Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৭


রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

পর্ব_৩৭

নিলুফানাজমিননীলা

★★★
মির্জা বাড়ি এখন এক উৎসবের নগরী। পুরো বাড়ি আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে, চারদিকে লোকজনের হইচই আর ব্যস্ততা। ডেকোরেটরের লোকরা সকাল থেকেই বাড়ি সাজাতে ব্যস্ত। বাড়ির বড় মেয়ে নুসরাত মির্জার বিয়ে বলে কথা! অথচ এত আয়োজনের মাঝেও নুসরাত কেমন যেন পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে আছে। তার এই নীরবতা কি খুশির নাকি কোনো গভীর আশঙ্কার, তা বাড়ির কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।
​এদিকে বাড়ির বউ আর মেয়েরা মিলে শপিংয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করছে। হাতে সময় একদম কম। নৌশি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হন্যে হয়ে রেডি হচ্ছে। মুখে হালকা সানস্ক্রিন মেখে সে এবার আইলাইনার দিতে ব্যস্ত। মেয়েদের এক অদ্ভুত সহজাত অভ্যাস চোখে কাজল বা আইলাইনার দিতে গেলে কেন যেন অজান্তেই মুখটা ‘হা’ হয়ে যায়!

​নৌশি যখন গভীর মনোযোগে চোখে টান দিচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ঝড়ের বেগে রুমে ঢুকল আদনান। নৌশি আয়না থেকে চোখ না সরিয়েই বলল,
“কী আদু ভাই, যাবি না শপিংয়ে? রেডি হয়েছিস?”

​আদনান পকেট থেকে কিছু একটা বের করে হাতের মুঠোয় লুকিয়ে রেখে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“আমরা পুরুষ মানুষ রে। আমাদের রেডি হতে তোদের মতো জন্মের সময় লাগে না।”

​নৌশি এবার চোখে ফিনিশিং টাচ দেওয়ার জন্য মুখটা একটু বেশিই ‘হা’ করল। ঠিক সেই মোক্ষম সুযোগে আদনান বলে উঠল,
“এই নে, চকলেট খা!”

​কথাটা শেষ করতে না করতেই আদনান নৌশির মুখের ভেতর গোলমতো কিছু একটা ঢুকিয়ে দিল। নৌশি প্রথমে বিরক্ত হলো, কিন্তু শপিংয়ের তাড়ায় সেটাতেই কামড় বসাতে গেল। দাঁত দিয়ে চাপ দিতেই তার চক্ষু চড়কগাছ! এটা তো চকলেট নয়,অন্য কিছু একটা হবে।

​আদনান ওদিকে হাসতে হাসতে বিছানায় লুটিয়ে পড়েছে। সে পেটে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে বলছে, “হা হা হা! চকলেটের লোভে কেমন কামড়টা দিলি দেখ!”

​নৌশি বুঝতে পারল বড় রকমের কোনো ঘাপলা হয়েছে। সে চটজলদি মুখ থেকে জিনিসটা বের করে আনল। তাকিয়ে দেখে সেটা একটা তেলাপোকা!
​নৌশির সারা শরীর ঘিনঘিন করে উঠল। সে রাগে চিৎকার করে উঠল,
“আদুর বাচ্চা! তোকে আমি আজ মেরেই ফেলব! তুই আমাকে তেলাপোকা খাওয়ালি?”
বমিটা ঠিক গলার কাছে এসে আটকে গেছে। সে রাগে, ঘেন্নায় চিৎকার করে উঠল,
“আদুর বাচ্চা! হাতির বাচ্চা! কুত্তা! এটা কী করলি তুই?”

​আদনান হাসতে হাসতে প্রায় বিছানা থেকে পড়ে যাওয়ার দশা। নৌশির দুচোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। সে সত্যিই খুব আঘাত পেয়েছে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “সবকিছু নিয়ে ফাইজলামি ভালো লাগে না আদনান। এটা কী ধরনের মজা? তুই এত জঘন্য কেন?”

