Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৫


রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

পর্ব_৩৫

নিলুফানাজমিননীলা

★★★
মধ্যরাত পেরিয়ে ঘড়ির কাঁটা এখন বারোটা তেত্রিশ। চারদিকের নিস্তব্ধতা যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে। শীতের বিদায়ের পর বসন্তের আকাশ এখন একদম পরিষ্কার।মায়াবী জ্যোৎস্না আলো বেলকনিতে আছড়ে পড়েছে। সেই আলো-ছায়ার খেলায় নীল রঙের শাড়ি পরা তৃণা দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে।
​একসময় যে তৃণা অন্ধকার ঘর থেকে বের হতে ভয় পেত, আজ সে এই গা ছমছমে নিস্তব্ধতায় একা বসে আছে। মানুষের মনের ভেতর যখন বিশাল কোনো হাহাকার বা দুশ্চিন্তা বাসা বাঁধে, তখন কি বাইরের সব কৃত্রিম ভয় উবে যায়? হয়তো তাই। তৃণার হৃদয়ের নীল বিষের কাছে বাইরের অন্ধকার আজ বড় তুচ্ছ।
​সন্ধ্যায় আরিয়ান ফোন করে জানিয়েছিল, বান্দরবন থেকে ফিরতে অনেক রাত হবে বলে সে শহরে কোনো এক হোটেলেই থেকে যাবে, আজ বাড়ি ফিরবে না। হঠাৎ এই নিশিরাতে তৃণার হাতের ফোনটা সজাগ হয়ে উঠল। আরিয়ানের নামটা স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই তৃণা বুক ধক করে ওঠার আগেই রিসিভ করল।
​ওপাশ থেকে আরিয়ানের সেই গম্ভীর কিন্তু ক্লান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“ঘুমাওনি?”

​তৃণা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল
, “না, এখনই ঘুমিয়ে যাব। আপনি কি হোটেলে পৌঁছেছেন?”

​“হুম, এই তো মাত্রই আসলাম।” আরিয়ানের কণ্ঠস্বর বেশ ধীর।

​এরপর এক দীর্ঘ নীরবতা। কেউ কোনো কথা বলছে না, কিন্তু ফোনের লাইন ধরে দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ একে অপরের কানে পৌঁছাচ্ছে। তৃণা সাহস সঞ্চয় করে অনুচ্চ স্বরে প্রশ্ন করল,
“সেই মেয়েটার কোনো খোঁজ কি পেয়েছেন?”

​আরিয়ান ওপাশ থেকে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “নাহ। তবে আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি পেয়ে যাব।”

​তৃণার ঠোঁটে একটা ম্লান বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। ফোনের ওপাশ থেকে আরিয়ান সেই হাসির শব্দ শুনতে পেল না, কিন্তু তৃণার নীরবতা হয়তো তাকে কিছু একটা বলতে চাইল। তৃণা হঠাৎ খুব নিচু গলায় বলল,
“আপনি যদি ফ্রি থাকেন, তবে কি কিছুক্ষণ কথা বলবেন আমার সাথে?”

​আরিয়ান ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তৃণার গলায় আজ এক অদ্ভুত আকুতি ছিল, যা আরিয়ানকে উপেক্ষা করতে দিল না। সে নরম গলায় বলল,
“বলো, শুনছি।”

আরিয়ান তৃণার এমন আকস্মিক কথায় কিছুটা অবাক হলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, আমি ফ্রি আছি। বলো।”

​তৃণা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ম্লান গলায় বলল,
“জানেন আরিয়ান সাহেব, আমি সুখকে ডেকে একদিন বলেছিলাম তুমি কি আমার হবে? সুখ তখন তাচ্ছিল্য করে হেঁসে বলল, ‘যে জিনিস হওয়ার নয়, সে জিনিস চেয়ে নিজেকে লজ্জা দিচ্ছিস কেন?’ এরপর আমি যখন নিরুপায় হয়ে দুঃখের দিকে তাকালাম, দুঃখ আমার দিকে তাকিয়ে পরম মমতায় হাসল। বলল ‘আমাকে বলতে হবে না, আমি তো তোরই আছি’।”

​আরিয়ান চুপচাপ তৃণার কথাগুলো শুনছিল। এই গভীর রাতে তৃণার কণ্ঠে এমন হাহাকার সে আগে কখনো শোনেনি। ছেলেটা কী উত্তর দেবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। তার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করতে শুরু করল। তৃণা আবারও হুট করে বলে উঠল,
“আজ উকিল কাকু এসেছিলেন।”

​আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “তো?”

