রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_৩৬
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
পুরো পৃথিবীটা যেন এক প্রচণ্ড ঘূর্ণিপাকের মতো আরিয়ানের চোখের সামনে ঘুরছে। আরিয়ান কিছুতেই নিজের মস্তিষ্ককে স্থির করতে পারছে না। হঠাৎ তার মাথায় একটা পুরনো কথা বিদ্যুতের মতো চমকে উঠল। সে পাগলের মতো দৌড়ে আলমারির কাছে গেল। মনে পড়ল, সেদিন নিজের টিশার্ট খোঁজার সময় সে একটা কাপড়ের পুঁটলি দেখেছিল। তৃণা তখন বলেছিল, ওটাতে নাকি তার পুরনো দরকারি কিছু জিনিস আছে।
আরিয়ান তখন গুরুত্ব দেয়নি, কিন্তু এখন এক অজানা আশঙ্কায় তার বুক কাঁপছে। কিছুক্ষণ হন্যে হয়ে খোঁজার পর আলমারির এক কোণে সেই পুঁটলিটা পেল সে। আরিয়ান কাঁপা কাঁপা হাতে গিঁটটা খুলল। ভেতরে কিছু টুকিটাকি জিনিসের মাঝে প্রথমেই বেরিয়ে এল তৃণা আর তার বাবার একটা পুরনো ছবি। আরিয়ান ছবিটার দিকে এক মুহূর্তের জন্য নজর দিয়ে পাশে সরিয়ে রাখল। তার লক্ষ্য অন্য কিছু।
সে আবারও পুঁটলিটার ভেতর হাতড়ে খুঁজতে লাগল। এক পর্যায়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা রুপার নূপুর। নূপুরটা দেখামাত্রই আরিয়ানের হাত কাঁপতে শুরু করল, যেন পুরো শরীরে কেউ বরফশীতল জল ঢেলে দিয়েছে। সে বিস্ময় ভরা চোখে তাকিয়ে রইল নূপুরটার কারুকার্যের দিকে। এই নকশা, এই গঠন সবই তার বড্ড চেনা। সে পাগলের মতো পুঁটলিটা উপুড় করে আরেকটা নূপুর খুঁজল, কিন্তু পেল না।
আরিয়ান এবার নিজের ড্রয়ার থেকে অতি যত্নে আগলে রাখা সেই নূপুরটা বের করল, যা সে ওই বৃষ্টময় বিকালে পাহাড়ে কুড়িয়ে পেয়েছিল। কাঁপা হাতে দুটো নূপুর পাশাপাশি ধরল সে। দুটোই হুবহু এক! জোড়া নূপুরের একটা ছিল আরিয়ানের কাছে, আর অন্যটা ছিল তৃণার এই পরম যত্নের পুঁটলিতে।
এতটা দিন যে মেয়েটার এক ঝলক দেখার জন্য সে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরেছে, যে স্মৃতির দহনে সে রাতে ঘুমাতে পারেনি, সেই মায়াবতী পাহাড়ি কন্যা আর কেউ নয় তার নিজের ঘরে থাকা অবহেলিত এই তৃণা! আরিয়ানের মতো শক্তপোক্ত পাষাণ পুরুষটার চোখ বেয়ে এবার টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল, “তবে কি তুমিই সে? তুমিই সেই নীল পরী?পাহাড়ি কন্যা!”
আরিয়ান এবার বুঝতে পারল, নিয়তি তার সাথে কী বিশাল এক খেলা খেলেছে। সে যাকে ঘৃণা করে দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছে, সেই তো তার চার বছরের পুরনো হৃদস্পন্দন।
আরিয়ান নূপুর দুটোকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। পাথর চাপা কষ্টের পর হঠাৎ প্রাপ্তির এই আনন্দ সে সইতে পারছে না,তার চোখ বেয়ে অবুঝ বাচ্চাদের মতো জল পড়ছে। শরীরের শক্তি যেন নিমেষেই ফুরিয়ে গেল, সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ধপাস করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল শ্বেতপাথরের ফ্লোরে। আরিয়ান এবার ওপরের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় ডুকরে বলে উঠল,
“আল্লাহ! তুমি আমাকে এত বড় সারপ্রাইজ দিলে! তুমি কি জানো খোদা, তোমার এই অধম বান্দা আজ কতটা খুশি? তোমার কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া!”
ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজা ঠেলে তৃণা রুমে ঢুকল। তৃণাকে দেখেই আরিয়ান চটজলদি নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। হাতের উল্টো পিঠে চোখের জল মুছে সে অতি দ্রুত নিজের কাছে থাকা আগের নূপুরটা পকেটে লুকিয়ে ফেলল। আর পুঁটলি থেকে পাওয়া নূপুরটা ঠিক আগের জায়গায় রেখে দিল যাতে তৃণা কিছু বুঝতে না পারে।
তৃণা ধীরপায়ে আরিয়ানের দিকে এগিয়ে আসছে। আরিয়ান অপলক দৃষ্টিতে তৃণার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে আজ অন্যরকম নেশা, বারবার না চাইতেও চোখ দুটো তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো ঝাপসা হয়ে আসছে। আজ তৃণা আরিয়ানের কাছে কেবল তার স্ত্রী নয়, বরং সেই বহু বছরের কাঙ্ক্ষিত মায়াপরী হিসেবে ধরা দিয়েছে।
আরিয়ানের ধূসর জীবনে বুঝি দীর্ঘ খরার পরে আজ প্রথম কদম ভেজানো নরম বৃষ্টি নামল।
তৃণা আরিয়ানের একদম সামনে এসে দাঁড়াল। আরিয়ানের লাল হয়ে থাকা চোখ আর গালের ওপর শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ দেখে সে ভীষণ অবাক হলো। কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করল,
“আরে, আপনি কাঁদছেন? কী হয়েছে আপনার?”
তৃণার এমন প্রশ্নে আরিয়ান অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে মুখ ফিরিয়ে নিল। চোখের কোণে আঙুল ঘষতে ঘষতে মিথ্যা বলে লুকানোর চেষ্টা করল,
“না না, তেমন কিছু না। চোখে কী যেন একটা পড়েছে, খুব জ্বালা করছে।”
তৃণা বিশ্বাস করল না। সে আরও একধাপ এগিয়ে এসে আরিয়ানের খুব কাছে দাঁড়াল। তার চোখে মুখে একরাশ উদ্বেগ। সে কি জানত, আরিয়ানের এই কান্নার কারণ সে নিজেই?
তৃণা চটজলদি আরিয়ানের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সে আরিয়ানের দুই চোখের পাতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল আসলে চোখে কী পড়েছে। তৃণার হাতের স্পর্শ আর শরীরের মায়াবী ঘ্রাণে আরিয়ানের বুকের ভেতরটা আজ প্রচণ্ডভাবে ধকধক করছে,ঠিক যেমনটা করেছিল চার বছর আগে সেই পাহাড়ের বৃষ্টিভেজা রাতে। আরিয়ান মনে মনে ভাবল, তবে কি আল্লাহ তায়ালা তার ধৈর্যের ফল এভাবেই দুহাত ভরে দিলেন?
তৃণা কিছুক্ষণ গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখে নিয়ে বলল, “কই, কিছু তো নেই চোখে!”
আরিয়ান নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“হয়তো… এইমাত্র বের হয়ে গেছে বোধহয়।”
তৃণার নজর এবার ফ্লোরে পড়ে থাকা ছড়ানো-ছিটানো জিনিসপত্রের দিকে গেল। সে কিছুটা অবাক হয়ে বলল, “একি! আমার জিনিসপত্র এভাবে নামালেন কেন?”
আরিয়ান একটু আমতা আমতা করে বলল,
“আমার একটা খুব প্রিয় জিনিস খুঁজছিলাম, আর খুঁজতে গিয়েই তোমার এই পুঁটলাটা পেলাম।”
তৃণা নিচু হয়ে পুঁটলার মুখটা বাঁধতে বাঁধতে নির্লিপ্তভাবে জিজ্ঞেস করল,
“তা আপনার সেই প্রিয় জিনিসটা কি পেলেন?”
