই এনামুল মির্জার গাল বেয়ে দুফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি তাঁর জীবনে মেয়ের কোনো ইচ্ছেই কখনো অপূর্ণ রাখেননি। কিন্তু মাত্র একবার, একটি বিশেষ আবদার তিনি রাখতে পারেননি। আর সেই দিনের পর থেকে নুসরাত আর কখনো তার বাবা-মায়ের কাছে কোনো আবদার করেনি। শুধু বাবা-মা নয়, পৃথিবীর কারো কাছেই সে আর কিছু চায়নি। সেই নীরব অভিমানটা আজও এনামুল মির্জাকে কুরে কুরে খায়।
তখনি নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়ালেন স্ত্রী ফারহানা বেগম। মেয়ের শূন্যতা তাকেও খুব ভাবিয়ে তুলছে। স্ত্রীকে দেখেই এনামুল মির্জা দ্রুত চোখের জল মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেন। আকাশের একরাশ তারার দিকে তাকিয়ে তিনি ধীর স্বরে ডাকলেন,
“ফারহানা!”
ফারহানা বেগম স্বামীর দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন, “উমম?”
এনামুল মির্জা এক বুক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
“আমার মেয়েটা কি এখনো আমাদের ওপর অভিমান করে আছে?”
ফারহানা বেগম কিছুটা অবাক হয়ে স্বামীর দিকে তাকালেন। ম্লান কণ্ঠে বললেন,
“তুমি সেসব কথা এখনো ভুলতে পারোনি?”
“কী করে ভুলি বলো? একটামাত্র মেয়ে, অথচ সেদিন তার আবদারটা রাখতে পারিনি। যদিও সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার কোনো অনুশোচনা নেই, কিন্তু কষ্টটা অন্য জায়গায়। মেয়েটা যে সেই থেকে আর কোনোদিন আমার কাছে কিছু চায়নি! আগের মতো কক্ষনো বলেনি আব্বু, আমার জন্য এটা এনো, ওটা এনো। আজ বুকটা কেমন জানি ব্যথায় টনটন করছে।”
ফারহানা বেগম স্বামীর হাতে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,
“সব ভুলে যাও। নুসরাত এখন অন্য বাড়ির বউ। ও বড় হয়েছে, সব বোঝে। পুরনো কথা ভেবে এখন আর কষ্ট পেয়ো না।”
এনামুল মির্জা আর কোনো কথা বললেন না। কেবল আকাশের বিশালতার দিকে তাকিয়ে আবারও এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
চলবে…
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৯
-
রোদ্দুরের ছেড়া মানচিত্র পর্ব ৩৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪১ (স্পেশাল)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৭