​“আমি ডিভোর্সের পেপার রেডি করতে বলেছি।”

​আরিয়ান যেন কানে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো চমকে উঠল। সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“মানে? কিন্তু আমি তো তোমাকে না করেছিলাম এই কাজটা এখনই করতে!”

​তৃণা এবার অদ্ভুত এক শব্দ করে হাসল, যেন নিজের ভাগ্যের ওপর তার চরম ঘৃণা হচ্ছে। সে বলল,
“বাদ দিন সেসব। এবার আপনি ঘুমান।”

​বলেই আরিয়ানকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে কলটা কেটে দিল তৃণা। আরিয়ান বিমূঢ় হয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মাথায় তখন হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তৃণা কি তবে তার ওই মেয়েটাকে খুঁজতে আসার বিষয়টা মেনে নিতে পারছে না? কিন্তু সে তো স্পষ্ট করেই বলেছিল যে সে ডিভোর্স দিতে চায় না। তবুও তৃণা কেন এই হঠকারী সিদ্ধান্ত নিল? আরিয়ান অস্থির হয়ে কিছুক্ষণ হোটেলের রুমে পায়চারি করল, তারপর চরম বিরক্তি আর মাথাব্যথা নিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল।

​ওদিকে তৃণা একইভাবে বসে রইল বারান্দার সেই ঠান্ডা ফ্লোরে। এখন তার দৃষ্টি আকাশের দিকে। আকাশে অসংখ্য তাঁরা ফুটেছে, আর অর্ধেক চাঁদটা যেন এক মায়াবী হাসি দিয়ে পৃথিবীর সব অন্ধকার শুষে নিতে চাইছে। তৃণার মনে হলো, চাঁদটা কি তার এই নীরব কষ্ট দেখে হাসছে? ভেবেই সে এক বাঁকা হাসি হাসল।
​তৃণা চাঁদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“চাঁদকে নিয়ে কবিরা কবিতা লেখে, প্রেমিকরা তাদের প্রেমিকার সাথে তুলনা করে… অথচ কী আশ্চর্য, এই মহাবিশ্বের বিশালতায় চাঁদটা কত একা!”

স্মৃতির জানলাটা হঠাৎ করেই খুলে গেল তৃণার। চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই ধোঁয়াশা মাখা সুন্দর রাতগুলো। ঠিক এইরকমই এক জোছনা রাতে তৃণা, তার মা মেহেরজান আর বাবা উমর হাওলাদার—তিনজন মিলে ছাদে বসে গল্প করছিলেন। দোলনায় দুলতে দুলতে মায়ের আঁচলের ঘ্রাণ নিচ্ছিল তৃণা। কে জানত, ওই রাতটাই হবে তাদের শেষ সুখের স্মৃতি? পরের দিনই এক বিষাদময় অধ্যায় শুরু হলো, মা তাদের দুজনকে নিঃস্ব করে না ফেরার দেশে চলে গেলেন।
​তৃণা অশ্রুসজল চোখে আবারও চাঁদের দিকে তাকাল। লোকে বলে, ছোটবেলায় মায়েরা চাঁদকে দেখিয়ে ঘুম পাড়াত, কিন্তু তৃণার মা তো তাকে চিরতরের জন্য এক ঘুমন্ত রাতের আঁধারে ফেলে চলে গেছেন। তৃণা আকাশের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল,
“এত অভাগা কেন বানালে আমায় খোদা?”