আরিয়ান তৃণার চোখের দিকে গভীর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জবাব দিল,
“হ্যাঁ, পেয়েছি। একদম হাতের কাছেই পেয়েছি।”
তৃণা বুঝতে পারল না আরিয়ানের কথার গূঢ় অর্থ। সে বলল, “তাহলে তো ভালোই।”
তৃণা যখন পুঁটলাটা গোছাচ্ছিল, আরিয়ানের মনে তখন একটা খটকা লাগল। তৃণা তো বৃষ্টি প্রচণ্ড ভয় পায়, সে তো বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না,তাহলে সেই দিন পাহাড়ের ওপর মেয়েটা কীভাবে বৃষ্টিতে ভিজছিল? আরিয়ান কৌতূহল সামলাতে না পেরে খুব স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞেস করল,
“তোমার পুঁটলাতে দেখলাম একটা রুপার নূপুর রয়েছে। আরেকটা নূপুর কোথায়? জোড়া নেই কেন?”
তৃণা পুঁটলাটা আলমারির ভেতরে ঢোকাতে ঢোকাতে খানিকটা বিষণ্ণ গলায় জবাব দিল,
“হারিয়ে গেছে একটা নূপুর। কীভাবে, কোথায় যে হারিয়ে ফেললাম তা ঠিক মনে নেই। এই নূপুর দুটো আম্মু আমাকে বানিয়ে দিয়েছিল। সেই শেষ স্মৃতিটুকুও ঠিকমতো যত্নে রাখতে পারলাম না।”
তৃণার কথা শুনে আরিয়ানের মুখে আবারও সেই মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। তার পকেটে থাকা নূপুরটা যেন তখন তৃণার না বলা সব উত্তর দিয়ে দিচ্ছিল। আরিয়ান আবারও জিজ্ঞেস করল,
“কখনো কি পাহাড়ে গিয়েছিলে তুমি?”
“হুম, একবার গিয়েছিলাম আব্বুর সাথে।”
“কখন গিয়েছিলে? সময়টা মনে আছে?”
এবার তৃণা কিছুটা সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে আরিয়ানের দিকে তাকাল। আরিয়ানের চোখেমুখে অদ্ভুত এক উত্তেজনা। তৃণা জিজ্ঞেস করল,
“হঠাৎ এসব কেন জিজ্ঞেস করছেন?”
আরিয়ান একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল,
“না, এমনিই। সচরাচর মেয়েরা তো পাহাড় আর সমুদ্র খুব পছন্দ করে, তাই জানতে চাইলাম।”
তৃণা খানিকক্ষণ ভেবে বলল,
“এই চার বা পাঁচ বছর আগে হবে বোধহয়, ঠিক মনে নেই।”
ঠিক তখনি বাইরে থেকে আরিয়ানের মা মায়মুনা বেগমের গলার আওয়াজ শোনা গেল। তিনি নিচ থেকে উচ্চস্বরে তৃণাকে ডাকছেন। তৃণা আর সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে দ্রুত পা চালিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। আরিয়ান একা ঘরে দাঁড়িয়ে এবার পকেট থেকে নূপুরটা বের করল। তার মনের সব মেঘ আজ কেটে গেছে, সব প্রশ্নের উত্তর সে পেয়ে গেছে।
আরিয়ান একই জায়গায় পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার মনে এখন আর বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ নেই তৃণাই সেই রহস্যময়ী পাহাড়ি কন্যা। আরিয়ান চোখ বন্ধ করতেই অন্ধকারের মাঝে চার বছর আগের সেই পাহাড়ের মায়াবী মুখটা ভেসে উঠল, যা হুবহু তৃণার প্রতিচ্ছবি। তার হালকা দাড়িযুক্ত মুখে এক চিলতে শুভ্র হাসি ফুটে উঠল, আর চোখ দুটোতে আবারও খুশির অশ্রু ভিড় জমালো।
লোকে বলে পুরুষরা নাকি কাঁদে না! এই কথাটা আসলে কত বড় মিথ্যা। পুরুষরাও কাঁদে, তবে তাদের সেই কান্না সবার সামনে প্রদর্শিত হয় না। তারা মেয়েদের মতো অঝোরে সবাইকে দেখিয়ে কাঁদতে পারে না বলে তাদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। কিন্তু আজ আরিয়ানের এই কান্না কোনো দুঃখের নয়, এ যে পরম প্রাপ্তির খুশির কান্না।
হঠাৎ কিছু একটা ভেবেই আরিয়ান দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। নিচে গিয়ে দেখল তৃণা, মিতু আর নৌশি মিলে বেশ আড্ডায় মেতেছে। তাদের হাসাহাসির শব্দ পুরো লিভিং রুমে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
আরিয়ান গিয়ে সেখানে দাঁড়াতেই আড্ডা থেমে গেল, সবাই তার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালো। আরিয়ান কাউকে কিছু না বলেই তৃণার হাতটা আলতো মুঠোর দখলে নিয়ে তাকে দাঁড় করালো। তৃণা আরিয়ানের এমন আচরণে একদিকে যেমন অবাক হলো, অন্যদিকে তার বুকের ভেতর এক অজানা ভয় দানা বাঁধতে লাগল। লোকটা কি আবার কোনো কারণে রেগে গেল? আরিয়ান ভীষণ গম্ভীর গলায় আদেশের সুরে বলল,
“রুমে চলো তৃণা।”
আরিয়ানের সেই ইস্পাতকঠিন কণ্ঠস্বর শুনে তৃণা সিঁটিয়ে গেল। সে নিজের মনে হাজারটা চিন্তা করে কুলকিনারা পাচ্ছে না যে, এমন কী ভুল সে করেছে যার জন্য আরিয়ান এমন আচরণ করছে। তৃণা হাত ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে বলল,
“হাত ছাড়ুন! এভাবে করছেন কেন সবার সামনে? আমি কী ভুল করলাম?”
আরিয়ান কোনো কথা বলল না, এমনকি কাউকে কিছু বলার সুযোগটুকু পর্যন্ত দিল না। সে তৃণার হাত ধরে লম্বা লম্বা পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। আরিয়ান এতটাই দ্রুত হাঁটছে যে তৃণার রীতিমতো দৌড়াতে হচ্ছে তার সাথে তাল মিলিয়ে যাওয়ার জন্য। তৃণা রাগে আর অভিমানে বারবার বলছে,
“আমার এখন খুব রাগ হচ্ছে রাগি সাহেব! এত রাগী সাহেবগিরি কেন করেন সব সময়? কী করেছি আমি যে আপনি এমন করছেন আমার সাথে?”
আরিয়ান কারো কোনো কথা কানে তুলল না। রুমে ঢুকে এক ঝটকায় দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে সে তৃণার হাতটা ছাড়ল। তৃণা হাঁপাতে হাঁপাতে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে অগ্নিদৃষ্টি ছুড়ে দিল, তার চোখে তখন কান্নার জল টলমল করছে।
আরিয়ান তৃণার বিভ্রান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “যাও, ওযু করে এসো।”
তৃণা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে অবাক হয়ে শুধালো,
“অ্যাঁ? কী বললেন?”
এবার আরিয়ানের কণ্ঠস্বর কিছুটা নরম হলো। সে বুঝিয়ে বলার মতো করে বলল,
“বললাম নামাজের জন্য ওযু করে এসো। নামাজ পড়বে।”
তৃণা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল। আরিয়ানের মতিগতি কিছুই আজ তার মাথায় ঢুকছে না। সে বলল,
“এখনো তো যোহরের আযান দেয়নি। এখন কিসের নামাজ পড়ব?”
আরিয়ান শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“নফল নামাজ আদায় করতে আযানের প্রয়োজন হয় না তৃণা। যাও, বেশি কথা না বলে ওযু করে এসো।”
তৃণা এবারও দমে গেল না। সে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কিন্তু কিসের জন্য এই নফল নামাজ, সেটা তো বলবেন?”