​নৌশি হনহনিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু আদনান এক ঝটকায় তার হাত ধরে থামাল। নৌশি ফিরে তাকাতেই আদনান তেলাপোকাটা দেখিয়ে বলল,
“আরে গাদী! দেখ এটা, এটা প্লাস্টিকের! জ্যান্ত না তো।”

​নৌশি কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে দেখল হ্যাঁ, সত্যিই এটা প্লাস্টিক। কিন্তু তার রাগ তাতে কমল না। সে ঝাড়ি দিয়ে হাত সরিয়ে নিয়ে বলল,
“হাত ছাড় বলছি! তোর মুখ দেখতে চাই না আমি।”

​নৌশি চলে যেতে উদ্যত হতেই আদনান পেছন থেকে একটা সুন্দর গিফট বক্স এগিয়ে ধরল। নৌশি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “আবার কী এটা? এবার কি ভেতরে সাপ ঢুকিয়ে রেখেছিস?”

​আদনান ম্লান হেসে বলল, “আরে না, খুলে দেখ।”

​নৌশি অনেক দ্বিধা নিয়ে বক্সটা হাতে নিল। খুব সাবধানে ধীরে ধীরে প্যাকেটটা খুলতেই নৌশির চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। সে একবার বক্সের দিকে তাকাচ্ছে, আরেকবার আদনানের চোখের দিকে। বক্সের ভেতরে অতি যত্নে রাখা এক জোড়া মাটির পুতুল। এটা ঠিক সেই পুতুলটাই, যেটা কয়েকদিন আগে আদনানের হাতে ভুল করে ভেঙে গিয়েছিল।

​নৌশি অবাক হয়ে বলল,
“এটা তো সেই একই রকম পুতুল…”

​আদনান মাথা নাড়িয়ে বলল,
“উঁহু, একই রকম না। এটা সেই পুতুলটাই। অনেক কষ্টে জোড়া লাগিয়েছি।”

​নৌশি কাছে নিয়ে পরখ করে দেখল, হ্যাঁ! ভাঙা টুকরোগুলো জোড়া লাগানোর সূক্ষ্ম দাগ রয়ে গেছে। খুব ভালো করে খেয়াল না করলে বোঝাই যায় না। আদনান যে কতটা সময় আর ধৈর্য নিয়ে এই তুচ্ছ জিনিসটা ঠিক করেছে, তা ভেবে নৌশির বুকটা হু হু করে উঠল। আবেগে আপ্লুত হয়ে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আদনানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
​হঠাৎ এমন ঘটনায় আদনান একেবারে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নৌশি মুহূর্তেই বুঝতে পারল সে কী করে ফেলেছে! সে দ্রুত আদনানকে ছেড়ে দিয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। তার ঠোঁট কাঁপছে। নিচু স্বরে বলল,
“ সাধারণ একটা পুতুলের জন্য এত কষ্ট করার কী খুব দরকার ছিল? কে আমি তোর?”

​আদনান কিছুক্ষণ নৌশির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে তখন অন্যরকম এক মায়া। কিন্তু মুখ খুলতেই আগের সেই দুষ্টু আদনান ফিরে এল। সে বাঁকা হেসে বলল, “তুই কে? তুই হলি একটা নাদানের বাচ্চা!”
​এত সিরিয়াস একটা মুহূর্তে আদনানের এমন উত্তরে নৌশি আর রাগ ধরে রাখতে পারল না। চোখের জল মোছার আগেই খিলখিল করে হেসে উঠল সে।
★★★
সবাই রেডি হয়ে গেছে মার্কেটে যাওয়ার জন্য। বাড়িতে পুরুষদের অনেক কাজ।সেই কারণে মেয়েরা একাই যাবে।সবাই ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বাহিরে বের হওয়ার আগেই পেছন থেকে আরিয়ান বলল,
“এই দাঁড়া আমি সবাইকে নিয়ে যাচ্ছে। ”
সকলেই অবাক হয়ে পেছন থকালো।তৃণাও অবাক হয়ে তাকালো।আহাদ মির্জা আর তার ভাইয়েরা বিয়ের কি কি লাগবে সেসব নিয়েই হিসাব করছিল। বাড়ির পুরুষরা যখন কাজে ব্যস্ত, তখন আরিয়ানের হঠাৎ এই শপিংয়ে যাওয়ার শখ দেখে আহাদ মির্জা অবাক হয়ে বললেন,
“তুই যাবি মানে? কাজের তো অভাব নেই, তুই না থাকলে সামলাবে কে?আদনান তো যাচ্ছেই।”

​আরিয়ান মুচকি হেঁসে বলল,
“সবাই তো আছই। আর মহিলারা একা যাবে, সাথে একটা পুরুষ থাকা ভালো। তাই ভাবলাম আমিই ড্রাইভ করি।”

আদনান এবার অবাক হয়ে বলল,
“কেন ভাইয়া আমি তো যাচ্ছিই।আমাকে কি পুরুষ মনে হয় না?”

আরিয়ান আদনানের কাঁদে হাত রেখে বলল,
“তুই ছোট মানুষ তুই কি বুঝবি? ”

​নৌশি বাঁকা চোখে তাকিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“মার্কেট তো বাড়ির পাশের গলিতে না দাদাভাই! মতলবটা কী শুনি? আমাদের গার্ড দেওয়ার ইচ্ছা, নাকি অন্য কারোর পাশে থাকার বাহানা?”

​আরিয়ান নৌশির কানটা হালকা করে টেনে দিয়ে বলল,
“বেশি পাকা কথা বলিস না তো! যা গাড়িতে গিয়ে বস।”

​পার্কিং লটের দিকে যাওয়ার সময় আরিয়ান আর তৃণা পাশাপাশি হাঁটছে। তৃণা আজ হালকা রঙের একটা শাড়ি পরেছে, চুলগুলো আলগা করে ছেড়ে দেওয়া। আরিয়ানের চোখ যেন তৃণার দিক থেকে সরতেই চাইছে না। তৃণা সেটা বুঝতে পেরে একবার আড়চোখে আরিয়ানের দিকে তাকাল, তারপর একটু অবাক হয়েই বলল,
​“কী ব্যাপার রাগী সাহেব? গতকাল থেকে দেখছি আপনার মুখ থেকে হাসি সরছে না। ঘটনা কী? আর ওই যে কাল অত ঢাকঢোল পিটিয়ে নফল নামাজ পড়ালেন, তার কারণটাও তো বললেন না।”

​আরিয়ান পা থামিয়ে তৃণার ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে এক গভীর তৃপ্তি। সে আলতো করে হাসল সেই হাসি যা হৃদয়ে কম্পন ধরিয়ে দেয়। সে নরম গলায় বলল,
“হাসি সরছে না কারণ, আমি আমার সেই মায়াবতীকে পেয়ে গেছি। আমার প্রথম ভালোবাসাকে খুঁজে পেয়েছি।”

​তৃণা থমকে গেল। বুকটা কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠল তার। এতদিন যে মেয়েটার গল্প সে আরিয়ানের মুখে শুনেছে, যার জন্য আরিয়ান তাকে অবহেলা করেছে আরিয়ান কি তবে তাকে সত্যিই খুঁজে পেয়েছে? তৃণা নিজের ভেতরের কষ্টটা চেপে রেখে শুকনো গলায় বলল,
“পেয়ে গেছেন? সত্যি?”

​“হুম।” আরিয়ান একদৃষ্টে তৃণার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।

​“কে সে? আমার সাথে একবার দেখা করাবেন না?” তৃণার গলায় এক অদ্ভুত হাহাকার মিশে থাকল।

​আরিয়ান দুই পকেটে হাত ঢুকিয়ে তৃণার চোখের মণির দিকে তাকিয়ে রহস্যময় গলায় বলল,
“অবশ্যই করাব। খুব জলদি করাব। আর আমার বিশ্বাস, তুমি আমার সেই ভালোবাসার মানুষকে দেখলে একদম চমকে উঠবে।”

​তৃণা আর কিছু বলল না, কিন্তু তার মনের কোণে মেঘ জমতে শুরু করল।
তৃণা একটা ম্লান হাসি হাসার চেষ্টা করল। তার বুকের ভেতরটা কেন যেন হাহাকার করে উঠছে। তা না হলে আরিয়ানের মুখে অন্য কোনো মেয়ের রূপের বর্ণনা শুনে তার এত কষ্ট হচ্ছে কেন? সে ধরা গলায় বলল,
“খুব সুন্দরী বুঝি?”

​আরিয়ান তৃণার মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“হুম, আমার চোখে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর রমণী, সবচেয়ে মায়াবতী।”

​তৃণা আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পা চালিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। আরিয়ানও তার পিছু নিতে চেয়েছিল, কিন্তু ঠিক তখনই পকেটে ফোনটা কেঁপে উঠল। তাকিয়ে দেখল তার বন্ধু সিফাতের কল। ফোনটা কানে নিয়েই আরিয়ান উত্তেজনায় বলে উঠল,
“পেয়ে গেছি রে সিফাত! আমার সেই মায়াবতী কন্যাকে আমি খুঁজে পেয়েছি!”

​সিফাত ওপাশ থেকে যেন আকাশ থেকে পড়ল।
“বলিস কী! সত্যি? কই, আমাকে তো একবারও বললি না! কে সেই মেয়ে? কোথায় থাকে?”

​আরিয়ান তৃপ্তির হাসি হেসে জবাব দিল,
“সে আর কেউ নয় রে, সে আমার শ্যামলিনী, আমার অর্ধাঙ্গিনী তৃণা!”

​সিফাত বিস্ময়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলে উঠল,
“কী বলছিস! তোর বউই সেই পাহাড়ি মেয়ে? ভাই, এ তো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়! তাহলে আর দেরি করছিস কেন? এখনই সব বলে দে, মনের কথাগুলো খুলে বল।”

​আরিয়ান পার্কিং লটে তৃণার গাড়িতে ওঠার দৃশ্য দেখতে দেখতে বলল,
“না, এখনই বলব না। বাড়িতে নুসরাতের বিয়ে চলছে, সবাই খুব ব্যস্ত। আমি চাচ্ছি বিয়ের সব আয়োজন মিটে গেলে একদম নিরিবিলিতে তৃণাকে বড় একটা সারপ্রাইজ দেব।”

​“বাহ! আইডিয়াটা দারুণ। ঠিক আছে বন্ধু, শুভকামনা রইল,” সিফাত হাসতে হাসতে বলল।

​“রাখছি রে, এখন মার্কেটে যেতে হবে, সবাই অপেক্ষা করছে।” আরিয়ান কলটা কেটে দিয়ে দ্রুত পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। তার বুকের ভেতর এখন এক অদ্ভুত সুখের অনুভূতি। যে মানুষটাকে চার বছর ধরে খুঁজেছে, সে তার পাশেই আছে এর চেয়ে বড় সার্থকতা আর কী হতে পারে!
★★★
শাড়ির দোকানে সবাই হন্যে হয়ে শাড়ি খুঁজছে। নুসরাতের বিয়ের প্রধান শাড়িগুলো নির্জনের বাড়ি থেকে চলে এলেও বাকি অনুষ্ঠানগুলোর জন্য এখন কেনাকাটা চলছে। নুসরাত খুব শক্তভাবে বলে দিয়েছে সে কোনো জাঁকজমকপূর্ণ গায়ে হলুদ বা মেহেদি অনুষ্ঠান করবে না। তাই বাড়ির সবাই ছোটখাটো ঘরোয়া আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
​তৃণা এ পর্যন্ত যতগুলো শাড়ি হাতে নিয়েছে, আরিয়ান সবগুলোতে ভ্রু কুঁচকে না করে দিচ্ছে। তৃণার বিরক্তি এখন তুঙ্গে। সে মনে মনে ভাবল, ‘বউ হিসেবে তো এই লোক আমায় এক দণ্ড সহ্য করতে পারে না, অথচ এখন শাড়ি পছন্দ করতে গিয়ে এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন কত দরদ!’
​আরিয়ান তৃণার গাল ফোলা অভিমান দেখে মনে মনে হাসল। সে আলতো করে বলল,
“চলো, পাশের বড় শোরুমটায় যাই। ওখানে ভালো কালেকশন আছে।”

​পরের দোকানে গিয়েও একই অবস্থা। সেলস গার্ল একের পর এক শাড়ি দেখাচ্ছে, কিন্তু কোনোটাতেই আরিয়ানের মন ভরছে না। হঠাৎ তৃণার নজর কাড়ল তাকে সাজানো একটি গোল্ডেন সিল্কের শাড়ি। শাড়িটার কারুকাজ আর আভিজাত্য এক কথায় অসাধারণ। তৃণা শাড়িটা হাতে নিয়ে নিজের শরীরের সাথে জড়িয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আরিয়ানের দিকে ফিরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
“দেখুন রাগী সাহেব, এটা ঠিক আছে তো? নাকি এটাও আপনার ওই খুঁতখুঁতে চোখে অপছন্দ হবে?”

​আরিয়ান এক মুহূর্ত অপলক তাকিয়ে রইল। গোল্ডেন রঙের আভা তৃণার শ্যামলা গায়ের রঙে এক স্বর্গীয় স্নিগ্ধতা এনে দিয়েছে। সে মুগ্ধ হয়ে বলল,
“পারফেক্ট! একদম এটাই তোমার জন্য।”

​তৃণার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটল। আরিয়ান কাউন্টারে গিয়ে বলল, “এই শাড়িটাই প্যাক করে দিন।”

​কিন্তু পাশ থেকে মহিলা সেলস পারসন আমতা আমতা করে বলল,
“সরি স্যার, এই শাড়িটা অলরেডি অন্য একজন কাস্টমার বুক করে রেখেছেন। এটা বিক্রি করা সম্ভব না।”

​কথাটা শোনা মাত্রই তৃণার হাসিখুশি মুখটা নিমেষেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
​আরিয়ান তৃণার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে তৃণা চট করে কোনো জিনিস পছন্দ করে না, আর যেটা করেছে সেটা সে হাতছাড়া হতে দেবে না। আরিয়ান শান্ত গলায় সেলস গার্লকে বলল, “একটু ম্যানেজারকে ডাকুন তো, আমি উনার সাথে কথা বলব।”

​তৃণা আরিয়ানের হাত ধরে ফিসফিস করে বলল,
“আরে কী করছেন? দরকার নেই তো, অন্য দোকানে পাব।”

আরিয়ান আর কথা না বাড়িয়ে এবার সবাইকে নিয়ে জুতার মার্কেটে গেল। সেখানেও অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর তৃণার একটা জুতা পছন্দ হলো। সেলসম্যান জুতাটা নিয়ে এগিয়ে এসে বলল,
“ম্যাম, পা বাড়ান, আমি পরিয়ে দিচ্ছি।”
​তৃণা পা বাড়াতে গিয়েও ইতস্তত করছিল। আরিয়ানের হঠাৎ কেমন যেন লাগল পরপুরুষের হাত তৃণার পায়ে লাগবে, এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারল না। সে ঝট করে দোকানদারের হাত চেপে ধরল। গম্ভীর গলায় বলল,
“দিন, জুতা জোড়া আমার কাছে দিন। আমি দেখছি।”

​তৃণা অবাক হয়ে বাধা দিতে চাইল,
“আরে কী করছেন? ছাড়ুন, আমি নিজেই পারব।”

​কিন্তু আরিয়ান কারো কথা শুনল না। সে শপিং মলের মেঝেতেই এক হাঁটু গেড়ে নিচু হয়ে বসল। পরম যত্নে তৃণার একটা পা নিজের হাতের তালুতে তুলে নিয়ে জুতাটা পরিয়ে দিল। তৃণার সারা শরীর যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো,সে স্তব্ধ হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।
​অন্য দোকান থেকে জোর করে একটা শাড়ি কিনে দিলেও আরিয়ান স্পষ্ট বুঝতে পারল, তৃণার মনটা ওই গোল্ডেন সিল্কের শাড়িতেই পড়ে আছে। কেনাকাটা শেষ করে আরিয়ান ড্রাইভারকে ডাকল এবং সবাইকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিল। আরিয়ান বলল, তার জরুরি একটা কাজ আছে, সে পরে ফিরবে।
​তৃণা আড়চোখে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ‘জরুরি কাজ নাকি ওই মায়াবতীর জন্য উপহার কেনা?’ সে নিজেকে আর সামলাতে পারল না। গাড়িতে ওঠার আগে আরিয়ানের দিকে ফিরে বাঁকা হেসে বলল,
“এভাবে লুকিয়ে গিফট দেওয়ার কী প্রয়োজন রাগি সাহেব? আমার সামনে কিছু কিনলেও আমি কিছু মনে করব না। শেষে তো আপনার সেই ‘প্রথম ভালোবাসা’ বলেই কথা!”

​তৃণার কথা শুনে আরিয়ান হো হো করে হেসেই ফেলল। তৃণা যখন হিংসেয় জ্বলে-পুড়ে ছারখার হচ্ছে, তখন আরিয়ানের মনে হচ্ছে এই অনুভূতিটা বেশ উপভোগ্য। সে তৃণার রাগী মুখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি হেসে বিদায় দিল।
★★★
রাত প্রায় বারোটা। মির্জা বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় চলায় কারও চোখে আজ ঘুম নেই। তৃণা মিহুকে সাথে নিয়ে সারা বাড়ি ঘুরে কাজ গুছিয়ে অবশেষে নিজের রুমে ফিরল। ঘরে ঢুকতেই তার নজর গেল বিছানার দিকে। আরিয়ান আয়েশ করে পা তুলে বসে মোবাইল টিপছে।
​তৃণা ড্রসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই আয়নায় দেখল আরিয়ান একদৃষ্টে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তৃণা যেদিকে নড়ছে, আরিয়ানের দুই জোড়া চোখও ঠিক সেদিকেই স্থির হয়ে আছে। তৃণা অস্বস্তি আর বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“সমস্যা কী আপনার? এভাবে লুইচ্চাদের মতো ড্যাবড্যাব করে তাকাচ্ছেন কেন?”

​আরিয়ান যেন আকাশ থেকে পড়ল! সে মোবাইলটা পাশে রেখে সোজা হয়ে বসে বলল,
“লুইচ্চা? হোয়াট? নিজের বউয়ের দিকে ভালো নজরে তাকাব নাকি খারাপ নজরে, সেটা তো পুরোপুরি আমার ওপর ডিপেন্ড করে। এতে লুইচ্চামির কী আছে?”

​তৃণা মনে মনে আরিয়ানকে কয়েকটা জুতসই গালি দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ঠিক তখনই মিহু এসে তৃণার পায়ের কাছে ঘষাঘষি শুরু করল। তৃণা মিহুকে কোলে নেওয়ার জন্য যেই না নিচু হতে যাবে, অমনি আরিয়ান চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় এসে মিহুকে নিজের কবজায় নিয়ে নিল।
​তৃণা হাঁ করে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান মিহুর মুখটা হালকা করে চেপে ধরে ফিসফিস করে ধমকের সুরে বলল, “আমার বউয়ের কাছে তোর এত কী কাজ শুনি? ব্যাটা বহুত খারাপ বিলাই তুই!”

​মিহু বেচারা আরিয়ানের এই হঠাৎ আক্রমণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুধু ‘মিউ মিউ’ করে প্রতিবাদ জানাল। তৃণা এবার মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল,
“সমস্যা কী আপনার? এভাবে চেপে ধরেছেন কেন? ওর লাগছে তো!”