​তৃণার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জলগুলো চাঁদের আলোয় মুক্তোর মতো চিকচিক করছে। ব্যথায় নীল হয়ে যাওয়া কণ্ঠে সে অস্ফুট স্বরে গেয়ে উঠল সেই পরিচিত সুর,
​“ওই চাঁদের টিপে মন ভোলে না মা
দোলনা দোলে, মন দোলে না মা…
রাতের চোখে ঘুম যে নামে
চাঁদের পাশে মেঘ যে থামে
আমার পাশে তুমি নেই তো মা…
তোমায় ছাড়া ঘুম আসে না মা।”

​গানটা শেষ করতে পারল না তৃণা। কান্নায় কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল তার। হাঁটুতে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল সে। মধ্যরাতের এই নিঃশব্দ কান্না শোনার মতো কেউ নেই। ওপরের ওই বিশাল আকাশ আর নির্বাক চাঁদ হয়তো দেখছে এক নিঃসঙ্গ মেয়ের হাহাকার, কিন্তু তাদের কিছু করার সাধ্য নেই।
​মা নামক ছায়াটা না থাকলে জীবনটা যে কতটা তপ্ত মরুভূমি হয়ে যায়, তা আজ হাড়হাড় করে টের পাচ্ছে তৃণা। যাদের মা আছে, তাদের পৃথিবীর সব রোদ থেকেও আড়াল করার ছাতা আছে। আর যাদের নেই, তাদের জন্য প্রতিটি রাতই এক একটা কালবৈশাখী। আর তৃণার মতো যারা পরিস্থিতির শিকার, তাদের দুঃখটা তো নীল সাগরের চেয়েও গভীর।
★★★
রাত তখন প্রায় আড়াইটা। চারদিকের নিস্তব্ধতা চিরে আরিয়ানের গাড়িটা মির্জা বাড়ির সামনে এসে থামল। পাহাড়ের সেই রহস্যময় টান আর হোটেলের একাকীত্ব সবকিছু ছাপিয়ে তৃণার ওই কান্নাভেজা কণ্ঠটা আরিয়ানকে স্থির থাকতে দেয়নি। এক অজানা অস্থিরতা নিয়ে সে মাঝপথেই ফিরে এসেছে।
​বাড়ির প্রধান ফটক ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। আরিয়ান ফোন করে আদনানকে জাগিয়ে তুলল। আদনান ঘুমজড়ানো চোখে দরজা খুলে দিতেই অবাক হয়ে গেল।
“তুমি না বললে আজ আসবে না? এত রাতে হঠাৎ কী হলো?”

​আরিয়ান কোনোমতে মাথা নেড়ে বলল,
“এমনিই চলে এলাম। ভালো লাগছিল না ওখানে।”

​আদনান আর কথা বাড়াল না। আরিয়ান দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিজের রুমের সামনে দাঁড়াল। দরজায় হাত দিতেই বুঝতে পারল ওটা ভেতর থেকে লক করা নেই। ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখল পুরো ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার। কেবল বেলকনির এক কোণে চাঁদের ম্লান আলো এসে পড়ছে।
​আরিয়ান পা টিপে টিপে বারান্দায় যেতেই তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। হিমশীতল ফ্লোরে তৃণা গুটিসুটি মেরে বসে আছে, হাঁটুতে মুখ গোঁজা। মেয়েটা এতটাই নিজের কষ্টের গভীরে ডুবে ছিল যে আরিয়ানের আসার শব্দও পায়নি। আরিয়ান আলতো করে তৃণার কাঁধে হাত রাখল।
​স্পর্শ পেতেই তৃণা শিউরে উঠে ছিটকে দূরে সরে গেল। ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করে উঠল, “কে? কে আপনি?”

​আরিয়ান শান্ত স্বরে বলল, “আমি।”

​তৃণা কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। অন্ধকারের মাঝে আরিয়ানের ছায়াটা দেখে সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
“আপনি? আপনার তো হোটেলে।থাকার কথা!”

​আরিয়ান কোনো জবাব না দিয়ে তৃণার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসল। মেয়েটার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, মুখটা কান্নায় লাল হয়ে আছে। আরিয়ান নিজের আঙুল দিয়ে তৃণার গাল বেয়ে পড়া তপ্ত অশ্রুগুলো মুছে দিল। তার কণ্ঠে বিরক্তি আর মায়ার এক অদ্ভুত মিশেল শোনা গেল,
​“আমি তো তোমাকে বলেছিলাম তৃণা, আমি তোমাকে ডিভোর্স দেব না। তুমি আমার রুমে থাকছ, আমার চোখের সামনে থাকছ এতে তো আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবুও কেন তোমার এত জেদ? কেন এই মাঝরাতে ফ্লোরে বসে চোখের জল ফেলছ? আর ফোন করে বললে ডিভোর্স পেপার রেডি করতে,এতটা অস্থির কেন তুমি?”

তৃণা নিথর হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে রাজ্যের বিস্ময় আর অবিশ্বাস। আরিয়ান আবারও শান্ত গলায় বলল,
“তৃণা, আমি আর কতবার বলবো? আমি শুধুমাত্র ওই কন্যাকে খুঁজছি আমার মানসিক সমস্যার জন্য। আমি এই অদ্ভুত মানসিক রোগ থেকে মুক্তি পেতে চাচ্ছি। তবে তুমি যদি চাও, তুমি যদি একবার বলো, তাহলে আমি ওই মেয়ের আর কোনো খবর নেব না। তাকে খোঁজা আজই বন্ধ করে দেব।”

​তৃণা তখনও চুপ করে আছে, তার মুখে কোনো কথা নেই। আরিয়ান এবার আর কিছুটা এগিয়ে গেল। একদম তৃণার মুখের কাছে নিজের মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“এই গভীর রাত্রিতে তুমি কি স্ত্রীর অধিকার চাও? তবে তুমি চাইলেও আমার কোনো সমস্যা নেই।”

​আরিয়ানের এমন সরাসরি কথায় তৃণা ভীষণভাবে চমকে উঠল। সে লজ্জায় আর সংকোচে একটু পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পেছনে দেয়াল থাকায় তা পারল না। তৃণার এই অসহায় অবস্থা দেখে আরিয়ান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসলো। তারপর এক ঝটকায় এক টানে তৃণাকে পাজাকোলে তুলে নিল। তৃণা অপ্রস্তুত হয়ে ভয়ে আর আতঙ্কে হাত-পা ছুঁড়তে লাগল। কাঁপা কন্ঠে আর্তনাদ করে বলল,
“ছাড়ুন প্লিজ, আমাকে নামিয়ে দিন!”

​আরিয়ান তৃণার কোনো আকুতিই শুনল না। তৃণা মরিয়া হয়ে জোরে জোরে আরিয়ানের চওড়া বুকে কিল-ঘুষি বসাতে লাগল। আরিয়ান হঠাৎ তার পা থামিয়ে তৃণার মুখের দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে উঠল,
“চুপ থাকো একদম!”

​আরিয়ানের সেই কড়া ধমকে তৃণা মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেল। আরিয়ান লম্বা লম্বা পা ফেলে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বেডরুমে চলে এলো। বিছানার কাছে আসতেই তৃণার ভয়ে কলিজা শুকিয়ে যেতে লাগল, সে কোনোভাবেই আরেকটা ভয়ংকর রাতের সাক্ষী হতে চায় না। কিন্তু আরিয়ান তাকে অবাক করে দিয়ে বিছানায় একদম আলতো ভাবে শুইয়ে দিল। শুইয়ে দেওয়ার সময় আরিয়ানের মুখ তৃণার মুখের একদম কাছে চলে এলো। তৃণা ভয়ে দুচোখ কিচমিচ করে বন্ধ করে রেখেছে। আরিয়ান তৃণার সেই ভীতু মুখের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির এক মুচকি হাসি হাসল। এরপর সে আলতো হাতে বিছানার পায়ের নিচ থেকে কম্বলটা টেনে তৃণার সারা শরীরে জড়িয়ে দিল।

​তৃণা অবাক হয়ে ধীরে ধীরে চোখ খুলল। আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে খুব ধীর কন্ঠে বলল,
“বোকা মেয়ে!”