আরিয়ান এক মুহূর্ত চুপ থেকে রহস্যময় হাসি হেসে বলল, “স্বামীর খুশিতে স্ত্রীর উচিত আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করা। আজ আমি খুব খুশি, তাই তুমিও আমার খুশিতে শামিল হয়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করবে। যাও এখন।”
তৃণা ভ্রু কুঁচকে ভাবল, লোকটা কি তবে তার ব্যবসার বড় কোনো ডিল পেয়েছে? সে জিজ্ঞেস করল,
“আপনার কি অফিসে প্রমোশন হয়েছে?”
আরিয়ান এবার হেসেই ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, “আমার নিজের অফিসে আবার নিজের প্রমোশনের দরকার পড়ে নাকি?”
তৃণা আর কথা বাড়াল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওযু করতে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। ওদিকে আরিয়ান তৃণার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক অনাবিল সুখ অনুভব করল। তৃণা তো জানে না আরিয়ানের কাছে ওই পাহাড়ি মেয়ের নূপুরটা এখনো আছে, এমনকি সে এও জানে না সেই বৃষ্টিভেজা দিনে সে কী রঙের পোশাক পরা মেয়েকে দেখেছিল। সে শুধু এটুকুই জানে যে, আরিয়ান পাহাড়ে দেখা এক রহস্যময়ী মেয়েকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছে।
তৃণা ওযু করে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই দেখল আরিয়ান এরই মাঝে পোশাক বদলে একটা সাদা পাঞ্জাবি পরে নিয়েছে। তৃণা যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার মুখ হাঁ হয়ে গেল। সে মনে মনে বিড়বিড় করল, ‘এক লোকের একদিন পর পর কী যে হয় কে জানে!’
এই প্রথম আরিয়ানকে পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় দেখল তৃণা। এমনিতে আরিয়ানকে দেখতে ভীষণ সুপুরুষ লাগে, কিন্তু আজ পাঞ্জাবিতে তাকে যেন আরও বেশি সুদর্শন এবং স্নিগ্ধ লাগছে। তৃণাকে আসতে দেখে আরিয়ান আর কোনো কথা না বাড়িয়ে মেঝেতে দুটো জায়নামাজ বিছিয়ে দিল। আরিয়ান ইমামের জায়গায় অর্থাৎ একটু সামনে দাঁড়াল আর তৃণার জন্য জায়নামাজটা রাখল তার ঠিক পেছনে।
আরিয়ান আর তৃণা পাশাপাশি অথচ দূরত্ব বজায় রেখে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে এক নিস্তব্ধ মায়ায় নামাজ আদায় করল। নামাজ শেষে আরিয়ান দুই হাত উপরে তুলে পরম করুণাময়ের দরবারে মোনাজাত শুরু করল। তৃণা লক্ষ্য করল, আরিয়ানের চওড়া কাঁধটা মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে, সে কাঁদছে। জায়নামাজে লুটিয়ে পড়া আরিয়ানের এই কান্না তৃণার বুকে এক অদ্ভুত স্পন্দনের সৃষ্টি করল।
তৃণা নিজের দোয়া করতে যেন ভুলেই গেল। সে শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবল কী এমন আকুতি, কী এমন গভীর চাওয়া আজ এই মানুষটার আছে যে, পাথরের মতো শক্ত এই লোকটার চোখে এতটা জলের ধারা? তৃণা আরিয়ানের এই আর্তিতে বিচলিত হয়ে নিজের অজান্তেই মনে মনে দোয়া করল,
“হে আল্লাহ, তুমি লোকটার মনের নেক আশা পূরণ করে দিও। তার চোখের এই পানি যেন বৃথা না যায়।”
ওদিকে আরিয়ান নিজের চোখ বন্ধ করে হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে দিয়ে মোনাজাত করছিল,
“হে দয়াময় আল্লাহ, আপনার প্রতি লাখ লাখ শুকরিয়া! এতদিন যাবত যে মানসিক যন্ত্রণায় আমি বিধ্বস্ত ছিলাম, যে হাহাকার আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল, আজ আপনি এক নিমিষেই তা মিশিয়ে দিয়েছেন। আমি যা এতদিন পাহাড়ে আর স্বপ্নে খুঁজেছি, তা আমার নিজের ঘরেই ছিল এটা বুঝতে আমাকে সাহায্য করার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। আল্লাহ, আপনি আমার স্ত্রী, আমার সহধর্মিণীকে সবসময় আমার ছায়া হয়ে সাথে থাকার তৌফিক দান করবেন। আমাদের সব ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করে দিন।”
★★★
সন্ধ্যার দিকে মির্জা বাড়ির ড্রয়িংরুমটা এক থমথমে আড্ডায় মুখর। সচরাচর এমন দৃশ্য দেখা যায় না, তবে আজ তিন ভাই আহাদ মির্জা, এমদাদুল মির্জা এবং ইকবাল মির্জা একসাথেই অফিস থেকে ফিরেছেন। বাড়ির বড়রাও সেখানে উপস্থিত। কিন্তু সবার চোখেমুখে একটা চাপা দুশ্চিন্তা। নুসরাতের ওই অবস্থার পর থেকে বাড়ির পরিবেশটা যেন ভারী হয়ে আছে। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর নুসরাত আজও নিজের ঘর থেকে বের হয়নি।
ঠিক সেই মুহূর্তে মেইন দরজা দিয়ে দুজন মধ্যবয়স্ক মানুষকে ভেতরে ঢুকতে দেখা গেল। ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবার নজর সেদিকে যেতেই এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। আগন্তুক পুরুষটি শান্ত গলায় নিজের পরিচয় দিলেন,
“আমি মোজাহের ইমতিয়াজ। আর উনি আমার স্ত্রী মাহমুদা বেগম। আমরা নির্জনের বাবা-মা।”
পরিচয়টা পাওয়ামাত্রই উপস্থিত সবার মনে পড়ে গেল হাসপাতালের সেই দৃশ্য। নির্জনের পরিবার যে বেশ প্রভাবশালী এবং নির্জন যে নুসরাতকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসে, তা কারও অজানা নয়।
মোজাহের ইমতিয়াজ এবং মাহমুদা বেগম সোফায় গিয়ে বসলেন। তাদের মুখে এক চিলতেও হাসি নেই, বরং বিষণ্ণতার ছাপ স্পষ্ট। একমাত্র ছেলে নির্জন জেদ ধরে বসে আছে নুসরাতকে ছাড়া সে থাকবে না। শেষ পর্যন্ত ছেলের সুখের কথা ভেবে, মন থেকে পুরোপুরি রাজি না থাকলেও, তারা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছেন।
মোজাহের সাহেব নুসরাতের বাবার দিকে তাকিয়ে বিয়ের বিষয়টি নিয়ে সব গুছিয়ে বললেন। নির্জনের পরিবারের আভিজাত্য এবং ছেলের একরোখা ভালোবাসার কথা চিন্তা করে মির্জা বাড়ির সবাই মনে মনে খুশিই হলেন। যেহেতু নির্জনকে তারা আগে থেকেই চেনেন এবং তার সততা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তাই এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না তারা।
মাহমুদা বেগম একটু ম্লান হেসে বললেন,
“ছেলেটা নুসরাতের জন্য যা করছে, তাতে আমরা আর না করতে পারলাম না। এখন আপনারা মত দিলে আমরা সামনের দিনেই শুভ কাজটা সেরে ফেলতে চাই।”
তৃণা আর আরিয়ান এক কোণ থেকে পুরো ব্যাপারটা দেখছিল। তৃণা মনে মনে ভাবল, ভালোবাসার টান থাকলে বোধহয় এভাবেই অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। আরিয়ান তৃণার দিকে একবার তাকাল।
নুসরাত নিজের বিছানায় নির্জীবের মতো বসে ছিল। ঠিক সেই সময় নৌশি এক ঝটকায় রুমে ঢুকে নুসরাতকে জড়িয়ে ধরল। নুসরাতের মাঝে তেমন কোনো হেলদোল দেখা গেল না, সে শুকনো গলায় বলল,
“কী হয়েছে নৌশি? এত খুশি কেন?”
“আপু, তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে!” নৌশি প্রায় চিৎকার করে জানাল।
নুসরাত চটজলদি নৌশির দিকে ফিরল। তার চোখ-মুখে বিস্ময় আর রাগ মেশানো এক অভিব্যক্তি। সে ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“আমার বিয়ে? কী বলছিস এসব, তোর মাথা ঠিক আছে? আমি কি একবারও বলেছি যে আমি বিয়ে করব?”
নুসরাত রীতিমতো চিৎকার করে কথাগুলো বলল। নৌশি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল,
“আরে আপু, আগে শুনবে তো বর কে!”
নুসরাত সরু চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “কে?”
“নির্জন ইমতিয়াজ! তোমার ভালোবাসার মানুষের সাথেই তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
নুসরাতের বিস্ময়ে মুখ হাঁ হয়ে গেল। সে যেন ভুল শুনছে। যে ছেলেটা তার এই অবস্থার পর একবারও তাকে দেখতে আসেনি, সেই ছেলেটাই তাকে বিয়ে করছে এটা তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। নৌশি আবারও খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,
“আপু, এই সামনের শুক্রবারেই বিয়ে ঠিক করা হয়েছে।”
আজ বুধবার, আর মাত্র দুদিন বাকি। নুসরাত অবিশ্বাসের সুরে বলল,
“কী বলছিস এসব?”
“যা বলছি সব সত্যি!” নৌশি একগাল হেসে জবাব দিল।
এরই মাঝে নুসরাতের মা ফারহানা বেগম রুমে এসে নুসরাতকে জড়িয়ে ধরলেন। মা-মেয়ে কিছুক্ষণ ইমোশনাল কথাবার্তা বলার পর তিনি রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। নুসরাতের মাথায় কিছুই ঢুকছে না। ঠিক তখনই তার মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার চোখ জলে টইটুম্বুর হয়ে উঠল। নৌশির চোখও মোবাইলের দিকে যেতেই তার মুখে হাসি ফুটল। ডায়াল লিস্টে নাম দেখা যাচ্ছে ‘বাদামওয়ালা’। নৌশি আর সেখানে বসল না, এখন নুসরাতকে একা ছাড়া জরুরি।
নুসরাত কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে নির্জনের সেই নেশার ন্যায় মায়াবী কণ্ঠ ভেসে আসল,
“চশমাওয়ালি ম্যাডাম!”
নুসরাত ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। তবে কান্নার শব্দটা সামান্য হলেও নির্জনের কানে পৌঁছাল। সে কোমল স্বরে বলল,
“কাঁদছেন কেন?”
নুসরাত অভিমানে ফেটে পড়ে বলল,
“মানুষ এত পাষাণ কী করে হয় বলুন তো? রূপের বুঝি এতই দাম? তবে কি ভালোবাসাটা আপনার কাছে এতটাই মিথ্যা ছিল?”
নির্জন ওপাশ থেকে শান্ত গলায় জবাব দিল,
“আমার ভালোবাসা মিথ্যা হলে আপনাকে বিয়ে করার জন্য আমার বাবাকে দিয়ে প্রস্তাব পাঠাতাম না।”
“তবে এতদিন দেখতে আসলেন না কেন আমাকে?”
নির্জন এবার গম্ভীর কিন্তু গভীর আবেগে বলল, “আপনাকে আমি কবুল বলার পরই দেখব। সেই পর্যন্ত একটু ধৈর্য ধরুন। কবুল বলার পর যখন আপনাকে চিরতরে আমার সহধর্মিনী বানিয়ে নেব, তখন মন ভরে দেখব। তার আগে নয়।”
নুসরাতের কণ্ঠ দিয়ে আর কোনো কথা বের হচ্ছে না। একটা মানুষ কাউকে এতটা নিঃস্বার্থভাবে কীভাবে ভালোবাসতে পারে? নির্জন আবারও বলল,
“দেখা হচ্ছে চশমাওয়ালি ম্যাডাম, ঠিক বিয়ের দিন।”
বলেই নির্জন কলটা কেটে দিল। নুসরাত এক অদ্ভুত ঘোর আর বিস্ময় নিয়ে নিজের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইল।
চলবে…
(কোথাও কোনো ভুল হলে ধরিয়ে দিবেন। আমি শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করব।)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১১
-
রোদ্দুরের ছেড়া মানচিত্র পর্ব ৩৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৯
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৭