রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_৩৩
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
আজ পনেরো দিন পর নুসরাত মির্জা বাড়িতে ফিরেছে। হাসপাতালের সাদা দেয়াল আর ওষুধের গন্ধ থেকে মুক্তি পেলেও নুসরাতের মনের ভেতরের অন্ধকার কাটেনি। একটা মেয়ের কাছে তার চেহারা অনেক বড় বিষয়, অথচ নুসরাতের সেই মসৃণ তিলত্তমা মুখটা আজ ক্ষতবিক্ষত। বামদিকের অনেকটা অংশ এসিডের কালচে দাগে নিজের চেনা রূপ হারিয়েছে।
বাড়িতে ফেরার পর সবাই নুসরাতকে ঘিরে থাকলেও নুসরাতের চোখ জোড়া অবাধ্যভাবে একজনকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল সে হলো নির্জন। যে মানুষটা নুসরাতের জন্য পাগল ছিল সেই মানুষটা এই পনেরো দিনে একবারও নুসরাতের সামনে আসেনি। নুসরাত দুই-একবার দূর থেকে তাকে করিডোরে দেখেছে ঠিকই, কিন্তু নির্জন একবারের জন্যও তার কেবিনে ঢুকে হাতটা ধরে বলেনি, আমি আছি তো, সব ঠিক হয়ে যাবে। নির্জনের এই নিস্পৃহতা নুসরাতকে তার শরীরের ক্ষতের চেয়েও বেশি যন্ত্রণ দিচ্ছে।
তৃণা আর মিতু নুসরাতকে ধরে ধরে তার নিজের রুমে নিয়ে এল। রুমে ঢুকেই নুসরাত দেখল, তার চিরচেনা ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা একটা ভারী পর্দা দিয়ে ঢাকা। বাড়ির লোক হয়তো তাকে মানসিকভাবে রক্ষা করতেই এটা করেছে, কিন্তু নুসরাত তো অবুঝ নয়। সে মলিন হাসল।
নুসরাত ম্লান স্বরে বলল,
“এভাবে পর্দা ঝুলিয়ে রাখার তো প্রয়োজন ছিল না।”
তৃণা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“থাক না, কয়েক দিন পর না হয় সরানো যাবে…”
কিন্তু নুসরাত কারও বাধা মানল না। সে ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে এক টানে আয়নার পর্দাটা সরিয়ে দিল। ঝকঝকে আয়নায় ফুটে উঠল এক অচেনা নুসরাত। বাম গালের সেই বীভৎস পোড়া দাগটা যেন তাকে বিদ্রূপ করছে। নুসরাত স্থির থাকতে পারল না, নিজের ওপর ঘৃণায় আর্তনাদ করে উঠল সে। মিতু আর তৃণা তাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করল, কিন্তু নুসরাতের বুক ফেটে কান্না আসছিল। কোনো মেয়েই কি পারে নিজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া সৌন্দর্য মেনে নিতে?
নিচে থেকে ফারহানা বেগমসহ বাড়ির সবাই দৌড়ে এল। মা নুসরাতকে বুকে টেনে নিয়ে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন
, “কিছু হয়নি মা, কিচ্ছু হয়নি। সব ঠিক হয়ে যাবে, এখন তো অনেক উন্নত চিকিৎসা আছে।”
সবাই সান্ত্বনা দিচ্ছে, কিন্তু নুসরাতের কানে সেসব কথা প্রবেশ করছে না। তার মাথায় তখন অন্য এক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। নির্জন কেন আসেনি, তার উত্তর যেন আজ সে পেয়ে গেছে। নুসরাত নিজের মনেই ভাবল, “নির্জন তাহলে সৌন্দর্যের পূজারি ছিল? আজ আমার সৌন্দর্য নেই বলে সে আমাকে মুখ দেখাতে পারছে না? তবে কি তার সেই ভালোবাসা কেবল এই চামড়ার উজ্জ্বলতার জন্যই ছিল?”
নুসরাত ঠোঁট কামড়ে কান্না সংবরণ করার চেষ্টা করল।
★★★
বিলাসবহুল অফিসের বিশাল স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল ভেদ করে বাইরের ব্যস্ত শহরটা দেখা যাচ্ছে। আরিয়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে সেই জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে এক হিমশীতল শূন্যতা, যেন সে এই শহরে থেকেও এখানে নেই। পেছনে সোফায় বসে আছে সিফাত। আরিয়ান আর সিফাত বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি কিছু,দেশের বাইরে একসাথে পড়াশোনা শেষ করে ফেরার পর আজই প্রথম আরিয়ান তাকে এভাবে জরুরি তলব করেছে।
বেশ দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর সিফাতই প্রথম নিস্তব্ধতা ভাঙল। সে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“আরিয়ান, কী হয়েছে বলবি তো? তোকে ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছে। ডাকার পর থেকে তো একটা কথাও বললি না।”
আরিয়ান ধীরে ধীরে সিফাতের দিকে ফিরল। সে নিজের টেবিলের কোণে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
“একটা বিশেষ দরকারি কাজেই তোকে ডেকেছি। তোর হাতে যদি সময় থাকে, আমার সাথে একবার যেতে পারবি?”
সিফাত ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কোথায়?”
“মনে আছে সিফাত, চার বছর আগে আমরা পাহাড়ে ট্যুরে গিয়েছিলাম?” আরিয়ানের গলার স্বরে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।
সিফাত চমকে উঠল। সোজা হয়ে বসে বলল,
“হুম, মনে থাকবে না কেন? কিন্তু তুই হুট করে ওই জায়গার নাম নিচ্ছিস কেন? ওখানে যাওয়ার আর কোনো প্রয়োজন নেই আরিয়ান। আমি সব জানি, সেই এক্সিডেন্টের পর থেকে তোর অবস্থা কতটা খারাপ হয়েছিল। কেন আবার সেই ক্ষত খুঁড়ে বের করতে চাইছিস?”
আরিয়ান ধীরস্থিরভাবে জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল,
“আমাকে যেতেই হবে সিফাত। কিছু একটা আমাকে শান্তি দিচ্ছে না। আমাকে কিছু জিনিসের খোঁজ নিতেই হবে।”
সিফাত কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল,
“আরে ওখানে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার কিছু নেই! সেদিন যে গাড়ি এক্সিডেন্টটা হয়েছিল, সেটা একটা দুর্ঘটনা ছিল। তাতে কারো হাত ছিল না, এমনকি তোরও কোনো দোষ ছিল না। কেন নিজেকে অপরাধী ভাবছিস?”
আরিয়ান এবার সিফাতের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমি জানি ওটা স্রেফ একটা এক্সিডেন্ট ছিল। আমি সেই দুর্ঘটনার খোঁজ নিতে যাচ্ছি না সিফাত। আমি যাচ্ছি সেই পাহাড়ি কন্যার খোঁজে। তাকে আমার খুঁজে বের করতেই হবে।”
সিফাত আঁতকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে চরম বিস্ময়। সে আরিয়ানের সামনে এসে উত্তেজিত স্বরে বলল,
“তোর কি মাথা ঠিক আছে আরিয়ান? তুই এখনো সেই মেয়েটাকে ভুলতে পারিসনি? কয়েক সেকেন্ডের দেখা একটা মেয়েকে কেউ এভাবে চার বছর মনে রাখে? আর সবচাইতে বড় কথা, তুই বিয়ে করেছিস। তোর ঘরে স্ত্রী আছে। তারপরও সেই মেয়েকে খুঁজে বেড়ানো মানে কি তুই তৃণাকে ঠকাচ্ছিস না?”
আরিয়ান যেন এই প্রশ্নের জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে টলমল পায়ে গিয়ে নিজের রিভলভিং চেয়ারটায় ধপ করে বসল। বাইরের শহরের দিকে তাকিয়ে নিস্তেজ গলায় বলল,
“ঠকাচ্ছি না সিফাত। বরং আমি চাচ্ছি তৃণাকে তার যোগ্য সম্মান দিতে। ওই পাহাড়ি অচেনা মেয়েটা ছিল আমার জীবনের প্রথম মায়া। অদ্ভুত এক ঘোর ছিল তার চোখে। জীবনে প্রথম প্রণয় এসেছিল ওই পাহাড়ের বাঁকেই। আর এখন…”
কথাটা বলতে গিয়ে আরিয়ান হঠাৎ থেমে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে নিজের মুখমন্ডলে দুই হাত চেপে ধরে ভেতরের প্রচণ্ড অস্থিরতা লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। সিফাত আরিয়ানের এই ভেঙে পড়া রূপ দেখে ঘাবড়ে গেল। সে কৌতূহলী হয়ে নিচু স্বরে বলল,
“এখন কী আরিয়ান? থামলি কেন?”
আরিয়ান মুখ থেকে হাত সরিয়ে সিফাতের দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত দ্বন্দ। সে ধরা গলায় বলল,
“এখন আমি দ্বিতীয়বারের মতো মায়ায় জড়িয়েছি সিফাত। আমি আমার স্ত্রীর প্রতি, সেই তৃণার প্রতি ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছি। আমি লক্ষ্য করি, যখনই সেই শ্যামবর্ণ কন্যার দিকে আমার চোখ যায়, আমি আর দৃষ্টি সরাতে পারি না। ওকে আশেপাশে দেখলে আমার বুকের ভেতর অদ্ভুতভাবে ধুকধুক করে। কিন্তু আমি মানসিকভাবে এক চরম যুদ্ধে ভুগছি। আমি জানি আমি তৃণাকে এখনো পূর্ণ স্ত্রীর সম্মান দিতে পারছি না, কারণ আমার অবচেতন মনে সেই পাহাড়ি মেয়েটা একটা দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাস্ট মি সিফাত, আমি চেষ্টা করেছি ওকে আপন করে নিতে, কিন্তু কোথাও গিয়ে আমি আটকে যাই।”
কথাগুলো বলার সময় আরিয়ানের হাত-পা কাঁপছিল।
সিফাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“কিন্তু ওই মেয়েকে তুই এখন কোথায় খুঁজবি আরিয়ান? আমার মনে হয় না তুই তাকে আর খুঁজে পাবি। চার বছর অনেক লম্বা সময়। সেই মেয়েটা সত্যিই ওখানকার পাহাড়ি কি না, নাকি আমাদের মতোই কোথাও থেকে ঘুরতে গিয়েছিল সেটাও তো তুই নিশ্চিত জানিস না। আচ্ছা, ধরি যদি তুই তাকে খুঁজে পাস, তারপর কী করবি?”
আরিয়ান অসহায় দৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “কিছুই না। আমি শুধু একবার তাকে সামনাসামনি দেখতে চাই। যার কারণে আমার জীবনটা এমন ছন্নছাড়া হয়ে গেল, যার ঝাপসা চেহারাটা প্রতিমুহূর্তে আমার চোখের সামনে ভেসে বেড়ায় তাকে একবার স্বচক্ষে দেখা ছাড়া আমার মুক্তি নেই।”
সিফাত বুঝতে পারল আরিয়ানকে বোঝানো বৃথা। সে বলল, “ঠিক আছে, যা হওয়ার হবে। আগামীকালই আমরা সেখানে যাব। আজ আমি একটু ব্যস্ত থাকব।”
সিফাত বিদায় নিয়ে চলে গেল।
রুমে এখন আরিয়ান একা। সে একটা সিগারেট ধরিয়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। মার্বেলের সিলিংয়ের দিকে তাকাতেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই চার বছর আগের এক বৃষ্টিভেজা বিকেল। পাহাড়ের ঢালু রাস্তায় নীল রঙের গাউন পরে একটা মেয়ে দুহাত বাড়িয়ে বৃষ্টির আনন্দে নাচছিল। মেয়েটার দীর্ঘ চুলগুলো পিঠ ছাপিয়ে ছড়িয়ে ছিল। পাহাড়ি পথে মেয়েটার পায়ে কোনো জুতো ছিল না। বৃষ্টির ঝাপসা ঝাপটায় আর এলোমেলো চুলে মেয়েটার মুখটা পুরোপুরি দেখা না গেলেও সেই দৃশ্যটা আরিয়ানের মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে।
হঠাৎ করেই সেই স্মৃতির সাথে তৃণার মায়াবী শ্যামলা মুখটা এসে ভিড় করল। একপাশে সেই রহস্যময়ী কিশোরী, অন্যপাশে তার বর্তমান জীবন তৃণা। আরিয়ান নিজের মাথা দুই হাতে চেপে ধরল। যখনই এই দুই স্মৃতি একে অপরের সাথে যুদ্ধ করে, তখনই তার মস্তিষ্কে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয় মনে হয় মাথা ফেটে এখনই কিছু একটা বেরিয়ে আসবে। অসহ্য যন্ত্রণায় আরিয়ান টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলো এক ঝটকায় ফ্লোরে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“আল্লাহ! তুমি আমাকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দাও! হয় সব স্মৃতি ভুলিয়ে দাও, নয়তো আমাকে পাগল বানিয়ে দাও! তবুও আমায় একটু শান্তি দাও আল্লাহ!”
চিৎকার করতে করতে আরিয়ান ফ্লোরে হাঁটু গেঁড়ে বসে নিজের চুল মুঠো করে ধরল। ঠিক সেই সময় করিডোর দিয়ে যাচ্ছিলেন এনামুল মির্জা।আরিয়ানের আর্তনাদ শুনে তিনি হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকলেন। আরিয়ানকে এই অবস্থায় দেখে তিনি খুব একটা ঘাবড়ালেন না, কারণ তিনি জানেন আরিয়ান প্রায়ই এমন মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়। তিনি দ্রুত ড্রয়ার থেকে একটা ট্রাঙ্কুইলাইজার ট্যাবলেট আর পানির গ্লাস এগিয়ে দিলেন।
ওষুধটা খেয়ে আরিয়ান টেবিলের ওপর মাথা এলিয়ে দিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে রইল। এনামুল মির্জা আরিয়ানের মাথায় হাত রেখে তপ্ত শ্বাস ফেললেন।
★★★
রাত তখন বেশ গভীর। মির্জা বাড়ির ড্রয়িংরুমটা এখন নিস্তব্ধ। বাড়ির সবাই হয়তো এতক্ষণে ঘুমের দেশে, শুধু তৃণা একাই সোফায় বসে ঝিমোচ্ছে। আরিয়ান এখনো অফিস থেকে ফেরেনি। একবার কল দিয়েছিল তৃণা, আরিয়ান তখন শুধু বলেছিল ফিরতে দেরি হবে। মায়মুনা বেগমও ছেলের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলেন, কিন্তু ওনার পুরনো কোমরের ব্যথার কারণে বেশিক্ষণ বসে থাকা সম্ভব হয়নি। তৃণা জোর করেই তাকে রুমে পাঠিয়ে দিয়েছে। মায়মুনা বেগম আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছেন।আগে তৃণার প্রতি একটা দূরত্ব রাখলেও এখন তিনি নুসরাত বা নৌশির মতোই তৃণাকে আপন করে নিয়েছেন, তাকে বেশ ভালোবাসেনও।
ঘড়ির কাঁটায় টিকটিক শব্দ হচ্ছে, রাত এখন বারোটা। তৃণার চোখের পাতা ঘুমে বারবার ভারী হয়ে আসছে। ঠিক তখনই দরজার কলিং বেলটা বেজে উঠল। তৃণা দ্রুত গিয়ে দরজা খুলতেই দেখল বিধ্বস্ত আরিয়ান দাঁড়িয়ে। আরিয়ান একবার তৃণার দিকে তাকিয়েই ভেতরে ঢুকে পড়ল। দরজাটা লাগিয়ে তৃণা অনুযোগের সুরে বলল,
“এত দেরি করলেন যে?”
আরিয়ান নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল, “কাজ ছিল।”
“কিন্তু বাবা তো বললেন অফিসে এখন তেমন কাজের চাপ নেই,” তৃণা পাল্টা প্রশ্ন করল।
আরিয়ান এই কথার কোনো উত্তর দিল না। সে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে চাইলে তৃণা তার পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলল,
“খাওয়া-দাওয়া করে তারপর ওপরে যান। আমি জানি, একবার ওপরে গেলে আপনি আর খাওয়ার জন্য নিচে নামবেন না।”
আরিয়ান থামল। তৃণার দিকে একজোড়া ক্লান্ত আর শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে বলল,
“জোর করো না তৃণা। খাওয়ার মতো বিন্দুমাত্র এনার্জি আমার অবশিষ্ট নেই। তুমি খেয়েছ?”
ইদানীং আরিয়ান মাঝেমধ্যে তৃণার খোঁজখবর নেয়। এই ছোট ছোট প্রশ্নগুলো তৃণাকে ভীষণ আনন্দ দেয়। আরিয়ান এখন আর আগের মতো হুটহাট রেগে যায় না, কেমন যেন পাথর হয়ে গেছে। দেখে মনে হয়, মানুষটা ভেতর থেকে ক্রমশ গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। তৃণা ধীর স্বরে বলল,
“হুম, আমি খেয়েছি।”
“তাতেই হবে,” সংক্ষেপে এটুকু বলেই আরিয়ান সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
.
.
আরিয়ান ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হতেই দেখল তৃণা হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে রুমে ঢুকছে। প্লেটটা দেখেই আরিয়ান বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোমাকে না করলাম না তৃণা? আমার একদম ক্ষুধা নেই।”
“আপনি না করলেই হলো নাকি? আর কোনো কথা না বলে এখানে বসুন তো।”
তৃণা আরিয়ানের কোনো ওজর-আপত্তি শুনল না। সে প্রায় জোর করেই আরিয়ানের হাত ধরে বিছানায় বসাল। তারপর নিজেই বিছানায় আরিয়ানের মুখোমুখি বসল। আরিয়ান কেন জানি আজ আর বাধা দিল না,সে স্তব্ধ হয়ে তৃণার মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। তৃণা যখন যত্ন করে ভাত মাখিয়ে আরিয়ানের মুখের কাছে লোকমাটা ধরল, ঠিক তখনই তার হঠাৎ মনে পড়ল যত্ন করতে গিয়ে সে অনেক বেশি অগ্রসর হয়ে গেছে। আরিয়ানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো অধিকারটুকু কি আদেও সে অর্জন করতে পেরেছে?
তৃণা দ্বিধায় পড়ে হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল। কিন্তু তার আগেই আরিয়ান আলতো করে তৃণার কবজিটা ধরে ফেলল। আরিয়ান তৃণার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা ম্লান হাসি দিয়ে বলল,
“মুখের লোকমা এভাবে কেড়ে নেওয়া কি ঠিক?”
তৃণা আর কথা বাড়াল না, আলতো করে লোকমাটা আরিয়ানের মুখে তুলে দিল। লোকমাটা মুখে দিয়েই তৃণা বলল,
“এবার বাকিটা নিজের হাতে খেয়ে নিন।”
আরিয়ান এবার আর না করল না। সে প্লেটটা নিজের হাতে নিল, কিন্তু প্রথম লোকমাটা মাখিয়েই তৃণার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“হা করো।”
তৃণা এতটাই অবাক হলো যে কয়েক সেকেন্ড তার পলক পড়ল না। আরিয়ান কি তবে সত্যিই বদলাচ্ছে? আরিয়ান এবার কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী হলো? কথা শুনতে পাচ্ছ না?”
আরিয়ানের সেই চেনা ধমকে তৃণা তড়িঘড়ি করে হা করল। আরিয়ান যত্ন করে এক লোকমা খাবার তৃণার মুখে পুরে দিল। পুরো রুমের আবহাওয়াটা মুহূর্তেই বদলে গেল, এক বিষণ্ণ রাত যেন হঠাৎ বসন্তের ছোঁয়া পেল। খাবার খেতে খেতে আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
“কাল সকালে আমাকে একটু তাড়াতাড়ি ডেকে দিও। আমাকে জরুরি এক জায়গায় যেতে হবে।”
তৃণা মৃদু হেঁসে বলল,
“ওই মেয়েটার খুঁজে যাবেন?”
তৃণার সহজ স্বীকারোক্তি শুনে আরিয়ানের হাতের লোকমা হাতেই রয়ে গেল। সে স্তম্ভিত হয়ে তৃণার দিকে তাকাল। আরিয়ানকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তৃণা ম্লান হাসল। বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল,
“অবাক হচ্ছেন? গতকাল রাতে ঘুমের ঘোরে আপনি ছটফট করছিলেন। ঘুমের মাঝেই বারবার বিড়বিড়িয়ে বলছিলেন সেই মেয়েটাকে আপনার খুঁজে বের করতেই হবে।”
আরিয়ান এবার মাথা নিচু করে নিল। তার ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য যেন ওলটপালট হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
“তৃণা, আমি কাউকে ঠকাতে চাই না।নিজেকে মুক্ত করতে যাচ্ছি।”
তৃণা আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো ঘৃণা ছিল না, ছিল এক গভীর মমতা। সে দরজার দিকে এগোতে এগোতে হাসিমুখে বলল,
“আমি আপনাকে ভুল বুঝছি না। আমি দোয়া করি, আপনার স্বপ্নের সেই মায়াবতীকে আপনি খুঁজে পান। আপনার মনের শান্তি ফিরে আসুক।”
তৃণা প্লেট নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আরিয়ান অপলক দৃষ্টিতে তৃণার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তৃণার এই উদারতা আরিয়ানের অসস্তি যেন আরও বাড়িয়ে দিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল,
“তোমার এই নিঃস্বার্থ যত্নই যে আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিচ্ছে, তুমি কি তা জানো শ্যামলিনী?”
চলবে…
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেড়া মানচিত্র পর্ব ৩৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৯
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১