​বলেই আরিয়ান পাশ কাটিয়ে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। তৃণা বিছানায় শুয়ে ঠিক বুঝতে পারল না আসলে হলোটা কী! সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে রইল। এরই মাঝে ওয়াশরুম থেকে শাওয়ার ছাড়ার শব্দ ভেসে এল। তৃণা মনে মনে ভাবল মাঝরাতে কি লোকটা সত্যিই গোসল করবে?
★★★
সকাল দশটা বেজে গেছে, কিন্তু আরিয়ানের মোবাইলটা তখনো একনাগাড়ে বেজে যাচ্ছে। রাতে অনেক দেরি করে ঘুমানোর কারণে আরিয়ানের শরীরটা ভীষণ ভারী হয়ে আছে, সে কিছুতেই চোখ মেলতে পারছে না। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ রেখেই হাতড়ে মোবাইলটা খুঁজে কানে ধরল। কর্কশ গলায় বলল,
“হ্যালো!”

​ওপাশ থেকে নিরবের কণ্ঠ ভেসে এল, যার সাথে পাহাড়ে সেই হোটেলে দেখা হয়েছিল। নিরব কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
“কিরে, এখনো ঘুমাচ্ছিস?”

​“হুম। এত সকালে কল দিলি কেন?” আরিয়ানের কণ্ঠে রাজ্যের বিরক্তি।

​“সকাল কোথায়? দশটা বেজে গেছে। যাই হোক, একটা জরুরি কথা শোন। গতকাল তোরা যে লিস্টটা নিয়েছিলি, সেখান থেকে একটা ছেঁড়া পাতা সেই স্টোর রুমেই পড়েছিল। সকালে ঝাড়ুদার ময়লা পরিষ্কার করতে গিয়ে ওটা খুঁজে পেয়েছে।”

​আরিয়ান হাই তুলে বলল,
“আচ্ছা, ওটার একটা ছবি তুলে পাঠিয়ে দে।”

​নিরব কল কেটে দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হোয়াটসঅ্যাপে ফটো আসার নোটিফিকেশন বাজল। আরিয়ানের প্রথমে দেখার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না, সে আবার চোখ বন্ধ করে নিল। কিন্তু অবচেতন মন তাকে সায় দিল না। সে ভাবল, নামগুলো একবার দেখেই আবার ঘুমাবে।
​ঘুম ঘুম চোখে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ঝাপসা দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকাল আরিয়ান। কিন্তু ছবির ওপরের নামগুলো পড়ামাত্রই তার চোখের ঘুম এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। আরিয়ান ধপাস করে বিছানায় উঠে বসল। নিজের দুই হাতে চোখ কচলিয়ে সে বোঝার চেষ্টা করল যা দেখছে তা কি সত্যি, নাকি এখনো স্বপ্নের ঘোরে আছে?
​না, সে যা দেখছে তা দিবালোকের মতো সত্যি। আরিয়ানের চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। সেই হলদেটে পুরনো কাগজে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা রয়েছে উমর হাওলাদার। আর তার নিচেই পরিবারের সদস্য হিসেবে নাম দেওয়া আছে তৃণা হাওলাদার এবং রিনি হাওলাদার, সাথে রৌশনারা বেগম।
​আরিয়ানের হৃদস্পন্দন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার মাথায় হাজারটা প্রশ্ন ঝড়ের মতো আছড়ে পড়তে লাগল। তবে কি সেই বৃষ্টির দিনে দেখা নীল গাউন পরা রহস্যময়ী মেয়েটা তৃণা? যার সাথে সে একই ছাদের নিচে থাকছে, যাকে সে অবজ্ঞা করেছে, সে-ই কি তার সেই চার বছরের পুরনো জট? নাকি এটা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার? তৃণা কি তবে সব জানত?
​আরিয়ান পাগলের মতো বিছানা থেকে নেমে তৃণার খোঁজে রুমের বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। তার মনে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন পাহাড়ি সেই মেয়েটা কি আসলেই তৃণা?রুম থেকে বের হতে গিয়েই থেমে গেল।তার মাথায় অন্য আরেকটা কথা মনে পরতেই তার চোখ চকচক করে উঠলো।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply