রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
পর্ব_৩৮
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
বহু প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে আজ। দুটি আত্মা এক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে। আজ নির্জন ইমতিয়াজ এবং নুসরাত মির্জার বিয়ে। পুরো মির্জা বাড়ি যেন এক স্বপ্নপুরী। চারদিকে বাহারি ফুলের ঘ্রাণ আর রঙিন আলোকসজ্জা। ক্যাটারিং থেকে শুরু করে ডেকোরেশন সবই পেশাদাররা সামলাচ্ছে, তাই বাড়ির মানুষজন শুধু তদারকিতেই ব্যস্ত।
নুসরাতকে তার নিজের রুমেই সাজিয়ে বসানো হয়েছে। পরনে টকটকে লাল বেনারসি আর হাতে মেহেদির গাঢ় রঙ। আয়নায় নিজেকে দেখলেই নুসরাতের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছে। তার একদিকের গালের সেই পোড়া দাগটা ঢাকতে আজ অনেক মেকআপ ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু তার মনের ভেতরের ক্ষতটা তো আর মেকআপে ঢাকা পড়ে না। সে শুধু ভাবছে, নির্জন কেন তাকে পছন্দ করল? যার রূপ নষ্ট হয়ে গেছে, তার সাথে নির্জনের মতো সুদর্শন এক যুবকের জীবন কি মানায়?
নুসরাতকে এমন ম্লান মুখে বসে থাকতে দেখে মিতু তার কাঁধে হাত রাখল। নরম স্বরে বলল,
“কী হয়েছে নুসরাত? এভাবে মনমরা হয়ে আছো কেন? আজ তো তোমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন হওয়ার কথা।”
নুসরাত আয়নার দিকে তাকিয়েই ম্লান হেসে বলল,
“আচ্ছা ভাবি, তোমার কী মনে হয়? নির্জন কি আমায় বিয়ে করে পরবর্তীতে আফসোস করবে না? লোকে যখন ওর পাশে আমাকে দেখবে, তখন কি ওর লজ্জা লাগবে না?”
মিতু নুসরাতের থুতনি ধরে নিজের দিকে ফেরাল। একটু কড়া গলায় মমতার সাথে বলল,
“নির্জন অনেক পরিণত আর বোঝদার একটা ছেলে। যদি ওর মনে রূপ নিয়ে কোনো দ্বিধা থাকত, তবে সে এই বিয়ের পিঁড়িতে বসার সিদ্ধান্তই নিত না। আমি ওর সাথে কথা বলেছি, ও তোমায় ঠিক যেমন আছো, তেমনভাবেই ভালোবাসে। অযথা এসব ভেবে নিজের শুভক্ষণটা নষ্ট করো না তো!”
নুসরাত আর কোনো কথা বলল না।
★★★
ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে তৃণা তাড়াহুড়ো করে রেডি হচ্ছে। তৃণা পরেছে সেই গোল্ডেন কালারের সিল্কের শাড়িটা, যেটা নিয়ে কাল এত কাণ্ড হলো। সিল্কের শাড়ির কুঁচি ঠিক করা তৃণার কাছে সবসময়ই একটা বড় পাহাড় সমান প্যারা। তাই মিতু অনেক যত্ন করে কুঁচিগুলো গুছিয়ে শাড়িটা পরিয়ে দিয়েছেন।
তৃণা বরাবরই সাদামাটা সাজ পছন্দ করে। কখনোই সে গর্জিয়াস মেকআপ করে না। চুলগুলো আজ হালকা করে ছাড়া। ঠোঁটে আলতো করে ছোঁয়া দিয়েছে হালকা লিপস্টিক, চোখের পাতায় হালকা আইশ্যাডো আর মুখে কেবল সামান্য সানস্ক্রিন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার পরখ করে নিল সে। তৃণার মনে মনে এক ধরণের খচখচানি হচ্ছে এই শ্যামলা বরণে গোল্ডেন সিল্কের শাড়িটা কি ঠিক মানাচ্ছে? নাকি বড্ড বেমানান লাগছে?
আসলে তৃণা খুব বেশি শ্যামলা না, তবে গায়ের রঙটা ঠিক দুধে-আলতাও নয়। সুন্দরের যে প্রথাগত সংজ্ঞা, তার চেয়ে হয়তো কিছুটা কম আর এই স্নিগ্ধ মায়াবী রঙটাকেই মানুষ ‘শ্যামলা’ বলে আখ্যায়িত করে। আয়না থেকে চোখ না সরিয়েই তৃণা একটা কাজল হাতে তুলে নিল। চোখের নিচে খুব যত্ন করে হালকা এক টানে কাজল পরল সে।
কাজল দেওয়া শেষ করে ড্রেসিংটেবিল থেকে পেছন ফিরতেই দেখল আরিয়ান রুমে ঢুকছে। নিজের ঘড়িটা ঠিক করতে সে এতটাই মগ্ন যে এখনো তৃণার দিকে নজর দেয়নি। আরিয়ানের পরনে আজ শুভ্র রঙের পাঞ্জাবি। এমনিতে আরিয়ানকে দেখলে তৃণা বারবার দুর্বল হয়ে পড়ে, আর আজ পাঞ্জাবিতে তাকে এতটাই হ্যান্ডসাম লাগছে যে তৃণার হার্টবিট যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল।
তৃণা যথাসম্ভব নিজের চোখ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই লোকটার সামনে এলেই ওর বুকের ভেতরটা কেন জানি ওলটপালট হয়ে যায়। হয়তো এটাই ভালোবাসা! কিন্তু তৃণা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিল। এই ভালোবাসা যে কখনো প্রকাশ করার নয়, তা সে ভালো করেই জানে।
ঘড়িটা ঠিক করতে করতে আরিয়ান এসে একদম তৃণার সামনে থামল।
আরিয়ান নিজের ঘড়িটা শেষবারের মতো ঠিক করতে করতে চোখ তুলে তৃণার দিকে তাকাল। ঠোঁটের আগায় তার কোনো একটা জরুরি কথা ছিল, হয়তো বলতে চেয়েছিল
“শুনো তৃণা….
কিন্তু কথাটা বলতে পারলো না। যেন ওর কণ্ঠনালীতেই পাথর হয়ে আটকে গেল। স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। আরিয়ান কোনো নড়াচড়া ছাড়াই শুধু থ মেরে তৃণার ওই কাজল কালো গভীর দুটো চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। গোল্ডেন সিল্কের শাড়িতে মোড়ানো তৃণা যেন অন্ধকার অমাবস্যার রাতে হঠাৎ ফুটে ওঠা এক চিলতে চাঁদের আলো। তৃণা নিজেও আরিয়ানের গভীর চোখের সেই তীব্র চাউনিতে সম্মোহিত হয়ে গেল, নড়বার শক্তি হারাল সে। দুজোড়া চোখের এই মৌন যুদ্ধটা যেন মহাকালের এক রোমান্টিক মহাকাব্য তৈরি করছিল।
আরিয়ান অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতেই নিজের ঘাড়টা একটু বাঁকা করল। ওর ভেতরের অস্থিরতা বাড়ছিল। ঠোঁট নেড়ে বিরবির করে অস্ফুট স্বরে বলল,
“সর্বনাশ…”
তৃণা আরিয়ানের সেই ফিসফিসানিটা স্পষ্ট শুনতে পেল না। সে কিছুটা ঘোরের মধ্যে থেকেই জিজ্ঞেস করল,
“কী বলছিলেন?”
তৃণার গলার স্বর আরিয়ানের কানে পৌঁছাতেই সে যেন হঠাৎ এক ধাক্কায় ঘোর থেকে বাস্তব জগতে ফিরে এল। তৃণার সেই শ্যামল বরণ মায়াবী মুখটা থেকে চোখ সরিয়ে নেওয়া যেন আরিয়ানের কাছে এখন পৃথিবীর কঠিনতম কাজ। আরিয়ানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে, হার্টবিট এতটাই দ্রুত যে তার স্যুট-কোটের আড়ালে বুকটা ধুকপুক করছে। সে তোতলাতে তোতলাতে নিজেকে সামলাতে গিয়ে বলল,
“না, মা… মানে আসলে… ব… বলছিলাম যে…”
তৃণা নিজের সরু ভ্রু জোড়া কুঁচকে ফেলল। বলল,
“কী সব মানে মানে করছেন? একটা কথা গুছিয়ে বলতে পারছেন না কেন?”
আরিয়ান এবার নিজেকে শান্ত করতে একটা লম্বা শ্বাস নিল। তৃণার চোখের একদম গভীরে সরাসরি দৃষ্টি ডুবিয়ে দিয়ে গভীর মমতায় বলল,
“কাজল মুছে ফেলো শ্যামলিনী, তোমার এই চোখের অতল গভীরে যে আমি বড্ড বেশি হারিয়ে যাচ্ছি!”
আরিয়ানের মুখে এমন আচমকা আর সরাসরি স্বীকারোক্তি শুনে তৃণা যেন পাথরের মূর্তির মতো থমকে গেল। ওর সারা শরীর দিয়ে একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল। আরিয়ান নিজের চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য বন্ধ করে বড় করে একটা শ্বাস নিল, যেন নিজের হৃদপিণ্ডকে শান্ত করার শেষ চেষ্টা করল। তারপর আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে দ্রুত পেছন ফিরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
যাওয়ার সময় আরিয়ানের উদাত্ত কণ্ঠের গান করিডোর কাঁপিয়ে উচ্চস্বরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল,
“নেশা লাগিল রে
বাঁকা দুই নয়নে নেশা লাগিল রে…
হাসন রাজা পেয়ারির প্রেমে মজিল রে
হাসন রাজা পেয়ারির প্রেমে মজিলো রে
নেশা লাগিল রে
বাঁকা দু নয়নে নেশা লাগিল রে…”
তৃণা অবাক হয়ে দাড়িয়ে রইল। কানের কাছে তখনো আরিয়ানের সেই গভীর কণ্ঠস্বর বাজছে। পরক্ষণেই তৃণার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে লাজুক এবং তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। রাগী লোকটার নেশা যে তবে তার চোখেই লেগেছে!
★★★
নুসরাতের ঘরে এখন পিনপতন নীরবতা, শুধু কাজি সাহেবের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। বিয়ে জিনিসটা প্রতিটি মানুষের জীবনেই এক অভূতপূর্ব অনুভূতি নিয়ে আসে কারও জন্য তা আনন্দের জোয়ার, আবার কারও জন্য অজানা আশঙ্কার নাম। কাজি সাহেবের পাশে সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন বাড়ির মুরুব্বিরা, আর ঠিক তাঁদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ান, পাশে আদনান আর রোহান।
নুসরাত মাথা নিচু করে বসা। তার পরনে লাল বেনারসি আর ভারী গয়না থাকলেও তার মনের ভার যেন তার চেয়েও বেশি। নুসরাতের কানে চারপাশের কোনো কথাই ঠিকমতো ঢুকছে না। তার অবচেতন মন বারবার একটা কথাতেই আটকে যাচ্ছে নির্জন কি সত্যি তাকে মন থেকে মেনে নেবে? যখন সব মেকআপ ধুয়ে যাবে আর তার পোড়া দাগটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে, তখন নির্জনের ভালোবাসার রঙ কি ফিকে হয়ে যাবে না তো?
কাজি সাহেব খাতা খুলে চশমাটা নাকে এঁটে নিয়ে বললেন,
“আমি সাক্ষীদের উপস্থিতিতে আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, আপনি কি আপনার পিতা এনামুল মির্জার একমাত্র কন্যা নুসরাত মির্জা, মোহর ধার্য দশ লাখ টাকা নির্ধারণ করে, মোজাম্মেল ইমতিয়াজের একমাত্র পুত্র নির্জন ইমতিয়াজকে শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহ করতে কবুল করছেন? যদি আপনি এই বিয়েতে রাজি থাকেন তবে বলুন আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।”
কাজি সাহেবের কথা শেষ হওয়ার পর নুসরাত দীর্ঘক্ষণ পাথরের মতো নিথর হয়ে বসে রইল। চারপাশ থেকে ফিসফাস শুরু হলো। মিতু আর তৃণা পাশ থেকে তাকে তাগাদা দিচ্ছে, “বলো নুসরাত, কবুল বলো!”
নুসরাত এবার ধীরে ধীরে তার ঝাপসা হয়ে আসা চোখ দুটো তুলে তাকাল। সামনেই তার ভাইয়েরা দাঁড়িয়ে। তার চোখ গিয়ে স্থির হলো আরিয়ানের ওপর। আরিয়ানের দিকে চোখ যেতেই নুসরাতের বুকের ভেতর কেমন যেন এক হাহাকার বয়ে গেল।
নুসরাত এক গভীর শ্বাস নিয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল। তারপর কাঁপা অথচ স্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করল,
“আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।”
সাথে সাথে ঘরের সবাই সমস্বরে বলে উঠল, “আলহামদুলিল্লাহ!” আনন্দের একটা হিল্লোল বয়ে গেল পুরো ঘরে। নুসরাতের দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দুই ফোঁটা আনন্দাশ্রু। সে আজ থেকে নির্জনের অর্ধাঙ্গিনী।
বিয়ের জমকালো স্টেজে বসে আছে নির্জন। পরনে অফ-হোয়াইট শেরওয়ানি আর মাথায় রাজকীয় পাগড়ি। তার আশেপাশে বন্ধুদের অফুরন্ত আড্ডা আর রসিকতা চললেও নির্জনের মন পড়ে আছে অন্তঃপুরে। একটু আগেই খবর এসেছে, নুসরাত কবুল বলেছে। খবরটা পাওয়ামাত্রই নির্জনের বুকের ধুকপুকানি দ্বিগুণ বেড়ে গেল। তার দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর আজ শেষ। তার সেই জেদী, অভিমানী চশমাওয়ালি ম্যাডাম আজ থেকে সত্যিই তার চিরচেনা ঘরওয়ালি হতে চলেছে।
নির্জনের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটা কোনোভাবেই মুছছে না। ওর এক বন্ধু কাঁধে ধাক্কা দিয়ে রসিকতা করে বলল,
“কী রে ভাই! ছোট বাচ্চাদের মতো এমন গালভরা হাসি দিচ্ছিস কেন? খুশিতে তো তোর দফারফা অবস্থা!”
নির্জন বন্ধুর কথায় কোনো উত্তর দিল না, বরং তার হাসিটা আরও একটু চওড়া হলো। ঠিক তখনই কাজি সাহেব দলবল নিয়ে স্টেজে এসে উপস্থিত হলেন নির্জনের সই নেওয়ার জন্য। চারপাশ হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। কাজি সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“আমি সাক্ষীদের উপস্থিতিতে আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, আপনি মোজাম্মেল ইমতিয়াজের একমাত্র পুত্র নির্জন ইমতিয়াজ, মোহর ধার্য দশ লাখ টাকা নির্ধারণ করে, এনামুল মির্জার একমাত্র কন্যা নুসরাত মির্জাকে শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহ করতে কবুল করছেন? যদি রাজি থাকেন তবে বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
কাজি সাহেবের কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই নির্জনের চোখের সামনে নুসরাতের পুরো প্রতিচ্ছবিটা ভেসে উঠল। সেই প্রথম দেখা সহজ-সরল মুখখানা, চশমার আড়ালে লুকানো বুদ্ধিমতী চোখজোড়া, আর হাসপাতালের সেই কঠিন দিনগুলোর ছটফটানি। নুসরাতের ওই পোড়া দাগটা নির্জনের কাছে কোনো অভিশাপ নয়, বরং ওর যোদ্ধার প্রতীক। ভালোবাসার পূর্ণতা পাওয়ার এই পরম মুহূর্তে নির্জনের দুচোখ বেয়ে অজান্তেই নোনা জল গড়িয়ে পড়ল।
সে কাঁপা অথচ অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করল, “আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।কবুল আমার চশমাওয়ালি ম্যাডামকে!”
পুরো মজলিস সমস্বরে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে উঠল। কিন্তু উপস্থিত অনেক মেহমানই অবাক হয়ে নির্জনের চোখের জলের দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ আড়ালে ফিসফিস করে বলল, “ছেলেটা কাঁদছে কেন? বিয়েতে রাজি ছিল না নাকি?”
কেউ বুঝল না, এই কান্না কোনো কষ্টের নয়। এই কান্না হলো না-পাওয়া থেকে পাওয়ার পরম তৃপ্তির, এই কান্না হলো দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এক আকাশ পূর্ণতার।
বিয়ের আনন্দ আর উৎসবের রেশ কাটিয়ে এবার নেমে এল সেই চিরন্তন বিদায়ের সুর। মেয়েদের জীবনের সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত এটি। যেখানে একটা মেয়ে তার জন্মের পর থেকে শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের প্রতিটি স্মৃতি বুনেছে, যে আঙিনায় বাবা-মায়ের স্নেহে ডানা মেলে বড় হয়েছে, আজ সেখান থেকেই চিরতরে বিদায় নিয়ে পাড়ি জমাতে হবে এক নতুন ঠিকানায়।
নুসরাতের হাত যখন নির্জনের হাতে তুলে দেওয়া হলো, তখন যেন পুরো বাড়ির আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠল। এতক্ষণ যে বাড়িতে সানাইয়ের সুরে আনন্দের জোয়ার বইছিল, এখন সেখানে কেবল কান্নার সুর। নুসরাতের মা মেয়ের গলা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন নুসরাতও বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদছে। বাড়ির বড় মেয়েকে বিদায় দেওয়ার এই দৃশ্য দেখে মিতু, তৃণা,নৌশি এমনকি আদনানের মতো চঞ্চল ছেলের চোখেও জল টলমল করছে।
এনামুল মির্জা আজ বড্ড অসহায় হয়ে পড়েছেন। তিনি কাঁপাকাঁপা হাতে নির্জনের দুটি হাত শক্ত করে ধরলেন। অশ্রুসজল চোখে বললেন,
“বাবা নির্জন, আমার মেয়েটাকে কখনো কষ্ট দিও না। ও আমাদের খুব আদরের, বড্ড মায়ার মেয়ে। ওর কোনো ভুল হলে তুমি শুধরে নিও, কিন্তু কখনো ওর মন ভাঙতে দিও না।”
নির্জন তার শ্বশুরের কথায় পরম শ্রদ্ধায় মাথা নিচু করল। তারপর তাঁর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে দৃঢ়তার সাথে বলল,
“বাবা, আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন। আমি কথা দিচ্ছি, যতদিন এই নির্জন ইমতিয়াজের শরীরে এক ফোঁটা রক্ত বইবে, ততদিন নুসরাতকে আমি কোনো দুঃখ স্পর্শ করতে দিব না। আজ থেকে আপনার আমানত আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী সম্পদ।”
নির্জন নুসরাতের কাঁধে আলতো করে হাত রাখল, নিঃশব্দে তাকে অভয় দিচ্ছে। নুসরাত শেষবারের মতো তার প্রিয় বাড়িটির দিকে তাকাল। যে বাড়িতে সে বড় হয়েছে, আজ সেই বাড়ি থেকে সে এক নতুন পরিচয়ে, এক নতুন জীবনের পথে পা বাড়ালল।
নুসরাতকে বিদায় দেওয়ার পর পুরো মির্জা বাড়ি যেন হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গেল। সন্ধ্যার ম্লান আলোয় সবার মনই কিছুটা ভারাক্রান্ত। সারাদিনের ধকল আর ইমোশনাল প্রেসারের পর আরিয়ান নিজের রুমে প্রবেশ করল। রুমে ঢুকতেই তার কানে এল তৃণার ফোনের রিংটোন। ফোনটা একনাগাড়ে বেজে যাচ্ছে।
আরিয়ান ফোনটা হাতে নিতেই কলটা কেটে গেল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল ছয়টি মিসড কল! মুহূর্তেই আবারও কল এল। আরিয়ান এবার দ্বিধা না করে কলটা রিসিভ করে কানে ধরল। ওপাশ থেকে এক যুবকের কণ্ঠস্বর ভেসে এল
“হ্যালো তৃণা…”
আরিয়ান কোনো কথা বলল না। ওপাশ থেকে তৌহিদ অস্থির হয়ে আবারও বলতে শুরু করল,
“তৃণা, প্লিজ কথা বলো। তোমাকে ছাড়া আমি একদম ভালো নেই। তুমি এতটা স্বার্থপর কী করে হতে পারো? মানলাম তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনি, কিন্তু আমি তো তোমাকে ভালোবেসেছি। আমি তোমার আর আরিয়ানের বিষয়ে খোঁজ নিয়েছি, তোমাদের মাঝে কোনো ভালো সম্পর্ক নেই। ট্রাস্ট মি তৃণা, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।”
ঠিক সেই মুহূর্তে তৃণা রুমে ঢুকে আরিয়ানের হাত থেকে ছোঁ মেরে মোবাইলটা কেড়ে নিল। তৃণার পুরনো ফোনের স্পিকারের সমস্যার কারণে কথা লাউডস্পিকার ছাড়া শোনা যায় না, তাই তৃণা সবটাই শুনতে পেয়েছে। তৃণা চরম বিরক্তিতে ফোনটা কানে ধরে চিৎকার করে উঠল,
“এত ছেঁচড়া কেন আপনি? একটা বিবাহিত মেয়েকে কল দিয়ে ভালোবাসার কথা বলতে লজ্জা করে না আপনার?”
ওপাশ থেকে তৌহিদের কোনো উত্তর এল না। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে তৌহিদ বলল,
“লজ্জা? হুম, ঠিক বলেছো। ভালোবাসা বোধহয় মানুষকে লজ্জাহীন বানিয়ে দেয়। আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করব। তোমার ফিরে আসার পথ চেয়ে থাকব আমি।”
বলেই তৌহিদ কলটা কেটে দিল। আরিয়ান এতক্ষণ শান্ত হয়ে সব শুনছিল। তৃণার তৌহিদকে দেওয়া কড়া জবাব শুনে তার মনে এক গোপন তৃপ্তি হলো। সে মুচকি হেসে আলগাভাবে বলল,
“ছেলেটা তো তোমাকে অনেক ভালোবাসে, ফিরিয়ে দিলে কেন?”
তৃণা ড্রসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হাতের চুড়ি খুলতে খুলতে আড়চোখে আরিয়ানের দিকে তাকাল। বলল,
“কেন? এখন কি আপনি আমাকে পরকীয়া শুরু করতে বলছেন?”
আরিয়ান একটু মজা নেওয়ার ছলে বলল,
“না না, তা বলব কেন! তবে পরকীয়া তো আজকাল খুব সহজ বিষয় হয়ে গেছে।”
তৃণা এবার ঘুরে দাঁড়াল। আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে চ্যালেঞ্জের সুরে বলল,
“ওহ! তাহলে তো আমারও এখন পরকীয়া করা উচিত, তাই না?”
আরিয়ান দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে এক পা এগিয়ে এল। গলার স্বর কিছুটা গম্ভীর করে বলল,
“একদম সোজা মেরে দেব!”
আরিয়ানের এমন পজেসিভ কথা শুনে তৃণা খিলখিল করে হেসে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই তার হাসির রঙ বদলে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল,
“আপনি তো নিজেই পরকীয়া করছেন মিস্টার আরিয়ান মির্জা। নিজের বউ থাকতে অন্য মেয়ের মায়ায় মজে আছেন!”
আরিয়ান তৃণার কথার পিঠে হাসল। রহস্যময় গলায় বলল,
“ওকে, তোমার কথাই মেনে নিলাম। খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে আমার সেই মায়াবতীর সাথে দেখা করাব। তারপর তোমাকে বলেই পরকীয়া করব। তখন ঠিক হবে তো নাকি?”
তৃণা ম্লান হাসল। আবারও গয়না খুলতে মন দিল সে। আরিয়ান তৃণার আয়নায় প্রতিফলিত মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“সেদিনটা আমার শ্যামলিনীর জন্য জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন হবে। শুধু আর একটুখানি সবুর করো মায়াবতী।”
চলবে…
(ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৫