​আরিয়ান জোরপূর্বক দাঁত বের করা হাসি দিয়ে বলল,
“হুম, লাগছেই তো! ওর জন্য তোমার মায়া দেখে আমার চোখে জল চলে আসছে।”

​বলেই সে মিহুকে সপাটে বিছানার মাঝখানে শুইয়ে দিল। তারপর মিহুর ওপর ঝুঁকে পড়ে তর্জনী উঁচিয়ে শাসনের সুরে বলল,
“দেখ বিলাই, তোকে খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেব। ঘর-সংসার করবি। খবরদার! এরপর যদি আমার বউয়ের কাছে বেশি ঘেঁষতে দেখেছি, তবে তোর একদিন কি আমার একদিন!”

তৃণার নজর যখন ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা শপিং ব্যাগটার দিকে গেল। তৃণা মনে মনে নিশ্চিত হলো এই গিফট টা হয়তে আরিয়ান সেই অচেনা মেয়েটার জন্যই কিনেছে। বিষণ্ণ মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল,
“কী কিনলেন ওই মেয়ের জন্য?”

​আরিয়ান বিছানায় সোজা হয়ে বসে রহস্যময় হাসল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
“অন্যের জন্য কী কিনলাম তা ভেবে লাভ নেই, তুমি নিজেই খুলে দেখো না ভেতরটা।”

​তৃণা কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল,
“আমি কেন খুলব? যার জিনিস তাকেই দেবেন।”

​আরিয়ান এবার একটু ধমকের সুরে বলল,
“বেশি কথা বলো তুমি। আমি যা বলছি তাই করো, ব্যাগটা খোলো।”

​তৃণা অনিচ্ছাসত্ত্বেও ব্যাগটা খুলল এবং পরক্ষণেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! ভেতরে সেই কাঙ্ক্ষিত গোল্ডেন কালারের সিল্কের শাড়িটা চিকচিক করছে। তৃণা অবিশ্বাসের সুরে বলল,
“একি! এই শাড়িটা কীভাবে পেলেন? ওনারা তো বলছিলেন এটা অন্য কেউ বুক করে রেখেছে!”

​আরিয়ান উঠে দাঁড়াল। তৃণার খুব কাছে গিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে একটু ঝুঁকে পড়ে বলল,
“এবার তো খুশি? তোমার ওই মলিন মুখটা আমার একদম সহ্য হচ্ছিল না।”

​তৃণা খুশিতে ডগমগ হয়ে মাথা নাড়াল। আরিয়ান আবারও বলল,
“শাড়িটা আনতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। যে আগে কিনেছিল, তাকে বুঝিয়ে রাজি করাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে আমার।”

​তৃণার মুখের হাসিটা হঠাৎ ম্লান হয়ে এল। সে নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল,
“এত কিছু করার কী দরকার ছিল? শুধু শুধু মায়া বাড়াবেন না রাগী সাহেব। আপনার প্রতি মায়া পড়ে গেলে তো ছেড়ে যাওয়ার সময় বড্ড কষ্ট হবে।”

​বলেই তৃণা দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল যাতে আরিয়ান তার চোখের জল দেখতে না পায়। সে আলমারি খুলে শাড়িটা গুছিয়ে রাখতে রাখতে বাঁ হাত দিয়ে চোখের কোণটা মুছে নিল। কিন্তু আরিয়ানের তীক্ষ্ণ নজর এড়াল না সেই জলবিন্দু। এই প্রথম হয়তো তৃণার চোখের জল দেখে আরিয়ানের বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠল।
​তৃণা যখন আলমারির দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে, আরিয়ান তখন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল,
‘আরেকটু সময় ধৈর্য ধরো তৃণা। কথা দিচ্ছি, এই চোখের জল আর কোনোদিন পড়তে দেব না। সারা জীবন তোমাকে আগলে রাখব, যতদিন এই দেহে প্রাণ থাকবে ঠিক ততদিন।এতটা ভালোবাসবো তোমায় যতটা ভালোবাসলে মানুষ দুঃখ কি ভুলে যায়।’

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply